বৃহস্পতিবার, ২২ আগস্ট, ২০১৩

যেভাবে লেখা হলো আত্মজা ও একটি করবী গাছ

হাসান আজিজুল হক

প্রথম কথা হচ্ছে, যিনি লেখক তিনি যদি একটা লেখা লিখতে শুরু করেন, যে মুহূর্তে শুরু করেছিলেন তার আগে কী ভেবেছিলেন বা আগে কদিন ভেবেছিলেন, এটা ঠিক কেউ বলতে পারবে না। এ গল্প লেখা হয়েছে ১৯৬৭ সালে। আমার মনে হয়, গল্পে যে সময়টা, তাতে তীব্র শীতকালের উল্লেখ আছে যেহেতু, সেহেতু গল্পটা লেখা হয়েছিল শীতকালেই। মাথার ওপর চাঁদ দেখা যাচ্ছে--এ রকম লেখাও আছে সেখানে। অথচ গল্পটা লিখতে শুরু করেছিলাম কিন্তু উজ্জ্বল রোদের এক সকালবেলায়।

আমি একটা নিঝুম রাতের অনুপুঙ্খ বিবরণ দিচ্ছি যেখানে শব্দ নেই, পাখির আওয়াজ নেই এরূপ। এক উজ্জ্বল সূর্যালোকিত সকালবেলায়। আমি তখন থাকতাম ফুলতলা নামের একটা জায়গায়। খুলনা শহর থেকে ১৪ মাইল দূরে এবং আমি যে কলেজে চাকরি করতাম, ব্রজলাল কলেজ ওখান থেকে ৯ মাইল দূরে। আমি যাতায়াত করতাম বাসে। আসতামও বাসে। গরিব মাস্টার, বিরাট পরিবার টানতে হতো। কী করে লেখা হয়েছে, এটা সোজাসুজি করে বলা যায় কিছু কাগজের ওপরে কলম দিয়ে। অবশ্য একটা বই বেরিয়েছে তখন। পাঠকরা তা ভালো করেই নিয়েছে, গ্রহণ করেছে বলে মনে হয়। তবুও '৬৭ সালে দৌলতপুর ব্রজলাল কলেজ, যেখানে অধ্যাপনা করি, তখন খুব সাধারণ অবস্থার মধ্যে ছিলাম। আমি তখন গল্পটা নিয়ে ভাবার সুনির্দিষ্ট কোনো জায়গা বলতে পারব না কিংবা গল্পও বলতে পারব না।
তখন বেশ কিছু মানুষ পশ্চিমবঙ্গ থেকে তারা যে বিতারিত হয়ে এসেছে, তা নয়, যেভাবেই হোক না কেন তারা পশ্চিমবঙ্গ ছেড়ে ফুলতলাতে বসবাস শুরু করেছে। এরা একটা বিশেষ দুরবস্থার মধ্যে ছিল। আর যেভাবেই হোক স্থানীয় মানুষদের তাদের গ্রহণ করার ব্যাপারটা কোনো দেশেই থাকে না। একটা মানুষ নিজেই একটা এলাকার নানা সমস্যায় জর্জরিত হচ্ছে, তাদের এসো এসো বলে গ্রহণ করা হয় না। বাস্তবে সেটা ঘটে না। তো এমন একটা পরিবারের পারিবারিক ঘটনার একটা টুকরো কানে এসেছিল। সে বাড়িতে মেয়েটার কাছে লোক আসত। মামা কাকা জানে শোনে কিন্তু কিছু পয়সা কড়ি দেয় বলে তারা কেউ কিছু বলে না। জেনেও না জানার ভান করে। এ কথাটুকু একটা পরিবার সম্বন্ধে এসেছিল। মাথায় এটা ঘুরতে থাকে যে, কিছু একটা লিখে ফেললে হয়। এ পর্যন্তই।
তারপর গল্প লিখতে শুরু করার সপ্তাহখানেক আগেই গল্পটা একটু চেপে ধরল আমাকে। তখন আমি নানাভাবে গল্পটা লিখতে শুরু করেছিলাম। আমার মনে আছে, একবার শুরু করলাম যে একটি স্থানীয় বাজারের ছোট্ট চায়ের দোকানে বসে কয়েকটি ছেলে খুব আড্ডা দিচ্ছে। তো আড্ডা মারতে মারতে রসালো গল্প করছিল তারা। তখন একটি মেয়ের প্রশ্ন তুলছে। যারা যারা সেখানে যায়, তারা খুব মজা পাচ্ছে। এভাবে তা দু-এক লাইন লিখেছিলাম। দেখা গেল, এত অপছন্দ হলো যে গল্পের ভাষা গড়ন পুরনো হতে হতে নষ্ট হয়ে যাওয়া একটা জায়গায় চলে গেছে। সেটা ছিঁড়ে ফেলে দিলাম। ওই দিনের কথা থেকে, আচ্ছা দেখি, গল্পটা লেখার চেষ্টা শুরু করি।

খুব যে সুনির্দিষ্টভাবে গল্পটা লেখা শুরু করেছিলাম, তা কিন্তু নয়। শীতের দিনে যে বাড়িটা আমরা পেয়েছিলাম বিনিময়সূত্রে, সেখানে বসে লিখেছিলাম। তো লেখা শুরু করার আগে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'বুড়ো আঙুল' পড়ছিলাম। তার প্রথম বাক্য ছিল 'হৃদয় নামের ছেলেটির নামই হৃদয়।' হৃদয় থেকে আমার মনে হলো, আমি তাহলে নিদয় শব্দটি ব্যবহার করব। সেই জন্য আমি লিখলাম 'এখন নিদয় শীতকাল।' কলার পাতা অল্প বাতাসে একবার বুক দেখায় একবার পিঠ দেখায়। এভাবে গল্পটা শুরু হলো এবং তারপর দেখা গেল আসতে থাকল কী রকম করে যে, একটা ছবির পর একটা ছবি। আরেকটা কথা, ফুলতলা খুব রূপবতী জায়গা। এত ফুল, এত সুন্দর লতাপাতায় ঘেরা জঙ্গল, ঠিক যেমনটি আমি ব্যবহার করেছি 'আত্মজা এবং একটি করবী গাছ'-এ। এটা যে খুব কল্পনা করে লিখেছি, সে রকম নয়। আমার ঠিক যেমনটা মনে হয়েছে, তেমনই লিখেছি।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন