রবিবার, ৬ জানুয়ারী, ২০১৩

যিশুপুত্র

আনোয়ার শাহাদাত


সিনথিয়ার কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না ভাবনার ওপর। নিজেকে ঐশ্বরিক মানবীর মতো, ঐশ্বরিক মানবীকে নিজের মতো মিলিয়ে দেখে অজ্ঞাতে।

সে-সময় ক্ষণিকের জন্য পাপাচারও মনে হয়। কিন্তু অন্য সত্তা পাশে প্রবোধিত করে-

পাপ অইবে ক্যা, তোর দোষ কী? মোনতো বইন্নার হোত্‌, দোহাই মানে না, মোনেত্‌ যা লয় হেইডাই বোঝে, দোষ কী, তোর দোষ কী? লাগলে মুই মেরি হমু কতক্ষুন, মন লইলে মেরিরে মুই বানামু কতক্ষুন, দাইড়া বান্দা খেলমু, দোকোট্‌ মারমু, কোট বদলামু, হে মুই, মুই হে।

আইজ্যাকের কুটার কুড়-তলায় কি পউলের মরিচ-ক্ষেতের উঁচু কাঁধিতে ঝুলে-পড়া আম-গাছের নিচে, সন্ধ্যায় ভাঙা চাঁদনি রাতে কি কৃষ্ণপক্ষে উইলিয়াম সিনথিয়ার চুল জড়িয়ে কত কথাই তো দিয়েছে! -‘সাবান দিমু লাক্স, নাইরকোল ত্যাল, মোরগ মারকা, কইলকাত্তার ছাপার শাড়ী-কাফুর, বড়দিনে বাসের-ত্যাল তেরফলা, আংডি-চুড়ি ঢাকাইয়া, টিসু রূপবান শাড়িও বিয়ার বচ্ছর, আরো কত কী সব’

ওসব কথাও কম বড় নয়। অনেক প্রতিশ্রুতি, সম্ভাবনা ও স্বপ্ন। কিন্তু সে কথার চেয়েও তখন বড় হয়েছে সিনথিয়ার কাছে এই যে দুজনার কাছে-আসা অভিজ্ঞতার ভালোলাগাটুকু। যদি বিশ্বাস না হতো উইলিয়ামের কথা সে সময়, তবে কি সিনথিয়া আমগাছের নিচের দুজন এক মানুষ হতে পারে এমন আয়তনের মসৃণ ধুলায় আবরিত ভূমিটুকু ছেড়ে চলে আসতে পারত? কিংবা কুড়ের তলায় নাড়ার উপর বিছানো হোগল-পাতার মোটা হোগলার শয্যায় স্বপ্নময় শয়ন ছেড়ে দৌড়ে একটা অর্থহীন বাস্তবে ফিরে আসা হতো? নিজ মনে গড়া স্বর্গসুখ-তুল্য সেই সে কাল-টুকু যা অতিক্রমিত, কখনো পাতা মুদ্রিত চোখ, কখনো খোলা চোখে স্বর্গ-লব্ধ করার মধ্য দিয়ে। বুকের ভিতর লালিত এইটুকু সময় সিনথিয়া উলটে-পালটে এধার-ওধার সব ধার দিয়ে ঘষে দেখেছে। সময়টুকুকে কখনো তার দোষ মনে হয়নি। মনে হয়েছে পবিত্রই, ঈশ্বরের ইচ্ছায় ‘সে-সময়’ আসে তার জীবনে। আবার সে-সময় চলেও যায় শুধু এক যেসাস’কে জরায়ুর জলে ভাসিয়ে দিয়ে।

স্বাভাবিক আশঙ্কাটুকু ছিল না তা নয়। তবে কিনা ছায়া ঘেরা ভিটার সেইটুকু ভূমির আকর্ষণ আর উপেক্ষা করা হয়ে ওঠেনি সিনথিয়ার। তা ছাড়া উইলিয়াম মাঝ-চাষে খ্যাপা-গোরুর মতো ঘাড় মুচড়ে জোয়াল ফেলে দেবে তা তো আর আগে-ভাগে জোর করে ভেবে নিতে চায় না কেউ। তারচেয়েও বড় কথা এসব আগে মনেই হয়নি। অমনভাবে দুজন মানুষের স্বর্গীয় সময়ে কারও কি মনে হয় পরবর্তীকালে, কবে, কী হবে, বা হতে পারে যা কিনা অপকৃষ্ট, অদৃষ্টের দুরবস্থা যোগানের সহায়ক? সেই সময়ে সেই-সব বোধ, চিন্তা, ভাবনা, সুপ্ততায় লুকিয়ে স্থবির হয়ে পড়ে।

কিন্তু স্মৃতি সব স্বাচ্ছন্দে আর বয়ে বেড়ানো যায়নি দু’মাস-অধিক। এ পর্যায়ে আসে চৈত্রের সকাল, উঠোনে সূর্যের প্রলম্বিত স্ব-ছায়ায় খড়-কুটা বিছিয়ে গোবরের ঘুঁটে বানাতে গিয়ে দুর্যোগের প্রথম উপসর্গ ধরা পড়ে, চোখের সামনে এক-ঝাঁক সর্ষে-ফুল ফুটে ওঠে পলকে। সাজি থেকে ডান হাতে গোবর নিয়ে বাম হাত মাটিতে ভর করে কুটার উপর লেপটানোর সময় সিনথিয়ার মাথা চক্কর দিয়ে ওঠে। বার দুই-তিনেক ওয়াক ওয়াক শব্দ শুনে মা রেচেল ঘর থেকেই ঠা ঠা করে- ‘কেডা, কেডা-রে সিনথি’ বলে উঠানে নেমে হাতের মুড়া-পিছা ধুলোয় উবু হয়ে পড়ে থাকা মেয়ের পিঠে ঝাড়তে থাকে অতীব গুরুত্বের সঙ্গে। যেন মায়ের মৌলিক কোনো কর্তব্য সম্পাদন কন্যার উপর যা কিনা এভাবে এখনই মাথা ঘুরে ভিরমি খেয়ে বমি করা-রত আধশোয়া মেয়েটির উপর না করলেই নয়।

মা রেচেলের ‘কেডা’ প্রশ্নের উত্তরও নয়, পিঠে মুড়া-পিছার ঘন কর্মের প্রতিক্রিয়াও নয়, সামান্য গলগল করে তেমন বেশি কিছুও নয়, সকালের কটি পান্তাভাত, লালচে আধপোড়া ডলা মরিচ ও ঘন ছড়া দুধের মতন বিচিসহ কলা ধুলায় গড়ায়। সিনথিয়া হাতের কবজা নেড়ে জলপান ইচ্ছের ইঙ্গিত করলে মা রেচেল ধরে নয় এই বুঝি তার কেডা’ প্রশ্নের উত্তর সিনথিয়া করছে। এবং রেচেল নিজেই সেই ইঙ্গিত-উত্তর নিশ্চিত করছে দুটো নাম উচ্চারণ করে।-‘কী কইলি, উইলিয়াম না সিমসন্‌?’

সিনথিয়া মাথা আড়াআড়ি নেড়ে আবারও তার জলপানের কথাই বোঝাতে চায়, কিন্তু গলা ফাটিয়ে আরও জোরে প্রশ্ন করে- ‘তয় কেডা, কোন জাউরার পোলায়?’ তার হাতের ঝাড়– আবারও ভীষণ ক্রিয়াশীল হয় সিনথিয়ার পিঠে। ততক্ষণে সিনথিয়া বাকিটুকু ডলা লালচে মরিচ গলা থেকে ঢেলে উঠানের আগের উৎপাদনের সঙ্গে যোগ দিয়ে দেয়।

অবস্থার এ প্রেক্ষিতে সবকিছুতে ফোঁস-করে-ওঠা রেচেলের অনঅবলম্বিতা দীর্ঘতর হতে থাকে। শৈশবের পিতৃহীন কন্যার সাজে কি না বনবাদাড়ে শুয়ে পড়া সেকথা ইতিমধ্যে রেচেলের মুখে হাজার বার উচ্চারিত। তা ছাড়া শুয়ে পড়ার ওই পাত্রখানি উইলিয়াম যার বাবা জ্যাকবের সঙ্গে ছিল জোহনের ভুঁইয়ের আল ঠেলা নিয়ে কাইজ্যা। ফি-বছর জ্যাকব বীজধানের ক্ষেতের আল ঠেলবেই সিনথিয়ার বাবা জোহনের ক্ষেতের দিকে। জোহন না পেরে উঠে তৃপ্তির সঙ্গে গাল দিত জ্যাকবকে-‘চাঁচাছোলা জারুয়া হালার পো, তোর আইল ঠেলা শাউগারি দেখলে কোন হালার পোয় কইব ডরমেন তোর পাপু আছিল!’ রেচেল তখন স্বামী জোহনের বিরুদ্ধেই যেত- ‘দ্যাহো, লাগলে লেজা-লেজি হরো, কু-কথা কবা ক্যা, হের মায়ের-বাপের দোষ ক?

পিতা-অভিহিত ‘জারুয়া’ জ্যাকবের ছেলে উইলিয়ামের সঙ্গেই বোঝাপড়া হয়ে যায় সিনথিয়ার। না, বোঝাপড়া এমন সব বিস্তারিত নয়; যদি তা-ই হতো তা হলে ‘স্বপ্নময় স্বর্গের সুখকাল’ দুর্যোগের স্রোতে ভেসে যাবে কেন?

বিধবা নারীর আত্মরক্ষার অতি পরিচিত কৌশল মারমুখিতা ধারণ করে যে রেচেল দাঁড়াস উপাধিতে সন্তুষ্টই থেকেছে, সেই রেচেল দাড়ামি ব্যক্তিত্ব পুড়িয়ে ফেলে মেছো-পোনা কি মেটে-শাপের মতো ভঙ্গুর ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়। অনুনয় বিনয়পূর্বক পল্লির মাতব্বর গোছের লোকজন ধরে জ্যাকবকে বলিয়ে উইলিয়ামের সঙ্গে সিনথিয়ার পেটেরটার একটা বিহিত করার উদ্যোগ নেয়। রেচেলের ক্ষোভ যেন সিনথিয়াকে ছাপিয়ে পেটেরটার উপরই প্রবল হয়। কেননা সিনথিয়া পেটেরটার বাহক হলেও সিনথিয়ার পিতৃ-পরিচয় নিয়ে কোনো সমস্যা দেখা দেয়নি, তা মৃত, অনুপস্থিত বাবা সিনথিয়ার জীবনে কোনোভাবে কাজে আসুক কি না আসুক। কিন্তু পেটেরটারও ‘বাপ’ যে নেই সেকথা রেচেলও বলছে না। তা হলে এখানে নাই কী সে প্রশ্নেরও একটি সরল উত্তর রেচেলের দাঁড় করানো আছে। বিষয় থেমে গেছে ‘বিয়াত’ বাধের গোঁড়ায়। ‘বিয়াত’ হলে সিনথির পেটে একটা কেন, ‘আজারে-আজারে, লয়ক্ষ্যে’ আসুক তাতে যে কিছু যায়-আসে না সেটাই রেচেলের কথা। আর ওই ‘বাপ’ প্রসঙ্গেও রেচেলের কথা সেরকমই- ‘বাপও একটা না হউক আজারটা হউক, কেল বিয়াতটা ঠিক থাকলেই হইছে।’

এই হচ্ছে রেচেলের এ যাত্রা আন্দোলনের ইসু।

আন্দোলনের মাঠের পর্ব পরিচালনার পাশাপাশি পশ্চাৎ কৌশলও প্রয়োগ হয়। যন্তর-মন্তর, দড়ি-পড়া, ধুতরার ফুল, বিষবৃক্ষের পাতা ও শেকড় বেটে গিলিয়ে পেটেরটার নামানোর যাবতীয় প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকে। এরপর সর্বশেষ পদক্ষেপে প্রত্যক্ষ ফকিরি কেরামতিই সফল হবে এমন ভরসায়- মাটির হাঁড়ি কলসের উপর বসিয়ে শেষরাতে সদ্য-বানানো নারকেল-শলার ঝাড়ুর শপাৎ-শপাৎ সনিথিয়ার পেটে-পিঠে ঝরেছে এই মার্মে ‘নাম হারামির বাচ্চা, নাম, হুড়-হুড়াইয়া নাইম্যা যা, যেই পথে ঢোকছো হেই পথে নাম।’


সেই নামানোর শলার ঝাড়ুর শপাৎ-শপাৎ ঝাড়নার প্রথম পালা শেষ হওয়ার আগেই হাঁড়ি-কলস কাত করে সিনথিয়া মাটিতে গড়িয়ে পড়ে। মুখের দু'গালি দিয়ে দিনের খেজুর রসের ধারার মতো অজস্র ফেনা উগরে দেয় দাঁত দুপাটির কপাটে খিড়কি লাগিয়ে। তখন উপস্থিত দাদি-সম্পর্কের বাজা বুড়ি সন্তানহীনতার অভিজ্ঞতার হাহাকার থেকে হয়তো ফকিরকে অনুরোধ করে সিনথিয়াকে আস্তে পেটাতে-

-ফহির, পিডানডা আস্তে দেলে অয় না?

এমন সময় এরকম হাস্যকর কোনো কথাও কেউ বলতে পারে এমত-ভাবে ফকির পাত্তা না দিয়ে নিরুত্তর থাকে। কী জানি কী ভেবে অবশ্য ফকির আবার উত্তরও করে- ‘মাইয়া মানু বোঝবা কী, এ্যার একটা পিডানও সিনথির উফরে পড়ে না, যায় সব পেডের ঐ জাউরাডার উফুর দিয়া।’

দাদি-বুড়িকে আরও সহানুভূতিশীল মনে হয় সম্ভবত ঐ পেটেরটার প্রতিই-

‘হেডারও তো একটা পরান ফহির!’

‘জাউরারও আবার পরান!’ ফকিরের হাতের নতুন শলার ঝাড়– শেষরাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে শাঁই শাঁই পড়ে মূর্ছিত সিনথিয়ার পেটে।

বাজা বুড়ি অন্যদিকে ফিরে সুর তুলে কাঁদে, ‘এডা মোর পেডে আইলে না ক্যা, মোর পেডে আইলে না ক্যা!’

পরিস্থিতি এমন হতে পারে এরকম জ্ঞান ও শিক্ষা সিনথিয়া লাভ করেনি সত্য, তার ওপরে নিজের দেহের ভেতর নিজের রক্তে বড় ‘হইতেছে’ যে প্রাণ তার প্রতি মায়া থাকলেও, পেট-নামানো ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদহীন থাকতে হবে তাই-বা সিনথিয়াকে কে শিখিয়েছে! শেষরাতের ঝাড়– পিঠে নিয়ে মূর্ছা যাবে তবুও বলা যাবে না- ‘এডার বাফের নাম লাগবে না, মায়ের নামই থাউক।’

ভাঙচুর দাঁড়াস ব্যক্তিত্বের রেচেল পান্তাভাতের সময় জ্যাকবের বাড়ি ওঠে। পথের ঘাস-কাঁটা কাপড়ে বিঁধলে তা তুলতে তুলতে যখন রেচেল কিছু একটা বলবে তার আগে জ্যাকবই দাঁড়াস আচরণ ধারণ করে-

‘হুনছি মোগোর পোয়ার নামে তোমার মাইয়ারে লইয়া কীসব কতা কও, খবরদার মানা হরি, এমন কতা মুহেও লবা না!’

শক্ত নয়, বিনীত রেচেল জ্যাকবকে পাল্টা প্রশ্ন করে-

‘আইলে ক্যামনে’?

‘হ্যা জানে তোমার মাইয়ায়, আর জানে ঈশ্বরে, কইতে থাহো পোলা ঈশ্বরের, নাইলে যিশুর, মোগো ছ্যামড়ার নামও লও বুজি।’

উইলিয়ামের স্বীকারোক্তি ও বিয়ে দাবিটুকুর জন্য রেচেলের আন্দোলন, বুড়ো বলদের মতো হাত-পা ছেড়ে জিব বের করে থুবড়ে পরে।

মৃত শত্রুর বিরুদ্ধে মোক্ষম প্রতিশোধ-স্পৃহা থেকে জ্যাকব ছেলে উইলিয়ামকে শহরে পাঠায় কাজের জন্য। একথাও সত্য উইলিয়াম নিজেই দু-একজনকে স্বীকার করে গেছে যে সে-ই সিনথিয়ার ঐ পেটের মালিক।

এদিকে কেরামত ফকির পানের পিক ফুৎ করে ফেলে ঘোষণা করে-

‘জাউরা, জাউরাই, হালায় পেট দিয়ে নামবে না, এহন পারন যায় পুরা নাওডা ডুবাইয়া দেওন, এলাকাবাসী আর সিনথির মায় কইলে মুই হে ব্যবস্তাও হরতে পারি।’

খবর রাষ্ট্র যা হওয়ার তা হয়। রেচেল অবশ্য প্রথমে চেয়েছে বিয়েটা, পরে চেয়েছে পেটের বিপদ নামিয়ে দিতে। কিন্তু খবর গোপন রাখার কোনো চেষ্টা সে করেনি। কেননা এসব খবর বাতাসে ছড়াবে তা না চাইলেও সেটা রেচেল আগেও ভেবেছে। কিন্তু জ্যাকবের চূড়ান্ত মনোভাব আঁচ করতে পেরে রেচেল প্রকৃতই ভেঙ্গে পড়ে। ফকিরের প্রস্তাব অনুযায়ী পুরো নৌকা ডুবিয়ে দেয়ার কথাও রেচেল দু’একবার ভেবেছে। সায় না পেয়ে নতুন যুক্তির সন্ধানে নেমেছে মন। সেক্ষেত্রে অবশ্য না চাইলেও জ্যাকবের প্রতিই রেচেলের কৃতজ্ঞতা প্রকাশিত হয় অন্তরে। জ্যাকবই তো যুক্তির নতুন পথে ঠেলে দেয় রেচেলকে-

‘কও, পোলা ঈশ্বরের নাইলে যিশুর।’

উপায়হীন রেচেলের এই একমাত্র পথই খোলা থাকে চলার জন্য।

ক্ষেতে গরুর হাল থামিয়ে আব্রাহাম রেচেলকে খোঁচে,

‘হোনলাম তোমার নাহি নাতি অইবে, তয় জামাই কেডা?’

আব্রাহামের অজানা ছিল না কিছুই, তার পরও কিছু যে জানা বাকি ছিল, তা বুঝল রেচেলের উত্তরের পর। রেচেল একটি ঐশী বাণী প্রচারের মতো বিশ্বাস, বিশ্বস্ততা ও আস্থার সঙ্গে বলে ফেলে,

‘জামাই সব সোন্তানের লাইগ্যা লাগে না, তয় হোনতেই যদি চাও একান্ত, পোলা অইল তোমার যিশুর।’

জেসাসের জন্ম সম্পর্কে বাইবেল তিন চোদ্দ বিয়াল্লিশ প্রজন্মের পারিবারিক কুষ্ঠিনামা বর্ণনাপূর্বক পরিচয় দেয়। আব্রাহাম থেকে কিং ডেভিড পর্যন্ত চোদ্দ প্রজন্ম, আবার কিং ডেভিড থেকে ১৪তম উত্তরাধিকার জোসিয়াহ-পুত্র জ্যাকোনিয়া পর্যন্ত যাঁরা প্রত্যাবর্তিত হন ব্যাবিলনে এবং অতঃপর জ্যাকোনিয়া থেকে ১৪তম পুরুষ জ্যাকবপুত্র জোসেফ পর্যন্ত। জেসাস যখন মাতা মেরির গর্ভে আসেন মেরি ছিলেন তখন শুধু জোসেফের বাগদত্তা স্ত্রী। সন্তানধারণ করার মতো কাছাকাছি জোসেফ-মেরি তখনও আসেননি। অথচ এরই মধ্যে কুমারী মেরি গর্ভবতী হয়ে পড়েন ঈশ্বরের পবিত্র ইচ্ছায়। জোসেফ তখন বিচ্ছেদের কথাই ভাবেন। কিন্তু স্বপ্নে তখন ঈশ্বরের পক্ষ থেকে এঞ্জেল দেখা দিয়ে বলেন, হে জোসেফ, রাজা ডেভিডের বংশধর তুমি, মেরিকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করতে দ্বিধা কোরো না, পবিত্র ঈশ্বরের ইচ্ছায়ই মেরি একটি পুত্রসন্তান গর্ভে ধারণ করেছে, তাকে তোমরা জেসাস নামে ডেকো, জেসাস-ই নৈরাজ্যকর সময় থেকে মানবকে সঠিক পথ নির্দেশনা দেবে। ঈশ্বর কর্তৃক বাইবেলে বাণী প্রণীত হয় এই ভাবে-

‘দেখো, এক কুমারী তার গর্ভে এক পুত্রসন্তান ধারণ করবে এবং তাকে ডাকা হবে ইমানুয়েল নামে।’

ইমানুয়েল শব্দের অর্থ ‘মানুষের ঈশ্বর’।

বেথলেহ্যামের নাজারোতে কুমারী মাতার ঈশ্বর পবিত্র ইচ্ছায় সন্তান জেসাসের পরিচয় দিতে বাইবেল- জেসাসের পিতা নন যিনি মেরির স্বামী সেই জোসেফের বিয়াল্লিশ প্রজন্মের কুষ্ঠিনামা বর্ণনা করে। যদি জোসেফের সঙ্গে জেসাসের পৈতৃক সম্পর্ক না-ই থেকে থাকে তা হলে জেসাসের পরিচয়ে বিয়াল্লিশ প্রজন্ম কোন প্রসঙ্গে রায় পায় তা রেচেলেরও বিয়াল্লিশ প্রজন্মের বোঝার সাধ্যি নেই। কারণ তারা এসবের কিছুই জানে না। সবই ভাসাভাসা। যিশুই ঈশ্বর, ঈশ্বরই তার প্রযত্নকারী এইসব।

অথচ জোহন ও রেচেলের কন্যা, সিনথিয়ার গর্ভের সম্ভাব্য সন্তান যিশুপুত্র ‘যিশু’ কি ঈশ্বর-পুত্র ‘যিশুর’ পরিচয়ের জন্য জ্যাকবপুত্র উইলিয়ামের স্বীকারোক্তিই যথেষ্ট।

সিনথির পেটে যিশুর পুত্র ঘোষণার পর মারমুখী রেচেল আর তেমন থাকে না। সকালে কন্যার প্রতি দরদি হয়ে নিজেই পান্তাভাত মেখে দেয় ধুরি-চিংড়ি পেঁয়াজ কেটে। দুপুর ও সকালের মাঝের ক্ষুধার জন্য শিকোয় তুলে রাখে বাদুড়ে-খাওয়া বীচিকলা। পুকুরের ঘাটে না নামতে দিয়ে জল গরম করে নাড়ার লছমীতে গা ডলে নাইয়ে দেয়। রেচেলের সেই যে ‘কে রে সিনথি’ প্রশ্নের শুরু থেকে মারমুখিতা তাতে সহসা সিনথিয়াকে নির্বাক থাকতেই প্ররোচিত করেছিল। ‘জবান গেছিনি’ বলে যতই রেচেল চেঁচিয়েছে সিনথি কথা বলেনি। প্রতিপক্ষের ঝড়ের মতো আচরণে সিনথিয়া বরং ঘাপটি মেরে থাকাই নিরাপদ মনে করেছে। কিন্তু যে সকাল থেকে রেচেল তুলা-নরম হয়ে মেয়েকে নাড়ার লছমীতে ঘষে আদর করেছে তখন থেকে সিনথিও বলা শুরু করে, অবশেষে কোলে পড়ে কেঁদেও ফেলে।

-জ্যাকবের পো উইলিয়াম পালাইয়া গেছে টাউনে, থাউক, কপালের লেহা না অইলে কি এইসব অয়! সবই যিশুর ইচ্ছা, পেডেরডাও অইলো যিশুর পোলা।’

নমনীয় মায়ের এসব যুক্তিতে সিনথিয়ারও ওই অবচেতন মন, নিজেকে মেরির সঙ্গে মিলিয়ে দ্যাখে।

সিনথিয়ার ঘটনা ‘পেট বাজছে’ শিরোনামে রাষ্ট্র হয় কল্পনানুরূপ। পাশাপাশি শ্রোতারা বিজ্ঞান-মনস্ক হয়ে ‘পেট-বাজানোর’ ব্যাটা লোকটিরও খোঁজ নিতে বাকি রাখে না। তা হলে খবর হয় তিনজনের, সিনথিয়া, উইলিয়াম ও পেটেরটার। কিন্তু কৌতূহলীদের বিজ্ঞান-মনস্কতায় উইলিয়ামের কথা জানলেও সংস্কারের ঊর্ধ্বে তো আর কিছু আশা করা যায় না। ফলে উইলিয়াম ও পৌষ-মাঘের মসৃণ ধুলার রাত, এর সবকিছু ঝাপসা হয়ে মিলিয়ে যেতে থাকে অতি দ্রুত ‘শ্রোতাদের’ স্মৃতি থেকে। ভাদ্রের সকালের সূর্যটার মতো ভীষণ দুর্নামের আলো ছড়াতে থাকে সিনথিয়া ও পেটেরটা। এইভাবে সিনথিয়া মা রেচেলের সামান্য সমর্থন ছাড়া নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে।

সামাজিক নিঃসঙ্গতা ও অসহায়ত্ব বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে মায়ের বলা যুক্তির উপরে সিনথির নির্ভরতা ও বিশ্বাস বাড়তে থাকে। মনে হয় তাই তো, যিশুর ছেলে ভাবতেই দোষের কী, সবই যদি চলে তাঁর ইচ্ছায়? কিন্তু একথা মনে হলেই উইলিয়ামকে দ্যাখে চোখের সামনে কেমন করে পউলের ভিটায় সিনথির চুল জড়িয়ে আছে। তবে কি মানুষের মধ্যেই থাকেন ঈশ্বর ও যিশু, উইলিয়ামের মধ্যেও কি? পাপবোধই হয় সিনথিয়ার মাতা মেরিকে নিজের ভেতর আবিষ্কার করতে গিয়ে। সজ্ঞানে সিনথিয়া এ পাপ গ্রহণ করতে চায় না।

বস্তুত রেচেলের কি সিনথিয়ার, ঈশ্বর বা যিশুর প্রকৃতার্থ সম্পর্কে অন্ধকারে বাস। কিন্তু অপরিস্ফুট একটি ধারণা থেকেই রেচেল সিনথির এ-সন্তানের কল্যাণের দিকটি ভেবে ওকথা ঘোষণা দিয়ে ফেলে। কিন্তু অদ্ভুত সমস্যা হয় সিনথিয়ার-ঈশ্বর, যিশু, উইলিয়াম, মাতা মেরি, সেসব তার কাছে একাকার হয়ে যায়।

মা রেচেল গ্রাম মাথায় তোলে ঝগড়া করে-

‘গোলামের-ফোয়রা বিশ্বাস হরতে চাও না কেয়া, জোহনের চ্যাটটা চিহন আছিল দেইক্কা, একটা বিশ্বাস হরবা আর একটা হরবা না, বিষয় কী।’

সিনথিয়ার পেটে যিশুর ইচ্ছের সন্তান বিশ্বাস না করায় রেচেল খুব ভয়াবহ যুক্তি দিয়ে ফেলে। যিশুর জন্মকেই দাঁড় করিয়ে দেয় সিনথির পেটেরটার পাশে। মাতা মেরিকে তুল্য করে বর্ণিত হয় সিনথিয়া। দাঁড়াস রেচেল ফিরে আসে পূর্ব অবস্থায়। হুমকি দিতে থাকে সবাইকে, যারা সিনথিয়ার গর্ভের সন্তান নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

‘ফাঁস কইরা দিমু সবাইর খবর, কেডা কেডা এই গ্রামে যিশুর পোলা-মাইয়া আছ, কার ঘরে কোন যিশুর পোলা, আর কারে বোলায় পাপু, বেশি কতা কবা না কইলাম।’

যারা সিনথিয়ার ব্যাপারে আগে আগ্রহ প্রকাশ করেছে তাদের দু’চারজনের নাম নিয়ে রেচেল বলেও ফেলেছে-

‘এরিখের মায় যে মোরে জিগাইলে, হ্যা এরিখ যারে পাপু বোলায় হে কি এরিখের পাপু, মেগডি দেহি গরুর গরে হুইলে কত্তা মানের লগে...।’

এভাবে রেচেল আক্রমণাত্মক হয়। ফলে সিনথিয়ার সম্ভাব্য সন্তান নিয়ে উৎসাহীদের আগ্রহে টান পড়ে, পাছে কিনা উৎসাহীও ‘যিশু-পুত্রে’ পরিণত হয়। বরং উৎসাহীরা এখন রেচেলের কথাই মেনে নেয়ার পক্ষে। তারাও বলাবলি শুরু করে-‘ঠিক আচে, সিনথির পেডেরডারে নাইলে যিশুর পোলাই কইলাম।’

কী অদ্ভুত, গ্রাম-সুদ্ধ লোক উইলিয়ামের ব্যাপারটা ছাপিয়ে যিশুর পুত্র হবে সিনথির গর্ভে সেটাই বিশ্বাস করতে শুরু করেছে।

অবশেষে আশ্বিনের এক রাতে সিনথিয়া একটি কন্যাসন্তান প্রসব করে।


হায়! ঈশ্বরের পবিত্র ইচ্ছায় এক পুত্রসন্তান জেসাস ভূমিষ্ঠ হয় দুহাজার বছর আগে। অথচ ও সময়ে দয়াময় ঈশ্বরের কোনো কন্যাসন্তান পবিত্র ইচ্ছায় জন্ম নিলে আজ সিনথির গর্ভের ভূমিষ্ঠ নবজাতক, রেচেল ও সিনথির বেঁচে থাকার গ্রহণযোগ্য একটা যুক্তি হয়তো থাকত।


নিউইয়র্ক, আগস্ট ১৯৯৬।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন