রবিবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০১৩

জাদুকর জ্যোতিপ্রকাশ--

রমিত দে

 “পসস চিত্তকতং বিমবং অরুকায়ং সমুসসিতং ।
আতুরং বহুসঙ্কপ্পং যসস নত্থি ধুবং ঠিতি ।।   (জরা বগগো ধম্মপদ)

এই বিচিত্র শরীর যা ফোড়ায় ভরা, যা অসুস্থ, যে নানা প্রকারের সংকল্পের সংগে যুক্ত, যার স্থিতি নিশ্চিত নয়, তাকে দেখো। দেখো তাকে।এই যে হাসতে হাসতে জন্ম নিলে আর জন্ম নেওয়া থেকেই তুমি নিত্য জ্বলছ, লাল কুয়াশার মাঝে কালো দাগ দুটো দিয়ে ঠোঁট দুটো নাড়াচ্ছো,আসলে একটা ডায়াস বুনছো, দেখো কি সদানন্দ শিশুর মত ওকে ঘিরে আছে তৃষ্ণা মোহ আসক্তি আর তুমি অন্ধকার ঘিরে আছো, ঘর বানিয়ে বসে আছো, আগুন  জ্বালিয়ে বসে আছো,কিন্তু দুঃখ সে কোথায়?
এতদূর একটা ঠোঁট নাড়া শিখবে বলে একটা ঝিল্লিজাতীয় ফাঁকা করোটিকে চিনবে বলে সে কোথায় লুকোলো! অনেকদিন ধরেই ভাবছিলাম,যদি ভোরবেলা উঠে দেখি কোথাও পোড়ার দাগ নেই,দৈহিক শর্তগুলো যদি বলে খোলা জানলা বন্ধ করতে নেই।এই বৈতরনীতীরে হল্লাবোল নেই,দুঃখ লিখতে গিয়ে হাত কাঁপা নেই।কেবল নির্জনতা-আমি তোমায় দেখছি, তুমি যতই পর্দানসীন যতই ছক নিছক ,এই হু হু করে বিকিয়ে যাওয়া বরফ আর দিন দিন ছোট হয়ে যাওয়া দস্তানা পড়েই আমি তোমায় দেখছি। ভাবছিলাম রজব আলী যদি আজ ই ওই টাঙ্ক থেকে বের হয়ে আসে! ওই তল নেই শেষ নেই বড় অন্ধকার খুলিঘরের শূন্যতা থেকে! বেরিয়েই কি বলবে দুঃখ ওখানে থাকে,বাসনা ওখানে থাকে,স্বভাবগত সিসিফাসের শূন্যতাবাদ চেনাবে আমাকে? চেনাবে এমন একটা বসন্তের জন্য অপেক্ষা,চিরকাল বরফ পড়ে না যেখানে!মাঝে মাঝে ভাবি এই অনাবিষ্কৃত আমিটুকুর নিচে কি থাকে? কি থাকে পক্ষাঘাতগ্রস্থ এই আলোর নিচে !ওই যে,ওই টাঙ্কটায়! এইটুকু ঘর আর অতবড় টাঙ্কটায় কারা রাখে সম্মিলিত নির্দেশনার এই একাকীর বন্দনা ? কারা আমাদের সমস্ত ঘটনায় এই একখন্ড রাখে,এই একখন্ড মানুষের মত চাহনি, হাতপাহীন কবন্ধের একখন্ড, যার কাছে কেবল মাথা নাড়া আছে গন্তব্যের প্রতিশ্রুতি নেই,যেখান থেকে একা হওয়া আছে,চন্দ্রকিরন মেখে হেমন্তের কুয়াশা মেখে খুদকুড়ো মেখে ফিরে আসা আছে সূর্যাস্ত নিবেদিত এই মহানিদ্রাপথের ফ্রি রেডিক্যালে;আসলে তোষক যথারীতি বিছানো থাকে, লেপের ওয়ারটি ফর্সা থাকে, রাতে ভালো ঘুম হয়।কেবল জেগে থাকে যাপনের চারটে গজ চারটে নৌকো।কেউ বলতে পারেনা সে সম্পূর্ণ দেখতে পাচ্ছে তাকে, কেউ বলছে পারেনা এই কান্না মন্থনে কবিতা লিখছে সম্পূর্ণ, কেবল আরো বেশি করে করে কাচের ভঙ্গুরতা আরো বেশি করে করে টুং শব্দ কেবল বর্ষায় বর্ষাতি গায়ে দেওয়া আর ছাতাটির থাকা অতৃপ্ত ও বিজনের হয়ে । এখন প্রশ্ন এই লেখা কাকে উৎসর্গ করব? সুরজা মাসি-সাঈদ-শ্রীমন্তের মত যে মানুষগুলো ,যে নীরব ইকোয়েশনগুলো যে বয়ান-শরীরগুলো পৌঁছতে পারল না গতিপথ বুঝতে পারল না তাদের !নাকি সেই রক্তিম উত্তরীয়ের অলৌকিক জাদুকরকে যিনি শিখিয়েছিলেন-মানুষ কেমন করে শূন্যে ভাসবে অথচ সে কোন পথে শহরে এসেছিল তা কেউ দেখেনি,নাকি জ্যোতিপ্রকাশকে যিনি এই চুনবালির পুরোনো শহরে এই অলিন্দের নিঃসংগ অন্ধকারে আমাদের নিয়ে চললেন অসময়ের জন্য তুলে রাখা কেবল কিছু ধূসর গাছের কথাবার্তায় কিছু পাখিদের খুনসুটিতে কিছু জাদুকরের যোগসূত্রে কিছু ডিসকোর্স কিছু জবানী কিছু নিরবতার ভাষাতত্ত্বে! আসলে ওই জাদুকর আর জ্যোতিপ্রকাশ দুজনেই মানুষকে কোনো না কোনো  জায়গায় পৌঁছে দেবে বলেই  মঞ্চে উঠেছেন আর আমাদের শরীরসূত্রের দিকে আমাদের গভীর রাতে হাঁ করে ঘুমিয়ে থাকার দিকে তাকাতে তাকাতে বলছেন –‘আই অ্যাম গোয়িং,আই অ্যাম গোয়িং-আর পর্দাটা নিজের মাথা অবধি তুলে নিয়েই বলছেন ,আই অ্যাম গান। এবার আমরা খুঁজছি যারা যারা এই মাঝের স্টেশনে নেমে পড়েছিলাম হুট করে, যারা যারা শেকল তুলে সামান্য হেঁটে গলির মুখে বড় রাস্তায় এসেছিলাম , আমরা খুঁজছি  একটা সজীব ও স্বাধীনের পাশেই  অদ্ভুত আঁধার নিয়ে থেকে যাওয়া এক সমগ্র জীবন,একটা আশ্চর্য আত্মহনন।কি সামান্য এক জীবন কি অসামান্য কাঁপতে থাকা এক জীবন, বিচ্ছিন্ন হবার জন্যই অনবরত কাছাকাছি হওয়া এক জীবন-কেবল এক ইনকোয়ারি ইনটু দ্য মিনিং!হ্যাঁ, খুব সাধারন এক পাঠক হয়েও এ মূর্হতে খুব রোমান্টিকলি বলতে ইচ্ছে করছে জ্যোতিপ্রকাশই যেন আমাদের নিয়ে চলেছেন সেই সমান্তরাল পাকযন্ত্রে, দেহলীন যৌথশালায়।আমাদের বিশ্বাস করাচ্ছেন-দুঃখ আরও অনেক উঁচুতে থাকে!আরও আলেয়াআশ্রিত গহীনে !আমরা তো চিনেও চিনতে চাইছিনা বিষাদ্গ্রামের বিষপিঁপড়েদের!ব্যকরন বদলে কেবল বিবর্তন পড়ছি,দেখছি না এক বিস্রুত আলোয় এক বাক্সের শূন্যতায় গোটা গ্রহটাই আসলে একটা খাঁচার ভাস্কর্য হয়ে যায়।আমরা চিনতে পারিনা এই এত অন্ধকার, চুরি করে ঢুকতে পারিনা শাশ্বত অন্ধকারে,শব্দ করে খুলতে পারিনা সমাহিত নৈঃশব্দ্যের ডালা। তবে কি এখান থেকেই জ্যোতিপ্রকাশের চরিত্র হয়ে ওঠার গল্প? এখান থেকেই কি রজব আলী বা শ্রীমন্তদের নো এক্সিট! একটু গুহার মধ্যে ঢোকা যাক একটু আতুড়ঘরের কান্নার মধ্যে-যার কোথাও দরজা নেই জানলা নেই,ঢোকাই যাক না আবহমান গুপ্তচরের মত জ্যোতিপ্রকাশের হাত ধরে এই কোঁচকানো গোপনতাকেন্দ্রে।

প্রভাব প্রতিফলন প্রতিভাস-যদি এভাবে একজন ভাষাসাহিত্যিকের তামসী নিস্পৃহে,মৌল প্রতিন্যাসে ঢুকে পড়া যায় ,ঢুকে পড়া যায় তাঁর সিলেক্টেড সাইলেন্সের ভেতর,যদি সেই শব্দের পাড়ায় ঢুকে পড়া যায় যেখানে নোঙর হয়ে রইল এক সমুদ্রবাক্স,তীরচিহ্ন হয়ে রইল এক অঙ্কনশিল্পী এক স্বপ্নপ্রণেতা, তবে কি ভেতরে ভেতরে বেড়ে উঠছে এক ঘুমন্ত ক্যানেস্তারা!জন্মকাহিনীকে ফিরিয়ে দেওয়ার এক নিরাসক্তা আনন্দ!যে আনন্দ কিছুতেই অন্য আনন্দের মত নয়,যে আনন্দ এক নির্ভুল বশীকরনের দিকে নির্বাচিত করছে; কেউ কি আছে সেই আনন্দের কাছে?নিরাকার ব্রহ্মের মত হয়ে কেউ আছে?আত্মার দর্শনের মত! আধারের মানুষের মত!কেউ কি আছে দূরে সরে? আর এই দূরের লাগোয়াই কি কোনো এক কেন্দ্রগ ফেরা ? আলোচিততম ছোট রাস্তা যেখানে গিয়ে মিলল আত্মজিজ্ঞাসার বড় রাস্তায়,আর বড় রাস্তা পরম শূন্যে! জ্যোতিপ্রকাশ দত্তের আলোচনা করতে গেলে প্রথমেই আমাদের শব্দ দিয়ে বোনা সমতাগুলোকে বিপন্ন বিন্যাসে চতুরাঙ্গিক করতে হয়।শীতের কাছে একটা ডুবসাঁতার! ছায়াময় এক এপিফ্যানি !শব্দরা গোল হয়ে আসছে ক্রমশ, ভ্রূনবাড়ি হয়ে আসছে,শ্বাসমূল হয়ে আসছে,একটা গল্পকাহিনীর থেকে নিয়মের গাছ উঠে এসে প্রথার পাখি উড়ে এসে অপর গল্পকাহিনীকে শুনিয়ে যাচ্ছে জন্মকাহিনীর  ভেতর লেগে থাকা এক জন্মান্ধ ছাঁট,যা জ্যোতিপ্রকাশের,যা পার্থক্যের কথা ভাবাচ্ছে,দ্বিতীয় বিন্দুর কথা ভাবাচ্ছে, প্রবহমানতার বাইরে বৃত্তকর্মের বাইরে প্রস্তুতির কথা ভাবাচ্ছে।

বারবার যেন কথোপকথনস্থলে কেন্দ্রীভূত হতে চাইছেন জ্যোতিপ্রকাশ।পরস্পরের বিরোধী হচ্ছেন অথচ বিচ্ছিন্ন হচ্ছেন না প্রাকৃত থেকে,ফোলা পেটের পরিপ্রশ্ন থেকে।যেন একটা স্বাধ্যায় খুলে বসে রয়েছেন লেখক,স্বীকৃত হতে চাইছেন স্বরূপত বোধি বা ইন্ট্যুউটিভ পারসেপশনে;কখনও কখনও মনে হয় তাঁর শব্দেরা আসলে সংকেত শব্দ,নিঃসঙ্গ মুক্তি কামনা করে মুখাগ্নি করতে বসেছে একটা গেরুয়া সূর্যাস্তের,বয়সন্ধি ভাঙ্গতে চাইছে একটা মেঘলা গ্রহের,আবার ফিরেও আসছে একটাও পংক্তি লিখতে না পেরে গোটা পৃষ্ঠাটা কালো করে ফিরেও আসছে;সবই যেন প্রতিদিনের মতই ঘটে যাচ্ছে,দেওয়াল আলো করে খুনী অন্ধকার সব ঘর ঘুরে ঘুরে দেখছে আবার আলো নিভিয়ে ঘুমিয়েও পড়ছে,ছুঁতে পারছে না ধৃকেন্দ্র ছুঁতে পারছে না সেই বোবা শিক্ষালয় ,ধরে রাখছে পারছেনা বৃষ্টির জল আর ঠিক এখানে দাঁড়িয়েই যেন অবুৎপন্ন যাপনের বাইরে পরিমিত স্থুলের বাইরে তিনি হাতড়ে যাচ্ছেন শরীর আধার ও আশ্রয়ের অনন্তস্বরূপ,যেখানে ঐকিক নেই অথচ একা হয়ে যাওয়ার চেনা করিডোরগুলো আছে,বীজ এবং বীজের ভেতর দুটুকরো করা দুঃখবিক্রেতা আছে;ক্রীতদাসী বাসনায় যেন এমনই এক শনাক্তকরনের খেলাই নিজেকে জড়িয়ে নিয়েছেন জ্যোতিপ্রকাশ,আশ্চর্যভাবে খুলে দিয়েছেন প্রতীকি ভাষা,নির্মম আত্মপ্রকৃতির ভেতর  মুচড়ে ওঠা এক অন্যরকম আয়োজন এক অতলান্তের জাগরন, প্রথম পুরুষের যে চরিত্র যে ক্লোজ আপ উচ্চারন সে যেন একা সিদ্ধান্তহীন দাঁড়িয়ে যাপনের মাঝে,আর সহস্রবার বিচ্ছিন্ন হতে চেয়েও যেন সহস্রবার নির্মিত হয়ে চলেছে রক্তস্নাত প্রবহ,নির্মিত হয়ে চলেছে শরীরের অপূর্ণতা মনের অসুখ;ভোক্তা হিসেবে ভীত পাহারাওয়ালা হিসেবে বাসনার মত স্মৃতির মত সুখের মত চিরাচরিত রিপুকে,মনোবাসিতাকে তিনি মৃত বলে ঘোষনা করছেন,ঘোষনা করছেন-আমরা পরস্পরকে যতরকম ঘনিষ্ঠতম সম্বোধনে ডাকা যায় ডেকে শেষ করে দিয়েছি। বর্তমান ব্যবহার কেবলমাত্র মৃতের প্রতি শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার চিহ্ন,অথচ দেহ থেকে উৎক্রমনের অমীমাংসা তাঁর পা টেনে ধরছে অস্তিত্ব নামের বিদ্যমানতায় আর এখান থেকেই বদলে যাচ্ছেন একজন লেখক বদলে যাচ্ছেন একজন পাঠক;বোধিসত্ত্বে নির্বাণগামী হতে চাইছেন লেখক অথচ বাসনার অংশীদারিত্বে গড়িয়ে যাচ্ছে নির্বিকার ক্রিয়াপদগুলো।একটা দ্বন্ধ একটা স্ববিরোধ,মানসদর্শনে যেতে এনলারজেস ইডিওলজিতে যেতে উপস্থির কাঠামোর সাথেই কলমের বারংবার খেউড়; আসলে এক  মহৎ শূন্যাতার ভেতর তাঁর চরিত্রদের চালান করছেন জ্যোতিপ্রকাশ,লালনও করছেন একটা ভিস্যুয়াল মনটাজ,এক নির্মোক বর্ণহীন ধ্বনিহীন সাজের ভেতর তার একটাই উচ্চকিত ইশারা -আলো চাই- একটাই  নিরুপায় ঘোষনা এই পুরুষে কে ঘুমায়? কে জেগে থাকে? কে স্বপ্ন দেখে? কার সুখ হয়? কে সব প্রতিষ্ঠার ! কেই বা প্রত্যাখানের? যেন গল্পের ভেতর গল্প খুঁজছেন জ্যোতিপ্রকাশ,যেখানে লেখক ঘুমাচ্ছে পাঠক ঘুমাচ্ছে কেবল আতাঁতহীন এক ম্যনিফেস্টো পৃথিবীর প্রথম বিজ্ঞাপন হয়ে বানাউটি চরিত্রদের পেরিয়ে নকল প্যার্টানদের পেরিয়ে শরীর থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে।জ্যোতিপ্রকাশ দত্তের গল্পপাঠের প্রতিক্রিয়া হিসেবে হাসান আজিজুল হকও সেই অনুরননের কথা বলেন সেই জ্যোতিপ্রকাশীয় মুক্তির কথা-জ্যোতির গল্প সাংকেতিক ছিল,গণিতের ধাঁধার মতো,দুর্বোধ্য জ্যামিতিক কোডের মতো, অনেকটাই যেন তালা দেওয়া।জ্যোতি কখনো চাবি দেন,কখনো দেন না। সঙ্কেত ভাঙতে পারলেই অনেক পাওনা,কখনো মানবিক শুদ্ধ অস্তিত্বের জটিলতা,কখনো কোনো বহুমাত্রিক বহুকৌনিক পরস্পর প্রবিষ্ট ছবি;তাঁর গল্পের ব্যক্তিরা সমাজলগ্ন বা সমাজচ্যুত আর বেশির ভাগই আত্মচ্যুত। এই আত্মচ্যুত শব্দটাই হয়ত কোথাও জ্যোতিপ্রকাশের গল্পকে স্থানিক হতে দেয়নি, দাঁড়াতে দেয়নি, গল্পকেই করে তুলেছে গল্পের প্রতিপক্ষ;নিজের স্বত্ত্বাকেই টুকরো টুকরো করে ছড়িয়ে দিয়েছেন খন্ড আঁধারে  ছড়িয়ে দিয়েছেন জিইয়ে রাখা আলোয়;মানুষ মানুষীর ছেড়ে যাওয়া স্ববিরোধ আর প্রসন্ন শূন্যতা এই যেন জ্যোতিপ্রকাশীয় আইডেনটিটি পলিটিক্স; আসলে লেখক মাত্রই নিজেরদের একটা কঙ্কাল গঠন করেন যিনি বাউলও হতে চাননি বন্দীও নয় কেবল একটা অসামান্য বন্দীশ যা ওভারল্যাপ করে যাচ্ছে প্রতিটা পরিসরকে , বাসমতী পিপাসাকে,আয়নার নানা কোন থেকে ধরা পড়ে যাচ্ছে পারার মিথ্যে অভিমানগুলো,ধরা পড়ে যাচ্ছে পূর্ণতার অমূলসম্ভব কোলাহলগুলো,এযেন জীব সংবিদের সঙ্গে ব্রহ্ম সংবিদের সম্বন্ধ স্থাপন ।আবার আজীবন দিন রাত্রি তে আমরা দেখতে পাচ্ছি গল্পের ভেতর কোনো রিফিউজাল নেই অথচ একটা অধিসম্পর্ক তৈরী হয়ে যাচ্ছে একটা প্যারালেল পরিসর একটা সাদা ক্ষেত্র।রীনা-রবি আর মণি-গল্পের তিন চরিত্রেরা কেবল একা একা ঘুরে পায়ের দাগ রেখে ফিরে আসছে মূল গল্পের বাইনারিতে,অথচ রেখে আসছে একটা ইনভিজেবল ফর্ম একটা রিভার্স সিগনেচার।আমরা আর কতদিন বাঁচব,মণি?-এ তো এক অসীম প্রশ্ন , যার অনুরনন আছে কিন্তু সীমারেখা নেই, মদের গ্লাসে ভেসে থাকা বরফকুচির মত এক গলে যাওয়ার গল্প অথচ তাকে ভাসিয়ে রাখা হবে জীবন নামের নেশাটুকু চেকে চেকে দেখবার জন্য। পাঠককে  কেবল চরিত্রের বাহ্যিক চিত্রপটের হেজেমনিতে আবদ্ধ না রেখে জ্যোতিপ্রকাশ ক্রমশ খুলে দিচ্ছেন সেই অন্তর্পট,সেই আনস্টেবল গেজ,যেখান থেকে একজন ভালো ছবি আঁকিয়ে একজন চিত্রশিল্পী হয়ে উঠবে,দৃশ্যগ্রাহ্য ঐক্যকে কেবল আকরণে আবদ্ধ না রেখে ছড়িয়ে দেবেন অদৃশ্য দ্বৈততার ইশারায়।কখনও কখনও মনে হয় জ্যোতিপ্রকাশ তাঁর দার্শনিক ভাষ্যে খুব সহজেই ধরে ফেলেছেন ছাপা ও খোদাইয়ের মধ্যবর্তী ধ্রুবপদটি।তিনি যেন বোধ দিয়ে আঁকছেন তাঁর অবিস্মরনীয় ছবিগুলো,পাঠকের সামনে তুলে দিচ্ছেন পূর্ণনির্মানের তাগিদগুলো,নতুন পরিসর ও পরিপ্রেক্ষাগুলো,মানব অস্তিত্বের মর্মগত দ্বন্ধবোধে এভাবেই আত্মপরীক্ষায় নিয়োজিত করছেন  জ্যোতিপ্রকাশ, সেখানে কোনো এন্ড গেম নেই কেবল ওয়েটিং ফর। এ যেন এক জটিল বৃত্ত , যেখানে আমরা ঢুকে পড়ছি ঘুমন্ত পৃথিবীর একটি পরিসীমা চিনব বলে। এখানে “The Order Of Things” এর মিশেল ফুকোর দৃশ্য ও অদৃশ্যের আধারচিহ্ন সম্পর্কিত মন্তব্যটি বেশ জরুরী- From the eyes of the painter to what he is observing there runs a compelling line that we, the onlookers, have no power of evading: it runs through the real picture and emerges from its surface to join the place from which we see the painter observing us; this dotted line reaches out to us ineluctably, and links us to the representation of the picture. In appearance, this locus is a simple one; a matter of pure reciprocity: we are looking at a picture in which the painter is in turn looking out at us. A mere confrontation, eyes catching one another's glance, direct looks superimposing themselves upon one another as they cross. And yet this slender line of reciprocal visibility embraces a whole complex net work of uncertainties, exchanges, and feints

প্রথম গল্প হতেই দাঁড়াবার একটা নিজস্ব জায়গা খুঁজছিলেন জ্যোতিপ্রকাশ,একটা নিজস্ব ডেক্সেরিটি,শব্দের পাথরেই যেন ফোটাতে চাইছিলেন অপ্রাপনীয়কে।একটা পথ সবসময়ই তো খোলা থাকে,যা দিয়ে  শরীর হতে বেরোবার উপক্রম করেন দ্রষ্টা বেরোতে চান চাক্ষিক রূপকার আর প্রতিজায়সে প্রতিরূপে হতে চান এক সংঘহীন  উচ্চারন মাত্র;আধার উপচে এমনই এক অনুভবতিকেই যেন খুঁজে যাচ্ছিলেন জ্যোতিপ্রকাশ।

