রবিবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০১৩

সন্ধিক্ষণের যাত্রী

জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত

লে আসার সময় আবার তাকিয়ে পেছনের দৃশ্যাবলি হৃদয়ে তুলে নিতে হয়। যেন কখনও ঝাপসা হয়ে না যায়। প্রিয়জনের সাশ্রুবিদায়, বন্ধুর শেষ আলিঙ্গন, পরিচিতজনের মুখে শুভেচ্ছার স্মিত হাসি, সব মনে আছে। মাত্র ক'টি বছর দেখতে না দেখতে কেটে যাবে-- চিরকালের এই সান্ত্বনা মনে প্রবল না হলে মূল ছিঁড়ে চলে আসা কত কষ্টের সেদিন সে আরও ভালো বুঝত।


কিন্তু উত্তেজনাও ছিল-- আশার, স্বপ্নের, অজানার, আদর্শের। কৈশোর ও যৌবনের সমাজ-কল্যাণচিন্তা মনে প্রবল ছিল। আহরিত জ্ঞান স্বার্থসেবী হবে না-- এই বোধ তীব্র ছিল। তাই সে ভেবেছিল ফিরে আসা অনিবার্য। সে আজ চার যুগ আগের কথা। চলে আসার অনুমতি পেতে সময় লেগেছিল তিন বছর। কত জন, কত দফতর, কত জিজ্ঞাসার জবাব। সে সবের তিক্ততা এখন প্রায় তিরোহিত। যাদের শাসনে প্রাগযৌবনের প্রিয় শহর ছাড়তে হয়েছিল তাদের কথা এখন যেন মনেই পড়ে না। যাদের নির্দেশে যোগ্য চাকরি থেকে বঞ্চিত ছিল, তাদের প্রতি কোনো বিতৃষ্ণাও আর নেই।
ধূলিমুঠি তার হাতে সোনামুঠি হয়নি। অতি পরিশ্রম এবং ব্যয়সংকোচের সমাহারে সঞ্চয়ী অর্থবানও সে নয়। তাই ইচ্ছা করলেও লোকবিশ্রুত দানবীর সে হতে পারবে না।

প্রবল প্রতাপী পরিবারে তার জন্ম নয়। নিজেও কখনও প্রতাপী হতে পারেনি। লোকমুখে তার নাম কখনও শোনা যাবে না। তবুও সে জানে করণীয় কিছু ছিল। অজ্ঞানে, জ্ঞানে, সেই করণীয় থেকে সে দূরে রয়ে গেছে। তাই কখনও আত্মধিক্কারের মূঢ়তাকে সে অস্বীকার করতে পারে না।

অবশ্য সাফল্যে স্ফীতগর্বী অনেককেই তো সে দেখেছে। যাদের হাতে ধূলিমুঠি সোনামুঠি হয়েছে, অঙ্গুলিহেলনে যাঁরা অসাধ্য সাধন করেন বলে শোনা যায়, তাঁরা তো দিব্যানন্দেই আছেন। এমন কিছু দানসাগরও কেউ কাটেননি। তারা নিজেদের কশাঘাতেও জর্জরিত করেন না। সব-ই সে জানে তবুও নিজেকে সে অক্ষম মনে না করে পারে না।
ফেলে আসা দৃশ্যাবলি কত স্পষ্ট। স্কুলের শেষ ক্লাসে প্রিয় শিক্ষক একদিন সতীর্থদের সামনে তাকে যে শারীরিক নির্যাতন করেছিলেন্ত- দীর্ঘকাল সে তার কোনো অর্থ খুঁজে পায়নি। অপরাধ ছিল নিশ্চয়ই। কৈশোরের চপলতা তখনও ত্যাগ করেনি। তবুও ক্লাসের অন্য কোণে বসা বন্ধুর সঙ্গে হাসি বিনিময়ের ওই শাস্তি তাকে স্তম্ভিত করেছিল। ভাববার চেষ্টা করেছিল আসল অপরাধ কোথায়।

কিছুকাল আগে তারা ক'জন এক সজ্জন প্রতিবেশীর ফেলে রাখা একটি ঘরে নিজেদের সমিতির অফিস করেছিল। প্রাথমিক কয়েক সপ্তাহের উৎসাহ-ই সম্ভবত তাকে প্ররোচিত করেছিল দেয়ালে তাদের আদর্শ ব্যক্তিদের প্রতিকৃতি ঝুলিয়ে দেওয়ায়। ওইসব ব্যক্তি শাসকদের প্রিয় নন তারা জানত, তবুও ওই সজ্জন প্রতিবেশী যে তাদের চলে যেতে বলবেন মাত্র কয়েক দিন পরেই সে বুঝতে পারেনি। আসল অপরাধ কি সেখানেই ছিল?

কিন্তু তার দু'বছর পরে গোপনে শহর ছেড়ে চলে আসার আগের রাত্রি যে বন্ধুর বাসায় কেটেছিল, সেই বন্ধুর পিতাই ছিলেন সেই প্রিয়, অত্যাচারী শিক্ষক। তিনি ভোরের আঁধারে তাকে স্টেশনে পেঁৗছে দিয়ে গিয়েছিলেন। প্রায় অস্ফুটস্বরে তাকে বলেছিলেন, কালো পতাকা হাতে বাইরে ছুটে যাওয়ার কী প্রচণ্ড লোভ তিনি সামলিয়েছেন ১৯৫৮ সেই কালরাত্রিতে। সে বুঝেছিল হাসি বিনিময় নয়, ঘরের দেয়ালে নিষিদ্ধ ব্যক্তিবর্গের ছবি টাঙানো নয়-- এসব কোনো অপরাধই ছিল না। ক্রোধের কারণ অন্য কিছু, অন্য কোথায়ও।

ক্ষীয়মাণ ফেব্রুয়ারির সেসব ভোর, খালি পায়ে সারা শহর ঘুরে বেড়ানো, ফুলের স্তূপ, সব সেই দৃশ্যাবলিতে আছে। অযুত মানুষের সমাবেশে সেই শ্বেতশ্মশ্রু বর্ষীয়ান, বজ্রকণ্ঠী পুরুষের মুক্তিমিছিল সব-ই সেই দৃশ্যাবলির অঙ্গ। অতি সাবধানে, বাতাসের সঙ্গে যুদ্ধরত প্রদীপ শিখাটিকে বাঁচানোর মতো করে সেসব দৃশ্যাবলিকে হৃদয়ে ধরে রাখতে হয়। ভয় ছিল, যদি কখনও জুলাইয়ের আতসবাজির হাজারো রঙে ক্ষীয়মাণ ফেব্রুয়ারির সেই ভোর হারিয়ে যায়। আত্মজার সন্তুষ্টির জন্য ডিসেম্বরে বাতির মালা ঝোলাতে ঝোলাতে সে তাকে আর এক ডিসেম্বরের গল্প শোনায়। নানা বর্ণের আলোয় আত্মহারা তনয়া কস্ফচিৎ গল্পে মন দিলে প্রচণ্ড ক্রোধে হাতের মুঠি বন্ধ হয়ে আসে আর তখনই অকস্মাৎ বিদ্যুদ্দীপ্তির মতো দীর্ঘকাল পরে প্রিয় শিক্ষকের ক্রোধের কারণ সে বুঝেছিল, অক্ষম আক্রোশ প্রিয়জন ছাড়া আর কার ওপর প্রকাশ করা যায়?

ফেলে আসা দৃশ্যে সব বর্ণই ক্রমে ঝাপসা হয়ে যায়। তাই বারবার পেছনে তাকিয়ে সেসব দৃশ্যকে যত্নে হৃদয়ে তুলে রাখে সে। ক্ষীণ একটি প্রদীপের শিখাকে কোনো মতেই যেন অন্যায়ী বাতাস নিভিয়ে না দেয়।

দুই
মাঝে মধ্যেই নিজের প্রকৃত পরিচয় নিজের কাছে অস্পষ্ট মনে হয়। সে কখনও অন্যায়ী নয়, অথচ অন্যায়ের প্রতিবাদে চিরকাল সোচ্চার এমন কথা হলফ করে বলতে পারবে না। সে মিথ্যাবাদী নয়, কিন্তু সত্যের খাতিরে জীবন বিসর্জন দেওয়ার মতো প্রতিজ্ঞাও নেই। সে অপরের অনিষ্ট কামনা করে না, যদিও অসৎ দুর্জনের ক্ষতিতে অশ্রুপাতেও ব্যস্ত নয়। সে আসলে কী?

চলে আসার সময়ে সত্যি সত্যিই কেউ তাকে বলেননি জন্মভূমির সম্মান তোমার হাতে, তুমিও একজন রাষ্ট্রদূত। ফিরে যাওয়ার সময়ও কেউ তাকে আদর করে ঘরে তুলে নেবে না, সে জানে।
আত্মকণ্ডুয়ন নয়, আত্মপ্রতারণা নয়, এ এক বিবশ, দিশাহীন দিনাতিপাত।

বিভিন্ন সামাজিক উপলক্ষে একত্রিত সুবেশ পুরুষ ও সুসজ্জিতা সালংকারা নারীবৃন্দের আলাপ-আলোচনা, পারস্পরিক ঐশ্বর্য-আধিপত্যের বিবরণ বিনিময় ইত্যাদি থেকেও দূরে থাকা হয় না তার। হাসিমুখে অগাধ অর্থ বা অমিত প্রতিপত্তিশালীর করমর্দনে অনাগ্রহীও সে নয়। আত্মপ্রসাদ নয়, আত্মধিক্কার নয়, সর্বব্যাপী নিবুর্দ্ধিতার গ্রাস থেকে সে কোনোমতে নিজেকে রক্ষা করতে পারে না। অন্ধকার আর আলোর মাঝখানে এক ধূসর অস্তিত্ব আছে, সেখানে কিছু ঘটে না, কিছু নেই। মনে হয় সে সেই আলো নয়, আঁধার নয়, অস্তিত্বের হাত ধরে বসে আছে।

বাল্যের সেসব পুরুষ ও নারীদের কথা মনে পড়ে। কত অনায়াসে তাঁরা ছুটে বেরিয়ে গেছেন ওই আলো-আঁধারি থেকে। মনে আছে, কলেজ থেকে ফেরার পথে একদিন অগ্রজপ্রতিম সতীর্থকে থানার ভেতর ঢুকে যেতে দেখেছিল। তাকে দেখে হাসিমুখে তিনি বলেছিলেন, 'আবার ধরে নিয়ে যাচ্ছে।' মনে আছে, মাত্র ছ'মাস আগে তিনি পাঁচ বছরের রুদ্ধাবাস থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন। মনে আছে দু'বছর পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষায় তিনি প্রথম চারজনের মধ্যে ছিলেন। আজ তিনি কোথায় সে ভালো করে জানেও না। সংবাদপত্রে তার নাম ছাপা হয় না। বড় আমলা তিনি কখনও হবেন না জানাই ছিল, তবে মন্ত্রী যে হতে চান না অনেক পরে বুঝেছিল।

পিতৃপ্রতিম প্রিয় অধ্যাপকের কথা মনে পড়ে। কত সহজেই না তিনি সমস্ত সুবেশা সালংকারা নারী, পদাধিকারী ক্ষমতা ইত্যাদিকে উপেক্ষা করে পরিণতির দিকে এগিয়ে চলেছিলেন। অযুতজনের ভীতি নয়, ভালোবাসা; সহস্রের কুর্নিশ নয়, শ্রদ্ধা পেয়েছিলেন তিনি জীবনের বিনিময়ে।

মাতৃতুল্য সেই নারীর কথা মনে পড়ে। রুদ্ধাবাস নিশ্চিত জেনেও পরপর তিন সন্তানকে তাদের বেছে নেওয়া পথ থেকে ফেরানোর চেষ্টা করেননি। আলো-আঁধারের যে কোনো দিকে চলে যাওয়া কতই না কাম্য! অথচ সে পারে না।
কেন এমন হয়? ভেবে দেখার চেষ্টা করেছে সে। আসলে কি এই সত্যি যে সন্ধিক্ষণের যাত্রীর গন্তব্যে পেঁৗছানোর কোনো উপায় নেই? যান নেই? বাহন নেই? আর এই কি সত্যি যে, তার মতো সন্ধিক্ষণের যাত্রীর কোনো গন্তব্য নেই?

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন