বৃহস্পতিবার, ২২ আগস্ট, ২০১৩

'পিতা ও কুকুর ছানা'

হরিপদ দত্ত

খোদার এই দুনিয়া কেমন করে বদলে যায়, এর ব্যাখ্যা হয়তো আজীবন অজানাই থেকে যাবে বৃদ্ধের কাছে। কেন জানাজানি হয়নি এই আক্ষেপ করেই বুড়ো মানুষটা বাস থেকে নেমে গ্রাম্য নিবাসের উদ্দেশ্যে হাঁটতে থাকেন
মাঝখানে একটি রাত, গতকালই গিয়েছিলেন উপসচিব ছেলের সরকারি আবাসে। বড় একটা যাওয়া হয় না, এবার যেতে হলো গ্রাম্য বৈশাখী মেলার স্মৃতি নিয়ে। মেলাও যে বদলে গেছে খবর ছেলেকে শোনাবেন বলে। ছেলের প্রিয় গুড়ের জিলাপির পোটলাটা হাতের ব্যাগে। হয়তো বাসি হয়ে গেছে

বৃদ্ধের মনেই ছিল না ছেলের রুচিরও যে বদল ঘটেছে। ওসব সে খায় না। তাই সঙ্গে করে ফিরিয়ে আনা। গ্রাম্য নোংরা মানুষের হাতে তৈরি খাদ্যে কি রোগ জীবাণু থাকতে নেই?
গ্রাম্য প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত বৃদ্ধ শিক্ষকের কাছে পড়ন্ত বিকেলের খর রোদের তেজকে দোজখের আগুনের মতো মনে হয়। তাই মাঠের তেঁতুলতলার ছায়ায় দাঁড়াতেই হয় তাকে। তিনি বুঝতে পারেন গ্রামও বদলে গেছে। নির্জনতা নেই। নির্জন মাঠ নেই। ঘন ঘন বাড়ি। মানুষ দ্রুত বাড়ছে। ভূমির কাঠামো বদলে গেছে। সনাতন চাষের বদলে আধুনিক চাষের জন্য জমিনের গঠনও কোদালের কোপে, ট্রাকটরের আঘাতে বদলে গেছে। আদিম বৃক্ষের স্থান দখল করেছে বিদেশী গাছের চারা। কিন্তু বুড়ো মানুষটা বুঝতে পারেন না গাছ-গাছালি, শস্য-ফসল, মাটি-জমিন বদলে যাওয়ার পাশাপাশি মানুষেরও যে মনের বদল ঘটেছে
ইসকুলের সমাজ আর ভুগোল বইটিও কি তা হলে বদলেত গেল? কোথায় হারিয়ে গেল ছয় ঋতু? হারিয়ে গেল কি ঘন বর্ষার আষাঢ় সন্ধ্যা? দীর্ঘ শীত, দীর্ঘ গরম কি আরো দীর্ঘ হবে? তেঁতুলতলা থেকে পা ফেলার মুহূর্তে ব্যাগে হাত গলিয়ে দিয়ে বৃদ্ধ বুঝতে পারেন কলা পাতায় পেচানো পলিথিন ব্যাগে মোড়ানো গুড়ের জিলাপি ততক্ষণ থিকথিকে নরম হয়ে গেছে। গুড় আর তেল মেশানো বাসি গন্ধ নাকে আসে তার। তখন বৈশাখী গ্রাম্য মেলা পাখা মেলে ওড়ে তার মনের আসমানে
পা চলতে চায় না। এখনই বাড়ি ফিরে যাবেন কি? কি জবাব দেবেন বৃদ্ধা স্ত্রীর কাছে? বলতে কি পারবেন, ' আজাদের মা, তোমার পোলা আর পোলার বৌ গুড়ের জিলাপি খায় না, এসব অখাদ্য।'
'ক্যান খায় না আজাদ? ছোটকালে গুড়ের জিলাপির জন্য পাগল ছিল না কি, ক্যামনে বদলে গেল তার মুখ?' হয়তো এমনটাই বলবে বুড়িটা। অবাক নয় বরং কষ্ট বাড়বে মনে
'দুনিয়াটা যে বদলাইয়া গ্যাছে তুমি আমি টের পাই নাই আজাদের মা।' এর বাইরে কি বলার থাকবে বুড়ো মানুষটার?
বুড়ো স্কুল শিক্ষক পাঞ্জাবীর পকেট থেকে চশমাটা বের করে পরে নেন। নিজের গাঁয়ের পথে না হেঁটে বাম দিকের পথটা ধরেন। ওদিকে এলজি আর এর পাকা সড়ক নেই। ইউনিয়ন কাউন্সিলের কাঁচা পথ। পথ তার ছেলে আজাদের মাদ্রাসা পড়-য়া আধা শিক্ষিত তালাক দেয়া প্রথম স্ত্রীর বাপের বাড়ির। তালাক পেয়ে বাপের বাড়ি ফিরে এলে আজই বুড়োর বাড়ি আসা। আগের বহুবার এসেছেন। বৌটার বাপও এসেছে বিলের উজানি কইমাছ কিংবা কোঁচের খাইয়ে শিকার করা বোয়াল মাছ নিয়ে। কেন আজ যাচ্ছেন বুড়ো? বাসি গুড়ের জিলাপির পোটলাটা কি প্রাক্তন পুত্র বধূর হাতে তুলে দেবেন? যদি গ্রহণ না করে?
টিনের চালের বাড়িটি শূন্য। পড়শিরা জানায় কোন গাঁয়ে যেনো আত্মীয় মরেছে, খবর পেয়ে সবাই ওখানে গেছে। ফিরতে রাত হবে। হতাশ বৃদ্ধ ভাবেন জিলাপির পোটলাটি কি পড়শির কাছে রেখে আসবেন? না, তা কি হয়? কি জানি কি ভাববে। তালাক বৌ' বাড়ি বলে কথা। বৌটাও যদি সেসব গ্রহণ না করে?
বৃদ্ধ স্কুল মাষ্টার হাঁটতে থাকেন। সীতানাথ বসাকের আদর্শলিপি বইয়ের শেষ পৃষ্ঠার নীতিকথাগুলো বিড়বিড় করে পাঠ করে করে পা ফেলেন। বেলা পড়ে আসছে। গ্রাম্য মসজিদের আজানের সুর ভেসে আসে। দ্রুত বাড়ি ফিরতে হবে। নামাজের সময় বয়ে যাচ্ছে। আজ তো আর খোদার কাছে সন্তানের মঙ্গলের জন্য কোনো কিছু চাওয়ার নেই। বরং আপন গোনাহ্ ক্ষমার জন্য হয় তো তাকে ব্যাকুল হয়ে মোনাজাতে মগ্ন হতে হবে। দোয়া চাইতে পারেন প্রথম পুত্রবধূর একমাত্র নাবালক পুত্রের জন্য। কোথায় তাকে রাখা হয়েছে বৃদ্ধ তা জানেন না। তাকে জানানো হয় না। কেবল জানেন বাইরের কোথাও মাতৃছায়ায় রাখা হয়েছে শিক্ষার জন্য। বৃদ্ধ নিজের কাছে রাখতে চেয়েছিল ছয় বছর বয়সের নাতিকে। ছেলে রাজি হয়নি। গ্রামে থাকলে নাকি নষ্ট হয়ে যাবে। এমনটা ঘটলে কি জবাব দেবেন ছেলেকে?
চোখে জল আসে বুড়োর। তার উপসচিব ছেলে মিথ্যে বলেনি। কি যোগ্যতা আছে তার নাতিকে মানুষ করার? বিড়িবিড় করেন বুড়ো, 'আজাদ, তুই মিথ্যা কস নাই, হাছাই কইছস, গ্রামে থাকলে মানুষ নষ্ট হইয়া যায়। তুইও গ্রামের ছেলে, নষ্ট হওয়া থেকে নিজেরে বাঁচাইতে পারলি বাপধন?'
কেরানী থেকে প্রমোশন পেয়ে উপসচিব। প্রমোশন পেয়ে ছেলে বদলায়। মাদ্রাসায় পড় ুয়া বৌ তো আর বদলায় না। তাই বেমানান হয়ে যায়। সচিবের বৌ হবার যোগ্যতা নেই যার সে তো বাপের বাড়ি ফিরবেই। শূন্য জায়গা পূর্ণ করে নগরবাসী ভদ্রশিক্ষিত পরিবারের শিক্ষিত মেয়ে। সেই শিক্ষিত মেয়ে, অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ অফিসারের কন্যা যদিও তার দ্বিতীয় পুত্রবধূ, সে তো গুড়ের জিলাপি খায় না, পিজ্জা খায়, ফাস্ট ফুড খায়। গ্রাম্য শিক্ষকের এসব জানার বিষয় নয়। কিন্তু পুত্র আজাদ কি বৈশাখী মেলার জিলাপির ঘ্রাণ ভুলে গেছে? মনে কি পড়ে না মেলায় যাবার পথে বাতাসে ভেসে আসা গন্ধ নাক ভরে টেনে নিতে নিতে লাফাতে লাফাতে বলত, 'আব্বা, জিলাপির গেরান পাইতাছি।'
তখন বিল ভরা পদ্মপাতা ছিল। চৈত্র-বৈশাখের খরার দিনেও আধা শুকনো বিলে পদ্মপাতা পাওয়া যেতো। সে সবে হতো পোটলা। যারা দোকান কিংবা মেলায় বসা উনুনের পাশে দাঁড়িয়ে গরম জিলাপি খেতো তাদের জন্য ছিল ঢেউয়া পাতা। ঢেউয়া পাতায় গরম আঠালো গুড়ের জিলাপি! সেই দিন তো ফুরিয়ে গেছে। চোখের সামনে কেমন করে দিন ফুরায়, সময় বদলায় সেসব টেরও পাননি বৃদ্ধ মাস্টার। কেবল বিশ্বাস করেন ছয় বছরের নাতিটা জিলাপি ভালবাসত। ভালবাসত ওর তালাক পাওয়া গ্রাম্য অর্ধ শিক্ষিত জননীও
বুড়োর মনে পড়ে ছেলের বাসায় পেঁৗছে ব্যাগ খুলে বৌমায়ের হাতে জিলাপির পোটলা তুলে দিলে নোংরা বস্তু হাতে লেগে যাবার মতো হাত সরিয়ে নিয়ে মুখ বিকৃত করে বলেছিল, 'ছি! ওসব কি বাসায় নিয়ে আসছেন, চারদিকে ডায়রিয়া, গুড়ের ভান্ডে ইঁদুর-ছুঁচো পচে গলে পড়ে থাকে, মানুষ ওসব খায়?'
ছেলে আজাদ প্রতিবাদহীন নির্বাক। বুড়োর চোখে জল। সন্ধ্যা ঘনিয়ে রাত নামছিল বলে ছেলের বাসা ছাড়তে পারেননি। ইচ্ছে ছিল সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে পড়েন। সারা রাত ঘুমোননি। মনে পড়ে মাদরাসা পড়া মেয়েটা যতদিন তার ছেলের সঙ্গে ছিল ততদিন এই ঢাকা শহরেও গ্রাম ছিল, এখন তা নেই। যতদিন ছেলেটা ছিল কেরানী ততদিনও বাসার ভেতর গ্রাম্য বাগান ছিল, সচিব হলে পরে খরায় পুড়ে বাগান চিহ্নহীন হয়ে যায়
ত্রিসন্ধ্যায় উঠোনে পা রাখেন বৃদ্ধ স্কুল শিক্ষক। বৃদ্ধা স্ত্রীকে সামনে পেয়ে আজানের কথা, নামাজের কথা মনে পড়ে। ওজু সেরে নামাজ পড়েই মুখ খোলেন বুড়ো, ' আজাদের মা, কুত্তার ছাওটারে দ্যাখতেছি না তো?'
'টাউন থাইক্যা আইসা কথাবার্তা নাই, ভালামন্দ বচন নাই, কুত্তারছাও তালাশ করতাছ যে?' স্বামীর পাশে এসে বসে বৃদ্ধা
নিরুত্তর বৃদ্ধ মুখে শব্দ তুলে কুকুরের ছানাটিকে ডাকেন। অবাক বটে! কোথা থেকে যেনো দৌড়ে এসে বুড়োর পা চাটতে থাকে কুকুর ছানা। দাওয়ায় রাখা ব্যাগটা থেকে জিলাপির বাসি পোটলাটা বের করে আনেন বুড়ো। জিলাপিগুলো এখন কুকুর ছানার দখলে। বুড়োর চোখে পানি গড়ায়। আক্ষেপ ভেঙে পড়ে গলায়, 'আজাদের মা, কুত্তারে আদর কর, পোষ মানবো, কুত্তা বেঈমানী করে না, মানুষ বেঈমানের জাত, মায়ের পেটে পয়দা নিয়াও মায়ের সঙ্গে বেঈমানী করে, কুত্তা তা করে না।'

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন