রবিবার, ৬ জানুয়ারী, ২০১৩

পেলেকার লুঙ্গি

আনোয়ার শাহাদাত


পুবাল বাতাসে কলম ফরাজী তার ছেঁড়া লুঙ্গি আর ডান হাতে সামলাতে পারে না। বাম বগলে বৈঠা চেপে সে-হাতও ব্যস্ত রাখে লুঙ্গি ঠিক করার কাজে। এ-ফাঁকে হাল-ছাড়া নৌকা নিয়ন্ত্রণ-হীন হয়ে পড়ে আড়াইটা পাক খায়। কোনও কাজ হয় না, না নৌকার হাল ঠিক রাখা, না ‘পুরুষাঙ্গ’ ‘অণ্ডকোষ’ ‘হাবিজাবি’ এসব সামলানো। ছেঁড়া লুঙ্গি ঠিকই ফ্যাত-ফ্যাত শব্দ করে উলটে গিয়ে কলম ফরাজীর লজ্জা উন্মুক্ত করে দেয়। নৌকার গলুইতে পাল হাতে ধরা দাঁড়িয়ে থাকা দুই নাতি চেঁচিয়ে ওঠে তখন,


-‘দাদু, তোমার বেবাকগুইন জিনিসপত্তর দেহন যায়।’ ছয় বছর ও সাড়ে সাত বছরের নাতিদের তখন কলম ফরাজী অন্যদিকে মনোযোগী করায় সচেষ্ট হয়- ‘হালার বাই হালারা, বুড়া মানুর খিরাই-ফাডা ওলডা দেহনের কী অইলে, বাদাম ধর ঠিক কইররা!’


ফরাজী নিজেই আবার বৈঠা ঠিক করে খাড়া চাড়ি মেরে হাল ধরে। বাতাসের উলটো দিকে মুখ উঁচিয়ে জোরে গলা ছেড়ে ডাকে ‘পবন, পবন!’ অর্থাৎ আরও বেশি বাতাসকে সে আহ্বান করছে বাতাসের প্রতি সম্মানিত সম্বোধনে ‘পবন পবন’ ডাকে।


শ্রাবণের এই দরিয়ায় দাদু-নাতিরা এখন চলছে। পুবাল হাওয়ায় দুই নাতি হাবেল আর কাবেল পাল তুলেছে ছোট্ট ডিঙির গুলুইতে। কলম ফরাজী পেছনের চড়াটিতে বসে ছেওয়ের বাম দিকে বৈঠা ফেলে শক্ত করে হাল ধরেছে। তিন মাঝিমাল্লাই সমস্বরে আহ্বান করছে আরও অধিক বাতাস ‘পবন- পবন’ যাতে এই নৌকা বাইচ আরও সফল হয়।


তারা আসল দরিয়ায় নয় এখন। সোমনাথপুরের বর্ষায় আউশ ধানের ক্ষেত, জলাভূমি, শ্রাবণের পূর্ণিমার জোবায় সাগর থেকে ঠেলে-পুরে দক্ষিণাঞ্চলে যে-জল উঠেছে তা নামার আগেই আবার অমাবস্যার জোবা এসে গেছে। ফলে পুরো দিনের আলো ঝড়ের সন্ধ্যা-আকাশের রূপ ধরেছে। পাগলাটে আকাশে গুড়ো বৃষ্টি উড়ছে বর্ষার নির্মেঘ আকাশে যেমন গুটিপোকার পঙ্গপাল নামে। জোয়ারের জল ক্ষেতের পেট ফাঁপিয়েছে মরা গোরুর মতো। বীজধানের ক্ষেত তো কথাই নেই, ভিটার পাটক্ষেতও ভাসিয়েছে তুফান। বিশাল ক্ষেতের কোথাও আলের উপর বেড়ে-ওঠা নিঃসঙ্গ খেজুর গাছগুলোই দাঁড়িয়ে আছে বাতাসের ঝাপটায় বিধ্বস্ত মাথা নিয়ে। এ-গ্রাম ও-গ্রামের মাঝখানে অবাধ জলরাশিতে ঢেউয়ের হিল্লোলে কলম ফরাজী নাতিদের এটা দরিয়াই ভেবে নিতে বলেছে।


ডুবে যাওয়ার আগে বিলের মাঝে যে ছোট খাল ছিল তার শেষ-মাথার জলায় শাপলা ধরেছে প্রচুর। জল পেয়ে শাপলা আরও দীর্ঘ হয়ে উপরে ভাসিয়েছে মাথা। লম্বা শাপলার ঝাড় তুলে এনে রেঁধে ডাওর-দিন চালিয়ে নেবে এমন পরিকল্পনা করে কলম ফরাজী নৌকায় উঠে বসে। আমগাছের শেকড়ের সঙ্গে বাঁধা নৌকার রশির বান খুলে নাতিদের ‘জোংরা’সহ আসতে বলে ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টির হাত থেকে পিঠ বাঁচানোর জন্য। বড় নাতি হাবেলের পরনের লুঙ্গি খুলে দুভাই লুঙ্গির দুইপ্রান্ত বাতাসের উলটোদিকে ধরে নৌকার গলুইর গুড়ায় দাঁড়িয়ে বাদাম-নামক পাল তোলে। নাতিদের বানানো লুঙ্গি-পালে বাতাস লেগে নৌকা জোরে চলা শুরু করার পরই দাদু হাল ধরে শান্ত হয়ে বসে দিগম্বর নাতিদের খোঁচা মেরে কথা বলে- ‘মোর হালাগো দেহি লজ্জাশরমের মাতাডা খাওয়া গেছে। দুইডা ছিলা ক্যালা, ল্যাংডা ফহির অইচে।’ এর পরই দাদুর লুঙ্গি বাতাসে উলটে যায় যেমন পুঁটিতে ঠোকর বসাবে বলে অপেক্ষারত স্থির বলাকারা পাখা অনাকাঙ্ক্ষিত দমকা বাতাসে উলটে গিয়ে ডানার নিচের বিবর্ণ মাংস বেরিয়ে পরে। আর তখনই নাতিরা চেঁচিয়ে ওঠে- দাদুর বেবাকগুইন জিনিস দেহন যায়।


কলম ফরাজীর বড় নাতি হাবেল লাফিয়ে পড়ে ডুব দিয়ে শাপলার ঝাড় ছিঁড়তে থাকে। কাবেল টেনে টেনে নৌকায় তোলে সেই শাপলা। দাদু বৈঠা পালটিয়ে লগি পুঁতে, নৌকা রশি দিয়ে লগির সঙ্গে বেঁধে দেয়।


শাপলা তোলা হলে পরে সে-পরিমাণ উচ্ছ্বাস দাদুর থাকে না যে-পরিমাণ তার শুরুতে ছিল। বাড়ি ফিরতে হবে এবার বাতাসের উলটো দিকে। পাল তোলা নয়, গুলুইতে বৈঠা মেরে পাছায় লগি খুঁচে যেতে হবে। সতেরো-হাতি লম্বা নল-বাঁশের লগি বড় নাতি হাবেল খোঁচা শুরু করে। অনভ্যস্ত কাঁচা হাতের লগি কাদায় আটকে যায়। টেনে তুলতে গিয়ে নৌকার ছেওয়ের সঙ্গে লগি বাড়ি খেয়ে ত্বরিত চক্কর খায়। দিগম্বর হাবেল উলটে পড়ে যায় ক্ষেত দরিয়ায়। এ সময় কলম ফরাজী গুলইর চরাটি খুলে হুক্কা আর আগুনের তাওয়া বের কের হাবেলের উদ্দেশ্যে বলে-


