জেসিকা ট্রেডওয়ে'র গল্প : প্রথম প্রস্থান


অনুবাদ : তুতুন বিশ্বাস

সময়টা আমার অফিস ছেড়ে বাইরে থাকার জন্য একদম ভালো ছিল না, কিন্তু আমার ভাগনি চেয়েছিল, তাই অবশ্যই গেলাম। নিউ ইয়র্কে ট্রেনে যেতে চার ঘণ্টা লাগল। বেশ কয়েক বছর ধরে, যখন আমার ভাগনি ছোট ছিল, আমরা সবাই মিলে—শরতের কোনো এক শনিবারে আমরা সেখানে একসাথে দেখা করতাম । আমার বোন আর তার দুই ছেলেমেয়ে, আমার মা আর আমি—আলাদা আলাদা জায়গা থেকে ট্রেনে আসতাম। পেন স্টেশনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হুড়োহুড়ি করে দুপুরের খাবার খেতাম। তারপর হোটেলে উঠতাম। একটা শো দেখতাম, তারপর জনস পিৎজায় খেতাম। টাইমস স্কোয়ারে হাঁটতাম—আমরা বড়রা বাচ্চাদের দুই পাশে থাকতাম। যদিও এখন পেছন ফিরে ভাবি, কেউ সত্যিই বাচ্চাদের ক্ষতি করতে চাইলে আমরা কতটুকু রক্ষা করতে পারতাম—আমরা ছিলাম মাত্র তিনজন মহিলা, তেমন জোরদারি নই। তবু বাচ্চাদের জন্য আমাদের ভালোবাসা ছিল। সেটাই আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি

আমার বোন আর আমি দেখতে একরকম। আর আমার ভাগনি আমাদের দুজনের মতোই দেখতে। আমি জানতাম, রাস্তায় হাঁটার সময় আমি তান্যার হাত ধরলে যে কেউ সহজেই আমাকে তার মা ভেবে নিতে পারে। এটা আমার যতটা উপভোগ করা উচিত ছিল তার চেয়ে বেশিই করতাম। কিন্তু মনে হতো এতে কারো ক্ষতি নেই—আর কাউকে জানতে হবে না।

সেইসব শনিবার রাতে ঘুমানোর আগে আমরা একসাথে হোটেলের একটা ঘরে জড়ো হতাম, গল্প করতাম, বাচ্চারা দুষ্টুমি করত-- আমরা দেখতাম। এক বছর আমার বোন ছাদে সুইমিং পুল আছে এমন একটা হোটেল বুক করেছিল—কী মজাই না হয়েছিল সেবার! রাতের আকাশের নিচে আমার ভাগনি আর ভাগনে হাসতে হাসতে জলে ছপছপ করছে—দেখে মন ভরে গিয়েছিল। আরেক বছর আমার চল্লিশতম জন্মদিন উপলক্ষে পুরো ট্রিপটা সাজানো হয়েছিল। ম্যাগনোলিয়া বেকারির রেড ভেলভেট কেকের ওপর মোমবাতি জ্বালিয়ে ওরা আমাকে গান গেয়ে শুভেচ্ছা জানাল। মনে হলো ওরা সবাই বিশেষ চেষ্টা করেছে আমাকে ভালো সময় দিতে—ওরা জানত, চল্লিশ বছর বয়সে নিজের সন্তান না থাকলে কেমন লাগে। কেউ মুখে বলেনি, কিন্তু ওরা ঠিকই বুঝেছিল। সেই উৎসব মুহূর্তের জন্য একটু সাহায্য করেছিল, যদিও পরদিন বোস্টনে ফেরার ট্রেনে একা বসে আরও বেশি বিষণ্ন লেগেছিল।

তখন আমি সফল নারীদের সন্তান না থাকা নিয়ে বইপত্র পড়তে ভালোবাসতাম। যেমন জেনিফার অ্যানিস্টন বলেছিলেন, সন্তান গর্ভে না আসলেই যে মা হওয়া হয় না-- তা নয়। আমার বোনের বাচ্চাদের সাথে সময় কাটালে নিজেকে বলতাম, আমি মা-ই হচ্ছি। ওরা আমার গর্ভ থেকে আসেনি—এটা কি কোনো বড় ব্যাপার?

সেই সপ্তাহান্তের রবিবার সকালে আমরা একসাথে ব্রাঞ্চ খেতাম, তারপর সবাই পেন স্টেশনে ফিরে যেতাম—তিনটে আলাদা ট্র্যাকে তিনটে আলাদা ট্রেনে। সফর ছোট হতো, কখনো পুরো চব্বিশ ঘণ্টাও না। কিন্তু এগুলোই ছিল আমার মনে রাখা সবচেয়ে প্রাণবন্ত আর স্বস্তিদায়ক সময়—বাচ্চারা চারপাশের নতুন জিনিস দেখে মুগ্ধ হয়ে যেত, মুখের সমান বড় প্রেটজেল, সেন্ট্রাল পার্কে ঘোড়ার গাড়ি—আর ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইত সব কিছুতে। যেবার আমার ভাগনে হেনরির বয়স নয়, সেবার ফেরিওয়ালার কাছ থেকে একটা খেলনা ব্যাঙ কিনে দিলাম। হেনরি সঙ্গে সঙ্গে ব্যাঙটির নাম দিল হপি। সে ওটাকে মাথার ওপর বসিয়ে নিল, আর সারাদিন সেভাবেই ঘুরল। সেবার আমার মা যথেষ্ট সুস্থ ছিলেন। তিনি আমাদের সাথে অনেকটা পথ হাঁটলেন—হাঁটলেন পার্ক থেকে শুরু করে ফিফথ অ্যাভিনিউ ধরে রকফেলার সেন্টারের কাছে আমাদের চেনা হোটেল পর্যন্ত।

তান্যা এখন সেখানেই কাজ করে—রকফেলার সেন্টারে। একটা কমেডি স্কেচ শোতে লেখকদের সহকারী হিসেবে তার কাজ। কলেজ থেকে বের হয়েই স্বপ্নের কাজ পেয়েছে। এই কাজটাই সে চেয়েছিল, সেটা বলেছিল এগারো বছর বয়সে। তখন আমরা সবাই মিলে এনবিসির টিভি স্টুডিওতে গিয়েছিলাম। আমরা বাকিরা মুখে বলেছিলাম, হ্যাঁ হ্যাঁ, অবশ্যই পাবে এরকম কাজ—কিন্তু মনে মনে কেউই সত্যিই বিশ্বাস করিনি।

অথচ তাকে নিয়ে সন্দেহ করা উচিতই হয়নি আমাদের। একবার, ওর বয়স যখন মাত্র তিন, আমরা একটা মাইনর লিগ বেসবল খেলায় গিয়েছিলাম। আমাদের আসন ছিল স্টেডিয়ামের এক প্রান্তে। আর ওপাশে একটা ছোট কার্নিভাল বসেছিল। তান্যার চোখে পড়ল নাগর-দোলাকে। সে আঙুল তুলে দেখিয়ে বুঝিয়ে দিল যে ওদিকে যাচ্ছে। সে এগিয়ে গেল। আমি আর আমার বোন পুরোটা পথ পিছু পিছু গেলাম, ওর অজান্তেই ওকে নিরাপদ রাখলাম। একটু মজা লাগছিল, কিন্তু মনের ভেতর একটা অস্বস্তিও ছিল—বাচ্চাটা একবারও পেছন ফিরে তাকাল না।

তান্যা আমাকে শহরে আসতে বলেছিল। আর সাথে একটা দ্বিতীয় অনুরোধও করেছিল—ওর মাকে যেন না জানাই। বিষয়টা একটু জটিল ছিল, কারণ সে কারণটা বলল না। কিন্তু আমি নিজেকে বোঝালাম, হয়তো মাকে কোনোভাবে চমকে দিতে চাইছে। আমার বোনের জন্মদিন আরও ছয় মাস পরে, আর তেমন বড় জন্মদিনও নয়—কিন্তু এভাবেই নিজেকে রাজি করালাম। তান্যার অনুরোধ মানলাম, আর প্রতিদিন বোনকে যে টেক্সট করি তাতে এই আসার বিষয়টা উল্লেখ না করেই ট্রেনের টিকিট কাটলাম। তান্যা নিজেই আমাকে টেক্সটে বা ইমেলে বলতে পারত। কিন্তু তা সে বলল না কেনো—সেটা আমি বুঝতে পারলাম না। তবে কেন সে সামনাসামনি দেখা করতে চেয়েছিল-- খুব শীঘ্রই স্পষ্ট হয়ে যাবে ।

আমাকে তার ঘরে থাকতে দিতে না পারার জন্য আমার ভাগনি মাফ চাইল। আমি অবশ্যই বুঝলাম—এটা নিউ ইয়র্ক! কলেজের দুই বন্ধুর সাথে সে একটা দোতলা হাঁটা-বাড়িতে থাকে-- দুটো ঘর মিলে তাদের এপার্টমেন্ট। এদের একজন একটু কম ভাড়া দেয়, ঘুমায় ডাইনিং অ্যালকোভে। আমি নিজে তরুণ বয়সে এরকম ব্যবস্থায় ছিলাম—তবে সেটা বোস্টনে, নিউ ইয়র্কে নয়। এখন আর এভাবে থাকতে চাইতাম না, কিন্তু তখন বেশ মজাই ছিল। তা ছাড়া, এখন একটা ভালো হোটেল ঘর নেওয়ার সামর্থ্য আমার আছে। আগেভাগে হোটেলে চেক ইন করলাম। তারপর ৩০ রকের নিচতলার একটা রেস্তোরাঁয় তান্যার সাথে দেখা করলাম।

জানুয়ারি মাস। টেবিল থেকে বাইরে রিংকে স্কেটারদের দেখছিলাম। ছয় মাস হয়ে গেছে ওকে দেখিনি— মায়ের বড় জন্মদিনে সবাই মিলে দেখা করেছিলাম। তারপর আর দেখিনি। আমার ভাগনি তেমন বদলায়নি। দেখে খুশি হলাম। ওর মধ্যে যেটা আমার সবচেয়ে ভালো লাগে সেটা হলো ওর মিষ্টি স্বভাব। স্বীকার করতেই হবে, যখন প্রথম শুনেছিলাম সে এই শহরে চলে যাচ্ছে, তখন ভয় পেয়েছিলাম—শহরটা ওকে কঠিন করে দেবে না তো!

"দিদা কেমন আছেন?" সে জিজ্ঞেস করল। "ইশ, দিদা আর এদিকে আসতে পারলে ভালো হতো। তবু ওনার বয়সের অনেকের চেয়ে ভালোই আছেন বলে মনে হয়।"

আমি সায় দিলাম, আর নিজেকে সামলালাম—বলতে চাইছিলাম, দিদা কেমন আছেন সেটা দিদাকেই জিজ্ঞেস করতে পারো। কিন্তু শুরুতেই সম্পর্ক খারাপ করতে চাইনি।

তান্যা কেন আমাকে আসতে বলেছে—এ নিয়ে অনেক ভেবেছি। টাকার দরকার, বাবা-মাকে বলতে সংকোচ হচ্ছে? কিছু একটা ঘটেছে যা ওরা জানুক সেটা সে চায় না? গর্ভে সন্তান এসেছে, পরামর্শ চাইছে?

আমাকে ডেকেছে—সত্যি বলতে এটা আমাকে বিশেষ অনুভূতি দিয়েছে। ভাগনি বলেছে দরকার-- তাই সব ছেড়ে চলে এলাম।

"হেনরির ব্যাপারে," সে বলল, ওয়েটার টেবিল ছেড়ে যাওয়ার পর। মেনুতে সবচেয়ে কম দামি জিনিসটাই সে অর্ডার করেছিল—জানে আমি জোর করে বিল দেব, এবং দেবই। "ও বিপদে পড়েছে।"
"কী ধরনের বিপদ?"

উদ্বেগটা আসার আগে এক মুহূর্তের জন্য অবাক হলাম। ওর ভাই হেনরি কলেজের শেষ বর্ষে পড়ে। ছেলেটা সবসময়ই চুপচাপ থাকে—নিজের মতো চলে, কিন্তু কাউকে বিরক্ত করার আগ্রহ তার নেই। অন্তত আমার কাছে সবসময় এরকমই মনে হয়েছে। যদিও চুপচাপ স্বভাবের কারণে তাকে ঠিকমতো বোঝা কঠিন ছিল। কম্পিউটারে প্রচুর সময় কাটায়—এতটাই যে আমার বোন মাঝেমাঝে ওর চোখ নিয়ে চিন্তা করে। কিন্তু পারিবারিক সমাবেশগুলোতে সে উপস্থিত থাকে। নিজের ঘরে লুকিয়ে থাকে না বা সরে পড়ে না। আমার ভাগনি কী ধরনের বিপদের কথা বলছে, সেটা কল্পনাও করতে পারলাম না।

তান্যা বলল, হেনরি একটা হ্যাকিং চক্রে জড়িয়ে পড়েছে। সে বিভিন্ন সিস্টেমে ঢুকে পড়তে কতটা দক্ষ সেটা ওর কলেজে অনেক ছেলেমেয়ে জানে । আর অনেকেই চায় নিজেদের গ্রেড বাড়িয়ে নিতে—তাকে টাকা দিয়ে করিয়ে নিতে চায়।

আমি আস্তে আস্তে তান্যার কথাটা আবার বললাম: "জড়িয়ে পড়েছে।" এমনভাবে বলছ যেন সে কিছু করতে পারেনি। যেন কোনো উপায় ছিল না।" পানির গ্লাসের দিকে হাত বাড়াতে গিয়ে দেখলাম হাত কাঁপছে। তান্যাও দেখল। "আর এটাকে আমি 'বিপদে পড়া' বলব না—এটা অপরাধ করা।"

সে প্রায় অশ্রুতভাবে শ্বাস টেনে নিল। চেয়ারে হেলান দিল। "তুমি এত কঠিন হবে বলে ভাবিনি," সে বলল। "এটা তো হেনরির কথা।"

"জানি।" ওর চোখে অবিশ্বাসের দৃষ্টি দেখে মনটা ঠান্ডা হয়ে গেল। " তুমি কি মনে করো আমি কষ্ট পাচ্ছি না?"

তারপর পরিবারের মেয়েদের মধ্যে যে অদৃশ্য সংযোগ থাকে, সেই মানসচক্ষু দিয়ে আমরা দুজনেই একসাথে দেখতে পেলাম—সেই দিনটা, যেদিন ওর ভাই মাথার ওপর নতুন পছন্দের খেলনা ব্যালেন্স করে নিউ ইয়র্কের রাস্তায় ঘুরে বেড়িয়েছিল। আহ, হপি! গলায় হাত দিলাম।

সে একটু সামনে ঝুঁকল। দেখলাম ষোলতম জন্মদিনে আমার দেওয়া প্রজাপতির নেকলেসটা পরে আছে। প্রথমে মনে একটা ভালো লাগা এল। নেকলেসটা পরেছে আমাকে নরম করতে—এ ধরনের একটা ভাবনা মনের মধ্যে কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে উঁকি দি এই ভাবনাটা এড়াতে পারলেই বোধ হয় ভালো হতো।
"এটা আসলে অপরাধ না," সে বলল।

কোনোমতে নিজেকে সামলালাম। সে কতটা ভুলের মধ্যে আছে! সত্যি জেনেও চোখ বুজে থাকছে। শুধু যা বিশ্বাস করতে চায় তাই বিশ্বাস করছে।

"ইয়াইয়া," বললাম, তারপর অপেক্ষা করলাম যতক্ষণ না সে সরাসরি আমার দিকে তাকাল। "অন্যের ডেটাবেসে ঢুকে তথ্য বদলানো একটা অপরাধ, পুরোপুরি।"

"না, জানি," সে বলল, বিরক্তি লুকানোর চেষ্টা না করেই, "কিন্তু শুরুটা সেভাবে হয়নি।" তারপর বলল, ওর ভাইয়ের একটা মেয়েকে পছন্দ ছিল, মেয়েটাও পাল্টা আগ্রহ দেখাচ্ছিল বলে মনে হয়েছিল। "কিন্তু দেখা গেল সে ভালো ব্যবহার করেছিল শুধু সিভিক্সের গ্রেড বদলে নেওয়ার জন্য।" বুঝতে পারলাম ভাইয়ের হয়ে এই কথা শুনে তান্যার কতটা কষ্ট হয়েছে। আর মনে পড়ল, "ভালো ব্যবহার করেছিল"—এরকম পুরনো ধাঁচের কথা ওর মুখে শুনলে আমার কেমন আনন্দ লাগত।

"তারপর সে ছেড়ে দিল?" জিজ্ঞেস করলাম। " হেনরি আবার সিস্টেমে ঢুকে গ্রেডটা বদলে দেবে না—মেয়েটা এটা জানল কী করে?"
"কারণ," সে বলল, "সে হেনরিকে চিনত, তাই জানত ও এরকম করবে না।"
"এখন কোথায় দাঁড়িয়ে আছে বিষয়টা? কেউ ধরিয়ে দিয়েছে? তদন্ত হচ্ছে?"

তান্যা মাথা নাড়ল। "কলেজের শৃঙ্খলা বোর্ড। সে ভয় পাচ্ছে বহিষ্কার হয়ে যাবে। আর তারপর ডিন বললেন, পুলিশও জড়াতে পারে।"
"তোমার বাবা-মাকে বলেনি?"
"না। আর জানাতেও চায় না।"

ওয়েটার এসে আমাদের সামনে খাবার রাখল। দুজনের কেউই কাঁটাচামচে হাত দিলাম না। "তাহলে আমাকে বলছ কেন?" জিজ্ঞেস করলাম, যদিও উত্তর আগেই জানতাম।

আমি যে ওকে মুখ দিয়ে বলাতে বাধ্য করছি—সেই মুহূর্তে সে আমাকে কতটা ঘৃণা করছিল, সেটা দেখে আবার মনটা ঠান্ডা হয়ে গেল। "আমরা ভেবেছিলাম... তোমার চাকরির সুবাদে... তুমি হয়তো পারবে..." কিন্তু শেষ করতে পারল না। মুখ বুকের দিকে নামিয়ে কাঁদতে লাগল। "মাফ করো, কিম আন্টি, তোমাকে কখনো বলাই উচিত হয়নি। জানি এটা ঠিক না, হেনরিও জানে। কিন্তু ও অনুনয় করেছে আমার কাছে। ভেবেছে ও চাইলে তুমি করবে না, কিন্তু জানে তুমি আমার দ্বিতীয় মা। আমি বললে তুমি না করতে পারবে না।"

আহ, সেই জাদুর কথা: "দ্বিতীয় মা।" এটা একটা প্রশংসা বোঝানো হয়—সর্বোচ্চ প্রশংসার একটি। কিন্তু যাকে বলা হয়, সে মনে মনে বোঝে দ্বিতীয় মা প্রথম মার থেকে কতটা পিছিয়ে।

আমার বোন নিজের ছেলেমেয়েদের সম্পর্কে আমাকে প্রায়ই দ্বিতীয় মা বলত, বিশেষ করে তান্যার ক্ষেত্রে। জানতাম ভালোর জন্যই বলে, আমাকে ভালো অনুভব করাতে চায়। এখন ভাগনির মুখে কথাটা শুনলে মন ছুঁয়ে যাওয়া উচিৎ। "কিন্তু বুঝলাম, আমার কাছ থেকে সুবিধা আদায় করতেই সে কথাটা বলেছে।"

তাহলে সে একটু কঠিন হয়েছে, শেষমেশ। জানি, এই কাজটা—আমার কাছ থেকে সাহায্য আদায় করার এই চেষ্টা—তার কাছে সুখকর ছিল না। কিন্তু সে অগ্রাধিকার ঠিক রেখেছে, ভাই আগে। এক অর্থে এইজন্য তাকে শ্রদ্ধা করতে হয়। সে এখনও সেই মেয়ে, যে গন্তব্য ঠিক করে বেরিয়ে পড়ে, পথে কেউ আটকাক তা চায় না।

"মাফ করো, ইয়াইয়া," বললাম—আমার মনের ভেতরের একটা অংশ সত্যিই নরম হয়ে গিয়েছিল—মা হলে যা করত, সেই নরম অংশটা সেটাই করতে চাইছিল।—"কিন্তু আমি সত্যিই হস্তক্ষেপ করতে পারব না। শুধু যে চাই না তা নয়, চাইলেও আসলে কতটা সাহায্য করতে পারতাম সেটাও জানি না।”

"পারতে। ওরা তোমার কথা শুনত।" সে অনুনয় করছিল। দেখলাম চোখ শুকনো। আর তখনই ভেতরে একটা ধস নামল—বুঝলাম কান্নাটা নকল ছিল।

নিজেকে শক্ত করার পথ খুঁজতে হবে জেনে ভান করলাম যেন প্রিয় ভাগনির সাথে নয়, জীবনে কখনো দেখা হয়নি এমন একজন সম্ভাব্য মক্কেলের সাথে কথা বলছি। বললাম, এই ধরনের বিষয় আমার কাজের সাথে একদম মেলে না। আমি ভিন্ন রাজ্যে থাকি। ভিন্ন সংস্থায় কাজ করি। আমার ক্ষমতা নেই বললেই চলে। কলেজ যদি পুলিশকেও জানায় আর অভিযোগ করে তাহলে আমি কিছুই করতে পারব না।

কিন্তু শুধু কাজ না করার কারণে নয়, বা ধরা পড়ার ভয়ে নয়, সেটাও বললাম। এটা ভুল কাজ হবে। এই কথাটা বলতে হচ্ছে ভেবে নিজেরই কান্না পাচ্ছিল। আর সত্যি বলতে, কথাটা বলার আগেই মনে মনে ভেবে নিচ্ছিলাম এমন কাকে কাকে ফোন করা যায় যারা হেনরির জীবন একটু সহজ করতে পারে।

"এখন মনে না হলেও," বললাম, "আমি চেষ্টা করলেও হেনরির জন্য সেটা ভালো হতো না।"
"কেন না? সে শিক্ষা পেয়েছে। আর কখনো এরকম করবে না।"
"কিন্তু এবার করেছে। আর এটা মুহূর্তের ভুল ছিল না—এই ধরনের কাজ পরিকল্পনা করে করতে হয়। ভাবতে হয়। দীর্ঘমেয়াদে পরিণতির মুখোমুখি হওয়াই ওর জন্য ভালো। বিশ্বাস করো আমাকে।"

আমাকে বিশ্বাস করার কোনো ইচ্ছে তার ছিল না—সেটা মুখ দেখেই বোঝা গেল। "তুমি তাহলে চেষ্টাও করবে না?" চোখ দুটো কাচের ফলার মতো ধারালো।

"ওগো।" সেই মুহূর্তে বুঝলাম, আমার জীবনের সবচেয়ে দামি জিনিসটা শেষ হয়ে গেল। বিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই ভূমিকাটাই আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছিল। একাকী জীবনে এটাই ছিল আমার আশ্রয়। "আমি পারব না।"

আসার আগে আশা ছিল সে আমাকে তার অফিসে নিয়ে যাবে, ঘুরিয়ে দেখাবে—ফোনে ব্যবস্থা করার সময় এরকম কিছু একটা বলেছিল। কিন্তু বিল মিটিয়ে এসকেলেটরে লবিতে ওঠার পর স্পষ্ট হয়ে গেল, সে এখানেই বিদায় নিতে চাইছে। আমি তাকে জড়িয়ে ধরলাম, আবার ধরলাম—ছাড়তে চাইছিলাম না। সে সরে গেছে, এটা জানতাম। এমন এক জায়গায় চলে গেছে যেখানে আমি আর পৌঁছাতে পারব না।

হোটেলের ঘরটা সেই রাতের জন্য বুক করেছিলাম এই ভেবে যে তান্যা ওর বন্ধুদের নিয়ে আসবে, আর আমি ওদের এমন একটা ডিনার খাওয়াব যা ওরা নিজেদের পকেট থেকে কখনো দিতে পারত না। স্বীকার করতে হবে, মনে মনে একটা স্বপ্ন ছিল—ওর শান্ত আর উদার আন্টিকে নিয়ে সে কতটা গর্বিত হবে, রেস্তোরাঁ থেকে বের হওয়ার সময় সব মেয়েরা আমাকে জড়িয়ে ধরে ধন্যবাদ দেবে।

কিন্তু এখন ঘরটার আর দরকার নেই, তার ওপর শহর ছেড়ে চলে যেতে মন চাইছিল। হোটেলে ফোন করে বাতিল করলাম। জানতাম রিফান্ড আর পাবো না। তারপর ব্যাগ টেনে পেন স্টেশনে গেলাম। ফেরার টিকিট বদলালাম—তাতেও একটা ফি গুনতে হলো। কিন্তু সেটা দেওয়াই ভালো ছিল। চাইছিলাম--অ্যামট্র্যাক ট্রেন যত দ্রুত পারে আমাকে বাড়ি পৌঁছে দিক।

বাড়ি? না, ঠিক তা নয়। কিন্তু যেখানে আমি থাকি, সেখানে।

বোস্টনের দিকে ট্রেনে যেতে যেতে জলের দৃশ্য দেখা যায় এমন দিকে বসলাম। নিউ লন্ডনে একজন তরুণ মা উঠলেন, সাথে বছর দুয়েকের একটা মনমরা ছেলে। কোনো কারণ ছাড়াই সে কাঁদছে। শুধু কাঁদার জন্য কাঁদছে—বাচ্চাদের সাথে একটু সময় কাটালেই এই ব্যাপারগুলোর পার্থক্যটা বোঝা যায়। তার স্ট্রোলার ভাঁজ করতে সাহায্য করলাম, আর স্টেশন থেকে কিনেছিলাম এক প্যাকেট বিস্কুট। সেটা এখনো খোলা হয়নি। বিস্কুটের প্যাকেটটা ছেলেটাকে দিলাম। মা আমাকে এত ধন্যবাদ দিলেন যে লজ্জাই লাগছিল। বিস্কুট কিছুক্ষণ ওকে ব্যস্ত রাখল, কিন্তু প্যাকেট শেষ হতেই সেটা মেঝেতে ছুড়ে দিল। আবার কাঁদতে শুরু করল।

সিট বদলাতে পারলে ভালো লাগত। কিন্তু পারলাম না—ট্রেন ভরা ছিল। সিট বদলে অন্যত্র সরে গেলে মা বুঝে যেতেন। তাঁর খারাপ লাগত। খারাপ লাগুক এটা আমি চাইনি। একটা ফোল্ডার বের করে কাজ দেখার চেষ্টা করলাম, কিন্তু মাথায় এসব ঢুকছিল না। আংশিকভাবে ছেলেটার অসহনীয় ঘ্যানঘ্যানানির জন্য, কিন্তু বেশিরভাগটা এই কারণে যে ভাগনির সাথে যা হয়ে গেল তা নিয়ে মনটা কেমন অসুস্থ লাগছিল—সে জন্য।

একসময় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চোখ চলে গেল করিডোরের ওপারে। মা ভাবলেন আমি কথা বলতে চাইছি। সামনে ঝুঁকে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলেন, "পরে সহনীয় হয়ে যায়-- তাই না?"—গলায় হালকা ভাব আনার চেষ্টা ছিল, কিন্তু ভেতরের যন্ত্রণা লুকাতে পারছিলেন না।

তিনি আমাকে কী ভাবছেন সেটা মুহূর্তেই বুঝলাম। আর সেই পরিচিত, লজ্জার রোমাঞ্চটা অনুভব করলাম—অন্য কেউ আমাকে এমন কিছু ভাবছে যা আমি নই।

"অবাক হয়ে যাবেন," বললাম। "অবাক" শব্দের "ব" অক্ষরের গুনগুন আওয়াজটা ছেলেটার কানে লাগল। সে কান্না থামিয়ে আমার দিকে তাকাল। হাসল। আমিও হাসলাম। মা সঙ্গে সঙ্গে কাজে লেগে পড়লেন—পায়ের কাছের ডায়াপার ব্যাগ থেকে একের পর এক খেলনা বের করতে লাগলেন। এবার কাজ হলো। ছেলেটা হাতে ধরা পিনবল গেমে মেতে গেল, আর বাকি পথটা চুপচাপ রইল।

একটা গর্বের ঢেউ অনুভব করলাম—জানতাম এটা হাস্যকর। কিন্তু ট্রেনে ওঠার সময় যে হতাশা ছিল, সেটা একটু ভোঁতা হলো। তবে সত্যিটা এল আরও পরে। ওরা কয়েক স্টেশন আগে নেমে গেলেন, আমার স্টেশনে ট্রেন ঢুকছে।

প্ল্যাটফর্মে নামতে নামতে ব্যাগটা যতটা দরকার তার চেয়ে শক্ত করে ধরে বুঝলাম—আমি মাকে যতটা বোকা বানিয়েছিলাম, ছেলেটাকে মোটেই বানাতে পারিনি। বাচ্চাদের কি আমি এর চেয়ে ভালো বুঝি না? সে হেসেছিল আমি মুগ্ধ করেছি বলে নয়—হেসেছিল কারণ সে চিনতে পেরেছিল—তার সামনে বসেছিল একজন মিথ্যেবাদী। জেনিফার অ্যানিস্টন নিজেকে মা ভাবতে পারেন। কিন্তু এই বাচ্চা বোকা নয়। আমি যা বলেছিলাম, বলার অধিকার আমার ছিল না। বাচ্চাটা সেটা  বুঝেছিল।

**********

লেখক পরিচিতি : জেসিকা ট্রেডওয়ে আমেরিকান ছোটগল্পকার। জন্ম ১৯৬১, আলবানি, নিউ ইয়র্ক। বেড়ে ওঠেন নিউ ইয়র্কের অ্যালবানিতে। অ্যালবানিতে অবস্থিত নিউ ইয়র্ক স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতক এবং বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্জন করেন এমএ ডিগ্রি। ইউনাইটেড প্রেস ইন্টারন্যাশনালের একজন রিপোর্টার হিসেবে কাজ করেন। তিনি র‍্যাডক্লিফ কলেজের বান্টিং ইনস্টিটিউটে ফেলোশিপ অর্জন করেন এবং শিক্ষকতা করেন টাফ্টস বিশ্ববিদ্যালয়ে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