অনলাইন বোর্ডিং পাস সংগ্রহ করে স্নানে চলে যায় গহন। আহেলীও ওদিকে আপেল,আমন্ড, ইয়োগার্ট দিয়ে স্মুদি বানাচ্ছে তাড়াহুড়ো করে। আজ খুব ঝলমলে রোদ উঠেছে এখানে। বৃষ্টির ছিটেফোঁটা নেই। ব্যালকোনির রাবার প্ল্যান্টের পাতায় রোদ এসে যেন গাড় চুম্বন করে যাচ্ছে এমন, যে পাতাগুলোও খিলখিলিয়ে মেলে ধরেছে নিজেদের শামিয়ানা। এখানকার ফ্ল্যাটটা খুব সুন্দর এ্যাস্থেটিকভাবে সাজিয়েছে আহেলী আর গহন। ওই কোণার গোল্ড-টোনড ক্লাব ল্যাম্প থেকে শুরু করে, বার ক্যাবিনেট, রেক্লিনিয়ার সোফা, এথনিক মোটিফে ঊডেন এবং ব্রাশের ইনট্রিকেট ওয়াল ডেকর, ঝারোখা ওয়াল পেন্টিং—কি নেই সেখানে, যেন একটুকরো ভিনটেজ বাংলো। সকালের ব্রেকফাস্ট সেরেই বেরিয়ে যাবে ওরা। তাই আজ মেইডকে আসতে বারণ করে দিয়েছে আহেলী। দুপুর বারোটা কুড়ির ফ্লাইট। এর মধ্যে চারটে ট্রলি হয়ে গেছে। এছাড়াও কলকাতা থেকে ফেরার সময় প্রতিবার একটা একস্ট্রা ব্যাগ হয়ে যায় ওদের। ওই ফেরার সময় মা-বাবারা ভর্তি করে খাবার-দাবার নাড়ু চাউমিন চানাচুর কি না থাকে সেই লিস্টে, মা খুঁটিনাটি যা পায় সব ভরে দেয়, যেন এই আরবদের দেশে এসব কিছুই পাওয়া যায় না। আহেলী বকবক করতে থাকে, গহন বলে ‘আহা ছেড়ে দাও না, বয়স হয়েছে ওদের, দিয়ে যদি মন শান্তি পায়, দিক।’
দুবাই ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট। যেমন ব্যস্ততম তেমন ঝাঁ-চকচকে। সবাই ছুটছে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে। কেউ কাছের মানুষের কাছে ফিরছে, আবার কেউ দূরদূরান্তে ছুটে যাচ্ছে জীবিকার তাড়নায়। আহেলী গহনকে আবদার করে রেখেছে এবার ইন্ডিয়ায় গিয়ে ছোটবেলার মতো পুরী ঘোরাতে নিয়ে যেতে হবে। ভালবেসে বিয়ে বলে কথা, বৌয়ের আবদার তো রাখতেই হয়। তবু আহেলীকে বাবু-সোনা করে মাথায় হাত বুলিয়ে বুঝিয়ে রেখেছে পুরী ঘুরতে গেলে মা-বাবাদেরও সঙ্গে নিয়ে যাবে, ও যেন আপত্তি না করে।
—কটা দিনের তো ব্যাপার, এর মধ্যে আর মার সাথে ঝগড়াঝাঁটি কোরো না।
—ও আমিই শুধু করি, তোমার মা করেন না? মনে নেই আগের বার রেস্টুরেন্টে খেতে গিয়ে কিরকম দুর্ব্যবহার করেছিলেন...
—ছাড় না এখন এসব কথা। এতদিন পর যাচ্ছ, এসব ভুলে খোলামনে চলো, দেখবে অসুবিধা হবে না।
ততক্ষণে ফ্লাইটের বোর্ডিং সংক্রান্ত ঘোষণা করে দিয়েছে। আহেলীর এবার উইন্ডো সিট। টেক অফের আগে থেকেই ফোনের ভিডিও মোড অন করে রেখেছে সে, প্লেনটা ওড়া শুরু করলেই রিল বানিয়ে স্টেটাসে দেবে। গহন বিরক্ত বোধ করে—আজকাল এই রিল স্টেটাস স্টোরি পোস্টের যুগে মানুষের ব্যক্তিগত মুহূর্ত থেকে শুরু করে সামাজিক, নৈর্ব্যক্তিক সমস্ত রকম মুহূর্তই তার সজ্ঞানে কিংবা অজ্ঞানে এক অজানা নেশায় বাইরের পৃথিবীর সামনে তুলে ধরছে মানুষ। কিন্তু গহন এখনও বোধহয় নিজেকে অতটা আপডেট করতে চায় না, চিরকালই একটু ইন্ট্রোভার্ট, এসবে অস্বাচ্ছন্দ সে। ফ্রাইডে নাইটগুলো সে অধিকাংশই অফিস থেকে বাড়িতে ফেরে, আহেলীর সাথে বসে নেটফ্লিক্সে ওয়েব সিরিজ দেখে, কিংবা নাইটি'স এর কুমার সানুর গলায় সেই বিখ্যাত গান গুলো চালিয়ে ব্যালকোনিতে বসে দুজনে ওয়াইন খায়, গল্প করে কিন্তু বন্ধু বা কলিগদের সাথে পাবে যাওয়া বা পার্টি করা, ওসব একদম পছন্দ নয় তার। এখানে এত ভাল চাকরী, আহেলীকে নিয়ে সুখের সংসারে জীবনটাকে অনেকটা গুছিয়ে নিয়েছে গহন। এখন সে আহেলীর কাছে সন্তান চায়।
কিন্তু আহেলী তাকে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, বছর পাঁচেক এখন সে ঘুরে ফিরে জীবনটাকে উপভোগ করতে চায়, সন্তানের রেসপনসিবিলিটি নেওয়ার কোনো ইচ্ছে তার এখন নেই। ওই রাত জেগে বসে ঘুম পাড়াও, ন্যাপি পাল্টাও, ব্রেস্টমিল্ক খাওয়াও তারপর একটু বড় হলে স্কুলে নিয়ে যাও... ও বাবা অসম্ভব এখন। গহন আর কথা বাড়ায় না এ ব্যাপারে। সে আহেলীর ওপরই ছেড়ে দিয়েছে , ও যখন চাইবে তখনই হবে।
আজকে বেরোনোর তাড়ায় সকালে আর কফি খাওয়া হয়নি, তাই প্লেন ছাড়ার খানিক পর দুটো ব্ল্যাক কফি অর্ডার দেয় গহন। মানুষ পৃথিবীর যত দূরদূরান্তেই থাকুক, জন্মস্থানের প্রতি তার একটা অতল টান থাকে, কফিতে চুমুক দিতে দিতে গহনের মনে হয়, ‘আমাদের কি আর কখনও কলকাতায় ফেরার হবে না আহেলী? যতদিন চাকরি করব, যতদিন মা বাবারা বেঁচে থাকবেন ততদিন এরকম যাতায়াত করেই চলবে?’
আহেলী উত্তর দেয়, ‘তবু তো এখন যাতায়াত হচ্ছে, মা-বাবা না থাকলে আমাদের এই প্রতি বছর একবার করে কলকাতায় যাওয়াটাও হয়ত বন্ধ হয়ে যাবে, মা-বাবা আর জন্মভিটে এই দুটো শব্দ কেমন যেন অচ্ছেদ্য বন্ধনে আবদ্ধ, এই বন্ধনের কাছে ফিরতে চাওয়া মানুষই একমাত্র জানে ফিরতে না পারার যন্ত্রণা কতটা তীব্র, প্রগাঢ়। সুন্দরী এক এয়ারহোস্টেস কোথা থেকে ঝুপ করে এসে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ঘোষণা করতে লাগলেন। বোঝা গেল এবার ল্যান্ডিং করবে উড়ন্ত পাখিটি। রানওয়েতে যখন দুরন্ত গতিতে সে মাটিকে স্পর্শ করে এগিয়ে যাচ্ছে, আহেলী গহনের হাতটা চেপে ধরে থাকে, যেন এই হাত কখনও ছেড়ে না যায়। তারপর প্লেনটার পেটের ভেতর থেকে সিঁড়ি নেমে যায় মাটিতে। সিঁড়ি দিয়ে নেমে এক বুক নিঃশ্বাস নেয় গহন। চেনা শিকড়ের গন্ধ, চেনা ভাষার কোলাহল। মনের ভেতর প্রজাপতিটা ডানা মেলে উড়তে থাকে। নির্দিষ্ট বেল্ট থেকে লাগেজ সংগ্রহ করে যখন ক্যাব বুক করতে যাবে, আহেলী আনন্দে লাফিয়ে ওঠে। দূরে দাঁড়িয়ে আছে ওর বাবা-মা, গহনের বাবা-মা, বোন। ওরা আগে থেকে জানায়নি সারপ্রাইজ দেবে বলে। ফলে বাড়ির সবাই যখন একসাথে, ম্যান্ডেটারি গ্রুফি তো বানতা ই হ্যায়। মোটামুটি দিন কুড়ি ছুটি ম্যানেজ করতে পেরেছে গহন। ফলে নিজের বাড়িতে সাত আট দিন, আহেলীর বাড়িতে সাত আট দিন আর মাঝে আহেলীর আবদারে তিন চার দিন পুরী ভ্রমণ, আত্মীয় স্বজনদের সাথে দেখা করা, শপিং করা, কালীঘাট, দক্ষিণেশ্বরে পুজো দেওয়া। মানে পুরো এবেলা, ওবেলা প্যাকড প্রোগ্রাম।
—আর দেরী কোরো না, আজই ব্যাঙ্কের ঝামেলাটা মিটিয়ে আসো।
—হ্যাঁ ঠিক বলেছ, সকাল সকালই তবে বেরিয়ে যাই। কাজটা মিটতে তো সময় লাগবে। বিকেলের মধ্যে চলে এসে সন্ধ্যাবেলা মেজপিসিদের বাড়ি ঘুরে আসব। তুমি রেডি হয়ে থেকো। আর ওদের বাড়ির বাচ্চা দুটোর জন্য যে গিফটগুলো এনেছি , ওগুলো ট্রলি থেকে বের করে রেখো।
—তুমি অত চিন্তা করোনা, আগে কাজটা মিটিয়ে আসো। আর হ্যাঁ, ছাতা নিয়ে যেও। আজ খুব রোদ উঠেছে।
সকালবেলা স্নান করে লুচি তরকারি খেয়ে বেরিয়ে যায় গহন। একটা ক্যাব নিয়ে নিলেই হত। কিন্তু আজ ওর লোকাল ট্রেনে চড়তে খুব ইচ্ছে করছে, সেই ছোটবেলার মতো। বাদাম ভাজা-ছোলা ভাজা, চুরি-ক্লিপ, শসা-কলার ঝুড়ি নিয়ে ফল বিক্রেতা, অন্ধ যুগলের মাইক চালিয়ে কিশোরের গান, তৃতীয় লিঙ্গের সেই মানুষগুলোর হাততালি দিয়ে পয়সা চাওয়া, পয়সা দিলে খুশি হয়ে আশীর্বাদ করা, কত কত জীবন্ত স্মৃতি। দুবাইয়ে এসব খুব মিস করে সে। প্ল্যাটফর্মে এসে কত শত চেনা মুখের সাথে দেখা, গল্প। সেই মুচিকাকু এখনও ওই জায়গাতেই বসেন, শুধু তার বয়স বেড়ে গেছে। আতরের দোকানের মুস্তাফা এখন চটি-জুতোর দোকান খুলেছে। সিডি ক্যাসেট বিক্রি করত সেলিম, সে নাকি এখন দর্জির কারখানায় কাজ করে, তিন ছেলেমেয়ের বাবা এখন সে, একসময় গহনরা সব একসাথে ফুটবল খেলত ছাতিমগড়ের মাঠে। গহন ভাবে কত তাড়াতাড়ি সব বড় হয়ে যায় বন্ধুরা, যে যার মত ছড়িয়ে যায় জীবনের নানা প্রান্তে। ভাবতে ভাবতে ট্রেন এসে পড়ে। বেশ ভীড় ট্রেনটা। যাদবপুরে নামতে হবে, ভীড় ঠেলে নামতে পারবে তো? এই ট্রেনে চড়ার অভ্যেস বহুদিন হল ছুটে গেছে।
ফলে এই ভীড়ের মধ্যে খানিক অসুস্থ বোধ করতে শুরু করে গহন। অসুস্থতার মাত্রা এত বাড়ে যে যাদবপুর অবধি না যেতে পেরে গড়িয়ায় নেমে পড়ে সে। ভাবে হয়ত একটু কোথাও বসলে, বিশ্রাম নিলে নিশ্চয়ই ঠিক হয়ে যাবে। প্ল্যাটফর্মে নেমে স্টেশন লাগোয়া শৌচাগারে যায় সে, চোখে মুখে জল দেয়। তবু স্বস্তি বোধ করে না সে। রোদের তেজও বেশ তীব্র। কি করবে, ডাউন ট্রেন ধরে কি বাড়ি ফিরে যাবে তবে আজ? তাকে অসুস্থ দেখে এক অচেনা ব্যাক্তি এসে বলেন, ‘আপনি কি অসুস্থ?’
গহন কাতরকণ্ঠে উত্তর দেয়, ‘হ্যাঁ দাদা, একটু জল পাওয়া যাবে?’
—হ্যাঁ, অবশ্যই আপনি একটু অপেক্ষা করুন।
খানিক বাদে লোকটি এসে গহনকে একটি জলের বোতল আর একটি ওষুধ দিয়ে বলে, ‘খেয়ে নিন, ঠিক হয়ে যাবে।’
গহন তখন এতটাই অসুস্থ বোধ করছিল যে কি ওষুধ, কি বৃত্তান্ত কিছু না জেনেই লোকটিকে বিশ্বাস করে ওষুধটি খেয়ে নিল। এবার শুরু হল নতুন খেলা। যেই না গহন ওষুধটা খেলো, কিছু সময় পর থেকেই ও অনুভব করতে শুরু করল ও আর নিজের আয়ত্তে নেই। কেমন একটা ঘোরের মধ্যে চলে যাচ্ছে ক্রমশ। গহন দেখল কোথা থেকে ষন্ডা মার্কা তিন-চার জন লোক আর ওই লোকটি যে ওকে ওষুধ আর জল এনে দিয়েছিল, সব মিলে ওকে কোথায় যেন নিয়ে যাচ্ছে, এমনটা নয় যে তাকে জোর করে চ্যাংদোলা করে নিয়ে যাচ্ছে, ও হেঁটে হেঁটেই যাচ্ছে, চারপাশে লোকগুলোও ওকে ঘিরে এগিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু প্রতিবাদ করার ক্ষমতা বা পালিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা তখন আর তার নেই। ওরা জানায় ওরা নাকি গহনকে তার অসুস্থতার জন্য হসপিটালে ভর্তি করতে নিয়ে যাচ্ছে। গহনের তখন ভেতরে এমন একটা তালগোল চলছে, কি বলছে কি শুনছে কি বুঝছে, যেন কোনো এক অজানা রাক্ষস শরীরের ভেতর বসে সবটা গিলে নিচ্ছে, তালগোল পাকাচ্ছে মাথার ভেতরটা, ড্রাউজি লাগছে, চোখ-মুখ জড়িয়ে আসছে কথা বলতে গেলে, ওকে কিছুতেই বলিষ্ঠ হতে দিচ্ছে না। ও বুঝতে পারছে কিছু একটা গন্ডগোল হতে চলেছে, অথচ নিজের বুদ্ধি কাজে লাগিয়ে যে কিছু করবে সেই ক্ষমতা তখন তার নেই।
হঠাৎই গহন দেখল ওরা কোথ্থেকে ট্যাক্সি ডেকে আনল। প্রায় জোর করে ধরে যেই ওকে ট্যাক্সিতে তুলেছে। কেস সুবিধার নয় বুঝতে পেরে ও তৎক্ষণাৎ বুদ্ধি করে ওর লাইভ লোকেশন খুব সন্তর্পণে আহেলী আর আর ওর বোনকে হোয়াটসঅ্যাপে পাঠাতে গেল। এদিকে ওই লোকগুলো কি আর ঘাসে মুখ দিয়ে চলে, ফলে গহনের এই কাণ্ড ওদের চোখে পড়ে যায়, ওরা খপাত করে গহনের হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নিয়ে চলন্ত গাড়ি থেকে ফোনটা ছুঁড়ে ফেলে দেয়। তারপর জোর করে ধরে নাকে মুখে রুমাল চাপা দিয়ে ওকে কি যে একটা করল, আর জ্ঞান ফিরল না ওর।
যখন জ্ঞান ফিরল, তখন গহন দেখছে তাকে একটা প্রায়ান্ধকার ঘরে শুইয়ে রাখা হয়েছে। হসপিটালের মত সিঙ্গেল বেড। তার পরনে স্যান্ডো গেঞ্জি আর হাফ প্যান্ট। অথচ তার কাছে ফোন ওয়ালেট কিচ্ছু নেই, যে টিশার্টটা পরে বেরিয়েছিল সেটা নেই, ফুলপ্যান্টটাও নেই। পাশে আরও তিন চার খানা পর পর বেডে তিন চার জন মানুষকে অজ্ঞান করে অর্ধনগ্ন অবস্থায় শুইয়ে রাখা হয়েছে। এ কেমন দৃশ্য! ভয়ে শিউরে ওঠে গহন। ততক্ষণে ওর ঘোর কেটে গেছে, ও বুঝতে পারছে ও মারাত্মক কোনো একটা চক্রে ফেঁসে গেছে। খুব বেশি লোকজন ঘোরাফেরা করছে না এখানে। যারা আছে, তাদের সন্দেহজনক চাহনি আতঙ্কের বাতাবড়ন সৃষ্টি করছে। কিন্তু এই জাল থেকে ও বেরোবে এখন কি করে?
ওদিকে বাড়ির লোক ওকে যোগাযোগ করতে না পেরে কান্নাকাটি হুলুস্থুল কাণ্ড বেঁধে গেছে। সারা পাড়ার লোক, আত্মীয় স্বজন সবাই জেনে গেছে যে গহনকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ফেসবুকে পরিচিত স্বজনরা পোস্ট দিতে শুরু করেছে, “গহন মজুমদার (বয়স-৩৪) ইজ মিসিং, উচ্চতা- পাঁচ ফুট আট ইঞ্চি, ফর্সা গায়ের রং, চোখে চশমা, আজ দুপুর থেকে ওকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় ওর পরনে ছিল মেরুন টিশার্ট আর কালো প্যান্ট। কেউ কোনোভাবে ওর খোঁজ পেলে শীঘ্রই যোগাযোগ করুন এই নম্বরে... ।”
ক্রমশ সেই পোস্ট সামাজিক মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে লাগল। পুলিসের কাছেও খবর চলে গেছে, মিসিং ডায়েরি করা হয়েছে। এদিকে গহন তখন মনে মনে ফন্দি আঁটছে কিভাবে এই ডেরা থেকে বেরোনো যায়। পরিচয় হল অসীম পোদ্দারের সাথে। সেও গহনের মতই একই ট্র্যাপে পড়ে আটকে গেছে, বলা ভাল জোর করে আটকে রাখা হয়েছে। তার থেকেই গহন জানতে পারে এটি একটি কিডনি পাচারচক্র, যারা এভাবে ড্রাগ জাতীয় ওষুধ খাইয়ে অসহায় মানুষদের বেহুঁশ করে ধরে আনে এবং অপারেশন করে তাদের শরীর থেকে কিডনি বার করে সেগুলো বাইরের দেশে পাচার করে যে ভয়ঙ্কর খেলার গুটি গহন, অসীমের মত নিরীহ মানুষরা।
ওরা বুঝতে পারছিল এখান থেকে বেরোনো অত সহজ না। ভাবতে ভাবতে রাত ক্রমশ গাঢ় হল। এক 'আরএমও' গোছের কেউ দারোয়ানকে চোখ ঘুরিয়ে ইশারা দিয়ে গেল সে যেন কড়া নজর রাখে, যাতে কেউ বেরোতে না পারে। কারণ কখন পাখি ফুরুৎ হয়ে যাবে, তাই রাতারাতি মিশন সাকসেসফুল করতে হবে, এসব রিস্কের কাজ বেশিদিন ফেলে রাখা যায় না। রাত বাড়ল। এই ফ্লোরটা শুনশান হতে শুরু করল। কিন্তু কিভাবে বেরোবে, লোকটা তো গেটের সামনেই বসে আছে জেগে। গহনের মাথায় হঠাৎ একটা আইডিয়া খেলে গেল। হাতের সামনে রাখা টর্চ দিয়ে প্রথমে তাকে পেছন থেকে মাথায় আঘাত করে গহন আর তারপর সে যখন পড়ে যায় তার মুখের ওপর প্রশ্রাব করে দেয় অসীম পোদ্দার। তারপর ছিটকিনি খুলে দৌঁড়ে বেরিয়ে যায় ওরা। যার যেদিকে চোখ যায়, পালায়, পালায়, পালায়। এক বুক অন্ধকারের ভেতর আঁধারের শ্রোত বয়ে যায় যেভাবে দিশাহীন...দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে ভোর হয়ে আসে। এক ঘন কুয়াশায় ঘেরা ভোর। ওর পরনে তখনও ওই হাফপ্যান্ট আর স্যান্ডো গেঞ্জি। ধীরে ধীরে ট্রেন, বাস চলা শুরু হয়। লোককে জিগ্যেস করতে করতে নাকি এলোমেলো ভাবে হাঁটতে হাঁটতে কিভাবে যে ও শিয়ালদহ স্টেশনে এসে পৌঁছায় নিজেও বুঝতে পারে না। প্ল্যাটফর্মে ওকে অসংলগ্ন অবস্থায় দেখে পুলিশের সন্দেহ হয়। ওকে জিজ্ঞাসাবাদ করে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে সিআরপিএফের পুলিশ। বাড়ির সবাই, বন্ধুবান্ধব ছুটে আসে। ওর এই করুণ দুরাবস্থা দেখে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন গহনের মা। আহেলী বরাবরই শক্ত মনের মানুষ। এই অবস্থায় ভেঙে না পড়ে, মাথা ঠাণ্ডা রেখে পুলিশের সাথে যাবতীয় তথ্য বিনিময় সেরে শিয়ালদহ স্টেশন থেকে গহনকে উদ্ধার করে নিয়ে যায় ওরা।
আজ দিন পনেরো হল গহনের সাথে ওই দুর্ঘটনাটি ঘটে গেছে। গহন ফিরে এসেছে। তবু বাড়িতে কোনো খুশির রেশ নেই। এখনও লোকজন প্রায়ই এসে গহনকে দেখে যাচ্ছে এমনভাবে যেন চিড়িয়াখানায় আটকানো জন্তু। কারণ আশ্চর্যজনকভাবে ও পুরোনো কোনো কথা মনে করতে পারছে না। ফ্যালফ্যাল করে শুধু কেমন চেয়ে থাকে, কিছু জিজ্ঞেস করলে অসংলগ্ন উত্তর দেয়। ওর এই অবস্থা দেখে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায় আহেলী। ডাক্তার জানান, ওই ট্রমাজনিত ঘটনায় আক্রান্ত হয়ে ওর মস্তিষ্কের অনেকখানি অংশ আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে স্মৃতিভ্রংশ হয়েছে, যাকে মেডিকেল ভাষায় 'ডিসোসিয়েটিভ অ্যামনেশিয়া' বলে।
মাথায় যেন বাজ ভেঙে পড়ে আহেলীর...কী করবে এখন তবে সে এই নিথর মানুষটাকে নিয়ে? দুবাইয়ে ফিরে গিয়েও তো কোনো লাভ নেই এই মুহূর্তে। কারণ গহন অফিসের বসকে চিনতে পারছে না, অফিস সংক্রান্ত কোনোরকম তথ্য সরবরাহ করতে পারছে না। ফেরার টিকিট ক্যানসেল করতে হলো। অনেকে সাজেস্ট করেছিল দুবাইয়ে নিয়ে গিয়ে আরও উন্নত মানের কোনো চিকিৎসা যদি করানো যায়। আহেলীকে বাইরে থেকে শক্ত দেখালেও ভেতর ভেতর বড্ড ভেঙে পড়েছে মেয়েটা। কারণ গহন আহেলীকেও চিনতে পারছে না। আপাতত অফিস থেকে মাস তিনেকের মেডিক্যাল লিভ অ্যাপ্রুভ করেছে। কিন্তু ডাক্তার কোনো আশ্বাস দিতে পারেনি আদৌ মাস তিনেকের মধ্যে তার স্মৃতি ফিরবে কিনা। ডাক্তার বলেছেন বছর পনের-কুড়ির পরবর্তী পর্যায়ের স্মৃতি বিলোপ পেয়েছে। একটা মানুষ সুস্থভাবে বাড়ি থেকে বেরোলো, আর ফিরল অচেনা মানুষ হয়ে, এমনটা তো হওয়ার কথা ছিল না। মানুষ ভাবে এক, আর হয় আর এক। জীবন নিয়ে যায় অজানা দিশায়—এই ধাক্কা মেনে নিতে পারেনা আহেলী। শূন্য সংসার নিয়ে বসে থাকে মুখোমুখি দুজন মানুষ। শুশ্রষা, নৈঃশব্দ্য, অপেক্ষা, ভয়—একে অপরকে বিনুনির মতো জড়িয়ে হেঁটে যায় এক কুয়াশা জড়ানো স্বপ্নের দিকে।
**********
লেখক পরিচিতি : মোহনা মজুমদারের জন্ম কলকাতায়। অঙ্কে স্নাতকোত্তর। প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ শব্দলেখা থেকে ‘যতোটা অপ্রকাশিত' (ই-সংস্করণ ২০২২ এ বইতরণী থেকে প্রকাশিত হয়েছে দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ 'বিহান আলোর লিপি' ও ২০২৩ আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলায় অক্ষর সংলাপ প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হয়েছে তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ 'উৎসারিত ও সলিলোকুই।’

0 মন্তব্যসমূহ