 দর কষাকষির মাপকাঠি দিয়ে জ্যোতিপ্রকাশের গদ্যশৈলীর উচ্চতম গনিতের ধারনা অসম্ভব;তিনি যেন নিজেকেই উচ্চারন করছেন সমর্থন করছেন নিজেকেই।আঙ্গিক থেকে উত্তোরিত হচ্ছেন অন্তর্লোকে।তাঁর পান্ডুলিপি থেকে যেকোনো পাতা ছিঁড়লেই দেখা যাবে ভেতরে এক হিডেন মিস্ট্রি,এক স্বাদু ফলের আরক অম্লমধুর আচার,কোনো আবহমান মিথস্ক্রিয়া নয় বরং সমান্তরাল এক চেতনারণন ফেনিয়ে তোলার সুলতা।তাঁর সাঈদ আঁকতে চেয়েছে নিঁখুত একটি পাখির ছবি এবং একগুচ্ছ নিখুঁত ফুলের ছবি, তার শ্রীমন্ত জানলা খুলে রেখেছে পর্দা উড়িয়ে রেখেছে স্রেফ এক গম্ভীর মেঘ আর পড়ন্ত বেলায় রোদে মাথা এক দুর্লভ বিকেলের জন্য। ওরা কি পেছন ফিরে হাঁটছে? অপূর্ণতাকে ব্যাপক করে হাঁটছে? তবে পূর্ণতা কি? সে কি পরম শূণ্য নয়!এক পরিকল্পিত অসাফল্য নয়? এই শেষ লাইনের অনুচ্চারনকেই যেন কম্যুনিকেট করতে চাইছেন জ্যোতিপ্রকাশ।৫৬/৯ গোলক বসু বাইলেন আর ৬৩/৬ কাদের বক্সের গলির মত কিছ মাটিতে জলে আকাশে বিলম্বিত করছেন সিনেকবিতাদের যারা নিরুৎসবের পূর্ণজন্ম চাইছে চাইছে শিখাহীনতা ঘোষনাহীণতা-রঙের দেহকে মুখর হবার সুযোগ দিয়ে তিনি আসলে ডায়লুট করেছেন রোদের দেহলীকে।।জ্যোতিপ্রকাশের শিল্প বারবার খুঁজে চলেছে সেই নিজস্ব দেহ সেই নিজের বাগানে জল দেওয়ার রহস্যময় হাতছানি খুঁজছে গল্পের গায়ের গয়না খুলে দেওয়ার সাহস ।অগ্রবীজের পক্ষ থেকে গল্পকার আবু হেনা মোস্তাফার প্রশ্নের মুখোমুখি জ্যোতিপ্রকাশকে বলতে শোনা যায়-বাংলা গল্পের ধারাবাহিকতা বা পারম্পর্য যাই বল আমি সেইটি অনুসরণ করেই গল্প লিখতে শুরু করেছিলাম। কিন্তু দেখলাম গল্প বছরের পর বছর ধরে একই রকম থেকে যায়, সমস্ত লেখকের কাছে সেই জন্ম-মৃত্যু-বিবাহ জীবনের যন্ত্রণা, বাঁচার যন্ত্রনা সমস্ত গল্পকারদের গল্পের ভেতরে এই ধারাবাহিকতা। তো গল্পের বাইরে বছরের পর বছর পাঠক এই গল্পই কি শুধু শুনবে? ছোটোগল্পের কাছ থেকে তাদের প্রাপ্য কি শুধুই গল্প শোনা ? আর কিছুই নয় ? তখনই আমার নতুন ভাবনার শুরু। ছোটোগল্পকে যদি আলাদা করতে হয়, যদি কাহিনী বর্ণনার বাইরে এসে গল্পকে ভিন্ন ফর্মে বিশেষ মাধ্যম হিসেবে দাঁড় করাতে হয় তাহলে কী করা প্রয়োজন এ-বিষয়ে পথের চিন্তা করতে শুরু করলাম।............ গল্পের ভেতরে কাহিনী তো থাকবেই, কিন্তু একটি কাহিনীর ভেতর আরো অনেক কাহিনী থাকে। যেটা গল্প বলার মধ্যে দিয়ে সবটুকু বের করে নিয়ে আসতে পারা যায় না। গল্পের নিচে বোধের, অনুভবের আরো কত লেভেল থাকে যেসব টানা গল্প বলে বের করা সম্ভব হয় না। তখনই একটা কৌশলের প্রয়োজন হয়। এই কৌশল শিল্পের। যেখানে কাহিনী মুখ্য হয় না, কাহিনীর নিচে যা আছে মানুষের বোধ, মনের বিচিত্র ভাবনা,বহির্জগৎ দিয়েও যেটাকে ব্যাখ্যা করা স্পর্শ করা যায় না, সেটা ওই কৌশলের মধ্যেই চলে আসে। -তবে কি অস্তিত্বকে উপেক্ষা করে তিনি অতীন্দ্রিয়বাদী? তাঁর চরিত্ররা কি জীবনাভিজ্ঞতার আসন্ন সন্তান নয়? কোথাও মনে হয় এই ব্রহ্মচক্রের মাঝে তাঁর চরিত্ররা স্বয়ং সেই চিত্রকলা যার সামনে চমকে  উঠেই চোখ বন্ধ করে ফেলা যায়,চোখ বড় করে আলো নেওয়া যায় যার স্বদেশী গঠনতন্ত্রে;না,কোনো চটক বা চটচলজি চমক নয় বরং লেখার তাপমাত্রাকে তিনি কমিয়ে রেখেছেন নিজের হাতেই,যেন গল্পকে বর্জনের মাঝেই এক নতুন গল্প যা জানলা স্পর্শ করতে চাইছে, জানলার নিচের রংহীন যাপনকে স্পর্শ করতে চাইছে, শূন্যতার ভেতর জ্যোতিপ্রকাশ ঢুকিয়ে দিচ্ছেন নির্বিকার শূন্যতা;অন্ধকার আর আলোর মাঝে এক ধূসর অস্তিত্ব এক গুপ্ত হরিতকী; চেতনা তো সর্বত্র্য একক কেবল চরিত্র আর চিত্রনরা আংশিক ভাবে পরস্পরের সীমানার মধ্যে ঢুকে পড়ে আর এই অ্যামালগেমেশন এই অনুসরন,বর্ণের অধিতল থেকে ব্যঞ্জনার অধোতলে এই প্রবেশ নির্ভর করে লেখকের খুলে রাখা জানলার প্রকৃতি ও আয়তনের ওপর;এই জানলার চারপাশেই তাঁর ভ্রমণকাহিনীর  কয়েকপৃষ্ঠা এই জানলার চারপাশেই তাঁর জিজ্ঞাসু ঘুরঘুর ।

এক নিজস্ব গদ্যভাষার অধিকারী জ্যোতিপ্রকাশ,জীবন ও সময়সংলগ্নতায় যিনি খুঁজে চলেছেন নিজস্ব স্বরগম,জানি না এই অপরের খোঁজ এই মৌল অভাববোধ এই হাতড়ানো শেলীর সেই  desire of the moth for the star কিনা,কিমবা সেই মকশো ভাঙার ছন্দ সেই বিকল্প মাহেন্দ্রলগ্ন যা প্রথাসিদ্ধ পাঠককে মৃদু হাতে ঠেলে দেয় গাদ্যিক অনিয়মের দিকে;যান্ত্রিক অভ্যেসের দিকে মুখ ফিরিয়ে রাখা তাঁর বলবার কথা বেদনার কথা যা  অনেকাংশেই বোধগম্যতার বসতবাটি নিলাম করে কেনা তা যে কখনই পাঠক আনুকুল্যের পাইকারী দলে পীড়িত হবে না বলাই বাহুল্য,মাঝে মাঝে মনে হয় তাঁর গল্প বলার এই পরিসর এক স্বয়ং প্রকল্প,সে আবহমান বদলাবে না অথচ চূড়ান্ত গ্রহনের আগে শেষতম ব্যাখার আগে আদিবস্তুটিকে তুলে নেবে নতুন আবহের খোঁজে,যে অস্তিত্ব মানে পাঠক বোঝে বিদ্যমানতা সেই অস্তিত্বকেই আহত করে ফ্রেমের ঢের বাইরে নিয়ে চললেন চিন্তা ও চেতনার ইউনিটগুলোকে,ভাষা ও ভঙ্গিমাকে করে তুললেন একক থেকে স্বতন্ত্র্য, যেন মেধারও একটা কথা ছিল মেধাকে গলানো ছিল আর এই নির্বিকার মেধার কাছেই বারবার জ্যোতিপ্রকাশের প্রত্যাবর্তন বারবার পরিমার্জন, প্রচল থেকে গড্ডল থেকে এ যেন এক অন্যধরনের অস্তিত্বের অনুবাদ;

গদ্যকার জ্যোতিপ্রকাশের রিডীং টেবিলে কখনও সখনও মনে হয় কবিতা সাজানো।কুয়াশা পাতানো এক কবিতাকিসিম।তাঁর ভাষা কবিতার, সহজবোধ্য ও সহজস্পর্শের বাইরের এক অন্য রসায়ন।প্রতিটা প্রকাশ প্রতিটা প্রকরণ যেন গল্পের পাঁজরের নিচে আধপেটা কবিতা খেয়ে প্ল্যানচেটে বসেছে, এক নতুন রকমের সত্যের আকুতি, এক অন্তর্লীন অপ্রাপ্তির বেদনা বারবার জ্যোতিপ্রকাশকে নিয়ে চলেছে স্রোতের বিপরীতে; সাধারন গল্পকে গন্তব্যে পৌঁছোনোর আগে কাঠ কামড়াতে কামড়াতে কলমের মুখে উঠে আসা এক শব্দপূর্ববর্তী উল্লাস,বোধের এক সচেতন হেঁসেল।পাখি মানুষ ধানক্ষেত খুব সিরিয়াসলি এভাবেই যেন এক ঝাঁক এসে ঢুকে পড়ছে তাঁর ল্যাবরেটরীতে,একটা চুপ স্থিতিমগ্ন বিকারে গুলিয়ে উঠছে অতিচেতনার ওমেগা পয়েন্ট।যেমন ধরা যাক তাঁর ক্রীতদাসী বাসনা গল্পটি,পুরোটাই তো একটা অ্যান্টিম্যাটার!উত্তম পুরুষের মনোলগে প্রথম পুরুষের তিক্ত সিঁড়িগুলো বেয়ে বেয়ে ওঠা। এই যে মানুষ এই যে সঙ্গীতময় এক পরিক্রমন এর বাইরে তো আদতে এক প্রগাঢ় ছায়ামাত্র।একটা ডিমের নাড়াচাড়ার বাইরে আসলে একটা জন্মদিনের গোলাপের নিঃসংগ পাপড়ি।বাসনার মত এক রিপুকে এক কসমেটিক ফেব্রিকেশনকে লেখক কী গভীর বিশ্বাস থেকে গলিয়ে ঢেলে দিচ্ছেন সার্বণ দীর্ঘশ্বাসের ওপর।আতস আলোয় তার গল্পের সরেজমিনে বসলেই মনে হয় ঠিক কত তাপে শব্দরা গলে যাবে?রক্তশূন্য হয়ে যাবে রোজকার যাতায়াত আর লাঠি ঠুকে টলোমলো পায়ে উঠে আসবে অভ্যেসের মধ্যে বাস করে যে পুরনো আমি যে নতুন আমি, আমি হীন এক মহাধৃকেন্দ্র,একটা থিতিয়ে থাকা ধ্রুপদী লিটমাস।তবে কি গল্পেরই বিভঙ্গ অন্তরঙ্গে কবিতারই জায়নজল! কবিতারই সৎ ইতিহাস! কবিতাই কি বড় হতে হতে দু বিঘা জমি ছাড়িয়ে জ্যোতিপ্রকাশের গল্পের গাছ হয়ে উঠল! অস্থির বনপথ হয়ে উঠল! জাঁ ল্যুক গোর্ডাডকে বলতে শোনা গেছিল-“A story should have a beginning, a middle and an end, but not necessarily in that order”।আর কবিতার দাম মেটাতে জ্যোতিপ্রকাশও বুঝি আমাদের চিনিয়ে গেলেন ভাষার দ্বিপ্রান্তিক সংগঠন, যেখানে একদিকে কবিতার ব্যকরন অন্যদিকে গল্পের বয়ান, তাঁর গল্পের শরীরের কবিতার স্পষ্ট খড় বিছোনোর শব্দ,কবিতার ভাষা হওয়ায় তিনি যেন ভাষাকে নতুন করে সৃষ্টি করে নিয়েছেন,অন্বয়কে ভেঙেছেন, মূর্ত বস্তুকে লিংগ্যুইসিক সাইন দিয়ে স্বতঃস্ফূর্ততার অনুমোদন দিয়েছেন।স্ট্যান্ডার্ড ল্যাঙ্গুয়েজ এ্যান্ড পোয়েটিক ল্যাঙ্গুয়েজএ মুকোরোভস্কিকে বলতে শোনা যায়-Poetic language is thus not a brand of the standard. This is not to deny the close connection between the two, which consists in the fact that, for poetry, the stanadard language is the background against which is reflected the aesthetically intentional distortion of the linguistic components of the work, in the othe words the intentional violation of the norm of the standard………...the function of the poetic language consists in the maximum foregrounding of utterance.এই ডেভিয়েশন বা ভাষাগত বিচ্যুতি জ্যোতিপ্রকাশের গল্পে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে।চলিত গদ্যের রূপের সাথে জ্যোতিপ্রকাশের ব্যবহৃত ভাষার তুল্যমূল্যতায় দেখা যাবে বাংলা সাহিত্যের স্বাভাবিক ক্রম কর্তা-কর্ম-ক্রিয়া(S-O-V)এর বিচ্যুতির মধ্যে দিয়ে তাঁর গল্পে কাব্যময়তার প্রকাশ ঘটেছে অনেকাংশে।
     স্বাভাবিক ক্রম ধানখেতের বর্গাচাষী প্রথম দেওয়াল তুলেছিল ।বিচ্যুত ক্রম প্রথম দেওয়াল তুলেছিল ধানখেতের বর্গাচাষী ।
          স্বাভাবিক ক্রম কেউ দেখেনি কোন পথে শহরে এসেছিল সে ।
বিচ্যুত ক্রম কোন পথে শহরে এসেছিল সে কেউ দেখে নি ।
 স্বাভাবিক ক্রম সকলে তাকে ঘিরে বসে থাকে রাতের অবশিষ্ট সময় ।
বিচ্যুত ক্রম রাতের অবশিষ্ট সময় সকলে বসে থাকে তাকে ঘিরে ।
  স্বাভাবিক ক্রম অন্ধকারের ডাক পড়তে বাতাস তার খেলা দেখিয়ে চলে গেলে
বিচ্যুত ক্রম বাতাস তার খেলা দেখিয়ে চলে গেলে ডাক পড়তে অন্ধকারের ।
স্রেফ প্লট বা ডিসকোর্স নয় ,কেবল আঙ্গিকসর্বস্বতা নয় বরং বলা যেতে পারে গল্পের ফর্ম, যা নিয়ে বারবার চর্চা করে গেছেন জ্যোতিপ্রকাশ,করেছেন সচেতন পরীক্ষা নিরীক্ষা। শুরু থেকেই তিনি এই একটা জায়গাতে তার সমসাময়িক ও পূর্বজদের থেকে সম্মানজনক দূরত্বের সাপেক্ষে। সাহিত্য সৃজনে এই তাঁর ভিন্ন সম্প্রসারন।ক্রম আত্মানুসন্ধান। তাঁর নিজের ভাষায়-দেখলাম গল্প বছরের পর বছর একই রকম থেকে যায়, সমস্ত লেখকের কাছে সেই জন্ম-মৃত্যু-বিবাহ জীবনের যন্ত্রনা, বাঁচার যন্ত্রনা,সমস্ত গল্পকারদের গল্পের ভেতর এই ধারাবাহিকতা। তো গল্পের বাইরে বছরের পর বছর পাঠক এই গল্পই কি শুধু শুনবে? ছোটোগল্পের কাছ থেকে তাদের প্রাপ্য কি শুধুই গল্প শোনা? আর কিছুই নয়? তখনই আমার নতুন ভাবনার শুরু।ছোটগল্পকে যদি আলাদা করতে হয়, যদি কাহিনী বর্ণনার বাইরে এসে গল্পকে ভিন্ন ফর্মে বিশেষ মাধ্যম হিসেবে দাঁড় করাতে হয় তাহলে কী করা প্রয়োজন এ-বিষয়ে পথের চিন্তা করতে শুরু করলাম। স্বভাবতঃই জ্যোতিপ্রকাশকে খুঁজে পাওয়া যাবে কিছু প্রত্যাশিত সরলরৈখিকতার বাইরে ,হয়ত কিছু প্রতীক্ষাশীল পাঠকের জন্যই তাঁর তীব্র আর্তি, রোজকার বাক্যবন্ধের বৈপরীত্যে আলো আঁধারির ভিক্ষা।জ্যোতিপ্রকাশের সার্থকতা তাঁর গল্পের ন্যারেটলজিতে,স্ট্রাকচারইলজমে। গল্পের ভেতরে ও বাহিরে মহাইন্দ্রিয় পেঁচিয়ে ধরছে কিছু আবহমানের ড্রয়িং কিছু নন-লিনিয়ার গল্প।ফর্মকে ভেঙেছেন তিনি বারবার, কাহিনীর বর্হিজগতের বিপ্রতীপ খুঁজেছেন এক নিবিড় নিকষ অব্যাখাত সংগঠন। কেবল সংলাপে নয় বরং প্রাইমারি ন্যারেটিভের মাঝেই লুকিয়ে রয়েছে কিছু ফ্রেম ন্যারেটিভ ।প্রকট নির্মানের আড়ালে প্রায় প্রতিটা গল্পেই রয়ে গেছে নতুন এক প্রচ্ছন্ন অনুগল্পের হাইপারস্পেস ,বিন্যাসের ভেতর দিয়ে বিশ্ল্বেষনের ভেতর দিয়ে আরও এক টাইম ট্রাভেল।জ্যোতিপ্রকাশের গল্প প্রসঙ্গে হায়াৎ মামুদকেও বলতে শোনা যায়-উনি গল্পের সমস্ত উপাদান ছড়িয়ে দিয়ে চলেছেন ,পাঠক সেগুলোকে একত্রে করে গল্পটি তৈরি করে নিক।  আসলে গল্প ঠিক গল্প নয় সেখানে, খন্ড খন্ড গল্প, গল্পের উপনিবেশ, কলোনি, বোধের রিফিউজিরা এসে সেখানে জড়ো হয়। আসলে ভাষার মধ্যস্থতাকারী দৃশ্যে বা রেফেরেন্স পয়েন্টে জোর ধাক্কা দিলেন জ্যোতিপ্রকাশ,প্রতিদিনের জীবনকে বহন করে আনা ভাষা বা দৈনন্দিন ভাষাকে সাহিত্যের ভাষা হিসেবে মেনে নিতে অস্বীকার না করলেও আত্মবদ্ধ নির্মিত অবয়ব থেকে সাফিসিয়েন্ট অ্যাড্রেস করতে চাইলেন ভাষার ব্যুৎপত্তি-বিভঞ্জনকে;ঠিক এখান থেকেই উঠে আসে ডিকনস্ট্রাকশন বা বিনির্মানের পরিভাষাটি ।ডিকনস্ট্রাকশন সম্পর্কে দেরিদার যুক্তিটি ছিল-They undertake the deconstruction of metaphysics by showing how a philosophical position is subverted or undone,exposed as a construct,  by the workings of the discourse that affirms it. অর্থাৎ ভাষা যে বিশাল কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে তা আসলে পরিবর্তনশীল আর তার পরিবর্তন গ্রহনযোগ্য।জ্যোতিপ্রকাশ গল্পের কাঠামোর সদাপরিবর্তনশীল ইনসাইট ভ্যালু বা জাজমেন্টটাকেই ভাঙতে চেয়েছেন , খেলতে চেয়েছেন বোধের অবাধ খেলা , দ্বৈত নির্মানে তুলে এনেছেন চেতনার অমীমাংসিত দ্বন্ধ।কয়েকটা দৃষ্টান্ত নেওয়া যাক এহেন কাঠামোর বহুস্বরীতার -যেমন সরল সংসার গল্পে,নিঃসন্তান সেনমশাইয়ের মনের ভেতরই রয়েছে সন্তানপ্রাপ্তির এক বৃত্ত এক অখন্ড অবদমিত পরিসর এক নিস্ফল মধুর চাক সেখানে ছ সন্তানের পিতা পরেশবাবুকে দেখেই নড়ে ওঠে পিতৃত্বের প্রত্নতত্ত্ব, নড়ে ওঠে জীবনের নৈঃশব্দ্যটুকু অথচ গোপন করেন যাপন উৎসবের স্থুল চিৎকারে , অনুভব করেন জীবন তার একার কিন্তু ভোগে দখলদারী আছে। আবার অন্যদিকে এই মানসিক দেউলিয়াপন থেকে উত্তরণের মাধ্যম হিসেবে লেখক তাঁর শৈল্পিক সুষমায় চরিত্রের পাশে সাজিয়ে দিয়েছেন কিছু বৈকল্পিক নির্বাচন।উজ্জ্বল আলোয় জ্বালিয়ে দিচ্ছেন তার দোকানঘর তার মিথ্যে কোলাহল তার প্রাত্যহিক ভীড়্গুলো;প্রার্থণার এক অসুস্থ ভাষা নিয়ে কেবল শরীরটাই পড়ে থাকছে আর তারই ভেতর এক আউটসাইডার তার আত্মোপলব্ধি খুলে তার উদ্ভ্রান্ত হাহাকার খুলে এঁকে নিচ্ছেন সেই অনিকেত সরলরেখা সেই কল্পতরু সংসার আদতে যা সর্বস্বান্ত্‌,নিঃস্ব, ভোজবাজির এক জীবনে শরীর ডুবিয়ে মাথা উঁচু করে শুধু নিঃশ্বাস নিচ্ছে চিরন্তন মানুষগুলো, এই সাধারন মানুষগুলোর গল্পগুলো ফুরিয়ে আসতে থাকে অথচ ফুরোয়না তাদের গল্প।যেন এক অন্যমনতা দিয়ে আখ্যান ইমারতের বিচিত্র নকশা গড়ছেন জ্যোতিপ্রকাশ। কি অদ্ভুত অবগাহন! যেন চারদিকের স্থল দিয়ে জ্যোতিপ্রকাশ ঘিরে রেখেছেন  মধ্যবর্তী জলের নিভৃত পৃষ্ঠাগুলো। আবার পিতৃঘ্ন গল্পে জন্মদাতা পিতা আর প্রথমপক্ষের সন্তানের মধ্যে এক অরচিত দ্বিধায় আগাগোড়া ডিকনস্ট্রাকটেড হচ্ছে কাহিনীর অন্তর্গঠন কাহিনীর বুনট। শৈশবের বিষন্ন স্মৃতি ,পিতার দ্বিতীয় বিবাহ বা বিমাতার বিমুখতায় গল্পের নায়কের কাছে যেখানে পাঠক নিজেকে প্রস্তুত করছে বাবাকে কেন্দ্র করে এক ঘৃণার আবহ, সেখানেই   জ্যোতিপ্রকাশ গল্পকে আশ্রয় দিলেন এক অপ্রস্তুত স্বাগতে, রাস্তা পার করালেন অঘোষিত দ্বন্ধের হাত ধরে।যে পিতা যে অতীতকে অস্বীকার করছিল চরিত্র,ট্রেন ছাড়তেই সেই পিতাই যেন হয়ে গেল এক ভিন্ন স্বতন্ত্র মানুষ, বিচ্ছিন্ন হয়েও যে বিচ্ছিন্ন নয়।যেন বাবার কাছে ফেরা নয় কেবল সেই হেরে যাওয়া মানুষটার কাছে ফিরে ফিরে আসা , যেন এক সহজ  জানার মানুষের পরেও মেঘের ছায়ার দুঃখের অসহায়ের এক মানুষ যে এলোমেলো করে দিচ্ছে গল্পের নিস্পৃহ কাঠামো , নগ্ন কুয়াশায় ধুইয়ে দিচ্ছে আখ্যানের শেষ পৃষ্ঠা।চরিত্রকে বলতে শোনা যাচ্ছে-আমি আবার এখানে আসব,বোধ হয় তাঁকে দেখতে নয়, তাঁর চোখে আমার ছায়া দেখতে। একটা আগাগোড়া ভালোমানুষ গল্পের মধ্যে এভাবেই জ্যোতিপ্রকাশ ছড়িয়ে রেখেছেন বিনির্মানের ঠান্ডা নিঃশ্বাস।এমন কি আজীবন দিনরাত্রি তেও মণি,রবি ও রীনা এই তিন চরিত্রকে অবচেতনের এক মিশ্র জগত হিসেবে, বোধের এক প্লাবিত প্রান্তর হিসেবে তুলে ধরেছেন  জ্যোতিপ্রকাশ।সিচুয়েশনের দরজা  জানলা খুলে ত্রিকোন চরিত্রগুলোকে সাজিয়ে দিলেও,ছোটো ছোটো ফাঁকগুলো খুলে রেখেছেন আর এই ছোট ছোট ফাঁকই হল মানুষের অস্পষ্টতা মানুষের মুখোমুখি দাঁড়াবার ভয়, আসলে তাপসম্বল মানুষের ব্যথাতুর ইহজন্ম সম্পর্কে ওয়াকিবহলা জ্যোতিপ্রকাশ ,তিনি জানেন একটু হেসে গান হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে পুরোনো নকশাটা আর তাকে পালটে দেওয়া আদতে অসম্ভব,যেন দেহভর্তি পিতুলে শেওলা নিয়েই পৃথিবীর সেফটিট্যাঙ্ক, যার মাঝ বরাবরই হনহন করে হেঁটে যাচ্ছে এত মানুষ আর পিছলে পড়ে যাচ্ছে রক্তিম ছিটকিনি খুলে। একটা সরীসৃপ সমাজকেই স্পষ্ট করতে চাইছেন লেখক তাঁর গল্পের ভরকেন্দ্রে দাঁড়িয়ে,সেই যেন তাঁর গল্পের শুষ্ক ও নিরীহ-আর্দ্র ও জটিল। চেতনার অন্তরালের অস্পষ্ট চেতনাকে মাপার দুঃসাহস দেখিয়েছেন জ্যোতিপ্রকাশ।

জ্যোতিপ্রকাশের চরিত্রদের বেশীরভাগই স্মরনীয় হতে চায়নি,বরং কিছু  জ্যান্ত শব্দ নিয়ে খেলতে খেলতে তারা নিহিত বিশ্রাম খুঁজেছে, বেঁচে থাকার কিছু সাহজিক কাঁচামাল খুঁজেছে।লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে অধিকাংশ গদ্যের আবহেই যেমন লিরিকমুগ্ধতা দিয়েছেন জ্যোতিপ্রকাশ তেমনি তাঁর অধিকাংশ চরিত্রকেই দিয়েছেন সাফিসিয়েন্ট ব্রেক ইন পজিসন ।দিয়েছেন সশব্দ বাক থেকে বৃষ্টিভেজা কিছুটা বক্রতা।বিষাদের শান্ত নিমগ্নকে বুঝতে চাইলেও জ্যোতিপ্রকাশকে কিন্তু নৈরাশ্যবাদী বলা চলে না বরং তিনি একটা বিংগস এ্যান্ড নাথিংনেসের মাঝে একটা জনৈক আমির জগত রেখেছেন যেখানে অন্ধকার এসে বলছে আলো দেখে ভ্য় পাচ্ছ কেন,কিছুক্ষন বসে গল্প কর, আবার আলো, সেও যেন এই ইহলোকে সারা রাত আগুনে পুড়ে স্রেফ রেখে যাচ্ছে মূঢ় তুমি মূঢ় আমি।সাহিত্য কি,এ প্রসঙ্গে সার্ত্রে একবার বলেছিলেন-Let words organize themselves freely and they will make sentences, and each sentence contains language in its  entity and refers back to whole universe. Silence itself is defind in relationship to words, as the pause in music receives its meaning from the group of notes round it. This silence is a moment of language; being silent is not being Dumb; it is refuse to speak and therefore it keep on speaking ।উচ্চারনের এই সজীব মূর্হুতগুলোকে এই শূন্য গুলোকেই মহাভিক্ষু পাঠকের মৌচাকে সাজিয়ে দিয়েছেন জ্যোতিরিন্দ্র।দৈনন্দিন যাপনের মানুষগুলোর অসীম বাক্যনির্মান নয় বরং সসীম  শব্দগুলোকেই সোফাতে নামিয়ে রেখে দেখতে চেয়েছেন স্বপ্ন আর সম্বিতের মাঝে সেই অনন্ত ভেসে থাকার খেলা।শব্দের মেধার থেকেও নৈঃশব্দ্যের বোধকে ব্যাখা করতে চেয়েছেন জ্যোতিপ্রকাশ। একটা আসলের আসল বা নকলের ছায়ায় জীবনকে উপলব্ধি করছেন তিনি। সরল সংসার বা পিতৃঘ্ন এর মত গল্পগুলোতে  চিহ্নিত করছেন নামকরনের নিচে লেখা নামহীন কষ্টের ভারী শ্বাস, আর এই অসহতাকে তালাক দিতে দিতেই তৈরী হচ্ছে সম্ভাবনার একটা আবহমান অনুবাদ,একটা সেলফ রেফারেন্সিয়াল লাইন .জ্যোতিপ্রকাশের গল্পে আদ্যন্ত জড়িয়ে একটা প্রিস্ক্রিপ্ট;একটা অন্তর্জগত একটা জ্যোৎস্নাপথ, অতি আয়াসে লিখে ফেলা যাপনের দুই পাশের দুই মস্ত শূন্য,চতুর্দিকে সরস পাতার মাঝে থাকা শিরীষের বিশুষ্ক ফলের মত তাঁর চরিত্ররা গ্রহের গা জোয়ারি ছেড়ে উঠে আসে ক্ষীনতোয়া জলসম্ভারের দিকে হাজার পাওয়ারে বাল্ব নয় বরং ডিম লাইটে উঠে আসে জ্যোতিপ্রকাশের সতেরো রিলের মানুষ, সেই গর্ভস্তব্ধ নাড়িচক্র,তাঁর প্রিঅকুপেশনে তাঁর একক চেতনায় ইনডিভিস্যুয়াল কনশাসনেস পেরিয়ে কোথাও ভাষানৌকায় উঠেছে এক ফিসফিসে নিরবনীবিড় চিৎশিল্প।যেখানে মুখ লুকোচ্ছে সম্পর্ক যেখানে তিনি যেন বারবার খুঁজছেন সেই নতুন সাজের রঙ্গ বার বার চিনতে চাইছেন শব্দ নামক কৌটোটার ভেতর বোধ নামের বুৎপন্ন লিপি,কিন্তু এই শব্দ কি?শব্দ কাকে বলে?নৈঃশব্দের ভাষাতত্ত্ব শীর্ষকে দেবীপ্রসাদ বন্দোপাধায় লিখেছিলেন-শব্দ কাকে বলে আমি জানি না।আমি যে সংস্কৃতিতে বসবাস করি, যে লৈখিক সংস্কৃতির কথা মাথায় রেখে এই যে আমি এখন লিখছি ফাঁক ফাঁক রেখে, এটা আমার অভ্যেস……শব্দ এই দুটি ফাঁকের মাঝখানে কিছু একটা ।হ্যাঁ, জ্যোতিপ্রকাশের গল্পের কাছে এলে বারবার ফিরে যেতে হয় এমনই এক ধূসরতার কাছে এক অভাবের কাছে আর এই অভাবই যেন তাঁর সিগনেচার। এই অভাবের মধ্য দিয়েই তিনি এক অনন্ত মেক আপরুমের অবসরকে খুঁজতে চাইছেন।খুঁজছে চাইছেন তার ইথারিও ম্যাকাওপাখিগুলোকে খুঁজতে চাইছেন আর তাই কি এই অনুভবের জগত এই ধ্বনিস্পন্দনের জগত তার সাজপোষাক তার ঘরবাড়ি জ্যোতিপ্রকাশের বাচনিক ভঙ্গীতে ধরা পড়ে এমনই এক প্রবীন নিশ্চুপ!কিন্তু মানূষটার ভেতর সেই আরেকটা মানুষ!সে কোথায়?সব কটা মানুষই তো সে অথচ সবকটা মানুষই যেন কেবল এক খোলার টেক্সচুয়াল, শিকারের নেশা ধরেছে জ্যোতিরিন্দ্রের, হ্যাঁ মানুষ শিকারের, মানুষের মাঝে ওই ছেঁড়া বইয়ের পাখি শিকারের,নিজের ভেতর এ এক অদ্ভুত অস্ত্রোপচার, যেন ড্রয়িংয়ের ভেতর ড্রয়িং আঁকছেন জ্যোতিপ্রকাশ,অথচ এক সর্বগ্রাসী ভ্যাকুয়াম, আলো পেতে চেয়ে আধপাগল এক অন্ধকার নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছেন জ্যোতিপ্রকাশ ,মাথা ঘামাচ্ছে শ্রীমন্ত বা সাইদ।তাঁর চরিত্ররা খুঁজছে আরেকটা ডার্করুম আরেকটা নেগেটিভ নিদেনপক্ষে আরও একটা চরিত্র ।

ফুল্ল কুসুম,জলপরী নাচে,জাদুকর জাদু জানে না,হিম চন্দ্রাতপেএর মত গল্পগুলো বিষয়মুখী হওয়ার চেয়েও ব্যক্তির অ্যালিয়েনেশন চেনাতে লেখকের এক চূড়ান্ত আত্মপেনদী ভাষাকে উপস্থাপিত করে । মানুষ একা,খানিক ভরতি হয়েই আবার ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে সে, শূন্যতা শব্দটাকে সে পুষে রেখেছে বহুদিন ধরে ,তার ক্ষতস্থান থেকে গড়িয়ে পড়ছে একটি পূর্ণাবয়ব ব্যর্থতা আর তাকেই ছায়া বানিয়ে হাঁটছেন জ্যোতিপ্রকাশ।তাঁর সুখীতম ফ্যান্টাসি নয় বরং অসমান পায়ে হেঁটে যাওয়া মানুষের প্রতিটি প্রসববেদনাই সেখানে বোধের অ্যানাটমি,পৃথিবীর যাবতীয় প্যাচপেচে ধোঁয়াঝুলের কথা বা প্রবহমান নিমবাক্যের সাবজেকটিভ বর্ণনা না থাকলেও যেন আক্ষরিক অর্থে জ্যোতিপ্রকাশের ভূমাদর্শনে উঁকিঝুঁকি মারছে ভাঁটফুলের জঙ্গলে,কলমিলতার দলে বা নলখাগড়ার ঝোপে লেগে থাকা হিমজার্সির দলিল-দস্তাবেজগুলো।সদ্যকর্ষিত খেতের আল ধরে ধরে হেঁটে চলেছে একা মানুষের পঞ্চভূত,সমাজতাত্ত্বিকের গভীর অন্বেষা নয় বরং তিনি নির্দেশ করছেন মঞ্চের চারিদিকে নুয়ে পড়া মানুষগুলোর বেয়াড়া যোগাযোগের দিকে, যেখানে হাঁটা এতটুকু ফুরোয়নি ,নিজের রুটির থেকে এক টুকরো দিচ্ছেন এই পরিসীমার মানুষগুলোকে,মাটি মুছে উঠে আসছে তারা,তাদের তলিয়ে যাওয়া কৃষ্ণবিবরটির কাছে তাঁর লেখনীকে,ভাষাজলীয়তার গড় ভ্যালুকে নিয়ে যাচ্ছেন জ্যোতিপ্রকাশ,আত্মসমর্পন করছেন বাসাবদলের মানুষগুলোর কাছে।এখানেই থেমে যাওয়া যেত, শূন্যতা সম্পর্কে ইঙ্গিত করা যেত,একটা অটোমেটিক সিগন্যাল দিয়ে বুঝিয়ে দেওয়া যেত সাদা রঙের চিৎকার আর চিৎকারের বাইরে শান দেওয়া নিঃসঙ্গতা ছাড়া আর কিছু নেই ,কিন্তু না,দৃশ্যগ্রাহ্য চরিত্রের মননেই রেখেছেন মিলিমাইক্রনের অদৃশ্য কিছু ইন্টারক্লাস কমপার্টমেন্ট,কিছু নিরূপায় ক্রিয়াপদ,অস্তিত্ব থাকলেও যা চিরস্থায়ী হতে পারেনা,বালির অরণ্যে থকথকে জেলির মত যারা মর্টগেজ দিয়ে যায় কিছুটা মহাবিশ্ব, যেখানে আকাঙ্খা বিধৃত হয়ে আছে আঁচড়ের অনুগত অলৌকিকে,হ্যাঁ, আকাঙ্খা আছে, মাথা গুঁজে মিথ্যে অনুসরন আছে, যেন এই রিলভর্তি মানুষগুলোকে পরী এসে উড়িয়ে নিয়ে যাবে, জাদুকর এসে দেখিয়ে দিয়ে যাবে নোনাধরা থলির ভেতর লুকিয়ে থাকা এক মোহিনী প্রেক্ষাগৃহ যেখানে মায়াজ্যোৎস্নার মানুষগুলোর প্রতারক চামড়া সিঁড়ি ধরে নেমে যাচ্ছে অন্তরের আশ্চর্য কেলভিনে,ঠিক সেখানেই মেলানোর টুপি খুলে ধরছেন জ্যোতিপ্রকাশ,জালের ফসলে ভাগ করে নিচ্ছেন হেরে যাওয়া স্বপ্নের ইড়া পিঙ্গলা, গাছের গুঁড়ি-ফেলা ঘাটে ধুয়ে নিচ্ছেন মানুষের নিঃসংগতা, ধুয়ে নিচ্ছেন মাননীয় দীর্ঘশ্বাস।আসলে একই চরিত্রের মাঝে জ্যোতিপ্রকাশ খুঁড়তে চেয়েছেন এককোটি আত্মজীবনী,সাধারন মানুষগুলোর মুগ্ধ অসাধরনত্ব আগলিয়ে বসে আছেন জ্যোতিপ্রকাশ,কিন্তু কিসের জন্য! ছুঁতে চাইছেন? মেঘগুলোকে চিনতে চাইছেন ? চিনতে চাইছেন চটচটে অন্ধকারগুলোকে? তবে কি দুঃখ পাওয়ার দিকেই তার নায়কেরা সমান্তরাল লৌহপথ ধরে দৌড়ে যায় যার শেষ জানা আছে অথচ যার শেষ মানতে চাইছে না সবুজ কংকালের মানুষগুলো ! তবে কি দেহডারে গরম রাখনে লাইগ্যা তার নায়িকারা এত ঠান্ডা শরীরের আধিপত্য মেনে নেয় ? সাইনাইড পৃথিবীর শৃঙ্গারস্বাদে বিষের যোগান খোঁজে তাঁর বাতিল ভ্রূনেরা? আসলে একটা ক্রশিংএ এসে জ্যোতিপ্রকাশ খুলে রাখছেন পায়ের তঞ্চক বেড়ি, অথবা  ক্যামেরার সেই প্রথম মুভমেন্টের কাছে মুক সাক্ষীর মত দেখছেন সর্বহারার ক্রনিকাল প্লে। যেখান থেকে একজন ঐন্দ্রজালিক তার জাদুকফিনটিকে মাটি থেকে তুলে ফেলেছে কয়েক ফুট ওপরে অথচ মাটি ছাড়তে পারছেনা তার তরল অনলময় মনোতিসা,তনহা মরিচীকার মত খুঁজে চলেছে সাটিনের পৃথিবী অথচ বারবার গোত্তা খেয়ে নেমে আসছে নীল চিড়িয়াখানায়,আমরা কেউ  জানিনা ওই ঐন্দ্রজালিকের ভাষা,কেউ জানিনা তার বিচলন-স্পন্দন-গ্রথন-দ্যুতি-কেউ জানিনা কতোকালের চেনা সে,শহরের কোন রাস্তা দিয়ে সে এল ,আমরা কেবল জানি তার লাস্য তার হস্তনির্দেশ,জানি সফেদ পায়রাটাকে কালো থলেতে ঢোকালেই সে আমাদের অবলম্বন হয়ে উঠবে অন্বেষন হয়ে উঠবে - অপরূপ কোনো এক সুখের অন্বেষন কোনো এক জবাকুসুম স্বপ্নের অন্বেষন-যা নেই, যা কোত্থাও নেই-আত্মার অ্যালবাম খুলে ফুটো নাভি দিয়ে যে গড়িয়ে গেছে। টসটস করে হৃদপিন্ডের রক্ত ঝরছে অথচ ফাঁকি দিয়ে পালাচ্ছি না আমরা ,এই অপূরনীয় যাপনকে বাঁচিয়ে রাখছি,বাঁচিয়ে রাখছি মিথ্যের এক অ্যাবসিল্যিউট ডেনসিটিকে যার ভেতর পচে যাচ্ছে হেজে যাচ্ছে নিরন্ন শরতের বাজিতে হেরে যাওয়া মানুষগুলো অথচ কিছুতেই বিশ্বাস করছে না জাদুকর জাদু জানে না।বিশ্বাস করছে না সকন্যা দয়িতাটিকে আর নিয়ে যাবেনা যেকোনোখানে নিয়ে যাবার সম্পূর্ণ অধিকার দেওয়া নিরুদ্দিষ্ট দয়িতটি।কেবল ঘরের উঠোনে বসে আছে প্রবঞ্চনার চিহ্নটুকু,কুলকুচির জলে দৌড়ে যাচ্ছে ফোলা পেটের স্বপ্নেরা,পরী আসলে আসছে না পরী আসলে আসেনা,কেবল মাদারগাছের নিচে পড়ে থাকে এক ঝটিতি অন্ধকার এক অনিকেত আলোককাহিনী, বাড়ির দিকে দৌড়নোর কেবল একটি পথ।একটিই মাত্র পথ। এই ঝাড়লন্ঠন নিভে যাওয়া নিমবেত্তান্ত শুনতেই,ভাঙাচোরা একটা কোমরজলের ছবি আঁকতেই, এই ভেতরের মানুষগুলোকে চিনতেই কিংবা কেবল ঠকতে ঠকতে ঠকে যাওয়া কিছু মুখের চতুর্ভুজে পৌঁছতেই বাহিরের জানলা খুলেছেন জ্যোতিপ্রকাশ,কোনো হাইটেক হলোগ্রাফি দিয়ে নয় বরং এক শান্ত ডানার সন্ন্যাসে।প্রত্যাখানের বোধ থেকে রবিশস্যের আদিঅনন্তে তিনি নকশা আঁকেননি, বরং তাঁর কেন্দ্রীয় চরিত্ররা আর তাদের স্থিতধী ইহকালেরা,নিয়ত প্রতারিত প্রাণময়েরা খুঁজছে আশ্রয়ের বর্হিগৃহ।প্রশ্ন করছে নিজেদেরকেই আবার নিজেদের কাছেই নিরুত্তর,নুনবাতাসময় নির্বাসনে নেড়ে চেড়ে দেখছে তাদের কলকব্জা তাদের রক্ত তাদের শোকচিহ্ন তাদের আন্তরিক চেনা তাদের অপহৃত নির্মম।নিরন্তর যন্ত্রনা বিষাদে এই ভীষন কোলাহলেও যেন এক মূক সম্পূর্ণতা পেয়েছে সুদাস-শ্রীমন্ত-সাঈদ-সরোজিনীরা।স্বপ্ন দেখার গল্প করছে তার নায়িকারা,সেটাই যেন শেষ বিশ্বাস সেটাই যেন অলীক প্রস্তুতি,এর জন্যই যেন ঘরের প্রতি ধূলিকণার প্রতি এমন ভালোবাসা। তার নায়কেরা দাঁড়িয়ে থাকছে কেবলমাত্র একটা ক্রশিং এর জন্য,দূর অলক্ষ্যের একটা সক্ষম বিজনের জন্য, ছোট্টো একটা রেলস্টেশনের জন্য,আর এক অন্তিম ধূসর রেললাইন ধরেই গড়িয়ে যাচ্ছে তাদের তাপমাত্রা,সেই অপরিচিত স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়েই তারা ছেড়ে দিচ্ছে পরিচিত গাড়ির শেষ বগিটা, অপসৃয়মান কামরার দিকে দৌড়তে চেষ্টা করছে, সে জানে গাড়ি তাকে ফেলে চলে যাবে অথচ তার দৌড় এক ধারাবাহিকতার দিকে, এক স্বতন্ত্র মিথ্যের দিকে, এক গাঢ় আঁধারে আবৃত নম্র প্রতিকূলতার দিকে ,তবু সে আলো নেভবার আগে অভিমান চিনতে যায়, ঠিক যেমন চাঁদ সূর্য না জেনেও তার নায়িকারা বেরিয়ে আসে ভেজা কাপড়ে চান্দের আলোয় গা শুকাইব, কাপড় শুকাইব বলে-দিগন্তের কাছে এসেও জ্যোতিপ্রকাশ যেন বারবার এই বাড়ি ফেরবার কথা বলছেন,অন্ধকার জানলাগুলো জেনেও ধূলো রঙের অপরিহার্য জেনেও ।আঁধার নিভিয়ে শুরু করছেন বিজন খেলা ।এক বিচ্ছিন্ন আঁধারে দাঁড়িয়ে জ্যোতিপ্রকাশ, এক নিশ্চিত নেভানো আলোয়, অথচ কি অফুরন্ত স্বপ্নের ভেতর নিশিতে পাওয়া শরীরগুলোকে শুইয়ে রেখেছেন ,ভূতগ্রস্থ সিক্ত ভীত একা একা বসিয়ে রেখেছেন বিশুদ্ধ নির্জনে।এ কি কেবল নিঃসংগতা? নাকি এও এক অন্বেষন! মহাকালের বৃহৎ আয়নায়গুলিয়ে দেওয়া প্রশ্নহীন ফেনা !জলপরী নাচে এর অন্তিম অধ্যায়ে আসা যাক-সে জলের ধারে দাঁড়ানো।অনেক দূরে বিস্তৃত  বিলের কোনো খানে কি জ্বলে উঠবে আলো? তার দীপ্তি কেবল তাকেই দেখাবে। আর কিছু না……সাতটি আলোর বৃত্ত ক্রমে ক্রমে স্পষ্ট হবে, এই বুঝি আশা। অনেক দূরে জ্বলে-নেভে এমন প্রদীপ নয়, বৃত্তের মধ্যভাগে থাকবে অপরূপ রোশনি। কাছে এলে দেখবে তার মধ্যে নেচে চলেছে অবর্ণনীয় রূপহীন অপরূপা রমনী। প্রিয় জলপরী। শেষে একজন কাছে আসবে। আলোর বৃত্ত থেকে আলোকরমনী তার সামনে দাঁড়াবে। জলের ওপর দাঁড়ানো কিন্তু পা বিলের বুক স্পর্শ করে না।হেসে সেই অধরা সামনে এগিয়ে ধরবে সোনার মূর্তি। --- গল্পের ভেতর এক রোমান্টিক পোড়োবাড়ি তুলেছেন জ্যোতিপ্রকাশ,না পাওয়াকে সাজিয়েছেন রূপহীন অপরূপে,যেন এখান থেকেই তাঁর ঠান্ডা হলুদ শাশ্বত চরিত্ররা গুহাভর্তি চাপ চাপ অন্ধকারে দাঁড়িয়ে বলে উঠছে-
আমি অনাসক্ত দেখি, আমি অন্যমন
ঘ রে ফিরে যাই।তবু কোনোখানে ক্লান্ত নির্নিমেষ
দৃষ্টির শীতল ?তারা কোন অনিবার্য স্পষ্ট করে?
আমি মনে-মনে ভাবি পথের শেষের দূর সক্ষম বিজন
সাদা জ্যোৎস্নার বাড়ি,মাদুর বিছানো,সাদফুল অনিমেষ ঝরে
…… (অনিবার্য-আলোক সরকার)

