বৃহস্পতিবার, ২২ আগস্ট, ২০১৩

ও শারী ও শাড়ি

আনোয়ার শাহাদাত

এটা, অর্থাৎ বিষয়টা কি পর্যায়ে কি নির্দেশনায় চিহ্নিত করা যায় বা চিহ্নিত করা উচিত এবং তা কোন ঘরানায়ই বা হওয়া উচিৎ সেই প্রশ্ন দিয়েই শুরু হতে পারে। এই ঘটনা ও বিষয় হয়তো অনেক ঘণ্টা-ব্যাপি কি দিন-ব্যাপি বিদ্যা ও বিদ্যান সম্পর্কিত তর্কালোচনার দাবিদার কি তর্কালোচনার সূত্রপাত্র করতে সক্ষম কিন্তু সত্য হচ্ছে ওটি আবার এমন কোনো জটিল ব্যাপারও নয় যে এত কিছুর দরকার আছে বরং অন্য অর্থে বলা ভাল এটা খুবই সাধারন একটা ব্যাপার, সে সম্পূর্ণই একটি শাড়ির ঘটনা, অথবা কয়েক জোড়া শাড়ির ঘটনা, অথবা যে সব লোকজন শাড়ি পরে তাদের ঘটনা অথবা নির্ধারিত কতিপয় নারী যারা শাড়ি পরে থাকে তাদেরকে নিয়ে ঘটনা ফলে এটা কোনো বিচারেই জরুরি বিষয় হয়ে উঠবার কথা নয়।


‘শাড়িকে’ ভারত উপমহাদেশের বিভিন্ন ভাষায় কি নামে ডাকা হয় তা শারি কি শাড়ি, কি সিরে, কি সিরা, কি সাটি অথবা পোদাভাই এসব মূলকথা নয় এখানে। যদিও ‘শাড়ি’ জিনিষটি কি তার সংজ্ঞা দেয়া দরকারও আছে বলে মনে হয়, অবশ্য শাড়ি সংজ্ঞার এই দরকারে একেবারে সুনির্দিষ্ট ভাবেই তা দেয়া সম্ভব, যা এরকম-- শাড়ি হচ্ছে কোনো সেলাই ছাড়া টানা লম্বা প্রসারিত এক টুকরা কাপড়, যদিও তর্কের অপেক্ষা রাখে না যে আজকাল দুনিয়ায় কে না শাড়ি চেনে? একজন ‘সুন্দরী রমণী’ দেখতে ভারতীয়, তার শুকনা দেহ চারদিক দিয়ে জড়িয়ে রেখেছে একটা কাপড় অথচ যার উপস্থাপনা কম-বেশি ‘শিল্প-সম্মত’ ভাবে ক্ষানিকটা উদ্দীপকও বর্নণা করা যেতে পারে, সেই যে রঙ্গীন বা কখোনো সাদা কাপড়খানি যা ভারত উপমাদেশের নারী দেহের যাবতীয় অঙ্গ প্রত্যঙ্গ নানা ভাবে ঢেকে রাখতে ব্যবহৃত হয় সেই কাপড় খানাই হচ্ছে ‘শাড়ি’। ‘শাড়ি’ কী সে সংজ্ঞা নির্ধারিত হওয়ার পর ‘আমরা’ অথবা ‘আপনি’ অথবা যে কেউ অথবা সেটা ব্যাপার নয় কে এই বিদ্যান অথবা বিদ্যান নয় এমন আলোচনায় অংশ নিচ্ছে, অথবা কে-ই বা বিষয়টিকে বলছে বা বিষয়টি সম্পর্কে প্রশ্ন করছে, এর যে কেউ-ই হোকনা কেনো আপাতত বিষয়টি নিয়ে সামনে এগুনো যেতে পারে।

তবে এটা নিশ্চিত, বর্ননার এ সন্ধিক্ষণে দৃষ্টি রাখবার প্রধান বিন্দু হচ্ছে পূর্বোলে−খিত শাড়ি। ভাল কথা, সামান্য আর একটু ভাঙিয়ে বললে বলা যেতে পারে যে, সম্ভবত একটি মাত্র শাড়ি বিষয়েই কথা হচ্ছে না, তবে সংখ্যায় অনেক গুলো শাড়ি নয় কেনো? এখানে আবারো বলা দরকার মনে হচ্ছে, ঘটনা বা সম্ভাব্য ঘটানার স্বার্থে শাড়ি সংখ্যা ‘দুই’ বা দু'য়ের চেয়ে আরো কিছু বেশি সংখ্যা নির্বাচন করা যথাযথ হবে বলে মনে হয়, অথবা আমরা এপর্যায়ে এখানেই অপেক্ষা করতে পারি তা দেখবার জন্য যে প্রকৃত সংখ্যা বা প্রকৃত ঘটনা আসলে কি বা কি বিষয়ের উপর। এখানে এই মুহূর্তে শাড়ি বিষয়ক সংখ্যা ‘দুই’ এর ইতিহাস বিষয়ে শুরু করা যেতে পারে কেনোনা অবশেষে এটা দু’টি শাড়ি বিষয়ক তথ্য বা খবরাদি, অথবা আবারো উলে−খ করা দরকার কোনো সংখ্যা নিরূপণ না করাই হয়তো ভাল হবে, আবার এভাবেও বলা যেতে পারে যে সংখ্যা নিরূপণ হয়তো যথাপুযোক্তই হবে, অথবা নাকি সংখ্যা তত্ত্ব এখানে দ্বন্দ্বের মধ্যেই রেখা দেয়া ভাল হবে যেহেতু সংখ্যা নিয়ে মানব মস্তিষ্ক সর্বাদাই এক ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে বসবাস করে।

এই যে ‘ঘটনা ও বিষয়’ তা আলোচনার জন্য এভাবে পাশা-পাশি রাখা সম্ভব হতোনা যদি না আজকালকার আধুনিক প্রযুক্তির বিকাশ এই উন্নত পর্যায়ে অবস্থান করতো। যার ফলে এখনকার দিনে সম্ভব যে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের কোনো গ্রামে এমন কোনো ঘটনা ঘটছে যা কিনা নিউইয়র্কের বাসার কার্যালয়ের ডেস্কে বসে থেকে দেখা যেতে পারে সরাসরি। আর যখন কিনা হয়তো তুমি এমন কিছু পড়ছ যা ধ্র“পদী গ্রন্থের অংশ বা তার আলোচনা বা কোনো সাময়িকী তা হয়তো টাইম অথবা ফরচুন, নিউইয়র্কার অথবা আটলান্টিক মানথ্লি, সে হয়তো বিশ্ব রাজনীতি পর্যবেক্ষণের জন্যে, কি বাণিজ্য বিশ্বের সবশেষ পরিস্থিতি জানবার জন্যে, কি শিল্প সংস্কৃতির খোঁজ খবর নেয়া, সে খোঁজ খবর হয়তো নিজের চাইতেও অন্যকে বলার জন্য, এর সবই হচ্ছে তোমার নিউইয়র্ক শহরে, কার্যত সেই কথিত ‘মিষ্টি বাড়ি’ থেকে যখন অমন সময় স্যাটেলাইটের মাধ্যমে তুমি বাংলাদেশের টেলিভিশন দেখছো। আর এভাবেই সুদূর বাংলাদেশ থেকে শাড়ি কাহিনি স্যাটেলাইট টেলিভিশনের সৌজন্যে বা কারণে শুরু হয়। এ পর্যায়ে বোধ হয় বলা যেতে পারে যে, সে তাহলে কেবল ‘একটি শাড়ি’ কাহিনিই। কেউ যদি ঝুম্পা লাহিড়ির ইন্টার প্রেটারস অব মেলাডিস এর গল্প গুলো পড়ে থাকেন তাহলে উপলদ্ধি করা সম্ভব বাঙালি নারী-পুরুষরা কি রকম জোশে ঘোরতর গভীর ভালবাসায় নিমগ্ন শাড়ির সঙ্গে। যদিও পুরুষরা শাড়ি পরে না, শাড়ি পরে নারীরা কিন্তু পুরুষরা তাদের নারীদের এই ছত্রিশ ইঞ্চি চওড়া ষোলো ফুট দৈর্ঘ্যের লম্বা কাপড় খানার আবরনে দেখতে অসম্ভব পছন্দ করে।

সবচেয়ে সুন্দর শাড়িতে কোনো নারীকে বা সবচেযে সুন্দর নারীকে কোনো শাড়িতে তার জীবনে দেখার সুযোগ ঘটে বলে তার ধারণা- যখন সে আক্ষরিক অর্থেই একটি ছোট্ট বালক, সে সময়টা হবে যতদূর মনে পরে উনিশ’শ একাত্তর যখন ভারতের তখনকার প্রধান মন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী নিউইয়র্কে জাতিসংঘের কোনো বিশেষ এক অধিবেশনে একটি দেশের স্বাধীনতার পক্ষে এক গরম বক্তৃতা করে, স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধরত ভবিষ্যতের ওই দেশটির নাম ‘বাংলাদেশ’। তখন ওই কঠিন মিশন শেষ করে তার বিমান ইন্ডিয়ার দিকে যাত্রা শুরু করে নিউইয়র্ক থেকে, যদিও পথিমধ্যে লন্ডনের হিতরো বিমান বন্দরে স্বল্প সময়ের জন্য বিরতি নেয় সে নতুন করে জ্বালানী পূরণের জন্যে। তারপর সেই বিমান ভারতের দিলি−র পালাম বিমান বন্দরে অবতরণ করে। অবশ্য যে বিমান বন্দরটি পরে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরার নামেই নামকরণ করা হয়। ওই বিমান অবতরণের পরও হয়তো তখনো বিমানের প্রপেলার অসম্ভব শক্তিতে বাতাস সৃষ্টি করছিল, যে বাতাসে হয়তো ইন্দিরার শাড়ি উড়ে যেতে চেয়েছিল যে দিকে তিনি হাঁটছিলেন তার বিপরীত দিকে। আর তিনি হাঁটছিলেন তার মন্ত্রীসভার সদস্যদের দিকে যেখানে সদস্যরা সব লাইন বেঁধে দাঁড়ানো, তাদের কেউ খয়েরি রঙের স্যুটে, কেউবা গোলাপী স্যুটে, কেই ধুতিতে, কেউ শেরোয়ানীতে, কেউ টারবাইনে। ‘সে’ অর্থাৎ সেই বালক তখন ওই শাড়ি পরা ইন্দিরার প্রেমে পড়ে অর্থাৎ যখন ওই দৃশ্য সে দ্যাখে, যে দৃশ্য তার কাছে জ্ঞাত কি অজ্ঞাত কারণে এক মহান দৃশ্য, সেরকম শাড়িতে সে সময়ে সেরকম এক নারী। এই যে তার প্রেমে পড়া এবং এই প্রেমে পড়ার পেছনের কি সব কারণ তা এখানে মূখ্য নয় যদিওবা তা এমনকি বোঝা যায় যে তার কৈশোরিক দৈহিক পরিবর্তনের উপসর্গ বা হরমোনের প্রভাবই হচ্ছে মূখ্য কথা। সেই যে অবোধে প্রেমে পড়া যা ছিল তার কাছে খুবই সৎ ও আন্তরিক কেনোনা আজ দশক-দশক পরেও সেই দৃশ্যই তার কাছে ‘প্রেম’ হয়ে ওঠে এক দ্বান্দ্বিক প্রশ্নের মধ্যে তা ইন্দিরা গান্ধীর চাইতেও তার পরনের শাড়ি বা সেই শাড়ি দৃশ্য বা শাড়ি পরা নারী দৃশ্য বা সেই নারীই যে কিনা ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, জওহারলাল নেহেরুর কন্যা, মতিলাল নেহেরুর নাতি, মহাত্মা গান্ধীর আশীর্বাদপুষ্ট। ঠিক আছে, এখানে একটি সত্য বলে নেয়া যেতে পারে বা একটি সত্য বলে নেয়া উচিত তাহলো এটা নিশ্চিত যে ‘সে’ শাড়ি পড়া ইন্দিরা গান্ধীকে কোনো টেলিভিশনে দেখেনি। কিন্তু কাহিনির বয়ানে মনে হতে পারে যে দৃশ্যগুলো তার টেলিভিশনে দেখা কিন্তু বাস্তবে হওয়ার নয় কেনোনা যে সময়ের কথা সে বলছে সে রকম সময়ে তার পক্ষে কোনো টেলিভিশন দেখা সম্ভবপর ছিল না যেখানে ও যখন কিনা ওই গুরুত্বপূর্ণ শাড়িতে সে ইন্দিরা গান্ধীকে দেখেছে বা গুরুত্বপূর্ন ইন্দিরাকে সে ওই শাড়িতে দেখেছে। বাস্তবতা হচ্ছে মিলেনিয়াম দশকের আগে তার বা তার পরিবারের পক্ষে যেমন কোনো টেলিভিশনের স্বত্ত্বাধিকারী হওয়ার সম্ভবনা ছিল না তেমনি টেলিভিশন দেখারও তার কোনো সুযোগ ছিল না সুতরাং এখানে জেনে রাখা ভাল যে এই যে শাড়িতে তার ইন্দিরাকে দেখা তা তাহলে হতে পারে কোনো ছাপার মাধ্যমে সে দেখেছে, হয়তো তা কোনো একটি স্থিরচিত্র। সুতরাং দৃশ্য বা দৃশ্যকল্পগুলো যে ভাবে তার কল্পনায় ঘুরপাক খায় তাতে মনে হচ্ছে সে হয়তো ওই সব দৃশ্য টেলিভিশনেই দেখেছে। যেখানে ইন্দিরার মন্ত্রীরা স্থির ভাবে দাঁড়ানো যা কিনা টেলিভিশনে দেখলেও তাই মনে হতো এবং হয়তো স্থিরচিত্রে স্থির ভাবেই শাড়িতে ইন্দিরার আঁচলটা ওড়া অবস্থায়, তারই পেছনে হয়তো একটি বিমানকে দেখা যাচ্ছে। সুতরাং এখানে জেনে নেয়া ভাল যে দৃশ্যটি একটি সংবাদ পত্রের স্থিরচিত্র থেকে দেখা। এবং যে সংবাদ পত্রটিতে সে এই ছবিখানি দেখেছে সে সময় সেই সংবাদপত্রটি তার এক দূরসম্পর্কের চাচার কাছ থেকে পাওয়া, যে চাচা ছিল খুব ভীরু প্রকৃতির, ফলে ওই ‘ভীরু চাচা’র পাকিস্তানী মিলিটারিদের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়ার প্রশ্নই ওঠেনি যদিও তার সম্পূর্ণ আবেগ ও ভালবাসা দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের সে সমর্থন করেছে। অতএব ভীরু চাচা’র কাজই ছিল সারাদিন যুদ্ধ নিয়ে বিশে−ষণ করা এবং তার করা যে কোনো বিশে−ষণই ছিল মুক্তিযোদ্ধারা কী নিষ্ঠুর ভাবে পাকিস্তানী মিলিটারিদের পরাজিত করছে। সময়টার কথা আবারও স্মরণ করা যেতে পারে যখন মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি মিলিটারিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে দেশের স্বাধীনতার জন্যে, সে একটি নতুন দেশের জন্য যুদ্ধ, যে দেশটির নাম হবে বাংলাদেশ। সেই সময়টা অর্থাৎ উনিশ’শ একাত্তর, কোনোক্রমেই সেটা এখনকার এইসব সময় নয় ধরে নিতে হবে আর যদি বলা হয় যে একাত্তর ও এখনকার সময় এরমধ্যে কি কোনো চেতনগত বা অবচেতনগত বা রাজনৈতিক। অরাজনৈতিক কি তেমন কোনো তফাৎ বা কিছু? উত্তর হচ্ছে- সে সম্পূর্ণ অন্যকথা ও অপ্রয়োজনীয় বিষয় এখানে।

একটি স্থানের নাম মুক্তাগাছা, ময়মনসিংহ জেলার অধীনে, যা কিনা রাজধানী শহর ঢাকা থেকে উত্তরে ও খুব দূরে নয়। গুগল ম্যাপে সার্চ করে হয়তো মুক্তাগাছা জায়গাটা পাওয়া যেতে পারত ইন্টারনেটে এবং ভৌগলিক একটি ধারণা নেয়া যেত, এবং ওই জায়গায় ঘটে যাওয়া শাড়ি বিষয়ক যাবতীয় ঘটনার তথ্যাদিও সংগ্রহ করা সম্ভব হতো যে তা কিভাবে, কখন, কেমন করে ইত্যাদি সব ঘটল। যে সব তথ্য কিনা বিভিন্ন অলাভজনক প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে ইন্টরনেটে রেখে দেয়া হয়, অতএব মুক্তাগাছার স্পর্শ কাতর কাহিনিও তার পক্ষে সবটাই ইন্টারনেটের সৌজন্যে জানা সম্ভব কিন্তু এসব এমন ভাবে জেনে লাভ কি? কি অর্থ দাঁড়াবে এ সম্পর্কিত তথ্যগুলো জেনে বা তা সংগ্রহ করে।


শাড়ি কাহিনির আর একটি অর্থৎ দ্বিতীয় স্থান হচ্ছে দেশের দক্ষিণ-পূর্ব দিকে, বঙ্গোপ সাগরের উপকূলে যা কিনা ভারত মহা-সাগরের অংশ। অন্য ভাবে বলা যায়- সুন্দরবন নামের রয়েল বেঙ্গল বলে পরিচিত বাঘের যে বাড়ি সেই ঘন বর্ষা-অরণ্য থেকে স্থানটি খুব দূরে নয়, অথবা ওই জায়গাটা চিনতে আরো ভাল হতে পারে আমরা যদি সদ্য প্রকাশিত একটি বইয়ের দিকে তাকাই; যে বইটির প্রণেতা ইউনাইটেড স্টেটের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট, যিনি মজা করে সবসময় দর্শকদের সামনে নিজেকে পরিচয় করান এভাবে- আমি একদা ইউনাইটেড স্টেটের ভবিষ্যত প্রেসিডেন্ট ছিলাম, তো ‘ভবিষ্যত প্রেসিডেন্ট ছিলাম’এর নির্মিত প্রামাণ্য চিত্র, ও বই যার একই নাম “দি ইনকনভিনিয়েন্ট ট্রুথ”; সেই বইটির বিষয় আমাদের এই গ্রহ ‘পৃথিবীর উওপ্তায়ন ও তার প্রতিক্রিয়া’। সেই বইয়ে স্পষ্ট করেই দেখানো আছে কিভাবে বাংলাদেশের নিম্নাঞ্চল এন্টার্কটিকের বরফ গলে যাওয়ার ফলে সহসা সাগরে তলিয়ে যাবে। অতএব সেই আল গোর অর্থাৎ পরবর্তীকালে যে প্রায় আমেরিকার প্রেসিডেন্ট, অথবা অন্য ভাষায় যে জনপ্রিয়তার মাপে ইউ এস প্রেসিডেন্ট কিন্তু কৌশলগত কারণে প্রেসিডেন্ট হতে পারলেন না, তিনি ভালো করেই এই স্থানটি চিনবেন। জায়াগাটি দেশের দক্ষিণে পটুয়াখালী জেলার অন্তর্গত, স্থানীয় ভাবে যা গলাচিপা উপজেলা বলে পরিচিত এবং আমাদের আগ্রহের ওই সুনির্দিষ্ট গ্রামটির নাম ‘হতভাগী’। এখন আল গোর যদি সুনির্ধারিত ভাবে জানতে চান ভাই বা বোন এই যে গ্রামের নাম হতভাগী তার অর্থ কি? আমরা তার জন্যে ওই নামের ব্যাখ্যা যথার্তই করতে সক্ষম এখানে। ভাইশাব, মি. গোর, হতভাগী শব্দটির অর্থ হচ্ছে সংক্ষেপে- বঞ্চিত ও নির্যাতিত একজন নারী, যে নারীর আর নতুন করে কোনো কিছু হারাবার নাই, যে আগেই জীবনের সব কিছু সব অর্থে হারিয়েছে; এবং এ পর্যায়েই একজন নারীকে চিহ্নিত করা হয়ে থাকে সর্বস্ব হারানো ভাগ্যহীন নারী ‘হতভাগী’ হিসেবে।


অতএব, অনেকদিন আগে ‘তার’ কৈশোরকালে যখন দেশের দক্ষিণাঞ্চলে অপর আর একটি শহরে থাকতে হতো যার নাম বরিশাল। যে শহরটি আমাদের উপরোলে−খিত গ্রাম ‘হতভাগী’ থেকে প্রায় একশ মাইল উত্তর দিকে। সেইখানে সেই বরিশালে কোনো এক সময় তখন ‘সে’ একটি বালিকার প্রেমে পড়ে যার অর্থ কিনা সেই বালিকাটিও তার প্রেমাকুতির প্রতিত্তোরে এক ধরনের সাড়া দিতে সম্মত হয় যার ফলে তাদের মধ্যে ‘দ্যাখা-ট্যাকা’টা ঘটে। তখন তাদের মধ্যে ‘দ্যাখা-ট্যাকা’ হওয়ার ঘটনার কোনো একদিন কীর্তনখোলা নামক কোনো এক নদীর ধারে নৌকা ঘাটে মেয়েটির সঙ্গে দেখা হলে সে মেয়েটিকে বলে- এই তুমি কি আমার জন্য একদিন শাড়ি পরবে যেমনটি ইন্দিরা গান্ধী পরেছিল তার জীবনের কোনো এক সময়, হয়তো তা মস্কো থেকে কী নিউইয়র্ক থেকে দিলি−তে ফিরে আসবার পথে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পক্ষে সমর্থন আদায়ের প্রচার করবার পর। এমন উদ্ভট কথা শুনে মেয়েটি নিঃশব্দে হাসে, প্রথমে সে কৈশোরোত্তীর্ণ সেই তরুণের দিকে গরু চোখে তাকায়, ছেলেটি হাসতে থাকা মেয়েটির দিকে আপলক পাল্টা-গরু চোখে তাকিয়ে থাকে, এই মাত্র বৃষ্টি হওয়ার পর স্বচ্ছ আকাশে অবাক হয়ে রংধনু দেখার মত ঘটনা যেনো তার এই দীর্ঘ জীবনে দেখছে, হ্যাঁ দীর্ঘ জীবনই তো, যখন থেকে জ্ঞান হয়েছে বলে তার মনে হয় এবং এমন দৃশ্যের জন্য যখন থেকে অপেক্ষা সেই থেকে ধরলে তো এ তার দীর্ঘ জীবনই। তার সঙ্গে ও তার জন্যে এমন করে কেউ রংধনু নির্মাণ করে হাসতে পারে সে অভিজ্ঞতা তার হয়নি আগে কখনো।

অতএব স্বর্গ সম্পর্কে তার যে ধারনা জন্মায় সেই ধারণার একটি বাস্তবতা তার মনে হতে থাকে। আহা! এবং স্বর্গ বলে যদি কিছু থেকে থাকে, সেই স্বর্গে আহা! এমনও যদি কোনো বালিকা থেকে থাকে! তার আবেগ অপরিবর্তিত, সেই আবেগের উপর ভর করে দাঁড়িয়ে সে আবারও জিজ্ঞেস করে, এই? তুমি উত্তর করোনি, তুমি কি একদিন, কোনো একদিন, আমার জন্য শাড়ি পরবে যেমন ইন্দিরা গান্ধী একবার কি দুইবার কি অনেকবার যেমন করে শাড়ি পরেছিল। রংধনু বিচ্ছুরিত হয়, নিঃশব্দ হাসি সশব্দ হাসিতে রূপান্তরিত হয়, সেই হাসির শব্দ কীর্তনখোলা নদীর স্রোতের কুল-ধ্বনির সঙ্গে মিশ্রণে এক ভিন্ন বাদ্যের তৈরি করে, তার কাছে তেমনি মনে হতে থাকে। কিন্তু মেয়েটি শাড়ি বিষয়ক কোনো উত্তর করে না, অতএব আবেগে ভর করে দাঁড়ানো তরুণের চোখে যথেষ্ট জলের উদগীরণ হওয়ার উপকরণ তো ছিলই এবং যা হয়ও এবং সেই জল কিনা গড়িয়ে তার গালের ঢালু পথ দিয়ে সাদা-কালো চেকের জামার উপর পড়ে। সেই চোখ থেকে আসা জল জামার সেখানে পড়ে যেখানে ঠিক জামার নীচে থাকে হৃৎপিণ্ড নামক দেহের অংশ বিশেষ। যদিও তা কেবলই দেহের একটি অংশ মাত্র অথচ কি সব মিথ যে চালু রয়েছে সে সম্পর্কে ! রংধনুর মাঝে বিজলীপাতের মত সেই হাসি মেয়েটি এবারে থামিয়ে বলে, তুমি কি কাঁদছ, কেনো কাঁদছ, কাঁদারতো কিছু নাই, তুমি তোমার ইন্দিরাকে দেখতে চাও শাড়িতে আমার মধ্যে? ভালো কথা, ঠিক আছে, একদিন, হয়তো কোনো একদিন, আমি তোমার জন্যে, তোমার ইন্দিরাকে দেখাতে শাড়ি পরব, এখন কান্না থামাও, তুমি দেখছি একদম ছোট্ট বালকটির মত, আমি ভেবেছিলাম তুমি অন্তত ছোট্টো বালকের চেয়ে কিছুটা বড়। আমি কাঁদছি না, বালকটি বলে, তা যথেষ্ট গাধা চাতুর্যতার সঙ্গেই সে বলে, আরো বলে, বৃষ্টি হচ্ছে, বলে সে হাসে, বিশ্বাস করো বৃষ্টি, কেবলি বৃষ্টি। উত্তরে- হ্যাঁ তোমার মনের মধ্যে ওই বৃষ্টি! একথা বলা ছাড়া মেয়েটি আর কিছু বলবার জন্যে খুঁজে পায় না এমন গাধা পরিবেষ্টিত সময়ে। পরিশেষে এটা অবশ্য কখনোই জানা যায় না যে মেয়েটি আদৌ ছেলেটির জন্যে কোনদিন শাড়ি পরেছিল কিনা যেমনটি সে চেয়েছিল মেয়েটিকে ইন্দিরার মত শাড়িতে দেখতে। ধরে নেয়া যায় বা ধারণা করা যেতে পারে মেয়েটি ওই ছেলেটির শাড়ি পরা বিষয়ক অনুরোধ না রাখলেও নিশ্চয়ই যথা নিয়মে অন্য কারো করা অনুরোধ সে রেখেছে তা হয়তো হিজাবে দেখে সুখী হতে চাওয়া কোনো পুরুষের কথা রাখা। এখন বিষয় হচ্ছে সেই মেয়ে কি অন্য কোনো মেয়ে কার অনুরোধ রেখে কাকে সুখী করলো কি করলো না তাতে কার কি যায় আসে, বা ওই ব্যাপার নিয়ে কথা বলে অন্যকেই বা উত্যক্ত করা ঠিক কিনা। জগত সম্পর্কে কি আমরা এরকমই বলি না যে, যার যা ইচ্ছা সে তাই করে, বা করা উচিৎ যতক্ষণ না পর্যন্ত এটা অন্তত কাউকে বা ‘তাকে’ অর্থাৎ যে এই বিষয়ের উদ্যোক্তা কোনোনা কোনো ভাবে স্পর্শ করছে? অতএব সে যাই হোকনা কেনো আসল সত্য হচ্ছে ‘সে’ সেই শাড়ি অনুরোধ তারও অনেক দিন পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরো একটা মেয়েকে করে, তুমি কি একদিন আমার জন্য একখানি শাড়ি পরবে? তুমি? দয়া করে? তার এই জাতীয় অনুরোধ প্রতিবন্ধী নিয়মে সে ক্রমাগত করতে থাকে প্রতিটি নারীকে, যে সব নারীকে তার জীবনে যেখানে মনে হয়েছে এই অনুরোধ করা যেতে পারে। ক্রমাগত তার এই অনুরোধ চালাতে গিয়ে এমনকি তাদেরও অনুরোধ করে যারা শাড়ি পরে না, দু’একটি আমেরিকান মেয়েকে, জাপানিস, ইকোয়েডেরিয়ান, সুদানিজ, কাকে নয়? অনেককেই সে এই অনুরোধ করে, কিন্তু প্রায় সব সময়ই উত্তর এসেছে “হু কেয়ারস”!

এই যে বিষয়টি যা এখন মনে হচ্ছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বা ফালতু বিষয় ‘শাড়ি’, তা মনে করা যেতে পারে বাঙালিদের একাধিক ই-মেইল গ্রুপ গুলোতে যেখানে কিনা অর্থাৎ ওই সব গ্রুপ গুলোতে খুবই দেশপ্রেমিক বুদ্ধিজীবীদের ঘনঘাটা। সেই সব ই-মেইল গ্রুপগুলোতে দেশ-প্রেমিক বুদ্ধিজীবীরা যারা দেশের বাইরে থাকেন এবং যারা চব্বিশ ‘কাত-দারি’ সাতদিন সপ্তাহে সারাক্ষণ খুবই লোমহর্ষক ভাবে উত্তেজিত থাকেন দেশপ্রেম নিয়ে। বিশেষ করে দেশপ্রেম নিয়ে কথা-বার্তা বলাতেই যেন মূল প্রেম, মূল কাজ, মূল কথা ওই সব ই-মেইল গ্রুপ গুলোর মাধ্যমে এবং যেকোনো সাধারণ বিষয়কেই ওই সব দেশ-প্রেমিকরা একটা ঢাউশ আকার ও জটাজাল’এ পরিণত করতে পছন্দ করেন ও ভালবাসেন। অবশ্য অতিব জরুরি বিষয় সমূহ গ্রুপে পোস্ট করবার আগে ই-মেইল গ্রুপের মডারেটরের পক্ষ থেকে বিষয়টি সম্পর্কে ও তার বিবিধ গুরুত্ব সম্পর্কে একটি জরুরি বার্তাও পাঠানো হচ্ছে নিয়মিত প্রথা। যে বার্তায় মডারেটর সকল বুদ্ধিজীবী সদস্যদের আহ্বান করেন এই মর্মে যে তারা তাদের বুদ্ধির বিস্ফোরণ ঘটাতে পারেন উলে−খিত বিষয়ের উপর বিবিধ দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে আলোচনার মাধ্যমে। সুতরাং এখানে ধরে নেয়া যেতে পারে যে ওই সব ফোরামে বিষয়টি উত্থাপন করা হলে, তার চেয়ে বলা ভাল বিষয়টি ই-মেইলে পাঠালে বিদেশ থেকে দেশপ্রেমিক বুদ্ধিজীবীদের বুদ্ধিভিত্তিক বিষ্ফোরণের এক ‘জল-বন্যা’ শুরু হয়ে যাবার সম্ভাবনা থাকে। হয়তো ‘জল-বন্যা’র ঢলই শুরু হয়ে যাবে বা যেতে পারে অথবা এমনও হতে পারে যে ওই সব বিস্ফোরোন্মুখ মস্তিষ্কের উচ্চ সীমা রেখা হয়তো এই নিম্নমানের উৎপীড়নের সীমা রেখা স্পর্শ করবার যোগ্যতাই রাখবে না। হয়তো তা তাদের কাছে খুবই নগণ্য ও তুচ্ছ মনে হতে পারে, এমনকি হাস্যকরও মনে হতে পারে। অতএব সেই সম্ভাবনাও ফেলে দেয়া যায়না যে তারা কোনো রকম মন্তব্য করা থেকে বিরতও থাকতে পারেন। এসবের কোনটা যে ঘটতে পারে তা নিশ্চিত করে বলা মুশকিল। অতএব ই-মেইল গ্রুপে পাঠানোর ভাবনাটি ‘সে’ মাথায় দ্বিতীয় অথবা সর্বশেষ চিন্তা হিসেবে ভেবে রাখে যে বিষয়টি ওই সব গ্রুপ গুলোতে পোস্ট করা হবে যখন তার মনে হবে যে এর চেয়ে আর বাজে ভাবে কোনো সময় কাজে লাগানো যায় না অথচ যা হবে এক অর্থে খুবই সৃষ্টিশীলও। অতএব তার ই-মেলের ইন-বক্সের ড্রাফট সেকসনে বিষয়টি সংরক্ষিত থাকলো যাতে অমন কোনো এক সুবিধামত সময়ে সেন্ড বাটনে ক্লিক করে দিয়ে উত্তরসূরী কি মুক্তমনার কি এরকম শত গ্রুপের কিল-বিল করা মস্তিষ্কগুলো কার্যকর হয়ে উঠতে নতুন একটি বিষয় উত্থাপন করে দেবে। ধারণা করা যেতে পারে তাতে আলোচনায় একটি মাদকতা যোগ হবে, হবে না? এসব গ্রুপগুলোতে সারা না পেলে কত কেইসই তো আজকাল আছে ইয়াহু কি ফেসবুক কি মাইস্পেস, ইত্যাদির বদৌলতে, সে পরে দেখা যাবে।

সময়ের হিসেবে সে খুবই সকাল, যদিও তার জীবনে সেরকম সকালের ঘটনা প্রতিদিনের ঘটনার চাইতে ভিন্ন কিছু না। তার ছোট্টো মাটির ঘর থেকে সে, অর্থাৎ সেই নারীর বাইরে আসার প্রসঙ্গ। এই যে তার ঘর বলে যা, সেই ঘরের চালা নাড়ায় ছাওয়া। আহা! “ধানবৃক্ষ” থেকে আসা নাড়া-খড়ে ছাওয়া তার ঘর। সেই তার ঘরের ভেতরেরই খুব সকালের কথা, সে রকমই সকাল যে দিনের আলো আসবার অনেক আগে। পেশাব না পেলে এমন সময় তার ঘুম ভেঙে যাবার কথা নয়, অতএব তার এই জেগে উঠবার কারণ কিডনীতে জমে যাওয়া পেশাবের চাপ। অথচ সময়টা এমন যে তার তখন ঘুমিয়েই থাকতে ইচ্ছে করে। এমনও নয় যে সকালের চিহ্ন রেখা দেখা গ্যাছে যাতে করে ঘুম থেকে উঠবার একটি যৌক্তিকতা তৈরি হয়। অথচ পেশাব পাওয়া, কেবল পেশাব পাওয়াই তাকে ঘুম থেকে তোলে।
যদিও এই পেশাব পাওয়ার পাশাপাশি আরো একটি মৌলিক বিষয় জড়িত তার এই ঘুম থেকে ওঠা, তা হলো পেটের ভেতর অসম্ভব মোচড়ানো, সেই মোচড়ানো ক্ষুধায়, যদিও তা প্রতিদিনের ও নিয়মিত, ওই পেশাবের মতই। আর এই পেটে মোচড়ানোর কারণও যথারীতি তার আগের রাতের অপর্যাপ্ত খাবার। কিন্তু এ বিষয় চিরন্তন ধারনা হচ্ছে- এই শ্রেণির মানুষের জন্য কখনোই খাবার পর্যাপ্ত হবে না এবং যার ফলে সর্বদা একটা নির্ধারিত সময় পরে পেট মোচড়াবে, তাতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু থাকবে না। অতএব এই যে শেষ রাতে তার ঘুম ভেঙে যাওয়া তার কারন এখানে ধরে নিতে হবে ক্ষুধা নয় বা না খেয়ে থাকা নয়, বা খাবার মত খাদ্য না থাকাও নয়, প্রধান কারণ পেশাবের চাপ। এই অসম্ভব পেশাবের চাপ থাকা সত্ত্বেও তার ‘বিছানা’ ছেড়ে উঠতে ইচ্ছে করে না। বিছানা? হ্যাঁ ! তাকে যদিবা বিছানা বলা যেতে পারে কোনো কারণে। ঘুমাবার জায়গাটা যে কেবল বিছানাই নয় তা জানা যায় এখানে এই সুবাদে। তার নিজ হাতে বোনা মোটা হোগোল পাতার হোগলা, এরই নাম এই আলোচনায় বিছানা। সেই বিছানায় শুয়ে থাকা অবস্থায়ই চোখ খুলে বাইরের দিকে বেড়ার ফাঁকা দিয়ে আলো দেখবার চেষ্টা সে করে। দিনের আলোর কোনো চিহ্ন নয় বরং গুটি কয়েক জোনাকি পোকার আলো তার চোখের সামনে জ্বলে-নেভে। ফলে বিছানা ছেড়ে উঠতে আর তার ইচ্ছে করে না। কিন্তু পেশাবের চাপ তাকে তার বিছানা ছাড়তে বাধ্য করে। অতএব এরপরের অংশ- তার বা তারই মত “তাহাদের” আনুষ্ঠানিক কোনো পায়খানা-পেশাব করবার যেমন ঘর নাই বা থাকে না কিছু কোণা-কানছি ও বিশেষ জায়গা বাদে ঠিক তার অবস্থাও তাই। সুতরাং আমাদের এ প্রসঙ্গে জানা হয় যে সে পেশাবের জন্য যে জায়গাটা ব্যবহার করে সেটি তার নাড়া ও মাটির ঘর থেকে একটু দূরে । সুতরাং সে এই অন্ধকারে দূরে যেতে চায় না। তার মনে হয় এই অন্ধকারে কেবল জোনাকি পোকাদের ওড়া-ওড়ি বাদে এখানে কোনো প্রাণীরই তো অস্তিত্ব নেই, তাই অত দূরে যাবে না। তার এই মনে হওয়ার ফাঁকে জোনাকিদের নিয়ে তার ভাবনা হয় কি এমন কারণ যে পোকাগুলো তাদের পশ্চাদদেশে আলো নিয়ে শেষ রাতে ওড়া-উড়ি করছে। যাই হোক, পেশাবের চাপ তাকে তার বিছানা ছাড়তে বাধ্য করে। উঠে ঘরের যে দরজাখানি যা ঢাকনার মত, সেই ঢাকনাটি সরায়, অবশ্যই তা ঘরের দরজার ঢাকনা, দরজা নয়, তাদের ঘর-দোরের কাহিনিই ওই রকম যেখানে দরজার দরকার পড়ে না। এর অর্থ এই নয় যে চোর বা ডাকাত বলে তাদের জীবনে কিছু নেই। বরং এর অর্থ-যেহেতু তার বা তাদের কিছুই নাই যা চোর বা ডাকাতরা নিতে পারে। সেই যে কিছু নেই এবং তা না হারাবার ভয় থেকেই কোনো দরজা থাকার যৌক্তিকতা এখানে থাকে না। অতএব দরজার সেই ঢাকনা যা কিনা চতুষ্কোণের একটি কাঠামো, যে কাঠামো বাঁশের চ্যাড়ায় বানানো, যার মাঝখানটা দরজা সমান প্রস্থ আয়তন, তাল পাতায় বুনানো। এই হলো দরজা বা যার নাম রাখা হয়েছে দরজা যা কেবলই ঘরের ভেতরে অপ্রয়োজনীয় বাতাস ঢুকে পরা রোধে সহায়তা করে কী বর্ষার ছটা যথা সম্ভভ আটকায়। তো আমাদেও এই অপর ‘সে’ সেই দরজার ঢাকনা সরিয়ে ঘরের বাইরে আসে। বাইরে এসেই দেখতে পায় তাদের এলাকার পরিচিত কুকুরটি তার ঘরের সামনে শুয়ে আছে, এবং তাকে দেখেই কুকুরটি লেজ নাড়ায়, গলাটি মাটিতে সমান্তরাল শুইয়ে দিয়ে কুৎ-কুৎ করে এক ধরনের সাড়া পাওয়ার ও সাড়া দেয়ার শব্দ করে। এর সবই যেনো কুকুরটি করে তাকে খুশী করবার জন্যে। অতএব সে কুকুরকে উদ্দেশ্যে করে মনে মনে গাল দেয়, এই মরার কুত্তা তুই এহানে কি কর? এর পর তার মনে পরে, দু’দিন আগে সে এই কুকুরটিকেই দেখেছে সোনা কান্দির ভিটায় একটি মাদি কুকুরের পেছনে ঘুরতে যখন প্রতিবেশী অপর সখী মেয়ের সঙ্গে নিচু স্বরে তাদের মধ্যে এই নিয়ে কথা হয়- দ্যাখ কুত্তাডা কি বেহায়া, লয়জ্জা কইতে কিচ্ছু নাই অর, কেডি কুত্তাডারে পাওয়ার লইগ্যা অর জানডা শ্যাষ অইয়া যাইতাচে, এ কথা তাদের মধ্যে হওয়ার পর তারা নারী কুকুরটার উদ্দেশ্যে বলে- এই দিসনা, ওরে দিসনা কিন্তু কইলাম, এসব কথা হওয়ার পর তারা তখন খুব হাসে। এখন কার্তিক মাস, গ্রামাঞ্চলে খুব অভাবের দিন, এছাড়া এ সময়টা কুকুরেরও প্রজননের সময়, আর এই প্রজনন সময়ে পুরুষ কুকুরগুলো নারী কুকুরের পেছনে পাগলের মত ঘুরতে থাকে। সেই একই কুকুর তার দরজার বাইরে এবং তাকে ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে দেখে লেজ নেড়ে এক ধরনের সাড়া দেয় যা কিনা সহসাই কুকুরটির প্রতি তাকে রাগিয়ে তোলে এবং তার গলা থেকে এক ধরনের রাগন্বিত গোঙ্গানী বের হয়ে আসে। এরপর তার অদ্ভুত ভাবে মনে হতে থাকে- এই যে কুকুরটির বিপরীত লিঙ্গের সঙ্গী খোজা, সেই সঙ্গী যেমন তার প্রজাতির অর্থৎ কুকুর প্রজাতির হতে পারে তেমনি অন্য প্রজাতির কোনো প্রাণী হলেও হয়তো হতে পারে। অন্য প্রজাতির বিপরীত লিঙ্গের সঙ্গী হলে চলবে না কেনো সেই উদ্ভট প্রশ্নটিই তার মাথায় আসে। এমনকি তা অর্থাৎ সেই সঙ্গী যদি হোমোসেপিয়েন্স প্রজাতির হয়? তার ভাবনা জগত এ পর্যন্ত আসার পর সে কামার্ত একটি চোখের সামনে যেনো লজ্জায় গোলাপী হয়ে ওঠে। কি সেই অনুভূতি তা বর্ননা করা যায় না, অন্তত এক্ষেত্রে তা বর্ননা করা খুব কঠিন। অনুভব এক ধরনের করা যায়, সেই গোলাপী হয়ে ওঠা, সেই ভেতরে তোলপার হওয়ার জানা-নাজানা অনুতূতি। এই যে তার জানা-নাজানা অনুভূতি তার সঙ্গে যোগ হয়- বাড়ির পাশের হাটে খাবার কুড়াতে গেলে চারদিক থেকে তার দেহের প্রতি পুরুষের যে খামচে দেয়ার অভিজ্ঞতা, ডলে ও কচলিয়ে দেবার যে অভিজ্ঞতা, সেই অভিজ্ঞতা তার শরীরের কোথায় নয়? কোন অংশই বা শরীরের বাদ থাকে ওই সব প্রানীদের হাত থেকে? তখন নারী বৈশিষ্ট্য অর্থাৎ ‘নারীর শক্তি প্রয়োগ পুরুষের বিরুদ্ধে নিষেধ’ এমন বিধান মেনে কেবল মৃদু কনুই খোচা নিয়ম ব্যবহারে খানিকটা নিরাপদে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া, সেই ঘৃনা, ভয়, এবং অসহায়ত্বের অভিজ্ঞতার কথাই তার মনে হাতে থাকে এই কুকুরটির এমন এই অসময়ের উপস্থিতির মধ্য দিয়ে। যদিও কুকুরটি এখনও পর্যন্ত তেমন কিছুই করেনি তার প্রতি, যেসব তার সঙ্গে পুরুষগুলো হর-হামেষা করে থাকে। এখন বরং তার ভিন্ন কিছুই মনে হতে থাকে, কোথায় যেনো ওই পুরুষ গুলোর সঙ্গে এই কুকুরটার খুব বড় ধরনের একটি তফাৎ তৈরি হয়। সব কিছুই তার কাছে মনে হতে থাকে অন্য দৃষ্টি থেকে। ঘরের দরজার সেই ঢাকনা খুলে সে বেরিয়ে এলে কুকুরটি বিনীত মাথা তোলে, বিনয়েই আবার তার গলা-ঘার মাথা সমান্তরাল মাটিতে শুইয়ে দেয়, ভক্তি ও বিশ্বস্ততা দেখাতে লেজ নাড়ানোতো ছিলই, চার-পা আধা খাড়া করে দাড়াবার যে চেষ্টা সেও তো ওই বিনয়েই। এর সবই তার মনে হতে থাকে, সেই দরজা খুলে বাইরে আসবার পর থেকে কুকুরটির কি নিরলস বিনয় ও বিশ্বস্ততা ও সম্মান প্রদর্শন তা তার এই তিরিশ বছর পর্যন্ত তাকে কে দেখিয়েছে, অন্তত তার মনে পড়ে না। মনে পড়ে না জীবনে কোনো পুরুষ কোনোদিন কোনো মুহূর্তে এমন করে এমন করেছে। সেই প্রশ্ন ও যুক্তি তার মনেও ওঠে, তবে ওই যে, এবং এইযে, পুরুষগুলো যাদেরকে মানুষই বলা হয় কুকুরটির আচরণকি তার চাইতেও অধিক ভালবাসার, আদর ও বিশ্বস্ততার না? অন্তত এই মুহূর্তে? সে জানে বা তার মনে হয় এটা হয়তো কোনো ব্যাপার নয় কেনোনা তা মানুষের নয় কুকুরের কিন্তু তারপরও কোথায় যেনো তার ভালো-লাগাটা থেকে যায়, সে ওই মুহূর্তেরই হয়তো, তবুও একটি নারীর প্রতি একটি প্রাণীর আগ্রহ তবুও তা অন্তত ‘মানুষের মত পাশবিক’ নয়। অতএব তার কাছে সেটা ব্যাপার নয় প্রাণী প্রজাতির কোন ঘরানার পুরুষ ক্যানিস লুপাস কি হোমো স্যাপিয়েন্স আগ্রহ দেখালো। সত্য হচ্ছে এখানে এরকম যে, একজন নারী তার তিরিশ বছরের জীবনে এই প্রথমবারের মত নারী হিসেবে সন্মানের সঙ্গে বিপরীতে লিঙ্গের কারো কাছ থেকে আগ্রহ দেখতে পায় তাহোক কোনো মানুষ পুরুষের কাছ থেকে নয় তা কুকুর পুরুষের কাছ থেকে, আবারো উলে−খ্য এই নারীর প্রতি এই প্রাণঢালা আগ্রহটুকু প্রাণী জগতের ক্যানিস লুপাাস থেকে হোমো স্যাপিয়েন্স থেকে নয়।

সে সামনে যেতে থাকে তার সেই লজ্জিত ও সে লজ্জায় গোলাপী হওয়া মুখ নিয়ে যেখানে সে পেশাব করবে বলে মনস্থির করেছে । খালি পায়ে হেঁটে এসে ঘর পেছনের দিকে রেখে পায়ের পাতার উপর বসার উদ্যোগ নেয়। যথারীতি পরনের শাড়িখানা উপরের দিক তুলতে হয়। এর একটু আগের ওই সব ভাবনা ও অনুভূতি উত্তর শাড়ি পেশাব করা উপোযোগি তুলতে গিয়ে তার সেই লজ্জায় আরো সংকোচ যোগ হয়, বিব্রত ভাব নিয়ে সে পেছনের দিকে ফেরে, অর্থাৎ তার ঘরের দিকে ফিরে তাকায় যেখানে কুকুরটি। কোনো পুরুষ তাকিয়ে থাকলে যে অনুভূতি হওয়ার কথা সেই অনূভুতিই তার হয়। সেটা ভেবেই তার পেছনের দিকে ফেরা, কিন্তু পেশাবের চাপ ও পেশাব করবার অনিবার্যতা তাকে যুক্তিযুক্ত করে এই বলে- ‘ও কিছু নয়’। যদিও তাতে তার জড়তা কাটে না, পেছনে ফিরে দ্যাখে কুকুরটি তার দিকেই তাকিয়েই আছে। আগের মত তেমন করেই কুকুরটি ঘাড় নাড়িয়ে মাটিতে ঘষে বিশ্বস্ততার লেজ নেড়ে কুৎ-কুৎ শব্দ করে। অতএব কুকুরটির এহেনো বেলেল−াপনায় তার আর অমন করে পেশাব করার ইচ্ছা থাকে না। সে এরপর কুকুরের দিকেই ফেরে, তার কারণ তার কাছে মনে হয়, কুকুরের দিকে পেছন ফিরে পেশাব করবার ফলে লজ্জিত হওয়ার সম্ভাবনা কমে যাবে। কিন্তু এই যে অধিক লজ্জিত হওয়ার সম্ভাবনা কমাতে পেশাব করবার অবস্থানের পরিবর্তন করতে যাওয়া তাতে আর শাড়ি ঠিক আগের মত উপরে তোলা হয় না। অতএব দ্বিতীয়বার অসম্পূর্ণ ও এলোপাথারি ভাবে কোনো রকমে তড়িৎ উপরে তোলা শাড়ি নিয়ে পায়ের উপর আবার বসতে গেলে শাড়ির উপর অস্বাভাবিক টান পড়ে, ওই টানের ফলে শাড়ি ফ্যাত-ফ্যাত করে ছিঁড়ে যায়। সেই শাড়ি ছেঁড়বার শব্দ কুকুরটির জন্য এক ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি করে কারণ তার আগ্রহের বিষয় পাক-প্রণালীর নিয়মে সৃষ্ট বায়ু পায়খানা পথে নিঃসরণের যে শব্দ তার মত কেনোনা পায়খানাও তার সঙ্গে থাকতে পারে যা কিনা কুকুরটির খাদ্য হতে পারে। এই যে শাড়ি ছিঁড়ে যাওয়া তাতে তার তেমন মন খারাপ হয় না। এই শাড়ি খানা সে তিন বছর সাত মাস যাবৎ পরছে। সুতরাং সে জানে কোথাও টান পড়লেই তা ছিড়বে। অতএব আরো একবার শাড়ির এই ছেঁড়ায় সে অবাক হয় না। কিন্তু কুকুরটি ওই শাড়ি ছেড়ার শব্দে ঠিকই বিভ্রান্ত হয়ে মনে করে সেই শব্দ কোনো মানুষের পায়খানা করবার সময় যে শব্দ হয় সেই শব্দই। শেষ রাতের কার্তিক মাসের ক্ষুধার্ত খাবার অন্বেষণের কুকুর এর মধ্যে খাদ্য সমস্যর সমাধান হতে পারে মনে করে নড়ে-চড়ে ওঠে। ‘সে’ বুঝে ফেলে শাড়ির শব্দে কুকুর ভুল বুঝতে পেরেছে, অতএব আগেই কুকুরটিকে উদ্দেশ্য করে বলে, এই যা মরার খিদা লাগা কুত্তা, দুইন্যার সব কিছুরেই খাওন মনে হরিসনা, তোর না খাইয়াই থাহা উচিত, যে কুত্তা হাড়ী কাফুর ছেড়ার শব্দ ও পাদের শব্দের তফাৎ বোঝেনা হ্যার না খাইয়াই থাহা উচিত। একথা বলবার সময় তার কণ্ঠে ও বলবার ভঙ্গিতে যেনো কুকুর পুরুষটির সঙ্গে এক ধরনের রসিকতা ছিল, তার দিক থেকে মনে করা হয় যেনো এইটুকু রসিকতা কোনো মানুষ নারীর কাছ থেকে পুরুষ কুকুরটি অর্জনই করেছে এবং হ্যাঁ কুকুরটি যে পুরুষ সে কথা তারও বেশ মনে ছিল।

এই যে শেষ রাতে পেশাব করতে গিয়ে তার শাড়িখানা ছিঁড়ে যায় তাতে তার যে পরিমাণ মন খারাপ হওয়ার কথা তা হয় না, তার কারণ যে সকাল অর্থাৎ ভোর রাতে তার শাড়ি ছেঁড়ে সেই দিনটিতেই তার আর একখানি নতুন শাড়ি পাওয়ার কথা, অতএব যুক্তি সঙ্গত কারণেই তার মন খারাপ হয় না, বরং তার কাছে ঘটনাটি এক ধরনের মজারই মনে হয় যে, যেদিন তার শাড়ি খানা এমন ভাবে ছিঁড়ল সেদিনই তার আর একখানা শাড়ি হবে। এবং সে এভাবেই ভেবে দ্যাখে যে সেটা একটা ভাগ্যেরই বিষয় বটে; তবে তার এই ভাগ্য বয়ে নিয়ে আসে সামনের সংসদ নির্বাচন, এবং সেই নির্বাচনের আগের ঈদের ঘটনা। দীর্ঘদিন রোজা বা উপবাসের পরের ঈদ। অবশ্য তাতে অন্তত তার কিছু যায় আসে না, কেনোনা ধর্মীয় উদ্যাপনের যে সামর্থ একজনের থাকা উচিত তা তার নাই অর্থাৎ সুবেহ্ সাদেকের আগে পেট ভরে খেয়ে নেওয়া এবং সূর্যাস্তের পর আবার অনুরূপ খাওয়া, এই দুটোর একটি বেলায়ও তার পক্ষে সম্ভব হয় না মহামানবের নির্দেশিত বা অনুসরিত পথ অবলম্বন করা, অতএব তার সেই সব নিয়ম মেনে চলবার প্রশ্নই ওঠে না। তার ক্ষেত্রে সে সব না করা হলেও কখনো কখনো প্রত্যক্ষ কী পরোক্ষ তার লাভ হয়ে থাকে। শোনা যায় কোনো একজন সংসদ সদস্য প্রার্থী মন্ত্রী-প্রধান পুত্রের আশীর্বাদ কিনেছেন, সেই নগদে কেনা আশীর্বাদের অর্থ নাকি সংসদ সদস্য পদের নিশ্চিতকরণ। তারপরও নাকি তিনি অর্থাৎ মন্ত্রী প্রধান-পুত্র-যুবক চান তার পারিষদ এলাকায় দাতা হিসেবেই চিহ্নিত হোক নিঃস্বদের মাঝে, যদিও নাকি প্রার্থী ‘দাতা কি অদাতা’ তার কোনো প্রভাব নির্বাচনে নেই। নির্বাচনের ফলাফল নাকি আগেই হয়ে গেছে। তাতে তার কিছু যায় আসে না। তার যা কিছু যায় আসে তা হলো- একখানা শাড়ি, যা সে ওইদিনই পাবে, যেদিন কিনা খুব সকালে সূর্য ওঠার আগে শেষবারের মত আর না পরবার অবস্থায় তার একমাত্র শাড়ি খানা আর একবার ছিঁড়েছে। যখন কিনা একটি পুরুষ কুকুরের জন্যে সে লজ্জায় গোলাপী হয়েছিল, তা হোক সে পশু প্রজাতির পুরুষ।

সুতরাং ‘সে’ অর্থাৎ ‘শালিক’ অর্থাৎ এখনকার আলোচিত নারী যার নাম আমাদের এখনই জানা হলো যে তার নাম রাখা হয়েছে ওই গ্রামীণ বড় নিরীহ গানের পাখির নামে। সেই শালিক তখন পেশাব করবার পর ছেঁড়া শাড়ি নিয়ে আবার ফিরে যায় ঘুমাতে তার বিছানায়, বিছানা কী হোগোলপাতার পাটি, যদিও তার আর ঘুম হয় না সেই উত্তেজনায় যে একটু পরে সূর্য উঠলে যে দিন হবে সেই দিনেই তার একখানি নতুন শাড়ি হতে যাচ্ছে। উত্তেজনাই বা কেনো হবে না? এমন কি কোনো বাঙালি নারী পাওয়া যাবে যার কাছে শাড়ি একটি বিষয় ও উত্তেজনা নয়? শালিকই বা তার বাইরে হবে কেনো? যদিও এক্ষেত্রে অর্থাৎ শালিকের ক্ষেত্রে একটু বেক্ষাপ্যা মনে হওয়া স্বভাবিক কেনোনা শালিকের জন্য বাঙালি হিসেবে শাড়ি ভালবাসার চাইতেও তার পুরো দেহটি ঢাকবার প্রয়োজনীয়তা থেকে একটি শাড়ি প্রত্যাশা বড় হয়ে ওঠে। যা কিনা সমাজেরই আবার চাহিদা ও নিয়ম বলে জ্ঞাত, সমাজের এই চাহিদার আবার অর্থ কিনা- বিশাল একটি কাপড়ে মুড়িয়ে বা জড়িয়ে ফেলা, যা আবার কিনা শালিকদের সংস্কৃতিরও অংশ বলে অনুপ্রাণিত। এবং ওই বৃহৎ আকারের একটুকরা কাপড়খানার নামই কিনা শাড়ি বা যে কাপড় খানাকেই বলা হয়ে থাকে শাড়ি। প্রতিদিনের চাইতে আরো সকালে সে উঠে যায়, যেটা আজকের ক্ষেত্রে তার জন্য খুবই স্বাভাবিক। তাকে ক’ মাইল পথ হেঁটে যেতে হবে যেখানে প্রার্থী নিজ হাতে বিতরণ করবেন গরীব নারীদের মধ্যে শাড়ি। সেই অঞ্চলের শুক্রবারের জুম্মার নামাজ আদায়ের জন্য যে আলাদা ‘ময়দান’ নামের জায়গা সেখানেই নির্ধারিত হয় বাদ-জুম্মা শাড়ি বিতরণ হবে। শালিক ও তার সেই সঙ্গী ওই ময়দান নামক জুম্মা আদায়ের স্থানে চলে আসে যখন কিনা তখনো শুক্রবারের নামাজ চলছে, সঙ্গত কারণেই ময়দানের পাশেই অন্যান্যদের মত তাদের অবস্থান নিতে হয়। তারা শোনে অনেক কথাই ইমাম বলছেন- শুক্রবার হচ্ছে সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত তার বান্দাদের প্রতি একটি বিশেষ উপহার। এই রকম অনেক কাহিনি ও গল্প ইমাম খুদবা পাঠের পর বলেন যার কিছুটা শালিক শোনে কিছুটা শোনে না বা শুনে বোঝে না, কিছুটা বোঝে পুরোটা বোঝার ভান করে অন্যান্যদের মতই, এবং শুনে মাথা দুলিয়ে এমন ভাব করে যে ওইসব কাহিনি ও বয়ানের প্রতি যেনো তার খুবই গভীর মনোযোগ।

একই কারনে অর্থাৎ ইলেকশন ও ঈদ উপলক্ষে মন্ত্রী-প্রধানও সৌদি আরব যান, মক্কাতে বিশেষ হজ পালন করেন, এবং তার এই যে ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের তৎপরতা তা দেশ ও জাতি বাধ্য হয়ে নানা ভাবে দেখতে ও শুনতে পায়। আহা! প্রধানের ধর্ম পালন, ধর্মের মাধ্যমে প্রজাসম ভাই-বেরাদানদের প্রতি তারও যে কি পরিমাণ ‘ইয়ে’ ! এসব তো থাকছেই আরো থাকছে প্রায় সৃষ্টি কর্তার বন্ধু দাবিদার সৌদি বাদশার আশীর্বাদও।

এরপর এইভাবে- ওটা একইদিন হবে যেদিন মন্ত্রী-প্রধান ফিরেছেন হজের মাধ্যমে খোদ সৃষ্টিকর্তার ও সৌদি বাদশার বিশেষ আশীর্বাদ নিয়ে। সে আশির্বাদ কেবল নিজের জন্য বা তার পরিবার বা গোষ্ঠি ও দলের জন্য নয়, সে আশির্বাদ নাকি পুরো জাতির জন্য। কেনোনা তিনি অতটা স্বার্থপর নন বলেই সবাই যেমন জানেন আমারাও জানি। জাতি তেমনটিই জানে রেডিও-টেলিভিশনের মাধ্যমে যে মক্কা থেকে সর্ব শক্তিমানের কৃপা তিনি নিয়ে ফিরেছেন। বিশেষ বিমান সৌদি আরব থেকে এসে ঢাকা আন্তর্জাতিকে ভেড়ে। তিনি বিমান থেকে নামেন। পরিষ্কার আকাশের রোদ উজ্জ্বল দিনের ওই আলোতে তার পরনের শাড়ি বেশ পরিমাণ উসকানীমূলক। অতএব হ্যা তার শাড়িও বাতাসের উল্টা দিকে ওড়ে, কাব্যিক উপমায় সেই শাড়ি ওড়াকে কোনো কবি চাইলে মনের মত বর্ণনা করতে পারেন। তিনি যাচ্ছিলেন তার মন্ত্রীসভার সদস্যদের দিকে যেখানে তারা সব ‘আধুনিক দাস’দের মত দাঁড়িয়েছিলেন অথবা অভিজাত রেশনিং লাইনের লোকজনের মত, অথবা মাফিয়া সদস্যরা যেভাবে অপেক্ষা করে বসকে রিপোর্ট করবার জন্যে তেমন করে দাঁড়ানো। এর কোনোটাই সম্পূর্ণ নিশ্চিত করা যাবে না তাদের দাঁড়ানোর ভঙ্গিটি ঠিক উপরোলে−খিত কোনরকম ছিল তবে এইটুকু নিশ্চিত যে আমাদের ‘শালিকের’ সঙ্গে যতটুকু বিশ্বস্ততা কুকুরটির ছিল তা এখানে নেই।

তো আমাদের ‘সে’ নিউইয়র্কের বাসায় স্যাটেলাইট টেলিভিশনে বাংলাদেশ থেকে পরিবেশিত সংবাদ দেখছিল, সেই সংবাদেই বলা হয় দেশের দুটো অংশের কথা যার একটি ময়মনসিংএর ‘মুক্তাগাছা’ অপরটি পটুয়াখালীর ‘হতভাগী’। দু’জায়গাতেই সরকার মনোনীত প্রার্থীর বিতরণ করা শাড়ি নিতে এসে যথাক্রমে নয় জন ও পনের জন মহিলা একই ভাবে শাড়ি নিতে আসা অপরাপর মহিলাদের ভিড়ে এবং তাদের পায়ের তলায় পিষ্ট হয়ে প্রাণ হারায় অর্থাৎ তাদের ভাষ্যমতে- ‘আল−ার মাল আল−ায় নিয়ে নেয়’। ‘শালিক’, নামের যার সম্পর্কে আমরা একটু আগেই কথা বললাম যে সামান্য হলেও একটু আগ্রহ, একটু ভালবাসা, একটু আদর পায় বলে তার মনে হয় কার্তিক মাসের প্রজনন কাতর ক্ষুধার্ত কুকুর থেকে একজন নারী হিসেবে, যদিও প্রশ্ন থাকে এখানে তাকে নারীর যাবতীয় সংজ্ঞার আওতাভূক্ত করা যাবে কি যাবে না। সেই ‘শালিক’ও তাদের মধ্যে একজন ‘হতভাগী’ ওই হতভাগী গ্রামে যারা পায়ের তলায় পিষ্ট হয়ে ‘আল−ার ফিরতি মালে’ পরিণত হয় অর্থাৎ প্রাণ হারায় এবং আমারা জানতে পারি তার এই ‘আল−ার ফিরতি মালে’ পরিণত হওয়ার মধ্যদিয়ে একটি ক্ষুধার্ত ও ক্ষুধাময় জীবনের অবসান ঘটে। টেলিভিশন এই সংবাদ পরিবেশনের সময় সংবাদ পাঠক মন্ত্রী প্রধানের দপ্তরের বরাতে একটি প্রেস রিলিজও পাঠ করেন যেখানে বলা হয় তিনি অর্থাৎ আমাদের মন্ত্রী-প্রধান ওই ঘটনায় খুবই শোকাহত। ওই প্রেস রিলিজ পাঠের সময় টেলিভিশন মন্ত্রী-প্রধানের যে চিত্র দেখাচ্ছিল তাতে দেখা যায় তার পরনের বিশেষ ভাবে নির্মিত গোলাপী রঙের জর্জেটের আঁচলটি বিমানের দিকে উড়ছে। মনে হয় বিমানটিকে যেন তার শাড়ির গোলাপী আঁচলে ঢেকে দিতে চাচ্ছে এভাবে যেনো বিমান ঢেকে যায় তারপর সবকিছুই ওই আঁচল ঢেকে দেয় যেন পুরো দেশ অতপর।






লেখক পরিচিতি
 আনোয়ার শাহাদাত

জন্ম বরিশালে। কৃষক পরিবারে।
গল্পগ্রন্থ : ক্যানভেসার গল্পকার, পেলেকার লুঙ্গী।
উপন্যাস  : সাঁজোয়া তলে মুরগা।
চলচ্চিত্র : কারিগর। 

শর্ট ফিল্ম : ন্যানী।
দীর্ঘদিন নিউ ইয়র্কে থাকেন। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন