ইওকো ওগাওয়া জাপানের অন্যতম প্রধান সাহিত্যিক। জন্ম: ১৯৬২, ওকায়ামা, জাপান। ১৯৮৮ সালে লেখালেখি শুরু করেন এবং প্রথম গল্প প্রকাশের পরই সাহিত্য মহলে নজর কাড়েন। ১৯৯১ সালে ‘অ্যানেস্থেশিয়া’ উপন্যাসের জন্য আকুতাগাওয়া পুরস্কার পান, যেটি জাপানের সাহিত্যের সর্বোচ্চ সম্মান।
তাঁর লেখার বিশেষত্ব হলো সাদামাটা, নিরুত্তাপ গদ্যের আড়ালে গভীর অস্তিত্বের সংকট। স্মৃতি, ক্ষয় আর হারিয়ে যাওয়া এবং মানুষের একাকিত্ব তাঁর লেখার কেন্দ্রীয় বিষয়। তিনি অতিবাস্তব আর বাস্তবের সীমারেখা ঘুচিয়ে এমন এক জগৎ তৈরি করেন যা একই সাথে পরিচিত আর অদ্ভুত।
‘দ্য মেমোরি পুলিশ’ (মূল জাপানি: 密やかな結晶, ১৯৯৪) তাঁর সবচেয়ে আলোচিত উপন্যাস। স্মৃতি, ক্ষমতা আর মানুষের পরিচয় নিয়ে এই বইটি বিশ্বের ত্রিশটিরও বেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। ২০১৯ সালে স্টিফেন স্নাইডারের ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশিত হলে আন্তর্জাতিক পাঠকমহলে নতুন করে আলোড়ন সৃষ্টি হয় এবং বইটি আন্তর্জাতিক বুকার পুরস্কারের দীর্ঘ তালিকায় স্থান পায়।
ওগাওয়ার অন্যান্য উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে আছে ‘দ্য হাউসকিপার অ্যান্ড দ্য প্রফেসর’—যেখানে স্মৃতিভ্রংশ এক অধ্যাপকের জীবনের গল্প বলা হয়েছে। এই বইটিও বিশ্বজুড়ে ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে। এখানে প্রকাশিত হলো ‘দ্য মেমোরি পুলিশ’ উপন্যাসটির ১ থেকে ৫ পর্বের অনুবাদ।
························
প্রথম পর্ব
আমি মাঝে মাঝে ভাবি—এই দ্বীপ থেকে যা যা হারিয়ে গেছে, তার মধ্যে সবচেয়ে আগে কোনটা গিয়েছিল?
"অনেক আগে, তোমার জন্মের আগে, এখানে আরও অনেক কিছু ছিল," মা আমাকে বলতেন যখন আমি ছোট ছিলাম। "স্বচ্ছ জিনিস, সুগন্ধি জিনিস... উড়ু উড়ু জিনিস, উজ্জ্বল জিনিস... অসাধারণ সব জিনিস, যেগুলোর কথা তুমি এখন কল্পনাও করতে পারবে না।
"দুঃখের বিষয়, এই দ্বীপের মানুষেরা সেসব অপূর্ব জিনিস মনে ধরে রাখতে পারেনি। কিন্তু এই দ্বীপে এটাই নিয়ম। একের পর এক জিনিস হারিয়ে যেতে থাকে। আর বেশি দিন নেই," মা যোগ করতেন। "তুমি নিজেই দেখতে পাবে। তোমার জীবন থেকেও একদিন কিছু একটা হারিয়ে যাবে।"
"ভয় লাগে না?" আমি হঠাৎ উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করতাম।
"না, ভয় নেই। ব্যথাও লাগে না, বিশেষ কষ্টও হয় না। একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠলেই দেখবে—হয়ে গেছে, বুঝে ওঠার আগেই। চুপ করে শুয়ে, চোখ বন্ধ করে, কান খাড়া করে, সকালের বাতাসের গতি অনুভব করার চেষ্টা করতে করতে তুমি টের পাবে কাল রাতের চেয়ে কিছু একটা বদলে গেছে। তখন বুঝবে—তুমি কিছু একটা হারিয়েছ, দ্বীপ থেকে কিছু একটা মুছে গেছে।"
যখন আমরা বেসমেন্টের তাঁর স্টুডিওতে থাকতাম তখন মা এইসব কথা শুধু তখনই বলতেন। ঘরটা বড়, ধুলোমাখা, মেঝে এবড়োখেবড়ো। উত্তর দিকের নদীর এত কাছে তৈরি যে স্রোতের শব্দ স্পষ্ট শোনা যেত। আমি আমার জন্য রাখা ছোট্ট মোড়াটায় বসে থাকতাম, আর মা ছিলেন একজন ভাস্কর। ছেনি শান দিতে দিতে বা পাথর ঘষতে ঘষতে মা শান্ত গলায় কথা বলতে থাকতেন।
"কিছু একটা হারিয়ে গেলে দ্বীপে শোরগোল পড়ে যায়। মানুষ রাস্তায় ছোট ছোট দলে জড়ো হয়ে হারানো জিনিসটার কথা মনে করে। একটু দুঃখ হয়, একটু আক্ষেপ হয়, আমরা একে অপরকে সান্ত্বনা দিই। যদি সেটা দেখা যাওয়ার মতো কোনো জিনিস হয়, তাহলে বাকিটুকু জড়ো করে পোড়াই, কিংবা মাটিতে পুঁতি, কিংবা নদীতে ভাসিয়ে দিই। কিন্তু কেউ খুব বেশি হইচই করে না। কয়েকদিনের মধ্যে সব স্বাভাবিক হয়ে যায়, যেন কিছুই হয়নি। আর কী হারিয়েছিল সেটাও কেউ মনে রাখতে পারে না।"
তারপর মা কাজ থামিয়ে আমাকে সিঁড়ির পেছনে নিয়ে যেতেন। সেখানে ছিল একটা পুরনো আলমারি—তার সারি সারি ছোট ছোট দেরাজ।
"যাও, যেটা খুশি খোলো।"
আমি মরচে পড়া ডিম্বাকৃতি হাতলগুলো দেখতে দেখতে একটু ভেবে নিতাম।
আমি সবসময় দ্বিধায় পড়তাম, কারণ ভেতরে কী ধরনের অদ্ভুত, মনোমুগ্ধকর জিনিস থাকে তা আমার জানা ছিল। এই গোপন জায়গায় মা লুকিয়ে রেখেছিলেন দ্বীপ থেকে অতীতে হারিয়ে যাওয়া অনেক কিছু।
অবশেষে আমি বেছে নিয়ে দেরাজ খুললে মা হাসতেন এবং হাতের মুঠোয় জিনিসটা রেখে দিতেন।
"এটা একধরনের কাপড়—'ফিতে’ বলে। আমার যখন সাত বছর বয়স তখন এটা হারিয়ে গিয়েছিল। চুল বাঁধতে বা স্কার্ট সাজাতে এটা ব্যবহার করা হতো।
"আর এটার নাম 'ঘণ্টা'। একটু নাড়া দাও—কী সুন্দর শব্দ হয়।
"ওহ, আজ ভালো দেরাজ বেছেছ। ওটাকে বলে 'পান্না', আমার কাছে যা আছে তার মধ্যে সবচেয়ে দামি। এটা আমার দাদির স্মৃতিচিহ্ন। পাথরগুলো সুন্দর, অত্যন্ত দামি—এক সময় এই দ্বীপে সবচেয়ে মূল্যবান রত্নপাথর ছিল এগুলো। কিন্তু এর সৌন্দর্যের কথা এখন সবাই ভুলে গেছে।
"এটা পাতলা আর ছোট, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ। কাউকে কিছু জানাতে চাইলে কাগজে লিখে এই 'ডাকটিকিট' লাগিয়ে দিতে হতো। তারপর যেকোনো জায়গায় পৌঁছে দিত। কিন্তু সে তো অনেক আগের কথা..."
রিবন, ঘণ্টা, পান্না, ডাকটিকিট। মায়ের মুখ থেকে বেরিয়ে আসা এই শব্দগুলো আমাকে শিহরিত করত—যেন এগুলো দূর দেশের ছোট্ট মেয়েদের নাম, কিংবা নতুন প্রজাতির গাছের নাম। মায়ের কথা শুনতে শুনতে মনে মনে খুশি হতাম—এই দ্বীপে একসময় এই সব জিনিসের জায়গা ছিল।
তবু কল্পনা করতে কঠিন লাগত। হাতের মুঠোয় রাখা জিনিসগুলো কুঁকড়ে থাকত একেবারে নিথর হয়ে—যেন শীতঘুমে থাকা ছোট্ট প্রাণী, কোনো সংকেত দিত না। প্রায়ই একটা অনিশ্চিত অনুভূতি জাগত, যেন কাদামাটি দিয়ে আকাশের মেঘের আকৃতি বানাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছি। গোপন ওই দেরাজের সামনে দাঁড়িয়ে মায়ের প্রতিটি কথায় মনোযোগ দিতাম।
আমার সবচেয়ে প্রিয় ছিল "পারফিউম"-এর গল্প—ছোট্ট কাচের বোতলে স্বচ্ছ একটা তরল। প্রথমবার মা যখন হাতে দিলেন, আমি ভেবেছিলাম এটা চিনির পানি, মুখে দিতে যাচ্ছিলাম।
"না না, খাওয়ার জিনিস না," মা হেসে বললেন। "এক ফোঁটা গলায় লাগাতে হয়, এভাবে।" তারপর সাবধানে বোতল থেকে একটু কানের পেছনে ঠেকালেন।
"কিন্তু এটা কেন করতে?" আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম।
"পারফিউম চোখে দেখা যায় না, কিন্তু এই ছোট্ট বোতলের মধ্যে অনেক শক্তি আছে," তিনি বললেন।
আমি বোতলটা তুলে ভালো করে দেখলাম।
"এটা গায়ে লাগালে অপূর্ব গন্ধ হয়। এটা কাউকে মুগ্ধ করার উপায়। ছোটবেলায় কোনো ছেলের সাথে বেড়াতে যাওয়ার আগে আমরা এটা লাগাতাম। সঠিক গন্ধ বেছে নেওয়া ছিল সঠিক পোশাক বেছে নেওয়ার মতোই গুরুত্বপূর্ণ—ছেলেটি যেন দুটোই পছন্দ করে। এটাই সেই পারফিউম যেটা তোমার বাবার সাথে প্রেমের সময় আমি লাগাতাম। শহরের দক্ষিণে পাহাড়ের ওপর একটা গোলাপ বাগানে আমরা দেখা করতাম। ফুলের গন্ধের সামনে যেন না হারিয়ে যায়—এমন একটা গন্ধ খুঁজে বের করতে আমাকে অনেক বেগ পেতে হয়েছিল। বাতাসে আমার চুল উড়লে আমি তাকে এমন একটা চাউনি দিতাম—যেন জিজ্ঞেস করছি, পারফিউমটা টের পাচ্ছ?"
এই ছোট্ট বোতলের গল্প বলার সময় মাকে সবচেয়ে প্রাণবন্ত দেখাত।
"সেই সময় সবাই পারফিউমের গন্ধ পেত। সবাই জানত এটা কতটা অপূর্ব। কিন্তু এখন আর না। কোথাও বিক্রি হয় না, কেউ চায় না। তোমার বাবার সাথে আমার বিয়ের বছর শরতে এটা হারিয়ে গিয়েছিল। আমরা সবাই পারফিউম নিয়ে নদীর ধারে জড়ো হলাম। তারপর বোতলের মুখ খুলে ভেতরের সব ঢেলে দিলাম—পারফিউম জলে মিশে গেল, যেন কোনো তুচ্ছ তরল। কিছু মেয়ে শেষবারের মতো বোতল নাকের কাছে তুলে ধরল—কিন্তু গন্ধ শোঁকার ক্ষমতা ততক্ষণে মিলিয়ে গেছে, সেই গন্ধের মানেও মনে নেই। দুই-তিনদিন নদীতে একটা কড়া গন্ধ ছিল, কিছু মাছ মারা গেল। কিন্তু কেউ খেয়ালই করল না। কারণ 'পারফিউম' বলে কিছু যে ছিল—সেটাই তাদের মাথা থেকে মুছে গিয়েছিল।"
কথা শেষ করতে করতে মায়ের মুখ বিষণ্ন হয়ে গেল। তারপর তিনি আমাকে কোলে তুলে নিলেন আর তাঁর গলায় লাগানো পারফিউম শুঁকতে দিলেন।
"কেমন?" তিনি বললেন।
কিন্তু আমি কী জবাব দেব বুঝতে পারলাম না। বুঝতে পারছিলাম কোনো একটা গন্ধ আছে—পাউরুটি সেঁকার গন্ধ বা সুইমিং পুলের ক্লোরিনের মতো, কিন্তু আলাদা—তবু যতই চেষ্টা করলাম, মাথায় আর কোনো ভাবনা এলো না।
মা অপেক্ষা করলেন। আমি কিছু না বলায় তিনি চুপি চুপি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
"কিছু যায় আসে না," তিনি বললেন। "তোমার কাছে এটা কয়েক ফোঁটা পানির বেশি কিছু না। কিন্তু কিছু করার নেই। এই দ্বীপে একবার হারিয়ে গেলে সেই জিনিস আর মনে করা প্রায় অসম্ভব।" এই বলে বোতলটা আবার দেরাজের মধ্যে রেখে দিলেন।
স্টুডিওর থামে লাগানো ঘড়িতে নটা বাজলে আমি ঘুমাতে উপরে চলে গেলাম। মা হাতুড়ি আর ছেনি নিয়ে কাজে ফিরে গেলেন। বড় জানালায় অর্ধচন্দ্র আলো ছড়াচ্ছিল।
শুভরাতের চুম্বন দেওয়ার সময় আমি অবশেষে সেই প্রশ্নটা করলাম যেটা অনেকক্ষণ ধরে মাথায় ঘুরছিল।
"মা, তুমি হারিয়ে যাওয়া সব জিনিস মনে রাখো কেন? সবাই যে 'পারফিউম' ভুলে গেছে, তুমি এখনো সেটার গন্ধ পাও কীভাবে?"
মা একটু জানালার দিকে তাকালেন, চাঁদের দিকে চেয়ে রইলেন, তারপর এপ্রন থেকে পাথরের গুঁড়ো ঝাড়লেন।
"আমি সবসময় ওগুলোর কথা ভাবি বলেই মনে হয়," তিনি বললেন, গলাটা একটু ভারী।
"তবু বুঝতে পারছি না," আমি বললাম। "তুমিই কেন একা কিছু হারাওনি? সব কিছু মনে আছে তোমার? সবসময়ের জন্য?"
মা নিচের দিকে তাকালেন, যেন কথাটা তাঁকে কষ্ট দিচ্ছে। তাই আমি আবার তাঁকে একটা চুমু দিলাম, একটু ভালো লাগুক তাঁর।
দ্বিতীয় অধ্যায়
মা মারা গেলেন। তারপর বাবাও মারা গেলেন। তারপর থেকে এই বাড়িতে আমি একা থাকি। ছোটবেলায় এক নার্স আমার দেখাশোনা করতেন। দুই বছর আগে তিনিও হার্ট অ্যাটাকে মারা গেলেন। উত্তরের পাহাড়ের ওপারে নদীর উৎসের কাছে একটা গ্রামে আমার কিছু চাচাতো-জ্যাঠাতো ভাইবোন আছে বলে মনে করি, কিন্তু কখনো দেখা হয়নি। পাহাড়ের গায়ে কাঁটাওয়ালা গাছের ঘন জঙ্গল, আর চূড়াগুলো সবসময় কুয়াশায় ঢাকা—তাই কেউ পার হওয়ার চেষ্টা করে না। আর দ্বীপের কোনো মানচিত্র নেই—মানচিত্র নিজেই অনেক আগে হারিয়ে গেছে—তাই দ্বীপের সঠিক আকৃতি বা পাহাড়ের ওপারে ঠিক কী আছে কেউ জানে না।
বাবা ছিলেন পাখিবিদ। দক্ষিণের পাহাড়ের মাথায় একটা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে কাজ করতেন। বছরের বেশ কয়েক মাস সেখানে থাকতেন—তথ্য সংগ্রহ করতেন, পাখির ছবি তুলতেন, ডিম ফোটানোর চেষ্টা করতেন। তাঁকে দেখতে যেতে আমার খুব ভালো লাগত, দুপুরের খাবার পৌঁছে দেওয়ার অজুহাতে যতবার পারতাম যেতাম। তরুণ গবেষকরা আমাকে আদর করতেন, বিস্কুট আর গরম চকোলেট খাওয়াতেন।
বাবার কোলে বসে দূরবীন দিয়ে পাখি দেখতাম। ঠোঁটের আকৃতি, চোখের চারপাশের পালকের রঙ, ডানা নাড়ানোর ভঙ্গি—কিছুই তাঁর নজর এড়াত না। ছোট মেয়ের হাতে দূরবীনটা অনেক ভারী ছিল, হাত ক্লান্ত হয়ে গেলে বাবা হাত দিয়ে সেটা ধরে রাখতেন। গাল ঠেকিয়ে পাশাপাশি বসে পাখি উড়তে দেখার সময় মনে হতো মাকে জিজ্ঞেস করি—স্টুডিওর পুরনো আলমারির দেরাজে কী আছে সেটা কি বাবা জানেন। কিন্তু বলতে যেতেই ছোট্ট জানালা দিয়ে চাঁদের দিকে তাকানো মায়ের মুখ মনে পড়ত, আর কথা বেরোত না। মা যেমন করে বাবাকে বলতেন--খাবার ঠান্ডা হওয়ার আগে যেন খেয়ে নেন, ঠিক তেমন করে শেষ শুধু বাবাকে খেয়ে নেওয়ার কথা বলতাম। ।
যাওয়ার সময় বাবা বাসস্টপ পর্যন্ত এগিয়ে দিতেন। রাস্তার যেখানে পাখিরা খেতে আসত, সেখানে থেমে গবেষকদের দেওয়া বিস্কুট ভেঙে ছড়িয়ে দিতাম।
"কখন বাড়ি আসবে?" জিজ্ঞেস করতাম।
"শনিবার সন্ধেবেলা মনে হয়," বাবা একটু অস্বস্তি নিয়ে বলতেন। "মাকে আমার ভালোবাসা দিও।" জোরে জোরে হাত নাড়তেন, এত জোরে যে বুকের পকেটে গোঁজা লাল পেনসিল—বা কম্পাস বা হাইলাইটার বা স্কেল বা চিমটি—পড়ে যাওয়ার উপক্রম হতো।
............
মনে হয় ভালোই হয়েছিল যে বাবার মৃত্যুর আগে পাখিরা হারিয়ে যায়নি। দ্বীপের বেশিরভাগ মানুষ কোনো কিছু হারিয়ে গেলে দ্রুত অন্য কাজ খুঁজে নেয়, কিন্তু বাবার পক্ষে সেটা সম্ভব হতো না। বুনো পাখি চেনাটাই ছিল তাঁর একমাত্র আসল গুণ।
টুপি হারিয়ে যাওয়ার পর রাস্তার ওপারের টুপিওয়ালা ছাতা বানাতে শুরু করল। আমার নার্সের স্বামী ফেরিতে মেকানিকের কাজ করতেন, পরে গুদামের পাহারাদার হয়ে গেলেন। স্কুলে আমার কয়েক বছরের সিনিয়র এক মেয়ে বিউটি সেলুনে কাজ করত, সে তাড়াতাড়ি ধাত্রীর কাজ নিয়ে নিল। কেউ একটা কথাও বলল না। নতুন কাজে মাইনে কম হলেও পুরনো কাজ নিয়ে কোনো আক্ষেপ নেই। অবশ্য অভিযোগ করলে মেমোরি পুলিশের নজরে পড়তে পারত।
মানুষ—আমিও এর বাইরে নই—প্রায় সবকিছুই ভুলে যেতে পারে। মনে হয় এই দ্বীপটা শুধু একটা সম্পূর্ণ শূন্য সমুদ্রেই ভেসে থাকতে পারে।
হঠাৎ একটা সকালে অন্য অনেক কিছুর মতোই পাখিরা হারিয়ে গিয়েছিল। চোখ খুলতেই বাতাসে একটা অদ্ভুত, প্রায় খসখসে ভাব টের পেলাম। সেটা যেন হারিয়ে যাওয়ার চিহ্ন। কম্বল গায়ে জড়িয়েই চারদিকে ভালো করে দেখলাম। ড্রেসিং টেবিলের প্রসাধনী, ডেস্কে ছড়ানো কাগজের ক্লিপ আর নোট, পর্দার লেস, রেকর্ডের তাক—যেকোনো কিছু হতে পারে। কী হারিয়েছে বুঝতে ধৈর্য আর মনোযোগ লাগে। উঠে সোয়েটার গায়ে দিয়ে বাগানে বেরোলাম। প্রতিবেশীরাও সবাই বাইরে, উদ্বিগ্ন মুখে চারদিকে তাকাচ্ছে। পাশের বাড়ির কুকুর আস্তে আস্তে গোঁ গোঁ করছে।
তখন আকাশের উঁচুতে একটা ছোট্ট বাদামি প্রাণীকে উড়তে দেখলাম। মোটাসোটা, বুকে সাদা পালকের গোছার মতো কিছু। ভাবছিলাম বাবার সাথে দেখা কোনো প্রাণী কিনা—এমন সময় বুঝলাম সেগুলো সম্পর্কে যা জানতাম সব মনের ভেতর থেকে মুছে গেছে। স্মৃতি গেছে, অনুভূতি গেছে, এমনকি "পাখি" শব্দের মানেটাও গেছে—সব।
"পাখি," রাস্তার ওপারের সাবেক টুপিওয়ালা বিড়বিড় করল। "যাক গে। কেউ মিস করবে না।" গলার স্কার্ফ ঠিক করে আস্তে হাঁচি দিল। তারপর আমাকে দেখতে পেল। হয়তো মনে পড়ল আমার বাবা পাখিবিদ ছিলেন—একটু অস্বস্তির হাসি দিয়ে কাজে চলে গেল। বাকিরাও কী হারিয়েছে বুঝতে পেরে স্বস্তি পেল। সকালের কাজে ফিরে গেল, আমাকে একা ছেড়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলাম।
ছোট্ট বাদামি প্রাণীটা চওড়া চক্কর দিয়ে উত্তরে মিলিয়ে গেল। প্রজাতির নাম মনে করতে পারলাম না, আর মনে হলো বাবার সাথে পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে থাকার সময় আরেকটু মনোযোগ দিয়ে দেখলে ভালো হতো। উড়ে যাওয়ার ভঙ্গি, কিচিরমিচির শব্দ, পালকের রঙ—আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করলাম, কিন্তু জানতাম লাভ নেই। এই পাখি, যেটা বাবার স্মৃতির সাথে জড়িয়ে থাকার কথা ছিল, সেটা এখন আমার মধ্যে কোনো অনুভূতিই জাগাতে পারছে না। শুধু একটা সাধারণ প্রাণী, ডানার ওপর-নিচ নাড়িয়ে শূন্যে এগিয়ে চলেছে।
বিকেলে বাজারে গেলাম। এখানে-ওখানে দেখলাম মানুষ খাঁচা হাতে দাঁড়িয়ে আছে—ভেতরে টিয়া, মুনিয়া, ক্যানারি ছটফট করছে, যেন বুঝতে পেরেছে কী হতে চলেছে। খাঁচা হাতের মানুষগুলো চুপচাপ, প্রায় বিমূঢ়—হয়তো এই নতুন হারানোর সাথে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে।
প্রতিটি মালিক যেন নিজের মতো করে পাখির সাথে বিদায় নিচ্ছিল। কেউ নাম ধরে ডাকছিল, কেউ গালে ঠেকিয়ে আদর করছিল, কেউ মুখ থেকে ঠোঁটে খাবার দিচ্ছিল। কিন্তু এই ছোট্ট বিদায়-পর্ব শেষ হলে তারা খাঁচা খুলে আকাশের দিকে তুলে ধরল। ছোট্ট প্রাণীগুলো প্রথমে বিভ্রান্ত হয়ে মালিকদের চারপাশে একটু ঘুরল, ছোট্ট প্রাণীগুলো প্রথমে বিভ্রান্ত হয়ে মালিকদের চারপাশে একটু ঘুরল, তারপর যেন দূরের কোনো ডাকে সাড়া দিয়ে মিলিয়ে গেল। চলে যাওয়ার পর একটা শান্তি নামল—যেন বাতাস নিজেই অসীম সাবধানে শ্বাস নিচ্ছে। মালিকরা খালি খাঁচা হাতে বাড়ির দিকে ফিরে গেল।
এভাবেই পাখিরা হারিয়ে গেল।
............
পরের দিন একটা অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটল। সকালের নাস্তা খেতে খেতে টেলিভিশন দেখছিলাম, হঠাৎ দরজার বেল বাজল। এত জোরে বাজছিল যে বুঝলাম কিছু একটা অপ্রীতিকর হতে চলেছে।
"বাবার অফিসে নিয়ে চলো," দরজায় দাঁড়ানো মেমোরি পুলিশের একজন অফিসার বলল। পাঁচজন এসেছে—তাদের পরনে গাঢ় সবুজ ইউনিফর্ম, মোটা বেল্ট, কালো বুট। চামড়ার দস্তানা পরা, কোমরের হোলস্টারে বন্দুক আধা-ঢাকা। দেখতে প্রায় একইরকম, শুধু কলারের তিনটে করে ব্যাজ আলাদা—তবে ভালো করে দেখার সময় পেলাম না।
"বাবার অফিসে নিয়ে চলো," দ্বিতীয় জন একই সুরে বলল। এর ব্যাজগুলো হীরা, বিন আর ট্র্যাপিজিয়ামের আকৃতির।
"বাবা পাঁচ বছর আগে মারা গেছেন," আমি যতটা শান্ত ও সমান গলায় পারলাম বললাম।
"জানি," বলল আরেকজন। তার ব্যাজ তিন কোনা, ষড়ভুজ আর 'T' অক্ষরের আকৃতির। যেন এই কথাটা সংকেত ছিল, পাঁচজন অফিসার জুতো না খুলেই ভেতরে ঢুকে পড়ল। হঠাৎ করিডোর বুটের আর বন্দুকের ঠনঠন শব্দে ভরে গেল।
"কার্পেট পরিষ্কার করেছি এইমাত্র," আমি বললাম। "জুতো খুলুন।" জানতাম আরও জোরালো কিছু বলা উচিত, কিন্তু মাথায় এটুকুই এলো। যাই হোক, তারা কানই দিল না, ততক্ষণে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে শুরু করেছে।
কোথায় যেতে হবে তারা যেন আগে থেকেই জানত। একটু পরেই বাড়ির পূর্ব দিকে বাবার অফিসে পৌঁছে দ্রুত কাজে লেগে গেল। প্রথমে একজন সব জানালা খুলল—বাবার মৃত্যুর পর থেকে সেটা বন্ধ ছিল। আরেকজন সরু একটা ধারালো যন্ত্র দিয়ে আলমারি আর ডেস্কের দেরাজের তালা ভাঙল। বাকিরা দেওয়ালের প্রতি ইঞ্চি ইঞ্চি জায়গায় বোলাল। তারা সেখানে গোপন কুঠুরি খুঁজছে।
তারপর সবাই মিলে বাবার কাগজপত্র উল্টাতে লাগল—নোট, খসড়া, বই, ছবি সব হাতিয়ে দেখছে। যেটাকে বিপজ্জনক মনে হলো—অর্থাৎ যেখানে "পাখি" শব্দটা আছে—সেটা অবলীলায় মেঝেতে ছুঁড়ে দিল। আমি দরজার চৌকাঠে হেলান দিয়ে নার্ভাসভাবে তালা নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে দেখলাম।
মেমোরি পুলিশদের সম্পর্কে যেরকম শুনেছিলাম, অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে ঠিক সেভাবেই তারা কাজ করছে । নিঃশব্দে, স্থির দৃষ্টিতে, একটাও অপ্রয়োজনীয় নড়াচড়া নেই তাদের। শুধু কাগজ সরসর করার শব্দ—যেন ডানা ঝাপটানো শব্দ।
দেখতে দেখতে মেঝেতে কাগজের পাহাড় জমে গেল। ঘরের প্রায় সব কিছুই কোনো না কোনোভাবে বাবার কাজের সাথে জড়িত। বাবার পরিচিত হাতের লেখায় ভরা কাগজ আর পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে তোলা ছবি একের পর এক অফিসারদের হাত থেকে বেরিয়ে পড়ছে। তারা যে বিশৃঙ্খলা করছিল সেটা নিশ্চিত, কিন্তু এত নিখুঁতভাবে করছিল যে পরিপাটি মনে হচ্ছিল। তাদের থামানো উচিত, কিন্তু বুক ধড়ফড় করছিল, কী করব বুঝতে পারছিলাম না।
"সাবধানে," আমি বিড়বিড় করলাম, তারা কান দিল না। "বাবার কাছ থেকে এগুলোই একমাত্র আমার কাছে আছে।" একজনও ফিরে তাকাল না, আমার গলা মেঝের স্মৃতির স্তূপে হারিয়ে গেল।
তখন একজন অফিসার ডেস্কের নিচের দেরাজের হাতলে হাত দিল।
"ওতে পাখির কিছু নেই," আমি চিৎকার করলাম। ওই দেরাজে বাবা পারিবারিক চিঠি আর ছবি রাখতেন। অফিসারটি—এর ব্যাজ একটা কেন্দ্রীভূত বৃত্ত, একটা আয়তক্ষেত্র আর একটা অশ্রুফোঁটার আকৃতির— তল্লাশি চালিয়ে গেল। দেরাজে একটাই আপত্তিজনক জিনিস ছিল—আমাদের পরিবারের একটা ছবি, সাথে একটা উজ্জ্বল রঙের বিরল পাখি—নামটা এখন আর মনে নেই। বাবা নিজে পাখিটার ডিম সেঁকে ফুটিয়েছিলেন। বাকি ছবি আর চিঠিগুলো অফিসার সাবধানে গুছিয়ে দেরাজে রেখে দিল। সেদিনের একমাত্র সদয় কাজ এটুকুই।
সব বাছাই শেষ হলে মেঝের স্তূপ থেকে জিনিসগুলো তুলে জ্যাকেটের ভেতরের পকেট থেকে বের করা বড় কালো প্লাস্টিকের ব্যাগে ঠেসে ভরল। যেভাবে নিষ্ঠুরভাবে গুঁজে দিচ্ছিল তাতে বোঝা গেল সব ফেলে দেবে। কিছু খুঁজছিল না তারা—শুধু পাখি-সংক্রান্ত সব চিহ্ন মুছে দিতে এসেছিল। মেমোরি পুলিশের প্রথম কাজ হলো হারিয়ে যাওয়াটা কার্যকর করা।
একসময় মনে হলো, যেদিন মাকে নিয়ে গিয়েছিল সেদিনের ঘটনা আর আজকের এই তল্লাশি আর এক নয়। আজ যা খুঁজতে এসেছিল পেয়ে গেছে, আর ফিরে আসবে না বলেই মনে হলো। বাবা মৃত, আর বাড়ি থেকে পাখির স্মৃতি ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে।
তল্লাশি এক ঘণ্টা চলল, দশটা বড় ব্যাগ ভরল। উজ্জ্বল রোদ এসে ঘর গরম হয়ে উঠেছিল। অফিসারদের কলারের ব্যাজ চকচক করছিল, কিন্তু কেউ ঘামছে বা গরমে কষ্ট পাচ্ছে বলে মনে হলো না। দুটো করে ব্যাগ কাঁধে তুলে বাইরে রাখা ট্রাকে নিয়ে গেল।
ঘরটা সম্পূর্ণ বদলে গেছে। বাবার উপস্থিতির যে চিহ্নগুলো যত্ন করে আগলে রেখেছিলাম, সেগুলো উবে গেছে—জায়গায় জায়গায় এমন শূন্যতা যা আর পূরণ হবে না। সেই শূন্যতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে মনে হলো তার ভয়ঙ্কর গভীরে টেনে নিচ্ছে।
তৃতীয় অধ্যায়
আমি এখন লেখালেখি করে জীবিকা নির্বাহ করি। এ পর্যন্ত তিনটি উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে। প্রথমটা ছিল এক পিয়ানো টিউনারকে নিয়ে। তার প্রেমিক ছিল একজন পিয়ানোবাদক। সে হারিয়ে গিয়েছে। তাকে খুঁজতে খুঁজতে একের পর এক সংগীতের দোকান আর কনসার্ট হলে ঘুরে বেড়ায় সে। কানে লেগে থাকা তার বাজনার শব্দটুকুই একমাত্র সম্বল। দ্বিতীয়টা ছিল এক ব্যালেরিনাকে নিয়ে। দুর্ঘটনায় ডান পা হারিয়েছে সে। সে তার বয়ফ্রেন্ড একজন উদ্ভিদবিদ। তার সাথে সে একটা গ্রিনহাউসে থাকে। আর তৃতীয়টা ছিল এক তরুণীকে নিয়ে। তার ছোট ভাইয়ের ক্রমোজনগুলো নষ্ট হয়েছে যাচ্ছে একটি অসুখে। সেই ভাইটির সেবা করছে তরুণীটি।
প্রতিটি উপন্যাসই কোনো না কোনো হারিয়ে যাওয়া জিনিসের গল্প বলে। সবাই এই ধরনের গল্প পছন্দ করে। কিন্তু এই দ্বীপে উপন্যাস লেখা সবচেয়ে কম সম্মানের, সবচেয়ে অবহেলিত পেশাগুলোর একটা। দ্বীপে বই উপচে পড়ছে—এটা কেউ বলতে পারবে না। গোলাপ বাগানের পাশে একটা জীর্ণ এক তলা কাঠের বাড়িতে লাইব্রেরি—যখনই যাও, হাতে গোনা কয়েকজন পাঠক দেখতে পাবে। বইগুলো তাকে কুঁকড়ে থাকে, যেন একটু ছুঁলেই ধুলো হয়ে যাবে। শেষে যত্ন না পেয়ে, বাঁধাই না হয়ে ফেলেই দেওয়া হয়—তাই লাইব্রেরিতে বইয়ের সংগ্রহ কখনো বাড়ে না। কিন্তু কেউ অভিযোগ করে না।
বইয়ের দোকানগুলোও একইরকম। প্রায় ফাঁকা, আর ম্যানেজাররা হলদেটে মলাটের অবিক্রীত বইয়ের স্তূপের পেছনে প্রায় বিরক্ত মুখে বসে থাকে।
এখানে খুব কম মানুষেরই উপন্যাসের দরকার হয়।
আমি সাধারণত বিকেল দুটো নাগাদ লেখা শুরু করি, প্রায় মধ্যরাত পর্যন্ত লিখি, তবু পাঁচ পাতার বেশি খুব কমই হয়। আস্তে আস্তে লিখতে ভালো লাগে—কাগজের প্রতিটি ঘর ভরাই, একটা একটা করে অক্ষর বসাই। তাড়া নেই। সময় নিয়ে লিখি।
বাবার পুরনো ঘরে কাজ করি। তবে ঘরটি এখন অনেক গোছানো আর পরিপাটি, কারণ উপন্যাস লিখতে নোট বা অন্য কিছুর দরকার হয় না। ডেস্কে শুধু একগোছা কাগজ, একটা পেনসিল, ছোট একটা ছুরি পেনসিল ছাঁটার জন্য, আর একটা রবার। মেমোরি পুলিশ যে শূন্যতা তৈরি করে গেছে অনেক চেষ্টা করেও না সেটা ভরাট করার কোনো উপায় খুঁজে পাইনি।
সন্ধে হলে এক ঘণ্টা হাঁটতে বেরোই। সমুদ্রের ধারের রাস্তা ধরে ঘাটে যাই, ফেরার পথে পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের পাশ দিয়ে পাহাড়ের ওপর দিয়ে আসি।
ফেরিটা অনেকদিন ধরে ঘাটে বাঁধা, এখন পুরো মরচে ধরে গেছে। কোনো যাত্রী ওঠে না, কোথাও নিয়েও যেতে পারে না। এটাও দ্বীপ থেকে হারিয়ে যাওয়া জিনিসগুলোর একটা।
নৌকার সামনের দিকে নাম লেখা আছে, কিন্তু নোনা বাতাসে মুছে গিয়ে অপাঠ্য হয়ে গেছে। জানালায় ধুলোর প্রলেপ, খোল আর নোঙরের শিকল আর প্রপেলার ঝিনুক আর শেওলায় ঢাকা—যেন একটা বিশাল সামুদ্রিক প্রাণী আস্তে আস্তে পাথর হয়ে যাচ্ছে।
আমার নার্সের স্বামী একসময় এই নৌকায় মেকানিক ছিলেন। ফেরি হারিয়ে যাওয়ার পর ঘাটের কাছে একটা গুদামে পাহারাদারের কাজ নিয়েছিলেন। কিন্তু কোনো এক সময় অবসর নিয়ে তিনি এখন এই পরিত্যক্ত নৌকায় থাকেন। হাঁটতে বেরোলে তাঁর সাথে দেখা করতে আসি।
"কেমন আছ?" একদিন সন্ধেবেলা একটা চেয়ার এগিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন। "উপন্যাস এগোচ্ছে?" বসার জায়গার অভাব নেই—আবহাওয়া বা মেজাজ বুঝে কখনো ডেকের বেঞ্চে, কখনো ফার্স্ট ক্লাস লাউঞ্জের আরামদায়ক সোফায় বসি।
"আস্তে আস্তে," বললাম।
"আস্তে হোক, নিজের যত্ন নেওয়াটাই আসল কথা।" নিজে নিজে মাথা নাড়লেন, তারপর বললেন, "সারাদিন ডেস্কে বসে মাথা থেকে এত জটিল সব জিনিস বের করতে পারে—এমন মানুষ কমই আছে। তোমার মা-বাবা বেঁচে থাকলে কত গর্বিত হতেন।"
"উপন্যাস এত আহামরি কিছু না। আমার কাছে নৌকার ইঞ্জিন খুলে ঠিক করে আবার জোড়া লাগানোটা অনেক বেশি রহস্যময় আর অসাধারণ।"
"না না। ফেরি হারিয়ে গেছে, আর কিছু বলার নেই।" একটু চুপ করে রইলাম দুজনে।
"আচ্ছা," তিনি একটু পরে বললেন। "চমৎকার কিছু পিচ ফল পেয়েছি। একটা খাবে?" ছোট্ট গ্যালিতে গেলেন—বয়লার রুমের পাশে— রফ বিছানো থালায় পিচের টুকরো সাজিয়ে ওপরে পুদিনার ডাল দিলেন। তারপর কড়া সবুজ চা বানালেন। যন্ত্রপাতি, রান্না আর গাছপালা—এই তিনটেতে তাঁর সত্যিকারের দক্ষতা।
প্রতিটা বইয়ের প্রথম কপিগুলোর একটা সবসময় তাঁকে দিই।
"তাহলে এটাই তোমার নতুন উপন্যাস," প্রতিবার তিনি বলেন, "উপন্যাস" শব্দটা খুব যত্ন করে উচ্চারণ করে দুহাতে বইটা নেন, যেন কোনো পবিত্র জিনিস গ্রহণ করছেন। "ধন্যবাদ, ধন্যবাদ," বারবার বলেন, গলা প্রায় কেঁদে আসে, আমি ক্রমশ অস্বস্তি বোধ করি।
কিন্তু আমার একটা বইয়ের একটা পাতাও তিনি কখনো পড়েননি।
একবার বললাম বইগুলো সম্পর্কে তাঁর মতামত জানতে চাই। তিনি নারাজ হলেন।
"আমি কী বলব," বললেন। "উপন্যাস শেষ পর্যন্ত পড়লে শেষ হয়ে যায়। এমন অপচয় করতে চাই না। বরং এটাকে এখানে রেখে দিতে চাই, নিরাপদে, চিরকালের জন্য।"
তারপর বইটা জাহাজের হুইলহাউসে সমুদ্রদেবতার ছোট্ট বেদিতে রেখে কুঁচকানো হাত জোড় করে প্রার্থনা করলেন।
নাস্তা খেতে খেতে নানা কথা বলতাম—তবে বেশিরভাগই স্মৃতির কথা। মা আর বাবার কথা, পুরনো নার্সের কথা, পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের কথা, ভাস্কর্যের কথা, সেই দূর অতীতের কথা যখন নৌকায় অন্য জায়গায় যাওয়া যেত। কিন্তু স্মৃতি দিন দিন কমছিল—দ্বীপ থেকে কিছু হারিয়ে গেলে তার স্মৃতিও মুছে যায়। শেষ পিচের টুকরোটা ভাগ করে নিয়ে একই গল্প একে অপরকে আবার বলতাম, আর ফলটুকু জিভে আস্তে আস্তে গলতে দিতাম।
সূর্য সমুদ্রের দিকে হেলে পড়লে নৌকা থেকে নামতাম। গ্যাংওয়ে খুব বেশি খাড়া না হলেও বুড়ো মানুষটা এগিয়ে আসতেন। আমাকে এখনো ছোট্ট মেয়ে ভাবেন।
"বাড়ি ফিরবে সাবধানে।"
"ঠিক আছে," বলতাম। "কাল দেখা হবে।"
আমি চলে যাওয়ার পর তিনি দাঁড়িয়ে দেখতেন—যতক্ষণ না একেবারে চোখের আড়াল হই।
বন্দর ছেড়ে পরের গন্তব্য পাহাড়চূড়ার পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র। তবে বেশিক্ষণ থাকতাম না। সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে কয়েকটা গভীর শ্বাস নিয়ে আবার নেমে আসতাম।
মেমোরি পুলিশ এখানেও কাজ করে গেছে—বাবার স্টাডির মতোই—প্রায় ধ্বংসস্তূপ বানিয়ে রেখেছে। একসময় এটা বুনো পাখি দেখার জায়গা ছিল—তার কোনো চিহ্নই নেই। গবেষকরাও ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেছেন।
যে জানালার কাছে বাবার সাথে দাঁড়িয়ে দূরবীন দিয়ে দেখতাম, সেখানে দাঁড়িয়ে এখনো মাঝে মাঝে ছোট্ট ডানাওয়ালা প্রাণী উড়ে যেতে দেখি—কিন্তু সেগুলো শুধু মনে করিয়ে দেয় যে পাখি আমার কাছে আর কিছুই না।
পাহাড় থেকে নেমে শহরের মধ্য দিয়ে আসার সময় সূর্য ডুবছিল। সন্ধেবেলা দ্বীপ আরও নিরিবিলি হয়ে যায়। কাজ থেকে ফেরা মানুষেরা মাথা নিচু করে হাঁটছে, বাচ্চারা তাড়াতাড়ি পা ফেলছে। বাজারের ট্রাকের ইঞ্জিনের শব্দও—সারাদিনের বিক্রি শেষে খালি হয়ে ফেরা—যেন দমে গেছে, বিষণ্ন।
চারদিকে নীরবতা নামল। পরবর্তী হারানোর আঘাত সহ্য করার জন্য যেন আমরা সবাই নিজেদের মনে মনে তৈরি করছি। হয়তো কাল সকালেই সে আঘাতটা আসবে।
এভাবেই দ্বীপে সন্ধে নামে।
চতুর্থ অধ্যায়
বুধবার বিকেলে পাণ্ডুলিপি প্রকাশকের কাছে নিয়ে যাওয়ার পথে মেমোরি পুলিশের মুখোমুখি হলাম। এই মাসে তৃতীয়বার দেখলাম তাদের, আর প্রতিবারই আগেরবারের চেয়ে একটু বেশি নির্মম মনে হচ্ছে তাদের।
মনে পড়ল, তারা প্রথম আবির্ভূত হয়েছিল পনেরো বছর আগে। সেই সময় স্পষ্ট হয়ে উঠছিল যে কিছু মানুষ—আমার মায়ের মতো—হারিয়ে যাওয়া জিনিসের স্মৃতি ধরে রাখতে পারে। মেমোরি পুলিশ তাদের সবাইকে ধরে নিয়ে যেতে শুরু করল। কোথায় রাখা হচ্ছে কেউ জানত না।
বাস থেকে নেমে রাস্তা পার হওয়ার অপেক্ষায় ছিলাম, এমন সময় পেছনে ক্যানভাসের ঢাকনা দেওয়া তিনটে গাঢ় সবুজ ট্রাক গর্জন করতে করতে মোড়ে এলো। রাস্তার গাড়িগুলো গতি কমিয়ে ফুটপাথের পাশে সরে দাঁড়াল। ট্রাকগুলো একটা বাড়ির সামনে থামল—সেখানে একটা দাঁতের ডাক্তারের চেম্বার, একটা বিমা কোম্পানি আর একটা নাচের স্কুল আছে। দশজন মেমোরি পুলিশের সদস্য লাফিয়ে নেমে দ্রুত ভেতরে ঢুকে গেল।
রাস্তার মানুষেরা উদ্বিগ্ন হয়ে দেখছিল, কেউ কেউ পাশের গলিতে সরে গেল। সবাই যেন চাইছিল এই দৃশ্য তাদের নিজেদের টানার আগেই শেষ হয়ে যাক।
পাণ্ডুলিপির খামটা বুকে চেপে একটা বাতির খুঁটির পেছনে একেবারে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। অপেক্ষা করতে করতে ট্র্যাফিক বাতি কতবার সবুজ থেকে হলুদ, হলুদ থেকে লাল, আবার সবুজ হলো। কেউ রাস্তা পার হলো না। ট্রামের যাত্রীরা জানালা দিয়ে উঁকি দিচ্ছিল। একসময় খেয়াল করলাম খামটা একদম কুঁচকে গেছে।
একটু পরে ভেতর থেকে পায়ের শব্দ এলো—মেমোরি পুলিশের জোরালো ছন্দময় বুটের শব্দের সাথে মিশে আছে আরও মৃদু, অনিশ্চিত পদশব্দ। তারপর একে একে বেরিয়ে এলো কয়েকজন মানুষ—দুজন মধ্যবয়সী ভদ্রলোক, বাদামি রঙে চুল রাঙানো তিরিশোর্ধ এক মহিলা, আর কিশোরী বলা যায় এমন একটা রোগা মেয়ে।
শীত তখনো পড়েনি, তবু তারা প্রত্যেকে কয়েক পরত জামা গায়ে দিয়েছে, ওভারকোট পরেছে, গলায় মাফলার আর স্কার্ফ পেঁচিয়েছে। হাতে ব্যাগ আর স্যুটকেস, ঠাসা ভরা। যা যা দরকারি জিনিস বহন করা সম্ভব নিয়ে আসার চেষ্টা করেছে।
আলগা বোতাম, খোলা জুতোর ফিতে, ব্যাগ থেকে উঁকি দেওয়া কাপড়ের কোণ—বোঝা গেল তাড়াহুড়ো করে গুছিয়ে আসতে হয়েছে। পিঠে অস্ত্র ঠেকিয়ে তাদের বের করে আনা হচ্ছে। তবু মুখ শান্ত, চোখ দূরে স্থির—যেন গভীর বনের নির্জন জলাশয়ের মতো। সেই চোখে নিশ্চয়ই অনেক স্মৃতি, যা আমাদের কাছ থেকে কবেই হারিয়ে গেছে।
মেমোরি পুলিশ সবসময়ের মতোই কলারের ব্যাজ ঝকঝক করিয়ে ভয়ঙ্কর দক্ষতায় কাজ করে যাচ্ছিল। যেখানে আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম সেই জায়গাটার পাশ দিয়ে চারজনকে নিয়ে গেল—একটা ওষুধের তীব্র গন্ধ নাকে এলো, হয়তো দাঁতের ডাক্তারের চেম্বার থেকে এসেছিল তারা। একে একে ট্রাকের পেছনে তোলা হলো। সারাক্ষণ বন্দুক তাক করা ছিল তাদের দিকে। সবার শেষে ছিল মেয়েটা। তার আছে কমলা রঙের একটা ব্যাগ। ব্যাগটার গায়ে কাপড়ে কাটা ভালুকের নকশা আকাঁ ছিল। ব্যাগটা ট্রাকে ছুঁড়ে দিয়ে নিজে উঠতে গেল, কিন্তু অনেক উঁচু—পড়ে গেল চিৎ হয়ে।
আমি থামতে পারলাম না, চিৎকার করে উঠলাম, খামটা হাত থেকে পড়ে গেল। পাণ্ডুলিপির পাতা ফুটপাথে ছড়িয়ে গেল। পাশের মানুষগুলো বিরক্তমুখে ঘুরে তাকাল—হইচই হোক চায় না কেউ, পুলিশের নজরে পড়তে সবার ভয়।
কাছে দাঁড়ানো একটা ছেলে পাতা কুড়িয়ে দিতে সাহায্য করল। কয়েকটা পাতা পানিতে ভিজে গিয়েছিল, কয়েকটা পায়ে মাড়ানো হয়েছিল, কিন্তু সব পাতা খুঁজে পাওয়া গেল।
"সব পেয়েছ?" ছেলেটা কানের কাছে ফিসফিস করল। মাথা নাড়লাম, কৃতজ্ঞ দৃষ্টিতে তাকালাম।
কিন্তু এই ছোট্ট ঘটনায় মেমোরি পুলিশের কাজে একটুও ব্যাঘাত হলো না। একজনও ফিরে তাকায়নি।
মেয়েটা উঠে দাঁড়িয়েছিল। ট্রাকের ভেতরে থাকা একজন অফিসার নিচে হাত বাড়িয়ে মেয়েটার হাত ধরে টেনে তুলল। স্কার্টের নিচে বেরিয়ে থাকা ছোট্ট গাঁটওয়ালা হাঁটু দুটোয় এখনো শিশুর ছাপ। ট্রাকের পেছনে ক্যানভাস নামিয়ে দেওয়া হলো, ইঞ্জিন চালু হলো।
চলে যাওয়ার পরেও একটু সময় লাগল স্বাভাবিক ছন্দে ফিরতে। ট্রাক চলে গেলে, ইঞ্জিনের শব্দ দূরে মিলিয়ে গেলে, ট্রাম আবার চলতে শুরু করল—তখনই নিশ্চিত হলাম মেমোরি পুলিশ চলে গেছে, আমার কোনো ক্ষতি হবে না। ফুটপাথের মানুষেরা যে যার পথে চলে গেল, সাহায্য করা ছেলেটা রাস্তা পার হলো।
শক্ত বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে রইলাম। মনে মনে ভাবলাম, ট্রাকে টেনে তোলার সময় অফিসারের হাতের স্পর্শ মেয়েটার কেমন লেগেছিল।
............
"আসার পথে ভয়ঙ্কর একটা দৃশ্য দেখলাম," প্রকাশনা সংস্থার লবিতে আমার সম্পাদক R-কে বললাম।
"মেমোরি পুলিশ?" সিগারেট ধরাতে ধরাতে জিজ্ঞেস করলেন।
"হ্যাঁ। ইদানীং আরও খারাপ হয়ে গেছে মনে হচ্ছে।"
"ভয়ঙ্কর," সম্মতি জানিয়ে ধীরে ধোঁয়া ছাড়লেন।
"কিন্তু আজকেরটা একটু আলাদা ছিল। দিনের বেলা শহরের মাঝখান থেকে একসাথে চারজনকে নিয়ে গেল। যতদূর জানি, এতদিন রাতের বেলা শহরের কোণায় কোণায় এক একটা পরিবার থেকে একজন করে নিত।"
"ওরা নিশ্চয়ই কোনো নিরাপদ আস্তানায় লুকিয়ে ছিল।"
"নিরাপদ আস্তানা?" অপরিচিত শব্দগুলো আমি আবার বললাম, কিন্তু গলার ভেতরেই যেন মিলিয়ে গেল। প্রকাশ্যে এই ধরনের স্পর্শকাতর বিষয় না বলাই ভালো—এটা জানা ছিল। সাদা পোশাকের পুলিশ আশেপাশে থাকতে পারে। দ্বীপে তাদের সম্পর্কে গুজবের শেষ নেই।
লবি প্রায় ফাঁকা। শুধু একটা টবের রাবার গাছের কাছে তিনজন স্যুট পরা লোক কাগজের মোটা তাড়া নিয়ে আলোচনায় মগ্ন। "মনে হয় বাড়ির কোনো একটা ঘরকে লুকানোর জায়গায় বদলে নিয়েছিল। এছাড়া আর কীই বা করার আছে। শুনেছি বেশ বড় একটা গোপন নেটওয়ার্ক আছে যারা এই নিরাপদ আস্তানা তৈরি করে চালু রাখে। ঘর বানায়, থাকার লোকদের খাবার আর টাকা দেয়। কিন্তু পুলিশ যদি এখন সেই আস্তানাগুলোতেও হানা দিতে শুরু করে, তাহলে সত্যিই আর লুকানোর জায়গা নেই..."
R আরও কিছু বলতে চাইছিলেন মনে হলো, কিন্তু চুপ করে গেলেন। কফির কাপে হাত দিলেন, চোখ চলে গেল উঠোনের বাগানে।
বাগানে ইটের তৈরি একটা ছোট্ট ফোয়ারা। সাদামাটা, চোখে পড়ার মতো কিছু না। কথা থামতেই জানালা দিয়ে ফোয়ারার শব্দ আসছিল—যেন দূরে কোনো বাদ্যযন্ত্রে আস্তে আস্তে সুর বাজছে।
"পুলিশ কীভাবে বুঝতে পারে কারা কারা সেরকম—সেটা আমার কাছে সবসময় অদ্ভুত লেগেছে," ফোয়ারার দিকে তাকিয়ে থাকা R-এর দিকে চেয়ে বললাম। "মানে, যারা হারিয়ে যাওয়ার পরেও ভুলতে পারে না। তাদের চেহারায় আলাদা কিছু নেই। নারী-পুরুষ, সব বয়স, সব পরিবার। তাই সাবধানে থেকে সবার মধ্যে মিশে গেলে পার পেয়ে যাওয়ার কথা। অভিনয়টা কঠিন হওয়ার কথা না—বাকিদের মতো হারিয়ে যাওয়াটা নিজেদেরও স্পর্শ করছে এমন ভান করা।"
"ব্যাপারটা তুমি যতটা সহজ মনে করছ ততটা সহজ কিনা সন্দেহ আছে।" R একটু ভাবলেন। "সচেতন মন আসলে অবচেতনের মধ্যে গাঁথা—আর অবচেতন দশগুণ শক্তিশালী। তাই ভান করাটা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়তে পারে। এই হারিয়ে যাওয়াগুলো আসলে কী—সেটা তারা কল্পনাও করতে পারে না। ভান করা সহজ হলে তারা নিরাপদ আস্তানায় লুকিয়ে থাকত না।"
"সেটা ঠিক," বললাম।
"গুজব মাত্র, তবে শুনেছি জিন বিশ্লেষণ করে এই বৈশিষ্ট্য ধরার চেষ্টা করছে তারা। বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা গোপন জায়গায় বিশেষজ্ঞ জড়ো করছে।"
"জিন বিশ্লেষণ?" আস্তে বললাম।
"হ্যাঁ। এই মানুষগুলোকে চেহারা দেখে আলাদা করা যায় না, কিন্তু ধারণা করা হচ্ছে তাদের জিনে কিছু একটা আছে। মেমোরি পুলিশের আচরণ দেখে মনে হয় গবেষণা বেশ এগিয়ে গেছে।"
"কিন্তু আমাদের জিন পাবে কোথা থেকে?" জিজ্ঞেস করলাম।
"এইমাত্র এই কাপ থেকে কফি খেলে না?" R সিগারেট নিভিয়ে আমার কফির কাপটা চোখের সামনে তুললেন। মাথা নাড়লাম।
"এটা নিয়ে লালা থেকে জিন আলাদা করে ফেলা যায়। মেমোরি পুলিশের জন্য এর চেয়ে সহজ আর কী। তারা সর্বত্র ওত পেতে আছে — হয়তো থালাবাসন ধোয়ার পেছনের ঘরেও। আমাদের টেরও পাওয়ার আগে দ্বীপের সবার পরীক্ষা করে ডেটাবেজে ঢুকিয়ে ফেলবে, তবে কতটা এগিয়েছে জানার উপায় নেই। যতই সাবধান থাকি, চলতে ফিরতে আমরা সবাই নিজেদের ছোট্ট ছোট্ট চিহ্ন রেখে যাই। চুল, ঘাম, নখ, চোখের জল... যেকোনোটা পরীক্ষা করা যায়। কেউ রেহাই পাবে না।"
আস্তে আস্তে কাপটা নামিয়ে রাখলেন। চোখ নেমে গেল কাপের তলায় জমে থাকা কফির দিকে।
রাবার গাছের কাছে যে তিনজন কথা বলছিল তারা শেষ করেছে। টেবিলে তিনটে কাপ পড়ে আছে। রিসেপশনিস্ট একেবারে ভাবলেশহীন মুখে সেগুলো সরাতে এলো।
সে চলে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম। "কিন্তু কেন ধরে নিয়ে যায়? তারা তো কোনো অন্যায় করেনি।"
"যারা দ্বীপ চালায় তারা চায় সবকিছু হারিয়ে যাক। তাদের দৃষ্টিতে, যা হারিয়ে যাওয়ার কথা তা হারিয়ে না গেলে সেটা হয় অকল্পনীয়। তাই নিজেরাই জোর করে হারিয়ে দেয়।"
"মাকে কি মেরে ফেলেছিল?" জানতাম R-কে জিজ্ঞেস করে লাভ নেই, তবু বেরিয়ে গেল।
"তাকে নিশ্চিতভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছিল, পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছিল।" R সাবধানে শব্দ বাছলেন।
একটু চুপ করে রইলেন। শুধু ফোয়ারার জলের শব্দ। কুঁচকানো খামটা আমাদের মাঝখানে টেবিলে পড়ে আছে। R সেটা টেনে নিয়ে পাণ্ডুলিপি বের করলেন।
"অদ্ভুত লাগছে," বললেন, একটা পাতা থেকে একটু ময়লা সরালেন—যেন কোনো মূল্যবান জিনিস আদর করছেন। "এই দ্বীপে সবকিছু হারিয়ে যাচ্ছে, আর তুমি শুধু শব্দ দিয়ে এমন সম্পূর্ণ নতুন কিছু তৈরি করে যাচ্ছ।"
তখন বুঝলাম আমরা দুজন একই কথা ভাবছি। একে অপরের চোখে চোখ রাখলাম, আর আবার সেই উদ্বেগটা অনুভব করলাম—যেটা অনেক আগে থেকে বুকের মধ্যে শিকড় গেড়ে আছে। ফোয়ারার জলের ঝলক R-এর মুখে আলো ফেলছিল।
"আর যদি শব্দ হারিয়ে যায়?" নিজের মনেই ফিসফিস করলাম—জোরে বললে হয়তো সত্যি হয়ে যাবে এই ভয়ে।
পঞ্চম অধ্যায়
শরৎ দ্রুত কেটে গেল। ঢেউয়ের আছড়ে পড়ার শব্দ তীক্ষ্ণ আর ঠান্ডা হয়ে এলো, পাহাড়ের ওপার থেকে বাতাস শীতের মেঘ নিয়ে এলো।
বুড়ো মানুষটা নৌকা থেকে এসে শীতের প্রস্তুতিতে সাহায্য করলেন। একসাথে উনুন পরিষ্কার করলাম, পাইপে মোড়ক দিলাম, বাগানের শুকনো পাতা পোড়ালাম।
"দশ বছর ধরে তুষারপাত হয়নি, তবে এই শীতে হতে পারে," বললেন, পেছনের গুদামঘরের তাকে পেঁয়াজ ঝোলাতে ঝোলাতে। "পেঁয়াজের খোসা যখন এরকম গাঢ় বাদামি আর প্রজাপতির ডানার মতো পাতলা হয়, তখন সবসময় তুষার পড়ে।"
একটা খোসা ছাড়িয়ে হাতের মুঠোয় দুমড়ে দিলেন, মচমচ একটা শব্দ হলো।
"তাহলে জীবনে তৃতীয়বার তুষার দেখতে পাব। ভালোই লাগবে," প্রায় আনন্দিত হয়ে বললাম। "আপনার কতবার হবে?"
"গুনিনি কখনো। উত্তরের সমুদ্রে ফেরি চালাতাম যখন, এত তুষার পড়ত যে বিরক্ত হয়ে যেতাম। তবে সেটা তোমার জন্মেরও অনেক আগের কথা," বললেন, পেঁয়াজ ঝোলানোয় ফিরে গেলেন।
কাজ শেষ হলে উনুন জ্বালিয়ে খাবার ঘরে ওয়াফেল কেক খেলাম। হয়তো এইমাত্র পরিষ্কার হওয়ার কারণে উনুন ধরতে দেরি করছিল, ভটভট শব্দ হচ্ছিল। জানালার বাইরে আকাশে জেট বিমানের ধোঁয়ার রেখা দেখা যাচ্ছিল। পোড়া পাতা থেকে সরু ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠছিল।
"একা থাকি, শীত এলে একটু ভয় ভয় করে। সাহায্যের জন্য সত্যিই কৃতজ্ঞ। আর একটা কথা, একটা সোয়েটার বুনে শেষ করলাম, পরে দেখুন তো," বললাম। প্রথম ওয়াফেলটা শেষ করে তাঁর জন্য বোনা ধূসর ফেয়ার আইল সোয়েটারটা আনতে গেলাম। অবাক হয়ে চায়ের চুমুক গিলে দুহাত বাড়িয়ে নিলেন।
"সাহায্য করতে পেরে ভালো লাগে, কিন্তু আমি তো তেমন কিছুই করিনি। এটা অনেক বেশি হয়ে গেল।" কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে পুরনো সোয়েটার খুলে ব্যবহার করা তোয়ালের মতো দলা পাকিয়ে রাখলেন। তারপর নতুনটায় অত্যন্ত সাবধানে হাত গলালেন—যেন এটা নাজুক, একটু ছুঁলেই খুলে যাবে। "আহা, কী গরম!" বললেন। "এত হালকা যে ভাসতে ভাসতে উড়ে যাব মনে হচ্ছে।"
হাতা একটু লম্বা, গলাটা একটু টাইট, কিন্তু তাতে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। আরেকটা ওয়াফেল খেলেন, কিন্তু নতুন সোয়েটারে এতটাই মুগ্ধ যে থুতনিতে ক্রিম লেগে গেলেও খেয়াল হলো না।
রাতের খাবারের পর বুড়ো মানুষটা সাঁড়াশি আর স্ক্রু ড্রাইভার, বালি কাগজ আর তেলের কৌটো সাইকেলের সাথে লাগানো যন্ত্রপাতির বাক্সে ভরে নৌকায় ফিরে গেলেন।
পরের দিন থেকে সত্যিকারের শীত শুরু হলো। হঠাৎ করেই বাইরে বেরোতে কোট লাগছে। সকালে বাড়ির পেছনের নদীতে বরফ জমেছে, বাজারে সবজি কমে গেছে।
বাড়ির মধ্যে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে নতুন উপন্যাস লিখছি। এটা একজন টাইপিস্টকে নিয়ে যে তার গলার স্বর হারিয়ে ফেলে। সে তা খুঁজতে বেরোয়। সাথে আছে তার প্রেমিক। সে টাইপিং স্কুলের শিক্ষক। সে বাক-চিকিৎসকের কাছে যায়। প্রেমিক তার গলা মালিশ করে। ঠোঁট দিয়ে জিভ উষ্ণ করে। আগে একসাথে রেকর্ড করা গান বাজায়। কিন্তু গলার স্বর ফেরে না। সে টাইপ করে তার মনের কথা জানায়। কীগুলোর খটখট শব্দ তাদের মাঝে সংগীতের মতো বয়ে যায়, তারপর...
পরে কী হবে আমি নিজেও জানি না। গল্পটা সহজ সরল মনে হচ্ছে, কিন্তু মনে হচ্ছে একটা ভয়ের দিকে মোড় নিতে পারে।
............
মধ্যরাত পেরিয়ে গেছে, তখনও লিখছি। হঠাৎ মনে হলো দূর থেকে কাচে কেউ টোকা দিচ্ছে। পেনসিল নামিয়ে একটু কান পাতলাম, কিন্তু শুধু বাইরে বাতাসের শব্দ। পাণ্ডুলিপিতে ফিরে গেলাম, কিন্তু আরেকটা লাইন শেষ হওয়ার আগেই আবার কাচ নড়ে উঠল। খট, খট, খট... শান্ত, ছন্দময় শব্দ।
পর্দা সরিয়ে বাইরে তাকালাম। বাড়িগুলো অন্ধকার, রাস্তায় কেউ নেই। চোখ বন্ধ করে শব্দটা কোথা থেকে আসছে বোঝার চেষ্টা করলাম। হঠাৎ বুঝলাম—বেসমেন্ট থেকে আসছে শব্দটা।
মায়ের মৃত্যুর পর থেকে স্টুডিওতে খুব কমই নেমেছি। তার দরজা সাধারণত তালাবন্ধ রাখি। আসলে এতদিন চাবির দরকার হয়নি বলে ঠিক কোথায় চাবিটি রেখেছি মনে ছিল না। একটু ভাবতে হলো, তারপর একটা দেরাজ হাতড়াতে গিয়ে বেশ শব্দ হলো। শেষে চাবির কৌটো পেলাম, কিন্তু খুলতে গিয়ে আবার শব্দ হলো, তারপর চাবির রিং থেকে মরচে পড়া চাবিটা খুঁজে পেতেও সময় লাগল। মনে হচ্ছিল আরও চুপচাপ করা উচিত, কিন্তু বেসমেন্ট থেকে সমান, ধৈর্যশীল টোকার শব্দ তাড়া লাগাচ্ছিল।
অবশেষে দরজা খুললাম। সিঁড়ি দিয়ে নেমে আলো জ্বাললাম। দেখলাম কেউ একজন নদীর দিকের লন্ড্রি ঘরের কাচের দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। দাদির আমল থেকে ঘরটা নিয়মিত ব্যবহার হয় না। মা মাঝে মাঝে ভাস্কর্যের যন্ত্রপাতি ধুতেন সেখানে, কিন্তু সেটাও পনেরো বছরেরও আগের কথা।
লন্ড্রি ঘরটা নদীর পাড়ে ইট বিছানো কয়েক বর্গফুটের একটা জায়গা। বেসমেন্টের চেয়ে উঁচুতে সেটা। সেখান থেকে কয়েক ধাপ নেমে বাড়ির পেছনের কাচের দরজায় আসা যায়। এই জায়গায় নদী মাত্র কয়েক গজ চওড়া, দাদা ওপারে যাওয়ার জন্য একটা ছোট কাঠের সেতু বানিয়েছিলেন। তবে সেটা এখন জরাজীর্ণ।
কিন্তু সেখানে কেউ দাঁড়িয়ে কেন?
কী করব ভাবতে ভাবতে প্রশ্নটা মাথায় ঘুরতে লাগল। হয়তো চোর। না, চোর টোকা দেয় না। টোকা পড়ছে সমানে, প্রায় ভদ্রভাবে।
সাহস করে ডাক দিলাম, "কে ওখানে?"
"মাফ করবেন। জানি রাত হয়ে গেছে। আমি ইনুই।"
............
দরজা খুলতেই দেখলাম প্রফেসর ইনুই পরিবার নিয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে। ইনুই আমার মা-বাবার পুরনো বন্ধু, বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের চর্মরোগ বিভাগে পড়াতেন।
স্পষ্টই বিপদে পড়েছেন। "কী হয়েছে?" জিজ্ঞেস করে ভেতরে নিয়ে এলাম। কাছের নদীর স্রোতের শব্দ ঠান্ডাকে আরও তীক্ষ্ণ করছিল।
"এভাবে হঠাৎ আসার জন্য সত্যিই দুঃখিত। জানি কতটা অসুবিধা হচ্ছে..." বিড়বিড় করতে করতে দরজা দিয়ে ঢুকলেন। প্রফেসরের স্ত্রীর মুখে প্রসাধন নেই, চেহারা রোগা হয়ে গেছে। চোখ ভেজা—ঠান্ডায় না কান্নায় বোঝা গেল না। মেয়ের বয়স বোধহয় পনেরো বছর। ঠোঁট শক্ত করে চেপে দাঁড়িয়ে আছে সে। মনে পড়ল ছেলেটার বয়স বয়স আট। ছেলেটা কৌতূহলী চোখে ঘর দেখছে। তারা একে অপরকে আঁকড়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। স্ত্রী স্বামীর হাত চেপে ধরেছেন, স্বামীর হাত মেয়ের কাঁধে, ছেলেমেয়ে হাতে হাত ধরেছে, আর ছোট ছেলে অন্য হাতে মায়ের কোটের কোণ ধরে আছে— কটা বৃত্ত তৈরি হয়েছে।
"কোনো অসুবিধা নেই সত্যিই," বললাম। "কিন্তু সেতু পার হয়ে এলেন কীভাবে অবাক লাগছে। ভয় করেনি? ওটা তো প্রায় ভেঙে পড়ার অবস্থায়। আর সামনের দরজায় না এসে এদিকে কেন এলেন বুঝলাম না। যাই হোক, এসে গেছেন, চলুন উপরে বসার ঘরে যাই, গরম আছে।"
"আপনি অনেক দয়ালু, কিন্তু সময় নেই। আর যতটা সম্ভব চোখে না পড়াই ভালো। নজরে পড়তে চাই না।" প্রফেসর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, আর যেন সেটাই সংকেত—চারজন আরও কাছে সরে এলো।
তারা ভালো কাপড়ের লম্বা কোট পরেছিল। কোটের বাইরে যতটুকু শরীর বেরিয়ে আছে—গলা, হাত, পা—সব উলের পোশাকে মোড়া। প্রত্যেকের দুহাতে দুটো করে ব্যাগ। বহনকারীর আকার অনুযায়ী সেগুলোর আকার ছোট-বড়। ব্যাগগুলো ভারী দেখাচ্ছিল।
তাড়াতাড়ি মায়ের টেবিল সরিয়ে চেয়ার এনে দিলাম। ব্যাগগুলো টেবিলের নিচে রাখা হলে তাদের কথা শোনার অপেক্ষায় রইলাম।
"অবশেষে এসে গেল," প্রফেসর বললেন, আঙুলগুলো সামনে জড়ো করে—যেন সেই অর্ধবৃত্তের মধ্যে গলা লুকিয়ে রাখতে চাইছেন।
"কী এলো?" থামতেই জিজ্ঞেস করলাম।
"মেমোরি পুলিশের তলব।" গলা শান্ত।
"কিন্তু কেন?"
"জিন বিশ্লেষণ কেন্দ্রে হাজিরা দিতে বলেছে। আজ—না, এখন তো ভোর হয়ে গেছে—সকালে নিতে আসবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি গেছে, ফ্যাকাল্টির বাড়ি ছেড়ে দিতে বলেছে। পুরো পরিবারকে কেন্দ্রে চলে যেতে হবে।"
"কোথায় সেটা?" জিজ্ঞেস করলাম।
"জানি না। কেউ জানে না—কোথায়, কেমন জায়গা। তবে আন্দাজ করতে পারছি কী হচ্ছে সেখানে। সরকারিভাবে বলছে চিকিৎসা গবেষণা, আসলে মেমোরি পুলিশের আস্তানা। আর আমার গবেষণা ব্যবহার করে স্মৃতি ধরে রাখতে পারে এমন মানুষ শনাক্ত করতে চায় বলে মনে হচ্ছে।"
R-এর কথা মনে পড়ল। তাহলে শুধু গুজব ছিল না।
"তলব এসেছে তিন দিন আগে। কী করব ভাবার সময়ই পাইনি। মাইনে তিনগুণ দেবে বলছে, ছেলেমেয়েদের জন্য স্কুল আছে। কর, বিমা, গাড়ি, বাড়ি—সব ব্যবস্থা। এত উদার সব আয়োজন যে ভয় লাগছে।"
"পনেরো বছর আগে তোমার মায়ের কাছে যে রকম চিঠি এসেছিল ঠিক সেরকম।" এবার প্রফেসরের স্ত্রী কথা বললেন। মেয়ে চুপচাপ শুনছে, যে কথা বলছে তার দিকে মাথা ঘোরাচ্ছে। ছেলে গ্লাভস পরা হাতে সাবধানে টেবিলের ভাস্কর্যের যন্ত্রপাতি নিয়ে খেলছে।
. . .
মাযকে ধরে নিয়ে যাওয়ার কথা মনে পড়ল, আর সেসময় ইনুইরা কীভাবে সান্ত্বনা দিয়েছিলেন। আমি তখন ছোট্ট মেয়ে, আর তাঁদের মেয়ে মায়ের কোলে শিশু।
তলব এসেছিল খসখসে হালকা বেগুনি রঙের খামে। তখনো মেমোরি পুলিশের নাম কেউ শোনেনি, তাই মা-বাবা বা ইনুইরা কেউ চিঠিতে বিশেষ অশুভ কিছু দেখেননি। শুধু একটু উদ্বিগ্ন ছিলেন—কেন ডাকছে, কতদিন লাগবে বোঝা যাচ্ছিল না।
কিন্তু আমি মোটামুটি নিশ্চিত ছিলাম বেসমেন্টের আলমারির দেরাজের সাথে এর সম্পর্ক আছে। বড়রা যখন চিঠি নিয়ে আলোচনা করছিলেন, মনে পড়ছিল মায়ের শান্ত গলায় গোপন জিনিসের গল্প বলা—আর যখন জিজ্ঞেস করেছিলাম কেন এই গল্পগুলো মনে আছে, সবার মতো ভুলে যাননি কেন—সেই মুহূর্তে মায়ের বিচলিত মুখ।
চিঠি নিয়ে আলোচনা কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি। স্পষ্ট কোনো কারণ ছিল না অস্বীকার করার।
"সব ঠিক হয়ে যাবে। এত চিন্তার কিছু নেই," মা বলেছিলেন।
"আর বাড়ি আর ছোট্ট মেয়ের দেখাশোনা আমরা করব, যা যা দরকার," প্রফেসর ইনুই মা-বাবাকে আশ্বাস দিয়েছিলেন।
পরের সকালে মেমোরি পুলিশের পাঠানো গাড়িটা ছিল অসাধারণ। কুচকুচে কালো, ঝকঝকে পালিশ করা, বাড়ির মতোই বড় মনে হচ্ছিল। ক্রোম চাকা, দরজার হাতল, বনেটে পুলিশের প্রতীক—রোদে সব ঝলমল করছিল। চামড়ার সিট এত নরম দেখাচ্ছিল যে উঠে বসে দেখতে ইচ্ছে করছিল।
সাদা গ্লাভস পরা ড্রাইভার মায়ের জন্য দরজা খুলে দিল। মা ইনুইদের আর নার্সকে কয়েকটা শেষ কথা বলে দিলেন, বাবাকে চুম্বন করলেন, তারপর দুহাতে আমার গাল ধরলেন।
গাড়ির জৌলুশ আর ড্রাইভারের ভদ্র ব্যবহার আমাদের কেমন আশ্বস্ত করেছিল। এত যত্ন নেওয়া হবে, চিন্তার কী আছে।
মা পালকের মতো নরম সিটে বসলেন, আমরা হাত নাড়লাম—যেন ভাস্কর্য প্রদর্শনীতে পুরস্কার নিতে যাচ্ছেন।
কিন্তু সেটাই ছিল শেষ দেখা। এক সপ্তাহ পরে মৃত্যুর সার্টিফিকেটসহ মায়ের দেহ ফিরে এলো।
মৃত্যুর কারণ লেখা ছিল হার্ট অ্যাটাক। প্রফেসর ইনুইয়ের ক্লিনিকে ময়নাতদন্ত হলো, কিন্তু সন্দেহজনক কিছু পাওয়া গেল না।
"গোপন গবেষণায় সাহায্য করতে করতে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন... এই দুঃসময়ে আমরা আন্তরিক সমবেদনা জানাচ্ছি..."
বাবা মেমোরি পুলিশের চিঠি পড়ে শোনালেন, কিন্তু আমি কিছুই বুঝলাম না—যেন অন্য ভাষায় কোনো মন্ত্র শুনছি। অপলক দেখলাম বাবার চোখের জল হালকা বেগুনি কাগজে ছোট ছোট দাগ ফেলছে।
............
"এই চিঠিটার কাগজের মান, টাইপরাইটারের হরফ, এমনকি ওয়াটারমার্ক—সব হুবহু একরকম। তোমার মায়ের কাছে ঠিক একই রকম চিঠি এসেছিল।" মিসেস ইনুইয়ের গলায় দুটো স্কার্ফ, সামনে শক্ত করে বাঁধা। কথা বলতে বলতে চোখের পাপড়ি কাঁপছিল।
"অস্বীকার করতে পারতেন না?" জিজ্ঞেস করলাম।
"করলে জোর করে নিয়ে যাবে," প্রফেসর ইনুই দ্বিধা না করে বললেন। "সহযোগিতা না করলে শিকার হতে হয়। পরিবারকেও ছাড়বে বলে মনে হয় না। একবার ধরে নিলে কোথায় নিয়ে যায় জানি না। জেল? শ্রমশিবির? ফাঁসি? তবে ভালো জায়গা নয় সেটা নিশ্চিত।"
"তাহলে গবেষণা কেন্দ্রে যাবেন?"
"না," প্রফেসর বললেন, স্ত্রীও একসাথে মাথা নাড়লেন। "আমরা নিরাপদ আস্তানায় যাচ্ছি।"
"নিরাপদ আস্তানা," আস্তে বললাম—মনে হলো এই কথাটা আগেও শুনেছি।
"যারা এটা চালায় তাদের সাথে যোগাযোগ হয়েছে, লুকিয়ে রাখতে রাজি হয়েছে। এখনই সেখানে যাচ্ছি।"
"কিন্তু কাজ, পুরো জীবন সব ছেড়ে দিতে হবে। তাদের কথা মেনে নেওয়াই কি ভালো না? ছেলেমেয়েরা এখনো এত ছোট।"
"গবেষণা কেন্দ্রে আটকে থেকে নিরাপদ থাকব এটা নিশ্চিত নয়। শেষ পর্যন্ত মেমোরি পুলিশের হাতে পড়তে হবে। তাদের বিশ্বাস নেই। কাজ শেষ হয়ে গেলে গোপনীয়তা রক্ষার জন্য যা করা দরকার তারা তাই করবে।"
ছেলেমেয়েরা যেন ভয় না পায়—প্রফেসর সাবধানে শব্দ বেছে কথা বলছিলেন। তারা চুপচাপ ভালোভাবে বসে আছে। ছেলেটা একটা সাদামাটা পাথর নিয়ে খেলছে। তার ভেতরে যেন কোনো জটিল কৌশল লুকানো আছে। তার হাতে হালকা নীল রঙের সাধারণ গ্লাভস—হাতে বোনা স্পষ্ট বোঝা যায়। যেন হারিয়ে না যায় সেজন্য দুটো গ্লাভস একসাথে সুতো দিয়ে জোড়া। আমিও ছোটবেলায় এরকম পরতাম মনে পড়ল। উদ্বেগে ভরা এই বেসমেন্টে ওই গ্লাভস দুটোই যেন নিষ্পাপতা আর শান্তির একমাত্র চিহ্ন।
"আর আমরা মেমোরি পুলিশকে সাহায্য করতে চাই না," মিসেস ইনুই যোগ করলেন।
"কিন্তু লুকিয়ে থেকে চলবে কীভাবে? টাকা, খাবার, ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা? কেউ অসুস্থ হলে? কী হবে তাদের?"
এখনো অনেক কিছু বুঝতে পারছি না। জিনগত কোড, পাঠোদ্ধার, গবেষণা কেন্দ্র, নিরাপদ আস্তানা, সহায়তাকারীরা... এই শব্দগুলো এখনো ঠিকমতো বোঝা হয়ন। শব্দগুলো মাথার মধ্যে অনবরত ঘুরছে।
"আমরাও ঠিক জানি না," মিসেস ইনুইয়ের চোখে জল এলো। বুঝলাম তিনি আসলে কাঁদছেন না। বুঝলাম তিনি এতটাই দুঃখী যে কান্না আসছে না— খের জল শুধু নিজে নিজে বেরিয়ে আসছে।
" হঠাৎ এত সব হয়ে গেল," তিনি বলতে লাগলেন। "সময়ই পেলাম না। কী নেব, কী ফেলে যাব ভাবতে পারিনি। কী হবে জানি না, তাই শুধু সবচেয়ে জরুরি সিদ্ধান্তগুলো নিতে পেরেছি। চেকবই নেব? নাকি নগদ টাকা? কোন পোশাক নেব? খাবার লাগবে?—আমাদের বিড়াল মিজোরেকে ফেলে যাব?"
চোখের জল এখন অবিরাম গাল বেয়ে নামছে। মেয়ে পকেট থেকে রুমাল বের করল।
"আরেকটা সিদ্ধান্তও নিতে হয়েছিল," প্রফেসর বললেন। "তোমার মায়ের দেওয়া ভাস্কর্যগুলো নিয়ে কী করব। আমরা উধাও হয়ে গেলে মেমোরি পুলিশ বাড়ি তল্লাশি করবে। অনেক কিছু নষ্ট করে দিতে পারে। তাই অন্তত সবচেয়ে প্রিয় কিছু জিনিস বাঁচাতে চেয়েছিলাম—তবে এটাও বিপজ্জনক হতে পারে। গোপন কথা ফাঁস হয়ে যেতে পারে। নিরাপদ আস্তানার কথা যত কম মানুষ জানবে ততই ভালো।"
মাথা নাড়লাম।
"অনেক বড় আবদার জানি, কিন্তু তোমার মায়ের দেওয়া এই কাজগুলো তুমি রাখবে? যতদিন না আবার দেখা হয় ততদিন পর্যন্ত রাখবে।"
কথা শেষ হতেই মেয়ে পায়ের কাছের ব্যাগে হাত দিল এমন ভাবে যেন আগে থেকে মহড়া দিয়ে রেখেছিল। সে পাঁচটা ছোট ভাস্কর্য বের করে টেবিলে সারি করে সাজিয়ে রাখল।
"বিয়ের উপহার হিসেবে তোমার মা এই তাপির বানিয়ে দিয়েছিলেন। এটা দিয়েছিলেন মেয়ে জন্মানোর সময়, আর বাকি তিনটা মেমোরি পুলিশের সাথে যাওয়ার আগের দিন।"
মা কখনো তাপির দেখেননি, তবু তাপিরের ভাস্কর্য করতে ভালোবাসতেন। মেয়ের জন্মের উপহার ছিল ওক কাঠে কাটা বড় চোখের একটা পুতুল। আমারও একটা ছিল ঠিক এরকম। কিন্তু বাকি তিনটা আলাদা। কাঠ আর ধাতুর টুকরো মিলিয়ে বানানো বিমূর্ত-- ধাঁধার মতো জিনিস সেটা। হাতের মুঠোয় এঁটে যায়। বালি দিয়ে বানানো হয়নি। বার্নিশ না করা হয়নি। ভাস্কর্যটি স্পর্শ করলে খসখসে লাগে। মনে হয় তিনটা ভাস্কর্য একসাথে জোড়া দিয়ে একটা ভাস্কর্য বানানো হয়েছে। কিন্তু ঠিক কীভাবে বানানো হয়েছে সেটা কিন্তু ঠিক বোঝা যাচ্ছিল না।
"জানতামই না মায়ের যাওয়ার আগে এগুলো আপনাদের কাছে রেখে গিয়েছিলেন," বললাম।
"আর আমরাও জানতাম না এগুলো একদিন তোমার কাছে ফিরে আসবে। তবে সেই সময়ই মনে হয়েছিল তিনি হয়তো এরকম কিছু একটা ভেবেই রেখেছিলেন। শেষের দিনগুলোতে প্রায় সারাক্ষণ এখানে কাজ করতেন, হয়তো ভাবছিলেন আর কতদিন ভাস্কর্য করতে পারবেন। দেওয়ার সময় বলেছিলেন স্টুডিওতে ফেলে রাখার কোনো মানে নেই।"
"এখন এগুলো তোমার কাছে রেখে যেতে চাই," মিসেস ইনুই রুমাল ভাঁজ করতে করতে বললেন।
"এতদিন এত যত্নে রেখেছেন, আমি কৃতজ্ঞ। রাখতে পেরে খুশি হব।"
"ধন্যবাদ," প্রফেসর স্বস্তির হাসি দিলেন। "অন্তত এগুলো ওদের হাতে পড়বে না।"
............
ভোর হওয়ার আগেই যেতে হবে, তাড়া আছে — বুঝতে পারছিলাম। তবু যা পারি করতে চাইলাম।
উপরে রান্নাঘরে গিয়ে দুধ গরম করে মগে ঢাললাম। বেসমেন্টে নিয়ে এলাম, যেন চিয়ার্স করব, কিন্তু মগ ঠোকাঠুকির শব্দও যেন না হয় সেজন্য সতর্ক থাকলাম। মাঝে মাঝে কেউ মুখ তুলছে, মনে হতো কিছু বলবে, কিন্তু কথা বেরলো না — চুপচাপ চুমুক দিলাম।
একা একটা বাল্বে ধুলোর আস্তরণ, ফ্যাকাশে আলোয় বেসমেন্টের দৃশ্যটা জলরঙের ছবির মতো দেখাচ্ছিল। মায়ের ফেলে যাওয়া জিনিসগুলো আঁধারে চুপ করে পড়ে আছে—অর্ধেক শেষ পাথরের ভাস্কর্য, হলদেটে স্কেচবুক, শুকনো শান পাথর, ভাঙা ক্যামেরা, প্যাস্টেলের বাক্স—চব্বিশটা রঙ। একটু নড়লেই চেয়ার মেঝেতে ক্যাঁচ ক্যাঁচ করে। জানালার বাইরে আকাশ ঘুটঘুটে কালো, চাঁদের চিহ্ন নেই।
কেউ কথা বলছে না দেখে অবাক হয়ে ছোট ছেলেটা বোধহয় একে একে সবার মুখের দিকে তাকাল। মুখের চারপাশে সাদা রিং। "খুব ভালো," বলল।
"হ্যাঁ," কেউ একজন আস্তে বলল, আমরা একে অপরের দিকে মাথা নাড়লাম। তাদের জন্য কী অপেক্ষা করছে কল্পনা করতে পারছিলাম না, কিন্তু এই মুহূর্তে অন্তত গরম ভালো দুধ পাচ্ছে।
"কোথায় থাকবেন?" সবচেয়ে যে প্রশ্নটা মাথায় ছিল সেটা করলাম। "হয়তো কিছু সাহায্য করতে পারতাম—দরকারি জিনিস পৌঁছে দেওয়া, বাইরের খবর জানানো—এরকম কিছু।" ইনুইরা একে অপরের দিকে তাকালেন, তারপর চোখ মগের দিকে নামিয়ে নিলেন। একটু পরে প্রফেসর বললেন।
"তোমার উদ্বেগ দেখে সত্যিই ভালো লাগছে, কিন্তু নিরাপদ আস্তানার কথা না জানাই ভালো। তুমি কিছু ফাঁস করে দেবে এই ভয় নেই—থাকলে ভাস্কর্যগুলোই আনতাম না। কিন্তু তোমাকে আর বিপদে ফেলতে চাই না। যত বেশি জানবে তত বেশি বিপদ। না জানলে জোর করে বলাতে পারবে না, কিন্তু জানলে যেকোনো উপায়ে বের করার চেষ্টা করবে। তাই অনুরোধ করছি, নিরাপদ আস্তানার কথা জিজ্ঞেস করো না।"
"বুঝলাম। এ পর্যন্তই থাকুক। কোথায় আছেন জানব না, কিন্তু নিরাপদ থাকুন এই প্রার্থনা করব। যাওয়ার আগে আর কিছু করতে পারি?" খালি মগ চেপে ধরে তাদের দিকে তাকালাম।
"নখ কাটার কাঁচি পাবে?" মিসেস ইনুই আস্তে বললেন। "ওর নখ অনেক বড় হয়ে গেছে।" ছেলের হাত নিজের হাতে নিলেন।
"অবশ্যই," বলে দেরাজের পেছনে খুঁজে কাঁচি বের করলাম। ছেলেকে গ্লাভস খুলতে সাহায্য করলাম। "একটু স্থির থাকো। এক সেকেন্ডে শেষ।" আঙুলগুলো সরু আর মসৃণ, একটাও ফ্রেকেল বা তিল নেই। সামনে উবু হয়ে বসে আস্তে হাত ধরলাম। চোখে চোখ পড়তে লাজুক হেসে দিল। চেয়ার থেকে ঝুলে পড়া পা দুটো দুলছে।
বাঁ হাতের কনিষ্ঠ আঙুল থেকে শুরু করে সাবধানে নখ কাটলাম। নখগুলো নরম আর স্বচ্ছ, সামান্য চাপেই আলাদা হয়ে ফুলের পাপড়ির মতো মেঝেয় ঝরে পড়ছে। কাঁচির শান্ত খটখট শব্দ শুনলাম, সেই শব্দ রাতের গভীরে এই মুহূর্তটাকে যেন মুদ্রিত করে দিচ্ছিল।
শেষ হলে টেবিলে আকাশনীল গ্লাভস দুটো অপেক্ষা করছিল।
এভাবেই ইনুই পরিবার উধাও হয়ে গেল। ·
অনুবাদক পরিচিতি : তনুশ্রী বিশ্বাস। পড়াশোনা : ইংরেজি সাহিত্য। পেশা : সাংবাদিকতা।


0 মন্তব্যসমূহ