‘হালার বাই হালা তুমি চালাহি হরতে গেলা ক্যা লগি বাইতে যাইয়া-


শাপলা-ভরা আধা-ডোবা নৌকা ঢেউয়ে দুলে পূর্ব থেকে পশ্চিম-উত্তর কোণে যেতে থাকে। নৌকার তলায় পানি জমে যাওয়ায় মাঝের জোড়া গুড়ার উপর বসে কাবেল নারকেলের আইচা দিয়ে সেচ শুরু করে। সেচের তুলনায় পানি কমছে না। নৌকায় এত পানি ওঠায় কাবেল রেগে ‘পানি ওডার মায়রে চুদি’ বলে গালাগাল শুরু করে। কাবেলের এই মৌখিক ধর্ষণ-পর্বে একাধিক বস্তু যোগ হতে থাকে। আইচা, চ্যাটের নাও, নাওয়ের গুড়া, হাফলার ফুল, ‘দাদুর হুক্কা তাওয়া’ কিছুই কাবেলের ধর্ষণ থেকে বাদ পড়ে না। হাবেল আর একদফা ভিজে একটু ঠাণ্ডা কাতর হয়ে সামনের চরাটিতে লুঙ্গির মধ্যে ঢুকে কুণ্ডলী দিয়ে থাকে। কলম ফরাজী তার তামাক সাজাতে সাজাতে কাবেলকে বলে -


‘আরে হালা তুমি অত কাম করবা কেমনে, লুঙ্গিডা দুই বাই মিল্লা আবার বাদাম ধরো, এততা হহালে বাড়ীতে যাইয়া করমুডা কী, খইয়া ধান থাকলে তো তোর মায়রে কইতাম ভাইজ্জা দেতে, হ্যার চাইয়া লও নাও বাইচ খেলি।’


দাদুর মুখে ‘নাও বাইচ খেলি’ শুনে দু'নাতি পুরো উদ্যমে আবার পাল ধরে। কলম ফরাজী এবার হাল না ধরে তার তামাক সাজানো নিয়ে ব্যস্ত থাকে। নৌকা পালের হাওয়ায় চলতে চলতে আড়াআড়ি পাশের গ্রামের ছাড়া ভিটায় ভেড়ে। ভিটার কান্দি ঝুলে কাত হয়ে থাকা শবরী পেয়ারা-গাছের নিচে নৌকা থামে। কলম ফরাজী হুক্কা রেখে রশি দিয়ে পেয়ারার ডালে নৌকা বাঁধে। হাবেল পেয়ারার ডাল ঝুলে বানর-প্রক্রিয়ায় পেয়ারা ছেঁড়ে। লাল বড় ডাইয়া পিঁপড়া কেটে দেয় তার পিঠ। নৌকা থেকে কাবেল এডাল-সেডালের হিন্দইররা রঙ্গের পেয়ারা দেখাতে থাকে। দাদু যখন হুক্কার খোল থেকে বাড়তি পানি দরিয়ায় ফেলে গড়গড় করে টানতে থাকে তখন হাবেল গুড়ায় পা ফেলে ফেলে দাদুকে পেয়ারা দিয়ে লুঙ্গি প্রসঙ্গ ওঠায়-


‘দাদু এবারগো পৌষা খোন্দে বাবো আইলে তুমি আর কাবেল দুইডা লুঙ্গি কেনবা, বাপেরে কইয়া পারলে মোরেও একখানা কেনাইয়া দিও দাদু।’


কলম ফরাজী হুক্কায় সুখটান দিয়ে খোলের ছিদ্রের পাশের পানি মুছে যে দীর্ঘশ্বাস ফেলে তার সঙ্গে কাশি ওঠে,


-‘হয়, এবারগো যদি তোর বাফে কিছু টাহা-পয়সা লইয়া আইতে পারে ঢাহা দিয়া, হ্যা পারে কি না সোন্দেহ, দক্ষিণ কান্দার মোবারক কইছে ঢাহার মানষে এ বচ্ছর দালান-কোডা বানায় না, যোগাইল্লাইর কামের খুব টান।’


কলম ফরাজী থেমে ডান হাত বাম হাত ঝুলিয়ে দেয়। দুহাতের কবজা সহসা পানিতে ডুবে যায়। ভেজা হাত তুলে গলায় মুখে ঘষে নাতিদের একটি পুরোনো কিসসায় নিয়ে যায় যেমন করে রাতে দু'নাতিকে নানান কিসসা শোনায়।


-‘খুব আউশ আছেলে পুতের টাহায় একফির একজোড়া পেলেকার লোঙ্গি পিনমু, হে আউশ আর মনেত কয় পুরাইবে না।’


বড় তালুকদারকে সে প্রথম প্লেকার্ড লুঙ্গি পরতে দেখেছে। ‘স্টাইকেন’-পরা পায়ের গিরা পর্যন্ত ঝুলিয়ে পরা লুঙ্গি তালুকদার বাম হাতে হাঁটু পর্যন্ত টেনে তোলে। তিন-ব্যাটারি লাইট বগলে চেপে কেমন পা টেনে টেনে হাঁটে তালুকদার, সে প্রায়ই কথা বলে সাহেবদের সঙ্গে। নাতিরা দাদুর পেলেকার লুঙ্গির কিসসার তেমন কিছু বুঝে উঠতে পারে না ‘পিন্দনের লুঙ্গি’ অংশটুকু ছাড়া। তবুও তারা শোনে।


‘মেলা সোন আগের কাতা।’ কিন্তু কত সন আগের কথা সে হিসেব কলম ফরাজী দিতে পারে না। ‘বিনদেশিগো লগে যুইদ্য’ এটা ঠিক। নাতিরা প্রশ্ন করে- ‘বিনদেশি কারা?’ ‘হেরা খানসেনা’ , এর কিছু বোঝে না নাতিরা। দাদাও আর বোঝাতে পারে না। কিন্তু বাঙালি যে খানসেনারা পিঁপড়ার মতে ‘লায়খে লায়খে’ মেরেছে সেটা দাদু বোঝাতে পারে এইভাবে - ‘মোগোরে মারবে।’


নাতিরা বুঝতে পারে ‘মোরাই বাঙালি’।


‘কিন্তুক হেগোর লগে মোগোর মইদ্দে দিয়াও কিছু জোটছে ফফর, কী জানি কইত হেগোর, ওই উত্তর কান্দার আলাদার বাড়ির ছোডো মেয়ার নামের নাম।’


কলম ফরাজী উত্তর কান্দার হাওলাদার বাড়ির ছোটমিয়ার নাম মনে করার চেষ্টা করে তার কিসসা থামিয়ে। ছোট মিয়ার নাম তার মনে পারে –রেজ্জাক।


‘হেগোর কইত “রেজাকার”।’


ছোট নাতি কাবেল দাদুর আসল গল্পে ফিরে যেতে চায়, শিশুদের যা স্বভাব।


‘দাদু তোমার পেলেকার লোঙ্গি।’


তখন অগ্রহায়ণের শেষ। খালের জোয়ারভাটার জোর কম। শুধু সে-বছরই ‘পৌষা খোন্দে’ খালে বাঁধ দেয়া হয়নি কলম ফরাজীর মনে পড়ে। তারই মধ্যে কিনা বাড়ির সামনে তোকমাখালি গুদি-ঘাটে একজনের লাশ ভাসতে দেখা যায়। লাশের মাথা পানির নিচে। মানুষের মাথা যে পুরো দেহের চাইতে বেশি ভারী সে-রকম তথ্য সম্পর্কে কলম ফরাজী তখনই অবহিত হয় লাশের মাথা ডুবন্ত বলে। সে-রকম কাঁঠালতলী হাটের শ্রীমন্ত গাং কি বিশ-খালি গাং-এ বহু লাশ ভাসতে দেখা গেছে সে শুনেছে, দেখেছেও একবার, কিন্তু একেবারে বাড়ির সামনের ছোট খালে লাশ!


‘মানু মরলে বুজি লাশ অয় দাদু?’ কলম ফরাজী একথার প্রেক্ষিতে বিরক্তি প্রকাশ করে- ‘কেচ্ছার মধ্যে বাও হাত দেবা না, হুনতে থাহ, খালি মরলে লাশ অইবে ক্যা, কোনও কোনও সোময় জিন্দা লাশও অয়!’ দাদুর প্রকাশে আক্ষেপের সুর বেজে ওঠে। ‘তয় কতা অইল যাইয়া তোকমাহালি গুদি-ঘাটে ঝাউর বাঁশের লগে লাশ সায়ক্ষাত নিজে বাইজ্জা রইচে।’


মাছেরা মানুষের ভুঁড়ির সঙ্গে অন্যকিছুর তফাত না পেয়ে ঠোকর দিয়ে বের করেছে লাশের নাড়িভুঁড়ি।


‘যুয্যমান’ পরিবেশের কারণেই নিঃসন্দেহে ‘কার লাশ, কেমনে আইল, কহন কাম বানাইলে কেডা’ এসব প্রশ্ন সামনে আসে না। দিনভর নানা লোক আসে, নানা কথা বলে লাশ নিয়ে, আবার চলে যায়। ওদিন বিকেলে লাশ-ভাসা তোকমাখালি গুদি-ঘাটের খালের বেরি রাস্তায় আস্তর-কাঠির মজিদ মওলানাও একজন পথিক। অতি-উৎসাহী মজিদ মওলানা ধা-ধা করে যোগ হয় খালের পারের দর্শনার্থীদের সঙ্গে। কাফিলা গাছের ডাল ভেঙ্গে লুঙ্গি গুটিয়ে মজিদ মওলানা খালের চরে নামে। কচা দিয়ে ডুবন্ত মুণ্ড খুঁচিয়ে জলের উপরে তুলে সোল্লাসে ঘোষণা দেয়-


‘ওরে হারামজাদা, তুই, এ্যাহানে মরতে আইচ! বাইসব, ও অইল যাইয়া বেতাগীর আডের সাঁইটের রেজাকার, অর দাফটে কোন হালায় থাকপা ঐ এলাকায়, কইলাম ও মইররাও যদি শন্তিতে থাকতে দে এই গ্রামে।’


নৌকার মাঝগুড়ায় দাঁড়িয়ে ডালি বরাবর কাবেল পানিতে ঝরঝর শব্দে পেশাব শুরু করে দাদুকে গল্পের গোড়ায় টেনে নামানোর জন্যে জিজ্ঞেস করে


-‘দাদু তোমার পেলেকার লঙ্গি?’


মজিদ মাওলানার চিহ্নিত বেতাগীর হাটের ডাকসাইটে রাজাকারের লাশ ঝাউয়ের বাঁশে জড়িয়ে মাথা ডুবিয়ে ভাটার স্রোতে ভাসে, তখন তোকমাখালির গুদি-ঘাটে মরিচ ক্ষেতে চারার গোঁড়ায় মাটি কোপায় কলম ফরাজী খালের অন্যপারে। এপার থেকে লাশ দর্শনার্থীদের ভেতর থেক একজন কলম ফরাজীকে সতর্ক করে-


‘তুমি খাল পারানের কালে হুশ কইর‍্যা পারাইও, হালায় না আবার তোমার কাফুর টাইন্না ধরে! জ্যাতা থাকতে বোলে হুনছি জ্বালাইবে দুইন্নার মানু।’


সাঁজ আসতে খাল-পার জনশূন্য হয়। ঝাউ, স্রোত, কাশ, সব মানুষের চোখও আগ্রহমুক্ত হয়ে পড়ে। মরিচ-ক্ষেতে তখনও চারার গোঁড়ার মাটিতে কাঁচি ঢুকিয়ে ব্যস্ত মোচড় মারে কলম ফরাজী। প্রতিটি চারার গোঁড়ায় মাটির আস্তর হাতের প্রলেপে যথাযথ করে। আর বর্ষা না হলে মাটি জমাই হবে না, ঝুরঝুরে থাকবে। শুধু খালপারে নয়, পুরো এলাকায় আর কোনও মানুষের অস্তিত্ব টের পাওয়া যায় না, যখন কলম ফরাজীর মরিচ-ক্ষেতের চারার গোঁড়ার মাটি কোপানো শেষ হয়।


তারার আলোয় পরনের লুঙ্গি না ভিজিয়ে খাল পার হয় কলম ফরাজী। কিন্তু লাশ ভেসে থাকা খাল পার হওয়ার সময় কলম ফরাজী ও লাশের মধ্যে কাপড় টানাটানির ঘটনা ঘটে। তবে এমন নয় যে লাশ কলম ফরাজীর লুঙ্গি-কাপড় টেনে ধরল। কলম ফরাজীই বরং লাশের পরনের কাপড় পায়ের দিক থেকে টেনে বের করল। সাদা জমিনে কালো বা বাদামি রঙের চেক, তালুকদারের পরনের লুঙ্গিকে হার মানায়।


পেয়ারা-গাছের ডাল থেকে নৌকার রশি খুলে দিয়েছে কলম ফরাজী। বৈঠা গলুইতে বসা হাবেলের দিকে এগিয়ে দিয়ে সে লগিতে খোঁচা শুরু করে। হাবেল বৈঠায় জোরে টান মেরে পেছনে ফিরে দাদুকে আবারও কৌতূহল প্রকাশ করে,


-যদি তোমরে মরাডায় টাইন্না ধরতে!


-পারতে না, একটা মন্তর পড়ছি হেই সময়।


-কী মন্তর দাদু?


-যে মন্তরডা পইড়াই মোগোর পোয়াডি হুনছি জিততা গেচে।


-দাদু মন্তরডা কও, মোরও ডর লাগলে পড়মু।


-মনে নাই দাদু, মেলা দিন অইয়া গেচে না, আর হেই মন্তরে এহন দগ আচে কি না, কাম অয় কি না হেই-বা জানে কেডা!


শাপলাভরা নৌকা নিয়ে দাদু-নাতিরা পুবাল বাতাসের উলটো দিকে যাচ্ছে। হাবেল গলুইতে বৈঠার থাবা মারে। মাঝ-গুড়ায় বসে কাবেল নারকেলের আইচায় পানি সেঁচে হরদম। উলটো বাতাসে নৌকা বাইচ বহু ‘মেন্নতের’ কাজ। কলম ফরাজী সেই মেহনতে লগিতে খোঁচা মারে।


কিন্তু মাঝপথে ঠিক গভীর বিলে যখন ডেউ নৌকার ডালিতে বাড়ি খেয়ে দাদু ও নাতিদের ভিজিয়ে ফেলছে তখন আবারও কাবেল আইচা থামিয়ে জানতে চায়,


-‘দাদু তোমার পেলেকার লুঙ্গি?’


‘অপ্রতিরোধ্য পবন’, মাথাভাঙা খ্যাপাটে ঢেউ, ‘পেলেকার’ লুঙ্গির বেদনা, খোল-ভরতি শাপলা নৌকার হাল ঠিক রাখা, এসব প্রতিকূলতার মধ্যে দাদু চাইলেও নাতিকে বলতে পরে না-


‘খালবিলে আবার লাশ না ভাসলে পেলেকার লোঙ্গি পামু কই?’



নিউইয়র্ক, মে ’১৯৯৬।



লেখক পরিচিতি

আনোয়ার শাহাদাত

জন্ম বরিশালে। কৃষক পরিবারে।
গল্পগ্রন্থ : ক্যানভেসার গল্পকার, পেলেকার লুঙ্গী।
উপন্যাস : সাঁজোয়া তলে মুরগা।
চলচ্চিত্র : কারিগর।
শর্ট ফিল্ম : ন্যানী।
দীর্ঘদিন নিউ ইয়র্কে থাকেন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন