রবিবার, ৩১ মার্চ, ২০১৩

বৃদ্ধাশ্রমে এক যুবতী

স্বপ্নময় চক্রবর্তী

এক বৃদ্ধাশ্রমের একটি ঘর। বৃদ্ধাশ্রমটি মফঃস্বলে। একটি ঘরে একা থাকেন সরস্বতী। বসন্ত কাল। সরস্বতী বারান্দায়। সরস্বতী একা।

সরস্বতী – ও পলাশ ও শিমূল আমার এ ঘুম কেন ভাঙালে
জানি না জানি না আমার এ মন কেন রাঙালে...।


পলাশ কোতায়? পলাশ কি একেনে ফোটে নাকি? সেই ছোটবেলায় দেখতুম শিমূলতলায়। সরস্বতী পুজোয় পলাশ লাগে। কতদিন সরস্বতী পুজো করি না। বাড়িতে কত্তুম। আমার নামও সরস্বতী। হি-হি। ম্যাট্রিক পাশ। বি.এ. পাশ দেওয়ার খুব শখ ছিল। বাবা যে বিয়ে দিয়ে দিল...।


বাতাসের ফাল্গুনী গান...
ভ’রে তোলে আঙিনা বিতান
দুলে ওঠে মাধবীর প্রাণ কি অনুরাগে
কপোতের বুকে ওই কত সুখে কপোতী ঘুমায়।

কপোত কোথায়? ডলির কোলে মাথা রেখে ভুতোটা ঘুমিয়ে আছে। এদিকে কখন বিকেল হয়ে গেছে ওদের খেয়াল নেই। দুপুরে বেশিক্ষণ ঘুমনো ভাল নয়কো।


কে এলি র‍্যা ... চাঁপা? চা এনিচিস? রেকে যা। দে বিস্কুটের থালাটা দে।


অ্যাই ভুতো, নে, বিস্কুট খা। তুই ভুতোরটা খেয়ে নিলি ডলি? তোকেও তো দিতুম। যত বলি ছেলেরাই স্বার্থপর হয়, মেয়েরা না, আমার কথাটা ‍পোমান করার জন্যই ভুতোর বিস্কুটটা তোর খাওয়া ঠিক হয়নি ডলি।

আমাদের এই বৃদ্ধাশ্রমটি কিন্তু বেশ। বারান্দায় দাঁড়ালে কী ভাল লাগে। নিমগাছটায় কচি কচি পাতা এয়েচে। একটা শিমূল গাছও দেখা যাচ্ছে আর একটা বেল গাছ। আর নদী।


ও নদী রে ... একটি কথা শুধাই শুধু তোমারে
বল কোথায় তোমার দেশ
তোমার নাইকি চলার শেষ ...

এটা নদী নয়কো, খাল, সরু খাল। কালো জলে প্লাস্টিক ভাসে। কাজলা নদীর জলে প্লাস্টিক ছলোছলো। এরই মধ্যে একটা কোকিল ডেকে উঠল। মরণ! মুখপোড়া কোকিল। থেমে গেলি কেন, ডাক, ডাক না ...।

আমার পাশের ঘরে থাকে অনুরাধা। ও কিন্তু অনেক লেখাপড়া জানা। ইস্কুলের দিদিমণি ছিল। অন্যদিন বিকেলে আমি আর অনু বারান্দায় বসে গপ্পো করি। আমি সন্ধ্যের পর টিভি দেখি। খুঁজে পেতে দেখি কোথাও উত্তমকুমারের বই দিয়েছে কি না। উত্তমকুমার পেলেই গ্যাঁট হয়ে বসে যাই। শেষ না হওয়া পর্যন্ত উঠি না। অনুরাধা বইপত্র পড়ে। অনুরাধা এখন নেই। ও কুণ্ডু স্পেশালে কাশ্মীর বেড়াতে গেছে। আমাকেও বলেছিল, টাকার জন্য ভাবনা নেই। খোকাকে বললেই দিয়ে দিত। আমার বড্ড বাতের ব্যথা। ওসব পাহাড়ি জায়গায় হাঁটাহাঁটি করতে পারব না বাপু।

আমাদের এই বৃদ্ধাশ্রমটার নাম পারিজাত। পারিজাত নাকি একটা ফুলের নাম। সগ্গে হয়। মরার আগেই সগ্গে। হি হি। সামনে একটা বাগান। পারিজাত না থাক, অপরাজিতা আছে। রজনীগন্ধার ঝাড় আছে। রজনীগন্ধার ডাঁটিগুলো সার বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকে, কেউ যখন আসে, রজনীগন্ধার ডাঁটিগুলো ইস্কুলের মেয়ের মত, সাদা শাড়ি পড়ে শাঁখ বাজায়।

মিথ্যে বলব কেন, খোকা আমাকে ভাল জায়গাতেই রেখেছে। খাওয়া-দাওয়া ভালই দেয়। শীতকালে পিঠে করে কাঁচা আমের ঝোল, সকালে কখনও বেলের পানা দেয়, রাতে কখনও কখনও লুচি, যাদের ডাইবিটিস, ওদের এসপেশাল খাবার। বর্ষায় দু’চারদিন ইলিশ মাছ হয়, বছরে দু-চারদিন চিংড়িও করে। আমি মাছ-টাছ খাই না। বেধবা মানুষ। মাছ যদিও খুব ভালবাসতুম, চিংড়ি মাছ। উত্তমকুমারও খুব চিংড়ি ভালবাসতেন, আমার কত্তাও।

ওই যে আমার কত্তা। দেয়ালে ছবিটা। ইশ, গ্যাঁদার মালাটা পুরোন হয়ে গেছে গো... চাঁপাকে দিয়ে একটা নতুন আনাব। আমার কত্তার চুলটা দেখ, কপালের কাছে কেমন ফুলো, শোন শোন গেরো বাজ, খোপ থেকে বেরো আজ, আকাশটা পেরো আজ... একদম মায়ামৃগ সিনেমার উত্তমকুমার। এই ছবিটা ওর বিয়ের পরপর তোলা। একদম আগেকার। পরের দিকের ছবি আমি রাখিনিকো। এটাই রেখেচি। উত্তমকুমারের মতো কিনা। যদি বলো এতই যদি উত্তমকুমারের শখ, একটা উত্তমকুমারের ছবি রাখোনি কেন?– লজ্জা করে না বুঝি? ঘরে একটা পরপুরুষ ঢোকাই আর কী!

আমার কত্তার নাম হল – ওই যে সাহেব পল্টনদের ‍যে নামে ডাকত, চৈতন্যের আরেক নাম – গয়ের ওকার, র-এ আকার, তার সঙ্গে জুড়ে দাও রাতের আকাশে যে থাকে, যার পূন্নিমে অমাবস্যা হয়। দুইয়ে মিলে কী হয়?– নামেও যেমন, দেখতেও তেমন। ফর্সা পানা মুখ, কপালের উপর ফুলো চুল, ঘাড়ের পিছনে ইউ কাট। একেই বলত উত্তম ছাঁট। আমাদের দুটো বাড়ি পরেই তো থাকত। ছাতে উঠে ঘুড়ি ওড়াত। আমিও ছাতে যেতুম বিকেলে, লুকায়। আমার দিকে দেকতে গিয়ে ওর ঘুড়ি ভোকাট্টা হয়ে যেত, হি হি। একদিন দেখি আমার ছাতে দুম করে কী একটা পড়ল। দেখি একটা ঠোঙা। ঠোঙার ভিতরে ঢিল। তার ভিতরে একটা কাগজ, আর কাগজের ভিতরে লেখা আমি দূর হতে তোমারেই দেখেছি আর মুগ্ধ এ চোখে চোখ রেকেছি। আমি ওটা পড়েই ধাঁ করে নিচে নেমে এলাম। পরদিনও ছাতে ওঠার জন্য মন আকুলি-বিকুলি করছিল, আবার বুকটাও ঢিপঢিপ করছিল। সেদিন বাদ গেল, পরদিন আবার উঠলাম। আমি তখন ক্লাস এইট।

যখন টেনে পড়ি, দু’জনে মিলে হারানো সুর দেখতে গেলাম। ম্যাটিনি শো। যখন ফুটপাথে আলুকাবলি খাচ্ছিলাম, তখন হারুকাকু আমাদের দেখে ফেলে। ব্যাস, বিয়ে। ওদের ছিল কাচের বিজনেস। বিয়ের পর আমার কত্তার সঙ্গে বেশি সিনেমায় যেতে পাত্তুম না। বৌদিদেরও সঙ্গে নিতে হত। ননদরাও কখনও কখনও। ছেলে যখন ইস্কুলে পড়ত, তখন লুকিয়ে লুকিয়ে একা একা দেকিচি অগ্নীশ্বর, মৌচাক, ছদ্মবেশী। বিয়ের আগে উত্তমকুমারের বই দেখিনি ভেবেচো, তাও দেকেচি, বৌদিদের সঙ্গে রাইকমল আর সাগরিকা। আর ওই যে খোকার বাবা, ওকে ভাল লেগেছিল কেন বলব? ওর যে উত্তমকুমারের মতো চুল ছিল...। চোখটাও...। কী নামে ডেকে বলব তোমাকে মন্দ করেছে আমাকে ওই দু’টি চোখে ...।

কে এখন দরজা ধাক্কায়?

কে?

একটি পুরুষ কণ্ঠ। আমি। চিনতে পারছ?


সরস্বতী। ওমা! আমি একি দেখছি। ও চাঁপা, ও বুঁচির মা, ও দারোয়ানজি, আমি কী দেখছি। ধুতি পাঞ্জাবি, সেই চুল, সেই চোখ, সেই হাসি। আমি কিন্তু বুঝতে পারছি না। এদিকে সুয্যি ডুবেছে আর ...

পুরুষকণ্ঠ। সূর্য ডোবার পালা আসে যদি আসুক

বেশ তো
গোধূলির রঙে হবে এ ধরণী স্বপ্নের দেশ তো
বেশ তো

সরস্বতী। আপনি উত্তমকুমার?

উত্তমকুমার। আমাকে চিনতে এতক্ষণ লাগল?

সরস্বতী। প্রথমেই তো বুঝেছিলাম। কিন্তু বিশ্বাস হয়নি যে। ওই গানটা গাইলেন বলে বিশ্বাস হল।

উত্তমকুমার। এতদিন জানতাম গোঁপ দিয়ে যায় চেনা।

সরস্বতী। ও মা, দাঁড়িয়ে রইলেন কেন? বসুন, এই চেয়ারটায় বসুন, বরঞ্চ আমার খাটে উঠে বসুন না, বালিশটা কোলে নিয়ে।

উত্তমকুমার। আপনাকে ব্যস্ত হতে হবে না, আমি ঠিক বসে যাব।

সরস্বতী। আমাকে আপনি বলবেন না। তুমি বলবেন। অ্যাঁ? বেণুদিকে কি আপনি বলেন, আমি তো বেণুদির চেয়েও ছোট। আমার তো সবে সেভেনটি ফোর চলছে। আর ছ’মাস পরই সাড়ে চুয়াত্তর, হি হি, আপনার আর সুচিত্রা সেনের প্রথম ছবি।

উত্তমকুমার। অত তাড়াতাড়ি তুমি হয় নাকি? আমার সিনেমা দেখনি?

সরস্বতী। সব দেখেছি। সব নয়, অনেক, অধিকাংশ। একদম কলঙ্কিনী কঙ্কাবতী পর্যন্ত।

উত্তমকুমার। তবে? দেখনি, আপনি থেকে তুমিতে যেতে ছ’সাত রীল খরচ হয়ে যায়।

সরস্বতী। আজকে ক’রীল হবে উত্তমদা? আচ্ছা, আমার কাছে কেন এলেন বেণুদির বাড়ি না গিয়ে? আচ্ছা, আপনি চা খাবেন না? চা না কফি? রাত্তিরে খেয়েদেয়ে যাবেন তো? প্লিজ খেয়ে যান, আজ শুনেছি রাত্তিরে চিংড়ির মালাইকারি হবে। এখানে গেস্টরাও এলাউ।

ইশ্ বড্ড বাজে বকছি, তাই না! আমার একটু বকবক করার স্বভাব। জানেন, আমাদের বৃদ্ধাশ্রমের যিনি ম্যানেজার আছেন না, জগদীশবাবু, উনি আমাদের রেজিস্টারের খাতার নামের পাশে পাশে সঙ্কেত লিখে রাখে ‘ঝগ’, পাগ, বক, খুক, এসব। মানে হল ঝগরুটে, পাগলাটে, বকবক করে, খুঁতখুঁতে, এসব। অনুরাধা বলছিল আমার নামের পাশে নাকি পাগ, আর বক দুটোই লেখা আছে।

উত্তমকুমার। মানে, আপনি পাগলাটে, আর খুব বকবক করেন?

সরস্বতী। তাই তো মানে দাঁড়াচ্ছে। আচ্ছা, আপনি কি চুপচাপ থাকতে ভালবাসেন নাকি ...

উত্তমকুমার। আমিও তো বকবক করি। তোমার মতোই।

সরস্বতী। এই তো, এই তো তুমি বলেছিলেন আমাকে। এক রীলও হয়নি। কী মজা! কী মজা!

উত্তমকুমার। তোমায় তো একদম বুচুর মত লাগছে। তুমি তো লাফাচ্ছো।

সরস্বতী। লাফাতে পারি না। হাঁটুতে ব্যথা তো। কিন্তু আমি ভেতরে ভেতরে লাফাচ্ছি, আমার এক্কাদোক্কা বেলার মতো। আমার ঢিল মেশানো চিঠি পাওয়ার দিনের মতো।

উত্তমকুমার। আইসক্রিম... আইসক্রিম...

সরস্বতী। ও আইসক্রিমওলা, একটা চৌকো আইসকিরিম দাও না।

উত্তমকুমার। যা লেবে ছে আনা –
যা লেবে ছে আনা
নিলামওলা ...

উত্তমকুমার। তুমি খুব ভাল মেয়ে।

সরস্বতী। ও গোরাদা, তুমি কেন ঢিল ছোঁড়? ঢিলের মধ্যে কী অসভ্য কথা লেখ। যদি ঢিল আমার মাথায় পড়ে?

উত্তমকুমার। আমি ব্যান্ডেজ বেধে দেব মাথায়।

সরস্বতী। এতদিন আসনি কেন তুমি? কতদিন অপেক্ষা করেছি।

এতদিন তো বসেছিলাম পথ চেয়ে আর দিন গুনে
দেখা পেলেম ফাল্গুনে।
ফাল্গুনে বিকশিত কাঞ্চন ফুল
ডালে ডালে পুঞ্জিত আম্র মুকুল...
বসন্তে ফুল গাঁথলো আমার জয়ের মালা
বইল প্রাণে... আমার ছেলেবেলা –

বুড়িবেলা একাকার হয়ে যাচ্ছে, আমার

গিরিবালা বালিকা বিদ্যালয় আর পারিজাত বৃদ্ধাশ্রম একাকার হয়ে যাচ্ছে গোরাদা... ইশ, গোরাদা বলছিলেন, আসলে ওর মধ্যেই তো দেখেছিলাম উত্তমকুমারের অংশকে। আর আজ? ভাবতে পারছি না সম্পূর্ণ উত্তমকুমার আমার সামনে।


উত্তমকুমার। উত্তমকুমার নিজেই কি সম্পূর্ণ নাকি বোকা মেয়ে। সম্পূর্ণ কিছু হয় নাকি?

সরস্বতী। জানি না বাবা। থাক ওসব কথা। একটা কথা জিজ্ঞাসা করি, অ্যাঁ? বলছিলাম কী, আপনার জন্ম তো সেই ১৯২৬ সালে। আজও কী করে সেই আগের মতোই আছেন?

উত্তমকুমার। আমারই চেতনার রঙে পান্না যেমন সবুজ, তোমার চেতনার রঙে উত্তম ষাট পেরোয় না।

সরস্বতী। এই, শুনুন না, সপ্তপদীতে রিনা ব্রাউন, মানে সুচিত্রা সেন আপনাকে দেখে মুখ ঘুরিয়ে নিল, খুব কষ্ট হয়েছিল না?

উত্তমকুমার। হবে না? খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। আর নিজের উপর খুব ঘেন্না হয়েছিল খোকাবাবু যখন জলে পড়ে গিয়ে...

সরস্বতী। যখন শ্যুটিং শেষ হয়ে যায়, হলে আগে, ম্যাটিনি-ইভিনিং-নাইট... দেখতে যেতেন?

উত্তম। যেতুম তো প্রথম দিকটায়।

সরস্বতী। কেমন লাগত?

উত্তম। বেশিরভাগ ছবি অর্ধেকের বেশি দেখতে পারতাম না। কিন্তু শো-এর পর কত যে সই দিতে হত...

সরস্বতী। এটা তো নায়কের ডায়লগ। শর্মিলা ঠাকুরকে বলেছিলেন আপনি।

উত্তম। এখন তোমাকে বললাম...


সরস্বতী। আমার কী সৌভাগ্য। যে ডায়লগটা শর্মিলা ঠাকুরকে বলেছিলেন– সেটা আমাকে বললেন...

উত্তম। তোমার আর শর্মিলার মধ্যে তফাৎ কোথায়?

সরস্বতী। কী যে বলেন। শর্মিলা হল নবাবের বউ। রাজপুরীতে থাকে। আমার তো একটা খুপরি।

উত্তম। নীড় ছোট, ক্ষতি নেই, আকাশ তো বড়।

সরস্বতী। তা অবিশ্যি ঠিক কথা, আকাশ তো বড়ই। বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশটা নিয়েই তো থাকি। এই আকাশে আমার মুক্তি আলোয় আলোয়, কিন্তু ওই তো, সামনেই ফ্ল্যাট উঠতে শুরু করেছে। আকাশটাও যাবে।

উত্তম। মনের ভিতরেও একটা আকাশ থাকে। মনটাই তো আসল। মেজাজ। মেজাজটাই তো আসল রাজা আমি রাজা নই।

সরস্বতী। জানি, এটা অমানুষ বইয়ের। বিপিনবাবুর কারন সুধা গানে আছে। উনি বিপিনবাবুর কারন সুধা খেতেন। একটু একটু। আপনিও। আমি জানি।

উত্তম। তুমি আমার সম্পর্কে এত জানো? বল তো দেখি পৃথিবী আমারে চায় সিনেমায় কে আমার নায়িকা ছিল?

সরস্বতী। মালা সিনহা।

উত্তম। বিশ্বজিৎ কোন ছবিতে আমার সঙ্গে ছিল?

সরস্বতী। জানি তো, মায়ামৃগ।

উত্তম। বাঃ এবার বলতো অলোক মুখার্জি কে?

সরস্বতী। যদি পারি, তাহলে আমার একটা অনুরোধ রাখবেন?

উত্তম। বল...

সরস্বতী। আপনার জীবনের কথা বলবেন? অনেক কথা, সেই ছোটবেলার কথা, ঘুড়ি ওড়াবার দিনগুলোর কথা, স্বপ্নে দেখা রাজকন্যের কথা, মান অভিমান, দুঃখ, অভিযোগ, অনুতাপ, ভালবাসা... আচ্ছা ভালবাসাটা কী?

উত্তম। ওটা আমি ভালই জানি। ভালবাসা মানে কারুর কাছে নিজেকে সমর্পণ করা নয়। নিজের যা কিছু ভাল, সেটাই সমর্পণ করা। যাকে তুমি ভালবাস, তাকে ফুল দাও। কাঁটা দিও না। তোমার হৃদয় সরোবরের পদ্ম দাও, পঙ্ক দিও না। অশ্রুর মুক্তা দাও, কান্নার ভানত্যাড়া দিও না।

সরস্বতী। বুঝতে পারছি না তো এটা কোন সিনেমার ডায়ালগ।

উত্তম। এটা কোনও পুরনো সিনেমার নয়। এই সিনেমার। আর ডায়লগটা আমার একার নয়। রবীন্দ্রনাথ আর আমার মেলানো।

সরস্বতী। ও নিলামওলা, একটা কুমকুম, একটা নেল পালিশ আর লাল ফিতে।

ওয়ানে করে, হয়ে যাও লাখপতি করে– অলোক মুখার্জি কে! তাহলে বলি, অলোক হল সেই লোক যে অ্যাকসিডেন্টে সব ভুলে গিয়েছিল। ওকে সারিয়ে তুলেছিল ডাঃ রমা ব্যানার্জি। হারানো সুর। একটা গোপন কথা বলব উত্তমকুমার, আমি মনে মনে কতদিন রমা ব্যানার্জি হয়ে অলোক মুখার্জির শিয়রের পাশে বসেছিলাম, কত রাত...

উত্তম। গোরাচাঁদবাবু জানেন সে কথা?

সরস্বতী। সবার মনের ভিতরে একটা সোনার কৌটো থাকে। রূপকথার কৌটোটা। শুধু সেই জানে, আর কেউ না।

উত্তম। তাহলে তো তোমার কথা রাখতেই হয়।

সরস্বতী। তা হলে আমরা অনেক গল্প করব? অনেক কথা! কথায় কথায় অনেক পথ। পথ বেয়ে অনেক কথা। আর এই পথ যদি না শেষ হয়, তবে কেমন হত তুমি বলো তো?

উত্তম। তুমিই বলো।

সরস্বতী। না-না তুমিই বলো।

উত্তম। তুমিই বলো না বাবা।

সরস্বতী। কথায় কথায় যদি রাত হয়ে যায়, রাতে এখানেই থেকে যাবেন, অ্যাঁ? এক ঘরে নয়, আলাদা ঘরে। অনুরাধা তো নেই। আপনি তো থেকেছিলেন। শুধু একটি বছর বইয়ে একটা বছর থেকে ছিলেন। একটি রাতেও তো। আমার এখানে একটা রাত থেকে যান প্লিজ। আমি অনুরাধার ঘরে আপনাকে পাঠাবো না। অনুরাধার চাদর, তোষক, বালিশ, অনুরাধার ঘরের হাওয়া কেন আপনার স্পর্শে ধনী হবে। আমার ঘরে থাকবেন আপনি। আমার ঘরে চিরদিনের জন্য থেকে যাক আমার এক্কাদোক্কা বেলা, আমার স্কিপিং বেলা, আমার দুই বিনুনি আর লাল ফিতের সোনা সোনা দিন।

আপনি ওই বিছানায় বসবেন, আমি মেঝেতে। আপনি বলবেন চম্পা চামেলি আর গোলাপের বাগে, আমি বলব এমনো মাধবী নিশি আসেনি তো আগে। আমার গলায় সন্ধ্যা মুখার্জির ভর হবে। উঃ।

আমি যখন ও ঘরে যাব, ওই ছবিটাকে সঙ্গে নিয়ে যাব। ওই উত্তমকুমারের মত চুলওলা লোকটাকে। আমার কত্তা। আমায় পাহারা দেবে। বলা যায় না তো– কম বয়সে কী যে হয়।

এক মিনিট। একটা ফোন এসেছে। আমার খোকা। হ্যাঁ বাবা, ভাল আছি। বাতের তেলটা আছে তো, ফুরোয়নি। পেন কিলার কত খাব বল? সব পেন কি ওষুধে যায়? শরীরের যত্ন করিস বাবা। না না, একা লাগবে কেন? কত সব আছে, ভাল থেকো বাবা।

শুনু মুনু শুনু মুনু মোবাইল সোনাটা আমার। তুমিই আমার খোকাবাবু। পয়লা বোশেখে তোমাকে নতুন জামা দেব। গরম লাগছে, তোমায় ফ্যানের তলায় রাখি।

কে? চাঁপা? কী হল? খাবার টাইম হয়ে গেল? না রে, আজ টিভি চালাইনি। একজন এসেছিলেন কি না ...

না, কে এসেছিল বলব না। সব কথা বলতে যাব কেন তোকে? *




লেখক পরিচিত
স্বপ্নময় চক্রবর্তী

জন্ম :১৯৫২, কলকাতায় স্কুল-কলেজে বিজ্ঞানের ছাত্র | পরে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এম.এ. | দেশলাই-এর সেলসম্যান হিসাবে কর্ম জীবনের শুরু | নানা জীবিকা বদলের পর বপ্র্তমানে আকাশবানীর সঙ্গে যুক্ত | সত্তর দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে লেখালেখির শুরু | প্রথম গল্প 'অমৃত'পত্রিকায় প্রকাশিত হলেও চত পত্র-পত্রিকাতেই লিখেছেন বেশি | প্রথম গল্প সংকলন 'ভুমিসূত্র' (১৯৮২) | প্রথম উপন্যাস 'চতুষ্পাঠী' প্রকাশিত হয় আনন্দবাজার পূজা সংখ্যায় (১৯৯২) | প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে বিশিষ্ট লেখকররূপে চিন্হিত হয়েছিলেন | দ্বিশতাধিক ছোট গল্প ও একাধিক উপন্যাসের লেখক স্বপ্নময় তাঁর 'অবন্তিনগর' উপন্যাসের জন্য পেয়েছেন বম্কিম পুরুস্কার (২০০৫) | এছাড়াও পেয়েছেন মানিক স্মৃতি পুরুস্কার, তারাশঙ্কর স্মৃতি পুরুস্কার, গল্পমেলা, ভারতব্যাস, আনন্দ-স্নোসেম ইত্যাদি পুরুস্কার | লেখালেখি ছাড়াও গণবিজ্ঞান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত |

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন