বৃহস্পতিবার, ২২ আগস্ট, ২০১৩

গল্পপাঠ : শ্যামলের গল্প

ভিক্টোরিয়ার হিরো

কুলদা রায়

১.

গল্পটি মাত্র সোয়া তিন পৃষ্ঠার। লেখক শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়। নাম ভিক্টোরিয়ার হিরো।

শুরুর সময়টা ১৮৬৯ ইং। তখন রবীন্দ্রনাথের জন্ম হয়ে গেছে। বয়স আট। বাবার সঙ্গে হিমালয়ে গেছেন। মীরাট, না, দিল্লীতে সিপাহী বিদ্রোহ শেষ হয় গেছে। এটা নিয়ে আমাদের মাথাব্যাথা নেই। শ্যামল আমাদের নিয়ে যাচ্ছেন মাছরং গ্রামে। থানা–বানারীপাড়া। জিলা–বরিশাল। ধানকাটা শেষ হয়ে গেছে। নদীর পাড়ে পালাগান বসেছে। দলের নাম নট্ট কোম্পানী।

রাধাকৃষ্ণের পালা। আয়ান ঘোষ সেজেছেন গিরিশ গাঙ্গুলি। তিনি খুব চিন্তিত। তার ছয়টি মেয়ে হয়েছে। আবার বাড়িতে দাই এসেছে। বাড়িটা পালামাঠের ওপারে–বাইশাড়ি গ্রামে। আজ আরেকটি ছেলে কি মেয়ে হবে তাই নিয়ে ভাবতে ভাবতে গানের বানী গেছেন ভুলে। গেয়ে উঠেছেন–আমারই বঁধুয়া আনবাড়ি যায় আমারি আঙিনা দিয়ে। ভাগ্নে কৃষ্ণের সঙ্গে অভিসারে চলেছে আয়ানের বউ রাধা। এই গানটিও আখ্যানের সঙ্গে লেগে গেছে। লোকের চক্ষে জল। এ সময়ই বঙ্কিমচন্দ্র দুর্গেশ নন্দিনী বলে একটা বই লিখে ফেলেছেন। কলকাতা থেকে কুষ্টিয়ায় রেলগাড়ি এসে গেছে। বরিশালে রেলগাড়ি আসবে না। এত নদী পার হয়ে কিন্তু ব্রাহ্মধর্ম এসে পড়েছে। ঠিক এ সময়ই সন্ধ্যানদী পার হয়ে বানারীপাড়ার বিখ্যাত দাই উষাঙ্গিনী নট্ট কোম্পানী অধিকারী বৈকুণ্ঠ নট্টের কানে কানে এসে বললেন, নট্ট মশাই গিরীশচন্দ্রের আবারও মেয়ে হয়েছে। তার সাহস নেই সদ্যোজাত মেয়েটির বাবা গিরিশের কানে খবরটি পৌঁছে দেওয়ার।

শ্যামল লিখেছেন, পালাগানতো থেমে থাকতে পারে না। বৈকুণ্ঠ নট্টকে ঘিরে বসা বাঁশিবাজিয়েরা ততক্ষণে কৃষ্ণের বাঁশির টান ধরেছে। কিন্তু আজ যে নিশিথিনী ননদিনী জেগে থাকবে পাহারায়। এর পরের বিবরণটুকু শ্যামল দেন না। আমাদের মর্মে এসে পড়ে। এর মধ্যেই রাধিকা অভিসারে যাবেন। যাওয়াটাই নিয়তি। গিরিশ গাঙ্গুলির অবাক করে বলে দিলেন উষাঙ্গিনীকে, মাইয়ার নাম দিলাম ভিক্টোরিয়া। ভিক্টোরিয়া মা ভালো আছে। গল্পটি এই ভিক্টোরিয়া মাকে নিয়েই।

দেড় পৃষ্ঠা পার হওয়ার পরেই আমরা বুঝতে পারি–এরপর অনেকদিন কেটে গেছে। বঙ্কিমচন্দ্র ঋষি হয়ে স্বর্গে গেছেন। নট্ট কোম্পানী কলকাতায় শোভাবাজারে বাড়িভাড়া করে অফিস খুলেছে। গিরিশচন্দ্র জোড়া মহিষ মানত করে ছেলের বাবা হয়েছেন। সেই ছেলে এখন খুলনার কোর্টে কাজ করেন। কিরণকুমারী নাম তার বউয়ের। দুতিনটে ছেলেমেয়ে। কিরণকুমারী ভিক্টোরিয়ার ননদিনী।

ভিক্টোরিয়ার বিয়ে হয়েছিল। কিন্তু মুখরা বলে তিনদিনও স্বামীর সংসারের টিকতে পারেনি। ভাইয়ের সংসারে এসেছে। সেটা ১৯২৫ সালের কথা। তখন দেশবন্ধু পরপারে। গিরিশচন্দ্রও। ইংলন্ডেশ্বরী রানী খোদ ভিক্টোরিয়ার নামে কলকাতার বুকে গড়ের মাঠে বাড়ি উঠেছে। মো. গান্ধী নামে একজন লোক প্রায়ই জেলে যান।খুলনায় কিরণকুমারী দিনে ঘরের কাজ করেন। রাতে ঘুমাতে পারেন না। জেগে জেগে ননদিনীর পাহারায় থাকেন। ননদিনী ভিক্টোরিয়া প্রদীপা জ্বালিয়ে ঘরের মধ্যে শ্রীকৃষ্ণের ছবির সামনে অভিসারী রাধিকা হয়ে নাচেন। কিরণকুমারীর ভয়–পাছে কাপড়ে আগুন লেগে যায়। ভিক্টোরিয়ার বয়েস হয়ে যাচ্ছে। ষাটের কাছে এসেছে। নাচতে গেলে পা ভাঙতে পারে। কৃষ্ণই তার স্বামী। বহুদিন আগে তাঁর নিজের স্বামীটি মারা গেছেন। তাঁর কোনো স্মৃতি তার মনে নেই। তবু তিনি থান পরেন।

এক সন্ধ্যায় ভৈরব নদীর পাড়ে কিরণকুমারী ননদিনীকে রাধাকৃষ্ণের মন্দিরে নিয়ে যান। সেখান থেকে বাতাসা পেয়েছেন। ফেরার পথে বাতাসাখানি হাত থেকে পড়ে গেল। জ্যোৎস্না নেমেছে। ঘাসের মধ্যে বাতাসাখানি খুজে পেলেন না ভিক্টোরিয়া। ননদিনীকে কাতর কণ্ঠে বলছেন, ও বউ, আমার সোয়ামি? হাতড়ে হাতড়ে সোয়ামিকে খুঁজে পেলেন। এবার আর হাতে নয়। মুখে পুরে মন দিয়ে চুষতে লাগলেন। যত চুষছেন–তত ব্যথা লাগছে। তবু কিছু বলছেন না। স্বামী তো। নিজেকে মন মনে বোঝালেন–স্বামী তো কিছু শক্তই হয়।

বাসায় এসে হারিকেনের আলোতে বাতাসাখানি মুখ থেকে বের করে ভিক্টোরিয়া ধরলেন। বলছেন, দ্যাখ তো বউ আমার সোয়ামী কেন এত শক্ত? শ্যামল এরপর লিখেছেন, অন্ধকারে বাতাসা ভেবে রাস্তা তৈরীর ছোট পাথর কুড়িয়ে মুখে দিয়েছেন ভিক্টোরিয়া।

কাণ্ড! এই বাইশাড়ি গ্রামে আমি বহুদিন গিয়েছি। মাছরং গ্রামের বটতলায় বসে থেকেছি। ভিক্টোরিয়া নামে ননদিনীর কথা আমাকে কেউ কখনো বলেনি। শ্যামল বলেছেন। বলেছেন, কিরণকুমারীর ছেলেটির নাম শ্যামল রেখেছিলেন সেই ননদিনী ভিক্টোরিয়া। এসো শ্যামল সুন্দর।


২.

গল্পটির শুরুতেই শ্যামল আমাদের একটা গান শোনাচ্ছেন–

আমি বলিতে ভুলিয়া গিয়াছি
যেন সে কিছুতেই বাঁশি না বাজায়
আজি নিশীথিনী ননদিনী
জাগিয়া জাগিবে প্রহরায়।

ইমন বিলাবল। দ্রুত একতাল। একটু তাল ঠুকেও দিচ্ছেন শ্যামল–ধা গেড়ে নাগ কদ্দি–ধেড়ে নাগ—-। ঘুরে ঘুরে কাঠের খোলা উঁচু পাটাতনে গোয়ালিনী রাধা গাইছেন। এই পাটাতনটি কোথায়? বৃন্দাবনে? কৃষ্ণের বাড়ি গোপপল্লী? সেটাই মনে হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু শ্যামলের গল্পে সেটা পালামাঠে–সন্ধ্যানদীর কুলে। শ্যামল গোপপল্লীর গল্পটি কইছেন না। এটা নিশ্চিত করেন বাক্যের প্রথমেই পাটাতন শব্দটি দিয়ে। ইমেজটি তৈরি করেন–পাটাতনের সামনেই নীচে বৈকুণ্ঠ নট্ট বসে। তাকে ঘিরে খোল, করতাল, ঢোল, বাঁশি, ক্লারিওনেট বাজছে। এই গান বেঁধেছেন বৈকুণ্ঠ নট্ট। সুরও দিয়েছেন তিনি। পালাটিও তার রচনা। এ পালায় গিরিশ গাঙ্গুলি নামে বাইশাড়ী গ্রামের এক সম্পন্ন চাষী আয়ান ঘোষ সেজেছেন। আয়ান ঘোষের খালি গা। রীতিমত সুপুরুষ। উদাত্ত গলায় গান করতে পারেন। গল্পের বীজ এই আয়ান ঘোষ ওরফে গিরিশ গাঙ্গুলি।

বীজের মধ্যে প্রাণ থাকে। সেটা কিন্তু সত্যি নয়। প্রাণের ঘুমন্ত রূপ। এই বীজ ভেঙে যখন তার বিস্তারটি ঘটে, শেকড়, শাখা, প্রশাখা, পাতা, কুঁড়ি, ফুল, ফলে বৃক্ষ হয়ে ওঠে, আকাশ স্পর্শ করে, তখন সত্যিটা প্রকাশিত হয়। সে সত্যির কোনো সীমা থাকে। অরূপ হয়ে ওঠে।

এই রূপ ভেঙে ভেঙে অরূপটি বিনির্মাণ করেছেন শ্যামল এই সোয়া তিন পৃষ্ঠায়। শুরু হয়েছিল–বাইশারী গ্রাম থেকে। সেটা চলে এসেছে মীরাটে, না, দিল্লীতে, বরিশালে, কলকাতায়, শিয়ালদাহে, কুষ্টিয়া, খুলনা থেকে ইংলন্ডে। বঙ্কিম থেকে ম গান্ধিতে। ফাঁকে দেশবন্ধু থেকে মহারানী ভিক্টোরিয়াতে। চলে গেছেন ননদিনী জটিলাকুটিলা থেকে কিরণকুমারিতে। মৃতস্বামী থেকে শ্রীকৃষ্ণে। বাতাসা থেকে রাস্তাবানাবার ছোট পাথরের টুকরোতে। পাথরের টুকরোটিকে আর পাথর বলে মানতে পারছেন না ষাটোর্ধ রাধাভাবে আকুল ভিক্টোরিয়া। পাথরের টুকরোটিকে ধরে নিয়েছেন সোয়ামি হিসেবে। সোয়ামি তো পাথরের টুকরোর মতোই। শক্ত। পাথর কি প্রাণে আরাম দিতে পারে? পারে না। ব্যথা দেন।

এইখানে ইমন রাগটি বাগেশ্রীতে এসে পড়ে। তাঁর রূপের রূপান্তর হয়ে যায়। বলে, সে যেন সে কিছুতেই বাঁশি না বাজায়। বাজালে ননদিনীকে এড়িয়ে অভিসারে যেতে হবে। দেখতে হবে আয়ান ঘোষ পাটাতনে দাঁড়িয়ে কান্না করছেন– আমারি বঁধুয়া আনবাড়ি যায় আমারি আঙিনা দিয়া। পথে পথে কাঁটা। জঙ্গলের মধ্যে সাপ খোপ। যমুনা নদী ফুঁসে উঠেছে। আর কৃষ্ণের কাছে গেলে ব্যথা লাগে। ব্যথা ছাড়া আর কি আছে ভালোবাসায়?

৩.

এই ভালোবাসার গল্পটিই বলছেন শ্যামল। আমাদের সঙ্গে হাওলা করে দিচ্ছেন–আয়ান ঘোষের সঙ্গে গিরিশ গাঙ্গুলিকে। রানী ভিক্টোরিয়ার সঙ্গে বাইশারীর সদ্যোজাত ভিক্টোরিয়াকে। জটিলাকুটিলার সঙ্গে ননদিনী কিরণকুমারীকে। ঘর-ছাড়া-করা বাঁষিএ সঙ্গে প্রদীপের খোলা আগুণে। স্বামীর সঙ্গে বাতাসাকে। বাতাসার সঙ্গে কালো পাথরের টুকরোকে। এর সঙ্গে বাঁশি বাজে কি প্রকারে?

বাজে। শ্যামল বাজান। শ্যামল বাঁশি বাজিয়ে দেন শব্দের বিশ্বস্ত প্রয়োগে। পুরান থেকে ইতিহাসে। ইতিহাস থেকে সমকালে। শ্যামল আমাদের সঙ্গে সময় নিয়ে কানামাছি খেলেন। ঘটনাগুলো তার মতো করে ভেঙে দেন। ভেঙে যেতে যেতে নতুন একটা ঘটনার জন্ম হয়। সে ঘটনার ফাঁদে আমরা পড়ি। এই ফাঁদে পড়াটাই আমাদের নিয়তি। সেই নিয়তির বীজটি অঙ্কুরিত হয়। শাখা হয়। প্রশাখা হয়। পল্লবিত হয়। বৃক্ষের মধ্যে সৃষ্টিশীল প্রাণের জন্ম হয়।

শ্যামল নিয়তিকে লেখেন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন