রবিবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০১৩

যে আসে যে যায়-- গল্পে কবিতার রূপ

 তুহিন ওয়াদুদ

জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত প্রচলিত গল্পরচনার কৌশল পছন্দ করেন না। একদিকে রাজনৈতিক সমাজবাস্তবতা, অন্যদিকে প্রচলিত গল্পের ফর্ম সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব তাঁকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে। তাঁর গল্প নিয়ে নিরীক্ষাপ্রবণ স্বভাব জীবনের শুরুতেই বিকাশ লাভ করেছে। তাঁর প্রথম গল্পগ্রন্থ 'দুর্বিনীত কাল' (১৩৭২)-এর সব গল্পই কবিতা আর ছোটগল্পের মিশেল যেন।
কোনো কোনো গল্পে কাহিনীকে বিমূর্ত করে তোলা হয়েছে, আবার কোথাও যে সামান্য কাহিনী রয়েছে, তার চেয়ে অধিক গুরুত্ব লাভ করেছে তাঁর গল্পের ভাষাবিন্যাস, যে ভাষাবিন্যাস মূলত কবিতানুগ। তাঁর পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত 'সিতাংসু তোর সমস্ত কথা' (১৩৭৬), 'বহেনা সুবাতাস' (১৯৬৭), 'পুনরুদ্ধার' (১৯৮৯), 'উড়িয়ে নিয়ে যা কালমেঘ' (১৯৯২), 'ফিরে যাও জ্যোৎস্নায়' (১৯৯৭), 'প্লাবনভূমি'সহ (২০০০) সব ছোটগল্পের জন্য অখণ্ড সত্য।

'যে আসে যে যায়' ২০১২ সালে প্রকাশিত হলেও বিভিন্ন সময়ে রচিত হয়েছে তাঁর এ গ্রন্থের গল্পগুলো। গল্পগুলোর পরিসর ছোট ছোট। তবে প্রতিটি গল্পেই একই সঙ্গে কবিতা ও গল্প। গ্রন্থের শুরুতেই গল্পকার 'না গল্প না কবিতার কথা' শিরোনামে ভূমিকায় লিখেছেন, 'গল্প ও কবিতার সীমানায় পারাপার করা যায় এমন কোনো রচনা আছে কি? সম্ভবত আছে--অন্তত আমার ভাবনায়, বহুকাল ধরেই। আর সেই ভাবনারই পথানুসারী এ গ্রন্থের রচনাগুলো। ব্যক্তিগত রচনাই। গল্পের হৃদয়ে যাদের মূল প্রোথিত, কবিতার আবেগ ও ব্যঞ্জনায় ঘন সনি্নবদ্ধ। সীমানার এপারে যদি বা গল্প, ওপারের দিকে মুখ ফেরালে মনে হবে কবিতা।'

'যে আসে যে যায়' গল্পগ্রন্থের প্রথম গল্প 'ক্ষীণ প্রদীপের শিখা' গল্পের মধ্যে গল্পকার যে বিষয় ধরে লিখেছেন তা তাঁর নিজের জীবনঘনিষ্ঠ। ১৯৬৯ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে যান উচ্চশিক্ষার জন্য। যাওয়ার সময় তিনি দেশে ফিরবেন-- এমনটি ছিল স্থির ভাবনা। কিন্তু যখন তিনি এ গল্প লিখেছেন, তখন তিনি দেশে ফেরেননি। দেশে ফিরতে পারেননি বলে তাঁর মনে এক ধরনের মনঃকষ্ট সৃষ্টি হয়। গল্পকার আলোচ্য গল্পের একমাত্র চরিত্রের স্মৃতিকাতরতা এবং লালন করা স্বপ্নের ম্রিয়মাণ আলোর যে জগৎ এ গল্পে তুলে ধরেছেন, তার ভেতর দিয়ে তিনি নিজেই উপস্থাপিত হয়েছেন। জন্মভূমিতে ফিরতে না পারার ব্যর্থতায় উৎসারিত উচ্চারণ--'ক্ষোভ, বিষাদ, ভিন্ন এক হতাশা এখন সঙ্গী।' তিনি ফিরবেন না আর কখনোই--এই সিদ্ধান্তও তাঁর নয়। জন্মভূমির প্রতি তিনি দায় এড়াতে পারেন না। জন্মভূমিতে তাঁর ফেরার স্বপ্নটুকুকেই তিনি বলেছেন ক্ষীণপ্রদীপের শিখা। জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত 'দুর্বিনীত কাল' গ্রন্থের মধ্যে 'পরত্মীয়, সাজানো ফুলের বাগান, একজন পুরুষ চাই' গল্পে যেভাবে সময়কে তুলে ধরেছেন, তেমনি 'ক্ষীণপ্রদীপের শিখা' গল্পেও।

'রাত্রিশেষেও থাকে অন্ধকার' গল্পে লেখক প্রতীকী অর্থে রাত্রি ব্যবহার করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় গল্পকারের ব্যক্তিগত জীবন কেটেছে আমেরিকায়। যুদ্ধকালীন যারা মাঠে ছিল না, যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে তারা যখন পুরস্কৃত হয়, তখন লেখক মর্মাহত হন। যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের জন্য তিনিসহ অনেকে মিলে আমেরিকা থেকে ঘুরে ঘুরে অনেকের কাছ থেকে সংগ্রহ করে পরিধেয় বস্ত্র দেশে পাঠিয়েছিলেন; কিন্তু সেই বস্ত্র যাদের কাছে পাঠানো হয়েছিল, তাদের কাছে পেঁৗছায়নি। তখন তাঁর কাছে মনে হয়, সব ভোরে পাখি ডাকে না এবং রাত্রি শেষেও অন্ধকার অনেক দীর্ঘস্থায়ী হয়। কারণ শোষণ-পীড়ন-বঞ্চনার অন্ধকারের বিরুদ্ধেই তো যুদ্ধ হয়েছিল। কিন্তু সেই যুদ্ধশেষেও যখন সোনালি দিন আসে না, তখন রাত্রিশেষেও অন্ধকার দীর্ঘ হওয়ার উপলব্ধিই লেখকচিত্তে দুঃখজনক সত্য হয়ে দেখা দেয়। লেখকের এই কাহিনী-বিন্যাস গল্পে রূপ লাভ করেছে কবিতার মতো করে। গল্প ও কবিতা উভয়েই যেন সারথি।

'যে আসে' এবং 'যে যায়' নামে দুটি গল্প আছে। গল্প দুটি মূলত বিদেশ থেকে যে আসে তার অনুভূতি, তাকে ঘিরে পরিচিতজনের যে অভিব্যক্তি এবং যে বিদেশে যায় তার যে রূপ অনুভূতি সৃষ্টি হয় তারই চিত্রায়ণ।

'আজ মন্বন্তর, কালও' গল্প প্রবাসজীবনের সঙ্গে স্বদেশি জীবনের চিত্রায়ণ। এখানে একজন প্রবাসী, যিনি দেশে ফিরেছেন, তাঁর স্মৃতিতে রাখা মন্বন্তরের সময়ের এক দুঃসহ বেদনাঘন ঘটনাকে ভুলতে না পারার কথা উঠে এসেছে।
'ফেরবার শেষ', 'ট্রেন ঝরাপাতার মালা', 'যদি কেউ ফেরে' প্রভৃতি গল্পের উপজীব্য হচ্ছে স্বদেশ-বিদেশ সমাচার। গ্রন্থের ভূমিকায় তিনি বলেছেন, নিজ দেশ কখনো দূরদেশ, কখনো বা দূরদেশ তাঁর কাছে স্বদেশ। গল্পগুলোর শিরায় শিরায় সেই স্বদেশ-বিদেশই ধ্বনিত হয়েছে।

আত্মজৈবনিক রচনা হলেও জ্যোতিপ্রকাশ দত্তের রচনার ভাষা কাঠামোগত গুণটি এই গ্রন্থেও অনেকখানি বিদ্যমান। 'গল্পকে আমি না কবিতা, না কাহিনীর বিবরণ--এই দুয়ের মাঝামাঝি নিয়ে যেতে চাই'। লেখকের এই সতর্ক উক্তির সত্যতায় উদ্ভাসিত এ গ্রন্থের প্রতিটি লেখা। তবে এ লেখাগুলোর মধ্যে সময়ের পার্থক্যজনিত কারণেই হয়তো কবিতাধর্মী ছোটগল্প হিসেবে 'দুর্বিনীত কাল' কিংবা 'বহেনা সুবাতাস'-এর চেয়ে আলোচ্য গ্রন্থে কিছুটা শৈথিল্য লক্ষ করা যায়। সময় চরম প্রতিকূল হলে স্বতঃস্ফূর্ত পরোক্ষভঙ্গি চলে আসে, প্রতিকূল সমাজবাস্তবতা না থাকলে সেখানে পরোক্ষ ভঙ্গির মধ্যে কিছুটা আরোপিত বিষয় যুক্ত হয়। আরোপিত বিষয় শিল্পমানে পরম বিকাশ লাভ করে না। তার পরও জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত তাঁর ষাটের দশকে জ্বলে ওঠা আলোয় ফিরতে চেয়েছেন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন