রাহেল রাজিবের প্রবন্ধ : প্রদোষে প্রাকৃতজনে ইতিহাসের অনুপাঠ


শওকত আলী বাংলাদেশের সাহিত্যে একটি অনুপেক্ষণীয় স্বতন্ত্র স্বরের উচ্চারণ। কথাসাহিত্যিক হিসেবে শওকত আলী প্রকৃতিঘেষা জীবনবৃত্তের রূপায়ণেই সর্বদা সচেষ্ট থেকেছেন, উত্তরবঙ্গের মাটি ও মানুষের আবেগময় অনুভূতির অন্তর্কথনকে অকপটভাবে তুলে আনেন। এছাড়া সমাজ সমকালের প্রেক্ষাপটের মানুষেরা তাঁর সাহিত্যে বিচরণ করলেও প্রদোষে প্রাকৃতজনে এর ব্যতিক্রমতা বিদ্যমান।

বাংলা গদ্যচর্চার শুরুই হয় ইতিহাসকে আশ্রয় করে; বাংলা গদ্যের উন্মেষকালে নকশা ও নকশাধর্মী গদ্য ইতিহাসকে আশ্রয় করেই লেখা। ঐতিহাসিক উপন্যাস রচনায় ভূদেব মুখোপাধ্যায়, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রমেশচন্দ্র দত্ত—এই ত্রয়ী নামের উচ্চারণ সমানভাবে করতে হয়, ভূদেব মুখোপাধ্যায়ের অঙ্গুরীয় বিনিময় সহ অধিকাংশ উপন্যাসের প্রধান উপাদান কাহিনি ঘটনা ও চরিত্র ইতিহাস আশ্রয়ী। বঙ্কিমের অধিকাংশ উপন্যাসই ইতিহাসকেন্দ্রিক এবং রমেশচন্দ্র দত্তের প্রধান পরিচয়ই ঐতিহাসিক ঔপন্যাসিক হিসেবে। বহুমাত্রিক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রথম দিকের উপন্যাসগুলি বঙ্কিম প্রভাবিত ও ইতিহাস আশ্রিত এবং অপেক্ষাকৃত পরের গোরা, ঘরে-বাইরে’র অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গই ইতিহাস সংশ্লিষ্ট। তিরিশ ও তিরিশ পরবর্তী ঔপন্যাসিকগণ ঐতিহাসিক উপন্যাস না লিখলেও ইতিহাসের উপাদান ব্যবহার করেছেন সহজাত প্রবণতা থেকে এবং এই ধারা অদ্যাবধি বহমান।

শওকত আলী সামাজিক কমিটমেন্টে দায়বদ্ধ থেকেছেন, লেখক হিসেবে নিজের দায়বদ্ধতাকে স্বীকার করেছেন বারবার, তাঁর লেখার মধ্যে গভীর মনোযোগ ও প্রাজ্ঞতার পরিচয় পাওয়া যায়, যা সহজাত ও স্বতঃস্ফূর্ত। লেখক শিবিরের সাথে সংশ্লিষ্টতার প্রভাব তাঁর লেখায় চোখে পড়ে না, যতটা পড়ে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, বদরুদ্দিন উমরের লেখায়। প্রদোষে প্রাকৃতজন বাংলাদেশের উপন্যাসে একটি অনন্য শিল্পিত সংযোজন। এই উপন্যাসটি একটি সময়কে ধারণ করে লেখা; দ্বাদশ শতাব্দীর শেষভাগ ও ত্রয়োদশ শতাব্দীর সম্মুখভাগ, যা বাংলায় মুসলমানের আগমনের সময়কাল হিসেবে চিহ্নিত এবং এখানে চরিত্রের প্রেক্ষাপটে কাহিনি বিবৃত হয়নি বরং কাহিনির চলমানতায় চরিত্র এসেছে, পরিবেশ-প্রতিবেশ দ্বারা চরিত্রের মানস নির্মিত হয়েছে। সামাজিক ও রাজনৈতিক আবহে খণ্ড খণ্ড অনেকগুলি ঘটনা, একটি পরিবার, একটি সময় এসেছে সামষ্টিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে। চরিত্রের প্রাধান্য দানকে কখনোই প্রধানরূপে প্রতীয়মান হয়েছে বলে মনে হয় না, বরং চরিত্রের দ্বারা ঘটনা কাহিনির কেন্দ্রে নির্দিষ্ট থেকেছে। চরিত্রের অখণ্ডতা ও কাহিনির আদি-মধ্য-অন্ত লয়ের মধ্যে বিকশিত নয়, বরং খণ্ডতার সমন্বয়ে পূর্ণাঙ্গ রূপের নির্মাণ প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। ইতিহাসের সাথে সম্পর্কযুক্ত করে কাহিনি ঘটনা চরিত্রের পরিপূরকতা উপস্থিত। উপন্যাসটিতে সেই সময়ের জনসাধারণের চরম অসহায়ত্বের চিত্র সফলভাবে পাওয়া যায়।

সমাজবদ্ধ মানুষের অতীত-আশ্রয়ী ও তথ্যনিষ্ঠ জীবনব্যাখ্যাই ইতিহাস। ঐতিহাসিক উপন্যাস হিসেবে প্রদোষে প্রাকৃতজন নন্দিত এবং ইতিহাসের উপাদান থাকায় এই বিশেষণের ব্যবহার হওয়াটাও স্বাভাবিক। ইতিহাস সর্বদা অতীত আশ্রিত এবং তথ্যসমৃদ্ধ; ফলে মানুষের জীবনবৃত্তের কথকথাপূর্ণ প্রামাণ্য জীবনালেখ্যকে ঐতিহাসিক উপন্যাস হিসেবে দাবি করা যেতেই পারে। প্রদোষে প্রাকৃতজনে ইতিহাসের একটি সময়কে ধারণ করা হয়েছে; ইতিহাস সংশ্লিষ্ট সম্ভাব্য উপাদান ব্যবহৃত হয়েছে এবং তা ঔপন্যাসিকের কল্পনার মিশ্রণে, ফলে তত্ত্বগত বিশ্লেষণের শতভাগ শর্ত পূরণ করতে না পারলেও ঐতিহাসিক উপন্যাস হিসেবে এর আবেদন এতটুকু কমে না। কেননা অতীত আশ্রয়ী জীবনের সফল রূপায়ণের প্রাণান্ত প্রচেষ্টা কাহিনি ও ঘটনায় বিদ্যমান। এছাড়া সময়ের প্রেক্ষাপটে কাহিনি ও ঘটনা অনুষঙ্গে ভাষা বিনির্মাণের সচেতন ও শিল্পিত প্রয়াস উপন্যাসের রচনাশৈলীতে অনেক বড় ভূমিকা রেখেছে যার পেছনে কাজ করেছে ইতিহাস সংশ্লিষ্টতা।

কাহিনির আবর্তনে মৃৎশিল্পী শ্যামাঙ্গের শিল্পভাবনার সাথে গুরু বসুদেবের বিরোধ ও বিদ্রোহ এবং শ্যামাঙ্গের গুরুত্যাগের মধ্যে দিয়ে চরিত্রের যাত্রা শুরু। বিল্বগ্রামত্যাগী শ্যামাঙ্গের লক্ষ্য নিজগ্রাম রজতপটে যাত্রা, কিন্তু পথিমধ্যে প্রণয়ভাবনার উন্মেষ তাকে শেষ পর্যন্ত গৃহে ফিরতে দেয় না এবং এক্ষেত্রে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনও অনেকাংশে দায়ী। শওকত আলী যে প্রদোষকালের কথা বর্ণনা করেছেন তার পুরোটা সময় জুড়ে আছে অস্থিরতা, সামন্তশ্রেণির শোষণের দৌরাত্ম, মুসলমানের আগমন, বৌদ্ধ ভিক্ষুদের উপস্থিতি, যা রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের বাইরে থাকা সাধারণ মানুষদের স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে দেয় নি। শ্যামাঙ্গ মায়াবতীদের গৃহের আতিথেয়তায় মুগ্ধ এবং প্রথম দর্শনেই লীলাবতীর প্রণয়াসক্ত হয়ে পড়ে, (লীলাবতী আর্যধর্মের তথা হিন্দু ধর্মের অনুসারী, বিবাহিতা হবার কারণে তার সিঁথিতে সিঁদুর ও হাতে শাঁখা থাকার কথা । তাই যদি থাকে তাহলে শ্যামাঙ্গ জেনে শুনে পরকীয়া প্রণয়ে আসক্ত হয় এবং লীলাবতীরও এতে সায় থাকে, যা সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে স্বাভাবিকভাবে ঘটার কথা নয়।) যা থেকে সে বেড়িয়ে আসতে পারে না। নবগ্রাম থেকে তাকে ফিরে আসতে বাধ্য করে অদম্য প্রণয়ই। কিন্তু লক্ষণ সেনের সামন্ত প্রভূরা উজবুট গ্রাম তছনছ করে; গৃহে আগুন দিয়ে, হত্যা করে বিভীষিকাময় পরিস্থিতি তৈরি করে পুরো গ্রামবাসীদের গৃহচ্যুত করে। লীলাবতীর বাবার মৃত্যু তাকে আরো অসহায় ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে, মামার উপদেশ ও শ্যামাঙ্গের প্রতি তার অনুরক্ততার দ্বন্দ্ব তাকে দোলাচলে ফেলে, সময়ের অস্থিরতার কারণে প্রেমিককে স্বাভাবিকতায় গ্রহণ করতে পারে না। অন্যদিকে শ্যামাঙ্গ লীলাবতীর আকর্ষণে উজবুটে ফেরে গৃহহীনার সঙ্গীও হয়, কিন্তু পারস্পরিক মানসিক দূরত্ব তাদের দূরে ঠেলে দেয়। লীলাবতী আশ্রয়ের নিরাপত্তা খোঁজে এবং এজন্য সে ধর্মত্যাগ করতেও প্রস্তুত, শ্যামাঙ্গ ধর্মের বেড়াজাল ছিড়ে বেরোতে চায় না। যদিও তার শিল্পীসত্ত্বা মানবিকতাকেই গ্রহণ করে বিকশিত হয়েছে, বিল্বগ্রামে চিত্রফলক নির্মাণে মানবীয় অবয়ব দান তারই প্রমাণ—“রামায়ণ কাহিনির চিত্রমালা পরিস্ফুটনের দায়িত্ব ছিল তার উপর। জানকীর বরমাল্যদান, রামের বনগমন, হনুমানের গন্ধমাদন বহন ইত্যাদি নানান প্রসঙ্গ সে মৃৎফলকগুলিতে উৎকীর্ণ করেছিলো। এবং ঐসব ফলকের সঙ্গে সঙ্গে আরও ক’টি মানবী মূর্তির ফলকও ছিলো। প্রেমিকের কণ্ঠলগ্না ব্যাধ তরুণীর প্রণয়দৃশ্য ছিলো একটি, একটি ছিলো শবর যুবতীর প্রতীক্ষার দৃশ্য আর ছিলো মাতৃময়ী ধীবর রমণীর সন্তানকে স্তন দানের দৃশ্য।”

রামায়ণের ঘটনার সাথে সম্পর্কযুক্ত করে শ্যামাঙ্গ মৃৎফলকগুলি তৈরি করেছিল এবং সেটার যথোপযুক্ত যুক্তিও সে গুরু বসুদেব দিয়েছিল। কিন্তু সুধীমিত্রের ব্রাহ্মণ্যকে অতিক্রম করে ধর্মের অনুষঙ্গ বহির্ভূত ফলক সংযুক্তিকে বসুদেব মেনে নিতে পারেননি।

শ্যামাঙ্গের সাথে সময়ের একটা সামঞ্জস্য খুঁজে পাওয়া যায়, কেননা তার সময়কাল এতটাই প্রদোষযুক্ত যে স্বাধীন শিল্পীসত্ত্বার বিকাশ সম্ভব হয় না, আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি তার এই শিল্পকর্মকে মূল্যায়ন করে না, গুরু বসুদেব শ্যামাঙ্গের ভাস্কর্য জ্ঞানের গভীরতাকে স্বীকৃতি দিতে পারে নি, এক্ষেত্রে অবশ্য শিষ্যের প্রতি ব্যক্তিক ঈর্ষাও কাজ করেছে।

শ্যামাঙ্গ স্বাধীনভাবে শিল্পচর্চা করতে চেয়েছে, ভাস্কর্য শিল্পের মৌলিকতাকে নিয়ে কাজ করতে চেয়েছে, বসুদেবের প্রতি তার গুরুভক্তির কমতি ছিল না, কিন্তু ব্রাহ্মণ নির্দেশিত আদেশ শুধু পালন করার মতো পরাধীন মানসিকতা শ্যামাঙ্গের ছিল না, তাই সে গুরুকে ত্যাগ করার মতো উদ্ধত্য দেখাতেও দ্বিধাবোধ করে না। শ্যামাঙ্গের এই স্বাধীনচেতনকে বাঙালির মজ্জাগত স্বভাব হিসেবে চিহ্নিত করা যেতে পারে, কেননা বাঙালি কখনো কারো অধীনে থাকতে চায় নি, যদিও আগ্রাসী শক্তির কাছে বারবার মাথা নোয়াতে হয়েছে, কিন্তু সুযোগ পেলেই স্বাধীনতা অর্জনের জন্য যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছে।

চিরন্তন বাঙালি রমণীর কাঠামোতে যোগমায়া চরিত্রটির বিকাশ, পুত্র হারানোর শোক তার মধ্যে সতত ক্রিয়াশীল; শ্যামাঙ্গের মধ্যে সন্তানের ছায়া খুঁজে ফেরেন, আবার কন্যার নিরাপত্তার কথাও ভাবেন সমানভাবে, কেননা গভীর রাত্রে মায়াবতী ও লীলাবতীর শ্যামাঙ্গের শয়নঘরে গমনে বিচলিত হওয়া তারই প্রমাণ। শুকদেব-যোগমায়ার আতিথেয়তা বাঙালির শাশ্বত অতিথিপরায়ণ মানসিকতাকে স্মরণ করিয়ে দেয়—“মৎস্যের ব্যঞ্জনই তিন প্রকার, ভর্জিত ইল্লিশখণ্ড, সন্তলিত চিতলপেটিকা এবং নবাম্রসহযোগে মৌরলা। অলাবুসহ মুগও ছিলো সঙ্গে। দেখা গেলো, একটি মাত্র পাত্রে মাংস-ব্যাঞ্জন। তবে তার প্রায়-রক্তিম তৈলাক্ত রূপ রসনাকে ব্যাকুল করার জন্য যথেষ্ট। এতদতিরিক্ত দধি খণ্ড-মিষ্টান্ন ইত্যাদি তো ছিলোই।”

উপরোক্ত খাদ্যতালিকার মধ্যে দিয়ে বাঙালির রসনা বিলাস যেমন জানা যায়, তেমনি অতিথিপরায়ণতার মানসিকতাকেও অনুধাবন করা যায়।

প্রাথমিকভাবে প্রদোষকালের আভাস মেলে উজবুটের প্রৌঢ়দের সাংসারিক কথনে, শ্যামাঙ্গে সাংসারিক অজ্ঞতা তাদেরকে স্পর্শ করে না, জানানোর কৌতূহলে শ্যামাঙ্গ শুকদেব ও তার শ্যালক দীনদাসকে সাংসারিক প্রসঙ্গে যেসব তথ্য জানায় তার মধ্যে দিয়ে সেই সময়ের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশ সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভ করা যায়—“তণ্ডুল বর্তমানে অধিক সুলভ নয়, গোধূম কদাচিৎ পাওয়া যায়—বস্ত্রাদি ক্রমেই মহার্ঘ হয়ে উঠছে, তৈজসাদির জন্য দক্ষিণের নৌযানগুলি আর আত্রেয়ী করতোয়া সঙ্গম পর্যন্ত আসছে না, রাজপুরুষদের হাতে প্রায়ই মানুষ অহেতুক লাঞ্ছিত হয়—এই সকল সংবাদ সে প্রৌঢ় দুটিকে জানাতে পারলো।”

লীলাবতীর স্বামী অভিমন্যুর মহাসামন্ত হরিসেনের সামন্তবাহিনীতে যোগদানের খবর ও উজবুটে সামন্ত সেনাদের অতর্কিত আক্রমণে ঘর সংসার হারানো লীলাবতীর জীবনে নির্ভরতা ও প্রণয়বার্তা নিয়ে শ্যামাঙ্গর পাশেই উপস্থিতি, বাসর রাতের অভিজ্ঞতা ও অভিমন্যুর বিকৃত মানসিকতা লীলাবতীকে শ্যামাঙ্গের প্রতি অনুরক্ত হতে সহায়তা করেছিল, যা সময়োচিত। কিন্তু সময়ের সাথে লীলাবতী তাল মেলাতে চায়, পারেও, শ্যামাঙ্গ তা পারে না বলেই তাদের মানসিক দূরত্ব বাড়ে।

গৌড়বঙ্গের রাজধানী লক্ষ্মণাবতীতে মহামহিম পরম ভট্টারক শ্রী লক্ষণ সেন শাসকের আসনে আসীন, রাজকার্যে মনোযোগহীনতা, সামন্তপ্রভূদের দৌরাত্মে শুদ্রশ্রেণির জীবন ওষ্ঠাগত প্রায়, ব্রাহ্মণ, কায়স্থ, বৈশ্যরা সুখে দিনাতিপাত করলেও শুদ্রের জীবনে নেই কোন নিরাপত্তা, অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান। নিম্নবিত্তের যুগযন্ত্রণা কখনোই প্রশমিত হয়নি। বাংলায় মুসলমানদের আগমন এবং ইসলাম ধর্মের সাম্যবাদ নিম্নবিত্ত হিন্দু সমাজের মুক্তির উপায় হিসেবে বিবেচিত হতে থাকে। ফলে এই সময়ের সমাজপতিরা সর্বদা সতর্ক থাকত, এছাড়া বৌদ্ধ ভিক্ষুদের সংঘটিত হওয়ার কারণে সামন্তশ্রেণিসহ লক্ষণ সেন পর্যন্ত উদ্বিগ্ন ছিলেন।

শওকত আলী লক্ষণ সেনের শাসক হিসেবে দুর্বলতার দিকটি উন্মোচন করেছেন, বৌদ্ধ ভিক্ষুদের সংঘটিত হবার কথাও বলেছেন, বৌদ্ধরা গোষ্ঠীবদ্ধভাবে গণতান্ত্রিক উপায়ে একটা লক্ষ্যের দিকে ধাবিত হয়েছিল এটার আভাস উপন্যাসে থাকলেও মুসলমানদের কোন পরিকল্পনার কথা জানা যায় না। মুসলমানরা কোন পরিকল্পনায় এগোচ্ছে তার কোন সুস্পষ্ট তথ্য এতে দেওয়া নেই। মুসলমানরা ব্যবসার প্রয়োজনে বাংলায় আসছে, তাদের ধর্মযাজকরা ধর্ম প্রচার করছে, কালেমা পড়ে মুসলমান হয়ে নিম্নবিত্তরা লক্ষণ সেন ও সমাজের উঁচু শ্রেণিসহ ব্রাহ্মণ্যধর্মের জাতিভেদের করাল গ্রাস থেকে মুক্তির পথ খুঁজে ফেরে।

সেই সময়ে সামন্ত শ্রেণির অত্যাচার এতটাই বৃদ্ধি পেয়েছিল যে সাধারণের মধ্যে সর্বদা আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা থাকত। পিপ্পলী হাটের ঘটনার বিভৎসতা এবং এর বিস্তার পুরো উপন্যাস জুড়ে থাকে। বসন্তদাসের হঠাৎ শ্বশুরবাড়িতে আগমন দীনদাসকে বিচলিত করেছিল; এর কারণ সদ্ধর্মী ভিক্ষুদের সাথে বসন্তদাসের সম্পর্ক। পিপ্পলী হাটের ডোমনীদের প্রতিবাদমুখরতা তাদের অন্ত্যজ জীবনবৃত্তে সহজাত প্রবৃত্তির অংশ, যার ফল ভোগ করে ব্রজসেন। ব্রজসেনের মৃত্যুর প্রতিক্রিয়া ভয়ংকর হয়। মহাসামন্ত হরিসেন কুসুম ডোমনীসহ ভিক্ষু চেতনানন্দকে আগুনে পুড়ে মারে, কুসুমের দুই সন্তানকে খড়াঘাতে নিহত করে, কুসুমকে স্বৈরিণী ঘোষণা করে যে পরিণাম দেওয়া হয় তা বর্বর পাশবিক অমানবিক—“সর্বসমক্ষে কুসুমকে নির্বস্ত্রা করে তার যোনিদেশে একটি উত্তপ্ত লৌহদণ্ড প্রবেশ করিয়ে দেয়া হলো। মৃত্যুর পূর্বেকার চিৎকার, বাঁচবার জন্য আকুলি বিকুলি, ঈশ্বরের নাম উচ্চারণ—সবই কুসুম করেছিল। কিন্তু সবই তখন দেখাচ্ছিলো জীবনের সঙ্গে সম্পর্কবিহীন পুত্তলীর হস্তপদ সঞ্চালনের মতো। শস্ত্রধারী সৈনিকের দৃষ্টি হয়ে উঠেছিলো ভারী নিস্পৃহ।”

বসন্তদাস ভিক্ষুদের নিয়ে প্রতিরোধ করতে চায়, সহায় সম্বল সামন্তের কাছে হারিয়ে সে বেপরোয়া হয়ে ওঠে, নিজের অধিকারবোধ জেগে ওঠে, তাই মায়াবতীর মোহনীয় বাহুবন্ধনের মায়ায় সে বাঁধা পড়ে না, গভীর রাতে শয্যা ত্যাগ করে ভিক্ষুদের সাথে মিলিত হয়ে শলাপরামর্শ করে, দৃঢ়চেতা মানসিকতা মায়াবতী স্বামীর পরিকল্পনার কথা শুনে অজানা ভয়ে আতংকিত হয়—“পিপ্পলী হাটে যে ঘটনা ঘটেছে, সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে পারে বলে আশঙ্কা করি। আমি সেই ঘটনার বাধা দেবার চেষ্টা করছি। কীভাবে, সে প্রশ্ন করো না। শুধু আমাকে তুমি বিশ্বাস করো। সম্মুখের কাল বড় ভয়াবহ। আসন্ন ঐ দুর্যোগের কালে অবিশ্বাস ও সন্দেহের অনুপ্রবেশ ঘটলেই আমরা ধ্বংস হয়ে যাবো। বিশ্বাস আর ভালোবাসায় আমাদের সংহত এবং দৃঢ় হতে হবে।”

সাধারণ মানুষেরা নিপীড়ন ও নির্যাতনের স্বীকার হয়, প্রতিবাদের ভাষা তারা জানে না, নেতৃত্বের অভাবে তারা আন্দোলনে অংশ নিতে পারে না, মধ্যবিত্ত সুবিধাবাদী শ্রেণির সাংসারিক বন্ধনের মোহ তাকে প্রতিবাদী হতে দেয় না, ব্রাত্য-অন্ত্যজ শ্রেণির গোষ্ঠীগত নিয়মের শিথিলতা, জীবনবোধের স্বাতন্ত্র্য তাদের বিদ্রোহী হতে স্বতঃস্ফূর্ত উৎসাহ যোগায়। বসন্তদাস মিত্রানন্দের সাথে পরিভ্রমণের মধ্যে দিয়ে যে অভিজ্ঞতায় এই সারসত্য আবিষ্কার করে যে রাজশক্তির ব্যবহার প্রজা নিপীড়নেই হয়; নিয়ম, শৃঙ্খলা ও সুশাসনের জন্য যে সৈন্যবাহিনী তার নেতিবাচকতা ও শাসকের এই বিষয়ে নির্লিপ্ততাই দেশের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির জন্য দায়ী এবং জনসাধারণের প্রতিবাদহীনতা এই ধারাকে সচল রাখতে সহায়তা করে—“রাজশক্তি প্রজাপীড়ন ছাড়া অন্য কাজে কোথাও ব্যবহৃত হয় না। এই রাজশক্তি যে প্রকৃতপক্ষে দুর্বল, এ সত্য কেউ স্বীকার করে না। তারা শুধু মহারাজ লক্ষণ সেন দেবের হস্তীবাহিনী, অশ্ববাহিনী এবং পদাতিকের সংখ্যাটি দেখতে পায়, আর কিছু দেখতে পায় না।”

উজবুটের রক্তক্ষয়ী ঘটনার পরিণামে লীলাবতী ও মায়াবতীর পরিবার হারায় তাদের স্বজন সংসার; এদিকে শ্যামাঙ্গের লীলাবতী আসক্তি অবচেতন মনে এতটাই প্রচ্ছন্নতায় প্রকটিত হয় যে কুসুম্বী গ্রামে মনোহরদাসের গৃহে অবস্থানকালে তৈরি পুত্তলিরা লীলাবতীর অবয়ব প্রাপ্ত হয়ে শ্যামাঙ্গের মানসপটে বাস্তবতায় রূপ নিতে চায়, এই আকর্ষণ শ্যামাঙ্গ অস্বীকার করতে পারে না এবং লীলাবতীর সাথে তার আশ্রয় অন্বেষণে এই বিষয়গুলি স্পষ্টভাবে উঠে আসে।

সময় ও সমাজের ক্রান্তিকালের কথকথার দলিল প্রদোষে প্রাকৃতজন; শওকত আলী বাঙালি জাতির একটি সংকটকালকে উপস্থাপন করার প্রয়াসে কাহিনি ও ঘটনার আবর্তনে চরিত্রের সংস্থাপন করেছেন, লক্ষণ সেনের শাসনামলের অস্তাচলে এবং বাংলায় মুসলমান শাসকের আগমনে বাঙালির জনজীবনে যে ভয়াবহ নির্যাতন নিপীড়নের খড়গের আঘাত এসেছিল তা থেকে মুক্তি পায় নি আবালবৃদ্ধবণিতা, ফলে বেঁচে থাকার তাগিদে দিশেহারা মানুষের নেতৃত্বের অভাবে অসহায় জীবনযাপন করা ছাড়া কোন পথ খোলা ছিল না—“বরেন্দ্রভূমির জনপদগুলিতে তখন ঐভাবেই প্রাণ বধ হচ্ছে, গৃহ লুণ্ঠিত হচ্ছে, পল্লি প্রজ্বলিত হচ্ছে। রাজধানী লক্ষণাবতীতে পরম ভট্টারক মহারাজ শ্রীমৎ লক্ষণ সেন দেব সিংহাসনে সগৌরবে আসীন হলেও তাঁর মহাসামন্ত ও সামন্তবর্গ প্রজাপালনের কোনো কাজ করে না। বরঞ্চ তারা বিলাসব্যসন ও প্রজাপীড়নে অধিক মত্ত। ওদিকে যবন জাতির হাতে মহাকালের ডমরুতে অনাহত ধ্বনি বেজে উঠেছে। কেউ জানে না, ভবিষ্যতে কী আছে। বড় ধূসর ঐ প্রদোষকাল!”

এই উপন্যাসের চরিত্ররা সময়ের প্রয়োজনে আসলেও অশ্ববিক্রেতা যবন বৃদ্ধটির চরিত্রের বিকাশ ও বসন্তদাসের চরিত্রে প্রভাব বিস্তারে শওকত আলীর পক্ষপাতদুষ্টতার প্রমাণ মেলে। কেননা বসন্তদাসের সাথে বৃদ্ধের পরিচয় ও সম্পর্কের গভীরতাকে লেখক বড় মমতা দিয়ে তুলে ধরেছেন। বৃদ্ধের বিসূচিকা রোগে আক্রান্ত হলেও বসন্তদাস তাকে সেবা করতে যায় এবং তাতে মৃত্যুর ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও সে এই কাজ করে। বৃদ্ধের মৃত্যু হলে তার মৃতদেহ ফেলে রেখেও যেতে পারে না, তাকে সমাধিস্ত করেই সে পুনরায় যাত্রা করে; এই ঘটনার মধ্যে দিয়ে বসন্তদাসের মানবিকতাবোধ চরমভাবে প্রকাশিত হয় এবং রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আভাস এই যবনের মুখেই বসন্তদাস প্রথম শোনে; মাত্র দু-তিন দিনের সম্পর্কের ব্যপ্তিতে যবন বৃদ্ধের সাথে আলাপন ও জীবনদর্শনের গূঢ় রহস্য অনুধাবন করতে বসন্তদাসের মানসগঠনের অনেক বড় পরিবর্তন সাধিত হয়, যাকে সে লালন করে—“বসন্তদাস দু’তিনটি দিন মাত্র বৃদ্ধের ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্য লাভ করে। কিন্তু ঐ দু’তিন দিনেই বৃদ্ধ তার কাছে বহু কথা বলেছেন। পশ্চিম দেশে নাকি এক শ্রেণির শস্ত্রধারী যবনের আবির্ভাব হয়েছে যাদের নাম তুরুক। ঐ যবনেরা একের পর এক রাজ্য জয় করছে। তারা যেমন নিষ্ঠুর, তেমনই নাকি বর্বর। ধ্বংস ও লুণ্ঠন ব্যতীত তারা অন্য কিছু বোঝে না। আবার এও অদ্ভূত কথা যে যবন বণিকদের ধর্ম ও তুরুকদের ধর্ম এক হওয়া সত্ত্বেও উভয়ের মধ্যে সদ্ভাব নেই—বরং শত্রুতা ভাবই পোষণ করে গোপনে গোপনে Ñ এইরূপ নানান কথা বৃদ্ধের। তবে এই সকল কথার মধ্য দিয়ে বসন্তদাস ভিন্নতর জগতের সন্ধান পাচ্ছিলো। যেমন, সমস্ত কিছুই ললাটলিপি ন—রাজা রাজপুরুষ কেউ অজেয় নয়। রাজার বিরুদ্ধে প্রজা দ্রোহ উত্থাপন করতে পারে এবং ক্ষেত্রবিশেষে সফলও হতে হয়।”


এই যবন বৃদ্ধের মাধ্যমেই লেখক তুর্কিদের সম্পর্কে তথ্য দেন এবং তার সংক্ষিপ্ত সাহচর্যই বসন্তদাসের রাজনৈতিক মানস গঠন ও সমাজ সংস্কার সম্পর্কে সচেতন করে তোলে, যা উপন্যাসের ঘটনাবিস্তারে অন্যতম ভূমিকা রাখে—“ছুৎমার্গ একেবারেই অহেতুক। স্পর্শ মাত্রই খাদ্যবস্তু নষ্ট হয় না। যে মনে করে হয়, সে মূর্খ। চণ্ডাল ব্রাহ্মণভেদে জলের গুণাগুণের হ্রাসবৃদ্ধি হয় না—জল জলই থাকে। কেবল দেবতা সম্পর্কিত বিষয়ে সে বোঝেনি। প্রকৃত কথা এই যে, মেলায় অবস্থান এবং যবন বণিকের সান্নিধ্য বসন্তদাসের মনের মধ্যে একটি রূপান্তরের প্রক্রিয়া সৃষ্টি করে দেয়। বস্তুর আপাত অবয়বের পশ্চাতেও যে অন্য কিছু থাকতে পারে, সে বিষয়ে সে এখন সজাগ ও সচেতন।”

যবন বৃদ্ধের সঙ্গ বসন্তদাসের জাতিভেদ ও ধর্মবোধের মূলে নাড়া দেয়, পরবর্তীকালে এই ঘটনার বিস্তার তার রাজনৈতিক জীবনে প্রভাব রাখে। তবে সংক্ষিপ্ত সময়ের ব্যপ্তিতে যবন বৃদ্ধের চরিত্র সৃজনে লেখকের সচেতনতা লক্ষণীয়; মানবিকতা, বসন্তদাসের প্রতি সহজাত স্নেহ এবং তার সমাজসচেতন বক্তব্য সংক্ষিপ্ত চরিত্রের কাঠামোতে অনেকটা বেমানান।

মুসলমানদের আগমন, সদ্ধর্মী ভিক্ষুদের সংঘটিত হওয়া জাতি ধর্ম নির্বিশেষে নিপীড়িত মানুষের বলিষ্ঠ ক্ষোভের বহির্প্রকাশের অপেক্ষায় সমগ্র জাতি, এই তালিকার বাইরে শাসকরাও আছে, কেননা তাদের কৃতকর্মের পরিণাম যে ভয়ংকর কিছু হতে যাচ্ছে তার আভাস তারা পেয়ে যায় এবং শাসকদের এই তটস্থতা দেখে আশায় বুক বাঁধে প্রাকৃতজনেরা—“কিন্তু কেন এই অপেক্ষা? কেউ-ই জানে না কিসের অপেক্ষায় দিন গণনা করছে বরেন্দ্র-বঙ্গ-সমতটের জনপদগুলি। লোভ হিংসা প্রতিহিংসা প্রতারণা যুদ্ধ ধ্বংস প্রেম সমস্ত কিছু একাকার হয়ে অপেক্ষায় আছে সেই অনাগত প্রহরটির জন্য। রাজধানী লক্ষণাবতীতে গোবর্ধন আচার্য ও হলায়ুধ মিশ্রের মতো লোকেরা অপেক্ষায় আছেন—অপেক্ষায় আছেন উজবুট গ্রামের সোমজিৎ উপাধ্যায়—হরিসেনও সম্ভবত অপেক্ষা করছেন। অপেক্ষা বসন্তদাসের, লীলাবতীর, শ্যামাঙ্গের, ছায়াবতীর, শুকদেবের, মিত্রানন্দের। কার অপেক্ষা নয়? সকলেই উপলব্ধি করে, যে জীবন যাপিত হচ্ছে, সে জীবন থাকবে না—এই অস্থিরতার অবশ্যই অবসান হবে। কিন্তু সেই অবসান কিসে? মৃত্যুর হতাশায়? না নবীন জীবনের উন্মেষে? কেউ-ই বলতে পারে না।”

প্রদোষে প্রাকৃতজনের ভাষাশৈলী বিশ্লেষণে দেখা যায়; এর ভাষাকে স্থাপত্যধর্মী করার লক্ষ্যে তৎসম শব্দের আধিক্য অনেক ক্ষেত্রে অযাচিত মনে হয়; কিন্তু ঔপন্যাসিকের ভাষা বিনির্মাণের সচেতন প্রয়াস সেই সময়ের প্রেক্ষাপট সংশ্লিষ্ট করার একটা প্রবণতা লক্ষণীয়। তৎসম, অর্ধতৎসম, তদ্ভব, আঞ্চলিক ও স্থানবিশেষে কথ্যভাষার সম্মিলিত মিশ্রণ উপন্যাস পাঠের স্বাভাবিক গতিকে অনেকটা ব্যাহত করে।

ঘটনা প্রযুক্তকরণে দেখা যায়, লক্ষণ সেনের শাসনের শেষভাগের অস্থিতিশীল পরিবেশ, সামন্তশ্রেণির উত্থান, সদ্ধর্মী বৌদ্ধ ভিক্ষুদের সাথে হিন্দু সম্প্রদায়ের চরম বিরোধ এবং তুর্কীদের আগমনবার্তা ইতিহাস সংশ্লিষ্ট; অবশিষ্ট ঘটনা ঔপন্যাসিকের কল্পনাপ্রসূত শিল্পবয়ন।

ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে আশ্রয় করে এই উপন্যাসের কাহিনি ও ঘটনার বিস্তার ঘটলেও ঐতিহাসিক চরিত্র হিসেবে লক্ষণ সেনের রাজসভার কবি হলায়ুধ মিশ্রের উপস্থিতি ছাড়া আর কোন চরিত্রের সন্ধান পাওয়া যায় না। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য হলায়ুধ মিশ্র লক্ষণ সেনের প্রধানমন্ত্রী পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন এবং লক্ষণ সেনের পূর্বপুরুষরা শিবের উপাসক অর্থাৎ শৈব্য হলেও লক্ষণ সেন ছিলেন বিষ্ণুর উপাসক অর্থাৎ বৈষ্ণব । যদিও এই উপন্যাসে বৈষ্ণব ধর্মের উন্মেষের কথা থাকলেও বিস্তারণ নেই, লক্ষণ সেনের শরীরী উপস্থিতি নেই, কিন্তু তার পারিষদ বর্গের কথা আছে, সামন্ত ও মহাসামন্তদের উপস্থিতি আছে কিন্তু তাদের ঐতিহাসিক সত্যতার প্রমাণ মেলে না। 

শওকত আলী একটি বৃহৎ সময়কে ধারণ করার প্রয়াসে উপন্যাসে সময়কে ব্যবহার করেছেন, ঐ সময়ের ইতিহাস বা ইতিহাস সংশ্লিষ্ট কোন চরিত্রকে রূপায়ণের লক্ষ্যে তিনি সচেষ্ট থাকেননি। খণ্ড খণ্ড ভাবে ইতিহাসের উপাদান ব্যবহৃত হয়েছে; একটি পরিবারের কাহিনির আড়ালে ঐ সময়ের সমাজকে উপস্থাপন করার প্রয়াস লক্ষণীয়। বাংলায় মুসলমানদের আগমনের বার্তার মধ্যে দিয়ে যে আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের কথা লেখক বলতে চেয়েছেন এবং তা ইতিহাসের আলোকেই। ফলে ইতিহাসের কোন চরিত্রের সফল রূপায়ণ না থাকা সত্ত্বেও কাহিনি ও ঘটনার অনুষঙ্গে ইতিহাসের উপাদানের শিল্পসম্মত ব্যবহারের কারণে ঐতিহাসিক উপন্যাস হিসেবে প্রদোষে প্রাকৃতজনের বিশিষ্টতা অনুপেক্ষণীয়।

**********

লেখক পরিচিতি : রাহেল রাজিব কবি ও প্রাবন্ধিক। জন্মেছেন দিনাজপুরে। কবি হিসেবে আত্মপ্রকাশ শূন্য দশকে। পাশাপাশি লিখেছেন প্রবন্ধ। এছাড়া নিয়েছেন বেশকিছু মহার্ঘ্য সাক্ষাৎকার। বসবাস করছেন ঢাকায়। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগে অধ্যাপনা করছেন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