বুধবার, ১৯ জুন, ২০১৩

মোহরগঞ্জের জিনিয়া ফুল

              অমর মিত্র                         

       খুব  ভোরে উঠে দিবাকর গান শোনে। তার বহুকালের অভ্যাস। সেই তিরিশ বছর আগে দিবাকর এইচ, এম, ভি, কোম্পানির একটি ফিয়েস্তা রেকর্ড প্লেয়ার কিনেছিল। কত রেকর্ড ছিল তার। সে থাকত এক মফস্বলী গঞ্জে। একা। বিয়ে করেনি তখন। তার ঘরে কাজ করত গঞ্জের একটি কিশোরী। সে রান্না করত। সকালে এসে ঘর গেরস্থালির কাজ করত। এসেই বলত দাদাবাবু গান চালাও। বিকেলে দিবাকর অফিস থেকে ফেরার আগে এসে বসে থাকত চাবি দেওয়া দরজার সামনে। দিবাকর এলেই বলত গান চালাও দাদাবাবু। নাম একটা ছিল, দিবাকর আর একটা দিয়েছিল। দিবাকরের সব মনে আছে। 

    তখন তার বছর তের। কৃষ্ণকলি। মুখখানি মনে আছে স্পষ্ট। যেদিন সে চলে এল বদলি নিয়ে চিরকালের মত, কেঁদে ভাসিয়েছিল বালিকাটি। একেবারে রবীন্দ্রনাথের পোস্টমাস্টার গল্প। সেই রতন। কিন্তু এই রতন ছিল গানের ভক্ত। গান শুনতে শুনতে কাজ করবে সে। আবার ছুটির দিনে কাজ শেষ করে গান শুনবে। শচীনদেব, হেমন্ত, মান্না দে, লতা, রফি,তালাত মামুদ তো শুনত, যখন বিলায়েত খান, রবিশঙ্কর বা নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায় বাজতেন মালকোষ বা ভৈরবী রাগে, সে নিবিষ্ট হয়ে শুনত।
     দিবাকর ভাল জানে সেই বালিকার বিয়ে হয়ে হয়ত এখন অনেক সন্তানের মা। সে কোনো এক গাঁয়ের বধূ হয়ত। যদি রেডিও থাকে হয়ত অবসরে..., দিবাকরের সবটাই অলীক ভাবনা। সেই মেয়েটি , রতন মুছে গেছে হয়ত এই পৃথিবী থেকে। দিবাকর তাকে ভুলেছে। এখন খুব ভোরে উঠে দিবাকরের মনে হয় তাকে গানগুলি পাঠিয়ে দেয়
     দিবাকর জানে এসব কিছুই হওয়ার নয়। সে থাকত তখন বাঁকুড়ার মোহরগঞ্জে পাহাড় টিলায় ঘেরা জায়গাটা ছিল ছবির মতো। দিবাকরের তখন এটা ওটা লেখার অভ্যেস ছিল। সে মোহরগঞ্জ নিয়ে একটি প্রতিবেদন লিখেছিল তখনকার সেই খবরের কাগজ যুগান্তরে। সেই কাগজ এখন উঠে গেছে। দিবাকরের একটি লেখাই ছাপা হয়েছিল। সেটি সে যত্ন করে রেখে দিয়েছে। সারাজীবন বদলির চাকরি করেছে। শেষে আট বছর কলকাতার পাশে। নানা জায়গায় ঘুরেছে। অন্য জায়গার কথা লিখতে চেষ্টা করেছিল, ছাপা হয়নি। আসলে মোহরগঞ্জের মতো আর কোনো জায়গা হয় না। এরপর আর সব ধূলিধূসর মফস্বল কোনো ভাবেই আকর্ষণ করেনি সম্পাদককে। সে কথা যাক, রিটায়ার্ড বুড়ো দিবাকরের কেন যে মনে পড়ে গেল সেই বালিকাটিকে। দিবাকর তাকে নিয়ে একটি গল্প লিখতে চেষ্টা করেছিল। কিন্তু সে তো রবীন্দ্রনাথের পোস্ট মাস্টারের মতোই হয়ে যাচ্ছিল। কী করবে দিবাকর, তার কোনো ক্ষমতাই ছিল না অন্য কথা লেখে। রবি ঠাকুর তো চাকরি করতে যাননি, তিনি কুষ্ঠিয়াশিলাইদহে জমিদারি দেখতে যেতেন, পদ্মায় ঘুরতেন বোটে। কিন্তু অত বছর আগে রবি ঠাকুর কী করে দিবাকরকে দেখতে পেয়েছিলেন ? রবিবাবুর মৃত্যুর দশ বছর বাদে দিবাকরের জন্ম।
    যাক সে কথা। ওই জন্য তিনি রবি ঠাকুর, আর সে দিবাকর ব্রহ্ম। রবি ঠাকুরের অবসর ছিল না, সে অবসৃত। পেনশন আর মান্থলি ইনকাম স্কিমের সুদে বাঁচে। কিন্তু তার ভিতরেই আচমকা মনে পড়ে গেল সেই মেয়েটির কথা। দিবাকর ফিয়েস্তা রেকর্ড প্লেয়ারটি চালিয়ে দিত, সে শুনতে শুনতে কাজ করত। নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায়ের মালকোষ শেষ হয়ে গেলে বলত আর একবার বাজাও দাদাবাবু। অখিলবন্ধু ঘোষ শুনে উদ্ভাসিত মুখে তাকাত। সেই মেয়ের কী কান্না, আর আমার গান শুনা হবে না দাদাবাবু, তুমার জন্যি মন কেমন করবে খুব
    দিবাকর ব্রহ্মর সারাদিনের রুটিনে তিনটি খবরের কাগজ, চাকরি থেকে রিটায়ারমেন্টের সময় ফেয়ারওয়েলে পাওয়া বিভূতি রচনাবলী নিয়ে বসা। সারাজীবন তেমন ভাবে পড়া হয়নি, এখন পড়ছে। আর এই ইন্টারনেটে বসা। ইঊ-টিউবে গান খুঁজতে খুঁজতে মনে পড়ে গেল তার কথা। দিবাকর খুঁজে খুঁজে মনের ভিতর থেকে তার নামটি বের করে আনল। কী ছিল নাম ? বুড়ি ?
    বুড়ি, এই বুড়ি তোর ভাল নাম নেই ?
    মেয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে। তার বাবা লোকটি চাষা। কিন্তু মোহরগঞ্জে এক ফসল,  বছরে একবার ধান। লোকটা, সেই নাকফুড়ি মণ্ডলের জমি বলতে চার বিঘে টাঁড়। আর ভাগে চাষ। তারপরে নামাল খাটতে বর্ধমানে যাওয়া। চারটে গুড়ি গুড়ি বাচ্চা। এই বুড়ি হল নম্বর। এর আগে একটা ছেলে, সে গেছে বার্নপুর, হোটেলে কাজ করে। ফেরেই না। বুড়ির পরে আরো দুটো মেয়ে। বউ মাঠে কাজ করে। তার সঙ্গে গুড়ি দুটোকে নিয়ে নামালে যায়। বুড়ির একটা হিল্লে হল। যখন নামাল যাবে তারা, বুড়ি থাকবে জে, এল, আর, ও পাহাড়ি বাবুর ঘরে।
    শুধু দিবাকরের ঘরেই তো কাজ করে না বুড়ি, জে,এল,আর,, পাহাড়ি সায়েবের ঘরে। তারপর বিডিওর বড়বাবু হালুইবাবুর ঘরে। সকাল থেকে খেটে বেড়ায় কিশোরী মেয়েটি। কালো  মেয়ে। চোখদুটি গানের সময় কেমন উদাস হয়ে যায়।
   ভাল নাম কী রে তোর ?
   ভাল নাম নেই সার
   সার ! হা হা করে হেসেছিল দিবাকর।  
   হাসিতে মেয়ে অবাক হয়ে বাবার দিকে তাকিয়ে ছিল। বাবা নাকফুড়ি সংকুচিত হয়ে বলেছিল, তাহলে কী বলবে সার ?
   দিবাকর কী অবলীলায় দাদাবাবু ডাকটি ফিরিয়ে এনেছিল। তার মামা তার বাবাকে দাদাবাবু বলত। দাদাবাবু বলে ভগ্নীপতিকে। তাই হোক। মেয়েটির গাল ভরে গিয়েছিল হাসিতে। চোখ দুটি উজ্জ্বল হয়ে গিয়েছিল। তার সাহস হয়েছিল, বলেছিল, ভাল নাম নাই, তুমি দাও কেনে
    কী নাম পছন্দ ?
    জানিনি
    তখন নাকফুড়ি বলেছিল, আপনার হাতে দি গেলাম সার, আপনার সব কাজ  করবে, মেয়েমানুষ হয়ে জম্মেছেআপনার সেবা করবে সার  
    নাকফুড়ি লোকটি শীর্ণকায়, চোখদুটি ঘোলাটে। মনে হয় নেশা করে। তার কথা ভাল লাগেনি দিবাকরের, কিন্তু মেয়েটির মুখ দেখে না করেনি। সে বলেছিল, কী নাম দেবরে তোকে, এইটুকু মেয়ের নাম কি বুড়ি হয় ?
    নাকফুড়ি কুড়ি টাকা নিয়ে চলে গিয়েছিল। টাকাটা সে বুড়ির পরের মাসের বেতন থেকে কেটে নিতে বলে গেল। বেতনের টাকা সে নিজে এসে নিয়ে যাবে। বুড়িকে দিবাকর বলেছিল, রতন
  প্রবল ভাবে মাথা নেড়েছিল সে, না, বেটা ছেলের নাম উটা
  রত্না ?
  না, রতনা উয়ারেই ডাকে গাঁর লোক, ভাল না, দুষ্ট, খাল ভরা
  দিবাকর তাকে পোস্ট মাস্টার বোঝাতে যায়নি। তার বাবা মার দরকার পড়েনি ভাল নাম দেওয়ার, দিবাকর দিতে পারলে দিক। ভাল নাম বাবুদের ঘরে থাকে। একটার বদলে পাঁচটা।  নাম দিতে হিমসিম খেয়েছিল দিবাকর তিনদিন ধরে। শেষে মেয়েই বলল, তুমি নাম বল ফুল দিয়ে
     ফুল দিয়ে! কী সুন্দর বলেছিল সে। ফুলের হাসি ঝরে পড়েছিল যেন দিবাকরের ঘরে। সে জিজ্ঞেস করেছিল, কী ফুল ?
    তুমার ইচ্ছে দাদাবাবু
     তুই কী ফুল চিনিস ?
    জবা, চাঁপা, গাঁদা। বলতে বলতে সে থমকে গিয়েছিল, বলেছিল, না, ইসব নাম ভালনি
    যদি বলি ডালিয়া, জিনিয়া, মল্লিকা, মালতী
    বুড়ি বলল, জিনিয়া কি ফুলের নাম?
     হ্যাঁ, পছন্দ ?
     সোন্দর, উটা কেমন ফুল দাদাবাবু ?
     তোর জন্য নিয়ে আসব।
     কিন্তু জিনিয়া নামটি ভাল জামা কাপড়ের মতো সে তুলে রাখল। অমন সুন্দর নাম, সব সময় কি বলা চলে? বুড়ি বুড়িই থেকে গেল। আর মাঝে মধ্যে সে বলে জিনিয়া নাম আর কাউর নাই দাদাবাবু। শুধু আমার, ইখন মু যদি বলি দাদাবাবু মোর নাম দিইছে জিনিয়া, উয়ারা নাম চাউর করি দিবে, কত মেয়্যা ছেল্যার নাম জিনিয়া হই যাবে
 হবে হবে, তাতে তোর কি ?
 না, ইটি মোর নাম, আমি দিব না কাউরে
 দিবাকর ব্রহ্ম মনে মনে ভাবে এখনো কি সে তুলে রেখেছে নামটি ? বিয়ের বেনারসি, সবচেয়ে দামী কাপড়টির মতো তোরঙ্গে রেখে দিয়েছে ন্যাপথলিন দিয়ে। দিবাকরের মাথায় এই শেষরাতে নানা রকম খেলা করে। তার মনে পড়ে ধবধবে শাদা একটি মস্ত জিনিয়া ফুলের কথা। ফুটেছিল তাদের বাড়ির ছাদে। টবের মাটিতে। সেই ফুল সে নিয়ে গিয়েছিল নপাহাড়ি। সেই ফুল দেখে বুড়ির মুখ দিয়ে অদ্ভুত বিস্ময় এক জেগে উঠেছিল। কী সোন্দর!
    ফুলটি সে বাড়ি নিয়ে গিয়েছিল। এই ভোরে দিবাকরের দিবাকরের মনে হল তার দেওয়া জিনিয়া ফুলটি সে বাড়িতে নিয়ে গিয়ে তোরঙ্গ বন্দী করেছিল। সেই ফুল ছিল মৃত্যুহীন, এখনো বেঁচে আছে। মাঝে মধ্যে বুড়ি তোরঙ্গ খুলে দেখে নেয় সে ঠিক আছে কিনা
     অখিলবন্ধু বাজিয়ে দিল দিবাকর ব্রহ্ম। পিয়াল শাখার ফাঁকে ওঠে, এক ফালি চাঁদ বাঁকা ওই... মরমিয়া গলায় বাজতে লাগলেন তিনি। দিবাকর ব্রহ্ম ভাবল সে এখন যেতে পারে নপাহাড়ি। ঘুরে আসবে নাকি। নাকফুড়ি মণ্ডলের মেয়ে বুড়ি। না না, জিনিয়া, তার কোথায় বিয়ে হল। তার জন্য একটি সিডি প্লেয়ার নিয়ে যাবে সে। আর অনেক গান, সেতার সরোদ বেহালা। আর বড়ে গুলাম আলির কা কঁরু সজনী আয়ে না বলম। অবিশ্বাস্য। এমন কখনো হয় ? নাকফুড়ির মেয়ে বড়ে গুলাম বাজলে চুপ করে যেত। আমজাদ আলি খাঁ বাজলে শুনতে শুনতে বিভোর হয়ে যেত। 
    তুই কী বুঝিস বুড়ি ?
   কানে শুনি দাদাবাবু।
   ভাল লাগে ?
   খুব, কানে লেগ্যে থাকে দাদাবাবু
   কী রকম ?
   গানটা, বাজনাটা সাথে সাথে ঘোরে
   সেই মেয়ে একদিন এসে বলল, পাহাড়ি সার ভাল না
   কেন রে কী হল ?
    না, ভাল না, আজ আমি যাই নাই
    কী হয়েছে বলবি ?
    তুমি দাদাবাবু গান শুনো, শুনে নি
   সবাই কি শোনে, তাতে কি মানুষ খারাপ হয় ?
     চুপ করে থাকল বুড়ি। দিবাকর টের পায় সবটা সে ভাঙ্গছে না। দুদিন বাদে বুড়ি এসে বলল, বাবা একশো টকা লিইছে খালভরা, মড়ার কাছ থিকে, দাদাবাবু পাহাড়ি মোরে শেষ করি দিবে গো, পলাই এয়েচি।   
     পাহাড়ি লোকটা অমন। পাহাড়ি ছাড়বে না মেয়েটাকে। মফস্বল-গঞ্জে সরকারী পদাধিকারী, পুলিশ আর পয়সাঅলা মানুষের স্বার্থ এক। নাকফুড়ির সদ্য কিশোরী মেয়েটাকে জে,এল,আর, পাহাড়ি নিয়েছিল এক সন্ধ্যায়। পাহাড়ির ফ্যামিলি তখন রাণাঘাটে, বাপের বাড়ি গিয়েছিল বউ বাচ্চা নিয়ে। পাহাড়ি এমনি বউকে হেথা হোথা পাঠিয়ে গাঁ থেকে মেয়ে জোগাড় করে আনে। কাজের মেয়েকে নিয়ে শোয়। এমনকি বউকে যাত্রা দেখতে পাঠিয়ে সন্ধেয় মেয়ে এনে ফুর্তি করেছে পাহাড়ি সে কথাও শোনা গেছে। বউ জানতে পেরে সারাদিন একা একা বিলাপ করেছে, সে কথাও জান দিবাকর।
    বুড়ি কিছুই বলেনি কিন্তু পাহাড়ি এসে গল্প করেছিল। নাকফুড়ির মেয়েটাকে  সেই প্রথম নিতে পেরেছে। টাকায় সব ঠাণ্ডা। নাকফুড়ি নিজে এসে মেয়েকে দিয়ে গেছে  সন্ধ্যায়। মুরগি কাটা হয়েছিল। নাকফুড়ি নিজে বসে থেকে সব ব্যবস্থা করে দিয়ে সিগারেট আনতে বেরিয়ে আর ফেরেনি।
   লোকটা খুব নিষ্ঠুর। হাসতে হাসতে কিশোরীর কুমারীত্ব হরণের কথা বলল। সে এমনি করে থাকে। মেয়েমানুষ হলে সে খুশি। যত জায়গায় ঘুরেছে পয়সা ফেললেই টাটকা ফুল। ফুল ছিঁড়তে তার খুব আনন্দ। তার বউ জানে, তাই বেশিদিন থাকে না এখানে। পাহাড়ি বলে, বউ হল মাস মাইনে, আর এসব হল উপরি, আপনি মশায় ধোয়া তুলসিপাতা হয়ে থাকার ভান করেন, চান তো ব্যবস্থা করি
   এই কী হয়েছে রে ? পরদিন জিজ্ঞেস করেছিল। 
   বুড়ি মাথা নেড়েছিল, কিছু তো না দাদাবাবু।
   সত্য করে বল
   কী হবে ?
   পাহাড়ি লোকটা তোর গায়ে হাত দেয় ?
   সে বলেছিল, দাদাবাবু, তুমি গান বাজাও
    আমার কথার জবাব দিলি না ?
   তুমি গান শুনাও দাদাবাবু, বাজনা শুনাও।
   রবি শঙ্কর বেজেছিল। রাগ দরবারী কানাড়া। শেষ রাতের নিস্তব্ধতা নেমে এসেছিল ঘরের ভিতর। তারপর আবার বেজেছিল তা। তারপর আবার। দুঘণ্টা পেরিয়ে গেলে সে বেরিয়ে গেল। তখন বিকেল। সে গেল হয় তো পাহাড়ির ঘরে
     নাকফুড়ি বলেছিল, ওসব কিছু না বাবু, পাহাড়ি সার ওরে নোতন জামা দিছে, ওর মারে কাপড় দিছে অঁর বউ দিদিমণির, দামী কাপড়, হামি মেয়ের বিয়া দিব, পাততর খুঁজছি
      পাহাড়ির ঘর থেকে ওকে ছাড়িয়ে আনো।
      না, হবেক নাই সার, পাহাড়ি মোর নিকট দুশো টকা পায়।
      চুপ করে গিয়েছিল দিবাকর। টাকা নিয়ে মেয়ে দিয়েছে সে। গরিব মানষের উ সব দেখলি চলেনি সার, হামাদের ঘরে ইয়াতে কোনো পাপ হয়নি, এমন হয়
      মেয়েটা চুপ করে থাকত। পাহাড়ির বউ ফিরে এলে রেহাই পেয়েছিল। কিন্তু পাহাড়ি তার বউ থাকতেও মেয়েটির গায়ে হাত দিত আড়াল পেলেই। কথাগুলো দিবাকর শুনেছিল বদলি হয়ে চলে আসার সময়। শান্ত হয়ে সে বলেছিল। বলেছিল, কী হবে দাদাবাবু, পুড়া গায় চন্ননের মতো আরাম দিত তুমার গান, হমারে আর কে শুনাবে গান, হামি মরে যাব দাদাবাবু, মরে যাব, জিনিয়াফুল শুঁকাই যাবে
      দিবাকর ব্রহ্ম জানে মেয়েটা পালিয়েছিল। কথাটা পাহাড়ির কাছ থেকে শুনেছিল সতের বছর বাদে। পাহাড়িকে সে চিনতে পারেনি। অকালে বুড়ো হয়ে যাওয়া ভাঙ্গা চোরা একটি মানুষের সঙ্গে তার দেখা হয়েছিল হাওড়া কালেক্টরেটে। কমল পাহাড়ি। অবসরের পর পেনশন আটকে গেছে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকায়। তার বউ মানসিক রোগগ্রস্ত, মেয়েটি পালিয়েছে এক লরি ড্রাইভারের সঙ্গে। কমল পাহাড়ি তাকে বলেছিল, মানুষের অভিসম্পাত সত্যি হয়, বুড়ি মেয়েটা তাকে প্রত্যেকবার অভিশাপ দিতে দিতে বেরত ঘর থেকে। দিবাকর চলে আসার সাত মাস বাদে সে পালিয়েছিল নপাহাড়ি থেকে। এমনও হতে পারে তার বাবা নাকফুড়ি তাকে আসানসোল-বার্নপুরে কোথাও বেচে দিয়েছিল। কমল পাহাড়ি তার সঙ্গে কথা বলতে পার হয়েছিল বঙ্কিম সেতু নিচে হাওড়া স্টেশনের রেল লাইন, সারা ভারতের দিকে ছুটে গেছে। সেই মোহর গঞ্জে কোনো রেল লাইন যায়নি। সারাদিনে কয়েকটি বাস মাত্র। যে যেত, সে পরদিন থেকে বদলির চেষ্টা করত। শুধু কমল পাহাড়ি ছিল অনেকদিন। অত সস্তায় মেয়েমানুষ পাওয়া যাবে আর কোথায় ? সে ছিল মেয়েমানুষখোর। সেই গঞ্জের মানুষ ছিল খুব গরিব। থানা পুলিশ সরকারী অফিসের বাবু আর সায়েবরা ছিল তাদের ঈশ্বর। পঞ্চায়েত ছিল সরকারী কর্তা আর অফিসের অনুগামী। কমল পাহাড়ি সবাইকে হাতে রেখে সুখে ছিল সেখানে।
 সেই দিন কমল পাহাড়ি তাকে  নিয়ে আলাদা হয়ে গিয়েছিল। তাকে নিয়ে গঙ্গার ধারে ফোর শোর রোডে চলে গিয়েছিল, বলেছিল, বউ মানসিক রোগী, ছেলে নষ্ট হয়ে গেছে, মেয়ে পালিয়েছে, সব সেই মেয়েটির অভিশাপে।
   তা হয় নাকি কমলবাবু ?
   আপনার সঙ্গে যদি তার দেখা হয়.........। কমল কথা শেষ করেনি।
    আমার সঙ্গে তার দেখা হবে কী করে ? অবাক হয়েছিল দিবাকর।
   কমল আর কথা বলেনি। কমলের সঙ্গে তার দেখাও হয়নি আর। সেও তো বছর পাঁচ হতে গেল। এই ভোরে দিবাকর ব্রহ্ম বিলায়েত খাঁ সায়েবের ভৈরবী নিয়ে কার কাছে যাবে ? এই মহা ব্রহ্মান্ডের কোথায় আছে জিনিয়া ফুল। গোলাপি হলুদ আকাশী নীল...হরেক রকম গান আর সুরের মতো, রাগ রাগিনীর মতো সেই ফুলের রং। দিবাকর জিনিয়াফুল নামে একজনকে পায় তার বন্ধু। হাজারের উপর বন্ধু তার এই ফেসবুকে। এ কবে বন্ধু হল কে জানে ? নিবাস আর এক গঞ্জ। মোহরগঞ্জ হলেও হতে পারে। দিবাকর অবাক। এই ভুবন গ্রামে সবই সত্য। সে লিখেছে আমি খুব দুঃখী মেয়ে। গানে আমার শরীর জুড়োয় বন্ধু। বন্ধু আমায় গান দেবে ? কই, তার ওয়ালে কেউ তো কোনো গান পাঠায়নি। দিবাকর ব্রহ্ম অলীক ভুবনগ্রামে খুজে পেল এক জিনিয়া ফুল। অলীক কিন্তু সত্য। মোহরগঞ্জের সে হয়ত ধর্ষিতা হতে হতে শেষ হয়ে গেছে। মরে তার জীবন জুড়িয়েছে। সুরহীন জীবন অলীক নিস্তব্ধতার ভিতর সুর পেয়ে গেছে হয় তো। দিবাকর এই নানা রঙের জিনিয়া ফুলের কাছে পাঠিয়ে দিল বিলায়েতের ঊষাকাল, ভৈরবী রাগ। তোমার তাপিত জীবন জুড়োক জিনিয়া ফুল। এখনো এই দিবাকর ব্রহ্ম কিছুই করতে পারবে না। তখনো পারেনি। শুধু অলীক এক স্বপ্নের ভিতরে ডুবে গিয়ে নিজের ব্যর্থতাকে ভুলতে চাইবে। কমল পাহাড়ির কাছে জিনিয়া ফুলটিকে রেখে সে নিশ্চিন্তে ফিরে তো এসেছিল বদলি নিয়ে। এখন আর এক জিনিয়ার কাছে গান পাঠিয়ে কী সুখেই না থাকল দিবাকর ব্রহ্ম,পেনশনভোগী বেকার, মান্থলি ইনকাম স্কিমে সুখ কেনা যার অভ্যেস।


            

২টি মন্তব্য:

  1. বেঁচে থাকুক মোহরগঞ্জ... অমন জিনিয়া ফুলেরাও বেঁচে থাকুক... দিবাকর তুমিও বেঁচে থাক।

    শ্রাবণী দাশগুপ্ত।

    উত্তরমুছুন