বুধবার, ১ মে, ২০১৩

ফটোগ্রাফি যেভাবে মারকেজকে সাহায্য করে


অনুবাদ : আজিজুল রাসেল

গাবরিয়েল গারসিয়া মারকেজের এই সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেলেন ইউনিভার্সিটি অব কলোরাডোর অধ্যাপক রেমন্ড লেসলি উইলিয়ামস। সাক্ষাৎকারটির শিরোনাম ছিল ‘দৃশ্যশিল্প, স্থান এবং লেখার কাব্যায়ন : গাবরিয়েল গারসিয়া মারকেজের সঙ্গে কথাবার্তা’। মারকেজ তার উপন্যাসে কোনো বিশেষ সময় বা স্থানের দৃশ্যকল্প তোলার ক্ষেত্রে সবচেবে বেশি আস্থা রাখেন ওই সময় বা স্থানের ফটোগ্রাফির উপর। কারণ দৃশ্যকল্প তৈরির কাজটি ফটোগ্রাফি যতটা সহজে করতে পারে কোনো দলিল-দস্তাবেজ বা গ্রন্থ তা পারে না। চমকপ্রদ এ তথ্যের জন্য সাক্ষাৎকারটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ।



গারসিয়া মারকেজ তাঁর সাহিত্যকর্মের জন্য সারা বিশ্বে সুবিদিত। অনেক গুরুত্বপূর্ণ সমালোচকই তাকে বর্তমান শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক হিসেবে বিবেচনা করেন। সার্থকতার মানদণ্ডে তাঁর একাধিক উপন্যাসই নোবেল পুরস্কার পাওয়ার উপযোগী। তিনি নোবেল পুরস্কার পেয়েছেনও— ‘নিঃসঙ্গতার একশ বছর’ উপন্যাসের জন্যে।  এখানে উইলিয়ামস আর মারকেজের মধ্যে কথাবার্তার নির্বাচিত কিছু অংশ অনূদিত হল।


রেমন্ড লেসলি উইলিয়ামস : শেষবার যখন আপনার সাথে কথা হয়েছিল আপনার আঁকা কিছু ছবি আমাকে দেখিয়েছিলেন। ছবিগুলো আপনার লেখায় ব্যবহার করেছেন। আপনার লেখায় দৃশ্যশিল্পের গুরুত্ব দেখে আমি মুগ্ধ হয়েছিলাম। আপনি হয়ত জানেন সমালোচকরা আপনার ফিকশনে টেক্সট অথবা লিখিত দলিলাদির উপরই গুরুত্বারোপ করে, বিশেষ করে যখন থেকে ইন্টারটেক্সটটুয়েলিটি জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে । আপনি কি মনে করেন আমরা টেক্সটুয়েলিটিতে গুরুত্ব দিয়ে কিছু হারাচ্ছি?

গাবরিয়েল গারসিয়া মারকেজ : আমি কোন লিখিত দলিল ব্যবহার করি না। আমি সাধারণত দলিলাদি খোঁজার জন্য পাগল হয়ে যাই এবং শেষ পর্যন্ত যখন পেয়ে যাই, সেগুলো ছুড়ে ফেলি। এরপর আমি আবার এগুলি খুঁজি এবং এগুলোতে আমি আর উৎসাহ পাই না। আমাকে সবকিছু আদর্শায়িত করতে হয়। ভালোবাসা সম্পর্কে ফ্লোরিনটিনো আরিজার যে ধারণা তা আদর্শায়িত হয়েছে ‘লাভ ইন দ্যা টাইম অব কলেরা’য়। আমার মনে হয়েছে যে ভালোবাসা সম্পর্কে ফ্লোরেনটিনোর যে ধারণা তা একেবারে আদর্শ। এবং এই ধারণা বাস্তব থেকে একেবারেই আলাদা।

উইলিয়ামস : আপনি কি বলবেন ভালোবাসার এই ধারণা তিনি পেয়েছেন তার পঠিত সাহিত্য থেকে?

মারকেজ : হ্যাঁ। বাজে কবিদের পাঠের মাধ্যমে। এটা একটা সাহিত্যিক ধারণা। এই ধারণাটি এসেছে বাজে কবিদের থেকে। আমার মনে হয় আমি অন্য কোথাও বলেছি, ‘নিকৃষ্ট কবিতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নিকৃষ্ট কবিতার মাধ্যমেই আপনি ভালো কবিতা পেতে পারেন।’ আমি যা বোঝাতে চাইছি তা হল, কবিতাপ্রেমী মফস্বল শহরের কোনো ছেলেকে যদি আপনি ভালেরি বা রিমবাউড অথবা হুইটম্যানের কবিতা দেখান, তবে তাদের কবিতা ছেলেটির কোনে কাজেই আসবে না। তাই এসব কবিদের কাছে যেতে হলে প্রথমে আপনাকে জনপ্রিয় রোমান্টিক কবিদের বাজে কবিতার ভিতর দিয়ে যেতে হবে। ফ্লোরিনটিনো যেমনটা জুলিও ফ্লোরেজের মতো (কলাম্বিয়ান একজন কবি যে তাঁর দেশে বেশ জনপ্রিয়) স্প্যানিশ অনেক রোমান্টিকদের পড়েছিলেন। আমি এখানে এরকম কারো নাম নিব না, কারণ তারা আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত নয়। ধরুন জাপানিরা আমার বই পড়ছে এবং আমি জুলিও ফ্লোরেজের কথা লিখছি। এখন আমি লেখার সময় সবসময়ই আমার অনুবাদকদের কথা চিন্তা করে লিখি।

উইলিয়ামস : এটা কী ‘নিঃসঙ্গতার একশ বছর (One hundred of solitude) থেকেই?

মারকেজ : না, ‘গোত্রপিতার হেমন্ত’ (Autumn of the patriarch) থেকে। যখন থেকে আমি অনুবাদকদের কাছ থেকে অনেক প্রশ্ন পেয়েছি। সবচেয়ে আশ্চর্যজনক ব্যাপার যে প্রায় সব বইয়ের ক্ষেত্রেই আমি একই রকম প্রশ্ন পেয়েছি।

উইলিয়ামস : ‘কলেরার দিনে প্রেম’-এ (Love in the time of cholera) দৃশ্যশিল্প এবং উনিশ শতকের নির্মাণ প্রসঙ্গে আসা যাক।

মারকেজ : এ বই লেখায় আমাকে বিশেষভাবে সাহায্য করেছে পোরট্রেট ফটো, পারিবারিক অ্যালবাম— এসব অনেক জিনিস।

 মোরগের লড়াইরত ছবি (চিত্র ১)
 ‘... লড়াইরত মোরগের এই ছবি আমাকে পুরো উপন্যাসের একটা সমাধান দেয়’


উইলিয়ামস : আপনি কি বলবেন আপনার দৃশ্যগত স্মৃতি আছে? আপনি কি দেখার উপর ভিত্তি করে কোন কিছু মনে রাখেন?

মারকেজ : আমি ঠিক জানি না এটা দৃশ্যগত স্মৃতি কিনা। একটা সময় মনে হল আমি সবসময়ই কিছুটা বিক্ষিপ্ত, যেন আমি কিছুটা মেঘের মধ্যে আছি। অন্তত আমার বন্ধুরা, মারসেডেস (স্ত্রীর নাম) এবং বাচ্চারা তাই বলে। আমি এরকম একটা ধারণা দেই, কিন্তু তারপর আমি পুঙ্খানুপুঙ্খ আবিষ্কার করি যা আমার সামনে পুরো পৃথিবী মেলে ধরে। এই অনুপুঙ্খ হতে পারে এমন কিছু যা আমি চিত্রকর্মের মধ্যে দেখি। হতে পারে লড়াইরত মোরগের এই ছবি (চিত্র ১) আমাকে পুরো উপন্যাসের একটা সমাধান দেয়। এটা এমন কিছু যা আমার ক্ষেত্রে হয়ে থাকে। আমি একেবারে প্যাসিভ বা অক্রিয় এবং এটা একটা আলোকচ্ছটার মত।

উইলিয়ামস : এই যে অনুপুঙ্খর কথা আপনি বললেন— এগুলো কি এমন কিছু যা আপনি দেখেন?

মারকেজ : এটা এমনই কিছু যা সবসময়ই আমি দেখি। এটা সবসময়ই, সবসময়ই একটি ছবি ব্যাতিক্রমহীনভাবে। অনেক আগে কুয়েরনাভাকায় একটি সাপ্তাহিক ছুটির দিনে একজন রাজনীতিবিদ আমার সাথে দেখা করতে এসেছিলেন। কিন্তু যখন সে বুধবার চলে গেল, আমি তাকে আমাদের আলাপচারিতার ১৬ পৃষ্ঠার একটি সারাংশ দিলাম। এই সারাংশে একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারও বাদ যায়নি। এটা কোন বিশিষ্ট কিছু না। শুধুমাত্র একটা ঘটনা/ধারণা যা দীর্ঘ সময় ধরে আমার মনে আছে। একারণেই আমি কখনও টোকা নেই না। যে বিষয়ে আগ্রহী তা আমি ভুলে যাই না। আর যে বিষয়ে আমার আগ্রহ নেই, তা একটু সময় পরেই আমি ভুলে যাই। তাই বলা যায় আমার স্মৃতিটা সিলেকটিভ, যা খুবই আয়েশি । এখন আমি যখন কোন বই সংশোধন করি পরবর্তীতে কম্পিউটারে সংশোধন করার জন্য আমি মার্জিনে নোট নেই। কম্পিউটার আমার জন্য একটা গুরুত্বপূর্ণ জিনিস। এটা বিশ্বের অনেক বড় আবিষ্কারের মধ্যে একটি। তারা যদি বিশ বছর আগে আমাকে একটি কম্পিউটার দিত তাহলে এখন আমার যতগুলো বই আছে তার দ্বিগুণ বই থাকত। যেমন আমি এই মুহূর্তে থিয়েটারের উপর একটা বই লিখছি এবং প্রতি রাতেই আমি আমার লেখা প্রিন্ট করি। আমি বিছানায় প্রিন্ট করা পৃষ্ঠা নিয়ে শুতে যাই। আমি এগুলো পড়ি, সংশোধন করি এবং মার্জিনে নোট নেই। এখন আমার চূড়ান্ত পৃষ্ঠায় প্রুফ দেখার সুযোগ রয়েছে। এর আগের লেখকরা টাইপরাইটারে শেষ পাঠ দিত এবং পাঠকরা দিত ছাপানো পৃষ্ঠায়। এখন আমি ছাপানো পৃষ্ঠায় সংশোধন করি, যেন এটা একটা বই।


আমি যখন গোত্রপিতার হেমন্ত লিখছিলাম, একটা অংশ নিয়ে খুব বিপাকে ছিলাম। প্রাসাদ সম্পর্কে এক প্রকার ধারণা আমার ছিল শুরুতে। কিন্তু এটা আমি ঠিকভাবে পাচ্ছিলাম না। এরপর একটি বইতে আমি এই ছবিটি পাই (চিত্র ২)। এই ছবিটি আমার উপন্যাস লেখার সমস্যাটি সমাধান করে দেয়


উইলিয়ামস : আপনি যা দেখতে পান তা কিভাবে আপনার উপন্যাসে রূপায়িত হয়?

মারকেজ : আমি যখন গোত্রপিতার হেমন্ত লিখছিলাম, একটা অংশ নিয়ে খুব বিপাকে ছিলাম। প্রাসাদ সম্পর্কে এক প্রকার ধারণা আমার ছিল শুরুতে। কিন্তু এটা আমি ঠিকভাবে পাচ্ছিলাম না। এরপর একটি বইতে আমি এই ছবিটি পাই (চিত্র ২)। এই ছবিটি আমার উপন্যাস লেখার সমস্যাটি সমাধান করে দেয়। এটা ছিল সেই ছবি যা আমার প্রয়োজন ছিল।

উইলিয়ামস : এটি ছিল একটি ধ্বংসপ্রায় প্রাসাদ এবং প্রথম পৃষ্ঠায় গরু সম্পর্কে বর্ণনা করা হয়েছে।

মারকেজ : এবং প্রতি অধ্যায়ের প্রথমে

উইলিয়ামস : আপনি কি ‘গোত্রপিতার হেমন্ত’ এবং ‘কলেরার দিনে প্রেম’ গ্রন্থে উনিশ শতকের ভ্রমণ কাহিনী থেকে কিছু ছবি ব্যবহার করেছেন?

মারকেজ : অন্যান্য গ্রন্থ থেকে ‘গোত্রপিতার হেমন্ত’ গ্রন্থে বেশি ব্যবহার করেছি। এই ড্রইংগুলো থেকে আমি অদ্ভূত কিছু জিনিস পেয়েছিলাম। যেমন গাছে ঝুলানো মৃত মোরগদের ছবি, যেগুলো মেরে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল।
একটি ধ্বংসপ্রায় প্রাসাদ। সিঁড়িতে গরু চরছে (চিত্র ২)
উইলিয়ামস : আপনি কি আরেকটু বিশদভাবে ব্যাখ্যা করতে পারবেন যে এই ড্রইংগুলো দিয়ে গোত্রপিতার হেমন্তে আপনি কি করেছিলেন?

মারকেজ : আমার একটি উদ্দেশ্য ছিল গোত্রপিতার হেমন্ত গ্রন্থে পুরো একটি বিশ্ব তৈরি করা। এটি ছিল এমন একটি বিশ্ব যা ভালোভাবে চিত্রায়িত হয়নি। জীবন সম্পর্কে কোন কিছু খুঁজে বের করতে হলে অনেক পড়ার দরকার। যখন ঘটনাক্রমে আমি এই বইটি দেখি, তখন আমি আমার লেখাটি ইতিমধ্যে শুরু করে দিয়েছি। এটি ছিল অনেকটা লটারির মত, যেমনটা সবসময়ই আমার সাথে ঘটে থাকে। জানি না কিভাবে, তবে আমি যখন কোন কিছু নিয়ে কাজ করা শুরু করি তখন আমার কাজ সম্পর্কিত অনেক কিছু আমার হাতে চলে আসে। এমনও হতে পারে যে জিনিসগুলো সেখানেই ছিল তবে আমি আগে এগুলো লক্ষ করিনি।

উইলিয়ামস : এই ছবিগুলো কি প্রাত্যহিক জীবন বর্ণনা করতে সাহায্য করেছিল ? ছবিগুলো কি টেক্সট থেকে বেশি সাহায্য করেছিল?

মারকেজ : টেক্সটের থেকেও কার্যকর। টেক্সটে অনেক পেপার থাকে। ড্রয়িংগুলো ছিল নোটের মত যেটা দৃশ্য তৈরিতে সাহায্য করেছিল।

উইলিয়ামস : এই ছবিগুলোর কথা বাদ দিয়ে আসা যাক আপনার নিজের জীবনের অভিজ্ঞতার কথায়। কলেরার দিনে প্রেমে ব্যাবহৃত ম্যাগডালেনা নদীর দৃশ্যের কথা এবার একটু বলুন। এই দৃশ্যগুলো কি ড্রয়িং থেকে নেয়া হয়েছিল?

মারকেজ : না, তা মোটেই না। এই নদী সম্পর্কে আমার জীবনের বিভিন্ন সময়ের গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা ছিল এবং প্রত্যেকটি অভিজ্ঞতাই আমার মনে বিভিন্ন ছবি এঁকেছে। পরবর্তীতে আমি এগুলো স্মরণ রেখেছিলাম। আমার বয়স যখন আট বা নয় বছর, তখন আমি প্রথম ম্যাগডালেনা নদীতে ঘুরে বেরিয়োছলাম। আমি প্রথমবারের মত আরাকাটা ছেড়েছিলাম যখন আমার দাদা মারা যায়। তখন আমি মাগানগু শহরে চলে আসি। আমি মাগানগুতে আমার বাবার সাথে নৌকায় ভ্রমণ করি। আমার বাবা তখন তার মা’কে দেখতে গিয়েছিলেন। আমার মনে হয় এটা ছিল ১৯৩৬ সাল।

উইলিয়ামস : অবশ্যই এই নদীটির কথাই কলেরার দিনে প্রেমে এসেছে। নদীটি আপনি কিভাবে এনেছিলেন এই উপন্যাসে?

মারকেজ : কলেরার দিনে প্রেমে আমি নদীতে দু’টি ভ্রমণ রেখেছিলাম। প্রথমটি হল, যখন ফ্লোরেনটিনো আরিজা ভিলা দে লেভায়া ছাড়ে। আমি এই ভ্রমণটি রেখেছিলাম কৌশলগত কারণে। কারণ দ্বিতীয় ভ্রমণে আমি নদী সম্পর্কিত বর্ণনা এড়াতে চেয়েছিলাম। কারণ সেটা করতে গেলে বর্ণনা অনেক বেশি হয়ে যেত এবং প্রসঙ্গ থেকে অনেক দূরে নিয়ে যাওয়া হত পাঠকদের।

উইলিয়ামস : মোটের উপর আপনি সত্যিকার নদী এবং উনবিংশ শতকের ড্রইংয়ে নদী যেভাবে এসেছে, এ দু’টির মধ্যে কি সম্পর্ক দেখেন? কারণ আপনার উপন্যাস এর সাথে যুক্ত।

মারকেজ : সে সময়ের নদীর সাথে আমার বেশ ভালো পরিচয় রয়েছে। ছবিগুলো আমাকে সাহায্য করেছে চিত্রশিল্পীরা কীভবে ভালো অথবা খারাপ, যাই হোক না কেন, উনিশ শতককে চিত্রায়িত করেছেন। ছবিতে আপনি এমন কিছু পাখি দেখবেন আসলে যেগুলোর অস্তিত্ব নেই। অথবা নারীদের যেভাবে চিত্রায়িত করা হয়েছে (দেখুন চিত্র ৩)। আপনি ছবিতে কিছু রূপবতী নারী দেখবেন। অর্থাৎ তাদেরকে ইউরোপীয়রা এভাবে দেখেছে। ছবিগুলো সত্যিকার অর্থেই অনেক চমৎকার।

চিত্রশিল্পীরা উনিশ শতককে যেভাবে চিত্রায়িত করেছেন (চিত্র ৩)
ছবিগুলো আমাকে সাহায্য করেছে চিত্রশিল্পীরা কীভবে ভালো অথবা খারাপ, যাই হোক না কেন, উনিশ শতককে চিত্রায়িত করেছেন। ছবিতে আপনি এমন কিছু পাখি দেখবেন আসলে যেগুলোর অস্তিত্ব নেই। অথবা নারীদের যেভাবে চিত্রায়িত করা হয়েছে। আপনি ছবিতে কিছু রূপবতী নারী দেখবেন। অর্থাৎ তাদেরকে ইউরোপীয়রা এভাবে দেখেছে


উইলিয়ামস : কলেরার দিনে প্রেমে ওই সময়ের দৈনন্দিন জীবনের অনেক কথা এসেছে যেগুলো ছবিতে দেখা যায় না। এটা থেকে বোঝা যায় ওই সময়ের হালচাল সম্পর্কে আপনার বিশদ ধারণা রয়েছে।

মারকেজ : আমি উনিশ শতকের দৈনন্দিন জীবনের খুঁটিনাটি অনেক পড়েছি। কিন্তু আপনাকে সতর্ক থাকতে হবে যেন ফাঁদে না পড়েন। কারণ আমি বাস্তবিক সময় এবং কাল সম্পর্কে খুব শ্রদ্ধাশীল নই।

উইলিয়ামস : আপনি কি কালপ্রমাদের কথা বলছেন?

মারকেজ : হ্যাঁ। কারণ আমি পুরোপুরি ইতিহাস অনুসরণ করে লিখি না। যে কেউ সহজেই দেখতে পাবে যে ভিক্টর হুগো বা অস্কার ওয়াইল্ড একসাথে প্যারিস যেতে পারতেন না। এটা যে কালপ্রমাদ বা দুর্ঘটনা এমন নয়। কিন্ত পরম্পরা ঠিক রাখার জন্য আমি যে বর্ণনা পছন্দ করেছিলাম তা আমি বদলাতে চাইনি। এই উপন্যাস কোন ঐতিহাসিক পুনর্নির্মাণ নয়। বরঞ্চ এখানে ঐতিহাসিক উপাদান কাব্যিকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। সব লেখকরাই এটা করে থাকেন।

উইলিয়ামস : কলেরার দিনে প্রেমে যে বাহ্যিক স্থানের কথা এসেছে তা মূলত কারতাগেনা, কলাম্বিয়া— কিন্তু কোন কোন সময় ভেরাক্রুজের ক্যাফে দ্যা লা পারোকুইয়া এবং মেক্সিকোর সাথে মিলে যায়। আমার মনে হয় আমাদের স্থানের কাব্যায়ন নিয়েও কিছু কথা বলা দরকার।

মারকেজ : কাফে দ্যা লা পারোকুইয়া খুব ভালোভাবেই কারতাগেনা হতে পারে। আসলে এগুলো একেবারে সদৃশ নয়। কারতাগেনার সব বৈশিষ্ট্য এর মধ্যে রয়েছে যাতে যে কেউ এই জায়গাটিকে কারতাগেনায় বলে মনে করতে পারেন। সত্যিকার অর্থে ভেরাক্রুজের ক্যাফে দ্যা লা পারোকুইয়া কারতাগেনায় হতে পারত যদি যেসব স্পেনিয়রা এটি তৈরি করেছিল তারা ভেরাক্রুজ না এসে কারতাগেনায় বসতি স্থাপন করত। এটা শুধু একটা সম্ভাবনা ছিল আরকি। আমার বউয়ের দাদার জন্য যেটা ঘটেছিল তা হল— তিনি ছিলেন একজন মিশরিয়, যিনি নিউইয়র্কের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিলেন এবং মাগানগুতে এসে যাত্রা শেষ করেছিলেন। হ্যাঁ, সেটা হতে পারে স্থানের এক ধরনের কাব্যায়ন— কিছুটা অতিরঞ্জন। কারতাগেনায় এখনও ভেরাক্রুজের ক্যাফে দ্যা লা পারোকুইয়ার মত একটা ক্যাফে দরকার। তাই আমি ভেরাক্রুজ থেকে একটা নিয়েছি, যেটা আমার উপন্যাসে দরকার ছিল কারতাগেনার জন্য। আমি যখন কারতাগেনায় যাই তখন আমি কখনও হঠাৎ অনুভব করি ভেরাক্রুজের ক্যাফে দ্যা লা পারোকুইয়ার মত কোন একটি জায়গায় আমি যেতে চাই। আমার এসব হোটেল এবং বারের মত জায়গায় যেতে হয় এবং আমি মাঝে মাঝে মনে করি কোনকিছু মিস করছি। এরকম স্বাধীনতা থাকা খুব চমকপ্রদ, তাই না?— যে লেখক বলতে পারে : ঠিক আছে আমি ক্যাফে দ্যা লা পারোকুইয়া যে জায়গায় ইচ্ছা সে জায়গায় বসাব। আমি প্রতিদিন লিখি আর নিজে নিজে বলি, জীবন উদ্ভাবন করা কি চমৎকার, যা আসলে আপনি করতে চান। যদিও কিছু নির্দিষ্ট আইনের মধ্য দিয়ে এটি করতে হয়, কারণ আপনি যখন চরিত্রগুলোকে মেরে ফেলতে চান, তখন তারা মরে না। আবার যখন আপনি তাদের জন্ম দিতে চান তখনও তারা জন্মে না। আমার এ সম্পর্কে একটি আবেগপূর্ণ অভিজ্ঞতা রয়েছে। এটা হয়েছে কলেরার দিনে প্রেম গ্রন্থে ফরমিনা ডাজার পরিবার নিয়ে, যখন সে একজন শিশু ছিল। আমি তার পুরো জীবন তৈরি করছিলাম ঘরের ভিতরে যেখানে সে তার বাবা এবং তার একজন অবিবাহিত ফুফুর সাথে থাকে। এই ঘরটা অনেকটা এখনকার দিনের কারতাগেনার প্লাজা ফারনান্দেজ মাদ্রিদের ওভেজা নেগ্রা বইয়ের দোকানের মত। আমি প্রথম খসড়া তৈরি করছিলাম। আমার কাছে ছিল তার বাবা, ফুফু এবং তার মা। কিন্তু তার মা চরিত্রটিকে আমার সবসময়ই অতিরিক্ত মনে হত। আমি ভাবতে পারছিলাম না, তার মা’কে নিয়ে কি করা যায়। তারা যখন ডিনার টেবিলে ছিল, তখন আমি তার বাবার মুখ ঠিকভাবে দেখতে পেতাম এবং আমি তার এবং তার ফুফুর মুখও ঠিকভাবে দেখতে পেতাম। কিন্তু তার মায়ের মুখ ছিল সব সময়ই ঝাঁপসা। আমি তাকে এক একভাবে কল্পনা করতাম। আমি তাকে বিভিন্নভাবে তৈরি করতাম, কিন্তু সে সবসময়ই আমার কাছে সমস্যা হিসেবে দেখা দিত। আমি বুঝতে পারছিলাম না তাকে নিয়ে কি করব। সে আমার উপন্যাস চালাচ্ছিল। ফুফু মেয়েটিকে স্কুলে নিয়ে যেত। বাবা কখনও বাড়িতে থাকত না। গৃহপরিচালিকা বাড়ির দেখাশুনা করত। কিন্তু মা কি করবে? তার কিছু করার নেই। এরপর হঠাৎ করে একদিন আমি ভাবি যে আমি একটা বিষয় নিয়েই পড়ে আছি। আমি অনুধাবন করলাম যা ঘটেছে তা হল— মেয়েটির জন্মের সময় তার মা মারা গিয়েছিল। এবং এ কারণেই তার ফুফু সেখানে ছিল। একারণেই যখন তার মা মারা যায় মেয়েটির বাবা তার ফুফুকে নিয়ে এসেছিল মেয়েটিকে বড় করতে। একারণেই গৃহপরিচালিকাকে বাড়ির সব দেখাশোনা করতে হত। আর এ কারণেই বাড়িতে মায়ের কিছু করার ছিল না। এটা আমার জন্য ছিল একটা মূল্যবান অভিজ্ঞতা এবং এটা ব্যাখ্যা দেয় যে মা চরিত্রটি কিভাবে সবসময় বেঁচে থাকত, যে সময় আমি আবিষ্কার করলাম যে সে মারা গিয়েছে। তাই তার উপস্থিতি সবসময় ঘরের মধ্যে থাকত এবং চরিত্ররা তার হয়ে কথা বলত। সে তার মেয়ের মধ্যে তার ছাপ রেখে গিয়েছিল। এই ঘটনাটি এটিরও ব্যাখ্যা দেয় যে, কেন বাবা সবসময় এত নিঃসঙ্গ থাকত এবং কেন তার ব্যাক্তিত্ব এরকম। আমি সব কিছুর সমাধান করেছিলাম যখন আমি বললাম, ‘আমার ভুল হয়েছে। আমি একজন মৃত মানুষকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছি। এই নারীটি মারা গিয়েছে।’ এই ধরনের ঘটনা আমার সব বইতেই ঘটে থাকে। এমন অনেক সময় থাকে যখন আপনার নিজস্ব জগতের বাইরে আপনার কোন রসদ থাকে না।


আজিজুল রাসেল : গল্পকারইতিহাস-গবেষক

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন