রবিবার, ১৯ মে, ২০১৩

নিষিদ্ধ পাখিওয়ালা-জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী



রমিত দে

বাস্তবিক তুমি এখন এক ভাসার দৃশ্য
গাছ ফাঁকা পড়ে রইল অনেকক্ষন
ফুল
ফুটল এবং
ঝরে গেল কখন?
পাখি, সেকি ফুলের দেওয়াল থেকে নিয়ে গেল
মধু আর মোমের সস্তা দাম্পত্য!
             উড়ে গেল বনের শরীর মাপতে!

এক একজনকে  এক একটা পাখির নাম দিয়ে ছেড়ে দিয়েছে।ব্যস । গোল্ডেন ফেঝাল্ট বলতেই ফার্ণ রোডের টুবলির শরীরটা চেহারাটা চোখের সামনে ভেসে উঠবে, কাঁকুলিয়া রোডের গোপা হল ফ্লেমিঙ্গো পাখি, একডালিয়া রোডের গৌরীর নাম পড়েছে সাতসয়ালী, রিজেন্ট পার্কের রুমির নাম ফটিকজল, বিচি রোদের চামেলীর নাম  চন্দনা আর পালক ঘামতে ঘামতে পাখিদের সাক্ষাৎকার নিতে পাখিরালয়ের অনিদ্রায় ঢুকে পড়েছে ধনু নামের এক পাখিওয়ালা ।
তার নাম রঞ্জুও হতে পারে কিংবা বিশেষ এক ধরনের গ্যাসের বাতি জ্বালিয়ে দিলেই সে নিশীথ কিংবা পলাশের মত ক্ষণবিহ্বল কোনো এক কোটেশনহীন ছায়াপ্রায় অনুমান।রুমাল দিয়ে ঘষে ঘষে সব ছবি মুছে দিলে সে উমেশ।দশ মিনিটের মধ্যে যে সব ছবি মুছে দিয়ে  নতুন পাখি বসাতে পারে কাঠের নবজাতক আয়তনে, খালি খোলা পাঁজর বুক বের করে দেখিয়ে দিতে পারে পাখি মানে ইঁট কাঠকয়লা দিয়ে এক একটা তেকোনা চিৎকারের গল্প, এক একটা দীর্ঘশ্বাস পালন। আর সবাইকে সীমান্তরক্ষীর মত ধনু বসিয়ে গেছে এই অনন্ত পক্ষীনিবাসের ধ্রুব জট কুড়োতে,জোড়া দিতে বলে গেছে সমস্তটুকু আকাশের, আলিঙ্গনের, তারা জানে এক  নতুন রকমের দরজা আছে বনবিভাগের বিশ্বাসে অথচ জানে না কাঠ এবং ক্র্যাচের ভেতর সেই স্বার্থপর ঘুনটির মেধা,জানেনা কীভাবে বেরোতে হয় রাত্রিবেলার কিছু ঘাম ঝরিয়ে, বেঁচে থাকার অভ্যেসের ভেতর কোথায় হারিয়েছে ডানার স্ক্রু !

সর্বনামকে টোকা মারার কোথায় সেই গুপ্তকথা ! কেবল এক পারমিয়েবল ধারনা আর ধারনাই সাদা কালো অবচেতনের ওপারে লুকোচুরি খেলে নিরীক্ষক স্বত্ত্বাটির সাথে, তেলচিত্রে আঁকা চৌখুপি মানুষগুলোর সাথে; ওরা একা হয়, পর্দা টানার শব্দে জুয়াঘরে খুলে বসে পাঁচশ পৃষ্ঠার সংকলন; ঝাপসা শীৎকারের ভেতররেও সরু সরু হাত নাড়ে সফেদ নির্বিকারে; তবে ধনু ,জ্যোৎস্না কিংবা জ্যোতিরিন্দ্র  এরা কারা? পায়চারী করতে আসে অনন্ত ট্র্যাপিজয়মের ভেতর! বেলুনের সুতো কেটে, বৃষ্টিতে ধুয়ে গিয়েও খোঁজে সমতলগুলো সূর্যোদয়গুলো,ধিঙ্গী কৃষ্ণগহ্বরের খুঁজে বেড়ায় নীহার কিংবা পলাশ নামের কোন চাবিওয়ালাকে ! ক্ষয়িষ্ণু ষড়ভূজ থেকে একা বেরিয়ে পড়ে রিক্ত পরিব্রাজক হয়ে কেবল অক্ষয় ক্ষতটির খোঁজে, পথিকস্বত্তায় লেগে থাকে পাথুরে বিশ্বাস, ফুরফুরে ব্যাধিমুক্তির গল্প; উদাসী অন্তরীক্ষের চিরভ্রাম্যমানতার স্পৃহা; কিন্তু ক্ষুদ্র মানুষের চূর্ণ টুকরো, মন্থনের ল্যান্ডস্কেপ যে আটানো যায়না সহজ চিরকূটে,মুদ্রিত হয়না খুদে হাড়ের গোলাপি রঙ, গাঁথবার রেওয়াজ; নাকি এই বাতাসতাড়িত মানুষগুলোকে এক আনকোরা সমান্তরালেই ছেড়ে যেতে চায় ধনু ! এই কি জ্যোতিরিন্দ্রের তন্নিষ্ট খেলাঘর! যেখানে মাটি ছেড়ে দিয়ে বালি আঁকড়ে ধরছে ছায়াগুলি ছত্রগুলি, ঊষর ত্রসরেনুর খাঁজে ইশারা রেখে যাচ্ছে অনিকেত ওয়েসিসের!Once the realilzation is accepted that even between the closet human beings infinite distances continue, a wonderful living side by side can grow, if they succeed in loving the distance between them which makes it possible for each to see the other whole aginst the sky।এমনই এক আটপৌরে আনকোরা এমনই এক প্রত্যাঘাতের অতিদৃশ্য জ্যোতিরিন্দ্র, উড়ে যাওয়ার সমান্তরাল সন্মোহন, এক আশ্চর্য অসমীকরন যে অন্বেষন করছে চামড়ার গায়ে লেগে থাকা চারাগাছগুলো, আত্মীয় সুহৃদ হয়ে মিশে যাচ্ছে অনাত্মীয় অনুধ্যানে; তেড়াবাঁকা এক নেশা যে জীবন্ত হবার রুচিতেই রাতকাবার করছে জীবন খুঁজতে খুঁজতে মাথার ভেতর তাঁর কেবল দু কলি, রুটম্যাপ হাওয়ায় উড়িয়ে খোঁজে স্থায়ী ঠিকানা

তবে কি জ্যোতিরিন্দ্র  স্থির সময়ক্ষনে দাঁড়াননি? ছুঁড়ে দেননি সরনশূন্য আঁধার যাত্রা? আসলে চলতে চলতে দেখা আর দেখবার জন্য থমকে দাঁড়ানো এক কথা নয় । আমি থমকে দাঁড়িয়েছিলাম। ঠিক সন্ধ্যার মুখে। গ্রীষ্মের সন্ধ্যা। বৈশাখ মাস। তাই বোধ করি সবটা রাস্তার দুপাশে খুব রাধাচূড়া ফুটেছিল.... তবে কি ভীড় অভাব এই উড়ুউড়ু সুলুকের থেকে  ভবঘুরে হলেন জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী! মাতৃশিকড়কে খুঁজতে জাল গুটিয়ে নিলেন সামান্য  কুঞ্জকানন , যুথিবলাকার ? না, নিরাপদে যাননি,যাননি পরিচয়লিপির দ্বিতীয়তায়। অর্ফিউসের ছদ্মবেশেও গড়তে চাননি ঈশ্বরদর্শনের সহলিপি, তাঁর ঘরমাটিআলোজল সঞ্চিত হয়েছে তৃতীয় ঋনের ঘরে , যা নিতান্ত কর্ষনের ভেতরের অতিরিক্ত মোকাসিন, তাৎক্ষনিক বিভোরের নয়, ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সেই অন্তিম নিভৃতি যা সমকালের যা স্পৃশ্যে জড়ানো ।  হাতের তালুতে মিশে গেছে সেই ব্রাত্যজনের রিল , মধ্যবিত্তের রিলিফ; সংরক্ষন না, শামিয়ানা বা শিবির না, প্রকৃতির প্রতিটি পরতকে প্রতিটা ফ্রেবিককে জ্যোতিরিন্দ্র স্থানান্তরিত করেছেন  তাঁর সর্বব্যাপিতায় তাঁর নিজস্বতায় - নির্বাকতায়, এ যেন এক নতুন কোরিওগ্রাফি । রিক্ত ফ্যাকাসে হলদে নিরক্ত গভীর বিপন্ন ছেঁড়াসব অমূর্তের মাঝে এ যেন প্রানস্রোতময় এক বিভাজিকা।

স্মৃতি বিস্মৃতি নৈঃশব্দ কোলাহল  ভাঙাচোরার মধ্যে ফারাকের মধ্যে জীবনের তো একটাই  গল্প,একই আত্মরতি, মানবপ্রানের  শতচ্ছিদ্র অসনাক্ততা ;  আর এরই মধ্যে লেখক খুঁজবেন কেবল বিযুক্তি; সেই ইনআর্টিকুলাসি,যা তাকে বীজ দেবে বেঁচে থাকার, পরীক্ষার, পর্যবেক্ষন ও পূর্ণতার; অস্তিত্বমুখর রঙের খেলার ভেতর লেখকের একমাত্র কাজ হল সেই তেরাস্তার মোড় খুঁজে বের করা যেখান থেকে তিনি প্রতক্ষ্য করবেন রিয়্যালিটি বিয়ন্ড দ্য রিয়্যালিটি, স্থানাঙ্ক নির্ণয় করবেন মুখহীন নামহীন ব্রীড়াগুলোর বৈরিতাগুলোর কাঁপনগুলোর; তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা নয়, জ্যোতিরিন্দ্রের জগৎমণ্ডল বহুস্বর সংলাপের, তাঁর পলিফোনার ডায়লগে লেগে আছে মৌরলা-খলসের আঁশটে গন্ধ, ভোরের বাতাস  আর ঝুপসির মত শ্যাওড়াগাছের কনফ্লিক্টগুলো;  তাঁর তত্ত্ব তাঁর ইগো তাঁর অবজেকটিভ আসলে অভিজ্ঞতাজাত , সেখানে কর্ষণযোগ্য মাটি তিনি খুঁড়ে এসেছিলেন সেই শৈশবেই; আনন্দ হাইস্কুলের ধনু ,ধূ ধূ গ্রাম-গাছপালা-ক্ষেতখামার-ধানক্ষেত-পাটক্ষেত আর ঝাঁক বেঁধে লাল ফড়িঙের উড়ে যাওয়া দেখে যার মুখ ভার হয়ে থাকত মেঘলা আকাশের মতো সে আসলে বাষ্পহীন মেঠো বনেটেই  খুঁজে নিয়েছিল আহ্লাদের একা জ্যোতিরিন্দ্রকে,  জানলা দিয়ে হাত গলাতেই পেয়ে গেছিল নাম ধরে ডাকা শ্রাবনের বিকেল  আর ক্ষুধিত বিকলাঙ্গ মানুষের বীজগুলোকে, যা ফুঁড়ে সুস্মিত মান্যতার কাছে পৌঁছতে চেয়েছে অগুনতি কুঁড়ি আর অস্বীকৃত মানুষের গ্রাফিত্তি; ধ্বনি প্রতিধ্বনি পেরিয়ে জ্যোতিরিন্দ্র সেখানেই সমাহিত , স্থিতধী; ক্ষতবিক্ষত সমাজের আঁচটুকু, আহার-মৈথুনটুকু নিঙড়ে শাশ্বত সত্যটুকু তুলতে চেয়েছেন সাহিত্যের শিশমহলে; কি-ই বা শাশ্বত?  ধানের গন্ধ! মূলো-শশা খড়কুটোর গন্ধ! বিছনার গন্ধ! গায়ের গন্ধ! মিলনবিরহহাসিকান্নার গন্ধ! আসলে ব্রম্ভলাভের বাসনা যে জ্যোতিরিন্দ্রের নেই, ব্রম্ভ যে মিথ্যা হয়ে যায়, আদিধ্বনিকে ফুৎকারে উড়িয়ে জাগর চৈতন্য দিয়ে এই বিপুলা পৃথিবীর মোহময় সৌন্দর্যকেই বোধহয় জ্যোতিরিন্দ্র  বেছে নিয়েছিলেন তাঁর বিলম্বিত লয়ে; উদ্ঘূর্ণ অসবর্ণ মাধুরীরেখার মাঝেই খুলে ছিলেন সেই অমীমাংসিত ডায়েরি- যেখানে অনাবিল সৌন্দর্য আর নিস্পৃহ শীতলতায় চিরবিবর্ধনশীল জীবনের স্বাদ জীবনবোধের ম্যানুস্ক্রিপ্ট।

জ্যোতিরিন্দ্রের গল্প কোনো অপরিচিত শূন্যতাকে বলে না, কোনো থামাকে না, সে প্রাত্যহিক রজস্বলা ক্ষতের টেক্সট,যেখান থেকে উঁকি দিচ্ছে কায়াহীন পৃথিবীর স্রোত,কথাহীন কুড়ানীর মহিমা। বিজ্ঞপ্তি দিচ্ছে চামড়ার ভেতরে এক ফোঁটা পৃথিবীর ছবি নিয়ে বসে থাকা  ট্রাউজার বা পাজামা পরা , রোগা পাতলা গলাবসা মানুষদের, যাদের চিৎকার গাছপালা মেঘ বাতাসের কয়েক শো বর্গমাইলে খুঁজছে  আরোগ্যের অবসর, গলে পড়ার আগে আঁকছে সেই গরম দস্তানার ছবি ; বিকেলের কম হয়ে আসা আলোয় জনান্তিকে লুকিয়ে পড়া চাল আনবার কথা, আঁচ দেওয়ার কথা, কালি পড়া হাড়ির কথা, আবছা হতে হতে মুছে যাওয়া  ঠকে যাওয়া মধ্যবিত্তই যেন তার গল্পের মূল প্রতিপাদ্য;বাইবেলের কেইনের মতই তাঁর চরিত্ররা নিঃসঙ্গ নির্মাণ;সব নিঃশেষিত হতে হতেই যেন জেনে ফেলেছে সব ভরে  তোলার খেলা, জেনে গেছে ভেতরে সেই বাড়ি আছে সেই ঘাইহরিনীর ডাক,সেখানে সূত্র খুঁজে গোছানোর আনসার্টেনটিগুলো জিইয়ে রাখা আছে, যত্ন করে তুলে রাখা আছে অন্ধকার আর আত্মার অসুখগুলো; প্রতিকারহীন দুঃখের ভেতর অচরিতার্থ অমরত্বকেই সাজিয়েছেন জ্যোতিরিন্দ্র; কখনো আলো জ্বালিয়েছেন যাতে রাত্রি সম্পূর্ণ দেখতে না হয়, কখনও ঠেলাগাড়িতে তুলে দিয়েছেন সামান্য বেতনভুক  তারিনী নামের ব্যর্থ পোকাদের, বর্জনের আগে যাদের রক্তক্ষরণে চেনা বলতে কেবল কিছু প্রসববসিরিজ, হলুদ গুড়ির গায়ে কাঁটাবন হয়ে থাকা জীবনের সমস্ত অভিধানে কেবল- কুলো-ডেকচি-মশারি-ছাতা-গনেশের মূর্তি-ইঁদুর মারা কল-অথবা নির্বাক জীর্ণ স্যুটকেশ এবং আত্মেন্দ্রীয়কে ঘিরে ঘিরে সেই অসহায় আস্ফালন;এ নিয়েই দাঁড়ে লেগে আছে ভেসে যাওয়ার নির্দেশ, তেলরঙের মধ্যবিত্ত অতিরিক্তের ভেতরই মাংসপেশী ফোলাতে ফোলাতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে আচ্ছন্ন জটলা, ফ্রেমের চারপাশে ব্লার করে রাখার স্বনির্বাচিত ফন্দিফিকির; এই কি সেই ডানার মানুষ? যার চারিদিকে সমুদ্র! জল ও স্থল দুই বিরোধী শক্তির মাঝখানের মানুষ? 

এই কি প্রান্তিক কন্ঠস্বর! মাটি নয়,জ্যোতিরিন্দ্র  তুলতে চেয়েছেন  প্রজন্মের ফাটল, স্যাঁতসেঁতে শেকড় , যেখানে জেগে থাকাই ঘুম,অথচ এরই ভেতর গভীর পেরেক তুলে প্রাকজন্মের কবিতা খোঁজে শতকের ক্লীন্নতা। কোনো সন্মোহ নিশ্চেতনা নয়,শোক বা দুঃখ নয় আসলে উৎপাটিত আলোর মধ্যে  অন্ধকার গুছিয়ে রাখার খেলা, একদিকে দু কোঠা ঘরের স্বচ্ছল পাড়া থেকে উৎখাত হচ্ছে মধ্যবিত্ত তারিনী , পেছন থেকে ভারহীন ঝিনুকশাঁসের মত ছিন্নমূল সমাজ প্রতিবেশী- পোস্ট কলোনিয়াল ন্যুডিটি তাকে ঠেলে দিচ্ছে কালসীমার দিকে, গিঁথে থাকার মত এক অখণ্ড গবেষনাকক্ষের দিকে, অথচ প্রত্যাবর্তন চাইছেনা জেলির সন্তানেরা, দহন নেই তবু জ্বালিয়ে রাখতে চাইছে মধ্যবিত্ত আত্মসম্মানবোধ, সেখানে পরাজয় নেই, নিস্ফল শ্রম জেনেও ব্যথাকে চালানোর জন্য ঘাড়ে করে তুলে আনা আছে  অলীক পোকাজন্ম  যা খালি চোখে ধরা পড়েনা আর ধরা পড়েনা বলেই  নিরেট অন্ধকারে তারিনীর মত সিসিফাসরা যতই উঁচু হোক ক্রমাগত উঠতে থাকে সেই পাহাড়ের চূড়োয়, সেই পাথর ঠেলার খেলায় , আর তার অস্তিত্বের পরীক্ষা দিতে দিতে হারিয়ে গেলেও চক্রাকার বৃত্তে থেকে যায় বাড়ি নামক কেবল এক বাক্যবন্ধ, ঘুনের কাঠামো; পরিত্যক্ত ঘরের দরজার তালা খুলে বাড়িওলার নতুন ভাড়াটেকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখিয়ে দেওয়া জলকল-পায়খানা ও রসুইঘরের চমৎকার ব্যবস্থার মত কিছু আপাত মিথ্যে, কিছু মূক বিবশ   অসহয়তা। 

তারিনীর বাড়ি বদল এর মত গল্পে আমরা দেখতে পাই নিরেট সময়খণ্ডে ধাক্কা খাওয়া বিশ্বজগতকে যেখানে শাশ্বত জীবন বলে আদতে কিছু নেই কেবল কিছু সম্ভাবনার ক্ষেত্র, মর থেকে মৃত্যুজগতে যাওয়ার কার্ণিভালের মাঝে মধ্যবিত্তের তিমির হননের অব্যক্ত  গুঞ্জন, খুদে শহরের খুদে মানুষের দৈন্যতা , অস্তিত্বের পক্ষে কিছু বাতিল তত্ত্বের ব্যালাড। সেখানে তিনি ইমোশনাল রেঞ্জকে স্ট্রাইক আউট করছেননা আবার চেনা মানুষের ঐশ্বর্যের ভেতর লুকিয়ে থাকা অচেনা বীজকেও ছাড়িয়ে নিচ্ছেন খোসার মত, ছাড়িয়ে  দিচ্ছেন লিরিক এক্সেস। গল্প শেষে গাড়ি উলটে তারিনীর মৃত্যু আদতে অসহয়তা এবং আত্মার অহংকার এই দুই দ্বন্ধের মাঝে এক আইডেন্টিটি ক্রাইসিস, এক ইনকম্পিটিবিলিটি,যা শেষমেশ কাম্যু দর্শিত ফিলোজোফিকাল সুইসাইডকেই চিহ্নিত করে যায়। 

মহাযুদ্ধ পরবর্তী পঞ্চাশের দশকের প্রত্যয়হীন মধ্যবর্ত্তী নাগরিক জীবনের করোটিগুলোর ভেতরের ক্ষয়ে যাওয়া রিদমগুলো মিহি ধুলোগুলো জ্যোতিরিন্দ্রের আঁকড়ে হয়ে উঠেছে শিক্ষিত ভদ্রলোক তারিনী; দ্রুত বদলে যাওয়া কল্লোলপর্বের অস্তিত্বহীন দাগানো মানুষগুলো যেন নিজেদের প্রেক্ষিতেই নিজেদেরকে আগাছালোভাবে দাঁড় করাতে চায় বারবার, তরল একটা বর্ণের মত কুড়োতে যায় তার সামগ্রিক স্বত্তার চিত্রায়ন এবং হেরে যায় তার অস্তিত্বের কাছে প্রতিবেশীর কাছে নব্য অর্থনৈতিক,সামাজিক অবক্ষয়িত মূল্যবোধগুলোর কাছে,রূপান্তরিত জীবন ও যন্ত্রনার ডেরিভেটিভসগুলোর কাছে। আধুনিকতা প্রসঙ্গে মর্ডানিটিঃইয়েস্টারডে,টুডে অ্যান্ড ট্যুমোরোতে যেখানে গবেষক মার্শাল বারম্যান বলেন- It is a paradoxical unity, a unity of disunity; It pours us all into a maelstrom of perpetual disintegration and renewal, of struggle and contradiction, of ambiguity and anguish. People who find themselves in the midst of this maelstrom are apt to feel that they are the first ones and may be the only ones, to be going through it; this feeling has engendered numerous nostalgic myths of pre-modern Paradise Lost.” , জ্যোতিরিন্দ্র সেই আত্মক্ষয়ী প্রসাধনেই তরনীকে সাজিয়েছেন উনিশ ও বিশ শতকীয় বাড়বাড়ন্ত সমাজ দর্শনের মাঝামাঝি ফুটকি দেওয়া মানুষ হিসেবে, যারা সাধের গড়গড়ার অবমাননা সহ্য করতে পারেননা অস্তিত্বের হরফ খুঁজতে গিয়ে, যার ক্ষীণ পথটূকুই তার কাটাকুটির ,মাঝাঘষার , সাবেক অস্তিবাদী খননকার্যের;অথচ যারা জানে এর মাঝেই লুকিয়ে আছে আরও এক বিচ্ছেদ আরও এক বিভাজন,যেখানে সে সামুয়িক পচনের।ভিসেরাল নির্বাসনের। পরিহাসভঙ্গিমার মাঝে কেবল এক আত্মসান্তনা যা সবুজ ও অন্ধকার;নিঃসঙ্গ আত্মার ভেতর এক দুর্বোধ্য আউডসাইডার-ই জ্যোতিরিন্দ্রের কথা বলে;   

মহাযুদ্ধ পরবর্ত্তী প্রেক্ষাপটের ক্লাসলেস সোসাইটির কথা, আরবান কলোনিয়ালের কথা বারবার ফিরে এসেছে নাগরিক গল্পকার জ্যোতিরিন্দ্রনাথের গল্প উপন্যাসে;বদলে যাওয়া নিজস্ব ভূগোলে দিশাহারা মানুষের ঠুনকো বিলাসিতা আর তেতো স্বপ্নের ম্যুরাল গড়েছেন তিনি; দেশভাগে পাতার মত ভাসতে ভাসতে এসে মাটি স্পর্শ করা মানুষগুলোর বিষবাষ্প মূলে কোনোক্রমে ভাঙাচোরা একটা নিজস্ব তল্লাট টিকিয়ে রাখাই জ্যোতিরিন্দ্র নন্দীর গল্প-উপন্যাসের মূল বিষয় হয়েছে,তিনি ডায়গনিস করেছেন সাধারান তুচ্ছ অদ্রষ্টব্য ঘাম-তিক্ত আচরনগুলো;  দুটো বিশ্বযুদ্ধ তুমুল ভাবে প্রবৃত্তির সহজাত প্রকাশ আর মূল্যবোধকে নষ্ট করে দেয় আর ঠিক এখান থেকেই দ্বন্ধ বিরোধাভাস বিসম্পৃক্তির এক নতুন আবহাওয়ায় জারিত হয় মধ্যবিত্ত বাঙালী, জীবনের স্বরূপ জানতে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া আর্ত উপান্ত্যপর্বের মেট্রোপলিস উঠে আসে উত্তরজাতকের দ্বৈত মনোজিনে,অনিশ্চিত তরঙ্গদৈর্ঘ্যে। যা হয়ত বিষয় বৈচিত্র্যের দিক দিয়ে খানিক হলেও পাঠককে মাঝেমাঝে ঠেলে দিয়েছে নিস্পৃহতার দিকে;তাঁর চূডান্তভাষায় সমালোচকরাও বিবিধা খুঁজে পাননি বহু ক্ষেত্রে । এ পাকদণ্ডী পেরোতে আমরা গল্প-উপন্যাস লেখায় তাঁর নিজস্ত ধারনাতেই ফিরে আসতে পারি। সেখানে রয়েছে এক আশ্চর্য মেধা, ভাষার প্রজ্ঞা দিয়ে জীবনের প্রজ্ঞারয় এক  উচ্চস্তরীয় যোগাযোগ। 

উপন্যাসের মনোলিথিক স্টাকচার গড়ে তোলার আগে তাঁর ছিল গল্প লিখে হাত পাকাবার এক নিজস্ব বিশ্বাস; যেখানে তিনি বলছেন  -আমি মনে করতাম গল্পগুলি হল এক এক খন্ড ইঁট। আর উপন্যস হল একটা প্রকাণ্ড ইমারত । সুতরাং ইঁটের পর ইঁট গাঁথার মতন আমি আমার গল্পের চরিত্রগুলি সাজিয়ে দেব। সেই সঙ্গে সিচুয়েশন জুড়ে দেব, ঘটনার সিঁড়ি থাকবে বারান্দা থাকবে। তার ওপরে স্টাইলের পলেস্তারা পড়বে এবং তারপর ভাষার রং।  আর হয়ত তাই  গল্পের গাঁথনীর মূলসূত্রটিই মাঝেমাঝে উঠে এসেছে তার বিভিন্ন উপন্যাসে । কিন্তু যা দৃষ্টির আড়ালে থেকে গেছে বাঙালী পাঠকের তা বাহ্যিক চরিত্রের ভোকাবুলারি নয়, তা লেখকের ব্যক্তিগত ইমাজিনেশন, ইনট্যুশন,  মূল চরিত্রের প্রেক্ষিতে তার চিত্রন, তার ভেতরবাড়ীর নির্যাস,কেবল কথার কারিকুরি নয়, যুগোর্ত্তীন দ্রষ্টার উপলব্ধি; প্রকৃত লেখক আচ্ছন্ন হবে তুচ্ছতম মানবিক চিত্রকল্পমালায়; কেবল দেহ না তার বীজের দুষ্প্রবেশ্যতা অবধি উৎকৃষ্টতার সন্ধান করবে মহাদ্রুমের সন্ধান করবে, আর ঠিক এখানেই জ্যোতিরিন্দ্র নন্দীকে আমরা পাই সেই অন্তরকথার ,অজ্ঞাতসারের চাবিকার হিসেবে যিনি মৌল অভাবগুলোকে তুলে এনেছেন সত্তার  পটভূমিকায়; পাঠকের তুষ্টিসাধন করেছেন লেখকবৃত্তি থেকে কাদামাটিখড় জড়িয়ে পথিকবৃত্তি অবধি ফিরে এসে ,চরিত্রের ছোট অংশে খুঁজে বেড়াননি মজুরি বা মুনাফা বরং তার সচেতন কল্পগুনে তাকে রসোত্তীর্ণ করে তুলেছেন ডাল-পাতা-ফুল-কুঁড়ি-ফল সব ফিসফিসের সাথে , ফুল শুকিয়ে যাওয়ার ব্যথার সাথে, শুকিয়ে একটু একটু করে এগিয়ে যাওয়ার আনন্দের সাথে,পর্দা সরিয়ে প্রসাধন মুছে ঢুকে পড়েছেন খালপোল আর টিনের ঘরের চিত্রকরের কাছে,যেখানে এসে বোঝা যায় এ পর্যন্তই জল, এ পর্যন্তই নেশা, ঢেউ খেলে এ পর্যন্তই, নিছক চরিত্রের বাইরে এসে স্থানীয়ের বাইরে এসে অমীমাংসিত প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছেন জ্যোতিরিন্দ্র, এই তার অর্জন , মরবিড চরিত্রের মাধ্যমে নুয়ে পড়া সংসারীর মাধ্যমে এই তাঁর মৌখিক বিরুদ্ধতা, তাঁর মৌলিক বিমূর্ততা;  ভাষাশিল্পকে তিনি দেখেছেন পরিব্যাপিত ধমনীর অপ্রচ্ছন্ন ধকধকে হাত ডুবিয়ে । 

তাঁর বহুল প্রচলিত উপন্যাস বারো ঘর এক উঠোনের কেন্দ্রীয় বিষয়েও মূল স্রোত থেকে নিক্ষিপ্ত মানুষের কোড অফ সিগনালসের পুনরাবৃত্তি দেখা যায়, সেখানে মানুষ মঞ্চে প্রবেশের পর কেবল সংজ্ঞায়িত এক অজুহাত, ব্যকরণের ভুল, আলু-কুমড়োর তরকারির মত সহজেই পরখ করা সহজেই পচে ওঠা ; গন্তব্যে পৌঁছতে পৌঁছতেই চরিত্রের মধ্যে এক আশ্চর্য বোঝাপড়া, অন্তিম সংলগ্নতাটুকু কুড়িয়ে রাখতে তারা নিচু হচ্ছে প্রবেশের তিন লাইনে পূর্ণজাগরনের তিন লাইনে,অথচ আবহাওয়ায় পৌঁছতে পারছেনা তারা, কুপকুপ অন্ধকার ছেড়ে বেড়োতে পারছেনা সুপ্ত জীবনানন্দে; এখানে চরিত্রগুলো নিজেরাই তাদের ধ্বস্ত জীবনে,শ্বাসশূন্য নিউক্লিয়ার খোঁয়াড়িতে ব্যস্ত নিজেদের অপ্রয়োজনীয়তাকে প্রমানে ।তাঁদের অন্তজ্য গ্রামারে উঠে আসে ছোটো শহরের বর্ডারলাইন ইকোসিস্টেম; যা ঘুন ধরা, ব্যঞ্জনা অবধি পৌঁছতে পারেনা স্থানীয়তাকে ছাড়িয়ে;  তারিনীর বাড়ি বদলের বীজাভাসকেই, আকরিককেই যেন আরও বড় পরিসরে জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী জারিত করেছেন তাঁর বারো ঘর এক উঠোন উপন্যাসে। যুদ্ধপরবর্ত্তী প্রেক্ষাপটে  স্বাশ্রয়ী লেখনী নয় , তিনি সাজিয়ে রেখেছেন ছিন্নমূলের ফাঁকটুকু, যা একাধারে মধ্যবিত্তের আত্মসর্মপণ আবার প্রতিবিপ্লবের ক্রিয়াপদে ধুঁকে ধুঁকে মরা মনোজিন। বারো ঘর এক উঠোন কেবলমাত্র বাস্তুহারা মধ্যবিত্তের খেদোক্তি নয় বরং ক্ষতবিক্ষত ও ভারসাম্যহীন সমাজজীবনের জীবন্ত দলিলও বলা যেতে পারে; উত্তরঔপনিবেশিক কালখণ্ডে শহরের পরিবর্ধন, অর্থনৈতিক মন্দা, ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতি ভেতরে ভেতরে গড়ে তুলেছিল হেরে যাওয়া মধ্যবিত্ত ট্রেডমার্ক; নগরসভ্যতার মোহ আর আমোদী খোলসের বাইরের সেই মূক বাকশক্তিহীন সোপানশ্রেনীর ডিল্লেমা,স্বপ্নভঙ্গের  চরিত্রগুলোর সাথে জ্যোতিরিন্দ্র যেন সংকলিত হয়ে গেছেন উদাসীন থেকেও। প্রোট্যাগনিস্ট হিসেবে উপন্যাসের মূল চরিত্রে নির্বিকার নির্লিপ্ত শিবনাথকে রাখলেও আদতে তার নিম্নগ্রামে বেজে গেছে জ্যোতিরিন্দ্রেরই ভার্সান , তাঁর আণ্ডারলাইন কালমিনেশন; কবন্ধ মানুষগুলোর সাথে তার এই  সহজপাচ্য সখ্যতা ,এই সজীব দহনের মধ্যে চিতামানুষগুলোর খোঁজে আমরা সেই জ্যোতিরিন্দ্রকে পাই যে নিরন্তর খুঁজেছে অস্তিবাদের গুপ্তকথা;রুট থেকে সাররাউন্ডিংস থেকে মুখোমুখি হয়েছে জিজ্ঞাসার; তাঁর ঘাড়ের কাছে নিঃশ্বাস নিয়েছে পরভৃত মননগুলির ফুল ভয়েজ; লোথার লুৎসের সাথে কালপুরুষ পত্রিকায় এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন- আমি তো মধ্যবিত্ত মানুষ। কাজেই এই জীবনের সঙ্গে যতটা পরিচয় অন্য জীবনের সঙ্গে আমার ততটা পরিচয় নেই। কাজেই এখানে আমি যতটা দেখতে পাই শুনতে পাই ততটা অন্য জীবনে নয়। সুতরাং এখানে আমার কলম বেশী করে যাবে এটাই তো স্বাভাবিক। আর এটা তো ডেকাডেন্স; অবক্ষয়ের যুগ। আর এটা তো মধ্যবিত্ত জীবন। ঐ যে শিবনাথ ও তার স্ত্রী এরা তো মধ্যবিত্ত মানুষ। 

মধ্যবিত্ত মানুষের চরিত্র বোধহয় শিবনাথ চরিত্রেই সবচেয়ে বেশি ফুটে উঠেছে। কাজেই মধ্যবিত্ত জীবন নিয়েই আমি সবচেয়ে বেশি লিখেছি । ---বারো ঘর এক উঠোনের মধ্যে আমরা বাখতিনের প্রচারিত উপন্যাস দর্শনের সেই দুটি মূল তত্ত্ব পলিফনি আর হেটেরোগ্লেসিয়ার দেশজ অবয়ব লক্ষ্য করতে পারি; দ্য ডায়ালজিক ইমাজিনেশন গ্রন্থে বাখতিন একস্বর থেকে উপন্যাসকে মুক্ত করেছিলেন  পলিফনিক বা বহুস্বরিক  মুক্তমঞ্চে, যেখানে বিভিন্ন চরিত্রের জিভে উঠে এসেছে চরিত্রের পারমিয়েবল মেমব্রেন, চরিত্র সেখানে স্বাধীন, তাঁর বিশ্লেষনে লেখকের দর্শন পেরিয়ে ব্যক্তি স্বত্তার তুমুল প্রকাশ লক্ষ্যনীয়; বারো ঘরের এক উঠোন উপন্যাসের বৃহত্তর পরিসরে পরিত্যক্ত মানুষগুলোকে ঘরের আদলে জ্যোতিরিন্দ্র  যাত্রাসঙ্গী করেছেন একই জাহাজের; বারোটা কামরা জাহাজের বারোটা কেবিন; কোনওটায় আলো জ্বলছে। কোনওটা অন্ধকার। অন্ধকার আকাশের নীচে সাঁতার কেটে চলেছে জাহাজটা। যাত্রীরা খাচ্ছে, গল্প করছে, কথা বলছে, কথা শুনতে শুনতে কেউ ঘুমে ঢুলছে। কোনও কামরার দরজা হাঁ-খোলা, কোনওটার দুটো পাল্লাই ভেজানো। জানালা কারও খোলা,কোনওটার বন্ধ। বারো ঘরের বারো শরিকের বাসন-কোসন-নাড়াচাড়া-বাটনা বাটা-মাছ কোটা-হাসতে হাসতে ঢলে পড়ার মধ্যে দিয়েই গড়ে উঠেছে সংলাপের ধারাবাহিকতা, তাদের স্বভাবভাবনা দিয়েই গড়ে উঠেছে এক বৃত্তাকার ফুটেজ; দোকানি বনমালী, হোমিওপ্যাথ ডাক্তার শেখর, ক্ষৌরকার পাঁচু ভাদুড়ী, সদ্য চাকরী হারানো লম্পট কে গুপ্ত,চা দোকানী রমেশ, স্বামী লাঞ্ছিত কিরন, বাড়িওয়ালা পারিজাত, আঠারো বসন্ত ঘেরা বিথী, এবং শিবনাথের সুন্দরী শিক্ষিতা স্ত্রী সুরুচি-প্রত্যেকই নিজস্ব অবস্থান থেকে টেনে রেখেছে টেন্সরগুলো, কম্যুউনিকেট করছে নিজস্ব উপাত্তগুলো, যা ক্রমশ পলিফোনিক ডিসকোর্সের ভেতর অসবর্ণ চরিত্রদের টোটাল এফেক্ট বলেই চিহ্নিত করা যায়। 

আর এই বাইশ রিলের বাইরে থেকে লেখক প্রথমেই তাঁর ভারচুয়াল ফরম্যাট হিসেবে বানিয়ে  নিয়েছেন শিবনাথের মত নির্বাক আত্মবিস্মৃত দ্বিধাবিভক্ত ফ্লোয়েমকে; শিবনাথ যেন জ্যোতিরিন্দ্রের একস্বরের বাহক; বহিরাকৃতির ওপর বসে সে যেন ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখে যাচ্ছে অর্ন্তরলীন সারবস্তুটি; ক্লাসিক্যাল ন্যারেটিভ থেকে এখানেই যেন জ্যোতিরিন্দ্র নন্দীর স্বনিয়ন্ত্রিত আড্ডাঘর, যেখানে নিজস্ব প্রতিরূপে ঢেলে সাজিয়েছেন শিবনাথকে,সাজিয়েছেন দ্বন্ধময় এক বাস্তবতা,ব্যক্তিগত নিস্ফলতা, অভিমানের ভেতরে সমষ্টির প্রতিরূপ; স্ত্রীর আয়ে জীবননির্বাহকারী দায়হীন এক চরিত্র,একাধারে অন্ধকারে নিজেকে তলিয়ে না দিতে দেওয়া মধ্যবিত্ত, প্রবল আত্মসম্মান বোধে অবক্ষয়িত সমাজে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা এক মানুষ যে অপমানবোধে একে একে সংসারের ঘটি বাটি সেলাই মেশিন বন্ধক রাখে, আবার অন্যদিকে প্রকট হয়ে উঠেছে তার বহিরায়ন তার আপোষপ্রবনতা, বন্দীজীবনের বিশালতার সামনে দাঁড়িয়ে এক হাতে সে কে গুপ্তের গলা টিপে ধরেছে যখন শুনেছে ফিল্ম মেকার চারু রায় তার অবর্তমানে স্ত্রী সুরুচির কাছে এসেছিল আর টিনের ফুটো দিয়ে কে গুপ্ত দেখেছে-দ্যাট বাগার,হুঁ চারু-হি কিসড রাইট অন হার,আবার পরক্ষণেই হ্যারিকেন হাতে সুরুচি এগিয়ে আসতেই শিবনাথের গলায় শোনা গেছে অভ্যস্থ গৃহজীবনের স্বান্তনার নির্যাসটুকু-সুরুচির হাত ধরেই কে গুপ্তকে পাগল প্রমান করে ফিরে এসেছে তার সর্বগ্রাসী পালক খসার শব্দে; তুলে নিয়েছে চারু রায়ের রেখে যাওয়া আস্ত এক টিন দামী সিগারেট; বারো ঘরের কোনোটাতে পর্দা নেই তবু যেন কোথাও পুষে রাখা আছে এক অলীক  পর্দা টানার শব্দ, এক বিধৃত তঞ্চকতা; সর্বস্তরে বিপন্ন মানুষের এপিক থিয়েটার বারো ঘরে এক উঠোণ; শিবনাথের মধ্য দিয়ে অনেকাংশে অঙ্গীভূত হতে চেয়েছেন জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী, যেন তার হৃদপন্দনকেই জানাতে চেয়েছেন বর্হিরাঙ্গিক ক্রোমোজমে; 

বারো ঘর এক উঠোন লেখার সময় জ্যোতিরিন্দ্র সপরিবারে উঠে গিয়েছিলেন বেলেঘাটার বারোয়ারিতলার বস্তিতে; স্মৃতিচারনামূলক গদ্যে শ্রীমতী পারুল নন্দী বলছেন- বারো ঘর যখন লেখা হয় আমার তখন বিয়ে হয়েছে মাত্র কিছুদিন। তখন রামচাঁদ লেনের বাসা ছেড়ে আমরা চলে গেছি বেলেঘাটার বারোয়ারীতলা লেনে। বাসাটা একটু অদ্ভুত। বাড়ির মাঝখানে বড় উঠোন। আমরা ভাড়াটে থাকতাম সবমিলিয়ে মোট এগার ঘর । সবার জন্যই ঐ একটা উঠোন। কত বিচিত্র পেশার মানুষ যে থাকত আমাদের সঙ্গে; কেউ কাজ করত দোকানে, কেউ আবার নার্স। বেশিরভাগি পূর্ব-বঙ্গের। সে সময় দীর্ঘদিন ধরে উনি লক্ষ করেছিলেন মানুষগুলিকে। ওদের আচার আচরন ওদের জীবনযাত্রা। তারপর বারো ঘর এক উঠোণ যখন লিখলেন, তখন উপন্যাসের নাম দশ ঘরও দিলেন না, এগার ঘরও দিলেন না।দিলেন বারো ঘর।এই দোহাট খোলা দ্রবীভূত চরিত্রদের থেকেই অবসন্ন জীবিত উত্তরসূরীদের প্রবেশ ও প্রতিক্রিয়া তুলে এনেছিলেন দীক্ষিত জ্যোতিরিন্দ্র; কোনো ক্যারিসমাটিক চিত্রনাট্য নয়, বরং চেতনাযাপনের তালিকাহীন মায়াবিভ্রমে জবরদখল করেছেন ক্ষয়ে যাওয়া নাগরিক তরঙ্গগুলোকে, মর্ডানিস্টিক ক্রাইসিসগুলোকে।কেওস থিয়োরিগুলোকে। যেখানে টুকরো টুকরো রঙ্গব্যঙ্গের মাঝে লুকিয়ে আছে এক শ্রেণীর অ্যাকুমুলেটেড ডিগ্রেডেশন; যেখানে চায়ের দোকানের আড়ালে নির্বিকাচিত্তে রমেশ ও তার ভাই চোরাকারবার চালায় অথবা বারো ঘরের মালিকের ছেলে পারিজাত বস্তির মেয়েদের দখল করার জন্য গেঞ্জির কারখানা খোলে, আবার পাঁচু ভাদুড়ী সেলুনের নামে খোলে ম্যাসেজ ক্লিনিক; আসলে এ্যাস্টাবিলিশমেন্টের বৃহত্তর খেতখোলান থেকে জ্যোতিরিন্দ্র তুলে এনেছেন মেটান্যারেটিভ কোয়ান্টামগুলো, যা দিয়ে ভেসে চলেছে মধ্যবিত্তের ট্রাজেডি, মধ্যবিত্তের নগরযাপন , ভেসে চলেছে সেই শব্দহীন জলযান।নির্জীবতাকে উপেক্ষা করে যাত্রীদের বিভিন্ন অবস্থা বুকে নিয়ে জাহাজখানি রাত্রির গাঢ জলে সাঁতার কেটে চলেছে; আর মস্ত বড় উঠোন বুকে নিয়ে বারোটা ঘর রাত্রির জলে সাঁতার কাটছে। মানুষের সঙ্গ চেয়েছিলেন জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী, যা জগৎরহস্যের ব্যধিমুক্তির তাঁর নিজস্ব কসমেটিকসের পরতে পরতে ভেসে উঠেছে।

 বুদ্ধিমান মানুষের বুদ্ধি বা প্রদর্শনপ্রিয়তা দেখতে না, তিনি চেয়েছিলেন নিরপেক্ষ মানুষের সঙ্গ।জীবনবোধের সচেতনতায় দিশাহারা ক্যাজুয়াল মানুষের নির্বাচন চেয়েছিলেন তিনি; তাঁর নির্বাচিত ক্ষেত্রটাই ছিল জীবিত মানুষের, বাস্তব অভিজ্ঞতার,সেখানে জানলা ও দরজা বন্ধ করেও শোনা যায় জুতোর শব্দ, দেখা যায় রাত জেগে পায়চারী করা বহুরৈখিক মানুষের খন্ডবাদ, ফসিল প্রক্রিয়া, অসংখ্য ঝুরির মত নেমে জবুথবু থমকানো মানুষগুলোর দুর্বোধ্য তৃতীয় তরঙ্গকে তাঁর মননশীলতার স্তরে প্রতিফলিত করতে চেয়েছিলেন জ্যোতিরিন্দ্র । সত্য ও বাস্তব এ রবীন্দ্রনাথ যখন বলছেন -প্রাত্যহিক মানুষ  তার নানা জোড়াতাড়া-লাগা আবরনে, নানা বিকারে কৃত্রিম; সে চিরকালের পরিপূর্ণতায় আসন পেয়েছচে সাহিত্যের তপোবনে, ধ্যানের সম্পদে। যেখানে মানুষের আত্মপ্রকাশের অশ্রদ্ধা সেখানে মানুষ আপনাকে হারায়। তাকে বাস্তব নাম দিতে পারি, কিন্তু মানুষ নিছক বাস্তব নয় । তার অনেকখানি অবাস্তব, অর্থাৎ তা সত্য । তা  সত্যের সাধনার দিকে নানা পন্থায় উৎসুক হয়ে থাকে। তার সাহিত্য, তার শিল্প, একটা বড়ো পন্থা। তা কখনো কখনো বাস্তবের রাস্তা দিয়ে চললেও পরিণাম সত্যের দিকে লক্ষ নির্দেশ করে জ্যোতিরিন্দ্রও যেন সেই পৃথিবীর বাইরের পৃথিবী অনুধাবন করেছিলেন, জানতে চেয়েছিলেন হৃদকাঠামোর অন্তরালে পুড়ে যাওয়া বাজারের বয়স ঠিক কত!তাঁর চিন্তার শরীরে লেগে ছিল এক হাত ব্যবধান আর অসংখ্যবার কাটাকুটি করে পৌঁছোনো সেই দূরবর্ত্তী মঙ্গলগ্রহে’; পাকা সংসারীর মত তাঁর চরিত্ররা গল্প করে-মাছ কোটে-রক্তের দাগ মোছে-আবার গালে ছিটকে আসা এক ফোঁটা মুছতে চেষ্টা করে বারবার;এক আশ্চর্য অনুপাতে প্রত্যাখ্যান আর প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিস্থানীয় করে তুলেছেন তাঁর চরিত্রদের; এই যেন সেই সত্যের সাধনা, সেই নির্মল আরোগ্যের পথ, যা নেই, তবু সর্বত্র্যসঞ্চারী ভেবে সেই নকল জগৎকে আখ্যান ভুবনকে ঘিরে ধরে ক্যালেণ্ডারের ডোরাকাটা মানুষ;জ্যোতিরিন্দ্র যেন সমকালকে দেখতে চেয়েছেন ভবিষ্যতের মূল্যায়নে, অসামঞ্জস্যের সাথে মেলাতে চেয়ছেন দূরান্বয়ী গন্তব্যটিকে

পাঠ ও বয়নের সাথে সাথে জ্যোতিরিন্দ্র নন্দীর উপন্যাস উসকে দিয়েছে পাঠককে, দ্বিমুখী বিশ্লেষনের পরিসর তৈরী করে দিয়েছে তাঁর চরিত্ররা; বাখতিনের ভাষাতত্ত্বে এ যেন সেই ডায়ালগিজমের হেটেরোগ্লসিয়া বা দ্বিবাচিনকতার সূত্র, উপন্যাসের ভেতরে ও বাইরে যেখানে গড়ে উঠছে সমান্তরাল দর্শন, বহুস্তরীয় পরিনতির এক সম্ভাব্য,রেনডারিং এন্ড ও রিসিভিং এন্ডের ভেতর গড়ে উঠছে এক অদৃশ্য ভাষাজগত, আনডিফাইন্ড সিগমা;বিষয়ের আসক্তি থেকে বিচ্ছিন্ন জ্যোতিরিন্দ্র, বরং নেপথ্যচারী মনস্তাত্বিক কুলুঙ্গি পটে গড়ে তুলেছেন তার প্রাতিস্বিক ভাষা, যে ভাষাবর্ণনা লোকায়িত বহুস্বারিতার প্রতিনিধি; শরীর স্বত্ত্বার থেকেও তিনি যেন সন্ধান পেতে চেয়েছেন যত্নশীল খোলসের ভেতরের সমাধিফলক;গল্প উপন্যাসের স্ট্রাকচারাল ম্যাচুউরিটির ক্ষেত্রে কেবল রূপনিহন নয়, অস্তিত্বের মধ্যে অভ্যাস ও রুচি অনুযায়ী প্রান প্রনোদন; এ প্রসঙ্গে ধীমান দাশগুপ্তের সাথে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন- সিচুয়শন বুঝে, থিম বুঝে, চরিত্র সমঝে আঙ্গিক বাছতে হয় ও গল্পটা চালিয়ে নিতে যেতে হয়। তারপর কোথায় শেষ করব-আমি সেটাকে আঙ্গিকের মধ্যেই ধরি,তার কারন সেটা আঙ্গিকের একটা প্রধান অঙ্গ, সেটাকে আমি অত্যন্ত গুরুত্ব দিই।পাঠকের হাতের মুঠোয় যাতে গল্প না চলে যায়, আবার কম্যুনিকেশন হবে না পাঠকের সঙ্গে তাও যেন না হয়, মোটামুটি একটা ইঙ্গিত যাতে থাকে এবং সেটা উইটি হওয়া চাই, এটা আমার লক্ষ্য। ব্যাপারটা যেন একটা ম্যাজিক খেলা, কোথায় গিয়ে শেষ করব সেটা পাঠকও বুঝবে না, সে জন্য পাঠক তৈরিও থাকবে না; তাই বলে সেটা যে একটা বিস্ময় একটা চমক  তাও নয়। একটা মাত্রাবোধে ,একটা ছন্দে, সমে এসে থেমে যাওয়া, তারপর যদি একটা শব্দ ব্যবহার করা হয়, মনে হয় যে আঙ্গিকটা নষ্ট হয়ে গেল, আমি আঙ্গিককে এতটা গুরুত্ব দিই

পাঠকের শরীরেও আমূল বসে যায় লেখকের এ জাতীয় গূঢসন্ধি যা শিল্পময়,দৃশ্যের অতিশোয়ক্তি না থেকেও যার রস পিছু পিছু অনুসরন করে দৃশ্যাতীত;নীল রাত্রি ও বনের রাজা শিরোনামে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় জ্যোতিরিন্দ্রের এক নিজস্ব স্বভাবের প্রসঙ্গ এনেছিলেন, যেখানে একা একা রাস্তাঘাটে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে  কোনো অপরিচিত পুরুষ বা নারী বা দম্পতির কোনো বৈশিষ্ঠ্য তাঁর চোখে পড়লেই তিনি নিজের খেয়ালে তাদের অজান্তে পিছু পিছু অনুসরণ করতেন , তারপর অনেক অচেনা  রাস্তায় তারা হারিয়ে যেত। কিন্তু তারা হারায় না। উঠে আসে জ্যোতিরিন্দ্রের আঁধার  মসনদে,তাঁর নিজস্ব ইকেবোনায় সাজতে থাকে সীমান্ত ফোটানো সেই ছায়ার খেলা, মায়াপতঙ্গের খেলা। দীক্ষিত পাঠকও যেন অপরস্বত্ত্বা হয়ে বসে থাকে এই আপেক্ষিকতাকে আবিষ্কারের নেশায়;সাহিত্যের ইউনিটারি ল্যাংগুয়েজকে হেজ করে দেয় লেখক এবং পাঠকের মধ্যবর্ত্তী এই হাইব্রিডি,লেখকের আঞ্চলিক অভিযাত্রা পাঠকের হাতে গুঁড়ো হয়ে ছড়িয়ে যায় আরও সৃজনশীল পারস্পরিকতায়, চিরন্তন মউলির মত ঘনবনাজ পেরিয়ে ভৌগলিক মধু সংগ্রহে; ঘাম ঠিকরে বেরোয় বনের গন্ধ গাছের গন্ধ অন্বেষনের গন্ধ,অভাবের ভেতরই পাঠক খুঁজে বেড়ায় ভরপুর অরণ্যের আশ্রয়।

  সব মিলিয়ে তাঁর গ্রন্থসংখ্যা প্রায় ৭০ টি মতো , উপন্যাস লিখেছেন ৫২ টি প্রায়, এতদস্বত্ত্বেও অফসেট শিল্পতত্ত্বে তিনি দুয়োরানী থেকে গেলেন,প্রতিষ্ঠানবিরোধী না থেকেও প্রকাশক সমালোচকদের কাছে যেটুকু ক্ষীন শ্বাস পেলেন তাও কেবল ন্যাচারালিস্ট তকমায়, অথচ যৌনস্থুলতাকে একমাত্র সাক্ষী বা সংঘ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাননি জ্যোতিরিন্দ্র কোনোদিনই বরং শনাক্ত করতে চেয়েছেন অবদমিত মানবিক আলোছায়াগুলি, বাকশক্তিহীন বিবেকের ফাঁক ভরাতে মাংসল স্টিকিং প্লাস্টারের টুকরো কুড়োতেই সার্চলাইট মেরেছেন মধ্যবিত্ত জাহান্নমে;সূর্যমুখী লেখার পর প্রকাশকদের কাছ থেকে তাকে এও শুনতে হয়েছিল ,নতুন উপন্যাস সূর্যমুখীর মত সরস হলেও সূর্যমূখীর মত আইডিওলজি নিয়ে যেন না হয়;আসলে জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী বাজারচলতি বীজতলায় সতীত্ব খোয়াতে পারেননি তাঁর সাদামাটির,পড়ে থেকেছেন অচঞ্চল ও স্থানু হয়ে,দুর্লঙ্ঘ ক্ষতের ওপর চাপাতে পারেননি পাঠকমার্গের স্থানিক এবং ক্ষণিক উপশম,আর তাই চরম মৌলিকতার অধিকারী হয়েও ধরা পড়লেন নিঃসঙ্গ হয়ে; প্রকাশক পাঠক কেউই ঢাকনা খুলে দেখতে পেলেন না ভার্জিন ইণ্টেলেক্টের জন্য তুলে রাখা মিশ্রন অনুপাত; ধরতে পারলেন না জীবনদর্শনের মাঝে জ্যোতিরিন্দ্রের গভীর অভিনিবেশ,জানতে পারলেননা বিবেকবান প্রকৃতির মাঝে লুকিয়ে থাকা জান্তব অ্যামবিগুইটি, বর্গস্বার্থের ন্যাড়া পালকের ভেতর মাইনরিটি আইসোলেশন,যা জ্যোতিরিন্দ্র লিখতে চাইলেন অমিত্রাক্ষর, আদিবিধ্যা প্রায় সমস্ত আবহমান আচারসর্বস্বতা ছুঁড়ে ফেলে কেবল শোনিতগন্ধী মার্জিনে;তাঁর ন্যাচারিলজম একান্তভাবেই রিয়েলিজমের আউটগ্রোথ, যার সেন্ট্রাল থিমই হচ্ছে- individual human beings are at the mercy of uncontrollable larger forces that originate both inside and outside them. These forces might include some of our more "animal" drives, such as the need for food, sex, shelter, social dominance, etc.  Or, in a more "external" vein, these forces might include the natural environment, the man-made environment, 

তিনি মানুষের কথা বলেছেন, অ্যাকট্যুয়ালিটির কথা বলেছেন , বারবার পোট্রেট করেছেন  প্রোটাগনিস্ট স্ট্রাগলকে ;এসেছে যৌনতা, অসম্পৃক্ত কাম, অবক্ষয়িত মননের ভঙ্গুর সাযুজ্য; যৌনতার ভেতর দিয়ে খুঁজেছেন মনস্তাত্ত্বিক সমাধান, গুঁড়ো করে ভেঙ্গে দেওয়া আছে যে খোলা বাজার তারই মাঝে জটিল যৌনতার সমীকরনে তাঁর চরিত্ররা বারবার পেতে চেয়েছে তাদের আকাঙ্খিত দ্বীপগুলো, ভ্যারিয়্যান্টগুলো, গলে গিয়ে শুকিয়ে যাওয়া অস্তিত্বগুলো তাদের ঘনকগুলোকে ভরাট করতে চেয়েছে আপোষের গল্প মিশিয়ে মিশিয়ে;প্যানপ্যানানি নয় সস্তা রোমান্টিকতা নয়, জীবনবীক্ষার মাঝে জ্যোতিরিন্দ্র এক লুকোনো দরজা দিয়ে পৌঁছতে চেয়েছিলেন সেই নির্সগবিচ্যুত ক্ষয়িষ্ণু অক্ষরমানুষদের কাছে যারা ক্ষতের সামনে ক্ষারপ্রজননের স্মৃতিকেই বহন করছে;আন্তেনিও পোর্কিয়ার  সেই বিখ্য্যাত উক্তি যেন তাদের জন্যই প্রযোজ্য-There are pain that have lost their memory and don’t remember why they are painful” ।

 উপন্যাসের পরতে পরতে যৌনতার স্বেচ্ছসমর্পণকে বিকার বা রতিক্রিয়াকে কেউ কেউ প্রকৃতিবাদের সাথে তুলনা করলেও সে কেবলই অসুখের প্রতিফলন অথবা অন্ধকার শেকলের গায়ে লেগে থাকা আলোর বিন্দুগুলি , যেন অবদমিত স্বাধীনতাগুলোকেই জ্যোতিরিন্দ্র নিরুপদ্রবে উড়ে বেড়াতে দেখতে চেয়েছিলেন নীহার-রুদ্রনাথ-হীরেন-সুরুচি বা মালার মত কিছু কয়লাকুঠির গায়ে লেগে থাকা বশীকৃত গুটিপোকার মাধ্যমে; তাঁর প্রকৃতিবাদী চিন্তাধারা কেবল ফিজিওলজিকাল রিয়েলিজমেই আবদ্ধ নয়;শ্লীলতা অশ্লীলতার চুলচেরা বিচারে নিংড়ানো নয় তাঁর মাটির পৃথিবী তাঁর মৃত্যুঞ্জয়ী মানুষগুলো; এমিলি জোলা যখন দৃঢভাবে ঘোষনা করেন-The metaphysical man is dead; our whole territory is transformed by the advent of physiological man; As a result we have become experimentalist rather than philosophers ,সেখানেই জ্যোতিরিন্দ্রের হীরেন কিন্তু এক অসহয়তার আদল , জ্যোতিরিন্দ্রের মীরা আসলে নারীমনের এক চরম মনোবিকলন; এরা সবাই নুন ফেলে রেখেছে জিভের ডগায় আর ক্ষুধার ফাঁদে খুঁজে চলেছে সেই নির্বিকার ঘাসের সৌরভ; সেতুর নিচে রাখা আছে ছায়ানৌকো আর সেতুর ওপর দিয়ে সীতাংশু-ব্রততী-রনধীরের কেবল এক বিস্তীর্ণ থাকা;মানিক বন্দোপাধ্যায়ের উগ্র সেক্সে কোনোদিনই সায় ছিল না বরং র্স্টেইনবেকের যৌনজার্নালে জারিত ছিলেন অনেক বেশী; সার্ত্রে তাঁকে লুপ্ত হতে শিকিয়েছিল জন্মের কাছে চেতনাসংঘাতের কাছে; যৌনতার মধ্যে দিয়ে জৈবপ্রতিমা নয় বরং ক্ষনস্থায়ী স্ফুরনের ভেতর লুকিয়ে  থাকা জীবনশৈলির ফাঁদটাকে পেতে চেয়েছেন জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী; পেতে চেয়েছিন সম্পর্কের দ্বৈততা;নীল রাত্রি সে তো নীল বিষময় জীবন্মৃত প্রেমেরই অনুসন্ধান; এতো সেই লস্ট ইন দ্য নাইটের গল্প, প্রব্রৃত্তির অনুসন্ধানের গল্প; আসলে মেট্রোপলিটন ট্যাপিজের মাঝে বিস্মৃত রেখাবন্ধনীর মত থেকে গেলেও জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী হয়ত কিছুতেই ভুলতে পারেননি ব্রাম্ভনবেড়িয়ার শৈশবস্মৃতি, ভুলতে পারেননি ভাসানের দিন তিতাসের বুকে ভেসে যাওয়া অগুনন নৌকো, ভুলতে পারেননি শীতের মুখে বড় বড় কড়াতে চ্যবনপ্রাশ জ্বাল দেওয়ার গন্ধ আর পাঁচন সেদ্ধর গাঢ় তেতো গন্ধ; কাদা ঠোকরানোর পরও তাই শামুকখোলের ঠোঁটে লেগে ছিল সাদা শালুকের বীজ; ভাঙাচোরা মুখগুলোর মাঝে অন্য কোনো নির্লিপ্ত উদাসীনতা, আর এই উদাসীনতা বারবার তার উপন্যাসের ভূখন্ড ছেয়ে ফেলেছে প্রতিসাম্য খুঁজতে ফাটলগুলো খুঁজতে;উচ্চবিত্তের মানসিকতার বিচারে তাই এসে গেছে মধ্যবিত্তের প্রদূষণগুলো। 

চরিত্রগুলোর মধ্যে কেবল খুচরো যৌনতা নয় আছে বহুমাত্রিকতা ,আছে মিথস্ক্রিয়া;যে হীরেন যাপনের ভারসাম্য খুঁজে না পেয়ে,আত্মর্নিমানের বাটখারা হারিয়ে আত্মহত্যা করে, যে হীরেন তার স্ত্রীকে ঘৃনা করে ঈর্ষা করে, সন্দেহের কীট ঢুকে যে দাম্পত্য ফোঁপরা হয়ে যায়; সেই নীহারের সংলাপেও শোনা যায়-ভালোবাসা কী না করে, মীরা বলো !-উঃ ভালোবাসা ! যে মীরা স্বামীকে বাঁচাবার জন্য সর্বস্ব বিপন্ন করে দিয়েছিল সেই মীরাই হীরেনের আত্মহত্যার পর সঙ্গী মৃগাঙ্কের ভেতর খুঁজে পায় তার নিকটতম প্রতিবেশী, খুঁজে নেয় বেঁচে থাকার নতুন রসদ; আবার,নীল রাত্রি  তে লীলাময়ীর ছলনায় সাংসারিক কুলদারঞ্জনের সেই স্বেচ্ছাসর্মপন,কামতাড়িত সমীকরন পার হতে না হতেই জড়িয়ে যাওয়া এক আপেখিক অতৃপ্ত ফাইবারে-আসলে যৌনতা,বহুগামীতা  এসবই জ্যোতিরিন্দ্র ব্যবহার করেছিলেন গ্রাস হয়ে যাওয়া জীবনের অনিষিক্ত অলক্ষ্য দৃশ্যজগৎটি গোচরের জন্যই। ঔপন্যাসিকের গভীর সচেতনতারই , কেন্দ্রীভূত বীক্ষা যাতে আছে প্রচলিত ছক ভাঙ্গার প্রয়াস;মূর্ত ও বিমূর্তের মাঝে খুঁজে ফেরা এক শেকড়সন্ধানী আইডেনটিটি;তাঁর উজ্জ্বল নীল জীবাশ্মের মত মানুষগুলো যেন বিকল্প পথ খুঁজে পায়না, বিস্মৃত হতে পারেনা,--“We, who did not manage to devote/Our nights to spinning, did not bend and sway/Above a cradle—in a flimsy boat,/Wrapped in a mantle, we’re now borne away….ইউনিভার্সাল লাইয়ের মাঝে ফ্রেস্কোয় রাখা এই মহাঅন্বেষন,এই কি জ্যোতিরিন্দ্রের মরমী উদ্ধার?

(সংক্ষেপিত)

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন