মঙ্গলবার, ১ জানুয়ারী, ২০১৩

হেরুকের বীণা


অদিতি ফাল্গুনী


"রাজার ভিত্তি হলো রাজকোষ ও সৈন্যবাহিনী, সৈন্যবাহিনীর ভিত্তি হলো রাজকোষ। আবার সৈন্যবাহিনী হলো সমস্ত ধর্মের (কর্তব্যসমূহের) ভিত্তি। যে ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে সমস্ত প্রজামণ্ডলী।'
মহাভারত: ১২, ১৩০, ৩৫


"তুমি সিংহের মতো সব কৌমগুলোকে ভক্ষণ করে। ব্যাঘ্রের মতো শত্রুদের পরাস্ত কর। শুধুমাত্র ব্রাহ্মণ্যশ্রেণী ছাড়া অন্য সকল প্রজামণ্ডলীই রাজার ভক্ষ্য। জোঁক যেভাবে রক্ত শোষণ করে, রাজারও সেভাবেই খাজনা আদায় করা কর্তব্য।'
অর্থ (রাষ্ট্রশক্তি) ও শতপথ ব্রাহ্মণ


স্বপ্নের মতো অন্তর্লীন কোন বিষণ্ন পৃথিবীর অধিবাসে সক্রীড়ক ক্লান্ত সময়। সে এক অনাদি নগরী ছিল। নগরী নয়। নগরপল্লী। টিলার পর্য্যঙ্কে স্থাপিত সুভিক্ষ নগরী। ভোগের, ব্যসনের, দ্যূতক্রীড়া ও অত্যুজ্জ্বল পানোৎসবের রাজধনী যে সুভিক্ষ নগরী, তারই বহির্রেখার অন্ধকারভাগে তার অবস্থান। তাই নগরী নয়, নগরতলি। লোকে ডাকে ধরন্ত পল্লী। শস্য ও স্বর্ণ-ঋদ্ধ নগরী সুভিক্ষ। পর্যাপ্ত ভিক্ষা পাওয়া যায় বলে সুপ্রচুর ভিক্ষুর বাস। নাম তাই সুভিক্ষ নগরী। তমলুক ও ভরতকচ্ছের নীলাচল সমুদ্রবন্দরদ্বয় খুব দূরে নয় ত' সুভিক্ষ হতে। সুভিক্ষর ক্ষেমি (রেশম), মোম কি অগুরু সমুদ্রপথে বোর্ণিওপেলান (পেনাং) যায় না বুঝি? সুভিক্ষর রাজকোষ আর মন্দিরসমূহ তাই স্বত:ই স্বর্ণে-হীরকে পূর্ণ। অথচ কী পরিহাস, সুভিক্ষরই বহির্রেখার অন্ধকারে যে ধলন্ত নগরী, সেখানে কারো পেটিকায় নিষ্ক (স্বর্ণমুদ্রা) ভরপুর আর কারো পেটিকায় নিষ্ক দূরে থাক, কড়ি-বুড়ি কিছুই থাকে না।

এ সেই সময়ের কথা যতদিনে সিংহের মতো শক্তিমান সম্রাট ছেদ করেছে অরণ্য, গড়েছে নগরী। ভুক্তি, মন্ডল, বীথি, গ্রামের অনুষঙ্গে গড়ে ওঠা সে কী সুবিস্তীর্ণ নগরী! সম্রাট, মহামাত্র, সামন্ত, মহাসামন্ত, দূতক, মহাপত্রীহার, মহাপিলুপতি, পঞ্চাধিকরণোপরিক, পুরপালোপরিক, কুমারমাত্য (আয়ুক্তক), অধিকরণীক, নগরশ্রেষ্ঠ, প্রথম সার্থবাহ, প্রথম কুলিক ও প্রথম কায়স্থ, মহত্তর, অগ্রহারিন, খাড়গি, বাহনায়ক, কুলবারকৃত, গ্রামিক, ব্যাপারীণ এবং এই অভিজাত সকলের অগ্রে ব্রাহ্মণগন যাদের অধিকারে আছে সোম, তাই এমনকি খোদ সম্রাটও অর্ঘ্য দিয়ে চলেন তাদের...ধলন্ত পল্লীর অধিবাসীরা তাদের দাস মাত্র। এই অভিজাত ও ব্রাহ্মণগণ চাটিল-তিল্লো-কজ্জলিকা-লক্ষ্মীঙ্করার কেউ নয়। তাদের অধিকারে আছে সোম-দণ্ড-ন্যায়-অঙ্গদ-পরিবর্তক অর্থের রাজকোষ, সৈন্যদল-অশ্বদল-হস্তীদল। কাজেই, তথাগত প্রচারিত ধম্মের শরণ যারা নিয়েছিল, সেই ভিক্ষুদলও ক্রমশ ব্রাহ্মণের নৈকট্যপ্রসাদ প্রার্থনায় ব্রতী হয়। যদিও সূচনায় তাদের ধর্ম ছিল রাজদ্রোহী। যদিও সূচনায় তাদের ধম্ম ছিল ব্রাহ্মণদ্রোহী। যদি প্রশ্ন হয়, ব্রাহ্মণ কে? তবে এর উত্তরে ত' বলতেই হবে যে ব্রাহ্মণ হলো সেই, আকাশ ও পৃথিবীর যাবতীয় প্রাচীন রহস্য যার আয়ত্ব, যে আবিষ্কার করেছে ব্রহ্ম, কবিতা ও কর্মবাদের মতো যাবতীয় প্রাচীন বিজ্ঞান, তবু হায় জ্ঞান তাকে কোনদিন উদার করতে পারেনি! বারবার তাকে টেনে নিয়ে গেছে ভূমিজ স্বার্থ-রমণী-স্বর্ণ-বিষয়ের দিকে। আর অর্থই কি সে পরিবর্তক নয়, যা বৌদ্ধ সম্রাট ও বৌদ্ধ ভিক্ষুদেরও ক্রমশ শ্রেণীভেদে উৎসাহী করে তোলে? তাই ব্রাহ্মণ ও ভিক্ষু পরস্পর আলিঙ্গন করে। ক্রমশ:ই সঙ্ঘগুলো ছিন্ন হয় রাজধর্ম থেকে। আর চাটিল-তিল্লো-কজ্জলিকা বা লঙ্কীঙ্করা? অর্থ, সুরম্য প্রাসাদ, বিচিত্র বর্ণ অঙ্গদ, দণ্ড কোনদিনই তাদের আয়ত্তে ছিল না। তবে তারা জানত স্বয়ং সম্রাটও তাদের ধর্মের অনুসারী। অথচ, পশ্চিম হতে আসা বহিরাগত ব্রাহ্মণরাই ক্রমাগত হস্তগত করছে আধিপত্য। যদিও সেই দেশে, সেই অনাদি সুভিক্ষ নগরীতে তখনো বৌদ্ধশাসন চলছিল।

সুভিক্ষর বহির্রেখার অন্ধকারভাগে ধলন্ত পল্লী, টিলার পর্য্যঙ্কে তার স্থিতি, শুক্লাপঞ্চমীর এক ঝকঝক রাতে চাটিল, তিল্লো, কজ্জলিকা ও লক্ষ্মীঙ্করা...এই চার বান্ধব পক্ষকাল স্বেদবাহী পরিশ্রমের পর মিলিত হয় টিলায়। এদের ভেতর যা কিছু কড়ি কজ্জলিকাই উপায় করে। কজ্জলিকার শরীর সুন্দর। সে সম্পন্ন করেছে নৃত্যকুশল, বীণাবাদন ও বুদ্ধনাটক, তবু আজ অবধি রূপক, দিনার বা নিস্ক তার কাছে দূরাগত স্বপ্নই রয়ে গেছে। যদিও এদের ভেতর যা কিছু কড়ি কজ্জলিকাই অর্জন করে। চাটিল বেকার ও অলস। শৈশবে মা তাকে এক প্রথম কুলিকের গৃহে কাজে দেবার পর বছর ষোলর মাথায় কেন সে বরখাস্ত হলো, কেউই জানে না। চাটিল কিছুতেই মুখ খোলে না এ ব্যাপারে। শুঁড়িখানায় দিনমান পড়ে থাকে। শুঁড়ি দারিক ও তার বউ শুঁড়িনী প্রায়ই তাকে বিড়াল-পার করতে ওঠে। চাটিলের লাউয়ের খোলে তখন বেজে ওঠে অব্যর্থ সুর,

ফিটিলিউ গো মাই অন্তউডি চাহি 
জা এথু চাহম সো এথু নাহি
 
পহিলে বিআন মোর বাসন পুড়া
 
নাড়ি বিআরম্ভে সেঅ বাপুড়া।।


তখন শুঁড়িনীর চোখ শ্রাবণের প্রথম মেঘ। আরো এক ঘঢ়া কঙ্গুচিনা রাখে সে চাটিলের সামনে, "খা, বাবা। খা। তোর কড়ি লাগবে না।' চাটিলের গানই কড়ি। গানই তার পরিবর্তক অর্থ। জীবনকে সুশোভন করার মত পর্যাপ্ত না হলেও দৈনন্দিনের কঙ্গুচিনা মিটাতে তা সমর্থ।

তিল্লোর এত বড় শরীর। হরিণের পিছু পিছু দৌড়ায় যখন সে, হরিণের খুরের মতই তার পা বাতাসে অদৃশ্য হয়ে যায়। তবু আজকাল ব্রাহ্মণ নাড়িআরা আর রাজকর্মচারীরা বড় বেশি প্রতারণা করছে। নিষ্কে নিষ্কে ভরা নাকি ওদের পেটিকা। অথচ মাংস নিয়ে একটি কড়িও দ্যায় না। বলে, "পরে দেব।' আর দ্যায় না। একবারের জায়গায় দু'বার চাইতে গেলে মারধোর করে। লক্ষ্মীঙ্করাকে বোঝা দায়। হাঁড়িতে তার ভাত নিতুই বাড়ন্ত, তবুও খেয়াপারে কড়ি-বুড়ি প্রায়ই সে নেয় না। বড় পুণ্যবতী। কিছু হলেই বলে, "দু'দিন পরে ত, মরেই যাব গো। কী আর হবে এত লোভের কড়ি বাড়িয়ে?'

কে বলবে গৌল্মিকের পুত্রের হাতে মাত্র এগারোতেই শরীরটা তার নষ্ট হয়েছিল? তারপর আরো কতবার আরো কতজন তার শরীরকে ব্যবহার করল? শুধুই কি রাজপুরুষ আর ব্রাহ্মণরা? স্বসমাজের লোকরাও তো কম করেনি। তবু, কজ্জলিকার মতো শরীরকে কড়ির উৎস বলে আজো ভাবে না লক্ষ্মীঙ্করা। মেহনতের কাজ করে সে, নৌকা বায়। কজ্জলিকার মতো খোঁপার টানটান দৃঢ়তা কী চটুল ভ্রুভঙ্গি নয়, নিথর জলজ্যোৎস্নার মত প্রশান্ত দৃষ্টি তার।

"লোভের কড়ি আবার কী?' শুক্লাপঞ্চমীর সেই ঝকঝক রাতে তেঁতুল পাতায় বিছানো অন্নের সার চাটতে চাটতে ধমকায় কজ্জলিকা, "এ ত' তোর পাওনা! দেখিস না শৌল্কিক কুত্তাগুলো--কানে সোনার কুন্তল পরে পাঁচ/ছ'জন সাঙ্গোপাঙ্গো নিয়ে আসে--তবু ছ'টা কড়ির জায়গায় সাতটা কড়ি কখনো দেয়?'

"চাটিল একটা গান কর!' বুড়ি শুঁড়িনী অনুরোধ করে।

"আর গান!'

"কেন?'

"রাজা বৌদ্ধ হয়ে বুদ্ধের ধর্ম ছেড়েছে। এই পাপ এখন সিংহাসনে ছায়া ফেলছে। পশ্চিম থেকে যে ব্রাহ্মণদের এনেছিল পালরা, আজ ঐ ব্রাহ্মণ জারুয়ারাই নিজ নিজ দেশ থেকে আত্মীয়-স্বজন, জ্ঞাতি-কুটুম্বে ভরিয়ে ফেলেছে সুভিক্ষ। মূর্খ বৌদ্ধরা ব্রাহ্মণদের রাজপদ দিল! এখন খোদ মহীপালের সিংহাসন নিয়ে টানাটানি। ভুলে গেল সবাই শশাঙ্কের কথা? কিভাবে ভেঙেছে বিহার? ধর্ষণ করেছে ভিক্ষুণীদের? আহ্‌ হেরুক! কোথায় তোমার বীণা? হেরুক, কোথায় তোমার বীণা?' অবিমিশ্র উত্তেজনা আর একনাগাড়ে কথা বলে যাওয়ার শ্রান্তিতে হাঁপায় চাটিল।

দেখতে দেখতে কখন যে ধলন্ত পল্লীর নর-নারী সবাই ভিড় করেছে। মেছুনি নিগুমা ভয়ে মুখে আঁচল চাপে, "তাহলে কী করব এখন? সনাতন ধর্ম গ্রহণ করব?'

"খুব মধু না সনাতন ধর্মে? কড়ি আছে তোর? কড়ি থাকলে সৎশূদ্র, কায়স্থ চাই কি ব্রাহ্মণের উপাধিও কেনা যেত। বলি, নিতম্বে নেই সুতো! তুই ত' অচ্ছুত!'

অদ্ভুত নৈ:শব্দ্যে ভরে যায় ধলন্তের কাঁচা, মলিন ও সঙ্কীর্ণ সড়ক। তেঁতুলের পাতায় বিছানো অন্নের সারস্বাদ পাকস্থলিতে মিইয়ে যায়। কঙ্গুচিনার ঘঢ়ায় গুনগুন করে নীলতনু মাছি। চাটিল তার পূর্ণ দৈর্ঘ্যে উঠে দাঁড়ায়। লাউয়ের খোলে আঙ্গুলগুলো দ্রুত পর্যটন করে। গম্ভীর খাদে এক বিরহচঞ্চলসুর বেজে চলে,

"জোইনি তঁই বিনু খনহি ন জীবমি 
তো মুহ চুম্বী কমলরস পিবমি।'

(যোগিনী, তোকে ছেড়ে এক মুহূর্তেও বাঁচব না। ওগো আয়, তোর মুখ চুম্বন করে কমলরস পান করি)।

দূরে তখন অরণ্য পুড়ে যাচ্ছিল। পুড়ে যাচ্ছিল উত্তরে রঙ্গন নদী ও দক্ষিণে নীলাচল সমুদ্রবন্দরমুখী জনপদ। সুভিক্ষ নগরীতে আগুন লেগেছে ততক্ষণে। অর্ধশতক কাল বৌদ্ধ পালরাজাদের পক্ষাশ্রয়ে লালিত ও পশ্চিম হতে বহিরাগত ব্রাহ্মণরা অমাত্য বিজয় সেনের নেতৃত্বে সেই মধ্যরাতে হঠাৎই শুরু করেছিল সংহার। লুণ্ঠন-ধর্ষণ-হত্যা-অগ্নিসংযোগ। অতর্কিতে তারা ঝাঁপিয়ে পড়ছিল বৌদ্ধবিহার স্তুপ ও চৈত্যগুলোয়। তারা চুর্ণ করছিল হেরুকের যুগনদ্ধ (শূন্যতা ও করুণা) মূর্তি। মারীচী, ত্রিমুখ, বিকটা, স্বাহাশ্রী যত বৌদ্ধ দেবদেবীর প্রতিমা! আর্যাবর্তের অপরাপর ব্রাহ্মণ রাজন্যরাও বাংলায় সৈন্য পাঠিয়েছিলেন বৌদ্ধ সংহার করতে। বঙালি সংহার করতে। ধলন্ত পল্লীতে মধ্যরাতের সে আগুন তখনো ছড়ায় নি। যদিও এক সহস্র কান্যকুজ ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়সৈন্য ধলন্তর শুঁড়ি-তেলি-কামার-মুচি-শবর-বেশ্যাদের রক্তফাগ খেলতে ঘোড়া ছুটিয়ে দিয়েছিল।

ধলন্তর অন্ত্যজ পল্লীর একমাত্র সিদ্ধান্তচার্য টঙ্গদেব তখন তার কুঁড়ের ভেতর বসে, রঙ্গন নদী ছাড়িয়ে উত্তরে হিমালয়ের ওপার হতে আসা দেশগুলোর মানুষদের সাথে শলা করছিলেন। ললিত পত্তনের (নেপালের) জেতারি, তেঙ্গুরিভাষী (ভুটানি) স্থগন (যার ঠাকুর্দ্দা দু' পুরুষ আগেও বঙালি ছিল। নেহাৎ এক মঙ্গার ক্ষুধা সইতে না পেরে উপত্যকার খাড়াই ধরে চলে গেছিল তেঙ্গুরিদের দেশে), লামাদের দেশের লো-চা-বা,নগ-ছো,জো-বা-র্জে ও হব্রোম-স্তোন-পা।

"অহিংসাই বৌদ্ধ মতের সারকথা। তবু আত্মরক্ষার অধিকার আছে সবার!'

টঙ্গদেবের চোখ বিস্ফারিত, "তোমাদের ধন্যবাদ লো-চা-বা, জেতারি, স্থগন! অতদূর থেকে বিপদের সঙ্কেত জেনেও তোমার আমার মত এক নগণ্য সিদ্ধাচার্যকে নিয়ে যাবার জন্য এসেছ। কিন্তু এ শবর পল্লীর সবাইকে ফেলে একা আমি ত' পালিয়ে যেতে পারি না। আমরা যুদ্ধ করবো। এ শবর পল্লীর প্রতিটি পুরুষ যুদ্ধ করবে। পারলে বরং তোমরা আমাদের যুবতী মেয়েদের লুকিয়ে নিয়ে যাও--তাদের আশ্রয় দিও তোমাদের দেশে...'

গাঢ় নিশ্বাস ফ্যালেন টঙ্গদেব। কুটীরের ঝাঁপ খুলে পল্লীর বৃহৎ উঠোনে নমিত পায়ে এসে দাঁড়ান। কেউ তাকে লক্ষ্য করল না। ঘোরতর শঙ্কা ও অনিশ্চতার ভেতরেও এই নিরন্ন, কৃষ্ণ মানুষগুলো গভীর উৎসবে মেতেছে। কোমরে সটান হাত দিয়ে মৃদঙ্গের তালে নাচছে কজ্জলিকা। চাটিলের হাতে বীণা। চাটিল। তাঁর প্রিয়তম শিষ্য। লক্ষীঙ্করাকে যোগিনী হিসেবে মনে মনে চাচ্ছিল সে কিছুদিন। শুধু প্রার্থনা ব্যক্ত করে উঠতে পারেনি। সে প্রার্থনার সময় কি আর পাবে চাটিল? এই অন্ত্যজ পল্লীর যুবতীরা, শৈশব থেকেই রাজপুরুষ আর ব্রাহ্মণদের হাতে নানাভাবে ব্যবহৃত হওয়াটা যাদের অলঙ্ঘ্যনীয় নিয়তি, যাদের কোনদিন রক্ষা করতে পারে নি শবরপল্লীর পুরুষরা... তাদের বরং ভিনদেশী পুরুষরাই নিয়ে যাক। হোক ভিনদেশী, তবু তারা বৌদ্ধ। করুক ভিনদেশী পুরুষরা বঙালী মেয়েদের বিয়ে! তবু ত' হিমালয়ের কোলে ওদের নিজস্ব ছোট ছোট কুঁড়ে হবে। শিশু হবে। মিশ্র রক্তের শিশু। চাটিল, তিল্লো, শান্তি, দারিক, মাহিত্তা, অচল...যুবকেরা সব যুদ্ধে যাক। নিশ্চিত মৃত্যুর আগে একবার অন্তত প্রতিরোধ করুক এই ধলন্ত পল্লী। যে ধলন্ত পল্লী শুধু তার ক্ষেমি (রেশম), মোম অগুরু, অজিন দিয়ে রাজকোষের গউথলিটি বৃদ্ধি করেছে। প্রতিবাদ করেনি কোন অন্যায়ের। কোনদিন।

"অদ্বঅ চিত্ত তরুতার হরউ তিহুঅনে বিস্থা 
করুণা ফুল্লিন্য ফল ধরই নামে পর উআর
 
...অপনে রচি ভব নির্বাণা মিছে লোঅ বন্ধাবএ অপনা ?'


চাটিলের বীণায় যেন আজ স্বয়ং হেরুক কথা বলছে। যুগনদ্ধ করুণা ও শূন্যতা। হে হেরুক, ভবও শূন্যরূপ। নির্বাণও শূন্যরূপ। ভব ও নির্বাণে কিছুই ভেদ নাই। মানুষ আপন মনে ভব রচনা করে, নির্বাণও রচনা করে। এভাবে তারা নিজেদেরই বৃদ্ধ করে কিন্তু পরমার্থ কিছুই কিছু নয়। সবই শূন্যময়।

আ: বড় ভাল গাইছে চাটিল।

টঙ্গদেব ভুটিয়া স্থগনকে ইশারা করেন। স্থগন সিদ্ধাচার্যের হাতে তুলে দিলেন বীণা। চাটিলের গান শেষ হওয়ার পথে। আজ রাতে টঙ্গদেবকেও বীণা বাজাতে হবে বৈকি। এতকাল এই বীণায় শুধু হেরুকের স্তব, করুণা ও শূন্যের স্তবই করা হয়েছে। এবার এই হেরুকের বীণায় টঙ্গদেব তবে নতুন সুর তুলুন। করুন প্রতিরোধের যুদ্ধ ঘোষণা। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন