বৃহস্পতিবার, ২২ আগস্ট, ২০১৩

সাক্ষাতকার : সাহিত্য কখনোই শুকিয়ে যাওয়ার নদী নয়---শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়

সূচি সৈয়দ

মানুষকে ভালবাসার এক দুর্লভ আর অসাধারণ ক্ষমতার অধিকারী লেখক শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় চব্বিশে সেপ্টেম্বর কলকাতার একটি নার্সিং হোমে পরলোকগমন করেছেন। মানুষকে ভালবাসার অপরিমেয় শক্তিতে এই মহান ও মহৎপ্রাণ লেখক আমাদের পরমাত্মীয় হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর মতো বড় মাপের লেখক, তার ওপর তারা যদি হন পশ্চিমবঙ্গীয়, তারা তাদের হাঁটু ভেঙ্গে মানুষের সমান হতে পারেন না। তারা সর্বার্থেই দাদা থাকতে চান, কী দাদাগিরির ক্ষেত্রে, কি সুযোগ-সুবিধা আদায়ে। আমার দেখা অভিজ্ঞতায় শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় তার ব্যতিক্রম, যিনি তাঁর হৃদয় মেলে ভাই হয়ে উঠতে পেরেছেন অন্ততঃ আমার মত অভাজনের কাছেও।


মনে পড়ছে শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের সেই ই-মেইলটির কথা। কবি আবু হাসান শাহরিয়ারকে লেখা যে ই-মেইলে তিনি তাঁর লেখা বিখ্যাত উপন্যাস কুবেরের বিষয়-আশয়-এর বাংলাদেশ সংস্করণের রয়্যালিটির সমস্ত টাকা বাংলাদেশের ক্যান্সার আক্রান্ত তরুণ কবি কমল মমিনের চিকিৎসার্থে প্রদানের ইচ্ছা ব্যক্ত করেছিলেন। 
বাংলাদেশের তরুণ কবি কমল মমিন ১৯৯৫ থেকে ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে আছেন। তার ক্যান্সার আক্রান্ত থাইরয়েডগ্ল্যান্ডটি ডাক্তাররা অপারেশন করে ফেলে দিয়েছেন। অসাধারণ মনোবল, ওষুধপত্র আর চিকিৎসা সম্বল করে তিনি লড়াই করছেন ক্যান্সারের বিরুদ্ধে। তার এবং আরো দুজন অসুস্থ লেখক-- প্রবীণ সাংবাদিক বিনোদ দাশগুপ্ত ও কবি শহীদুজ্জামান ফিরোজ-এর জন্য কিছু করবার চিন্তা থেকে আমরা তখন সুহৃদ সভা ট্রাস্টনামে একটি সংগঠন করার উদ্যোগ নিই। দেশের প্রধান কবি শামসুর রাহমান, অন্যতম গদ্যশিল্পী ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, প্রাবন্ধিক আহমদ রফিক সহ অনেকে সে উদ্যোগে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছেন। কলকাতা থেকে কবি মঞ্জুষ দাশগুপ্ত সে উদ্যোগে উৎসাহ অনুপ্রেরণা দিয়ে একাত্মতা জানিয়েছেন। ঠিক এ রকম একটা সময়ে শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের ই-মেইলটি বৈপ্লবিক ঘোষণার মতো। আমরা উদ্দীপিত এবং অভিভূত বোধ করলাম। শ্যামল দা এক আশ্চর্য আয়ুধ জোগালেন আমাদের, আমরা উপলব্ধি করলাম লেখকের শক্তি কত বড়, কত বিশাল লেখকের ক্ষমতা। এক নবীনের জন্য প্রবীণের এই ভালোবাসা চিরপ্রণম্য।
সেই শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় ঢাকা আসছেন শোনার পর তাঁকে ধন্যবাদ জানাতে হলেও তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করা প্রয়োজন বোধ করছিলাম কিন্তু নানা ব্যস্ততা, সর্বোপরি তাঁকে যারা ঢাকায় এনেছেন (রাইটার্স ক্লাব) তাদের সিডিউল ইত্যাদি মিলিয়ে নানা জটিলতাকে এড়িয়ে রাত নয়টার দিকে তার হোটেল কক্ষে আমরা হাজির হলাম। তোপখানা রোডের ওয়ার্কার্স পার্টি অফিসের সামনের নতুন হোটেল বিল্ডিংটির লিফটে চড়ে আমরা যখন তাঁর রুমে উপস্থিত হলাম তখন বোধ হয় রাত সোয়া নয়টা। তারপর এক সুদীর্ঘ আড্ডা ও আলপচারিতা তার কক্ষে থেকে বেরুলাম যখন তখন ঢাকা শহর ইংরেজি নববর্ষের উৎসব থামিয়ে প্রায় নিঝুম। 
সেই দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে আমরা এক অসাধারণ প্রাণবন্ত বাঙালকে আবিষ্কার করেছিলাম। তাঁর মুখে মুসলিম লীগের নেতা খান এ সবুর-এর প্রশংসা শুনে বিস্মিত হয়েছিলাম, বিস্মিত হয়েছিলাম এই উক্তি শুনে যে, ‘‘সবুর খান তো মোটেই সাম্প্রদায়িক মানুষ ছিলেন না, অসাম্প্রদায়িক উদার এক রাজনীতিবিদ ছিলেন, ক্ষমতার জন্য, ভারত বিভাগের রাজনৈতিক নিয়তির শিকার হন ওই জননেতা। 
স্যার রেডক্লিফ-এর বাংলা বিভক্তির পেছনে গঙ্গা অববাহিকার ভূমিকা, তথা ফারাক্কা বাঁধের তাৎপর্যও তিনি তুলে ধরেন। সেদিন তিনি খুব গভীর ভালোবাসার সঙ্গে বলেছিলেন, ‘আমি জন্মেছিলাম অবিভক্ত বাংলার সুবর্ণ যুগেতাঁর কথায়, আলোচনায় স্বপ্নের মায়াবী চাদর হয়ে ঝুলছিল ভবিষ্যতের এক অবিভক্ত বাংলার ছবি। তাঁর পঠন-পাঠন থেকে অনর্গল যে-ভালোবাসার স্বপ্ন, যে আকুতি আমাদের ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছিল তা হচ্ছে এক বাঙালের বাংলাস্পৃহা। বাঙালী জাতির অসাম্প্রদায়িক উত্থানের স্বপ্ন। 
কি গভীর স্পষ্ট করেই না বলেছিলেন, তাঁর সুবৃহৎ উপন্যাস শাহজাদা দারাশুকোলিখতে গিয়ে তাঁর অনুভূতির কথা। তাঁর মনে হয়েছে নেহেরু এবং গান্ধী যে অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির কথা বলতেন, ভারতবর্ষে তার জন্মদাতা এই মোগল শাহজাদা দারাশুকো। 
সেদিন তাঁর সঙ্গে কথা বলতে বলতে আমার ¯মরণ হচ্ছিল আরেকজন লেখকের কথা। তিনি পশ্চিম বঙ্গের সাবেক অর্থমন্ত্রী অশোক মিত্র। ১৯৯৪-এ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সেমিনার কক্ষে তাঁর বক্তব্য শোনার এবং তাঁর সঙ্গে মত-বিনিময়ের সুযোগ হয়েছিল আমাদের। সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. বোরহানউদ্দীন খান জাহাঙ্গীর, ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক ড. জাহেদা আহমদ, বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স পাটিঁর অন্যতম নেতা কমরেড হায়দার আকবর খান রনোর উপস্থিতিতে। খুব সম্ভবত রনো তাঁকে প্রশ্ন করেন, পশ্চিম বঙ্গের ভবিষ্যৎ কি? অদূর ভবিষ্যতে কি তারা স্বাধীনতার কথা চিন্তা করবেন? জবাবে অশোক মিত্র বাঙালীর ইতিহাসের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, ভারতবর্ষ কখনো এক দেশ ছিল না। 
শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ও সেদিন বলেছিলেন, অদূর ভবিষ্যতে এই উপমহাদেশ হয়তো একটা কনফেডারেশনের রূপ নেবে। লেখা বাহুল্য, ভারত বিভাগের প্রস্তাবনার পূর্বে মুসলমান রাজনৈতিক নেতারা ফেডারেল ব্যবস্থার কথা তুলেছিলেন কিন্তু সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধি, তাঁর সঙ্গে উত্তর ভারতীয় নেতৃত্বের প্রাধান্য, হিন্দি সাম্রাজ্যবাদীদের স্বার্থে সে প্রস্তাবকে সাম্প্রদায়িকতার ডামাডোলে চাপা দিয়ে হত্যা করা হয়। ভারত ভাগ তথা বাংলা ভাগের মধ্য দিয়ে হিন্দি সাম্রাজ্যবাদীদের রাজনৈতিক অভীপ্সা-অভিলাষ সেদিন পূর্ণ করা হয়। আজ যত দিন যাচ্ছে ততই সেই মতলবীদের মতলব স্পষ্ট ও পরিষ্কার হয়ে উঠছে।
আমি অবাক হচ্ছিলাম দুই বিপরীত মেরুর দুজন মানুষ-- শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে অশোক মিত্রের উপলব্ধির মিল দেখে। একজন কট্টর বামপন্থী মন্ত্রী আর একজন আনন্দবাজার ও অমৃত বাজার গোষ্ঠীর লেখক। দুজনই মত প্রকাশ করছে স্বাধীন অভ্যুদয়ের কি করে এটা সম্ভব? এই প্রশ্নের উত্তর কিন্তু মোটেই কঠিন নয়। আর সে উত্তর হচ্ছে ইতিহাসের যথার্থপাঠ। একজন তার রাজনৈতিক প্রয়োজনেই ইতিহাসের যথার্থপাঠ গ্রহণ করে যে-সত্যকে আবিষ্কার করেছেন, আরেকজন ঐতিহাসিক চরিত্রকে অবলম্বন করে উপন্যাস লিখতে গিয়ে সেই একই সত্যকে আবিষ্কার করেছেন। দুজন বলেছেন দুজনের মতোই। একজন রাজনৈতিক কুশলতায় আর একজন ঔপন্যাসিক স্বপ্নময়তায়। 
শ্যামলদা নেই, বুকের গভীরতম স্থানে বড় শূন্যতা বোধকরি। বিখ্যাত মার্কিন ঔপন্যাসিক হাওয়ার্ড ফাস্টের স্পার্টাকাস উপন্যাসটির প্রথম অধ্যায়ের একটি বাক্য পড়ে চমকে উঠেছিলাম। বাক্যটি এরকম : ভগবান যাকে ভালোবাসে সে জন্মেই মরেঅর্থাৎ পাপ তাকে স্পর্শ করে না। শ্যামলদা-র মৃত্যুকেও এক ভাল মানুষের অকালপ্রয়াণ বলেই বোধ হচ্ছে। ভাল মানুষেরা খুব তাড়াতাড়ি পাততাড়ি গোটান এই নশ্বর জগত থেকে।

.
সমকালীন বাংলা সাহিত্যের অবি¯মরণীয় গদ্যশিল্পী ঔপন্যাসিক শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে সেদিন আমাদের আড্ডা জমেছিল। শ্যামলদার রুমে পৌছে দেখি বাসচালকের মত চেহারার এক তরুণ তাঁকে ওস্তাদ’, ‘ওস্তাদবলে ডাকছে। বিরক্ত শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আচ্ছা তুমি যে আমাকে ওস্তাদ’ ‘ওস্তাদবলছো, আমি তোমার কিসের ওস্তাদ?’ সেই বাসচালক চেহারার তরুণ ওস্তাদশব্দটির জনক হিসাবে দীর্ঘদিন আমেরিকা প্রবাসী কবি শহীদ কাদরীর নাম উল্লেখ করে। ঔপন্যাসিক শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় এক সময় বিরক্ত হয়ে তাকে প্রায় রুম থেকে ঠেলে বের করে দিলেন, তুমি এখন যাও বলে। স্বঘোষিত সাগরেদবিদেয় হলে শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় স্বঘোষিত সাগরেদ-এর নাম উল্লেখ করে বললেন, ‘... ..., আচ্ছা বলো, এটা কোনও ভদ্রলোকের ছেলের নাম হল?’ 
ত্যক্ত-বিরক্ত ঔপন্যাসিক মধ্যরাত্রিতে অকপটে বললেন, ‘এখানে এসে দেখছি ফড়ে-দের কবলে পড়েছি।সন্দেহ নেই স্বঘোষিত সাগরেদকে হাড়ে-মজ্জায় চিনতে তাঁর চোখ ভুল করেনি।
বাংলাদেশ রাইটার্স ক্লাবের একটি অনুষ্ঠানে যোগ দেবার আমন্ত্রণে শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় ঢাকা আসেন। ঢাকা এসে লেখকদের মিছিলে অংশ নিয়ে হেঁটেছেন। সেই হাঁটাটা তাঁর ভাল লেগেছে। বললেন, ‘তোমাদের মিছিলে যে সেদিন হেঁটেছি, বড় ভালো লেগেছে। মিছিল যদি তোমরা রোজ কর আমার ভাল লাগবে।মিছিলে দল বেঁধে হাঁটবার অভিজ্ঞতাটি তাঁকে স্পর্শ করেছে। বললেন, ‘গৌতম বুদ্ধ, মহাত্মা গান্ধী, শঙ্করাচার্য এবং হযরত শাহজালাল এঁরা হলেন হাঁটার দেবতা।

ঔপন্যাসিক শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের জন্ম বরিশাল, বড় হয়েছেন খুলনায়। ১৯৪৭-এ দেশ বিভাগের পর তারা পশ্চিমবঙ্গে চলে যান। বললেন, ‘শোন, আমি অখণ্ড বঙ্গের সুবর্ণ যুগে জন্মেছিলাম।
১৯৪৭ সনের সেপ্টেম্বরে তাঁরা পশ্চিমবঙ্গে যান। সে সময় তিনি খুলনা জেলা স্কুলের দশম শ্রেণীর ছাত্র ছিলেন। পশ্চিমবঙ্গে গিয়ে দত্তপুকুরের একটি স্কুল থেকে মেট্রিক পরীক্ষা দেন। বিএসসি পাস করেন কেমিস্ট্রিতে অনার্স নিয়ে। ১৯৫২-তে স্টিল মিলে চাকরি নেন। সে চাকরি ছেড়ে ১৯৫৬-৫৭ পর্যন্ত স্কুল মাস্টারির চাকরি, ১৯৫৮ সনে দেশপত্রিকার চাকরিতে ঢোকেন। দেশঅফিসে গিয়েছিলেন লেখার বিল তুলতে। কানাইলাল সরকারের কাছ থেকে চাকরির প্রস্তাব পেলে রাজি হয়ে যান চাকরি করতে। জয়েন করেন আনন্দবাজার পত্রিকার ডেস্কে। রিপোর্টার হিসাবে শুরু করে ১৯৭৬-এ উন্নীত হন রাত্রিকালীন সম্পাদকের পদে। আনন্দবাজার ছেড়ে দৈনিক যুগান্তরে জয়েন করেন সহকারী সম্পাদক পদে। তের বছর চাকরি করেন, এর ভেতর আট বছর সম্পাদনা করেন সাপ্তাহিক অমৃতপত্রিকাটি। শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় দার্ঢ্য নিয়ে বললেন, ‘আমি যাদের লেখা ছেপেছি তারাই আজকের লেখক।১৯৮৩ সনে সিপিএম-এর ইউনিয়নের আত্মঘাতী কর্মতৎপরতায় মালিকরা অমৃত বন্ধ করে দেয়। ১৯৯১ পর্যন্ত কাজ করেন যুগান্তর-এ।

বাংলাদেশের ঔপন্যাসিকদের সম্পর্কে বললেন, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, মাহমুদুল হক, হাসান আজিজুল হক, সৈয়দ শামসুল হক, সেলিনা হোসেন, মঈনুল আহসান সাবের এঁদের লেখার সঙ্গে তাঁর পরিচয় আছে। বিশেষ করে উল্লেখ করলেন মাহমুদুল হকের জীবন আমার বোন এবং মঈনুল আহসান সাবেরের স্টেশনে শোনা গল্পবই দুটির। বললেন, হুমায়ুন আহমেদের নন্দিত নরকে উপন্যাসটি পড়েছি, তার লেখা দ্রুত গতির।
কবিতা পড়েছেন কবি শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, সৈয়দ শামসুল হক, আবু হাসান শাহরিয়ারের। বললেন, কবিতা প্রসঙ্গে খুব জোর দিয়ে : আল মাহমুদ তো কবিই।মতাদর্শিক অবস্থান যাই হোক। তার মতে, ‘বাংলাদেশে এক্সপেরিমেন্টাল লেখা প্রচুর হয়েছে
তাঁর পুরস্কার পাওয়া ঐতিহাসিক উপন্যাস শাহজাদা দারাশুকো হলিউডে ইংরেজি ভাষায় চলচ্চিত্রায়িত হবে। পরে সেটা হিন্দি এবং বাংলা ভাষায়ও ডাবিং হবে বলে জানালেন। 
শাহজাদা দারাশুকো উপন্যাসটি লিখতে গিয়ে তাকে মোগলদের ইতিহাস ঘাটতে হয়েছে। এমনকি শিখতে হয়েছে কিছুটা আরবি, ফার্সিও। দিনে গড়ে আঠারো-বিশ ঘণ্টা পড়েছেন পাঁচ বছরবললেন, “শাহজাদা দারাশুকোকে আমার কাছে মনে হয়েছে গান্ধী, জওহরলাল নেহেরু, এঁদের পূর্বসূরী। এঁরা যে অসাম্প্রদায়িক চেতনার অধিকারী, সেই অসাম্প্রদায়িক চেতনার অগ্রপথিক এই মোগল শাহজাদা।তাঁর মতে, ইসলামের নামাজ পদ্ধতির সঙ্গে হিন্দুর আহ্নিক পদ্ধতির অনেক মিল রয়েছে।
সাহিত্যে এখন একটা বন্ধ্যা অবস্থা চলছে-- যে-লোকটা এরকম কথা বলে সে লোকটা বন্ধ্যা, সে পড়েনা, না-পড়েই এই ধরনের কথাবার্তা বলে। সাহিত্য কখনোই শুকিয়ে যাওয়ার নদী নয়।
সাহিত্যের সঙ্গে রাজনীতি কিংবা রাজনীতির সঙ্গে সাহিত্যের সম্পর্ক কতখানি নির্ভরশীল কিংবা পরস্পরবিরোধী সে প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য : পৃথিবীর কোনও দেশে রাজনীতি নিয়ে লেখা কোনও উপন্যাস চিরস্থায়ী হয়নি। ম্যাক্সিম গোর্কির মাকিংবা রবীন্দ্রনাথের গোরা’! ‘গোরাকি পড়া যায়! গোরাএকটি আইডিয়াধর্মী উপন্যাস। যে-উপন্যাসের ভিতর থেকে রবীন্দ্রনাথ অবতারের মতো উঁকি দিচ্ছে। আমি মনে করি বাংলা সাহিত্যে একটি মাত্র উপন্যাস আছে সেটি অপরাজিতালেখক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়।’’ কলকাতার তরুণ লেখকদের ভেতর স্বপ্নময় চক্রবর্তী, কিন্নর রায়, আনছার উদ্দীন, একেএম মোরশেদ এঁদের গদ্য সম্পর্কে তিনি আস্থাশীল। পড়তে বলেন রবীন মজুমদারের কবিতাওতাঁর মতে, ‘শিল্প জনকল্যাণ নয়-- মহাশ্বেতা দেবীর অনেক ভাল গল্প আছে।
লেখার সঙ্গে দর্শনের সম্পর্ক প্রসঙ্গে তাঁর মত, “গরমকালের ঘামের মত লেখকের লেখার ভেতর দিয়ে দর্শন ফুটে ওঠে।অর্থাৎ লেখায় দর্শন আরোপিত করার বিষয় নয়। ভেতর থেকে স্বতঃস্ফূর্ততায় আপনা-আপনি তা প্রকাশিত হয়। কবি কাজী নজরুল ইসলাম সম্পর্কে তাঁর মূল্যায়ন, “প্রকৃতির দৈত্যাকৃতির ব্যতিক্রম নজরুল। একটা সাধারণ স্বভাব আছে কলকাতা এবং ঢাকার লেখকদের-- নজরুল আমার- কিন্তু কবি, লেখক, গান, গায়ক এগুলো সবার।
অবসর যাপনে তাঁর চিরসঙ্গী বড়ে গোলাম আলী, ফিরোজা বেগম, অখিলবন্ধু ঘোষ-এর সঙ্গীত সম্ভার। ফিরোজা বেগমের মাইজভাণ্ডারীর ক্যাসেট জোগার করতে পারেননি এখনো। দুই বাংলার সিনেমাতে পুরনো ছবিতে রাজ্জাককে তার নায়ক হিসাবে ভাল লাগে। কবরীর মত ইনোসেন্স কারো ভেতর নেই-- দুই বাংলার সেরা নায়ক রিয়াজএটা তাঁর অভিমত।
মার্কেজের চেয়ে অনেক ভাল লেখক বাংলা ভাষায় আছে। সতীনাথ ভাদুড়ীর ঢোরাই চরিত’, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের খোয়াবনামামার্কেজের শতবর্ষের নীরবতার চেয়ে কোনও অংশে কম?’ বিদেশী সাহিত্যে নিয়ে যারা অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করেন সে প্রসঙ্গে বললেন, ‘দেরিদা যদি আমার লেখা না পড়ে দেরিদা হতে পারেন তবে আমিও দেরিদা না পড়ে শ্যামল হতে পারি।

তাঁর পিতা মতিলাল বন্দ্যোপাধ্যায় চাকরি করতেন খুলনা কোর্টে। ১৯৩৩ সালের কথা। বাবা-মার দেশ বরিশাল। ঠাকুরদাদা নাট্য কোম্পানীর অভিনেতা ছিলেন। তাঁর দাদামশায়ের-- অর্থাৎ মায়ের বাবা-- বাড়িও ছিল বরিশালের উজিরপুরে। মায়ের এক কাকা ছিলেন স্বামী প্রজ্ঞানন্দ সরস্বতী-- যিনি বরিশালে শঙ্করমঠনামে একটি বিপ্লবীমঠ প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর এক বিপ্লবী শিষ্য নিশিকান্ত চৌধুরী (অরুণচন্দ্র গুহ)-- পরে ভারতের প্রতিরক্ষা দপ্তরের মন্ত্রী হয়েছিলেন।
ঠাকুরদাদা (বাবার বাবা, অর্থাৎ দাদা) বিবাহসূত্রে খুলনার মোড়েলগঞ্জে যে জমি পেয়েছিলেন সে জমির ধানেই তখন সংসারের চার-পাঁচ মাসের খোরাকি চলে যেত। দেশবিভাগ সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য : দেশ ভাগ একটা বিপর্যয়, এজন্য দায়ী লর্ড কর্নওয়ালিশের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত।বললেন, ‘তখন না-বুঝে ভয়ঙ্কর যন্ত্রণা পেয়েছি মনে। ভাল ব্যবহার পাইনি খুলনা শহরে, ১৯৩৭ থেকে ১৯৪৭ মুসলিম লীগের দাপটে, কংগ্রেসের স্টুপিডিটি এবং হিন্দু মহাসভার মূর্খতায়-- দীর্ঘকালের সৌহার্দ্য কলুষিত হয়ে পড়ে। এটা ১৯৪০ থেকে বেড়ে যায়।
দশ-বার লাখ উদ্বাস্তু। তার বেশিরভাগই বেকার যুবক। দেশভাগের অভিজ্ঞতা তোমাদের নেই, সে অনুভূতি তোমরা উপলব্ধিও করতে পারবে না। কাশ্মীর আলাদা হওয়াও একটা স্টুপিডিটি, বেঙ্গল পৃথক হওয়াটাও তাই। 
ফজলুল হক চেষ্টা করেছেন, শরৎ বোস কেঁদেছেন কিন্তু দেশ ভাগ ঠেকানো সম্ভব হয়নি--’ তাঁর মতে, এই ঘটনার জন্যই দায়ী পুরোপুরি কংগ্রেসের স্টুপিডিটি। হিন্দু মহাসভার মূর্খতা। যদিও ১৯২০ থেকে ১৯৪৭-এর সময়কালে গান্ধী এবং জিন্নাহ সমন্বয়ে কথা বলেছেন বারে বারে কিন্তু তাদের একটা ভুল ছিল, অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় সাম্য আনতে পারেননি তারা। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ শিক্ষিত মুসলমানদের সন্তুষ্ট করতে চেয়েছিলেন, বেঙ্গল প্যাক্ট মুসলমান ও হিন্দুদের চাকরি ক্ষেত্রে সমতা আনবার জন্য ৫০ : ৫০ কোটার ব্যবস্থা করে। পরে যেটা মুসলমান ৬০, হিন্দু ৪০ করা হয়। কংগ্রেস মুখে বলেছে, কাজে করেনি। ফজলুল হক যখন দাবি জানিয়েছেন, চাষীদের ঋণমুক্ত করার তখন কংগ্রেস জোর দিয়েছে সর্বাগ্রে আন্দামানের বন্দীদের মুক্তির ওপর। কংগ্রেস ভূমি সংস্কার করেনি। ভূমিসংস্কারের মত মৌলিক বিষয়গুলো এড়িয়ে গেছে। 
তিনি বলেন : এই শতাব্দীর সেরা বাঙালী ফজলুল হক, সুভাষ বসু, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ এবং বঙ্গবন্ধু। 
শুধু ফজলুল হক-ই নন মুসলিম লীগ নেতা সবুর খান সম্পর্কে বলতে গিয়ে শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় বললেন : সবুর খান আদৌ সাম্প্রদায়িক ছিলেন না। পাকিস্তান এবং ক্ষমতার জন্য উনি সাম্প্রদায়িক হয়ে গেলেন।
‘‘
জিন্নাহর অংকেই জিন্নাহকে বধ করেন জওহরলাল নেহেরু। স্টেট-এর ধর্মীয় জনসংখ্যার সংখ্যাগুরুদের পক্ষে- জেলার সংখ্যাগুরু জনসংখ্যার ভিত্তিতে ভারত বিভক্তিতে একমত হয়ে। বাংলা বিভাগ কিন্তু সে-অংকে মেলেনি। বাংলা বিভাগের সময় সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয় গঙ্গা নদীর পানি প্রবাহের ওপর ভারতের পরিপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখবার বিষয়টিকে। যার কারণে খুলনা- যশোর জেলা হিন্দু সংখ্যাগুরু হওয়ার পরও খুলনা-যশোরকে পাকিস্তানে ফেলে মুসলিম সংখ্যাগুরু মুর্শিদাবাদকে ভারতের অংশে রাখা হল।’’ ফারাক্কা বাঁধের পরিকল্পনা অখণ্ড ভারতে ১৯৩৯ সালে নেওয়া হয়। ভারত ভাগের পরে সেটা বাস্তবায়িত হয়।
শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় বলেন : শেক্সপীয়র সবচেয়ে বেশি পঠিত হয় ভারতে। দুই শো ইউনিভার্সিটি, এক লাখ মাইল রেলপথ, আর এত বেকার সায়েন্স গ্রাজুয়েট পৃথিবীর অন্য কোনও দেশে নেই। আমরা যাদের ভালো করে তৈরি করছি আমেরিকা তাদের ছোঁ মেরে নিয়ে যাচ্ছে। তারা আমাদের ক্রিম নিয়ে যাচ্ছে।

মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে তিনি সিফিলিসে আক্রান্ত হন না-বুঝে নিষিদ্ধপল্লীতে গিয়ে। তাঁর মা-বাবা সে ঘটনা জানতেন। তাঁর ভাষ্য : মেয়েটির মা মুড়ি বিক্রি করত। সে এসে আমার মা-কে বলল, দিদি তোর ছেলে আমার অসুখে মেয়েটার কাছে গিয়েছিল।
কবি তুষার চৌধুরী, কবি সমীর চট্টোপাধ্যায়-- তাঁর দুই জামাই। সমীর সম্পর্কে বলেন, ‘এখন সে কবিতা লিখতে পারে না জন্য সবারই নিন্দা করে।তাঁর মতে, ‘যে আর লিখতে পারে না। সে একটা আলমারি কেনে। আর রচনাবলী কেনে। ভাবে ষাট বছর এক দিন বয়স হলে পড়তে বসবে। কিন্তু সে বয়সে পৌঁছূলে আলফাবেট ভুলে যায়।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, ‘পশ্চিম বঙ্গের ক্ষমতার পাঁচটি অলিন্দ। এক নম্বর হচ্ছে আলীমুদ্দিন স্ট্রিট, দুই নম্বর বেলুরমঠ, তিন নম্বর আনন্দবাজার, চার নম্বর বিশ্বভারতী, পাঁচ নম্বর ব্রাক্ষ্ম শুচিবাই। 

আজ থেকে একশবছরের ভেতর বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভারত একটা ফেডারেশন হয়ে যাবে।অখণ্ড বঙ্গের সুবর্ণযুগের জাতক ঔপন্যাসিক শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় ব্যক্ত করলেন তাঁর এই মত। ফেডারেল রাষ্ট্র ব্যবস্থার দাবি ভারত বিভক্তিরও আগে করেছেন অনেক রাজনীতিবিদই কিন্তু সেদিনের সেই কণ্ঠস্বর চাপা পড়ে গেছে নানা স্বার্থের ডামাডোলে। সম্প্রদায়গুলোর ভেতর অর্থনৈতিক সাম্যাবস্থার প্রশ্ন, ভূমিসংস্কারের মত মৌলিক প্রশ্নাবলীকে ধুলোচাপা দেবার যে-প্রয়াস সে-প্রয়াস শেষ পর্যন্ত যে অসার- ইতিহাসই তা প্রমাণ করেছে। তাই ভবিষ্যতেও ফেডারেশন হলে উপমহাদেশের মৌলিক অর্থনৈতিক সমস্যাবলীর মীমাংসা করেই তা করতে হবে।

খোলাজানালা
দৈনিক মুক্তকণ্ঠের সাহিত্য সাময়িকী
২০০০ 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন