বৃহস্পতিবার, ২২ আগস্ট, ২০১৩

পশুপালনের দিন

কাজল শাহনেওয়াজ


পশুপালনের দিন


আমরা তখন সিদ্দিকী বানান লিখতাম ছিদ্দিকী। নতুন তিনটা শব্দ শিখছে সবাই: ইউরিয়া, টিএসপি, পটাশ। এটা সেই সময়ের কথা।

ঘাগর বাজার থেকে সিও অফিস হয়ে সিকির বাজারের দিকে যাওয়া থানা সদরের প্রধান সড়কের মাঝামাঝি যেখানটা জঙ্গল মত, একটা চিকন রাস্তা দক্ষিণে গেছে, সেখানে গাছের ডালে ঝুলানো টিনের সাইন বোর্ডে লেখা - ইউরিয়া, টিএসপি, পটাশ।
এমনিতে এরকম জঙ্গলা যায়গা ভুত প্রেতের বাসা - কে না জানে, তার উপর হঠাৎ করে তিন রাস্তার মোড়। তার উপর এরকম অদ্ভুত কতগুলি শব্দ, ভাবলেই বুকে ছম ছম করে।

মাইল খানেক পাকা রাস্তা। তারপর সব একরকম। সড়কের দুই পাশে খাল। তিনটা খাল যেখানে মিলছে সেখানেই মাছ। কেউ না কেউ পানিতে মাচা বানাইয়া তাতে বইসা থাকবে। এমন পরিষ্কার পানি যে একটা হোগলা মুড়ি দিয়া সারাদিন পানির ভিতরে তাকাইয়া থাকবে আর দেখবে কখন মাছের ঝাক যায় জালের ভিতর দিয়া। সময়ের কোন ঠিক ঠিকানা নাই, পানির ভিতর দিয়া তাকানোর আর শেষ নাই... শাদা সরপুটি ধরার জন্য তার মনপ্রাণ উব্যুত হৈয়া থাকে...

আষাঢ় মাসের সকাল, কয়েকদিন ধইরা দিনটা বৃষ্টি দিয়া শুরু হয়। তাই আব্বা ওনার রুটিন অনুযায়ী সকাল ৬টার রেডিওর খবর শুনছেন ফুল উমে, যাতে আমাদের ঘুম ভাঙে। আর আমরা, মা’য় ইস্তক, বিছনায় মোচড়া মুচড়ি করতেছি। এরকম বৃষ্টির সকালে কে অতো তাড়াতাড়ি বিছানা ছাড়ে! ‘ওঠেন, সবাই ওঠেন’ ‘কইগো, তুমিও ওঠো’ (মাকে বলেন), ‘আইজকা সকালে ভুনা খিচুড়ি হইছে, দেরি করলেই ঠান্ডা হৈব।’ আব্বা হইলেন এক নম্বর পাচক (এইটা বানান বই থিকা শিখছি)। খিচুরি রান্না হইতে না হইতেই ঘ্রাণ ভাইসা আইলো। মা বিছনায় মোচর দিলেন, আমি একটা পাক দিলাম, আর আমার ছোটটা কাই কুই কইরা উঠলো - অর অখনো গভীর ঘুম।

রেডিওর খবর পূরা হৈছে, খোদা হাফেজ বলা শেষ; তারপর কিসব আলোচনা, সকাল বেলার গান, একটু পরে শুরু হবে উর্দু খবর... আমাগ পুরা বাসাটা চলে রেডিওর টাইমের সাথে। এই সময় কামের খালা আইসা পড়ে - কিন্তু আইজকা তার কোন লক্ষণ নাই। মা ফোসফোসানো শুরু করল। এমন সময় -

: ওরে বাবারে আমার কি হইবো রে, আমার হাইব্বার কি হইবো। ও স্যার ওরে বাচান।
: কি হইছে কি হইছে ??

হাবিবের মা আমাগ বাসায় আম্মাজানের কর্মচারি। খাবার টাইমে নিজের বাসনে দুইজনের খাবার নিয়া বাড়ির দিকে রওনা দেয়, হাইব্বারে খাওয়ানোর জন্যই তার এই 'চাকরি’ করা। হাইব্বার বাপটা হৈল বাউলা; হাইব্বা বড় হইতেছে হাফেজি মাদ্রাসায়। সব ঠিকঠাক ছিল,- কিন্তু হাফেজ হইতে পারে নাই। আয়ুবের্দি-ইউনানি-চাঁদশি, এলাপাথি, হোমিও, জরিবুটি, তাবিজ-কবজ, শিন্নিদেয়া, ডেকচড়ানো, দরগার গাছে সুতি বান্ধা, চরক পুজায় মানত - গীর্জার যিশুর কাছে রবিবারে হত্যা দেয়া - এমন কিছু ব্যবস্থা বাকি নাই, যা ওর জন্য করা হয় নাই। কিন্তু সারা বছর ঠিকঠাক থাকে, একদম ভালা মানুষ, ধানগাছ। শুধু মাঝে মধ্যে পরিদের দেশে চইলা যায়।

স্যার, আমার হাইব্বা কাইল থেইক্কা ঘরে নাই। সাতার জানে না, নৌকা চালাইতে পারে না। কই যে গেলে।

আইজ বিলের মধ্যে খৈয়া গাছে পাইছি। আধা মাইলের মধ্যে কোন ডাঙ্গা নাই। গাছের ডাইলে হেলান দিয়া বইসা আছে। গান গাইতেছে। মাঝিরা আমারে নিয়া গেছে। ময়মিনতি কইরা নামাইতে হইছে...

আমার ছোটটা বিছানায় কাচু মাচু দিয়া ছিলো, ও-ই বললো প্রথম: আমি দেখতে যামু।

মা কয়, হ যা, অহনই যা, এইভাবেই যা।
তাকাইয়া দেখি ছোট সাহেব আজ বিছানা ভিজাইছে। এখন তার ন্যাংটা অবস্থা, সে সেভাবেই দাড়াইয়া আছে বিছানায়।

: হাইব্বা কই?
: সিকল দিয়া উঠানে বাইন্ধা রাখছি।
: ভালো করছো... এইবার যাও, তার জন্য ভুনা খিচুরী লইয়া যাও।
: হেয় এহন কিছুই খাইব না, হেয় নাকি পরিস্থানের খানা খাইছে। পরিস্থানের ফলপাকুর খাইছে। হ্যার সাথেও নাকি আছে।
: তুমি দেখছো?
: আমি যখন তারে পাই, তার হাতের মুঠা তখন বন্ধ। যে পোলাডা নৌকা বাইয়া আনছে - অরে নাকি সে পরিস্থানের ফল খাওয়াইছে। খুব নাকি স্বাদ।
: এহন অরেও কও পরিগো লগে ইয়ার্কি করতে। যত্তসব।
: কি কইলেন স্যার।
: তোমার মাথা আর অর মুন্ড।

ওই বাড়ীতে যাইতে হয় সেই রাস্তা দিয়া, যেখানে সাইন বোর্ড টাঙানো  ‘ইউরিয়া, টিএসপি পটাশ’। ভুত প্রেতের রাস্তা।

কিন্তু পরিস্থান ফেরৎ কাউরে দেখতে হইবোই হইব। আব্বারে বলতে সাহস পাইনা। তার চেয়ে আইয়ুব আলীরে বলি, ছোটটাকে বলি।

মা বলেন: খবরদার, কাছে যাবি না। দুর থেকে দেইখা আইসা পড়বি। ঠিকাছে!
আমাদের একা যাইতে দিলেন না। ডাইকা বললেন: আইয়ুব সাব, ওগো নিয়া ঘুইরা আসেন তো। বেশি দেরি কইরেন না।
ঠিকাছে ভাবি সাব, দেরি হইবে না।

আমরা দুইজন আব্বার এসিষ্ট্যান্ট আইয়ুব চাচারে জ্বালাইতে থাকি। ভদ্রলোক অতি নিরিহ ও তাবেদার টাইপের। ওনারে যাই করি না কেন কোন অসুবিধা নাই। নালিশ হইব না।

জ্বালাইতে জ্বালাইতে আমি বলি: কাকা আপনে রাগ করতাছেন? আপনের যে দুর্বল শরিল।

: কি বললা, শরিল? এইটা কেমন কথা বলতো - তোমরা হইলা ডাক্তার সাহেবের সন্তান। তোমরা এরকম গ্রাম্য কথা বলবা ক্যান। শুদ্ধ করে বলবা। আমি অনেক দিন ভাবতেছি। কথাটা আজ বলেই ফেললাম। কিছু মনে করো নাইতো?
: না না, কি যে কন।
: আবার
আচ্ছা ঠিকাছে, আর বলব না। আমি রাজি হলাম।কিন্তু ছোটটি রাজি হলো না। ও বললো, আমি পারলেও বলমু না। আমি মার মত কথা কমু। দেখেন না মায় কেমনে কয়।
: কিন্তু তোমার আব্বা?
: ঐটা তো আপনাগ লগে। বাসায় ঠিকই দ্যাশের ভাষা।
: তাইলে তো ঠিক আছে, বাসায় বিক্রমপুরের ভাষায় কথা বলবা। আর বাইরে ভদ্র ভাষা।
: না আমি কমুনা। আমার কি ঠ্যাকা পড়ছে ?
ছোটভাই কোন ভাবেই রাজি হলো না।

আমি জানি ও এইসব অজুহাত দিচ্ছে কেন। ও লজ্জা পায় গুছায় কথা বলতে। বাইরে যতই দূরন্তপনা করুক না কেন, ভিতরে ভিতরে ওর মত দুর্বল মানুষ আর হয় না। একেবারে শুকনা বিড়াল।

ভাবছিলাম হাইব্বার সামনে গেলে, আইয়ুবচাচা যেহেতু সাথে আছে, সাহস থাকবো। কিন্তু ওর অবস্থা দেখে সাহস ভুলে গেলাম। ছোটটা এমন এক চোখ রাঙানি খাইলো যে, কোন দিকে না তাকায়ে একলাফে চৌদ্দহাত দুরে গিয়ে থামল।

হাইব্বা উঠানের কোনায় একটা জামরুল গাছের সাথে শিকল দিয়ে বাধা। ওর চারপাশে শখানেক বাচ্চাকাচ্চা বুড়াবুড়ি নানা রকম মজা করতেছে। হাইব্বা কাউরে দেখতেছেই না।

কে যেন বলে: হাইব্বা কই তোর ডিব্বা।
একজন জিজ্ঞাসে আর সাথে সাথে অন্যেরা ঝলমল করে হেসে ওঠে।কখনো তাল মেলানো, নিজেদেরই উত্তর সমান প্রশ্ন।

: ক'ছেন হাইব্বা,পরিরা কি বাচ্চা দেয়, বিয়া করে ভাইগ্যা?
: পরিগো কি বাচ্চা অয়? পরির জামাই কয়ডা? তাগো কি ভ্যাটেনারী ডাক্তার আছে? কি নাম তার?
: আইয়ুব ডাক্তার। কে যেন উত্তর দিল। চারদিকে হৈচৈ-র মধ্যে হাতাহাতির শব্দ।কিন্তু আমরা দুভাই চমকাই। আইয়ুব আলী মানে আমাদের আইয়ুক কাকা নাকি?

কেউ কেউ কঞ্চি খোচাচ্ছিল, কেউ ঢিল মারতেছে...চিৎকার চেচামেচি হুলুস্থুল-

কথার মিল দিয়ে বেশীদুর আগাইলো না।

ওরে মনে হইলো সার্কেসের কাচা মোরগ খাওয়া রাক্ষস - দুইপার্টি কোমড়ে দড়ি বাইধে নিজেদের দিকে টানতেছে - তার হাতে একটা আধছিলা মুরগি - গলায় দাত বসায়ে এইমাত্র রক্ত চুষে খাইবে, চামড়া ছাড়ায়ে দুর্বল মুরগির রানের গোসত দাত দিয়া খামচাবে।

মানুষের মধ্যে ধাওয়া দেবার জন্য সেই রাক্ষসটা দৌড়াতে চাচ্ছিল, না পেরে ঘুরে ঘুরে যাচ্ছিল যাতে সব দিকের দর্শকরাই তাকে দেখতে পারে। দুইপাশেদড়ি টানা লোকগুলা বারবার এ ওর সাথে আছড়াইয়া পড়তেছে - হাসিছে, উত্তেজনাচ্ছে। একটা ভয়ঙ্কর কিছু নেমে আসতেছিল আসমান থেকে আর একটা ঠাডা চিংড়ির দাড়ার মতো লাফায় লাফায় কিছু একটাকে টেনে নেবার জন্য উৎসাহচ্ছিল। এই ওঠা নামাটা সবাই আদিভোগ করতেছে।

হাইব্বার চোখ বন্ধ। আস্তে আস্তে দর্শকরাও কমে যাচ্ছিল। একটা লোককে দেখলাম অপেক্ষা করতে। সে হল লিটিঙ্গা আইয়ুব। গভীর আগ্রহে অপেক্ষা করতেছে।

আইয়ুব কাকা হাইব্বার দিকে যায়: হাবিব কুমার, হাবিব, ওঠো দেখি, হাতটা খোলতো। দেখি তোমার হাতে কি?

হাবিব মাথা নিচা করে ঘুমায় পড়তেছিল। নরম সুর কানে যেতে মাথা তুলে বসল। মিঠা গলা ভাল লাগছে নিশ্চয়। ও হাত বাড়ায় দিল। কাকু সন্তর্পনে আগায় গিয়া জিনিসটা নিল। আমরা ভাল করে দেখতে পারতেছিলাম না। ও কাকুর দিকে তাকাল, একেবারে স্বাভাবিক দৃষ্টি, বলল, নেন খান। অগো দ্যাশের ফল, নাম জানিনা খাইতে মিঠা।

ভাগ্যিস আশে পাশে তেমন লোক ছিলনা। নাইলে হুড়াহুড়ি পড়ে যাইত। আমি ভাবতেছিলাম,কাকু কি একলাই জিনিষটা খাবে? হাবিব আমার হাতেও আরেকটা ফল ধরায়ে দিল। ততক্ষনে আশেপাশে যে দু’চারজন ঘোরাফেরা করছিল তারা টের পেয়ে যায়। আমরা ভাগি।

ইউরিয়া মোড়ের পাশ দিয়ে জংগলের আড়ালে আইসা মুঠ খুলি আমি, ভাবি নাই সত্যি সত্যি ভিন দেশের কোন কিছু আমাগো হাতে আসছে।

কিন্তু সত্যি সত্যি একেবারে অচেনা জিনিস। আইয়ুব কাকুর চোখ বল্টাইয়া যাবে মনে হচ্ছে। ফলটা একেবারে তরতাজা। সবুজের ভাব আছে, আবারপাকা ও মনে হচ্ছে। গাছপাকা আম যেমন হয় সেরকম। ঘ্রাণ ও আছে, বেশ ভালো ভদ্রগোছের ঘ্রাণ। আমার আর অপেক্ষা সইছিলো না। প্যান্টে একটু ঘসে কামড় বসালাম। আহ অপূর্ব! গাছপাকা বিচি ছাড়া পেয়ারা - ঘন ক্ষীর আর তার সাথে রস মাখানো - মাখমমাখম - চাবাতে হলনা। জিব্বা আর গালের চাপেই গিলে ফেললাম - মানে ঠিক মনে পড়তেছে নাকি ভাবে কি হল - এমনই নরম - কেমন গোলাপী আর বাদামী, আর খুব ঘ্রানও টেরপাচ্ছিলাম- এমনই ঘ্রান, যে আমার ভাইটা অস্থির হয়ে পড়ল, হাত থেকে কাইরা নেবার জন্য লাফ দিল। আমি বললাম, খাড়া, আমারতো অর্ধ্যেকও হয় নাই। ও জোর করে বলে, হ, তরে অর্ধেক খাইতে দেই আর তুই পুরাটাই খাইয়া ফ্যালা। তা হইব না, তুই এককামড় খাইছস, এইবার আমি এক কামড় খামু। তারপর আবার তুই খাবি - ঠিকাছে?

কিন্তু অরে বিশ্বাস করা আমার ঠিক হবে না। ও ছিল প্রথম থেকে ক্ষ্যাপা - হাইব্বা কেন আমার হাতে দিলো। তাই সুঘ্রান পেয়ে বাকিটা চেটে চেটে মুখের লালা দিয়ে ভিজিয়ে ফেলল - যেন আমি আর ঘেন্নায় খেতে না পারি। তারপর কয়েক কামড়ে পুরোটাই সাবার করে দিল। এত তত্তরি খাইছ যে, পরির দেশের ফলটার কোন রকম স্বাদই বুজতে পারল না। আমি রাগে গোস্যায় অনেকক্ষণ কথা বললাম না। অবশ্যই এটা যদি সামান্য একটা আতা বা সফেদা নিয়ে হতো, তা হলেও এমনই হত। আমাদের ঝগড়াটা ছিল সর্বদা তাৎক্ষণিক, সাংঘর্ষিক। আইয়ুব চাচার একটা প্রধান কাজই ছিল যুদ্ধ থেকে ছাড়ানো - প্রবল ঘৃনায় জড়ান জাবাড়া জাবড়ি করা দুভাইকে।

যাই হোক পরীর দেশের অদ্ভুত ফলটি আমরা খাইয়া ফেললাম। খিদাও লাগছিল! আইয়ুব কাকা কিন্তু তার হাতের ফলটা দেখতেই থাকল।

এমন সময় খেয়াল হলো আমাদের পিছু পিছু একটা ছেলে এই পর্যন্ত চলে আসছে।
: কি রে তুই কই যাবি,কোন বাড়ীর (পোলা)?
ও নিজের কোন পরিচয় দেয় না। খালি বলে, বিচিদেন। অনেকক্ষন ধরে বলছিল। ছোট ভাই ফলটা খেয়ে সত্যি সত্যি একটা বিচি পাইল। একটা বিচির জন্য একা একা এতদুর?

পাজিটার মাথায় সব সময় দুষ্টবুদ্ধি ঘোরে। ও ঠিকঠাক বিচিটা বামহাতে নিয়ে মুঠবন্দি করলো। বললো, এই বার ক তর নাম কি, কোনবাড়ির পোলা তুই, তাইলে পাবি - নইলে না। ছেলেটাকে মনে হলো না যে কোন ফাপড়ে পড়েছে। হি হি করে হাসল।

কমু না। কমুনা।

বিচি পাবিনা কিন্তু। নাম কি ক, বাড়ি কই ক।
: কমু না, খিকখিক করে হাসে আর বুড়া আঙ্গুলে কি যেন দেখায়।
আইয়ুব কাকা তো ফলের প্রেমে বিভোর - তার এদিকে খেয়াল নাই।
: কবি না ? দেখ কি করি তর বিচি। বলে কিছু বোঝার আগেই ও ছুড়ে মারে একটা ঝোপের মধ্যে, যেখানে ঐ ইউরিয়া ঝোপঝাড়...
: হি হি হি... ছেলেটা হাসতে হাসতে লাফাতে থাকে। আমি বুঝলাম না এতে হাসির কি হল। পাজিটাও এমন করছে যে ছেলেটা ওর খুব চেনা। তবু আমি একটু বিরক্ত হই। এই এই কি করছ - ও চাইছে দিলেই তো পারতি। এইটা কি হৈল। খাড়া বাসায় গিয়া আব্বার কাছে কইয়া দিমু।

এই কথা বলতে না বলতে, তাকিয়ে দেখি, ছেলেটা আমাদের পাশে দাড়াইয়া, ওর হাতের যেন কয়েকটা ভাজ খুলে দিল, হাতটা লম্বা হয়ে গেল, তা দিয়ে ও জংগলের ভিতর টুকটুক করে খুজে বিচিটা বিচড়াইয়া আনলো। বাম হাতে রেখে দেখল, আবার খুজল। একবার বলল, ইউ...লিয়া

ভাগগতিক দেখে আমার একটু আধটু কেমন কেমন করতে লাগল। হঠাৎ করে হিসু চাপল - একবার মনে হলো দৌড়দেই, কিন্তু কিছুই করতে পারছিলাম না - এমন কি তাকাতেও - পাজিটার দিকে তাকিয়ে দেখি ওর হাসি হাসি মুখ। দেখেই বুঝে যাই কি ঘটনা। বলি, দিয়াদে, ওর সাথে চ্যাংটামো করিছ না, এইটা এখানকার না - তেরিবেরি করলে হোতাইয়া দিবো

: তাইলে পরিচয় দিইক -

দেখলাম এইটাই উত্তম পন্থা। ওর দিকে তাকাইয়া কই

: তুমি কি এই ফলগুলি নিয়া আসছ? তোমাগ বাড়ির ফল এইগুলা?
: ও মাথা নাড়ে।
: বিচি আমাগো দিয়া যাও,আমরা লাগামু। চারা বানামু! কি দিবা?
ও না বোধক মাথা নাড়ে।
: একটাও না? মাথা নাড়ে না,না।
দিবে না। উপায় নাই।
পাজিটা হার মানে। এই নে। এইবার দিয়া দিলাম।
: তাইলে ওনার ফলের বিচি? বলে আইয়ুব চাচারে দেখাই।
: ফল নাই বিচি নাই... আমি যাই...

তারপর সব সুনসান। হঠাৎ স্বম্বিত আসে। দেখি আমরা তিনজন ইউরিয়া, টিএসপি পটাশ গাছের কাছে নিরিবিলি রাস্তায় দাড়ায় আছি। আইয়ুব চাচার হাত খালি। ওনার ভোধাই মার্কা ভাবটা তামার ডেকচির মতো হইছে। চোখ দুইটা ফুটা, নাকটা আরেকটা ফুটা।

বাসায় এসে পুরা গল্পটার গায়ে আরো নানা রকম কারুকাজ করে বর্ণনা করি। পরের সপ্তাহটা যায় সেই অনাস্বাদিত ফলের বর্ণনা দিয়ে যেতে। আইয়ুব কাকাশুধু দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন। কেন সেই ফলটা খাইলেননা। বুঝাই আমরা স্বাক্ষী দিবনে, আপনে বলেন যে খাইছেন। কিন্তু উনি রাজী হননা। তবে ছেলেটার হাত লম্বা হবার ঘটনাটা উনি সন্দেহের চোখে দেখেন। কারণ হাজার লোক নিজের চোখে তো আর দেখে নাই। দেখছি মাত্র আমরা তিনজন। এইটা ঠিক না।

বোবার যেমন শত্রু নাই, তার ডাক্তার পাওয়াও কঠিন। আর যদি রোগী হয় অবলা -তাইলে কে তার কথা আল্লার কাছে কয়? উপায়তো আর নাই!

সেই বর্ষায়ই, এক বৃষ্টিময় ভোর। বিগত চারদিনের টানা বর্ষণে পথঘাট একাকার। কোটালিপাড়ার বিল এলাকা। মাসের প্রথম হপ্তা। দুর্গম এইঅঞ্চলে মানুষের প্রসব বেদনা উঠলেও খোদা ছাড়া ডাকার মতো কেউ নাই, এমন একটা দিনে একটা কোষা নৌকা এসে ভিড়লো পশু হাসপাতালের ঘাটে। কোষার চালক লগি ঠেলতে ঠেলতে এসেছে, রক্তশুন্য ঠান্ডা হাত কালচে নীল, ফ্যাকাশে মুখমন্ডল। লম্বা মানুষটা শীতে কুজা হয়ে গেছে। হাত দশেক লম্বা কোষাটার মাঝে দুটা পাটাতন সেখানে একটা খোলা ছাতি, কেউ নিচে বসে আছে। কিন্তু একটু ধন্দ লাগে - মানুষযদি বসে থাকবে তো সে কী শুয়ে আছে, তা না হলে কি ছোট কেউ, ছাতির সমান?

চালকের অতো সময় নাই - কারণ ভেড়ানোর পর লগিটা মাটিতে এক কোপে যতটুক গাথে তা গেথে ভেজা রশিটা দিয়ে কোন রকম বেধে ফেলে। নেমে খালের পশ্চিমে চামুন্ডা কালী মন্দির, একটা প্রনাম ছুড়ে দিলো দ্রুত। এখন কি ? লোকটা একাই নামলো, কারো সাথে কোন কথা হলো না - বোঝা যায় কোন মানুষ তার সাথে নাই। তাহলে ছাতির নিচেই তার সঙ্গী; হাসপাতালের রুগি; কিন্তু কে সে ? লোকটা মনস্থির করতে পারছে না। কি করবে? এতো ভোর যে ডাক্তার খানায় কাউকে পাওয়া যাবেনা, জন মনিষ্যের দেখা মেলা ভার। বৃষ্টি একটু থেমেছে কিন্তু মনে হচ্ছে যে কোন সময় শুরু হতে পারে। আবার রুগির অবস্থাও ভালো না - যখন তখন।

সে ভাবলো। একবার। দুবার। খাল থেকে হাসপাতাল গজ পঞ্চাশেক। খালের পানি প্রায় বরাবর। সে হেটে হাসপাতালের যেখানটায় প্রানি রুগিদের রাখা হয় সেইসেডটা পর্যন্ত গেল। কাদা জমে আছে সর্বত্র। গোবর, চনা, খড়ের এলোমেলো বর্জ মিলেমিশে ছোটখাটো একটা নরক। কোন শুকনা কিছু নাই। ক্লান্তিতে ঘুমে দাড়িয়ে থাকতে পারছে না। একটা বিছানা পেলে এখনি ঘুমাতে পারতো। অবস্থা দেখে হতাশ হলোনা সে তারপরও। এখানে একজন ডাক্তার আছেন।

আবার খালের কাছে এলো। একটু গোঙানির মত শব্দ। ও জানে রুগিটা প্রবল কষ্ট পাচ্ছে। একটা মানুষ হলে এই কষ্টে চিৎকার করতে করতে অজ্ঞান হয়ে যেত।অবলা জীব কথা বলতে পারে না। ওর কষ্ট দুই পরতের। শে আবার মা হয়েছে ২ সপ্তাহ আগে।বাচ্চা দুটাকে রেখে এসেছে। সাথে আনলে ভিজ্জা মারা যাইত। বাচ্চার জন্য ওর কষ্ট আছে, দুধ খাওয়াতে পারছে না।

না, একটা কিছূ করতে হয়। অফিস টাইমের অপেক্ষা করলে হবে না।

ডাক্তার সাহেব, ও ডাক্তার সাহেব - একটু দয়া করেন না, রুগি তো যায় যায়। সে মনে মনে প্রার্থনা করে।

আমাদের আব্বা সকালে নামায পড়ার টাইমে ওঠেন। সকাল ৬টায় রেডিওতে বাংলা খবর। তার আগে কোরান তেলওয়াত। উচু ভলিওমে রেডিও চলে - ঘরের জানালা দরজা সব খুলে যায় - সবার উঠবার সময়। এর মধ্যেই - বৃষ্টির দিনে খিচুড়িরান্না শেষ। মা উঠে দেখে তার সকালের ডিউটি করা হয়ে গেছে।

আজকের বৃষ্টির দিনটার সেই রুটিন একটু এলোমেলো হলেও তিনি উঠেই ছিলেন। অমন ব্যগ্র কন্ঠ শুনে বাইরে এসে দেখেন এক ব্যথিত মানুষকে।

রুগী কই?
আসেন, এই যে ছাতির নিচে। বাড়ির কেউ রাজি হল না বৃষ্টি ঠেলে আমার সাথে আসবে। ভাবেন তো একবার, ছাতি ধরবে, তেমন লোকই নাই। ভীষণ অভিমান হলো। আমি হলাম চড়কের বড়শী গাঁথা মানুষ - আর আমার সামনে এভাবে মারা যাবে এক অসহায় জীব - একটু চেষ্টাও করবো না ? দড়ি দিয়ে ছাতি বাধলাম নৌকার সাথে, বাচ্চা দুইটাকে রেখে এলাম হাপানির মার কাছে, নগদ টাকার বিনিময়ে -দুধ কিনে খাওয়াবে। দেখেন কি অবস্থা - বাচ্চা হবার পরদিন কিষাণ ছেলেটা ঘুমের ঘোরে দরজার খিল লাগায় নাই। এলাকার শেয়ালও মাছ খাতিখাতি ধান্দায় ছিল, গন্ধ পেয়ে হামলে পড়েছিল বাচ্চাগুলার উপর, তিনটার একটাকে নিয়ে নিল। আর একটাকে নিতে গিয়ে মা’র শিংয়ের গুতায় ওখানেই অক্কা পেয়েছে - তবে বেটা যাবার আগে মা’টার বাটে দিয়েছিল কামড় - এই দু’হপ্তায় তা পেকে পচন ধরেছে - এইতো এই অবস্থা -

আব্বা তাকিয়ে দেখে বিশালদেহী এক ছাগী - স্তনের একটা বাট পচে খসে পড়ছে -রক্ত চুয়াচ্ছে টিপটিপ করে - দেখে যে কেউ বুঝবে কি হচ্ছে, কি করা উচিৎ। কিন্তু করবে কে ?

দীর্ঘদেহী সুগঠিত লোকটা - ধরা ধাক লোকটার নাম বিপদভূষন - যেন অপেক্ষা করতে জানেনা।

এই অজ পাড়াগায় গত এক বছরে এমন জটিল অপারেশন আর হয় নাই, তাই আব্বাও খুশি। বৃষ্টির মধ্যে দুপুর পর্যন্ত কাটা ছেড়া সেলাই চললো। মা ঘ্যানঘ্যান করতে করতে পানি গরম করা শুরু করল ঠিকই, তারপর একসময় আমরা সবাই লেগেগেলাম। আমাদের পূরা বাসাটাই যেন হয়ে গেল হাসপাতাল। আমরা সবাই নার্স, বয়, কম্পাউন্ডার। বিপদভঞ্জন দেখে আর চোখ বড় বড় করে। ছাগিটা ক্লান্ত হয়ে শুয়ে ছিল, শব্দ করতে পারছিলনা। তবে সবাইকে দেখে নিশ্চয়ই শান্তি পাইছিল।

একটা বাট নিয়ে আমাদের সংসারে শে ঢুকে গেল।

বাসায় আগেই ছিল একটা তিন পায়ের কুকুর... আব্বার প্রাক্তনরুগি। বিশিষ্ট প্রভুভক্ত ও সহজাত শিশুপ্রিয় এক প্রাণি। বয়স হয়েছে, তাইতার মধ্যে একটা প্রবীণ ভাব ছিল। তুই করে বললে কথা শুনত না, তুমিবা আপনে করে বলতে হত। আমরাও ওর তিন পায়ের দৌড় দেখার জন্য নানা রকম তেল মারা ঢংয়ে ফুটফরমাস করে ওকে মজাতাম।

ও ছিল আমাদের মায়ের মতো। সারাদিন পিছনে লেগে থাকত। আমরা ভাবতাম খেলতে আসছে। তাই ওরে দিয়া পরিশ্রমের কাজ করাতাম। আর বুড়িটা আমাদের কাছে বশ্যতার ভান করে সারাদিন সাপখোপপোকামাকড়ের হাত থেকে পাহারা দিত। আমি জানি একথা আমরা না জানলেও আব্বা জানতো। আব্বাকে দেখলে ও কি একটু লজ্জা পেত? নাকি রাগ করতো? তা জানিনা।

আমরা অপেক্ষা করতাম এরপর কে আসে? একটা বিড়াল ঘুরঘুর করতো, কিন্তু সে ছিল নিতান্তই সুস্থ স্বাভাবিক, তাই তার দিকে আমাদের নিপীড়নমূলক দৃষ্টিই থাকতো... যদি কোন চুরি করার অভিযোগ ওঠে এইআশায় বসে থাকতাম... ব্যাটাকে প্যাদানি দেবার জন্য।

বাসার পিছনে বেশ কিছু জমি। সেখানে শুকনার সময় পাখিরা আসেতবে বর্ষাকালে পানিতে ডুবে যায় বলে আমরা খুব একটা যাইতাম না। কারন তখন নাকি হিজল গাছগুলিতে অনেক ভয়ের জিনিস থাকে। কিন্ত একটা বিড়ালকে দৌড়ানোর সময় একবার দুপুরে আমি ঐ তেপান্তরে চলে যাই। সেদিন সবাই ঘুমালে আমি অনেকটা চিন্তা না করে বের হয়ে যাই।দেখি বিড়াল কিছু একটা মুখে নিয়ে রান্না ঘর থেকে বের হচ্ছে। আমার খুব ইচ্ছা ছিল বিড়ালটাকে অপরাধি বানানোর,তাই পা টিপে টিপে ওর পিছে যেতে থাকি। ও খুব চাল দিয়ে বের হলো ঠিকই, কিন্তু কিছুদূর গিয়ে সাধারণ হয়ে গেল। যেন একদম কিছু জানে না। তাতে আমি সাবধান হয়ে গেলাম, ও একটা দুষ্টু। ঘুঘু ডাকছে, বেশ একটা গরম বাতাস, আমারঘুম ঘুম চোখ... কিভাবে যেন ও পালায় গেল...

আব্বা একদিন বললেন: পন্ডিত, চল যাই। তখন বিকাল। সিও অফিসের লম্বা করিডর ধরে অনেকগুলি দরজা। একটা দরজার তালা খুলে আমরা ভিতরে ঢুকি। কাঠের আলমারি, কাঠের টেবিল, কাঠের চেয়ার। আব্বা খুটখাট করেন। দরজা দিয়ে বাইরে দেখি উচু সার করে মোটা মোটা লোহার পাইপ রাখা। কয়েকটা গড়িয়ে দূরে গিয়ে পড়ে আছে। পাওয়ার পাম্পের পাইপ। আব্বা বল্লেন, এইগুলা ইরিগেসন করার জন্য আনছে, জমিতে পানি দিব।

আমি আশ্চর্য হই, গোপালগঞ্জের এই বিল এলাকায় জমিতে পানি দিতে হৈব ক্যান? এত পানির দ্যাশে!

কাঠের দরজাটা খুলে আব্বা বলেন, পড়বি?
দেখি থরে থরে বই সাজানো। বইয়ের গন্ধ! আমার মাথাটা যেন কেমনকরে ওঠে।

একটা বাদাম গাছের সামনে বাদামের ঘ্রাণ নিলাম। বাতাস চাটলাম। অনেক অনেক পাতার ভিতর থেকে আরো অনেক পাতারা আমাকে হাসাতে চাইলো। আমি একটু ঘুমালাম। তারপর কালিমূর্তি দেখলাম,ওর লাল জিভটা দেখলাম। একটা বড় বড়শি পাইপের মুখে আটকাইয়া গেছে। থরে থরে পাইপ লেগে লেগে পেন্সিল হয়ে গেল। ’ইউরিয়া’ আর ’টিএসপি’ শব্দগুলি গুনগুন করতে করতে উড়ে এসে পেন্সিলের মাথায় গিয়ে বসলো। একটা জংগল থেকে একটা পরি বের হয়ে এল, চড়ক গাছে চড়লো।

বানান করে করে দুই একটা বইয়ের নামও পড়তে পারলাম। আব্বা একটাবই বের করে বলে, চল, আজকা এইটা পইড়া শোনামুনে। বাঙালি হাসির গল্প।

ঊণসত্তর সালে ছাত্ররা খুব মিছিল করা করা শুরু করলো। আমি ছাত্র, যদিও ইস্কুলে যাই না, বাসায় বসে পড়ি। ‘তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা’ বলে শ্লোগান দিতে দিতে ওরা আব্বার সরকারি অফিসে ঢিল ছুড়লে বুঝি দেশে কিছু একটা হচ্ছে।

বাসার কাছে কালি মন্দিরে সন্ধ্যায় ঢঙঢঙ করে কাশার থাল বাজে, বাজতেই থাকে। রাত নেমে আসে সন্ধ্যার সাথে সাথেই। সেই শব্দ কানে বেজেই চলে, আর আমার মাথায় সারাদিনের সব শোনা কথারা জেগে ওঠে। একটা শিয়াল ডাকে, একটাপাখি উড়ে যায়, আমার মনে হয় বাইরে এখন অনেক কিছু ঘটা শুরু হইলরে।

এক সন্ধ্যায় শুনি ভট্টাজ্যি বাড়িতে কে যেন মারা গেছে, তার চিতা হবে আজ রাতে। মা’তো কৌতুহল আর দায়িত্বময়তায় ছটফট করা শুরু করল। বাচ্চাদের বাসায় আটকে রাখা তার যেন মহান দায়িত্ব। আর তার নিজের ইচ্ছা চিতাস্থানের কাছে যাবার। বারান্দায় দাড়ালে আগুন দেখা গেল। অনেক রাত অবদি সেই আগুন দেখা গেল। স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিলাম কাঠের লাকরি চড়চড় করে জ্বলছে।

অনেকদিন ধরে আমরা একটা খেলা চালিয়ে গেলাম। লাকড়ির চুলায় রান্নার সময় এক চিমটি লবন ছুড়ে দিতাম, আর লবন চিরচির করে ফুটত আর আমরা বলতাম, এই যে ভট্টাজ্যির চিতা জ্বলতাছে। মা পিটুনি দেবার জন্য দৌড়াদৌড়ি শুরু করতো।

কোটালিপাড়ার ইস্কুল:

বাগান উত্তর বাড়ি।
বাসা থেকে দেখা যায় দুরত্বে কালি জিভ বের করে আছে।
সামনে বলি দেবার হাড়িকাঠ।
একটা ব্রীজ পার হয়ে।
হাতের বামে একটা পুরানো বাড়ি।
জংগলের ভিতর দিয়ে রাস্তা।
প্রথম দিনেই সবাই বলাবলি করছিল, এই জংগলে কাটামুন্ডু থাকে।

ক্লাশে ঢুকে দেখি বসার ব্যবস্থা নাই, সকলেই যার যার চাটাই আসন নিয়ে আসছে। একটা পায়া ভাঙ্গা বেঞ্চ ছিল, বইখাতা হাতে নিয়া তাতেই বসে থাকলাম, টিচারের কাছ থেকে অনেক দূরে। সামনে সবাই বগলের নিচ থেকে লম্বা কাপড়ে প্যাচানো তলোয়ার টাইপের কিছু একটা বের করলো। তালপাতা। নিজস্ব দোয়াত সামনে রেখে একটা একফুটি কলম বের করে পাতার উপর আকা শুরু করলো। টিচার এলে গতকালের ভরাট কৃত পাতা দেখালে উনি নানা রকম উপদেশ দিলেন। কালি বানানোর টিপস দিলেন। কিন্তু কাউকে মারলেন না। দেখে খুব স্বস্তি পেলাম। আমি বাসায় শ্লেটে অক্ষর আকতে শিখছি। তাই ব্যস্ত হলাম না। ভাবলাম নিজেই করব। কালি বানানোর কায়দাটা দারুন। কয়লা গুড়া করে পানি মিশাতে হবে... তবে গুড়া করা অত সহজ না... পানির পরিমানও ঠিক করা কঠিন.... সবাই পারে না।

যেহেতু ঐ স্কুলে আমি বড় ক্লাশে, তাই আমাকে মাষ্টার বাবু আর ছাত্রত্ব দিলেন না, আমি তার সহকারি হয়ে গেলাম... অপগন্ড তালপাতার সেপাইদের তদারকির ভার আমার উপর... মাঝে মাঝে উনি আমাকে পড়াতেন। তবে তা নেহাৎ অপ্রাতিষ্ঠানিক। উনি বলতেন: একটা অভিসপ্ত জীবন তিনি কাটাচ্ছেন। তার কথা ছিল কলকাতা ইনভার্সিটিতে গিয়া গ্রাজুয়েট হওয়া। ভাগ্যের ফেরে আন্ডারম্যাট্রিক। এই সবকীটানুকীট তার ছাত্র!

আমার কিন্তু অদ্ভুত মজা লাগতো তালপাতায় লেখা দেখতে। একটা প্রাকৃতিক গোলযোগ লাগছে মনে হইত ক্লাশ শুরু হইলে। সবাই একসাথে চেচামেচি, এ ওর কোলে কালির দোয়াত উল্টাইছে তো আরেকজন তালপাতা ভাইঙ্গা ফেলাইছে তো আরেকজন থুতু ফেলছে তো জায়গা দখল নিয়া দলাদলি। আমাদের শিক্ষক অতিরিক্ত উদাসিন বলে এই অবস্থা।

এই স্কুলে শিক্ষকের চাইতে গলাকাটাটাকে সবাই ভয় পাইতো বেশি। ছোট্ট একচিলতা একটা এবরো থেবরো মাঠ, জাম্বুরা বা গোল কিছুর গড়ানো খেলার মধ্যে কোন কারনে যদি তা জংগলের দিকে চইলা যাইতো, তা হলে আর রক্ষা থাকতো না। নিরিহ একজনকে অপরাধি বানাইয়া তাকে পাঠাতো বল খুজতে। আর তাকে সবাই মিলে ভয় দেখান হইতো, গলাকাটা আইলো...।

এর মধ্যে চৈত্র মাসে সিও’র দীঘিতে পানি শুকাইতে থাকলো। খুব খসখসা দিন। আমরা চাপকলের পানিতে গোছল করি। একজন হাতল ধইরা ঝুইলা পড়ি, আরেকজন কলের মুখে মাথা পাতি। এইভাবে বদলা বদলি কইরা গোসল চালাইয়া যাই।

সকালে উইঠা শুনলাম দীঘির সব মাছ ভাইসা উঠছে। আশেপাশের উৎসাহিরা মাছ ধরতে পানিতে নামলো। সবাই কিছু না কিছু ধরল। আমরা পাড়ে বইসে সেই অভুতপূর্ব দৃশ্য দেখে পানিতে নামার জন্য পাগল হৈয়া গেলাম। সাতার জানিনা তাই পাত্তা পাইলাম না। যদিও এতো মাছের মরন দশায় কষ্ট লাগতেছিল খুব। মাছের ভাগ না পাইয়া আমাদের মনটাও খুব অসন্তুষ্ট!

কিন্তু হঠাৎ আমাদের সব কিছু চঞ্চল হৈয়া উঠলো। চৈত্রসংক্রান্তি!

সকাল থেকেই ঢোলের আওয়াজ। এদিক সেদিক থেকে মানুষের আনাগোনা। সবাই দৌড়াইতেছে। কেউ খেজুরের কাটা লইয়া, কেউ জিহ্বায় শিক ঢুকাইয়া। এরমধ্যে কাটাঅলা খেজুর গাছের মাথায় একজন। সে আর নামবে না। জিহ্বা ফুটা কইরা মোচের মতো দুইদিকে লোহার শিক লাগাইয়া ডাটে ডাটে কয়েকজন নিরিহ মহিলা আর বাচ্চাকাচ্চাদের কোলের কাছ দিয়া দৌড়ায়। আর পুকুর পাড় থেকে বড়গোল লাল টিপঅলা ঘোমটা ঝোলানো মহিলারা আওয়াজ তুললো: কুলু লুলু লুউউউ...।

চিল্লাচিল্লি কইরা গাছ তোলা হৈল। চড়কগাছ কে ঘুম ভাঙ্গানোর পর সবাই মিলে উন্মত্তভাবে গোসল করালো, সিন্দুর দিলো। পুজা হৈল, গাছখাড়াইয়া গেল। ঢ্যা ঢাং ঢ্যাং, ছ্যা ডাং ঢ্যাং..ছ্যাডাং ছ্যাডাং... ঢোলপাগল হৈয়া গেছে।

পুকুর থেকে মাটিতে প্রতিষ্ঠা করানোর পর চড়কচারিরা আসলো। এরমধ্যেই আমরা নানা রকমের সং এর সাথে মেলায় পরিনত হওয়া যায়গাটা চক্কর দিতে থাকলাম। জিলাপির দোকান, সাজ এর দোকান, খৈ এর দোকান। নানা রকম রং বেরং, কোলাহলচিৎকার। চৈত্রমাসের বিকালে ধুলা বালি ঘাম উত্তেজনায় চড়ক ঘুরতে লাগলো। শিবধ্বনিদিয়ে পিঠের চামড়া একহাত লম্বা বড়শি গাইথা বনবন কইরা ঘুরতেছে আজকের বীরেরা। তাদের উদ্দ্যেশ্যে দুইহাত জড়ো করে কপালে ঠেকাচ্ছে সব নারী পুরুষ।

আমরা বিক্রমপুরের মুসলমান বালকেরা কোটালিপাড়ার গরিব নমসুদ্রদের চড়কপুজা দেইখা তাজ্জব হৈয়া যাইতেছি। ভট্টাজ্যি বন্ধু শিব ঠাকুর খুজতেছে। বড় মানুষেরা ভাবের ঘোরে নাচতেছে, চিল্লাইতেছে। গানে গানে মন্ত্র বলতেছে।

স্কুল পড়ুয়া চাচা স্বাধীনতা বানান লিখতে গিয়া ভুল লিখছে, তা নিয়া মা তারে খুব বকতেছে। আব্বা বললো, থাউক না, দেশে স্বাধীনতা আইলে সব ঠিক অইয়া যাইবো নে। আমরা দুরে দাড়াইয়া চাচার কাচুমাচু ভাব দেইখা হাসতে হাসতে ভ্যাংগাই। কেউ কিছু মনে করে না।

একটা সেগুন চারা লাগানো হৈল। আব্বা নিজেই বাশের খাচা বানাইলেন। চারাটা কত ছোট,আর খাচাটা বিরাট। আমাদেরও মাথা ছাড়ায় যায়। এইটা কি ঠিক? আব্বা বললেন: দেখ, এইটা একটা মাপ। যেদিন চারাটা খাচার চাইতে বড় হবে, সেদিন আর ওর খাচা লাগবে না। ও তখন স্বাধীন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন