‘আপনি যার সঙ্গে কথা বলছিলেন, তাকে চেনেন স্যার?’
‘না।’
‘তবে সাবধান স্যার। লোকটা কিন্তু পাক্কা ফোরটোয়েন্টি।’
আমি দুলালবাবুর দিকে তাকিয়ে আছি। দুলালবাবু এই মহকুমা অফিসের পুরনো লোক। খুব একটা বাজে কথা বলেন না। বরং একটু বেশিরকমই চুপচাপ। আমি দুলালবাবুকে জিজ্ঞাসা করলাম—লোকটা এখানে আসে কেন?
‘লোকটা স্যার শকুন। শকুন যেমন ভাগাড়ে গরু পড়লেই দেখতে পায়, এও তেমন। কিন্তু এখন কার জন্যে হাজির হচ্ছে বুঝলাম না। তবে যখন হাজির হয়েছে, তখন নির্ঘাত কোথাও গোলমালের গন্ধ পেয়েছে।’
‘হাজির হয়ে কী করেন?’
‘কী আবার করবে—উনি উদ্ধার করবেন। উদ্ধারকর্তা!’
‘উদ্ধার করবেন। উদ্ধারকর্তা! লোকটা কী করেন?’
‘কী করে না সেটা বলুন? বনেদি বাড়ি। প্রচুর বিষয়-আশয়। চাষবাস করে। কবিরাজি করে। দৈব ওষুধ দেয়। আমি বলি, ভূত প্রেত আত্মা জিনের কারবার করে। আমি আপনাকে কী বলেছি স্যার। ও শকুন। কোনও জ্যান্ত জিনিসে ওর কারবারে নেই, সব মৃত। তবে একটা ইনফরমেশন আছে। শুনেছি, সাপের বিষের কোনও র্যাকেটের সঙ্গে যুক্ত। আমি আপনার আগের এসডিও থেকে পুলিশ সুপারকে পর্যন্ত জানিয়েছি। কিন্তু কেউ গা করেনি। একবার ধরে লক আপ করে ঠ্যাঙালে সব বেরিয়ে যেত।’
আমি বুঝলাম, আমার কথার সূত্র ধরে উনি আমাকেও জানিয়ে রাখলেন।
দুলালবাবু আবারও বললেন, ‘সাপের বিষ! ও নির্ঘাত ওই ভূত প্রেত দিয়ে আড়াল করে রাখে। তবে—।’ আমি আর তবেটা শোনার আগ্রহ দেখালাম না।
দিন যায়। মাস যায়। এভাবে বেশ কয়েক মাস কেটে গেল।
মাঝে মাঝে লোকটাকে দেখি। এসডিও অফিসের ভেতর, সামনে ঘোরাঘুরি করছে। একদিন আমার ঘরের সামনে দিয়ে মানুষটা হেঁটে যাচ্ছিলেন। আমি অফিস স্টাফ সুধন্যবাবুকে বললাম, ‘ওনাকে ডাকুন তো একবার।’
সুধন্যবাবু সঙ্গে সঙ্গে হুকুম তামিল করলেন। উনি ঘরে ঢুকে আমাকে নমস্কার জানালেন। আমি বললাম, ‘বসুন।’
চেয়ার সরিয়ে মানুষটা বসলেন। আমি বললাম, ‘আপনার সঙ্গে আলাপ হয়নি, অথচ মাঝে মাঝেই আপনাকে দেখি। অনেকের কাছেই আপনার কথা শুনেছি।’
মানুষটা হাতজোড় করে আবারও নমস্কার জানালেন। বললেন, ‘আমার নাম স্যার অমল কালী।’ কথাটা বলেই লোকটা একটু চুপ করে থাকলেন। বললেন, ‘পদবিটা কালী! কালী শুনে কি আপনার হাসি পেল স্যার!’
‘না, আমি এই সারনেম আগেও শুনেছি।’
‘বাহ্ স্যার আগেই শুনেছেন। বেশির ভাগ লোকই স্যার শোনেনি। তারা আবার দ্বিতীয়বার জিজ্ঞেস করেন। আমি বলি—কালী। জিব বের করা কালী। মুখে চুন-কালির কালি নয়।’
‘তা কী করেন কালীবাবু।’
‘ভালো বলেছেন স্যার। কেউ কোনওদিন আমাকে কালীবাবু বলেননি। আপনিই প্রথম। সবার কাছে আমি অমল, কিংবা অমলের সঙ্গে জুড়ে গিয়ে কিছু।’
‘আপনি কী করেন?’
‘জমি জায়গা আছে কিছু, চাষবাসই করি। এটা স্যার পেটের জন্য। আর সমাজসেবার জন্য স্যার— কবিরাজি করি। আর শখের জন্য...।’
‘শখের জন্য কী?’
‘ওটাই তো স্যার আমার এখন পরিচয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ওই যে স্যার আপনি বলছিলেন না, আপনার কথা শুনেছি, আপনি নিশ্চয়ই আমার শখের কথাই শুনেছেন। ফোরটোয়েন্টি স্যার। পাক্কা ফোরটোয়েন্টি। আমি ভূত নামাই। প্রেত নামাই। পেতনির সঙ্গে থাকি। আমার বাড়ি স্যার প্রেতপুরী!’
আমি মাথা নাড়াই, ‘না, না, এমন কথা এই অফিসের কেউ বলেননি। তবে হ্যাঁ, আত্মা পরলোক নিয়ে কাজ করেন। তা কী কাজ করেন?’
‘কোনও কাজ নয় স্যার, বলতে পারেন ওদের ওয়েভ লেন্থের সঙ্গে আমার কোথাও একটা কানেকশন হয়ে গেছে। আমার সঙ্গে ওদের যোগাযোগ আছে। এইটুকুই। এবার স্যার আপনার বিশ্বাস অবিশ্বাস। সব আপনার ব্যাপার। আমি আগেই আপনাকে বলে দিয়েছি, আমি পাক্কা ফোরটোয়েন্টি।’
‘চা খাবেন?’
‘হাসালেন স্যার। আমি এসডিও অফিসে ঢুকলেই সবাই আমার কাছ থেকে চা খায়। আজ আপনি আমাকে খাওয়াবেন! খাওয়ান, ভালো লাগবে।’
চায়ের অর্ডার করলাম। চা এল। চা শেষ করে অমল কালী বললেন, ‘আপনার সঙ্গে আলাপ করে স্যার বড্ড ভালো লাগল। একদিন মনে হলে প্রেতপুরীতে আসুন। পূর্ণিমায় এলে উঠোনে ঘোরাব। অমাবস্যায় এলে— ছাদে বসাব। ভালো লাগবে স্যার। আমাদের বাড়ির হাওয়া ভালো, আমাদের বাড়ির খাওয়া ভালো। এছাড়া লোকে বলে আমার স্ত্রী সুন্দরী। আমি বলি, আমার মেয়েও সুন্দরী। সবাইকে দেখবেন। তাঁদের সেবা পাবেন। আসুন স্যার।’
দুই.
এরপরেও অমল কালীকে দেখি। প্রায় প্রতি সপ্তাহেই কোনও না কোনওদিন এসডিও অফিসের পাশের চায়ের দোকানে বসে। একদিন গাড়ি নিয়ে বের হচ্ছি। হঠাৎ দেখি অমল কালী এসডিও অফিস থেকে বেরিয়ে কোথাও চলেছে। আমি ড্রাইভারকে বলে গাড়ি থামাই। বলি, ‘অমলবাবু উঠে আসুন। আপনাকে ছেড়ে দেব।’
উনি বিব্রত মুখে বলেন, ‘না, না, স্যার আমি চলে যাব।’
কিন্তু আমি গাড়ি থামিয়ে দরজা খুলে দিয়েছি—আসুন আসুন উঠে আসুন। মানুষটা একটু নার্ভাস হয়েই উঠে এলেন। গাড়ি চালু হল। বললাম, ‘কোথায় বাড়ি আপনার—আলি সাহেবকে বলে দিন।’
আলি সাহেব একটু ঘাড় ঘুরিয়ে বলল, ‘বলতে হবে না, আমি চিনি স্যার। কিন্তু আমরা ওদিক দিয়ে যাব না। সম্পূর্ণ উলটোদিকে যাব। আমি বরং ওকে দিগরুই মোড়ে ছেড়ে দিচ্ছি।’
‘হ্যাঁ হ্যাঁ সেটাই ভালো। আপনারা বামদিক দিয়ে চলে যাবেন। আমি যাব ডাইনে—।’
‘না, না, আপনাকে আমি ছেড়ে দেব। আলি সাহেব অমলবাবুকে বাড়িতেই ছাড়াবেন।’ কথাটা হয়তো আলি সাহেবের পছন্দ হল না, কেননা গাড়িটা আচমকা ঘ্যাঁক করে উঠল।
গাড়ি চলেছে। গাড়ির ভেতর গুটিসুটি মেরে অমল কালী বসে। বললাম, ‘এসডিও অফিসে এসেছিলেন কোনও দরকার ছিল? দরকার থাকলে বলবেন?’
‘না, তেমন কিছু না।’
‘তবু—কার দরকারে এসেছিলেন?’
অমল কালী চুপ করে থাকেন। সামনে থেকে আলি সাহেব বলে, ‘নিশ্চয় কাউকে ওষুধ দিছেন। কাকে দিছেন—সায়েব রে বলেন না। সায়েব কিছু বলবা নে।’
আমি বললাম, ‘কী ওষুধ কবিরাজি?’
হাত কচলালেন অমল কালী। ‘না, স্যার!’
‘তাহলে?’
‘দৈব স্যার।’
আলি সাহেব বললেন, ‘ও তো সায়েব জিন নামায়—ওর জিন ওষুধ দেয়।’
‘জিন—ভূত! প্রেত! ইন্টারেস্টিং। তা কীসের ওষুধ দিলেন।’
চুপ করে আছে অমল কালী। ‘আজ্ঞে স্যার, রতু ভঞ্জর ছেলে, বড় ছেলে স্যার, শুলেই বিছানা ভেজায়।’
হ্যা হ্যা করে হেসে উঠলেন আলি সাহেব, ‘তুমি তো বাঁজা মেয়ের জন্য অষুধ দিতে, এখন এসব কাজও করছ। এত নিচে নামচ কেন? তোমার জাত গেল কালীদা।’
অমল কালী বিব্রত মুখে বলল, ‘বড় ছেলে, খালি ভয় পায়, ভয় পেয়ে জলত্যাগ করে। ভয় কাটলে সামলে যাবে।’
এরমধ্যে আলি সাহেব গাড়ি থামাল, সামনে বিশাল এক বাড়ি। দু তিনজন মহিলা বাড়ির সামনে ধান মেলে দিচ্ছে। গাড়ির দরজা খুলে নেমে পড়লেন অমল কালী। ‘আসুন স্যার, আসুন, এই আমার বাড়ি।’
‘না, না, আজ সময় হবে না। অন্য একদিন আসব।’
‘আজ আসবেন না স্যার? খুব মুশকিলে পড়ে যাব, বাড়িতে মেয়ে আছে, এমনিতেই বিয়ে দিতে পারছি না, তারওপর আপনি যদি বাড়ির দরজা থেকে ফিরে যান, তাহলে আমার মেয়ের কী হবে স্যার, সারা জীবন কুমারীই থেকে যাবে?’
কী বিপদ! আমি চুপ করে আছি।
‘বসতে হবে না স্যার, চৌকাঠ পেরিয়েই চলে যাবেন।’
‘ঠিক আছে, চলুন।’
বাড়িতে ঢুকতে ঢুকতে অমলবাবু হাঁক পাড়েন, তাঁর এক ডাকেই সামনে দেখলাম দুজন মহিলা। মা আর মেয়ে। অমল কালী বললেন, ‘আমার পরিবার আর কন্যে।’
আমি হাত তুলে নমস্কার জানালাম। চৌকাঠ পেরিয়েছি, স্ত্রী মেয়ের সঙ্গে দেখা হয়েছে, এবার আমার ফিরে আসার কথা। কিন্তু আমার পা যেন আটকে গেল, এরকম বাদাবনে এমন সুন্দরী। তবু কোনও ক্রমে বললাম, ‘আজ আসি অমলবাবু, অন্যদিন আসব। আজ অনেক দূর যেতে হবে।’
‘আবার আসবেন স্যার।’
‘আসব, অমাবস্যা কিংবা পূর্ণিমা দেখে আসব।’ আমি হাসি।
‘তাহলে তাই আসবেন স্যার। আমি অমাবস্যা পুর্ণিমার আগে আগে আপনাকে খবর করব। মাঝে মাঝে স্যার আমার কাউকে কাউকে দরকার পড়ে। ঈশ্বরও ঠিক জুটিয়ে দেন।’
গাড়ি চলতে শুরু করেছে। একটু এগিয়েই আলি সাহেব বলল, ‘আপনার কি কোনও রোগ ব্যাধি আছে স্যার, নইলে যাবেন না স্যার। সারা রাতের হ্যাপা, পুজো ধ্যান করবা, উঠে আসতে পারবেন না।’
‘রোগ ব্যাধি হলে ওষুধ দেন? আপনি কখনও নিয়েছেন?’
আলি সাহেব চুপ করে থাকেন।
‘আপনি কখন নিয়েছেন?’
‘বেটিছেলের জন্য নিয়েছিলাম স্যার, পেট থাকছিল না। নষ্ট হচ্ছিল।’
‘তারপর?’
‘সবাই বলল, আমি একদিন গে ধরলাম ওরে। বললাম বিটির কথা। ও বলল পূর্ণিমার রাতে আমার বাড়ি দে যাও। আমি বললাম, বিটিছানা। ও বলল, ওর পরিবার আছে, ভয় কী? পুজো হবে, আসবা নে কেন?’
‘গিয়েছিল?’
আলি সাহেব একগাল হাসে, ‘ছ্যালা হইছে।’
‘বাহ্, ওষুধে তাহলে কাজ করেছে। তা কত টাকা দিতে হয়েছিল?’
একটু ঘাড় ঘুরিয়ে জিব কাটে আলি সাহেব। ‘না, না, স্যার এক পয়সা লেয় না। ফ্রি।’
‘ফ্রি! বিনা পয়সায় ওষুধ দেন। আধি ব্যাধিতে স্যার এসডিও অফিসের সবাই হাত পাতে। যে ওষুধ নিচ্ছে সে তো বলে না স্যার। কারও কারও মেলে স্যার, আমার তো মিলেছে। শুনেছি, দুলালবাবুর বেটার বউ, তিন চারটে অমাবস্যা পূর্ণিমায় গিয়ে ওর দোর ধরেছে, কিন্তুক অষুধ লাগেনি। তবে আধি ব্যাধি না থাকলে যাবেন না স্যার।’
আলি সাহেবের কথা শুনিনি আমি। এক অমাবস্যার আগে আগে হঠাৎই আমার ঘরের দরজায় অমল কালী। বললেন, ‘পরশু অমাবস্যা স্যার। শনিবারের অমাবস্যা। হঠাৎ পাওয়া যায় না, বিরল। আসুন স্যার সন্ধেবেলা।’
অফিস অ্যাসিস্টেন্ট সুধন্যা আমার দিকে তাকিয়ে। আমি হাত তুলে অমল কালীকে থামিয়ে দিলাম। অমলবাবু কী বুঝলেন কে জানে, সরে গেলেন।
আমি সেই সন্ধেবেলায় হাজির হলাম অমল কালীর বাড়ি। উনি আমাকে দেখে অবাক হলেন না, উনি যেন নিশ্চিত ছিলেন আমি আসব। আমাকে দেখেই বললেন, ‘আসুন স্যার। আজ আপনাকে খুব দরকার ছিল।’
ওঁর পরনে রক্তবসন, গায়ের উড়নিও লাল। কপালে সিঁদুর। এসডিও অফিসে যেমন দেখি, তার সঙ্গে এই মানুষটির বিস্তর ফারাক।
‘কী দরকার?’
‘বলব স্যার, বলব, এমন কিছু না। আসুন স্যার, ঘরে চলুন, আমার পরিবারও আপনার কথা বলছিল।’
আমি হেসে বললাম, ‘আপনার স্ত্রীও জানে আমি আসব।’
‘আমি বলেছিলাম স্যার, আপনি আসবেন।’
‘আপনি বলেছিলেন অমাবস্যায় ছাদে বসবেন। পূর্ণিমায় উঠোনে ঘোরাবেন। আজ তো অমাবস্যা—। তাহলে ঘরে কেন, ছাদে চলুন।’
অমল কালী হাসলেন, ‘ছাদে যাব স্যার, তার আগে একটু পুজো আচ্চা করব। আজ শনিবার, সূর্যগ্রহণ। বড় বিরল যোগ স্যার।’
ঠাকুরঘরে গিয়ে দেখলাম ছোট একটা কালী মূর্তি। কিন্তু পুজোর আয়োজনে কোনও ত্রুটি নেই।
অমল কালী বললেন, ‘আপনি আজ্ঞা করুন স্যার, পুজোয় বসি।’
‘আপনি পুজো করবেন?’
‘আমরা আসলে স্যার ভট্টাচার্য্যি। নিজের পুজো নিজেই করি। কই গো তোমরা এসো।’
অমলবাবু ডাকে ওঁর স্ত্রী এল, সঙ্গে একটি অল্পবয়সী বউ। অমলবাবু স্ত্রীকে দেখে আমি চোখ সরাতে পারছি না। সারা গায়ে স্বর্ণালঙ্কার। সিঁথিতে উজ্জ্বল সিঁদুর। মাথার ঘোমটা আধভাঙা হয়ে খোঁপার সঙ্গে ঘাড়ের কাছে আটকে। সারা মুখে নরম আলো লেগে। গভীর চোখে কী প্রচণ্ড মাদকতা। পুরু ঠোঁটে ঘন কামনার ফণা। সে আমাকে চোখ ইশারা করে একটা আসন দেখাল। আমি বসলাম। মেয়েটিকে বলল, ওখানে বসো। মেয়েটি এসে আমার ঠিক বাঁ পাশে বসল।
অমল কালী বসলেন পুজোর আসনে। ‘আয়োজন সম্পূর্ণ। তাহলে শুরু করা যাক—।’
পুজো চলছে, রাত গভীর হচ্ছে। আমি দু বার হাতের ঘড়ি দেখলাম। দেখলাম, আমি সময় দেখছি, সেটা অমলবাবুর স্ত্রীও দেখেছে। আজ আমি যখন বেরিয়েছি আমার কোয়ার্টারে কেউ নেই। আমার সর্বক্ষণের কাজের লোক যতীন বাড়ি গেছে। একাই ছিলাম। তাই কাউকে কিছু বলতে হবে না। তবু, কতক্ষণ এই পুজোপাঠ!
হঠাৎ দেখলাম, অমলবাবুর স্ত্রী ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। ওর হাতে একটা ঘট। যাওয়ার সময় চোখ ইশারায় আমাকে পরিষ্কার বাইরে আসতে বলল। আমিও যেন মন্ত্রমুগ্ধের মতো ওর পিছন পিছন ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। আমি ওর পিছন পিছন পুজোর ঘর ফেলে বাইরে এলাম। আমাকে বলল, ‘ঘড়ি দেখছিলেন কেন? বাড়ি যাওয়ার তাড়া আছে?’
‘না, তা নেই।’
‘তাহলে? এখানে বাড়িতে তো কেউ থাকে না। একা থাকেন।’
‘হ্যাঁ, একাই থাকি।’
‘স্ত্রী?’
‘কলকাতায়?’
‘ছেলে মেয়ে কটি?’
‘সন্তান নেই। বিয়ে হয়েছে বছর দুই।’
‘দু বছর! তা বাচ্চা হয়নি, না বাচ্চা নেননি।’
‘বাচ্চার কথা ভাবিনি। পরিকল্পনায় নেই।’
‘ও আপনারা তো সরকারিবাবু—সব পরিকল্পনা করে করেন। তা এটা কি পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা!’
‘জানি না।’ আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলি। আমার দীর্ঘশ্বাস যেন ওর চোখে ধরা পড়ে গেল।
‘তা এখন বউ ফেলে চলে এলেন যে বড়?’
‘না, তা ঠিক নয়, ও চাকরি করে। কী করে আসবে?’
‘তাহলে তো কোনওদিন আপনার সংসার করা হবে না যে—। যান, পরিকল্পনা করে বাচ্চা পুরে দিয়ে আসবেন পেটে!’
আমি হাসলাম। বলতে পারলাম না, কলকাতায় থেকেও আমি ঠিক সংসার করতে পারিনি। আমার স্ত্রীর আমি পছন্দের পাত্র নই। বিয়ের বেশ কিছুদিন পরেই বুঝেছিলাম। বাবা মায়ের কথায় বিয়ে করেছে। ওর বাবাও ভেবেছিলেন, আমার সাতকুলে কেউ যখন নেই, তখন আমি ওদের বাড়ি গিয়েই থাকব। আমার স্ত্রীর আমাকে পছন্দের একটা শর্ত ছিল— সংসার করতে গেলে ওর বাবা মায়ের বাড়িতে গিয়ে থাকতে হবে। ও আসবে না। কোথাও যাবেও না। কিন্তু সেটা কোনওকিছু বিয়ের আগে বলেনি। ওই যে আমার সাতকুলে কেউ নেই। অর্থাৎ আমার কোনও আপত্তি থাকার কথা নয়, আমি কোথায় থাকব।
‘কী হল কী ভাবছেন? স্ত্রীর কথা?’
‘না, না, ও ওর মতো থাকে। ভালোই থাকে।’
‘আপনি ভালো আছেন তো?’
কথাটা হঠাৎই যেন মোচড় মেরে জিজ্ঞেস করল অমলবাবুর স্ত্রী।
‘হ্যাঁ, ঠিকই তো আছি।’
‘ঠিক আছেন? মনে তো হচ্ছে না। তবে খবরদার, ভালো নেই বলে কোয়ার্টারে অল্প বয়েসি মেয়ে রাখবেন না। আপনার চোখদুটো খুব অশান্ত। শরীরও অশান্ত!’
ঠিক এমন কথা আমি ইহজম্মে শুনিনি। ‘দেখুন, আমার কোয়ার্টারে সর্বক্ষণের জন্য যিনি থাকেন তিনি আমার থেকে বড়, যতীনদা।’
‘উফ হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। আপনার আগের অফিসার যিনি ছিলেন, তিনি তো এক কম্ম ঘটিয়েছিলেন, কাজের মেয়েটির পেট করে। শেষে ওনাকে ধরে— ওষুধ দাও গর্ভ নষ্ট করার। উনি বললেন, আমি গর্ভ নষ্ট করার ওষুধ জানি না। দৈব কৃপায় গর্ভ হওয়ার ওষুধ দিতে পারি। আপনি মেয়েটিকে নিয়ে শহরে যান, অনেক ঘুচকানি ডাক্তার পাবেন, তারা পারবে। তারপর বরং আমি আপনাকে শান্ত করার ওষুধ দিতে পারি।’
‘তারপর?’
‘কোন দিকে তারপর? মেয়েটির দিকে? না, অফিসারের দিকে?’
‘আমি দুদিকের কথাই জানতে চাই।’
আমার কথায় অমল কালীর স্ত্রী ঠোঁট মোচড়াল, ‘দুদিকের কথা আবার কী? ওই অফিসার মেয়েটিকে শহরে পাঠাল। নিজে যায়নি, এক ঠিকেদারই কাজটা করে দিয়েছিল। সেখান থেকে সাফসুফ করে নিয়ে এল। তারপর আমার উনি বললেন, আপনি মেয়েটিকে কিছু টাকা দিন। ওর জীবন তো চালাতে হবে? কিছু জমি জায়গা কিনে ও হালে পানি পাক। নইলে ভেসে যাবে। অফিসারবাবু শুনে ওনার ওপর রেগে গেলেন, বললেন, তুমি কি আমাকে ব্ল্যাকমেল করছ? উনি বললেন, না, হাতজোড় করে ভিক্ষে চাইছি। আপনি যতখানি দেবেন, আমিও ততখানি দেব। অফিসার মেয়েটিকে দুই বিঘে জমির টাকা দিল, উনি সেই টাকা নিয়ে মেয়েটিকে চার বিঘে জমি রেজিস্ট্রি করে দিলেন। আমি আপত্তি করিনি।’
‘আশ্চর্য, অমলবাবু কেন দিলেন? ওনার তো কোনও দায় নেই।’
‘কে বলল দায় নেই? উনি তো পাপীর সঙ্গে হাত মেলালেন। পাপের সহযোগী হলেন। মেয়েটির গর্ভনাশের পাপ যাবে কোথায়? উনি খণ্ডন করলেন জমি দান করে। ওই অফিসার তো তাঁর গোপন কথাটি একমাত্র ওনাকেই বলেছিলেন। উনিই পরামর্শ দেন শহরে যেতে—। নইলে পারতেন, থানা পুলিশ করতে, গ্রামের লোকজন নিয়ে গিয়ে ঝামেলা পাকাতে। বিচার চাইতে। কিন্তু উনি তা করেননি। উনি জেনে বুঝে পাপ চাপা দিতে চাইলেন।’
আমি হাসি, ‘দেখুন, শুধু উনি কেন ওই ঠিকেদারও জেনেছিলেন—।’
‘হ্যাঁ, জেনেছিলেন। আর জেনেই তিনি পাঁক-পুকুরে ডুবলেন। মেয়েটিকে যেদিন শহরে নিয়ে গেল, সেদিনই সেই ঠিকেদার মেয়েটিকে শহরের হোটেলে সারারাত ধরে ভোগ করেছিল, তারপর সকালে তাকে নার্সিংহোমে নিয়ে গিয়েছিল।’
‘খুব খারাপ লোক। তা ঠিকাদারের কী শাস্তি হল, সে তো ডবল পাপী। ওই ঠিকাদারের নামটা বলবেন। ওর শাস্তি আমি দেব।’
‘তার শাস্তি ওপরঅলা দিয়েছেন— সে গাছ চাপ পড়ে মরেছে। রাস্তার ধারে গাছকাটার কন্ট্রাক্ট নিয়েছিল। সেই গাছের নীচেই চাপা পড়ল। সবাই বলে, আমার স্বামী নাকি কারসাজি করেছেন। এদিকের গাছ ওদিকে নিয়ে গিয়ে ফেলেছেন।’
‘মানে?’
‘মানে আর কী, উনি দুদিন আগে সেই ঠিকাদারকে এসডিও অফিসের সামনে হুমকি দিয়ে বলেছিলেন— তুই ঠিক কাজ করিসনি। ওই পাপ তোর মাথায় পড়বে। পাপের চাপে তুই পিষে মরবি। সবাই বলে—সেদিনই নাকি ওর মৃত্যুবাণ আমি স্বামী ছুঁড়েছিলেন। তবে ভালো হয়েছে ওটা নিকেশ হয়েছে। নইলে, আমার স্বামীকে আমি জানি, ওকে ঠিক লোভ দেখিয়ে ভুলিয়ে ভালিয়ে এ বাড়িতে ডেকে এনে, ওর শ্নিন্নে দড়ি বেঁধে পাথর ঝুলিয়ে দিতেন। ওই ঠিকেদারের সারাজীবন আর শ্নিন্নের আস্ফালন থাকত না।’
আমি চমকে উঠি, ‘আরে সেটাও তো পাপ!’
‘পাপীকে শাস্তি দিলে পাপ লাগে না।’
আমি চাপা গলায় জানতে চাই, ‘ঠিকেদার আসত? কী লোভ দেখিয়ে ওকে ডেকে আনতেন?’
‘আমাকে দেখত? আমার লোভে লোভে ঠিক আসত। চলুন কথায় কথায় দেরি হয়ে যাচ্ছে।’ আমি অবাক হয়ে ওর দিকে তাকালাম— ওর লোভে! কথাটার মানে কী?
অমল কালীর স্ত্রী হাঁটছে, তার ঠিক পিছনে আমি। পোষা পুরুষের মতো হেঁটে যাচ্ছি। আমি পিছন থেকে বললাম, ‘একটা কথা— আমি আপনার নাম জানি না।’
‘গঙ্গা। মা গঙ্গা নয়— শুধু গঙ্গা!’ হঠাৎ হাঁটা থামিয়ে সে একটু পিছন ঘুরে তাকাল। ‘ডুব দেবেন? খুব স্রোত কিন্তু টেনে নিয়ে কোথায় তুলবে টের পাবেন না।’
সে কথা বলতে বলতে চলেছে। ঘরের ভেতর ঘর, পর পর দুটো ঘর ফেলে বাইরে এলাম। সামনে বন্ধ একটা দরজা। দরজা খুলতে সামনে একটু ঘাসজমি তারপরেই পুকুর। ‘আপনি দাঁড়ান এখানে। ঘটে জল নিলে আমাকে আর ছোঁবেন না, কথাও বলবেন না।’
গঙ্গা ঘাট দিয়ে তরতর করে নেমে গেল পুকুরে। বাইরের অন্ধকার এখনও জমাট বাঁধেনি। আমি অবাক চোখে দেখলাম, অমন গুছিয়ে শাড়ি পরা, সোনার গয়নায় সাজা— ওই অবস্থায় জলে নেমে যাচ্ছে! আশ্চর্য! পুকুরের জলে নেমে পরপর ডুব দিল—
আমি একটু এগিয়ে ঘাটে গিয়ে দাঁড়ালাম। তার মাথায় ঘট, সে ঘট নিয়েই ডুব দিচ্ছে। তারপর ঘট ভরে জল নিয়ে উঠে এল। যেমনভাবে এসেছিল তেমনভাবে হেঁটে চলল। আমি একজন অনুসরণকারী মাত্র। তার সিক্তবসনা শরীরের সঙ্গে চেপে বসছে। মাটির মেঝে ভিজে গেল, তারপর লাল সিমেন্টের মেঝেতে তার পায়ের দাগ। আমি আগে ওকে ছুঁইনি, এখনও ছোঁয়ার প্রশ্ন নেই। কথা বলাও নিষেধ। আমি ভেজা শরীরের শব্দ শুনছি, তার শরীরে প্রতি খাঁজে খাঁজে ঘুরছি।
আবার পুজোর ঘরে এলাম আমরা। এবার জল-ভরা সেই ঘট স্থাপিত হল ঘরের এক কোণে। আগেই সেখানে মাটির বেদী করা ছিল।
আসনে বসা বউটিকে দেখলাম জড়োসড়ো হয়ে। অমল কালী বউটিকে বললেন, যাও ওই ঘটের কাছে গিয়ে মাটিতে দু হাত পেতে বসো। বউটি এগিয়ে গেল।
গঙ্গা ঘরের বাইরে বেরিয়ে এল। আমিও চলে এলাম ঘরের বাইরে। এবার গঙ্গা আমাকে ডাকেনি। কিন্তু আমাকে যেন টেনে নিয়ে এল। ঘরের বাইরে এসে বলল, ‘এবার আমাকে ছুঁতেও পারেন, কথাও বলতে পারেন। আর মানা নেই। ঘট প্রতিষ্ঠা হয়ে গেছে।’
‘আপনার ভিজে শাড়িটা ছাড়ুন।’
‘হ্যাঁ। শাড়িটা এবার ছাড়তে হবে।’ গঙ্গা বারান্দা পেরিয়ে এগিয়ে যায়, আমিও তার সঙ্গে চলি। সে একটা ঘরে ঢোকে, আমিও তার সঙ্গে ঘরে ঢুকি। গঙ্গা অদ্ভুত চোখে আমার দিকে তাকায়—‘এ কী আপনি কি আমার শাড়ি ছাড়া দেখবেন?’
তাই তো! আমার কোনও হুঁশ নেই। আমার সম্বিত ফেরে। আমি দ্রুত পিছন ফিরে চলে আসতে যাই। গঙ্গা আমার হাত ধরে। ‘কেন এসেছেন? আপনার ঘোর লেগেছে? কেন চলে যাচ্ছেন? আপনার কি ঘোর কেটে গেছে?’
আমি মাথা নিচু করে দাঁড়াই, বিড়বিড় করি, ‘সরি! বড্ড ভুল হয়ে গেছে।’
‘যাবেন না, দাঁড়ান।’ গঙ্গা এগিয়ে এসে দরজা ভেজিয়ে দেয়। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে কানের দুল খোলে, একটা একটা করে হাতের চুড়, বালা খোলে। হাতে কটা চুড়ি শুধু থাকে, সোনার হাতে চকচকে করে। গয়না খুলে একটু থমকে আমার মুখোমুখি দাঁড়ায়, তারপর ভিজে চুপচুপে শাড়িটা টেনে টেনে খোলে, বলে, ‘দেখি কেমন করে অত সহজে ঘোর কাটল—এখনও তো পুজোই শেষ হল না।’
গঙ্গা শাড়ি আর ব্লাউজ পরে আমার সামনে দাঁড়িয়ে। আমি মন্ত্র পড়ার মতো বিড়বিড় করলাম, ‘বাড়িতে আর কেউ নেই? আপনার মেয়ে?’
‘পুজোর দিনে মেয়ে থাকে না।’
‘অন্য কেউ যদি এসে পড়ে—কী ভাববে?
‘আর কেউ নেই। আপনার কোনও সম্মানহানি হবে না। এ বাড়িতে আমরা না নিয়ে এলে এসব দিনে কেউ ঢোকে না— আজ যে ভূত প্রেত যক্ষ যক্ষিণীরা এবাড়িতে নামবে।’
কথা বলতে বলতে গঙ্গা আমার দিকে পিছন ফিরে ব্লাউজ খুলল। সামনে এগিয়ে গিয়ে খাটের বাজু থেকে ব্লাউজ নিয়ে, পিছনে ফিরে বদল করল। মাথা গলিয়ে সায়া পরে, ভিজে সায়া পায়ের নীচে ফেলে দিল। সায়ার দড়ি বাঁধল। তারপর আমার দিকে সামনে করল। তখনও তার ব্লাউজের বোতাম লাগানো হয়নি। পরপর সব বোতাম লাগাল। আলনা থেকে শাড়ি নিয়ে পরল।
বলল, ‘আজ আর রাতে বাড়ি ফিরবেন না।’
আমি বুজে আসা গলায় বললাম, ‘না, যাব না।’
গঙ্গা বলল, ‘চলুন।’
আমি সেই ঘর ছেড়ে নড়তে চাইছি না, মেঝেতে ভেজা শাড়ি ব্লাউজ সায়া পড়ে। আমার শরীর গঙ্গার দিকে ছুটে যেতে চাইছে। কতদিন নারী শরীর দেখিনি। কতদিন নারী শরীর ছুঁইনি।
গঙ্গা আমার দিক স্থির চোখে তাকাল, বলল, ‘চলুন।’
আমি থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে বললাম, ‘কোথায় যাব— পুজোর ঘরে?’
‘না, ওই ঘরে এখন যাওয়া নিষেধ। ওই ঘরে এখন গর্ভপুজো হচ্ছে। কারো যাওয়া নিষেধ। এখন আমরা ছাদে যাব। আপনি অমাবস্যা দেখবেন না?’
গঙ্গা আমার হাত ধরে ছাদে নিয়ে এল। দোতলা বাড়ির ছাদ। কিন্তু বেশ উঁচু। চারদিকে ঝিম ধরানো অন্ধকার। আকাশ জুড়ে নেশা লাগানো ঘোর। ছাদে উঠে গঙ্গা বলল, ‘ছটফট করবেন না। চুপটি করে দাঁড়ান। আপনাকে শান্ত করতে হবে। বড় অশান্ত হয়ে আছেন।’ সে আমার গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। বলল, ‘গায়ের জামাটা খুলুন। একটু বাতাস মাখুন।’ সে আমার জামার বোতাম খুলল—ফিসফিস করল, ‘মুক্ত হোন।’
আমি দুই হাত দিয়ে গঙ্গাকে জড়িয়ে ধরলাম।
গঙ্গা ফিসফিস করল, ‘আমাকে তখন বন্ধন করবেন, যখন আপনার সব বন্ধন মুক্ত হবে।’
আমি গায়ের শার্ট খুলে ফেললাম। প্যান্ট থেকে বেল্ট— ক্রমশ যাবতীয় বন্ধন থেকে মুক্ত হলাম। মুক্ত হয়ে সামনে গঙ্গার জন্য হাত বাড়িয়ে দেখি, গঙ্গার গায়েও কিছু নেই। ও সম্পূর্ণ মুক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে। আমি হাত বাড়িয়ে তার মুখ স্পর্শ করি। ওর চুল না-মোছা জলে পাকিয়ে আছে। তার ভেতর আঙুল দিয়ে শিহরিত হই। তার স্তনে শঙ্খের শীতলতা, আমার বুক ছুঁয়ে থাকে। আমি ঠোঁটে নিই—পান করি। চমকে ওঠে গঙ্গার শরীর, অস্ফুট শীৎকার জাগে। গঙ্গা আমাকে বিপুল বেগে জড়িয়ে ধরে। আমরা দুজন ছাদে শুয়ে পড়ি— ওপরে নীল আকাশ।
গঙ্গা ডাকে—‘আসুন।’ আমি আবেগে থরথর কাঁপি। আমি ওর শরীরে উঠি, গঙ্গা বলে— সম্পূর্ণ সমর্পণ করুন। আপনার নিজের কিছু নেই। আপনার আত্মাও আমার ভেতর আসুক।
আমি অত কিছু বুঝি না, দীর্ঘদিন পরে নারী শরীর! আমি স্পর্শে ঘ্রাণে পাগল হয়ে গিয়েছি। আমি দু’হাতে মাখি, সারা শরীরে মাখি, আমার সত্তা চেতনা সব ডুবে গেছে অতলে। আমার দাঁতে নখে গঙ্গাকে দংশন করি, চুষি। যেন ছিঁড়ে ফেলব ফালা ফালা করে ফেলব। গঙ্গা বলে— ‘আপনি আর আপনিতে নেই, আপনি এখন আমার ভেতর বিরাজ করছেন। আমার ভেতরে ফুল হয়ে ফুটছেন। আমার ভেতরে কাঁটা হয়ে বিধঁছেন। নিন, এবার আপনি এক হাতে আমার ডান কাঁধ স্পর্শ করুন, এক হাতে আমার স্তন মন্থন করুন, আর আমার সঙ্গে সঙ্গে বলুন— তোমার হৃদয় বাস করে স্বর্গে, তোমার হৃদয় বাস করে চন্দ্রে, আমি তোমাকে জানি, তুমি আমাকে জানো। আমি যেন শত শরৎ বেঁচে থাকি। বলুন, বলুন, বার বার বলুন, আমার সঙ্গে সঙ্গে বলুন, আমি যেন শত শরৎ বেঁচে থাকি…।’
আহ্! আমি বলি, আর দাপিয়ে চলি গঙ্গার শরীরে। আমি যেন শত শরৎ বেঁচে থাকি...।
গঙ্গা আকুলি বিকুলি করে, সারা শরীর পেতে দেয়। ‘আপনি বড্ড ভালো! নিন, আপনার মনের যত ভালোলাগা, যত ভালোবাসা, যত আবেগ, যত আকুতি সব আমার ভেতর ঢেলে দিন। এক ফোঁটা শরীরে নিজের রাখবেন না। আপনার সবটুকু নিয়ে আপনার সন্তান আসুক।’
আমি গঙ্গার শরীরে সবটুকু ঢেলে দিচ্ছি। আমার শরীর থর থর করে কাঁপছে, কাঁপতে কাঁপতে অতল গহ্বরে ফাঁপিয়ে পড়ছে। কী প্রবল ভূমিকম্প! সব কিছু ভেঙে পড়ছে চারদিক থেকে। আহ্! শরীর চিন্তা চেতনা জুড়ে শান্তি নামছে।
গঙ্গা বলে— আপনি শুয়ে থাকুন চুপ করে, রাতের আকাশ দেখুন। ভাবুন, এই আকাশ থেকে সন্তান নেমে আসছে— ভাবুন। একজন সুসন্তান মাতৃগর্ভে প্রবেশ করছে। আপনি তাকে আপনার শরীর দান করেছেন। আপনার হৃৎপিণ্ড, আপনার মস্তিষ্ক, আপনার শোণিত, মেদ, মজ্জায় সে সেজেছে। আপনার চিন্তা, চেতনা, আপনার শুভত্ব, আনন্দ নিয়ে সে বাঁচবে। এই পৃথিবীর মাটি জল হাওয়া গাছ পালা প্রকৃতি সে আপনার চোখে চিনবে। সে নারী হলে তার গর্ভে সন্তান আসবে, সে পুরুষ হলে বীর্যবান হবে। তাকে আত্মীয় স্বজন দিন, বন্ধু দিন। দেবদেবী দিন, ধর্মপথে থাকবে। তাকে ঘিরে নক্ষত্রমণ্ডলী। তাকে মানুষ করুন। মানুষ! মানুষ!
আমি অবচেতনে চলে গেছি। ঘোর! ঘোর!
গঙ্গা ফিসফিস করে আমার কপালে চুমু খায়। বলে— আপনি নির্বাচিত হয়েছেন। ঈশ্বর আপনাকে নির্বাচন করে পাঠিয়েছেন। আমার কলস ভরে গেছে আপনার বীর্যে! আজ অমাবস্যা। আজ এই অন্ধকারে আপনি প্রস্তুত হলেন। আমি আপনাকে প্রস্তুত করলাম। আগামী পূর্ণিমায় আপনি ওই পুকুরঘাটের পাশের উঠোনে আপনি গর্ভপুজো করবেন। নারীকে বুকে জড়িয়ে চাঁদের আলো মাখবেন। সে এক অনন্ত চাঁদের আলো—। বিশ্বাস রাখুন আপনি সফল হবেন। আপনি ভালোমানুষ।
আমি হু হু করে কেঁদে ফেলি। গঙ্গা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। আমার গালে বুকে হাত বোলায়। আমি কেঁদে ওঠা চোখে জিব বুলিয়ে দেয়। আমার ফুঁপিয়ে ওঠা ঠোঁটে স্তন গুঁজে দেয়। আমাকে শান্ত করে।— শান্ত হোন। শান্তি! শান্তি! নিন এবার আমরা নীচে যাব। ওনার পুজো শেষ হয়েছে।
আমরা আবার সমস্ত বন্ধনে জড়িয়ে নিজেদের প্রস্তুত করি।
গঙ্গার পিছনে পিছনে নীচে পুজোর ঘরে যাই। ঘরের ভেতর মেয়েটি ঘটের সামনে দু হাত মাটিতে পেতে বসে বসে আছে। পুজোর আসনে অমল কালী। গঙ্গা আমাকে মেয়েটির পাশে বসতে বলে। আমি বসি—।
অমল কালীর ধ্যান ভাঙে। হয়তো আমাদের পায়ের শব্দ শুনেছেন। শান্ত গলায় বলেন— ‘উনি প্রস্তুত হয়েছেন? তাহলে আগামী পূর্ণিমার দিন উনি বীজ রোপণ করবেন।’
গঙ্গা গাঢ় গলায় বলে, ‘আপনি সম্মতি জানান— ওই মেয়েটির ডান কাঁধে আপনার একটা হাত রাখুন।’
আমি পাশে বসা মেয়েটির ডান কাঁধ স্পর্শ করি।
‘ওর বাম স্তন স্পর্শ করুন।’
আমি মেয়েটির বাম স্তন স্পর্শ করি।
‘উনি লেখাপড়া করা বুদ্ধিমান মানুষ, উনি মেয়েমানুষের কষ্ট বুঝবেন। একটা সন্তান চাই—।’ অমল কালী তাঁর দু’হাত জড়ো করে আমাকে সামনের মাটিতে প্রণাম করেন। আমি নিথর বসে থাকি।
গঙ্গা ওঠে, ‘আসুন আমার সঙ্গে, রাত অনেক হলো। এই মেয়ে তুমিও আমার সঙ্গে এসো।’ মেয়েটাও উঠে এল।
একটা ঘরের সামনে এসে বলল, ‘নিন আপনি, শুয়ে পড়ুন, সারা রাত জাগলে শরীর খারাপ হবে। দরজাটা খোলা রাখবেন—ও আপনার সঙ্গে আজ রাতটাও থাকবে। বেচারা সারাদিন উপবাস করে আছে, একটু প্রসাদ নিয়ে আসছে। ও পড়লেই ঘুমিয়ে পড়বে। পারলে ওর সেবা করবেন, মাথায় হাত বোলাবেন, দু পা টিপে দেবেন। বড্ড ভালো মেয়ে, আগামী পূর্ণিমায় ওকে একটা সন্তান দিন। আপনার ভালো হবে।’
আমি আকুতি ভরা গলায় বললাম, ‘গঙ্গা তুমি আমার ঘরে এসো।’
‘ওর নাম গঙ্গা। আমি গঙ্গা নই। আমার নাম ছায়া।’ শেষের কথাগুলো বলার সময় ওর গলা কেঁপে উঠল, ভারী হয়ে কান্না চাপল। ‘আজ অমাবস্যায় আমি আপনাকে প্রস্তুত করে দিলাম, আপনি এবার আলোর জোয়ার ভরা পূর্ণিমা আনবেন, সোনার কলস ভরবেন!’
**********
লেখক পরিচিতি : কথাসাহিত্যিক জয়ন্ত দে-র জন্ম ২৯ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৪, কলকাতায়। তিনি ঔপন্যাসিক ও ছোটগল্পকার। সপ্তাহিক বর্তমান পত্রিকার সম্পাদক এবং দৈনিক বর্তমান পত্রিকায় কাজ করেন। সোমেনচন্দ স্মৃতি পুরস্কার, গল্পমালা পুরস্কার, নমিতা চট্টোপাধ্যায় সাহিত্য পুরস্কারসহ ভূষিত হয়েছেন নানা পুরস্কার ও সম্মাননায়।


5 মন্তব্যসমূহ
গা শিউড়ে উঠল পড়ে। এ কী লিখেছ জয়ন্ত!!
উত্তরমুছুনঅসাধারণ গদ্যের চলন। ভীষণ বোল্ড ডার্ক স্টোরি। শেষটা দুর্দান্ত।
উত্তরমুছুনগা ছমছমে লেখা। দারুণ
মুছুনঅসাধারণ ব্যতিক্রমী একটা গল্প!
উত্তরমুছুনঅসাধারণ একটি চলন। দারুণ লিখেছেন।
উত্তরমুছুন