রবিবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০১৩

আমৃত্যু, আজীবন

জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত

অমন করে তাঁকে দেখা যাবে না। ওখান থেকেও নয়। বাড়ির সামনে পেছনে বুনো ঘাসের জাজিম। ফুলের কেয়ারি নেই, চওড়া ফিতের লনে চেয়ারটি পাতাই আছে, দিন্তেদুপুরে শীর্ণ পপলার কিছু ছায়াও দেয়। সেখানে বসাই যায়কিন্তু যত দূরেই যে থাকুক, চাই কি ওই মধ্যপশ্চিমের রুক্ষ প্রান্তর, পূর্বাঞ্চলের গাছ-পাহাড় কি সপ্তসাগরের পার থেকেও সবাই যদি চারপাশে ভিড় করে আসে, তবুও তাঁকে দেখতে পাবে না।


বড় জোর তারা দেখবে শ্বেতশ্মশ্রু শীর্ণকায় এক বর্ষীয়ান্তপরনে ঘরের পায়জামাটি আছে, বুঝি লম্বা পাঞ্জাবিও, দেখবে মাথায় আছে পুণ্যাত্মার শিরোচ্ছাদক, অথবা দেখবে কালো শেরওয়ানির নিচে কালো পলিয়েস্টারের প্যান্ট চাপানো। ঘরের সামনের মাঠটুকু পার হয়ে সফল সন্তানের পেছন তাঁর গাড়িতে উঠে যাচ্ছেন।

রাস্তাঘাট, দোকান কি শপিং মলেও তাঁকে কেউ চিনবে না। এসব ছোট শহরে যেমন হয়, পঞ্চাশ মাইল ব্যাসার্ধের মধ্যে একমাত্র চক্ষু চিকিৎসক, হোক না সে বিদেশি, তার পিতা, পোশাক যতই কৌতূহলোদ্দীপক হোক, সামনে পড়লে সম্ভাষণটুকু ডাক্তারের রোগীরা জানাবেই এবং এতে পুত্রগর্বে বক্ষ কিঞ্চিৎ স্ফীত হলেও, মুখে সুজনের হাসিটুকু ধরা থাকলেও, তাঁকে কেউ চিনবে না।

পৌত্র ক্বচিৎ কাছে আসে। 'লেটস প্লে বল' এই আহ্বানে সাড়া দেওয়ায় আগ্রহের অভাব এ জন্য নয়, অথবা মাঝে মাঝে সুযোগ পেলেই জায়নামাজে তাঁর পাশের জায়গাটিতে বসিয়ে রাখেন এ জন্যও নয়, কি পেছনের লনে সন্ধ্যার মুহূর্তে চুপ করে বসে থাকা মানুষটিকে তার ভয় হয় এ জন্যও নয়--সেও তাঁকে চেনে না।

পুত্রবধূ কখনো কাছে আসে, স্নানের কথা বলে, কি দুপুরে টেবিলে খাবার সাজিয়ে ডেকে নিয়ে যায়, কখনো সঙ্গে করে সপ্তাহের বাজার, কি মনোহারি দোকান, কি শহরের মাথায় নতুন ওয়ালগ্রিনের সুপারস্টোরেও নিয়ে যায়, দেখে প্রায় বাক্যহীন মানুষ যেন দিশেহারা। সে কেমন করে তাঁকে চিনবে?

নিজ সন্তান কি তাঁকে চেনে? না। ইস্টার্ন রেলওয়ের স্টেশনমাস্টার কী করে ডাক্তারি পাস করিয়ে পুত্রকে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন উচ্চশিক্ষার জন্য, কী করে বানিয়েছিলেন মগবাজার-বনানী-বারিধারায় বহুতল ফ্ল্যাটবাড়ি, এসব মামুলি ব্যাপার, কেউ লক্ষ করে না। সব দরজা যখন সবার কাছে বন্ধ তখন সব কাগজপত্র জোগাড় করে অক্লেশে সে প্লেনে উঠেছিল, এ তার জন্য বিস্ময় ছিল বৈকি, তবুও তাঁকে চেনার জন্য যথেষ্ট নয়। এসব বরং কৃতিত্ব, কি ক্ষমতা, কি পরিচিতি, কি মর্যাদা, কি সম্মানের চিহ্নই বহন করে।

প্রতিবেশী সজ্জনের চোখেও তাঁর এক রূপ ছিল। এই শহরের একমাত্র বক্ষব্যাধির চিকিৎসক এবং সেই সুবাদে পরিচিত এই কারণে নয়, কি ভিন্ন দেশের সমপেশাজীবী, সভ্যতাই সৌজন্য শেখায় এ জন্যও নয়--এই প্রতিবেশী এককালে ভিয়েতনামের সময়ে পথে নেমেছিল, উডস্টকের কাদায় আছাড় খেয়েছিল, জিমি হেনড্রিঙ্, জ্যানিস জপলিন, উডি গাথরির সুরে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য ছিল এবং বব ডিলানের কনসার্টে উঁচু হাতে তুলে ধরেছিল জ্বলন্ত দেশলাইয়ের কাঠি, এসবই কারণ হয়তো এবং এ জন্যই 'এ ভেরি পায়াস ম্যান' বলে স্মিত হাসির সঙ্গে 'গ্ল্যাড টু হ্যাভ মেট এ ম্যান লাইক হিম' বলা তার শোভা পায়। সে এমন মানুষ যে কিসিঞ্জারের গোপন চীন সফরের কথা জানত এবং এ জন্য 'নিঙ্ন টিলট'-এর ব্যাপারটিও তার কাছে রহস্যময় ছিল না। ব্যস্ত চিকিৎসক, কখনো গ্রীষ্মের প্রভাতভ্রমণে মুখোমুখি হলে তাই কেবল হাত নাড়িয়ে নয়, কাছে এসেও স্মিত হাসির সঙ্গে হাত মেলাত।

আরো একটি ব্যাপার ঘটেছিল। এখানে আসার পরপরই। শহরের শেষ মাথায় ঢেউখেলানো গাছগাছালির জমি। সুবিন্যস্ত চারপাশে ছড়ানো আঙিনায় নতুন বাড়িঘর। পড়শি কারা জানা ছিল না। এই বাড়ির সীমানার শেষে ওই বাড়ির সীমানা পেরিয়ে শোবার ঘর আর কতই বা দূর। তবুও প্রভাত উপাসনার আহ্বান, গ্রীষ্মের জন্য জানালা খোলা ছিল বলেই যে ওই গৃহস্বামীর ঘুম ভাঙাবে তা কেউ বোঝেনি। পুণ্যের শরিক হোক সবাই, ওই শিশুটিও এমন চিন্তা যদি থাকেই তাহলে ওই প্রায়ান্ধকার প্রভাতে সবাইকে ডেকে তুলে উপাসনায় বসা যায়ই তো। তবুও সকালে পরিচিত হওয়ার জন্যই প্রতিবেশী এসেছিল এবং নানা কথার মধ্যে ভোরের শব্দের কথাও উঠেছিল। কিন্তু সব শুনে, তাদের পরিচয়, তাদের জন্মভূমির কথা জেনে নিক্সন-কিসিঞ্জার, জ্যাক অ্যান্ডারসন সবই তার মনে পড়ে যায় এবং কেবল জানালা বন্ধ রাখার অনুরোধেই ওই সৌজন্য সাক্ষাৎ শেষ হয়েছিল।
না, তারও তাঁকে চেনার কোনো উপায় ছিল না।
পবিত্র ভূমি থেকে ফিরে অমন হয়েছে তাঁর। শরীরে ক্লান্তি, হরিদ্রাভ চোখ, সারা শরীরে গরমের হলকা যেন, গ্রীষ্মের মাস ক'টি এখনো আসেনি যদিও।

ঘরে একা পায়চারি করে বেড়ান। সকালে চিকিৎসক পুত্র যখন তার গাড়িটি নিয়ে বেরিয়ে যায়, তখন যেমন শোনেন সবই, সন্তান দুটিকে ধুয়ে মুছে স্কুলে নিয়ে যায় পুত্রবধূ, তা-ও জানেন। ঘর থেকে বেরোতে চান না। ফজরের আজানের শব্দ বাড়ির বাইরে যায় না আর, জানালা খোলা থাকলেও।

অবশ্য কিছুদিন আগে গাড়ি চালানো শেখার কথা মনে এসেছিল। পরনির্ভরতা গ্লানি দিচ্ছিল এ জন্য নয়, এমন কোনো দূরের যাওয়ার কথাও আসে না, কেবল কিছু করা চাই এই জন্যই বোধ হয়, হয়তো নিজের সম্মান কিছু বাড়ত, এই জন্যই। বই খুলে চালানোর কিছু নিয়মকানুন এখনো মাঝে মাঝে পড়েন। পরীক্ষা দেওয়ার জন্য একবার গেছিলেনও; কিন্তু পরীক্ষা দেওয়া হয়নি।

আর কিছু করার থাকে না। তিন মহলা তিনটি বাড়ির মালিক। সুষ্ঠু ব্যবস্থায় নিয়মিত ভাড়া জমা হয়ে যায়। কনিষ্ঠ পুত্রটিই সব দেখে। ঠিকাদারির ব্যবসাটিতে বসিয়েছিলেন তাকে, আজও টিকে আছে। ব্যবসার সুবাদে সে বার দু-তিন এ দেশ ঘুরেও গেছে সপরিবারে। ভেবে দেখলে, এই দূর দেশে, বড় ছেলের কাছে না আসাই ঠিক ছিল তাঁর; কিন্তু সে কথা কেউ মুখে আনে না।

কখনো কখনো আশপাশের শহরে বেড়াতে যায় সবাই। স্বদেশের মানুষ, যেতে বাধা কি, এই মনে করে; কিন্তু বয়স্কের সঙ্গে সবাই স্বচ্ছন্দে কথা বলে না। তাই কিছু সময় কাগজপত্র নাড়াচাড়া করে কাটে। তারপরে নামাজের সময় হলে সবাইকে তাঁর সঙ্গে যোগ দিতে বলেন।
এই রকম। অনেকে বলে, এই বয়সে এমন জীবন বড় সুখের নয়। কেউ বলে দেশেই ভালো ছিল সব।
তারা কেউ কিছু জানে না।

তাঁর সম্মানেই এই আয়োজন। সম্পূর্ণ সুস্থ শরীর, তবে ঘুরেফিরে বেড়ানোর প্রয়োজন নেই, বসে লোকজনের সঙ্গে কথা বলা, খুব কষ্ট হবে না মনে করেই এই ব্যবস্থা। পাশাপাশি শহরের পরিচিতরা আসবেন। অঞ্চলের সবচেয়ে বড় ইউনিভার্সিটিও পাশেই। দেশের অনেক ছাত্র-শিক্ষক আছেন যেখানে তাঁদেরও অনেকে আসবেন। অনেকবার বলায় সজ্জন্তপ্রতিবেশীও আসতে রাজি হয়েছেন। বিপারটি যদিও তাঁর পকেটেই থাকবে। জরুরি রোগীর ডাক এলে যেতে হবে, এ কথা জানাই আছে।

সাদা পায়জামা, সিল্কের পাঞ্জাবি পরা তাঁর কারুকাজ করা টুপিটিও সুন্দর। তীর্থভ্রমণের স্মৃতি। হাওয়ায় শেষ শীতের রেশটুকু আছে বলেই লনে চেয়ার পাতার ব্যবস্থা করা যায়নি; কিন্তু ভেতরেই বসার দুটি ঘরে এত জায়গা যে লোক সংকুলান হবে কি না এই চিন্তা কারো মনে স্থান পায়নি। তবে এত লোকের সমাগমে তাঁর কিছু অস্বস্তি তো ছিলই। আপত্তিও ছিল; কিন্তু অনেককাল কাউকে ডাকা হয়নি, তিনিও ফিরিয়েছেন্ত-এসব ভেবে ছেলে তাঁর আপত্তি শোনেনি।
নারী-পুরুষ এবং তাদের পুত্র-কন্যা মিলিয়ে জনা ত্রিশ নিশ্চয়ই। দেশের নামি পণ্ডিত, স্বল্পকালীন অধ্যাপনার জন্য এখন এই বিশ্ববিদ্যালয়েই, তিনি এসেছেন, কৃতী ছাত্র আছে কয়েকজন, এসেছে উচ্চশিক্ষার জন্য, কয়েকজন গবেষক, দু-তিনজন হাসপাতালের চিকিৎসকও--সবাই এসেছেন।

দুই ঘরে ছড়িয়েই ছিলেন সবাই। কেউ দাঁড়ানো। কোকা কোলা, সেভেনআপ বা অরেঞ্জ জুস যার যেমন পছন্দ পানীয়ের গ্লাস হাতে, নানা রকম রুচি ফেরানোর খাবার। মূল ঘরটিতেই তাঁর চেয়ারটি। দু'একবার উঠে একটু ঘুরে আবার এসে বসেছেন। অধ্যাপকের সঙ্গে কিছু কথাবার্তাও বলেন মাঝে মাঝে। সদ্য দেশ থেকে উচ্চশিক্ষার জন্য আসা ছাত্রটিকে তাঁর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হলো। সে স্মিত মুখে সামনে এসে কী মনে করে কয়েক মুহূর্ত দাঁড়াল তারপরে ফিরে ঘরের কোনায় গিয়ে স্থির হলো।

ঠিক সেই সময়ই প্রতিবেশী সস্ত্রীক এসে ঢুকলেন। গৃহস্বামী হাসিমুখে সামনে এগিয়ে আসে, তার স্ত্রীও, মাথায় কাপড় তোলা, অন্য কয়েকজনও এগিয়ে আসে। অধ্যাপকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। 'সো নাইস, সো মেনি অব ইউ আই ডিড নট নো', বলে প্রতিবেশী নিজে থেকে এগিয়ে এসে কথাবার্তা শুরু করেন। বেঙ্গলি অ্যাপেটাইজার মুখে দিয়ে 'দে রিমাইন্ড মি অব মাই কলেজ ডেজ' বলে হারিয়ে যাওয়া বাঙালি বন্ধুটির সঙ্গে গল্প করতে থাকেন তিনি।

কথাবার্তায়, আলোয় হার্দ্য পরিবেশ গড়ে ওঠে। খাবার দেওয়া হবে কি না এ রকম চিন্তায় গৃহকর্ত্রী একবার সবাইকে দেখেও যায়, আর এ রকম ঘোরাফেরার মধ্যে নতুন ছাত্রটি অধ্যাপকের পাশাপাশি চলে আসে এবং নিচুস্বরে 'আপনাকে যা বলেছি, ঠিকই, ভুল নয়' এই কথা সে বললেও অন্য কারো কানে যায় না। তার কথা 'আমি চিনেছি, লিস্টেও নাম আছে,' শুনে অধ্যাপক ভ্রূকুঞ্চিত করেন। তখন সে সবে অন্য ঘরে ঢুকে গিয়ে আরো দু-তিনজনের সঙ্গেও নিচু গলায় কথা বলে। এমন সময় গৃহকর্ত্রী 'ডিনার ইজ সার্ভড' বলবে যখন, তখন তার স্বামী একটু জোরেই 'মাই ফাদার ইজ নট ফিলিং ওয়েল' বলে ওঠে, 'বাট হি জাস্ট রিটার্নড ফ্রম এ পিলগ্রিমেজ অ্যান্ড হি ওয়ানটেড টু মিট ইউ অল।' তার কথা শেষ হতেই প্রতিবেশী 'অ্যান্ড উই আর গ্ল্যাড টু মিট হিম' বলে তাঁর দিকে সশ্রদ্ধ দৃষ্টিতে তাকান।

মহিমান্বিত তাঁর মুখ উজ্জ্বল। যেন ওই মুহূর্তে শারীরিক অস্বাচ্ছন্দ্যও তাঁকে ছেড়ে যায়, 'থ্যাংক ইউ, থ্যাংক ইউ সো মাচ' নিচু স্বরেই বললেন তিনি। ইতিমধ্যে তাঁর মহিমান্বিত রূপ পুত্রবধূকেও স্পর্শ করেছিল এবং সে দেয়ালের সাজানো শেলফ থেকে ছবির একটি অ্যালবাম নিয়ে এসে প্রতিবেশীর হাতে তুলে দেয়। 'হিজ পিকচার্স, অল দ্য থিংস হি ডি,' হাসি মুখে বলে সে।

অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে ছবিগুলো দেখতে থাকেন প্রতিবেশী। আরো কয়েকজন এসে দাঁড়ায় তাঁর পাশে। অতি দ্রুত সেই ছাত্রটি ও তার দুই বন্ধু 'দেখি, দেখি' বলে কাছে আসতে চায়।

একটি তিনমহলা বাড়ির ছবিও ছিল, তিনি সামনে দাঁড়ানো। নিচের তলায় দোকানপাট, সাইনবোর্ডে নাম লেখা পড়া যায়। দেখেই ছাত্রটি 'মগবাজারে না?' প্রশ্ন করে। 'হ্যাঁ, আমাদের পুরনো বাড়ি', স্মিত মুখে জবাব দেয় গৃহস্বামী। ততক্ষণে পাতা উলটে প্রতিবেশী যে ছবিতে থেমেছেন, সেই ছবিতে পিতার সঙ্গে করমর্দনরত ব্যক্তিটিকে নির্দেশ করে গৃহস্বামী বলে, 'দিস ইজ দ্য গভর্নর, হিজ গুড ফ্রেন্ড।'

মনোযোগের সঙ্গে ছবিটিকে একটু দেখেন প্রতিবেশী, তার পরে তাঁর মুখ উজ্জ্বল হয়, যেন হঠাৎ কিছু মনে পড়ে যাওয়ার আনন্দ, হঠাৎ কিছু চিনে ফেলার আনন্দ, 'ওয়েট এ মিনিট, আই থিংক আই রিমেম্বার, আই থিংক আই নো হিম', বলেন তিনি। 'ইজ নট হি দি ম্যান হু ওয়াজ কিলড বাই এ গেরিলা ডিউরিং ইয়োর ওয়ার অব লিবারেশন?'
'
ইয়েস' দ্রুত দুপা পেছনে সরে যায় সেই ছাত্রটি 'এ ন্যাশনাল ডিসগ্রেস এ কোলাবরেটর, এ ট্রেইটর', উত্তেজিত স্বর তার।

মুহূর্তে হাত থেমে যায় তাঁর। ছবির অ্যালবাম থেকে সবার দৃষ্টি বক্তার মুখে পড়ে। যেন স্তম্ভিত সবাই, দু-একজন সরে যায়; কিন্তু এ দেশে নতুন, রীতিনীতি, ভব্যতা, আদবকায়দা, কৌশল, কূটনীতি কিছুই জানে না, বাঙালিরও রক্ত গরম হয়, ধ্রুব সত্যের চিন্তা তারও সঙ্গী হয়, এসব কারণেই সম্ভবত, কেউ কিছু বলে না। ছাত্রটি দরজার কাছে যায়, 'আমি চলে যাচ্ছি' বলে জুতো খুঁজতে থাকে সে।

দ্রুত গৃহস্বামী ছুটে আসে, 'এ কেমন কথা', আরো দু-চারজন এগিয়ে আসে। তাদের দিকে তাকিয়ে যুবক বলে, 'আপনারা থাকতে চান থাকুন। আমি একটা রাইট নিয়ে ক্যাম্পাসে ফিরে যাব।'
আর ঠিক সেই মুহূর্তে প্রতিবেশী চিকিৎসকের বিপার 'পিঁ পিঁ পিঁ' আওয়াজ করে ওঠে। যেন সংবিৎ ফিরে পান তিনি। কী ঘটছে, না বোঝার কোনো কারণ ছিল না তাঁর এবং টেলিফোনে খবর নিয়ে কর্তব্য স্থির করতে পারেন জেনেও তিনি অকস্মাৎ 'আই হ্যাভ টু গো' বলে হাতের অ্যালবামটি কফি টেবিলে রেখে দেন। যদিও তাঁর জানানোর কথা নয়। বারো বছরের বালকেরও সব মনে থাকে, প্রিয় অগ্রজের রক্তাক্ত মৃতদেহ আজও তার চোখে ভাসমান, নিজেদের ভাড়াবাড়ির মালিককে কখনো চোখে না দেখলেও সবুজ সাদা নিশান হাতে শান্তি মিছিলের সামনে পুণ্যাত্মার ছবি সে ভোলেনি।

পুত্রবধূ স্তব্ধ হয়ে বসে ছিল। এই কিছুক্ষণ আগে হাসপাতাল থেকে স্বামী টেলিফোন করেছিল, হাসপাতালে তিন সপ্তাহের ছোটাছুটি শেষ হয়েছে।

জানালা দিয়ে সে সামনে তাকানোর চেষ্টা করে। ছেলেমেয়ে দুটি তখনো ঘুমে। রাস্তা, গাছপালা সব এখনো নিজ নিজ চেহারায় স্পষ্ট নয়, মলিন আকাশের জন্যই চাপা কুয়াশার হালকা চাদর মাটির ওপরে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মনে হয়।
সে কিছু জানত না এমন নয়, পনেরো বছরের বিবাহিত জীবন তার। দেশেও গেছে দু'একবার। অনেক কথা তো সে জানেই। তবুও ভেবেছিল ওই সব তাকে স্পর্শ করবে না।

তখন তার স্বামীও প্রায় নিঃশব্দে শেষরাত্রির হাসপাতালের করিডর ধরে হেঁটে যাচ্ছে। পরিচিত নার্স, ডাক্তার নতমুখে তার পথ ছেড়ে দিচ্ছে।

সে এসে হাসপাতালের সামনে দাঁড়াল। সারারাত্রি প্রতীক্ষিত বৃষ্টি তখন শুরু হচ্ছে। ঘরে ফিরবে সে। নানা টেলিফোন, ফিউনারেল হোমের সঙ্গে যোগাযোগ পরিচিতদের খবর দেওয়া দরকার, কেউ কেউ তো আসবেই। মানুষই তো।
ভেবেছিল সময় সব দাগ মুছে দেবে। দিল না।

বৃষ্টি মাথায় সে গাড়ির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে এবং তখনই হঠাৎ তার কী মনে হয় গাড়ির কাছে অন্ধকারে মেপল গাছটির নিচে বসে পড়ে। দুই হাতে মুখ ঢাকে। না, পিতৃশোকে নয়। সে জানে মৃত্যু কিছুই নিল না।

ঘরে তার স্ত্রী আছে, দুটি পুত্রকন্যা আছে, দেশে কনিষ্ঠ ভ্রাতা আছে, আছে তার স্ত্রী, পুত্রকন্যা, পরিজন এবং তাদের সব পুত্রকন্যা, পরিজন। সবাই, সবাই এই অব্যক্ত ক্রন্দন, ক্রোধ গ্লানি, বুকে বয়ে বেড়াবে? কতকাল?

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন