বলেই আমাকে প্রচণ্ড জোরে আঁকড়ে ধরল। সে নিজেই। মনে হল যেন আমার একেকটি হাড় গুঁড়ো হয়ে যাচ্ছে। চুর চুর করে ঝরে পড়বে এখুনি। বালির মতো। নদীর জল এসে, স্রোত এসে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে মোহানার দিকে। মোহানা ছাড়িয়ে বিশাল বিস্তৃত গভীর সমুদ্রে। সমুদ্রের ভেতর লীন হতে হতে একটা ধ্বংসপ্রাপ্ত নগরীর মতো হয়ে উঠব আমি। একেকটা শান্ত অলিন্দে খেলা করবে ছোট ছোট মীনরাজি। সর্পিল গতিতে হেঁটে যাবে জলের লহরী। আমার দুকূল জুড়ে বিখ্যাত তীর্থস্থান।
আমি বুঝতে পারছি তার পুরুষালি হাত, গন্ধ আমার শরীরের মাংস আর হাড় একসঙ্গে মিশিয়ে একটা দলা পাকিয়ে তুলছে। আমার নিশ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে। শরীরের রক্তপ্রবাহ, কোষেদের জন্ম মৃত্যু সব কিছু নিস্তব্ধ হয়ে যাছে। অনন্তকাল ধরে। আর খানিকক্ষণ পরেই আমি তার শরীরের সঙ্গে মিশে যাব। এক হয়ে। একাত্মা!
কিন্তু এক হওয়া সহজ নয়। এটা আমি আমার সমাজ, পূর্বপুরুষ এবং প্রাচীন নক্ষত্রদের কাছ সম্পর্কে শিখেছিলাম। কখনও কোনও পুরুষ শুধু এক নারীর প্রতি আসক্ত থাকেনি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সে তার আকাঙ্খা, চাহিদা, প্রেম এমনকি নারীর শরীর বদলে ফেলতে চেয়েছে। আমি সব জানি, জানি এই প্রেম খানিকক্ষণের। কিছুক্ষণ পরে সে ক্লান্ত হয়ে পড়বে। দূরে সরে যাবে। তাও এই মুহূর্তে আমার শ্রেষ্ঠ প্রেমিক তাকেই মনে হচ্ছে। তাকে ছাড়া আমি কীভাবে জীবনকে দেখব, চিনব ইত্যাদি নানা আজগুবি ভাবনা আজকাল আমার মাথায় খেলে বেড়ায়। প্রেম আশ্চর্য এক জাদু, এর মায়াপাশ থেকে বেরোনো এত সোজা নয়।
এবং এই সত্যকে সত্য প্রমাণিত করে, এক হওয়ার আগেই সে আমাকে ছেড়ে দিল। এরকমভাবে খানিকক্ষণ জড়িয়ে থাকার পর, সে আস্তে আস্তে ঢিলে করতে লাগল বাঁধন। তীক্ষ্ণ, তীব্র বাঁধন খুলে গেলে শরীর যেমন টাল সামলাতে পারে না, এক্ষেত্রেও তাই হল। বন্ধনমুক্ত পাখির মতো আমি হতচকিত হয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলাম। আর আমার একেকটি হাড়, মাংস এই বন্ধন থেকে ছাড়া পেয়ে খুশি হল কী দুখী বোঝা গেল না! কিন্তু আমার হঠাৎ একলা লাগতে লাগল। এক বিরাট শূন্যতা! আবার সেই ফিরে যাওয়া এবং না যাওয়ার মধ্যিখানে বসে কান্না পেল খুব। আমার দু'চোখ নিয়ে লবণাক্ত জল বেরিয়ে আসতে লাগল। সেই পানির দু'একটি বুঁদ গড়িয়ে পড়ল তার বুকের ওপরে, যেখানে তার হৃদপিণ্ড মৃদুভাবে নেচে বেড়াচ্ছিল। চোখের গরম জলের স্বাদ আস্বাদনের জন্য তার আঙুল এগিয়ে এলো আমার চোখের কাছে। তর্জনীর একদম ডগায় সেই জলবিন্দু নিয়ে সে হালকা একটা ফুঁ দিল। শূন্যে হারিয়ে যাওয়া উচিত ছিল যে কান্নার, সে এসে পড়ল সাদা বিছানার চাদরে।
—কী হল...
সে জিজ্ঞেস করল। আমি নিজেকে দমন করতে না পেরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলাম। আমি চাইছিলাম না, সে আমার কান্না দেখুক, আমার দুঃখ দেখে দয়া করুক! বরং আমি আমার তীব্র অভিমান নিয়ে, আত্মমর্যাদা নিয়ে বাঁচতে চাইতাম প্রতিটি মুহূর্তে। তার সঙ্গে মিলনের আগে পর্যন্ত আমি নিজেকে একজন ব্যক্তিত্বময়ী, দীপ্তিময়ী এবং অহংকারপূর্ণ নারী রূপেই কল্পনা করতাম। কিন্তু মিলনের পর...
এসব ভাবনা আমাকে আরও দুর্বল করে তুলল। আমি কেঁদে উঠলাম জোরে। সেই কান্নার ভেতর আমার প্রতিটি অপরাধবোধ, চাওয়া, পাওয়া, যাবতীয় অপ্রাপ্তি সবকিছু ভেসে যেতে লাগল। সে চুপ। বরাবর যেমন থাকে। বরাবর যেমন নিস্পৃহ ভঙ্গিতে আমাকে গ্রহণ করে, তেমনি আমার চলে যাওয়াটাও তার কাছে বিরাট কিছু শূন্যতা নিয়ে আসে বলে কখনও মনে হয় নি আমার। আমি বুঝি, কিন্তু চুপ থাকি...
আমার ঘন কালো নিবিড় চুলের মধ্যে হাতের চারটি আঙুল নিয়ে গেল। এবং অতি ধীরে ধীরে খেলে বেড়াতে লাগল তারা। সে বাঁশি বাজানোর সময় যেমনটা করে, ঠিক সেভাবেই। আমি কান্নার ভেতর ডুবে যাওয়ার আগে, সে আরেকবার মৃদুস্বরে বলল, শোনো...একটা কথা...
দূরের মন্দিরে ঢং ঢং করে ঘণ্টা বাজছে। শব্দ ভেসে আসছে। আমার যাবতীয় অসন্তোষ, অপ্রাপ্তি এবং অসহায় কান্নার মধ্য দিয়েও কান খাড়া হয়ে উঠে। আমি তার কথা শোনার জন্য খানিকক্ষণের জন্য এসবকে দূরে সরিয়ে, অপেক্ষা করি। সে আমার কাছে সরে আসে আরেকটু।
— শোনো...
মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি প্রবল হচ্ছে। আমি কান্না ভুলে মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনিকেও অনুসরণ করতে থাকি। আমি আমার পাপ-অপরাধের জন্য বেশ কয়েকটি উত্তর গুছিয়ে রাখি। এসব কিছুর একদিন জবাব দিতে হবে ভেবে নিজেকে আরও কুঁকড়ে রাখি। যদিও মনের ভেতর এসব দ্বন্দ্ব প্রতিনিয়ত চলে, কিন্তু আমি এই প্রেমকে ঈশ্বরের ইচ্ছা বলেই মানি। তাকে সেই ঈশ্বরের পাঠানো দূত। আর এই ভাবনাটাই আমাকে আমার বর্তমানের যাবতীয় কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচিয়ে তুলত।
সন্ধ্যারতির সময় হয়ে গেল বুঝি! পার্থিব কিছু একটা ধরার জন্য, ছোঁয়ার জন্য বাড়াই। কিন্তু তার আগেই সে আমার চোখের কাছে নিয়ে এলো তার ঠোঁট। আমার আঁখিপল্লব, লবণাক্ত জল, কান্না সবকিছুকে চুম্বনে ভরিয়ে তুলল সে।
আমি খানিকটা উৎসুক করতে লাগলাম।
যেতে হবে... যেতে হবে... কিন্তু কোথায়?
আমার কিছু মনে পড়ছে না। কিছু ভাবনাও নেই মনের ভেতর। আমি কে, কোথা থেকে এসেছি, কাকে চাই—কিছুই মনে নেই। মনের ভেতর ফুঁপিয়ে ওঠা কান্না ছাড়া আর কিছু নেই।
ততক্ষণে সে আমার কানের কাছে তার মুখ নিয়ে এসেছে। মুখের ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো জিভ। নরম এবং গরম। কানের লতির কাছে, হালকা জিভের চলন আমাকে আরেকবার উত্তেজিত করে তুলছিল। তাকে বললাম, শোনো...
—উঁহু...
—যেতে হবে, দুপুর ফুরিয়ে গেছে...
—ফুরাক...ফুরানোটা স্বাভাবিক...
এই প্রেমের কাছ থেকে জোর করে বেরিয়ে যাব এমন শক্তি নেই আমার। আমি জানি, সে যতক্ষণ ইচ্ছে প্রেম করবে, ভালোবাসবে। তারপর সরে যাবে। সব জেনেও আমি থেকে যাব। সব বুঝেও আমি তাকে বিপুল ভালোবেসে যাব।
প্রতিটি পশুপাখি, জন্মমৃত্যু সবাই শুধু প্রেমের কাছেই বশ্যতা স্বীকার করেছে — এটা আমি জানতাম। তাই আমি কিছু না বলে, চুপ করে 'ফুরানোটা স্বাভাবিক' এই দু'টো শব্দ নিয়ে ভাবলাম খানিকক্ষণ। আমি জানি, সে যতক্ষণ চায় আমাকে গ্রহণ করবে। শরীরের একেকটি খাঁজের ভেতর থেকে বের করে দেবে আমার পুঞ্জীভূত অবসাদ, কষ্ট। আমি জানি। মৃদু হেসে তাকালাম তার দিকে।
—হাসলে তোমাকে রক্তাভ লাগে...
—তাই?
—এখন, চোখের জলে আমাকে নাইতে দাও...
—আমি জীবন্ত হয়ে উঠছি...
—প্রেম আমাদের তাই শেখায়!
উপায় নেই ভেবে শরীরের দিকে এগিয়ে এলাম। ততক্ষণে সে আমার কানের লতি থেকে নেমে ধীরে ধীরে গলা পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। গলায় যেখানে কণ্ঠনালি সেখানে, এখন তার জিভ। জিভের সঙ্গে সঙ্গে দাঁতও। দাঁত দিয়ে হালকা দংশন করল আমার সুরকে। আমার অক্ষরকে। আমার রচিত এক একটি বাক্যকে। সৃষ্টি এবং ধ্বংসকেও। এতদিন ধরে যে বাক্যদের আমি তিলে তিলে রচনা করেছি, সে তার জিভ দিয়ে, লালা দিয়ে স্নান করিয়ে দিচ্ছে। আমার কষ্ট পাওয়া উচিত ছিল বোধহয়। কিন্তু প্রেম বিরহ দেয়। কষ্ট না।
আমি চোখ বন্ধ করে ফেললাম। আমার স্থলিত বস্ত্র আরেকটু ঢিলে করে দিল। এতক্ষণে তার হাতদুটোও জেগে উঠেছে। কবুতরদের আদর করছে। গমক গমক করে বেজে উঠছে সংসার। দাঁতের আঘাতে কবুতরের গলায় লাল একটা দাগ তৈরি হল। কবুতর হালকা গমক রেখে চিৎকার করে উঠল— অ্যাঁ...
— এগুলো আমার...
সে আদরের মাত্রা বাড়িয়ে দিল আরও। আরও কঠিন হয়ে উঠল তার হাত। সে জোরে জোরে তার সমস্ত শক্তি দিয়ে, ভালোবাসা দিয়ে, সমর্পণ, প্রেম দিয়ে গ্রহণ করছে সময়কে। আমার কাছ থেকে চোখের জল, কান্নার শরীর, পড়ন্ত দুপুর এমনকি মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি সব হারিয়ে গেছে। শরীর মন্দির হয়ে উঠছে এখন। সে তার পূজারি। ধীরে ধীরে সমস্ত বিশ্ব খুলে যাচ্ছে। সমস্ত দরজা। চারপাশের ভয়, কান্না, দুঃখ, দারিদ্র্য মুছে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। সে নেমে আসছে। তার প্রেম নেমে আসছে। ভরে উঠছে পৃথিবী। পৃথিবীর আলো বাতাস জল বায়ু। আরও নীচে, পাহাড়ের খাদের দিকে নেমে যাওয়ার আগে আমি তাকে জোর করে টেনে তুলতে চাইলাম। কিন্তু সে যেন বেপরোয়া নাবিক। আবিষ্কারের নেশা প্রবল হয়ে উঠেছে তার। কোনো শক্তি তাকে আজ বিচ্ছিন্ন করতে পারে না।
খানিকটা থামল।
—এটা কখনো হতে পারে না...
—কী?
—তুমি তোমার শরীরকে এখনো চেন নি?
—কী?
—ত্রিবলী...
নাভিকুণ্ডে তার জিভ। শরীরের ভেতর একটা সাপ জেগে উঠছে। প্রথমে পায়ের পাতা চুম্বন করল। তারপর, বাম পায়ের বুড়ো আঙুলটিকে। মুখের ভেতর। তারপর ডান পা। নীচ থেকে প্রেম! তার মানে সমর্পণ!
কয়েকটি কুর্চিফুল ঝরে পড়ল। গন্ধে ভরে উঠছে বিছানা। রুমের বাইরে বোধহয় কোথাও মাধবীলতা ছেয়ে আছে। তার মৃদুমন্দ গন্ধ পার্থিব অপার্থিবের সে সীমারেখা সেটাকে মুছে ফেলছে।
এখন দুপুর। এসবের মধ্যেও গরম উতপ্ত লাভা স্রোত বয়ে আনছে বাতাস। আমি শিউরে শিউরে উঠছি। কাঁপছি।
কিছুক্ষণ পরে পৃথিবী শূন্য হতে আরম্ভ করল। আবার একলা একটা সময়। বন্ধন নেই। আকাঙ্খা নেই। সমর্পণ বিসর্জন কিছু নেই। শুধু শূন্য। গোলাকার ঘূর্ণাবর্ত।
ধীরে ধীরে বাহুপাশ থেকে বেরিয়ে কাপড় খুঁজতে লাগলাম। নিজেকে ঢাকা দেওয়া প্রয়োজন। সে অসাড়। নিজেকে আবৃত করা প্রয়োজন।
আমি কাপড় খুঁজতেই সে জোর করে টেনে নিল কাছে। বুক আবার বুককে স্পর্শ করল। শরীর আবার শরীরকে। আমি জানি নিজেকে বাহুমুক্ত করতে চাওয়া এক্ষেত্রে বোকামি। মুক্তি চাইতে গেলে বন্ধন আরও দৃঢ় হয়। আমি নিজেকে আবারও ছেড়ে দিলাম। সে আমাকে আঁকড়ে থাকল কিছুক্ষণ। তারপর আবার ধীরে ধীরে আলগা করতে আরম্ভ করল। বললাম, কী হল!
—আমি কী করবো?
—ওদিকে তাকাও না...পোশাক পরবো...
—আমাকে যেতে হবে! তাছাড়া তুমি ছাড়া আমার আর কোনও বন্ধন নেই...
—কোথায় যাবে?
—সবকিছু ছেড়ে...
আমার মনে হল, সব মিথ্যা। সব মিথ্যা। এই দুপুর, সন্ধে, একাকীত্ব, জীবন, সম্ভোগ এমনকি প্রেমও! আমিও কি তবে অস্তিত্বহীন?
আমিও জানি না, কী করা উচিত! আদৌ কিছু করার আছে কী না। কিন্তু সে আমাকে এটা সবসময়ই মনে করিয়ে দেয়, আমাদের কিছু করার নেই। এই প্রেম ভালোবাসা কষ্ট বিরহ এমন করেই যুগের পর যুগ বইবে। আমাদের কিছু করার প্রয়োজনও নেই। আবার উপেক্ষা করার উপায়ও নেই। আমি তার মাথার নীচে আমার হাত ঢুকিয়ে আঁকড়ে ধরলাম। আমার বুকে তার মাথা। তার চুল ঘামে ভিজে গেছে। তার চোখ ভিজে উঠেছে। তার চোখের গরম অশ্রু কবুতর দু'টোকে ভিজিয়ে দিচ্ছে। তারাও ভেজার আনন্দে হোক, কিংবা তার চোখের জলের সমর্পণের জন্য হোক চুপচাপ বসে আছে। আমি কিছু না বলে, তার চোখ মুছিয়ে দিলাম। যদিও জানতাম, এই জল মিলনের পরে আসে। আবার হারিয়ে যায়। মেয়ে কিংবা ছেলে এখানে আলাদা কেউ নেই।
খানিকক্ষণ এভাবে থাকার পর সে আমাকে ছেড়ে দিল।
দুই.
—একবারটি...ওদিকে ঘোরো না...
—না...
—আরে! আমি পোশাক পরবো...
—আমাকে বুঝতে দাও...
—কী?
—কীভাবে আবৃত করো নিজেকে...
সাদা ধবধবে একটা তোয়ালে মুড়ে বাথরুমের দিকে চলে গেল সে। রুম ভর্তি শূন্যতা। সাদা ধবধবে শূন্যতা। দৃশ্য নেই, দৃষ্টি নেই— এমন শূন্যতা!
আমি তার কান্নাকে ভয় পাই। তার চোখ যখন সমুদ্র হয়ে ওঠে, তখন আমার মনে হয়, কয়েক যুগ পরে সে প্রলয় আসার কথা বিধিনির্ধারিত, এখন হয়ত সেটাই আসতে চলেছে। আমি জানি আমার স্বপ্ন, আমার রচিত একেকটি জগৎ-সংসার, নিয়ম নীতি—সবকিছু একদিন সমুদ্রের ভেতর তলিয়ে যাবে। আর সেই সমুদ্র লবণাক্ত, ঠিক তার চোখের জলের মতো। আমি যখন তার চোখ আমার মুখের ভেতর ঢুকিয়ে নিই, স্পষ্ট বুঝতে পারি প্রলয়ের স্বাদ। বুঝি, এই অশ্রুকণা একদিন আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে। ডুবিয়ে দেবে অতলে।
প্রথম দিকে, যখন সে শারীরিক মিলনের পরে কাঁদত আমি ভাবতাম এটা আমার অশ্লীল বা নৃশংস প্রেম করার পদ্ধতির কারণে কিংবা পুরুষ হতে ব্যর্থ হওয়ার কারণে। তার মনের ভেতর জন্ম নেওয়া অসন্তোষের কারণে। আমি যখন তাকে সন্তুষ্ট করতে ব্যর্থ হতাম তখন প্রায়ই এমনটা হতো। দীপ্তির দরজায় পৌঁছানোর আগেই যখন তার মুখ ছাইয়ের মতো গভীর ধূসরতায় পরিণত হয়, তখনই অন্য সব পুরুষের মতো আমিও আমার ব্যর্থতা বুঝতে পারি। অপরাধবোধের নিন্দা এবং নিরর্থক অনুভূতির চোয়ালে কুঁচকে গিয়ে, আমি আমার অপরাধবোধ এবং ব্যর্থতা লুকানোর জন্য ভালোবাসার জন্য অপ্রয়োজনীয় শব্দ এবং প্রাণহীন চুম্বন ব্যবহার করি। কখনও তার আঁখিপল্লবকে, কখনো তার বুকের পোষা কবুতরদের কিংবা পায়ের পাতা। এই মুহূর্তগুলোর কাছে আমি অসহায় হয়ে পড়তাম। কিন্তু এরপরেও যখন সে কাঁদতে শুরু করত এবং তারপর আরও সুন্দর এবং অজেয় দেখাত তাকে। আরও পবিত্র। বকুলফুলের মতো গন্ধ বের হত তার স্তনযুগল থেকে। তার গলায় আশ্চর্য নক্ষত্রদের আলো ঠিকরে পড়ত। সাধারণ মানবী থেকে সে হঠাৎ করে দেবী হয়ে যেত। আমি শুধু অবাক হয়ে তার সেই অপ্রাকৃত দেহ-ধারণার কাছে নিজেকে সমর্পণ করে যেতাম। মুগ্ধ সুরের মতো, বিলাপের ধ্বনির মতো কখনও বা কামুক পুরুষের মতো! তবু আমি এসব মুহূর্তের কাছে নিজেকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ পুরুষ রূপেই নিজেকে কল্পনা করতাম।
কিন্তু কিছুদিন পর আমার ভ্রম ভেঙে গেল। বুঝলাম তার বিলাপ আমার পুরুষত্বের ব্যর্থতার ফলে সৃষ্ট অসন্তোষ থেকে উদ্ভূত নয়। কেননা, অনেক সময় তীব্র যৌন তৃপ্তি অনুভব করার পরেও সে এইভাবে কাঁদত।
ভালোবাসা এবং কান্নার এই মুহূর্তগুলিতে, আশ্চর্যজনকভাবে সে একটি শব্দও বলত না। এর দুটি কারণ ছিল। প্রথমত, প্রকাশের ক্ষেত্রে শব্দের শক্তির উপর তার বিশ্বাসের অভাব; দ্বিতীয়ত, শব্দের প্রকৃত অর্থ বোঝার ক্ষেত্রে তার আত্মবিশ্বাস শুরু থেকেই দুর্বল ছিল। যখনই সে বিশুদ্ধ আবেগের তাড়নায় কিছু বলতে চাইত, তার জিহ্বা থরথর করে কেঁপে উঠত, কারণ ভাষার কাছেই সেই স্বচ্ছ নির্দোষের জন্য কোন শব্দ ছিল না। ফলস্বরূপ, সে যা বলতে চেয়েছিল তার থেকে ভিন্ন কিছু বলতে শুরু করত, অথবা এমন কিছু বলতে পারত না যা সে বলতে চায়নি। অন্তত সে যেভাবে বলত সেভাবে বলা উচিত নয়। তার কথাগুলো ব্যাকরণগতভাবে ভুল এবং অসঙ্গত ছিল। শব্দগুলোর উদ্দেশ্য এবং অর্থও প্রচলিত পদ্ধতি থেকে ভিন্ন ছিল। সে কীভাবে এই অর্থগুলো তৈরি করেছিল, কার কাছ থেকে শিখেছিল, কখন সে কথা বলতে শুরু করেছিল, আমি জানতাম না। কিন্তু একটা বিষয় নিশ্চিত ছিল যে, তার কথায় ব্যাকরণগত ভুল এবং অশোধিত বাক্য গঠনের মধ্যে একই রকম সম্মোহনী ছন্দ ছিল যা যেকোনো অশোধিত সত্যের মূলে নিহিত। যদি সে কোন কিছুর জন্য দুঃখ পেত, তাহলে সে বলত, আমি দুঃখিত। যদি সে কোন কিছুর জন্য খারাপ বোধ করতো, তাহলে সে বলত যে সে এটা উপভোগ করছে না। যখন সে রেগে যেত, বলত, আমি পাগল হয়ে গেছি।
যখন সে বুঝতে পারত আমি মিথ্যা বলছি, তখন সে বলত—তোমার মনে ছলনা আছে। যখনই আমি বলতে চাই যে আমি জানি না, আমি বলি, আমি এটা বের করতে পারছি না। সে যখনই চাইত ঈশ্বরকে 'আপনি' সম্বোধন করত। কখনো কখনো সে নিজেকেও দেবী রূপে কল্পনা করে নিত। কিন্তু আমি বুঝতে পারতাম সবটাই আসলে গভীর প্রেম থেকে উৎপাদিত। ফলে আমি বিষয়টা নিয়ে তেমন নাড়ানাড়ি না করে, আরও মুগ্ধ হতাম তার প্রতি।
সে আমাকে অবতার ভাবত। এবং নিজেকে বারবার আমার পাশে বসিয়ে কোনও একটা মন্দিরের কল্পনা করত।
—কিছু বলো...
—তোমার কাছে এলে আমার কথা হারিয়ে যায়!
—তুমি প্রেমকে কীভাবে দেখ?
—তোমাকেই দেখি...!
সে তার ভালোবাসাকে স্পষ্ট ও স্বচ্ছভাবে দুটি ভাগে ভাগ করেছিল। এক ছিল আত্মার সঙ্গী, আত্মার প্রেম যা ছিল তার সবকিছু, এবং যার প্রতি আমার একেবারেই কোনও আগ্রহ ছিল না। দ্বিতীয়টি, শারীরিক, যা আমার জন্য প্রয়োজনীয় ছিল, কিন্তু তার জন্য সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয়, কুৎসিত এবং নোংরা। আমাদের মধ্যে এই দ্বন্দ্ব চলতে থাকে যতক্ষণ না আমি নিজেই এটি শেষ করার উদ্যোগ নিই। এর জন্য আমি তাকে আধ্যাত্মিক দিক দিয়ে ব্যাখ্যা করেছিলাম যে শারীরিক সংস্পর্শ খারাপ বা অপবিত্র নয়। এটা পাপ নয়, কারণ সকল দেবতাই এটা করেন। সমস্ত পিতামাতাও। সমস্ত জগৎ। তাকে আরও বুঝিয়ে দিতে পেরেছিলাম, শরীর ছাড়া আত্মা কিছুই করতে পারে না। দেহই তার ঘর যেখানে সে থাকে। এছাড়াও, সত্যিকারের এবং সম্পূর্ণ ভালোবাসা তখনই ঘটে যখন আত্মা, মন এবং শরীর তিন মিলে একসঙ্গে ভালোবাসে। আমার সমস্ত কথাবার্তায় মাত্র কয়েকটি শব্দ বুঝতে পেরেছিল সে এবং চুপ করে খানিকক্ষণ পরে বলেছিল 'সব ভালোবাসা'?
এরপর থেকে সে পুরোপুরি নিশ্চিত হয়ে গেল, আমার সঙ্গে যৌন মিলনের সময় সে আসলে 'পূর্ণ প্রেম' রূপে প্রেমকেই ডেকে আনছে। আমি লক্ষ্য করেছি, এসব কথা বোঝানোর পর, সে যৌন মিলনের সময় যেকোনো অপরাধবোধ থেকে মুক্ত হয়ে গেছে। ফলস্বরূপ, সেই সময় তার মুখে এক ধরণের লালচে ভাব দেখা দিতে শুরু করে, যা যৌন উত্তেজনার কারণে রক্ত প্রবাহ বৃদ্ধির কারণে ছিল না, বরং তার ভালোবাসা সম্পূর্ণরূপে অর্জনের নিষ্পাপ আনন্দ থেকে জন্ম নিয়েছিল। সে আনন্দের সঙ্গে আমার 'পূর্ণ প্রেম' করার ইচ্ছা পূরণ করেছে যেকোনো সময়।
পণ্ডিত হরিপ্রসাদ চৌরাশিয়া বাজাচ্ছিলেন ধুন ভাটিয়ালি। ভাটিয়ালির সুরে রুমটি নদীর মতো বয়ে যাচ্ছিল। নদীর ওপর নাবিক। প্রাচীন অথচ নবীন। সেই নাবিক তার নৌকার ভরে এনেছে প্রেম। প্রেমের ওপর ছড়িয়েছে দু'চারটি মাধবীলতা, জুঁই এবং বকুল। সেই মধুর পালের নৌকায় সে ধীরে ধীরে নিজের চারপাশটিকে পটচিত্র বানিয়ে তুলছে। হাজার হাজার ভঙ্গি তার। হাজার হাজার কলা। আমি তার দিকে তাকালাম। সে প্রাণপণে চেষ্টা করছে যাতে চোখে জল না আসে। আমিও প্রলয় থেকে মুক্ত হওয়ার একটা রাস্তা খুঁজে পেয়ে আরেকবার তার দিকে হাত বাড়ালাম।
আমি জানতাম সে আরও গভীরে প্রবেশ করতে চাইছে। আরও কঠিনভাবে গ্রহণ করছে আমাকে। নরমভাবে। একান্ত করে। অপেক্ষা এবং উপেক্ষা দুই-ই ছিল এর মধ্যে। উপেক্ষা ছুঁড়ে দিয়েছিল স্বার্থপর সমাজ ব্যবস্থার প্রতি। আর অপেক্ষা শুধু প্রেমের জন্য। প্রেমকেই সে তার সর্বস্ব ভেবে বসছিল। কখনো কখনো আমি দেখতে চাইতাম আমার জায়গায় অন্য কোনো পুরুষ এলেও কি সে এটাই করত? এভাবেই পাগলপণ, এভাবেই প্রেমের প্রতি দায়বদ্ধ এবং নিবেদিত? আমার মনের ভেতর সেই অদেখা, অজানা পুরুষটির ওপর একটা ক্ষোভ এবং ক্রোধের উৎপন্ন হত। আমি নিজেকে এসব ঈর্ষা থেকে মুক্ত করতে চেয়ে আরও আরও নারীসঙ্গে জড়িয়ে পড়তাম এবং নিজেই নিজের চোখে ছোট এক নরকের কীটের মতো হয়ে যেতাম। সেখানে নিজস্বতা বলে কিছু থাকত না। এভাবে বারবার হেরে যাওয়ার পরেও আমি তার প্রেমকে কিছুতেই আর পাঁচটা প্রেমের সঙ্গে মেলাতে পারতাম না।
একটা মেয়ে যখন সবকিছু ছেড়ে প্রেমকেই সত্য বলে মানে, তখন সে দেবী হয়ে যায়। সেও ধীরে ধীরে তাই হয়ে যাচ্ছিল। তার নির্মল, সুন্দর, একান্ত প্রার্থনা; প্রেমের প্রতি সমর্পিত এক আশ্চর্য দুনিয়ায় সে নিজেকে অসম্ভব এক পবিত্রতার জায়গায় পৌঁছে দিতে পেরেছিল।
আর আমার ভয় সেখান থেকেই শুরু।
কিন্তু কিছুদিন আগেও সে নিজেকে ছড়িয়ে রেখেছিল। উদ্দেশ্যহীনতায়। নিরপরাধ মন নিয়ে অপরাধের শিকারে। পরাধীনতায়। সে সমাজের জন্য সমাজ হতে চাইত। তার স্বামীর জন্য একজন আদর্শ পত্নী। এবং সে তার মন এবং শরীরের চাহিদাকে অবহেলা করত।
আমি তাকে কাছে টেনে নিলাম। প্রেমে কি না জানি না... এতদিন পরে তা আমার মনেও নেই... কিন্তু এই কাছে টেনে নেওয়া আসলে আমার নিজের কাছে নিজেকে ভুলিয়ে রাখা। সে যখন কাঁদত আমি মনে মনে খুব ভয় পেতাম। প্রতিটি পুরুষ জানে তার দুর্বলতা কোথায়! সে কাঁদলে আমি কুঁকড়ে উঠতাম। আমার মনে হত আমার যৌন নির্যাতনের কারণে সে এমনটা করছে। কিংবা আমার পুরুষোচিত দুর্বলতার কারণে তার বাসনা অপূর্ণ থেকে যাওয়ায় সে কাঁদছে। তাই আমি তাকে সেসব ভুলিয়ে দেওয়ার জন্য শরীরের প্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত ছুটে বেড়াতাম।
কিন্তু পরে বুঝলাম সে তার প্রায়শ্চিত্ত নিয়ে ভাবছে। সেই পাপ-পুণ্য-অপরাধবোধ তার শরীরের একেকটি রক্তপ্রবাহকে, প্রবাহের ধারাকে কান্নার লবনাক্ত স্রোতে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে চাইছে। আমি তাকে বোঝালাম—প্রেম মানে শুধু আত্মা নয়। মন এবং শরীরও। আত্মা তো শরীরের ভেতর থাকে। ঘরের মতো। আত্মা, মন এবং শরীর সবকিছু মিলিয়ে প্রেমের কাছে এলে সে প্রেম পবিত্র সাধনা হয়ে ওঠে। ভগবানের পুজোর মতো।
সে ভগবান মানত। ভগবানের অবতারকেও। যেদিন আমি তাকে শরীর মানে মন্দির এবং মন এবং শরীরের মিলন মানে পুজো, সমর্পণ—এরপর থেকে সে আর শারীরিক মিলনকে অপবিত্র ভাবত না। বরং এই প্রেমকে আরও পবিত্র করে তোলার জন্য যা যা করতে বলতাম সে কোনও বাধাদান ছাড়াই মেনে নিত।
সে অনেক কিছু বলতে চাইত—তার বিনিদ্র রাতের কথা। অসহায়তার কথা। মেয়ে হয়ে জন্মানোর কথা। যমুনার কথা এবং জঙ্গলের ভেতর হারিয়ে যাওয়া পথটির কথাও বলতে চাইত সে। এসব কথায় আমি কোনও লাভ-লোকসান খুঁজে পেতাম না। আমার মনের ভেতর এসব কথায় কোনও রকম দুঃখ, কষ্ট কিংবা উত্তেজনা তৈরি হত না। আমি এড়িয়ে যেতে চাইতাম আরেকটি কারণে, তার কথা বলার উচ্চারণ এবং গ্রাম্য টান।
আমি বহু আগে এসব গল্প তার বান্ধবীদের কাছ থেকে শুনেছি। কখনও কখনও আমাদের লোকায়ত কাব্যগুলোর কাছে। কীর্তনের সুরেও তার কথা বারবার উঠে আসে। আমার সেসব কথা শোনার চেয়ে চুপ থাকতে ভালো লাগত।
তাছাড়া, সে নিজের কথা নিজে কখনও গুছিয়ে বলতে পারত না। তার প্রতিটি বাক্যে এত ব্যাকরণের ভুল, এত ভুল শব্দের প্রয়োগ, উচ্চারণেও—সে যা বলতে চায় হারিয়ে যায় অচিরে। সেখানে অন্য কথা ঢুকে পড়ে কিংবা কথার ভেতর একটা হারিয়ে যাওয়া রাস্তা তৈরি হয়। সে অচিরে চুপ করে যায়। তার এই মৌন থাকা আমাকে স্বস্তি দেয়। সে চুপ করে থাকলে, তাকে বোঝার দায় থেকে আমি এড়িয়ে যাই।
তার হাতে একটা পোড়া দাগ। আমি দাগটার গায়ে আলতো ভাবে হাত বুলাই। স্পর্শ দিয়ে তার কষ্ট বোঝার চেষ্টা করি, নিজেকে বোঝার জন্য। দেখি, সে যতটা চায় আমাকে আমি ততটা নয়। প্রেম যে তিন বস্তুর মিলন—শরীর, মন আর আত্মা—এটা সে আমার কথানুযায়ী মেনে নিলেও আমি পারি নি। আমি শুধু তার শরীরের দিকে লোভার্ত নেকড়ের মতো চেয়ে থাকতাম। আর আমার এই অসম ব্যবহার আমাকে মনেমনে লজ্জিত করে। আমি তার ভেজা চোখে চুম্বন করি। আকুল কান্নার সামনে যাতে আমি বিচলিত না হয়ে পড়ি। আমি তার পায়ের পাতা চুম্বন করি যাতে আমার ধ্বংস খানিক বিলম্বিত হয়।
কিন্তু আমি জানি সব কিছুই তার কাছে বড় মূল্যহীন। সে শুধু আমাকে চায়। আমাকে পায়। আমার হয়ে থাকে। আমি ছাড়া তার বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড শূন্য এক ঘূর্ণায়মান বস্তু ছাড়া আর কিছুই নয়। আমি নিশ্চিন্ত ভাবে জানতাম এই বিশ্ব, জগৎ, সংসার সবকিছু আমি আর আমি...
—এসো...
—মন্দিরে ঘণ্টা বাজছে...
—বাজুক...
—দেরি হয়ে যাবে...
আমি তার অধরে আমার ঠোঁট নিয়ে গেলাম। ধীরে ধীরে আবারও তার সমস্ত শব্দ হারিয়ে গেল। আকাঙ্খা, বাসনা, ভয়, দ্বিধা। সে আরও একবার প্রেমকে সত্য বলে বিশ্বাস করল। সে আমাকে তার শরীর দিল। মন দিল। আত্মাও। আমি লোভীর মতো ধূপ-ধুনোর গন্ধ ভুলে তার শরীরের গন্ধ নিতে লাগলাম। আশ্চর্য গন্ধ। মাটি, চন্দন এবং ভাত ফোটার গন্ধ মিলেমিশে একটা গন্ধ। আমি তৃষ্ণার্ত চাতকের মতো, হিংস্র হায়নার মতো তার শরীরে ঝাঁপিয়ে পড়লাম। আমার মুখের ভেতর জন্মদ্বার। বাঁশি হারিয়ে শীৎকারের সুরে ভরে উঠল নদী, বকুলতলা। নদীর ভেতর যত যত মাছ ছিল, শ্যাওলা ছাড়াও পৃথিবীর নানা বর্জ্যও ছিল—সবকিছুকে সে বাঁশির সুর ভেবে আমাকে কঠিন কঠোর ভাবে জড়িয়ে ভেসে যেতে চাইল। তার ঘন এবং রুক্ষ চুল আমার মুখমণ্ডল ঢেকে দিল। সেই চুলের আড়ালে আমি তাকে আরেকবার বোঝার চেষ্টা করলাম না-বোঝা কবিতা লাইনটির মতো।
ধীরে ধীরে তার হাতের শক্ত মুঠি শিথিল হয়ে যাচ্ছে। সে আমার পিঠের ওপর মৃদুভাবে হারমোনিয়াম বাজানোর মতো আঙুলগুলোকে খেলতে ছেড়ে দিল। আমি বুঝলাম সে তার কান্নাকে দমন করতে পেরেছে। এসব কারণে আমি খানিকটা সুস্থ বোধ করতাম।
ক্লান্ত অবসন্ন শরীরে তার এই সুর আমাকে মানুষ করে তুলত।
তিন.
—এসো...
পোশাক পরে এসে শান্ত স্বরে মেয়েটি ডাকল ছেলেটিকে।
—কোথায় যাবে তুমি?
—মন্দিরে...
—ওখানে কেন?
—আমি আজ ওদের অন্ন প্রসাদ দেব বলেছি...
—ওরা তোমাকে মন্দিরে যেতে দেবে?
—কেন নয়? একটা অবস্থার পর সবকিছু শূন্য হয়ে যায়। আর শূন্য এমনই এক অবস্থান যা আগে পরে যেখানে খুশি বসানো যায়।
মেয়েটি ধীরে ধীরে তার ব্যাগ খুলল। একটা ছোট টিফিন বক্স। সাদা। দু'টো চামচ বের করল। একটা ছোট প্লেট। সারা রুম গোবিন্দভোগ চাল, এলাচের গন্ধে ম ম করে উঠল। প্লেটে পায়েসটুকু ঢেলে ডাকল,
—এসো...
—তুমি বানিয়েছ?
—অন্ন প্রসাদ দেব বলে তোমাকে...রান্না করতে করতে হাত পুড়ে গেছে...
—আমি দেখেছি দাগটা। আমি তোমাকে দাগের কারণ জিজ্ঞেস করতেই যাচ্ছিলাম...
—তুমি ঠিকঠাক করে এখনও মিথ্যে বলতে পারো না !
বলেই হাসল। ছেলেটি তাকিয়ে দেখল তার পুরুষত্বের দুর্বলতা বুঝতে পারে নি মেয়েটি। হাসলে বড় সুন্দর দেখায় তাকে। সুন্দর, মায়াবী, পবিত্র। মেয়েরা সব দিনই পবিত্র হয়। সুন্দর হয়। ছেলেটি জানে...
— হাঁ করো...
মেয়েটি চামচ ভর্তি পায়েস ছেলেটিকে খাইয়ে দিল। তারপর অপেক্ষা করল। ভাবছিল, ছেলেটি তাকেও এক চামচ খাইয়ে দেবে। খানিকক্ষণ অপেক্ষার পর, যখন এমনটা হওয়ার কোনও পরিবেশ তৈরি হল না, মেয়েটি নিজেই এক চামচ তুলে মুখে নিল। তারপর বলল, ভালো হয় নি?
—ভালো হয়েছে... এত কষ্ট করে তুমি বানিয়েছ...
অন্যমনষ্কভাবে ছেলেটি বলল। তখন একটা অনুশোচনা কাজ করল ছেলেটির মনে, তারও উচিত ছিল মেয়েটির মুখে এক চামচ পায়েস তুলে দেওয়া। কিন্তু ততক্ষণে অনেকটা সময় পেরিয়ে গেছে। এখন তা করা যায় না। সে চেষ্টা করল এই ঘটনাটিকেও চাপা দেওয়ার। তাই মৃদুস্বরে বলল, চাকরির কী খবর?
—চলছে...
—এখনও তারা তোমাকে অপমান করে?
—কিন্তু তারা আমার কিছু করতে পারে না...
—স্যালারি?
—ওটা পাওয়া যাবেই...
এবার ছেলেটি নিজে এক চামচ পায়েস তুলে নিজের মুখে দিল। মেয়েটি চুপ। ঘরটি শূন্যতায় ভরে গেছে ততক্ষণে। আবারও । ছেলেটির গলায় পায়েস আটকে যেতে লাগল। তার বমি পাচ্ছিল। কিন্তু মেয়েটির পোড়া দাগটির দিকে তাকিয়ে সে গিলে ফেলল। সে জানে গিলে ফেলতে পারলে, অনেক সমস্যা নিজে থেকে সমাধান হয়ে যায়। জিজ্ঞেস করল, তুমি কিছু রাখবে?
—না... না... আমার কাছে এখনো অনেক কিছু আছে...
—যেমন?
—"আমি যখন আড়াই তিন বছরের তখনও আমি নিজে নিজে হাঁটতে পারতাম না। আমার পা দু'টি ছিল পাতলা লিকলিকে। আমার নানি, দিদা এবং জনপদের সমস্ত নারী ভেবে নিয়েছিলেন আমি হাঁটতে পারব না। এবং এক পঙ্গু সন্তানকে নিয়ে আমার কিশোরী মাকে সারাজীবন দুঃখের ভেতর কাটাতে হবে!"
সে খানিকক্ষণ থামল। তারপর নিজের পায়ের আঙুলগুলোকে একবার ঘষে নিল মেঝের ওপর। কালো রঙের নেলপালিশে নখগুলো বর্ণমালার মতো লাগছিল।
"এরকম করে যখন আমি পাঁচ বছরের, আমার কিশোরী মা যাতে আমি হাঁটতে পারি তার জন্য একজনের কাছ থেকে সাড়ে আটশো টাকা ধার নিয়েছিলেন। আমি আমার লিকলিকে পা নিয়ে বসে থাকতাম দাওয়ায়। দাওয়া ভরে যেত আজব স্বপ্ন এবং বাস্তবতায়। অসম্ভব কিছু শব্দ এবং লজ্জায়। আমি ছোট কিন্তু তাও বুঝতাম। মেয়েরা বুঝতে পারে। সত্য এবং মিথ্যাকে। মিথ্যা এবং সত্যকে। তাও চুপ থাকে। এভাবে থাকতে থাকতে একদিন, যখন আমার আটবছর আমি প্রথমে বেড়া ডিঙিয়ে, রাস্তায় নেমে এলাম। হাঁটতে পারলাম দেখে, সেদিন আমার মা খুব কাঁদছিলেন। বারবার ভগবানের কথা বলছিলেন। ভগবান যা চাইবেন, তা হবেই— এটা সবসময় বলতেন। তাই আমি আর কিছু না ভেবে মায়ের নিঃস্ব হয়ে যাওয়া শরীরের দিকে, শুকিয়ে যাওয়া স্তনের দিকে, চোখের কালির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে লজ্জায় মরে যেতাম। সাড়ে আটশো টাকার নোট নয়, আমি জানতাম মায়ের শরীরের বিনিময়ে আমি আমার শরীর পেয়েছি। পরে বুঝলাম, এ তাই শুধু আমার নয় কিংবা আমার মায়েরও নয়। আমার বন্ধু বান্ধবীদের জন্যও। কেননা, আমার হাঁটতে পারার সঙ্গে সঙ্গে আমার মা নিঃস্ব হয়ে গেছিলেন। তার চলা ফেরা করার শক্তিটুকুও ছিল না। তাই আমাকে আমার পাড়ার কয়েকজন ছেলে মেয়ে একটা চটের পাতলা বস্তা দিয়ে বলেছিল, ফুরিয়ে যাওয়া জলের বোতল, ভাঙা কাচ এবং পরিত্যক্ত জিনিস সংগ্রহ করতে। আমি এই সব ততক্ষণ পর্যন্ত সংগ্রহ করতাম যতক্ষণ না, মা এবং আমার ভাতের টাকা উঠে না আসে... একদিন এক প্লাস্টিকের গাদায় একটা কালো কুচকুচে সাপ কুণ্ডলী পাকিয়ে ছিল। আমি হাঁটতে পারলেও দৌড়তে পারতাম না। সেই সাপ আমাকে ব্যাঙ ভেবে বসল। মা বলতেন, ভগবান যা চান তাই হয়... তাই হল..."
ছেলেটি অবাক হয়ে মেয়েটির দিকে তাকিয়েছিল। এর আগে এই হোঁচটহীন ভাবে, শুদ্ধ ব্যাকরণে, বিশুদ্ধ উচ্চারণে মেয়েটিকে কখনও কথা বলতে শোনে নি সে। সে এতদিন বুঝতেও পারে নি কী অসহ্য যন্ত্রণা বয়ে বেড়ায় একেকজন মানুষ! সে মেয়েটির শুদ্ধ ব্যাকরণ এবং উচ্চারণের দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থাকল।
মৃদুস্বরে জিজ্ঞেস করল, তুমি ততদিনে কিছু জমা করো নি?
—করেছিলাম কিন্তু খরচ হয়ে গেছে...
—কোথায় খরচ করলে?
—কিডনির ভেতর পাথর হয়েছিল ছেলেটির... তার মা হাতজোড় করে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছিল। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম কত চাই? সে প্রথমে আমাকে দেখে বিশ্বাস করে নি। কেননা, আমার চেহারা প্লাস্টিক কুড়ানিদের মতো ছিল। সে খানিকটা থতমত খেয়ে বলল, 'বিশ হাজার'... আমি বললাম এই নাও... সে প্রথমে অবাক হল। তারপর ছুটে চলে গেল। ছুটে যাওয়ার সময় আমি বুঝতে পেরেছিলাম সে খানিকটা ভয়ও পেয়েছিল।
—তুমি তোমার জন্য কিছু রাখো নি?
—আছে তো! অনেকটাই। কিন্তু সেখান থেকেও একজনকে কিছুটা দিতে হবে। রাস্তার মোড়ে তুমি যে পাগলটাকে রোজ রুটি দাও, তার হঠাৎ ইচ্ছে হয়েছে সে একদিন সিনেমা দেখবে। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম কার সিনেমা দেখতে চাও? সে বলল, " স্প্রিং সামার ফল উইন্টার এন্ড স্প্রিং"। একা যাবে? আমি তাকে জিজ্ঞেস করি। সে বলল, হ্যাঁ। তোমার বন্ধু নেই? পৃথিবীর সুন্দর জিনিস আমি একবার শুধু একা একা দেখতে চাই। কিন্তু সমস্যা হল, পৃথিবীর কোনও সিনেমা হলে এখন আর এই সিনেমাটি চালানো হয় না। এবং চালানোর ব্যবস্থা করা গেলেও একা একা দেখতে দেওয়া সম্ভব না। ভাবো, একজন ভিখেরি তারজন্য এত বড় একটা এক্সপেন্সিভ সিনেমা হল! আমি সিনেমাহল কমিটির সঙ্গে কথা বললাম। তারা বলল, সঠিক অর্থের বিনিময়ে এটা সম্ভব। ফলে, একটা সিনেমা হল বুক করতে হল আমাকে। একটা গোটা শহর। খালি, শান্ত এবং শূন্য শহর।
—তুমি নিজের জন্য কিছু রাখো নি?
—আছে তো...নিশ্চয়ই একদিন আমি আমার স্যালারির টাকা পাব। ততদিন চলে যাবে...
—আজকের অন্ন বিতরণ?
—ওরা সব বন্যায় ভেসে আসা মানুষ... তিন দিন না খেয়ে আছে...
—আমি তোমার সঙ্গে যাই?
—না না...আমি একাই পারবো...
—তবুও যাই?
—আচ্ছা! তবে খানিকটা চলো... ওই গলির মোড় পর্যন্ত...
মেয়েটি হাঁটতে থাকে। এলোমেলো। নূপুরের শব্দ। ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়। দূরে রাধানাম সংকীর্তন। খিচুড়ি-গন্ধে ভরে আছে পাড়াটি। কাঙালি ভোজন।
ছেলেটি একা দাঁড়িয়ে থাকে। একা। শূন্যের মতো... ·
লেখক পরিচিতি : বেবী সাউ-র জন্ম ২৯ অক্টোবর, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ঝাড়গ্রামে। থাকেন জামশেদপুরে। ওখান থেকেই বাংলা এবং ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। পিএইচডি। বর্তমানে সাউথ এশিয়া জার্নাল (নিউ জার্সি, আমেরিকা)-এর অ্যাসোসিয়েট এডিটর এবং জামশেদপুর আকাশবাণীতে কর্মরত। তিনি বাংলা, হিন্দি এবং ইংরেজিতে নিয়মিত লেখালেখি এবং অনুবাদের কাজ করেন। সম্পাদনা করেন ‘আবহমান’ পত্রিকা। তাঁর এ পর্যন্ত আঠেরোটি কাব্যগ্রন্থ, তিনটি প্রবন্ধগ্রন্থ, দুটি উপন্যাস এবং ৬টি অনুবাদ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।

0 মন্তব্যসমূহ