শৈলীবিজ্ঞানের দিক দিয়ে দেখলে বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই জ্যোতিপ্রকাশের গল্পের মাস্টার ন্যারেটিভগুলি এবং তা থেকে খন্ডসত্যে আবৃত মুখ্য বিরোধাভাসগুলো উত্তম পুরুষ বা নাম পুরুষে বির্নিমিত।সেমানটিক্স বা বাগর্থতত্ত্বের নিরিখে বিচার করলে পুরুষবাচক বা নামবাচক সর্বনামের এই স্বতন্ত্র্য প্রয়োগ জ্যোতিপ্রকাশকে প্রাসঙ্গিক করে তোলে সমান্তরাল গল্পের ধাঁচগঠনে।নামপুরুষের প্রিডোমিন্যান্সি তাঁর গল্পকে দিয়েছে এক নতুন মাত্রা। এক স্বয়ংসম্পূর্ণতা।নতুন লেখা , নতুন লেখার ধরন বা দৃষ্টির নতুনত্ব সেই পঞ্চাশের সময় থেকেই লক্ষ্য করা যাবে জ্যোতিপ্রকাশের কনটেন্ট ও ফর্মের কিছু বক্ররৈখিক মরফোলজিতে।এ গল্প তাঁর সম্পূর্ন নিজের, বিশেষ করে এ জাতীয় গল্প বলার ধরন এক স্বয়ংসম্পূর্ণ ঘরানার ইঙ্গিত্ সাঙ্কেতিকতায় সূদূর হয়ে ওঠে।মনে পড়ছে বেকেটের মলয় উপন্যাসের সেই বিখ্যাত সংলাপ-Stories,stories, I have not been able to tell them. I shall not be able to tell this one.রেহাননাম,জলজ কুসুম,জাদুকর জাদু জানে না,জলপরী নাচে;,ফুল্লকুসুম একের পর এক গল্পে জ্যোতিপ্রকাশ যেন এই একটাই গল্পের খোঁজ করছেন যা আদতে খুঁজে পাচ্ছেন না পেতে চাইছেন না ,আসলে একটাই চরিত্রকে কিছু পরম্পরা কিছু সক্রিয়তার মধ্য দিয়ে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন এক নিঃস্ব অস্বীকারের দিকে; তাঁর আঙ্গিকই যেন তার পরিপূর্ণ গল্প হয়ে দাঁড়াচ্ছে আবার গল্পই এক স্বয়ংক্রিয় আঙ্গিক।নাম পুরুষকে স্থান বদল করিয়ে জ্যোতিপ্রকাশ তুলে এনেছেন তার অপর গদ্য,অখন্ডের ভগ্নাংশে জুড়ে জুড়ে জড়ো করা কাহিনী নির্মাণ, কথনের পদ্ধতি। গল্পের শেষে গিয়ে আসলে কোনো পরিসমাপ্তি নেই কোনো পাখি হওয়া নেই।It is not written at all. It is not to be read..It is not about something, it is something itself. ব্যক্তিবাচক সর্বনামের অনন্য ব্যবহারে দেখা যাক জ্যোতিপ্রকাশের চিন্তন,তাঁর ব্যঞ্জনা কতদূর গিয়ে বেঁধে- রেহেননামা গল্পে চরিত্র কে? কে খুন করল ? অদৃশ্য কালিতে লেখা চুক্তির বয়ানটাই বা কে বলে দেবে? আবার জলজ কুসুমের বিবসনা বাক্যহীন হিমরমনী- যে শরীরটাকে দিয়ে দেহটাকে বাঁচিয়ে রাখে অথবা সেই আক্রোশী পুরুষ, জালে ঢোকা পরস্বাপহারীর জলজ়ে যে খোঁজে এককালীন উষ্ণতা, এই যে দুজন মানু্‌ষ , দুটো জীবন , আলো ও অন্ধকারের জ্ঞানসীমানায় দাঁড়ানো দুটো নিঃসীম রুদ্ররব দুটো অনায়াস সাদা- কে তারা? কে কার যাপন ? এই বাজিকরের দেশে জীবন নামক খলুইয়ের মধ্যে রাখা কে কার প্রয়োজন? আর সবশেষে যদি প্রশ্ন  করা হয় কেই বা মাধ্যম? কার ন্যারেটিভ ? অতিশোয়ক্তি হয় কি ? মনে হয় না। মাস্টার ন্যারেটিভ থেকে জ্যোতিপ্রকাশ কোথাও উর্ত্তীণ হয়ে গেছেন ফ্রেম ন্যারেটিভের অসাধারন প্রয়োগে। আর্টিকুলেশন অফ সেলফকেই নির্বাচন করেছেন সাবজেট আর অবজেটের প্রুফ দেখার কাজে,যা আসলে পাঠকের রিডিং ডেজায়রকেই বাড়িয়ে তোলে, খুঁজতে সাহায্য করে নিজেরই এক অনন্য আদলকে,সব আলো চুষে নেওয়া একটা নির্বোধ ব্লুপ্রিন্টকে।জ্যোতিপ্রকাশের বাচনিক ভঙ্গীতে রয়েছে একটা প্যারাডক্সিকাল চূর্ণন।প্রতিটা টেক্সটের মাঝে লুকিয়ে রাখা সাসপেক্ট ভ্যালু, যেন লক্ষ্যতে এগোতেই চাইছেনা তাঁর গল্প আর এক অসম্পূর্ণ ফোটো নেগেটিভিটি নিয়ে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে তাঁর চরিত্ররা তাঁর শ্রীমন্ত সাঈদরা।এরাই তো তাঁর কনসেপচ্যুয়াল মেটাফর,তাঁর গ্র্যান্ড ন্যারেটিভ। সাথে সাথে বিশেষ্যের বৈশিষ্ট্যগুলো এবং তাদের ব্যবহারগুলোও লক্ষ্যনীয়।এ প্রসঙ্গে বিশেষ্যের ব্যবহার আর তাদের বিধি নিষেধের ক্ষেত্রে চমস্কি কথিত selection restriction এর প্রশ্ন আনা যেতেই পারে।সেক্ষেত্রে দেখা যাবে অপ্রানীন বা বিমূর্তকেও কিভাবে জ্যোতিপ্রকাশ বিশেষ্যের মূলে এনেছেন যা গল্পের ন্যারেটিভে নিয়ে এসেছে নতুন গ্রহনতত্ত্ব নতুন পরিভাষা।কয়েকটা উদাহরন দেখা যাক, কীভাবে,শব্দের আড়ালে বাক্যের আড়ালে আভ্যন্তরীন শব্দ বা বাক্যগুলোকে বের করে এনে সীমাবদ্ধতা ভেঙে অব্যক্তিক বা অমূর্তের দরজাতেও কড়া নাড়া সম্ভব হচ্ছে।
১) ক্রীতদাসী বাসনা----->বাসনা (বিমূর্ত)------> আমাদের সুহৃদ যে স্বপ্নের গাড়িতে, ঘুমের দোলনায় বসিয়ে এই স্বল্পকেশকাল অবধি সকলকে সংগে করে এনেছে তাকে (মূর্ত) হারিয়ে ফেলেছি ভাবতে পারছি না।
২) সারাজীবন----> দুঃখ (অপ্রানীন) ------> না, রজব আলী, দুঃখ (প্রানীন) আরো অনেক উঁচুতে থাকে।
৩) জলজ কুসুম ------> জল অমানবিক-------> জলে প্রান আছে,শান্ত বাতাসে কাঁপতে থাকা ঢেউয়ের ডগায় নয় (মানবিক)।
বিশেষ্যের বিবিধতায় এভাবেই গল্পের মধ্যে একটা দ্যোতনাসঞ্চারী ইমেজ গড়ে ওঠে। গড়ে ওঠে একটা সমান্তরাল চিত্রকল্প।চলমানের আড়ালে আরও একটা চলিষ্ণু।আর এভাবেই গল্পের প্রছন্ন মেজাজে নিঃশব্দে জীবনের অনুচ্চারিত উপাদান সিনথেসাইজ করছেন ইন্দ্রিয় সক্রিয় করছেন জ্যোতিপ্রকাশ, এক নতুন অন্বয় যা আসলে রূপকের টার্গেট ডোমেনইকেই  দিচ্ছে প্রসরন,তার স্থানু থেকে তাকে মুক্তি দিচ্ছে।

জ্যোতিপ্রকাশের বেশীরভাগ গল্পেই  অ্যাকশন অফ এজেণ্ট প্রকট হয়েছে, মানে বিষয়ের বৈচিত্র বা ঘনঘটা অপেক্ষা সেখানে চরিত্রের ওপর লেখক দায়িত্ব দিয়েছেন গল্পকে এগিয়ে নিয়ে যাবার আরও বলা ভালো গল্প বলিয়ে নেওয়ার।যার জন্য তাঁর আখ্যান অনেকটা ন্যারেট করার গল্প বা বিবৃত করার।তাঁর চরিত্ররা অনেকক্ষেত্রেই সচেতন ভাষ্যকারের কাজ করছে।কি বলা হচ্ছে তার চেয়েও বরং কেমন করে বলা হচ্ছে তারই দায়িত্ব নিয়েছে চরিত্ররা।পাঁচ দশক আগে তাঁর পরমাত্মীয় গল্পের নায়ক সাঈদ আর শ্রীমন্ত - এখন সেই আশ্চর্য বৃষ্টি নেমেছে শ্রীমন্ত।এত ধূসরতার পরে।“-এমনিই স্বগোতক্তি দিয়ে শুরু করেছে তাদের গল্প ,পুরো গল্পটা দাঁড়িয়ে রয়েছে কেবল দুটি মানুষের দেখা ও ভাবার ওপর। অতি সামান্য সুক্ষ চেতনাকে তিনি ফেলেছেন তীব্র পর্দায়,আর ভেসে উঠেছে এক থমকানো জগত । শ্রীমন্ত-সাঈদের পারস্পরিক কথোপকথন থেকেই তা স্পষ্ট-----তুমি গল্প করছিলে  যখন এই মেঘ এবং বৃষ্টি ছিল না। আপ্ত ধূসরতায়ও আচ্ছন্ন ছিলাম না আমরা, কেমন করে বৃষ্টিকে এবং হাওয়াকে তুমি চাও। অনেক উঁচুতে সাততলা অথবা আরও বেশি উঁচু দালানে একটি ঘরের মধ্যে আছ তুমি। আলো এবং হাওয়াকে বাধা না দিতে সেই ঘরের দরজা এবং জানালাগুলো কী প্রশস্ত ! আর সেই সব জানালায় দরজায় তুমি পরদা ঝুলিয়েছ। কী কোমল, কী মসৃণ সেই সব পরদা, এবং সূক্ষ্ম। আর সেই ঘরের মসৃণ হিম, কারুকার্যখচিত মেঝেয় তুমি শুয়ে আছ প্রশান্ত, অলৌকিক, নগ্ন এবং নিরবয়ব হয়ে। সেই সময় এমনি আশ্চর্য মেঘ-রৌদ্রের খেলা শুরু হলো আকাশে। তারপর সেই অপ্রাপণীয় হাওয়া এসে জানালার সব পরদাকে কাঁপিয়ে দিলো, উড়িয়ে দিলো। পরদাগুলো শুধু নিজেদের প্রান্তকে সজোরে আঁকড়ে ধরে উড়তে থাকলো পত্ পত্ করে। নিশানের মতো। আর তখুনি সেই অদৃশ্য বৃষ্টি এলো। তুলে-ধরা-পরদার খোলা জানালা দিয়ে তারা লাফিয়ে, ঝাঁপিয়ে, মাতন লাগিয়ে ঘরে এসে ঢুকলো আর শায়িত, অলৌকিক, নিরবয়ব, নগ্ন তোমাকে নিশ্চেতন, তুহিন অবস্থায় উত্তরিত করলো।----বিষাদ,নিরাশা বা কেবল কিছু অতৃপ্তির কথা বলিয়েছেন পারস্পরিক অলীক চেতনা মাপবার ফিতে দিয়ে ।আত্মসমর্পণ করেছেন সামান্য কিছু বিগত বোধের কাছে। যেন কিছু ঘটনা নয় কেবল কিছু ভাবনাকে জুড়ে জুড়ে দুটি ক্লান্ত তরুন করে গেছে গল্পের শুদ্ধ বিনির্মাণ।একটা কাব্যময়তা একটা ছায়ার আল্পনা তৈরী হয়েছে গল্পের আবহ জুড়ে।সাজানো ফুলের বাগান এও  আমরা পাই সমমর্মী বন্ধুত্বেরই গল্প যেখানে সম্পর্ক বলতে কেবল এক নিরাময়হীন বিরোধীতা, আর এই আখ্যান নির্মানে জ্যোতিপ্রকাশ চেনান সেই নিঃশব্দ কথপোকথন সেই স্বগতোক্তি সেই আপাতঘটনাহীন অভিজাত দেখার দৃষ্টিকোন যেখান থেকে একজন লেখক গল্পের গানে নয় বরং গঠনের গভীরে ঢুকে পড়েন। ক্রীতদসী বাসনা বা গোলাপের নির্বাসন জাতীয় গল্পেও আমরা দেখি চরিত্রকে  দিয়ে গল্প না বরং ভাষার গায়ে লেগে থাকা চেতনার বুদবুদকে ফোটাতে চেয়েছেন জ্যোতিপ্রকাশ। এই হয়ত জ্যোতিপ্রকাশের নতুন ভাষা নতুন গল্প বলার রীতি। তবে অবশ্যই এজাতীয় ডিটেলমেন্টের বা গল্প বলার এ জাতীয় ঘরানায় ঝুঁকি থাকে প্রত্যাশী পাঠকের বিমুখতা, হয়ত সেও একটা কারন জ্যোতিপ্রকাশের গল্পের সাহিত্যের পাঠককূল তৈরী না হওয়া।তবে সত্যিই কি এজাতীয় লেখকরা পাঠক জনপ্রিয়তার ধার ধারেন? জ্যোতিপ্রকাশের মতে ছোটগল্পের চিরাচরিত ধারনার বাইরে আধুনিক পাঠকের দায়িত্ব খানিকটা পার্টিসিপেটারি প্রসেস এর মত যেখানে পাঠক গল্প পড়া শেষ হয়ে গেলে আরও কিছুটা চাইবে,নিজেকে যুক্ত করবে পাঠপরবর্তী বুদ্ধি ও মননের চর্চার সাথে ,প্রতীক্ষাশীল পাঠক নিজেকে ইনভলভ করবে লেখকের ছেড়ে রাখা ইমেজারি থেকে ম্যাক্রোসিকোয়েন্স খুঁজে বের করতে ,সংযুক্ত করবে গল্পের সামগ্রিক ন্যারেশনের সাথে নড়াচড়ার সাথে।যেহেতু জ্যোতিপ্রকাশের গল্পে শুরুর থেকেই গল্পের মাধুরী ধরে ধরে নেমে আসছে এক মাত্রাহীন কাব্যময়তার মহাওঙ্কারধ্বনি,পরিস্ফুট হচ্ছে এক ভিন্ন আঙ্গিক,এক অনুচ্চারিত মনোজগত তাই সাথে সাথেই গ্রহনতত্ব বা আধুনিক রিসেপশন থিয়োরি অনুযায়ী প্রশ্ন ওঠে সাহিত্যধারার গ্রহীতা ও দাতার ভেতর এক্ষত্রে স্বীকরন (assimilation)  না  অনুকরন (Imitation) ঠিক কোনটা গড়ে  ওঠে!অর্থাৎ দীক্ষিত পাঠক কি জ্যোতিপ্রকাশের গল্পের অবয়বিক শৃঙ্খলাকে গ্রহন করে না কি গল্পের অন্তনির্হিত শূণ্যায়তনকে পূর্ণ করে তোলে  তাদের নিজস্ব সংবেদনশীলতায়, বিশ্লেষনী দক্ষতায় ।খুব স্বাভাবিক একজন আইডল রিডার বা একজন অ্যাকচুয়াল রিডার অথবা একজন ইমপ্লায়েড রিডারের পাঠোপলব্ধি ভিন্ন হবে প্রতিটা পাঠের প্রেক্ষিতে এবং পাঠকৃতির মধ্যেকার বহুস্বরতাকে বিশ্লেষনের তুল্যমূল্যতাও স্বাভাবিক কিন্ত যে ভাষা জ্যোতিপ্রকাশ তাঁর দু হাতে মেখেছেন বা যে জীবনভাবনা যে মেধা বা  মননশীলতায়  শব্দদেরকে গেঁথেছেন অগ্রসর ও আধুনিক চেতনার গুলজারে , সেখানে খুব স্বাভাবিক অ্যাসথেটিক রিসেপশন এর কথা উঠবে, সিন্থেটিক পাঠক নয় বরং নবায়ত গ্রহনতত্ত্বে সচেতন  পাঠকের কাছে জ্যোতিপ্রকাশের আপাতঘটনাবিহীন আখ্যানেও জড়িয়ে থাকবে ভিতরের অন্তর্দ্যুতি,মননশীল ধ্রুপদীয়ানার মাঝে পাঠক খুঁজবে ডিসকভারিস অফ ডিফুইজ বা টাইমলেস ম্যানিফেস্টেশনের প্রসঙ্গ।

Words এ সার্ত্র লিখেছেন-I saw words  as the quintessence of things’। শব্দের মধ্য দিয়েই যেন একজন কবি একজন লেখক খুঁজে নেন তাঁর মিনিয়েচার ওয়ার্ল্ড, তাঁর কল্পনাকে।বস্তুগত দৃশ্য থেকে বিন্যাস ভেঙে বেরিয়ে আসেন অনিবার্যের বর্হিভবনে। আসলে শব্দই  হল সেই স্বকেন্দ্রিকতা যেখানে বারবার লেখক ফিরে আসছেন তাঁর ভেতরবাড়ির খোঁজে, তাঁর সর্বস্বচিহ্নিত জাগরনটুকু নিয়ে।সে তো ধ্বনির প্রতীক, বেশ কিছু পংক্তিকে আহত করে বেশ কিছু সম্ভাবনার তুমুল আত্মবিশ্বাসকে অভ্যেস করে। আর এই ক্রনিকল অফ হোপ এই মধ্যস্থতাকারী দৃশ্যের প্রেক্ষিতেই খোকা মস্তানী করে লেখকের প্রথম দু একটা কথা,উদ্ভব ও বিলয়ের মধ্যেকার সেই নিঃশব্দ মডেল যার মাঝে আয়না বসিয়ে লেখক ভেতর থেকে বাইরে চলে যায়, বাইরে থেকে ভেতরে ঢুকে আসে পাঠক।পৃথিবীর রাস্তায় রাস্তায় এগিয়ে চলে ঘুমন্ত মানুষ ঘুমন্ত শরীর অথচ সিটের নিচে লুকোনো থাকে গোটা শরীরটাই।জ্যোতিপ্রকাশও তাঁর শব্দের মাধ্যমে তাঁর নিজস্ব শিল্পকুশলতার সমর্থনে চরিত্রদের মধ্যে চামড়া তৈরী হয়ে যাওয়ার পরের অংশটাই যেন বার বার খুঁজছেন। বার বার খুঁজছেন সিটের নিচে লুকিয়ে রাখা আমাদের বেফাঁস হৃদিপিন্ডটাকে।আমি তো পাঠক!পরমাত্মীয় গল্পের কাছে এসে আমি তবে কি খুঁজি? সারাজীবন বা ক্রীতদাসী বাসনা র কাছে দুদন্ড দাঁড়িয়ে ঠিক কি জানতে চাই? রোদ ও বৃষ্টি! নীরব ও মুখরতা! জানতে চাই যে তোরঙ্গে দুঃখ লুকোনো তার চাবি পাওয়া গেল কিনা! নাকি স্রেফ সাঈদ আর শ্রীমন্তের মত রজাব আলীর মতো একটা দুটো আর্ত ও বিস্মিত অস্তিত্বের ছোট হতে হতে নিজেরই মাঝে অদৃশ্যভাবে চুরি হয়ে যাওয়া লক্ষ্য করি?দেহকে মুখর হবার সুযোগ দিয়ে তাঁর গল্পে চরিত্রদের মুখোমুখি বসিয়েছেন জ্যোতিপ্রকাশ। এ এক জীবন উৎসব,নতুন আর এক মাধ্যকর্ষনচ্যুতি,যার জটিল গড়নটা পাঠকের আগামী দিনের প্রস্তুতি।কি লিখি কেন লিখি-এ থেকেই তো একজন সল্পশক্তিমান মানুষের ভাষাবদলের মাধুকরী,ঠিক এ জায়গা থেকেই সে ভাবতে বসছে কয়েকটা নিরাকার শব্দকে দুমড়িয়ে মুছড়িয়ে ঠিক কতটা সম্ভাবনার করা যেতে পারে ,ঠিক কতটা দর্শনের পেছনে বসে থাকা অর্বুদ নির্বুদ করা যেতে পারে! আর ঠিক এখান থেকেই সে খোঁজ করতে ত্থাকে একটা নীরবতম মূর্হুত একটা আলোবিরহী সফর,আর তার সামগ্রিক সৃষ্টি জুড়ে একজন গল্পকার একজন লেখক খুঁজতে থাকেন পংক্তিমালার এমনই অসহয়তা, খুঁজতে থাকেন তারই মত আরেকজন মানুষকে,যে আলো জ্বেলে তাকেই খুঁজছে,যে চামড়ার ঘুরপথে বাইরে যাবার অনুমতি চাইছে তারই কাছে।এই যে ছাপান্ন বাই নয় এর এ গোলক বসু বাইলেনের শ্রীমন্ত বা তেষট্টির ছয়-ই কাদের বক্সের গলির সাঈদ-এতো জ্যোতিপ্রকাশই! ফকিরের আত্মায় ঢুকে পড়া জ্যোতিপ্রকাশ, সাদা গজ কোনাকুনি এগিয়ে দেওয়া জ্যোতিপ্রকাশ।এ  জ্যোতিপ্রকাশ মিল চায়না,টূকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়তে চায় টুকরোর অমিলে।নিজেকেই নিজে সাজাতে বসেছেন তিনি,অভিকর্ষের সাথে জড়িয়ে থাকতে নিজেকেই নিজে গাঢ় তীব্র তীক্ষ্ণ করে তুলছেন।জ্যোতিপ্রকাশের অন্বেষন এই ভ্রমণপ্রিয় মানুষটিই যার প্রতিটা পদক্ষেপেই পিছলে যাবার সম্ভাবনা,তাই হয়ত বারবার পা টিপে টিপে হাঁটে তাই হয়ত একটা নিঁখুত ফুলকে ধরতে পারে না,চেহারা পায় না একটা নিঁখুত পাখির,আসলে সারা গল্পে জ্যোতিপ্রকাশের চরিত্ররা লুকোচুরি খেলতে খেলতে জিরিয়ে নিচ্ছে দৌড়ের ফাঁকে আর আমরা, পাঠকেরা যখনই তাদের কাছে আসছি লবনাক্ত লেনদেনের হিসেব চেয়ে তখনিই চরিত্ররা এই হল্লাচিহ্ন থেকে পালিয়ে যাচ্ছে ওই গম্ভীর মেঘ আর পেছনে পড়ন্ত বেলার রোদ মাথা দুর্লভ বিকেলের দিকে।হ্যাঁ,এই নিজের ভেতরই বিতাড়িত মানুষটা তাড়া খাওয়া মানুষটা বারবার ফিরে এসেছে একটা নিউরোটিক পারর্সোনালিটি হয়ে।সব কথা বলা হয় না তার, জ্যোতিপ্রকাশও জানাতে চায়না তার পদক্ষেপের নিচের শব্দ তার অর্থহীন থাকার শব্দ,মেলাতে চায়না এই সব ভিজে অস্তিত্ব এই সব ফাটল এইসব ফোঁপানো কান্নার সমীকরন।তাই তো আজীবন দিন-রাত্রি তে রবির গলায় ভেসে ওঠে-আমরা আর কতদিন বাঁচব মনি? কেবল অভেদ।অসম্পূর্ণতা থেকে মানুষ যা পেতে চায় তাকেই জ্যোতিপ্রকাশ করে তুলেছেন অসম্পূর্ণতার দ্যোতক।এক অনিবার্য অভেদের অপেক্ষাই জ্যোতিপ্রকাশের সাহিত্যকর্মের অস্তিত ছন্দ হয়ে উঠেছে।হয়ে ঊঠছে চেতনার ছোপ ছোপ জমাট চিহ্ন।কাহিনীর পটভূমি ও চরিত্রকে আচ্ছন্ন করেছে কিছু সমান্তরাল অন্ধকার অথবা বলা যেতে পারে এই আলোর না থাকাটাকেই এই বৈভবহীনতাটাকেই সুদক্ষ দরজির ফিতেই কাঁটছাট করে জ্যোতিপ্রকাশ বৃহত্তর পৃথিবীকে আবিষ্কারের স্পর্ধা দেখিয়েছেন। শ্রীমন্ত আর সাঈদের মত অভিমানী পৃষ্ঠাগুলোতে যে মূহুর্তে লেখা হয়েছে -আমি যা ভাবছি তা বলছি না।আমরা কেউ তা বলি না।আমাদের  জীবনের প্রতিটি মূর্হুত কথায় কথায় ঠাসা।একটি মূর্হুত থেকে আর একটি মূর্হুত-একটি কথা থেকে আর একটি কথা। মূর্হুত আমদের জীবন-কথা,আমার,আমাদের ভাবনা । তাই সব বলে না কেউ। বলা যায় না। সেই মূর্হুতেই অন্তর্লোকের স্বাস্থ্যোদ্ধারে নেমেছেন জ্যোতিপ্রকাশ।এই সেই ইনার কনফ্লিক্ট এই সেই অন্তর্বত্তী পংক্তি , আশ্রয়ের বর্হিগৃহ যেখানে দাঁড়িয়ে একজন বিশ্বচেতা নয় বরং এক নিরলঙ্কার বিশ্বাস চেঁচিয়ে উঠতে পারে শরীরের লুকোণো শরীরটাকে নিয়ে, বস্তুহীন শব্দহীন কেবল এক উপলব্ধির গনিতায়ন; সৃষ্টিশীলতার ছকোনা ভৌতিক আয়নাটাকেই ভরসা করতে চেয়েছেন জ্যোতিপ্রকাশ,অথচ কেবল এক স্বপ্নবিক্রেতা হয়ে সেই আয়না ধরিয়ে দিয়েছেন পাতার স্তুপে হারিয়ে যাওয়া দ্বান্ধিক পেডিগ্রিগুলোকে,ব্যথিত হয়েও তার চরিত্ররা বহন করতে চেয়েছে ব্যাথার অংশকে,নিঃশব্দ মুখরতাকে।আসলে জীবন আমাদের কোমর ডোবানো জলের কলমিলতার মতই,জলের বনে দোলাগুলো সব ঠিকঠাকই আছে কেবল দূরে বিলের গভীরে ছুঁড়ে দিতে পারেনা কোনো গহনাপাখি কোনো ঢোঁড়াসাপ , কেবল ভিজে প্রতীক্ষা নিয়ে ফাটা ঠোঁটের বিশ্বাস নিয়ে জ্যোতিপ্রকাশ আমাদের নিয়ে চলেছেন সেই অতীন্দ্রিয় জাদুকরের কাছে , যে দূর সূদুর আঞ্চলিক পাখিদেরকে  নিয়ে আমাদেরই বিষাদসিন্ধুতে গেয়ে চলেছে-
   চলো আমরা দোষ খুঁজি, জলের নিচে ডূব দিয়ে   , জলের ওপর ভেসে ভেসে
     স্বপ্নের নিচের অংশে, স্বপ্নের ওপরের অংশে, চলো আমরা দোষ খুঁজে বেড়াই
    শ্বাসাঘাতপ্রধান এই দেশে আমাদের খোঁড়া ঠ্যাঙে মাঝে মাঝেই প্রজাপতি এসে বসে
-----
লোমওঠা ত্বক চুষতে থাকে মেঘলা জোঁকেরা —  এই আমাদের ভাগ্য?

এই আমাদের রাশিচক্র  ?...





লেখক পরিচিতি
রমিত দে
কবি। প্রবন্ধকার। গবেষক।
কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর।
কর্মসূত্রে তেজপুর আসামে থাকেন।

                 

1 টি মন্তব্য: