বুধবার, ২৯ জুন, ২০১৬

গ্যাস-লাইটিং ও স্লো-কুকিং : ভগবান ও প্রান্তিক জিরাফ

অনামিকা বন্দ্যোপাধ্যায়


এপ্রিল নাকি হল গিয়ে নিষ্ঠুরতম মাস।

আর যে মাসে এই লেখা লিপিবদ্ধ হচ্ছে, তা হল জুন। । আর এবছর এপর্যন্ত আমেরিকার নিষ্ঠুরতম ঘটনাটি ঘটল জুন মাসে। আমার শহর অরলান্ডোতে।

এরপর দু-সপ্তাহের ব্যবধানে, আমি সে শহর ছেড়ে চলে এসেছি ও আবার এই গদ্যে ফিরছি।


দেখছি সংবাদপত্রে লেখা হয়েছে --
“Transgressive sexuality and conservative religion can be a toxic mix," লিখছেন, David Shariatmadari দ্য গার্জিয়ানে। “If Mateen felt conflicted about his interest in gay men, it could have been because he believed his faith would condemn him for it”.

মাতিন গে-মানুষ না গে-মানুষকে ঘৃণা করা মানুষ, না টেররিষ্ট, অরলান্ডো ঘটনায় তার চেয়েও বড় প্রশ্ন হয়ে গড়িয়ে আসছে সেই তিন শব্দ -- হোমোফোবিয়া, ইসলামফোবিয়া, গান কন্ট্রোল। তার মধ্যে শেষোক্ত দুই নিয়ে অন্য গদ্যে যাব। আপাতত আমার জার্নাল খুঁজবে হোমোফোবিয়ার এর লোকাসে থাকা গ্যাসলাইটিং এর স্লো-কুকিংকে ।

স্লো-কুকিং পদ্ধতি অনুসরণ করে কিছু কল্পনার সংলাপ বিস্তার করা যাক। অনেকটা হলিউডি আখ্যানের ধাঁচা ধরে, কজালিটি এফেক্ট। তা এরকম হতে পারে --

-একজন, নিতান্ত '' ধার্মিক মানুষ তিনি কি একাজ ( মানে করুন-- সর্ব-সাপেক্ষে খারাপ / হানিকর কাজ) করতে পারেন ?

-একজন, সজ্জন মানুষ তিনি কি একাজ করতে পারেন ?

-উনি শিক্ষিত হতে পারেন কিন্তু সজ্জন নহেন।

-উনি, হয়ত একটু গুণ্ডা-গিরি করে থাকেন, কিন্তু আসলে মানুষটা ধার্মিক।

চলতে থাকুক । পেয়ে যাব এর'ম আরও কিছু ।

-জমিদার ( পোস্ট-কোলোনিয়াল ব্যাখ্যানে রাজনীতিক দাদা-দিদি পড়া যায় ) লেঠেল পোষেন ঠিকই, কিন্তু দুবেলা চণ্ডীপাঠ না করে জলগ্রহণ করেন না, না না তার পক্ষে অহিতকর কাজ … কেমন করে সম্ভব?

-ধর্ম রক্ষার্থে লেঠেলই যদি প্রয়োগ করতেই হয়, হবে। ধর্ম-রক্ষা, হিন্দুর, মুসলমানের, আস্তিকের বিকল্পহীন কর্তব্য। দর্শন।

পাঠক লক্ষ্য করে থাকবেন, সংলাপের ক্রম থেকে এক ধরনের ধীর-আগ্রাসনের রাজনীতি স্পষ্ট হয়, এটিকে আমি স্লো-কুকিং বলতে চাইব।

এই স্লো-কুকিং এর রেসিপি'র অ্যান্টিচেম্বারটি আমি বেশ ছোটকালেই আবিষ্কার করে ফেলি। তা' হল -- এক চামচ ধর্ম গুঁড়িয়ে তোমার সিগারেটে মিশিয়ে নাও, স্বাস্থ্যের পক্ষে লাভ-কারক হয়ে যাবে।

এর এক দৌড়ও আছে। যার স্টারটিং আছে যে শব্দটি-- অসহিষ্ণুতা । এসব দৌড়দের শেষ হয় অর্লান্ডোর মত প্রাণঘাতী ঘটনায়।

অরলান্ডো শহরে আমি বাস করেছি। পালস এর কথা আমি প্রথম শুনি ধরা যাক, আমান্ডা'র কাছ থেকে। ধরা যাক, আমান্ডা আমার সহকর্মী, ধরা যাক তিনি আমার প্রতিবেশীও বটেন । ধরা যাক, তার ঘটনার স্লো-কুকিং ও গ্যাসলাইটিংএর সাক্ষী ছিলাম আমি নিজে।

অল্পদিনই ফ্লোরিডা বাস করেছি, কিন্তু তার চমৎকার রোদ আর হাওয়ায় মজে থেকেছি। সপ্তাহান্ত মানেই, ফ্লরিডিয়ানদের হইচই, বারবিকিউ, মাছ ধরা, লেকে নৌকা-বিহার। লেক ছোট, ক্ষতি নেই। ফ্লরিডিয়ানদের উৎসাহ তুমুল। ফুরফুরে মেজাজে তারা সমুদ্রধারে বা লেকে জড় হচ্ছেই । আমার মত বই-কুনো মানুষও ছোঁয়াচ লেগে বই উল্টে বেড়িয়ে পড়ত। হইচই প্রিয় ক্যারল, আমান্ডা, ব্রায়ান'রা সঙ্গী হত প্রায়ই।

বাড়ির উলটোদিকে থাকা স্যামসনদের সাথে ভাল ভাব জমেছে ততদিনে। লুই আর সামান্থা স্যামসন। হঠাৎ এদিকে আমান্ডাকে ফেললুম বিপদে।

বারবিকিউতে স্যামসন দের বললাম একদিন। সাথে নেমন্তন্ন করলুম আমান্ডা'কেও । অফিসের carol এর সাথেও আমান্ডার সৌহার্দ্য। ঝকঝকে হাসিমুখের মেয়ে ক্যারল'কেও বলে দিলুম আসতে। ফুলঝুরি রোদে চিকচিক করছে কাচের মত লেকের জল। রেশমি ধোঁয়া বেরোতে শুরু করেছে চারকোলের আঁচের। হাল্কা কনিয়াক খেতে খেতে আমান্ডা বলে আমাদের-- তার বালিকা-বেলার কথা, মন্টানার অগভীর পাথুরে নদীগুলির কথা, তার বাবার ফ্লাই-ফিশিং এর কথা।' ছবির মত লাগছে তো আমান্ডা', আমি বলে বসি।

-তুমি ছবি বানাও তো, তাই। আর আমিও তো ছবি আঁকি।

--তাই নাকি ?

উল্লসিত আমি। ক্যারলও।

- বলনি তো আগে?

লুই বলল - কি'করে দেখা যায় ?

আমান্ডা উৎসাহী হয়ে ওঠে। একটুকরো চীজ মুখে পুরে তৎপর হয়ে প্রায় সাথে সাথেই সেল ঘেঁটে 'পেয়ে গেছে' বলে জানায়। একটি প্রদর্শনীর ছবি । ছবিতে পেন্টিং এ ক্যানভাস জুড়ে দুটি যোনী, দুটি লিপস্টিক মাখা ঠোঁট সেই যোনী-দুটিকে আদর করছে। আর তার সামনে ঠোঁটে ঠোঁট ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আমান্ডা ও একটা পুরনো গোছের বয়ফ্রেন্ড সোয়েটার পরা ছোটো চুলের আরেকজন। আমান্ডা জানায় - এ তার পার্টনার -কিম । ব্রুকলিনে কাজ করে, কিছুদিনের মধ্যেই এসে পড়বে অরলান্ডোতে, তার তোড়জোড় চলছে।

ছবি দেখে সামান্থা ভুরু-টুরু নাচিয়ে "নাইস' বলে প্রশংসা করে তড়িঘড়ি কাবাবগুলো রোস্ট করতে চলে যায়।

লুই ও প্রশংসা-সূচক মাথা নাড়িয়ে জানতে চায় ঃ আমি আর কনিয়াক পান করব কিনা ?


আমি ছোট্ট করে না বলি।

কিন্তু কনিয়াক তার মারহাব্বা খেল খেলে দিয়েছে। আমি বুঝে যাই চোরাগোপ্তা কি শুরু হয়ে গেছে।

আমান্ডা বেচারি স্ট্রাটস্ফীয়ারের তখনো একটু ওপরে।

এরপরের ঘটনা অনুমান করতে কষ্ট হওয়ার কথা নয়।

ক্যারলের হাসিমুখ থেকে হাসি উধাও। স্যামসনরা আমার সাথেও কথা বন্ধ করেছে। দেখলে দু'সেন্টিমিটার নিমতেতো ঠোঁট হাঁ করে। অফিসে কানাঘুষো । একদিন প্রবীণা জুলি তাকে জিগ্যেস করে ফেলেছেন, তোমাকে দেখে বোঝা যায়না যে তুমি ...। আমি-তুমি। আমরা -ওরা,অপর। ধর্ম, ভগবান, শাস্ত্র ও সবশেষে সেই হাতে রইল- জিরাফ।

ঘটনার ক্লাইম্যাক্সটি পাঠক অনুমান করেছেন। ঠিকই। আমান্ডা তার চাকরীটি খুইয়েছে। তাকে লে-অফের নোটিস দেওয়া হয়েছে। শুধু মাঝে হাডসন দিয়ে অনেক জল গেছে। আমান্ডা ল-স্যুট করেছে ইত্যাদি ইত্যাদি।

শুধু কেউ কেউ বলল, যদিও দুঃখের ব্যাপার, তাও আমেরিকায় চাকরী খোয়ানো খুবই কমন । ওর বস মদের ঠেকে বলল, খারাপ লাগছে, কিন্তু ওর পেন্টিং গুলো যদি পর্নো না হবে তাহলে চাকরী পাওয়ার সময় সিভি তে লেখেনি কেন ?

আমায় কে যেন বলেছিল বসের জিজ্ঞাসাবাদের কোন উত্তর করেনি সে। কিন্তু এইচ. আর এর ঘরের দিকে মিডিল ফিঙ্গার দেখিয়েছিল। বলাবাহুল্য সেকথা পাঁচকান-সাত-কান ও সব-কান হয়ে যায়।

যদিও কথা একটাই, যদি হও বিরুদ্ধ মতের সংখ্যালঘু, তোমাকে গ্রহণ করব না, টিকতেও দেব না।

আমান্ডার ডেস্কের কাছে গিয়ে দেখি, শীর্ণ কিন্তু গোছানো হাতে বাক্স ধরে ধীরে হেঁটে যাছে কাউকে পরোয়া না করে, করিডর দিয়ে একা, অফিসের জানলার পাশ দিয়ে, সব জানলাগুলি বন্ধ। মীরা নাইআরের নতুন ছবি The Reluctant Fundamentalist এর সেই ট্র্যাকিং শটের কথা মনে পড়াল।

সেদিন আমান্ডাকে সরাসরি আমার বাড়িতে নিয়ে এসেছিলাম। তার পার্টনার কিম, এ অনুরোধ আমায় করেছিল।

অরলান্ডো ঘটনার পর আমান্ডা আমায় একদিন ফোন করল।

-- এই ধর্ম জিনিষটা কি তা' বলত, সেই ঠিক করে দেবে, কি ভুল আর কি ঠিক, কি করতে হবে আর কি না... আমান্ডা বলে, তোমাদের হিন্দুদের কি কোন বই আছে, হ্যাঁ আছে তো, গীতা , তাই না ?

-- আরও আছে। আর আমি হিন্দু বাড়িতে জন্মেছি, তবে আমি হিন্দু কিনা সঠিক জানিনা।

--কিন্তু কোনটা তোমাদের বাইবেল ? মানে কোরান ও হতে পারে ..

--সেটা জোর দিয়ে হিন্দুরা বলতে পারেননা। অনেক টেক্সট, অনেক ভগবান, দেব-দেবী

--আমাদের খ্রিস্টানদের বিশ্বাসের উপজীব্যই হল ঃ মানুষ পতিত। তার পাপ-স্খলনের প্রয়োজন হয়। গড ভিন্ন অস্তিত্ব নাই। তিনি ও বাইবেলই চরম তাদের ক্ষেত্রে।

[ Romans 13: “Everyone is to obey the governing authorities, because there is no authority except from God, and so whatever authorities exist have been appointed by God. So anyone who disobeys an authority is rebelling against God’s ordinance, and rebels must expect to receive the condemnation they deserve.”]

-- ইসলামেও আছে , বলি আমি।

In the Islamic tradition, it states that it is better to suffer a hundred years of tyranny, than one night of anarchy.

কিসে কি আছে তা না, আসলে কি জানো আমান্ডা, ধর্মের জিরাফদের জন্যে এসবই হল বিশল্যকরণী।

একে শান্তির সাথে গুলিয়ে ফেলারও চেষ্টা। ভয় পাওয়ানোও কি নয় ? আর মূলধারার বাইরের যে বেঁচে থাকার অস্তিত্ব মুল ধারার হিপক্রিসিকে আক্রমণ করলেই তা হোল অ্যানারকি। তা'হল প্রান্তিক। আমার যা ভাল লাগে, অন্যদের তা ভাল লাগেনা। এই নিয়েই তো যত বিরোধ ...

আমান্ডা'র কথায় আবার পরে আসব, তার আগে অ্যানারকির কথায় যখন এসেই গেলাম...।

নোম চমস্কির ইন্টারভিউ নিতে গেছি। তার ঘরে বসে কথা হচ্ছিল, তার সেক্রেটারি বেভের সাথে ঃ 'জানোতো নোমের নাম নিলে চাকরী পায়না '। আমি তো শুনে দারুণ মজা পেলুম।

মজা যে ঠিক কতটা তা টের পেলুম কিছুদিন পর থেকে।

তখন একের পর এক চাকরীর অ্যাপ্লাই করছি, কোথাও ডাক পাইনা। আমার এক বন্ধু একদিন ফোন দিয়ে বলে, 'করেছ কি চমস্কির সাথে তোমার ছবি রেখেছ ওয়েবসাইটে ! সব্বোনাশ ! এদেশে আর কাজ পেয়েছ তুমি ! "

স্বীকার করতে লজ্জা নেই, কিছুদিনের জন্যে ছবিটা সরিয়ে দিয়েছিলাম।

পরে নানা সময়ে কাজের জায়গায় কোলীগদের কাছে হর-হামেশা গ্যাসলাইটিঙের যে বাগধারা শুনে চলেছি

তার থেকে বাছাই করলে কমন পাওয়া যায় তেমন কটি গ্যাসলাইটিং এর নমুনা এখানে রাখলাম --

আপনি কেন হলিউড দেখেন না ?

নোম চমস্কি কেন পড়েন ? ভদ্রলোক তো আমেরিকা বিরোধী… সব বিষয়ে কথা বলেন …

হলিউড দেখেন না ? কেন ? তবে কি দেখেন ?

আপনি কেন চেতন ভগত পড়েন না ( ভারতীয়দের করা এক অতি কমন প্রশ্ন )

ধর্ম মাননা কেন ? তোমাদের তো কাস্ট-প্রথা আছে, খুব খারাপ অভিজ্ঞতা হয়েছিল বুঝি ?

ধর্মই যদি না মানো তাহলে নীতিহীন কাজ থেকে তোমায় বাঁচাবে কে ?

বলার অপেক্ষা রাখে না যে দিনপ্রতি এই প্রশ্নসকলের যদি একবার করেও মুখোমুখি হতে হয়, তবে আপনার এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকেনা। এবং ক্রমেই আমার অ্যানারকি-ছাপ উত্তর তাদের কেবলই অসহিষ্ণু করে তুলতে থেকেছে। । এর ফলশ্রুতিতে আবারো তারা আমায় এড়িয়ে গেছেন, কেউ হাসি বন্ধ করেছেন, কেউ গল্প করা, এবং ক্রমে নেমন্তন্ন তালিকা থেকে বাদ ও আনঅফিসিয়ালি শেষমেশ বসের কাছে চুকলিকর্ম ইত্যাদি । অর্থাৎ কাল্পনিক বর্ডার ব্যবস্থা। যার চূড়ান্ত হবে আমান্ডা'র মত পরিস্থিতিতে। যুদ্ধ জারীই থাকে, বন্দুক-সুলভ বলে কেউ কেউ হাতে তুলে নেয় শুধু ।

পালস এ সেই প্রান্তিক মানুষেরা এসে মিলতেন, মূলধারার গ্যাস-লাইটিঙে যারা কৌণিক ভাবে সরতে সরতে সমকোণ হারিয়েছেন। মার্কিন সমাজ পলিটিকালি করেক্টের পাঠ নিতে নিতে ফল্গুধারার গ্যাসলাইইটিং কে বেছে নিয়েছে, সমাজের মূলস্রোত প্রকৃত সহনশীল হলে পালসের অস্তিত্বের প্রয়োজন হ'ত না।


লকের ( John Locke 1632 – 1704) সেই বিখ্যাত চিঠি মনে পড়ছে -- “Letter on Toleration”, যেখানে লক লিখছেন--

"কারুর এই অধিকার নেই যে অন্য বিশ্বাসের মানুষদের আঘাত করে।"

কিন্তু, এক গলদের মত প্রায় লক আড়াল করছেন আরও অনেক কিছু। লক বলছেন ' নাস্তিকেরা শপথ নেয়ার মানুষ ন'ন, আর তাই তাদের ওপর ভরসা চলেনা পুরোদমে"। যা আলোকায়নের একটি বায়াসের পক্ষ নেয়। তিনি ক্যাথলিকদেরও সিভিল সমাজের কেন্দ্রে রাখার পক্ষপাতী যদিও নন।


এমনকি আলোকায়নের দার্শনিকদের মধ্যে সবচাইতে বেশী পক্ষপাত-হীনরাও ভাবছেন এভাবে। Spinoza, ১৭ শতকের জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা, যদিও গণতন্ত্র-কামী ও মুক্ত-রাজনৈতিক চিন্তার ঝলকানি আছে তার চিন্তায়। বলছেন Spinoza-- 'একজন অভিজাত, সুবিধাপ্রাপ্ত শিক্ষিত মানুষ তার নীতি নির্ধারণের জন্যে দর্শন ঘেঁটে দেখতে পারেন, তিনি সেইখানে তার নীতি ও কাজ-ধারার অনুপ্রেরণা খুব পাবেনও বা কিন্তু দরিদ্ররা যাবে কোথায়?' অতএব নিদান হাঁকছেন-- 'গরীবরা নীতি বোধ পাবে ধর্ম থেকে' - 'religion is the poor man’s philosophy'.

ধর্মই দেখাবে পথ, অর্থাৎ ধর্ম হল গিয়ে গরীব মানুষের "দর্শন" চিন্তা ! এখানে ধর্ম, দর্শনকে রিপ্লেস করছে।

আমান্ডা আর আমার আলোচনায় ফিরে আসি।

আমি বলি--

-আমরা মুক্তমনা প্রগতিশীল, আমরা প্রান্তিক নারী, শ্রমিক, কালো ত্বক, ল্যাটিনো, মুসলিম, সমকামী সবাইকে এক টেবিলে দেখতে চাই।


ফ্লোরিডার জুন মাসে বিকেলবেলা রোজ এক ঝড় ওঠে। তা আমাদের কালবৈশাখীর মত। আমি বেভুল-পানা মুখ করে বৃষ্টির গন্ধ শুঁকি, পাম-গাছের তলায় দাঁড়িয়ে আমান্ডা'কে তালগাছের গল্প বলি। বোলপুরের সেইসব গরম-ছুটির বিকেল। অপূর্ব সব কালবৈশাখীর আগের-আগের মুহূর্তরা, থম হয়ে থাকা চরাচর, আর মাঝমাঠে দাঁড়িয়ে থাকা একা সেই তালগাছগুলি। আমান্ডা হাসে। আমার দিকে ঝুঁকে বলে-- poor tropical soul।

-Biological sex এর কথা ওঠে দুই-জঙ্ঘার মিলন স্থল থেকে। লিঙ্গ-নির্মাণ তারও চেয়ে বেশি কিছু নয় কি ? জিনাইটেলিয়া, ক্রোমোজোম, হরমোন... লিঙ্গ নির্মাণের সংস্কৃতিতে আমার শরীর যদি তোমার বাইনারিতে না আঁটে যাকে আরবান ডিকশনারি তে " খাপে-খাপ' বলা চলতে পারে, তা যদি নাহয় তবে তাকে …

বলে চলি আমি।


- নারী -পুরুষ বাইনারি আমায় পাগল করে দেয় জানো।

বলে ওঠে আমান্ডা।

'ট্র্যান্স-মানুষের শরীরকে যখন এই বাইনারিতে ফেলে মেয়েদের-মত-শরীর বা পুরুষের-মত-শরীর এই লেবেলে আটক করা হয়, তার তার আত্মিক পরিচয় গৌণ হয়ে দাঁড়ায় প্রজনন অঙ্গের কাছে। আমার শরীর আমার শরীর , তার কোনখানটা পুরুষের, কোনখানটা নারীর, এসব কে ঠিক করে বলে দিতে পারে ? পারে কি আদৌ ? আমার কনুই, নাক, গোড়ালিকে কি করে সেই বাইনারি তে ফেলতে পারি ? পারি কি আদৌ ? তা যদি না পারি, তবে শরীরের অন্য একটিই মাত্র অঙ্গের গঠন আমার পরিচয় ঠিক করে দেবে কেন ? শরীর, শরীর । এটাই ।'

আমি গভীর হয়ে ওর কথা শুনি। শুনতে শুনতে, এই আলোচনায়, ছোটবেলার জার্নাল থেকে রামকৃষ্ণকে এনে ফেলছি। নেহাতই মিথ-জনিত কথা। একবার লেপ মুড়ি দিয়ে শুনে ফেললুম, এক মাঘময় সন্ধেতে। জয় মিত্র স্ট্রীটের 'বর্মা', এই নামেই ডাকা হত তাকে, যা কিনা আসলে ছিল 'বড়মা'র' দ্রুতিকরণ। তিনি এক শীত-মাখা সন্ধেয় আমার মা'র কাছে এসে ঘন হয়ে বসলেন। আসতেন প্রায়ই। গল্পও করতেন নানান কিসিমের। । এই বর্মা হলেন আমার ঠাকুরমার একটু দূর সম্পর্কের কাকিমা। । ঠাকুমার প্রায় সমবয়েসি । ঠাম্মা বলতেন-- কাকিমা হিন্দুস্তানি, কাকার সাথে বিয়ের পর ৪০ বছর ধরে হিন্দুস্তানিত্ব খুইয়ে এখন নিখাদ বাঙ্গালী। এই কথা আমরা ফি বছর ছট পূজোর পরপর শুনতে পেতুম। বড়মার বাড়ী থেকে আসত গরম ঠেকুয়া আর সেও ভাজা। তাইতে কামড় বসিয়ে শুনতে থাকতুম, বড়মা কেমন ''খোট্টা'' রঙের শাড়ি পরে বিয়ের পর শ্বশুর-বাড়ি এসেছিলেন। তার সাথে এক হাত কাচের চুরি। 'আমার মায়ের তো মাথায় হাত , এতো এককণা ভাষা বোঝে না, ও সোনা ঠাকুরপো … এরে আমি কেমনে মানুষ করি! এতো বেগুন বললে বেলগাছও বোঝেনা গো' বলে চলতেন ঠাম্মা।

 খারাপ পাড়ায় থাকতেন বলে তার বাড়ী যাওয়া ছিল নিষিদ্ধ। নেহাত অসুখ না হলে যাওয়ার থাকত না। বাড়ির রান্নাঘরের ভারপ্রাপ্ত কর্মী টুলুপিসি গিয়ে মাঝে মাঝেই খাবার দিয়ে আসতেন, টুলুপিসির ভাষায় তার ওপর ছিল ছিল "টিপিনকেরি' পৌঁছবার ভার। তো এ'হেন বড়মা এসে এক শীত-সন্ধেয়, বড় এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চা নিয়ে হাঁটু মুড়ে বসলেন। কথা বলার সময় তার মুখের আগল থাকত না বলে আমদের সটান ঘুমতে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হল। আমি আর আমার পিসতুতো বোন গিয়ে সেধোলাম লেপের তলায়। তখনো আমাদের অভিনয় ক্ষমতায় বড়দের ততটা আস্থা জন্মায়নি। সেই ছিল বিরাট রক্ষে। 

তো যেকথা বলব বলে এই ডায়েরি উদ্গার, তা হল বড়মার বোমাবর্ষণকারী সেই তথ্য, যাকে আমি মিথ বলছি, (পরে এ জিনিষ রামকৃষ্ণ ভক্তদের কাছেও বিস্তর শুনেছি )-- রামকৃষ্ণের ঋতুমতী হওয়ার তথ্য। " ও বৌমা রামকৃষ্ণের মাসিক হত জানতো ? রাধাভাবে থাকতেন...।' গায়ে ঠেলা মারলেন বুঝি আমার মায়ের। লেপের তলায় ঝাঁ ঝাঁ করছে। মাসিক শব্দ শিখে গেছি তখন। শুধু যে মেয়েদেরই হয়, তাও জানা। পিসতুতো ভাই বুলটাই অনেক অনুনয় করলে ওকে বলতে স্বীকৃত হইনি এক বিশেষ মুখ ও মেজাজ সহযোগে। ছেলেদের মাসিক ? হয় ?

আসল বোমা ফেটেছিল পরদিন রান্নাঘরে। ঠাকুমা সিধান্ত নিলেন- 'না বড়মাকে আর বাড়তে দেওয়া যায়না। এইটুকু বউমাদের এইসব অধর্ম শেখাচ্ছে'। বেচারী মা, রামকৃষ্ণের নিন্দা হচ্ছে ভেবেছিলেন।

এই যে বেচারি বললুম। নিন্দে বললুম … এর ভেতর আছে যে অসহিষ্ণুতা তা ট্যাবু কেন্দ্রিক। মাত্র তিনটি মানুষের ভিতর এক রান্নাঘরের অন্দরে জোটবদ্ধ ভাবে রুখে দেওয়া গেলো- ধর্মের বিপন্নতা। রামকৃষ্ণের আদৌ মাসিক হওয়া সম্ভব ছিল কিনা তা বিচারের আওতায় না, আওতায় এলো রাধা-ভাব, লিঙ্গ-বিচ্যুতির কথা। যা সমাজ স্বীকৃত না, যা মূলধারার না, তা প্রান্তিক, আর মূলধারার রামকৃষ্ণকে সেই লেবেলে আটক করলে তা রুখে দিতে হবে। অনেক বেশি মানুষের যা পছন্দ, স্বীকৃতি পাবে শুধুই সেটি, মতে না মিললে প্রান্তিক করা হবে,আর মূলধারার আলোচনায় তার প্রবেশ নিষেধ। আর আজ প্রায় মাঝবয়েস ছুঁতে এসে দেখি সেই রান্নাঘর ফুলে ফেঁপে এক পৃথিবী হয়েছে।

স্লো-কুকিং এর আগ্রাসন এর সাথে রান্নাঘর কেমন জুড়ে-গেঁথে গেছে। পাঠক লক্ষ্য করুন।

মা-ঠাম্মার সেই রান্নাঘরে আমার রান্না শেখা হয়নি। যৌথ পরিবার ভেঙ্গে ফ্ল্যাটের রান্নাঘরে টাইলস বসেছিল অল্পদিন পরেই । আমার ব্যক্তিগত রান্নাঘর পাল্টে পাল্টে গেছে কিছুদিন পর পর। আজ অব্ধি আমেরিকার সাতটি শহরে রান্না-ঘর পাততে হয়েছে আমায়। তাতে জিরা-ধনিয়ার সাথে এসে মিশেছে ফেটা চীজ, পারস্লে, রোজমেরি, থাইম । কাবলি চানা টিনবন্দী হয়ে নাম পালটে- গারবানজো । আমার রান্নাঘর বেয়ে আমার আত্মার পরিচয়েও একটু করে প্রলেপ চড়েছে। ট্রান্সন্যাশনাল প্রলেপ । আমার ঠিকানা পাল্টাতে পাল্টাতে ভারচুয়াল-- ভারতীয় ডায়াস্পোরা।

পালস এর ঘটনার এক হপ্তা আগে বোস্টন শহরে'র হার্ভার্ড কুপ এ এক বন্ধুনীর জন্যে অপেক্ষা করছি। সময় কাটাতে হাতে তুলে নিয়েছি Free Thought and Official Propaganda।

রাসেল লিখছেন--

The evils of the world are due to moral defects quite as much as to lack of intelligence. But the human race has not hitherto discovered any method of eradicating moral defects; preaching and exhortation only add hypocrisy to the previous list of vices. Intelligence, on the contrary, is easily improved by methods known to every competent educator.

বইটি কিনে ফেলি। সেই বই অরলান্ডো পরবর্তী দিনে আমার প্রধান পাঠ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ফিরে আসি আবারো।

- তোমাদের হিন্দু সমাজে তবু অস্বীকৃতির ভেতর স্বীকৃতি লুকিয়ে আছে, চাপা পড়ে আছে তোমাদের ফ্যালাস-পুজো, যোনী-পুজো, মূলধারার আলোচনায় চাপা পড়ে আছে কিন্তু আবার আছেও। কিন্তু আমাদের সমাজে রাজনৈতিক এবং সংস্কৃতির হেজিমনিকে কাজে লাগিয়ে অন্য পরিচয়, মতকে মুছে দেওয়ার চেষ্টা সবচে' বেশি, মানে যা শাদা-দের বিপন্ন করতে পারে, বলে ওঠে আমান্ডা। And you probably don’t even realize it.

-ভাবো ইসলাম-এর দেশগুলোর কথাও। গজনীর সুলতান মামুদ প্রেমে পড়লেন তুর্কী ক্রীতদাস মালিক আয়াজ এর । তাদের প্রেমকথা এক আদর্শ প্রেমের উল্লেখে ছড়িয়ে গিয়েছিল ইসলামিক লেজেন্ডগুলিতে। অনুপ্রাণিতও করেছিল কত-শত সুফি সাহিত্যকে। কবি ইকবাল তার বঙ্গে-এ-দারা তে এর উল্লেখ করেছেন।

ইসলামিক স্বর্ণ সময়ে, আট আর তের শতকের সময় এটা। সমকামের কথা খোলাখুলি বলা হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে ইরানী কবি হাফিজ-ই-সিরাজি ও ধ্রুপদী আরব্য সাহিত্যের কবি সরাসরি সমকামের সম্পর্ক ও ভালোলাগার কথা জানাচ্ছেন। আবু নুয়াজ ( ৭৫৬-৮১৪ )। পুরো নাম আবু নুয়াজ আল-হাসান বেন হানি আল হাকিম । আব্বাসিদ খালিফা'র সুরম্য বাগদাদ। ততোধিক সুরম্য বাগদাদের অভিজাত সমাজ। সেহেন সময়ে নুয়াজ রচনা করছেন তার প্রেমের কবিতা গুচ্ছ ।

আমি শেল্ফ থেকে টেনে নিয়ে ইংরেজিতে তার বয়ান আমান্ডা কে বলি ( (Love in Bloom; after Monteil, p. 95)

I die of love for him, perfect in every way,
Lost in the strains of wafting music.
My eyes are fixed upon his delightful body
And I do not wonder at his beauty.
His waist is a sapling, his face a moon,
And loveliness rolls off his rosy cheek
I die of love for you, but keep this secret:
The tie that binds us is an unbreakable rope.

বিশ শতকের গোড়া পর্যন্ত এই টেক্সট সুলভও ছিল। নুয়াজ একজন অতি জরুরী ঐতিহাসিক সাহিত্যকার। আলিফ লাইলাতেও নুয়াজের উল্লেখ রয়েছে, এই সেদিন ২০০১ সাল থেকে কেবল মাত্র তাকে মুছে ফেলা সম্ভব হয়েছে। কি দ্রুত এগোচ্ছে এই অসহিষ্ণুতা । ২০০১ সালে ইজিপ্টের সরকার মৌলবাদীদের চাপে পড়ে ৬ হাজার খণ্ড পুড়িয়ে ফেলেন।

দস্যু মোহন সিরিজের সম্পর্কে এক খিল্লি-কথা প্রচলিত আছে - লেখক তার দুর্বলতা ঢাকতে প্রায়ই এই বাক্য বন্ধের আশ্রয় নিতেন-- তাহার পর কি করিয়া যে কি হইয়া গেল । আমাদের আলোচনায় এই শূন্যস্থানে আসতে বাধ্য ঔপনিবেশিকতা, ভিক্টোরিয়ান মনস্তত্ব।

আমি ঔপনিবেশিকতার দরজায় এই গদ্যকে আর হাজির করাচ্ছি না। আপাতত ।

তারচে' আবারো পড়ে নিতে চাইছি, বইয়ের তাকে ঈষৎ হেলে থাকা রাসেলের জবানী।

In religion and politics, on the contrary, though there is as yet nothing approaching scientific knowledge, everybody considers it de rigueur to have a dogmatic opinion, to be backed up by inflicting starvation, prison, and war, and to be carefully guarded from argumentative competition with any different opinion. If only men could be brought into a tentatively agnostic frame of mind about these matters, nine-tenths of the evils of the modern world would be cured. War would become impossible, because each side would realize that both sides must be in the wrong. Persecution would cease. Education would aim at expanding the mind, not at narrowing it. Men would be chosen for jobs on account of fitness to do the work, not because they flattered the irrational dogmas of those in power.

সংখ্যা-গরিষ্ঠ নাহলে তার অস্তিত্ব বিপন্ন। তারা প্রান্তিক। দলভারী মানুষেরা তাদের মত জোর করে চালাবেই সেই সব প্রান্তিকদের ওপর । 'প্রয়োজনে' - বল প্রয়োগ ও হত্যা।

সেলের টুং শব্দে টুইটার খুলে দেখি, এক বেলজিয়ান- ইজিপ্সিয়ান সাংবাদিক, নাম খালেদ দিয়াব, পোস্ট দিয়েছেন-- “ISIS have no idea what restoring the Caliphate actually means। In Baghdad, it’d involve booze, odes to wine, science... and a gay court poet.”


হিউস্টন, ২৩ জুন, টেক্সাস-- আজ এখানেও সারাদিন বৃষ্টির সাথে ঝড় হয়েছে। আমি Wasteland এর সাথে কনিয়াক পান করেছি। ঝড়ের রাতে, টাইরেসিয়াসের শ্মশ্রুময় পুরুষ-মুখাবয়ব যেন দেখতে পাই জানলার ওধারে। তার স্তনে বিদ্যুতের ঝলক এসে পড়ে। ভাবছি এমন কোনও সময়েই এলিয়ট 'দ' দেখতে পেয়েছিলেন। কেউ যেন বলে ওঠে, ঈষৎ নাসিকাময় উচ্চারণে।- 'everything' is not bad but just dangerous। আমি নোট নেব বলে তড়িঘড়ি লিখতে গেছি, দেখি কলমের কালি ধেবড়ে এভ্রিথিং এর মাথার দু-পাশে দুই quotation। চিহ্ন। কে বসাল ? আমি ? না ...... ? এতদিনেও কলমে লেখার অভ্যেস গেলনা আমার। Poor tropical soul.

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন