বৃহস্পতিবার, ২২ আগস্ট, ২০১৩

ঝিঁঝোটি দাদরা / শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়

অমর মিত্র

শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় যে আচমকা বছরখানেকের অসুখে চলে যাবেন, তা এই দশ এগার বছর বাদেও কেমন অবিশ্বাস্য মনে হয়। তিনি আমার সেই শিক্ষক যেমন শিক্ষক এই মহাপৃথিবী, এই প্রকৃতি, এই জীবন। শ্যামলকে যত পড়ি ততো তিনি উন্মোচিত হন। ১৯৭৭-এ এই আশ্চর্য মানুষ্টির সঙ্গে দেখা।

আড্ডা গল্প হই হল্লা, সাহিত্য থেকে চাষবাস, জমি আর মাটি, পরগণে মেদনমল্ল, বিদ্যাধরীর ফেলে যাওয়া খাত—সাপের খোলস, নদীর বয়স হাটবাজার----শ্যামলের জানার শেষ ছিলনা, কৌতুহলেরও শেষ ছিল না। তার সঙ্গে আড্ডায় বসা মানে জীবনে জীবনে ধারাস্নান।


শ্যামলবাবুর গল্প আমাকে বার বার পড়তে হয়। পড়তে হয় নিজ প্রয়োজনে। যখন কিছুই থাকে না কাছে, সব কিছু শূন্য মনে হয়, শ্যামলে নিজেকে সমর্পণ করি। সেই রাখাল কড়াই, চন্দনেশ্বর মাচানতলায়, দখল, যুদ্ধ, হাজরা নস্করের যাত্রাসঙ্গী, অন্নপূর্ণা থেকে দুগগাপুর হল্ট। নখদর্পণ, সিমেন্টের আয়ু, ঝিঝোঁটি দাদরা---কোন গল্পের কথা বলব? শ্যামল পড়েই যে এতটা বয়স পার করেছি। তাঁর যে কোনো গল্পের কথাই বলতে পারি। আমি বলছি ঝিঝোঁটি দাদরা নামে সে গল্পটি, যা পড়তে পড়তে আমার চোখে ভেসে উঠছিল শ্যামলবাবুর সেই প্রতাপাদিত্য রোডের বাসা বাড়ি, সকালে তিনি লিখতে বসেছেন, রেকর্ডে চলছে বড়ে গুলাম কিংবা কিশোরী আমনকর। এখন এই কমপ্যাক্ট ডিসক আর ইন্টারনেট ইউ টিউবের যুগে সব কিছু কত সহজে হাতে এসে পৌঁছয়, পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনার মতো দেবিকারানির অচ্ছুৎ কন্যার সেই গান, কিৎ গায় হো/ খয়বন হিয়ারে-এ-এ / কিৎ গয়া হো...কেউ না কেউ আপ-লোড করেছে ইউ-টিউবে। শ্যামলবাবু আপনি থাকলে সেই গানের সমুদ্রে ডুব দিতেন।


ঝিঝোঁটি দাদরা কোন এক শোভনলালের গল্প যে কিনা একবার ভবানীপুরে ট্রাম থেকে দুপুরবেলা নামতেই জগুবাজারের উল্টোদিকের ফুটপাথে তিনখানা নোটকে গলাগলি করে শুয়ে থাকতে দেখে চারপাশ দেখে বুক পকেটে চালান করেছিল। তখন সে বেকার প্রেমিক। পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনা একেই বলে। শোভন বছর পনের আগে বর্ষা বোঝাই শেষ রাতে স্বপ্ন দেখত, তার ঘরের বাইরেই জানালার ঠিক নিচে ঘাসের ভিতরে কয়েকটা সিকি আধুলি কাঁচা টাকা পড়ে আছে। শেষে দেখত অফুরন্ত সিকি আধুলি। কুড়িয়ে তা শেষ হয় না। এহেন স্বপ্ন প্রবণ শোভনলাল যখন টের পায় সে খুবই অরডিনারি, জীবনে বা অফিসে তার কোথাও বিশিষ্ট হবার কোনো চান্স নেই—তখন সে মরনিং ওয়াক, ডাকঘরের টাকা ডবলের সারটিফিকেট ক্রয় আর গানে ডুব দিল। ফৈয়াজ খাঁ, রসুলেন বাঈ, জ্ঞান গোঁসাই শুনতে লাগল। কেদার, কাফি, তিলক, কামোদ তাকে যেন দুদন্ড শান্তি দিল। তার মুখের ভিতর এক শান্ত ভাব এল। এরপর সে ধর্মতলার ফুটপাথে ৭৫ পয়সায় গওহরজানের ৮০ বছর আগে গাওয়া গানের রেকর্ড পায়। শ্যামলবাবুর এই গল্পে রাগ রাগিনি বেজে ওঠে নিরন্তর। আর তিনি যেন গানের ভিতর দিয়ে ফিরে যেতে থাকেন পিছনে। কী আশ্চরয গান রেখে তাঁরা, সেই সব মানুষগুলি চলে গেছে এই জীবন ছেড়ে, তা দিয়ে নিজের জীবনকে সুন্দর করে নিচ্ছে যেন শোভনলাল। আমাদের গল্পের একটি প্যাটার্ন আছে, কাহিনির একটি প্যাটার্ন আছে, শ্যামলবাবু তা থেকে বেরিয়ে যেতে পারতেন। বেরিয়ে গিয়ে নতুন এক ভুবনে প্রবেশ করতেন তাঁর পাঠককে নিয়ে। তাঁর ভিতরে ছিল এক অন্তরলীন তন্ময়তা। সে তন্ময় ভাব এই গল্পের শোভনলালের ভিতর। আসলে লেখক নিজেকেই যে উন্মোচিত করেছেন এই গল্পের এক এক বাক্যে, বাক্যবন্ধে। কানা কেষ্ট---কে সি দের রেকর্ড বগলে নিয়ে শোভনলাল টের পায় পৃথিবীতে এখনো চোদ্দ আনা পড়ে পাওয়া যায়। জীবনে অনেক কিছু এখনো তার পাওয়ার আছে। এই সব গান যেন খনির মণি। যখন গাওয়া হয়েছিল ওই গান সে সময়কার পৃথিবী আর নেই। নেই তখনকার মানুষগুলিও। রয়ে গেছে গান। যতবার বাজাও, সেই তেজ, দাপট। সেই লাবণ্য।

সেই গানের রেকর্ড খুঁজতে খুঁজতে রেকর্ডের মজুতদার বিশু ঘোষের সঙ্গে শোভনলালের বন্ধুতা হয়। সেই সঙ্গে আরো গানের সমঝদারের সঙ্গে আলাপ হয়ে যায়। পারুল ঘোষের গান শুনতে শোভনলাল যায় হীরুবাবুর বাড়ি। হীরু থাকে টবিন রোডে। তার বাড়িতে গান নিয়ে আড্ডা বসে। সবাই আসে গান শুনতে। কী এক অদ্ভূত গল্প লিখেছেন লেখক। গল্পটি ক্রমশ দার্শনিকতার দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। এই জীবন, সফলতা অসফলতা নিয়ে শোভনলাল নিজের মতো করে কথা বলে যায়। বলেন শ্যামলবাবু। শোভনের ছেলেরা বড় হয়ে দূরে চলে গেছে। বাড়িটা ফাঁকা। সেই বাড়ির ফাঁকা জায়গায় পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনার মতো আশ্চর্য সব গানের রেকর্ড সস্তায় নিয়ে এসে গাদা করে দিতে লাগল। গান নয় যেন স্টক করে রাখা আনন্দ আহ্লাদ। মনের ভিতরটা ঝলমলিয়ে ওঠে। রবিবার রবিবার বিকেলে হীরুবাবুর টবিন রোডের ডেরায় গানের আনন্দ নিতে শোভন, ননী গোঁসাই, বিশু ঘোষেরা হাজির হয়। হীরুর মেসিনে তাদের খুঁজে আনা রেকর্ড চাপিয়ে দেয়। শোভন তখন পাগল হয়েছে ঝিঁঝোটি দাদরা শুনে। কোথায় শুনেছে, না ফিল্ম ফেস্টিভালে গিয়ে অশোককুমার আর দেবিকারানির সিনেমা অচ্ছুৎ কন্যায়। পঞ্চাশ বাহান্ন বছর আগের গান, তখনো প্লে ব্যাক আসেনি। সিনেমার পর্দায় এক কাঠকুড়ুনির গলায় শোনা এই গানে মাতাল হয়ে গেছে শোভনলাল। হীরুর বাড়িতে গিয়ে ওই গানের জন্য অধীর শোভন বলে, লীলা চিটনিস কিংবা দেবিকারানি অশোককুমারকে চিঠি লিখবে কিনা। সিনেমায় শুনল একবার। আবার চাই তার, আবার। রেকর্ড সে পাবে কোথায় ? হীরু তার রেকর্ডের জাবদা খাতার পাতা উলটে উলটে দেখে নিয়ে তাক থেকে সাত পুরোন একটি রেকর্ড বের করে আনে। মুছে মেসিনে বসায়। বাজতে আরম্ভ করে সেই ঝিঁঝোটি দাদরা। সে একটা ব্যাপার হলো বটে। গান উথলে পড়ে হীরুর ঘরের বাইরে টবিন রোডের ভীড়ে ঢুকে পড়ে কী সব করে দিতে লাগল। গান শেষ হতে হীরুর বউ একটি বাচ্চা কোলে করে ঘরে ঢুকে বলে, এই দেখুন আমার নাতি।

হীরুর কাছে শোভনলাল কৃতজ্ঞ। তাকে ৫০ বছর আগের পৃথিবীতে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। দশটাকা দিয়ে সে হীরুর নাতির মুখ দ্যাখে। ঝিঁঝোটি দাদরাই পারল, হীরুর নাতির মুখ দেখে হীরুর দেশের কথা জিজ্ঞেস করতেই বেরিয়ে এল ভৈরব নদের গায়ের খালিশহর, দৌলতপুর, বেলেপাড়া, পুকুরপাড়ের বাড়ি......ঝিঁঝোটি দাদরায় স্নান করছে যেন হীরু আর শোভনলাল। কেউ কাউকে চিনতে পারেনি এতদিন। পাশাপাশি থাকত পঞ্চাশ বছর আগে। তারা দুজনেই সব ভুলে গেছে কে কেমন ছিল। কী করে পারবে, তারা দুজনেই যে অন্য রকম দেখতে ছিল......বলল হীরুর বউ। গল্প আর কী ? এমনি। ঝিঁঝোটি দাদরা নিয়ে আর কী বলব ? সুধী পাঠক শুনতে শুনতে দেখুন ৫০--৬০ বছর আগে পৃথিবীটা ছিল কেমন। আমরাই বা ছিলাম কেমন।




লেখক পরিচিতি
অমর মিত্র
জন্ম :৩০ আগস্ট, ১৯৫১।
বাংলাদেশের সাতক্ষীরার কাছে ধুলিহর গ্রামে | বিজ্ঞানের ছাত্র | কর্ম পশ্চিমবঙ্গ সরকারের এক দপ্তরে | তিনি ২০০৬ সালে ধ্রুবপুত্র উপন্যাসের জন্য সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার পেয়েছেন।

প্রকাশিত বই
পাহাড়ের মত মানুষ, অমর মিত্রের শ্রেষ্ঠ গল্প, অর্ধেক রাত্রি, ডানা নেই উড়ে যায়, ধুলোগ্রাম, অশ্বচরিত, আগুনের গাড়ী, ধ্রুবপুত্র, নদীবসত, কৃষ্ণগহ্বর, আসনবনি, নিস্তব্দ নগর, প্রান্তরের অন্ধকার, ভি আই পি রোড, শ্যাম মিস্ত্রী কেমন ছিলেন, গজেন ভূঁইয়ার ফেরা, জনসমুদ্র, সবুজ রঙের শহর, সমাবেশ, সারিঘর, সুবর্ণরেখা, সোনাই ছিলো নদীর নাম, হাঁসপাহাড়ি।
পুরস্কার : সাহিত্য একাডেমী।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন