রবিবার, ২০ অক্টোবর, ২০১৩

গল্পকে আমি গল্প হিসেবেই দেখাতে চাই

অঞ্জন আচার্য
------------------------------------------------------------------------------------------------------------
তিনি কবি। পেশায় সাংবাদিক। বাংলাএকাডেমীতে গবেষণার কাজে জড়িত ছিলেন। নানা সঙ্গ-অনুসঙ্গে লেখক সেলিনা হোসেনের সান্নিধ্য পেয়েছেন। 
পাশাপাশি গল্প, প্রবন্ধ, ফিচার, সাহিত্য- সমালোচনা, সম্পাদনা সহ সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় বিচরণ। বইপড়া, নাটক সিনেমা দেখা, গান শোনা তার সখ। অঞ্জন আচার্যের গল্প কবির গল্প। 
প্রাকাশিত বই: জীবনানন্দ দাশ-এর নির্বাচিত গল্প, ধর্ম নিধর্ম সংশয়, জাঁ পল সাত্রের গল্প, লেনিন কথা, রবীন্দ্রনাথ : জীবনে মৃত্যুর ছায়া, জলের উপর জলছাপ, আবছায়া আরো অন্ধকারময় নীল, পাবলো নেরুদার কবিতা সংগ্রহ।  
--গল্পপাঠ
------------------------------------------------------------------------------------------------------------
প্রশ্ন : ঠিক কবে থেকে গল্প লেখা শুরু? কেন এই গল্প লেখা?
উত্তর : সেই শৈবব থেকে নানা গল্প শুনে শুনে বড় হওয়া আমার। দাদু-ঠাকুরমা, জেঠা-জেঠিমা, কাকা-কাকিমা, বাবা-মা, ভাই-বোন মিলে ছিল আমাদের যৌথ পরিবার। আমার ছোট কাকা ছিলেন বেশ ভালো একজন গল্প-বলিয়ে মানুষ। মুখে মুখেই নানা রসের গল্প অনায়াসেই বলে যেতে পারতেন তিনি। যদিও তার এক লাইনও তিনি কোথাও কোনো দিন লিখেননি। কাকার অধিকাংশ গল্পই ছিল ভূত-প্রেতের। পরিবেশটাকে বেশ রকম তৈরি করে নিতে জানতেন তিনি। তাই তাঁর গল্প বলার সময়ও ছিল রাতের বেলা।
আমরা সব ভাই-বোন মিলে গোল হয়ে বসতাম কাকার সামনে। একসময় গল্প শুরু হতো। এমনভাবে তিনি আমাদের গল্প বলতেন যেন বিষয়টা সত্যি সত্যিই ঘটেছিল তাঁর জীবনে। আমরা জড়সড় হয়ে একে অপরের হাত ধরতাম গোপনে। বুক ধড়ফড় শুরু করতো, হাত-পা ঠান্ডা হয়ে পড়তো, চোখ যেন ভয়ে ঠিকরে বের হতে চাইতো সেসময়। গল্প শোনার পর আমরা আর বাড়ির বাইরে যেতে কেউ সাহস পেতাম না। এমনকি ঘর থেকে বের হয়ে প্রশ্রাব করতে গেলেও মা-ঠাকুরমাকে সঙ্গে করে নিয়ে যেতাম। আমাদের বাড়ির টয়লেটটি ছিল ঘর থেকে একটু দূরে। আশে পাশে ঝোপঝাড়। রাম নাম জপতে জপতে আমরা টয়লেটে বসতাম। বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখতাম মাকে। মশার কামড় খেয়ে খেয়ে মা আমাকে পাহারা দিতো। এমনটা চলতো প্রায় তিন-চার দিন ধরে। একসময় কাকার বলা গল্পটা ভুলে যেতাম, হয়ে ওঠতাম কিছুটা সাহসী। আবার অন্য কোনো দিন কাকা নতুন কোনো গল্প বলতেন, আবার সেই ভয়ে ভয়ে কাটানো হতো তিন-চার দিন। এত ভয় পাওয়ার পরও কিন্তু আমরা সুযোগ পেলেই কাকার কাছ থেকে গল্প শুনতে চাইতাম। গল্প শোনার তীব্র কৌতূহল ছিল বলেই হয়তো ভয় পাওয়ার ভয়কে দূরে রেখে গল্প শুনতে চাইতাম।

এমন অভিজ্ঞতা আমাদের কারো না কারো কম-বেশি আছে। মানুষমাত্রই গল্পপ্রেমী। সেই আদিকাল থেকেই মানুষ গল্প বলে আসছে মুখে মুখে। এভাবেই গল্প ছড়িয়ে পড়েছে গ্রামগঞ্জ থেকে শহর-বন্দরে; বন্দর পেড়িয়ে দূরদেশে। কাগজ যুগের আগে মানুষের গল্প থাকতো মুখে মুখেই। ব্যক্তি মানুষের বিচিত্র চিন্তা ধরা দিতো গল্প হয়ে। কখনো সেটি পেতো অলৌকিক আখ্যা, কখনো বা কিংবদন্তির মূল্য। কেউ গল্প বলতে, কেউ শুনতে, কেউ বা গল্প পড়তে ভালোবাসে- এটাই মানুষের বৈশিষ্ট্য। আর এ গল্পের ধারক ও বাহক এই মানুষই। মানুষই একমাত্র প্রাণী যারা গল্প বুনতে পারে। জীবজন্তু, গাছপালা, নদীনালা, পাহাড়-সমুদ্র ইত্যাদি সকল বিষয় নিয়েই গল্প আছে। আর সেই সব গল্পের স্রষ্টা একমাত্র মানুষ, উপাত্ত কেবল তার পরিবেশ-প্রতিবেশ। এ জন্যই একজন দক্ষিণ আফ্রিকান গল্প-বলিয়ের সাথে চীনা গল্প-বলিয়ের অনুসঙ্গের মিল খুঁজে পাওয়া মুশকিল।

নিজের প্রসঙ্গে আসা যাক। গল্প লেখা শুরু করি সেই ছেলেবেলা থেকেই। তবে সেগুলো ছিল নিতান্ত কাহিনি রচনা। কল্পনাপ্রবণ ছিলাম বলেই ভাই-বোনদের মধ্যে আমিই গল্প ভাবতে শুরু করি অনেকটা কাকার মতো করে গল্প-বলিয়ে হওয়ার লোভে। তবে বক্তা হিসেবে কোনো কালেই তেমন একটা ভালো ছিলাম না বলেই, লিখনির সাহায্য নিই। এভাবেই কাহিনি লিখতে লিখতে একটা সময় আবিষ্কার করলাম, গল্পমাত্রই কাহিনি নয়; গল্প মানে অন্য কিছু। যাপিতজীবনে প্রতিনিয়তই তৈরি হচ্ছে গল্প। তার সবকটিরই যে বাস্তব ভিত্তি আছে তা কিন্তু নয়; তবে বাস্তবতা বিবর্জিতও নয় কোনোটি।


প্রশ্ন : আপনার প্রথম দিককার গল্প সম্পর্কে বলুন। কেমন ছিল সেগুলোর গঠন-শৈলী?
উত্তর : আমার পঠন-পাঠন শুরু হয় বলতে গেলে অনেকটা পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্যের হাত ধরে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, সমরেশ মজুমদার, বুদ্ধদেব গুহ- এদের লেখায় বুদ হয়ে থাকতাম সবসময়। এক রহস্যময় ঘোরে দিন কাটতো আমার। সুনীলের ‘নীললোহিত’ হতে চাইতাম কখনো, কখনো সমরেশের ‘উত্তরাধিকার’ পড়ে জলপাইগুড়ির চা-বাগানে ঘুরতাম। একসময় কালবেলা’র অনিমেষ হতে চেয়েছিলাম মাধবীলতাকে পাওয়ার লোভে। মাধবীলতা কিন্তু এখনও আমার স্বপ্নের নায়িকা- যারা আমৃত্যু আকাঙ্ক্ষিত অথচ অধরাই থেকে যায়। যাই হোক, পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্যের প্রভাব ভীষণ রকম পড়েছিল আমার প্রথম দিককার গল্প কথায়। বহুদিন সময় লাগে আমার সেই ঘোর কাটিয়ে উঠতে। পরবর্তী সময়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ছাত্র হিসেবে পাঠ করি স্বদেশীয় সাহিত্য। পাল্টে যায় আমার গল্পের ভূবণ, ভাষা ও শৈলী।


প্রশ্ন : গল্প লেখার প্রস্ত্ততি পর্ব সম্পর্কে জানতে চাই।
উত্তর : গল্প লেখার জন্য আমার কোনো রকম প্রস্ত্ততি তো ছিলই না বরং গল্প লিখি এটা ভাবলেই মাঝে মধ্যে বড় অবাক লাগে। ছোটবেলায় গল্প-বলিয়ে হতে চেয়েছিলাম। সেই চেষ্টা যে করিনি তা কিন্তু নয়। বন্ধু-বান্ধব বা মা-ঠাকুরমা’র কাছে কম গল্প ফাঁদিনি আমি। অনেক সময় তারা সেটা বিশ্বাসও করে বসতো। এমনকি স্কুল কামাই করার জন্য গল্প ফাঁদেছি বহুবার। মা যদিও ধরে ফেলতো, কিন্তু বৃদ্ধা ঠাকুরমা’র মন গলতো ঠিকই। পরদিন স্কুলে গিয়ে মাস্টার মশাইদের বলতাম নতুন গল্প। ধরা পড়লে জুটতো বেতের বাড়ি, না-পড়লে মিলতো ক্ষমা।

খুব ছোটকাল থেকেই আমি আঁকাআঁকি করতে জানতাম। বলা যায়, অনেকটা জন্মগত পাওয়া। তবে মাতৃকূল বা পিতৃকূলের কোনো নিকট-আত্মীয় চিত্রশিল্পী ছিলেন কিনা আমার জানা নেই। মায়ের স্বপ্ন ছিল আমি বড় হয়ে যেন বিখ্যাত চিত্রশিল্পী হই। এর জন্য কম কাঠখড়ও পোড়ানো হয়নি। তবে অস্থির চিত্তের এই আমি সেই পথে বেশি দূর হাঁটিনি। তারপর কৈশোর পেরিয়ে হতে চাইলাম বড় ক্রিকেটার। শচীন টেন্ডুলকার হতে না পারলে যেন জীবনই বৃথা- এই ব্রত বুকে নিয়ে দিনকে রাত, রাতকে দিন করে লেগে গেলাম ক্রিকেট খেলায়। খেলেছিও অনেক। শর্টকাট ক্রিকেটার হওয়ার জন্য চেষ্টা-চরিত্রও কম করিনি। কিন্তু লাইফে সাকসেসফুল হওয়ার কোনো শর্টকাট ওয়ে নেই। আর সেটি বুঝতে আরও একটু সময় লাগলো আমার।


প্রশ্ন : আপনার গল্প লেখার কৌশলগুলো কী কী?
উত্তর : নির্দিষ্ট কোনো কৌশল অবলম্বন করে আমি গল্প লিখি না। কখনো আমি বক্তা, কখনো আমি শ্রোতা, কখনো আমি কোনোটাই না। সেই জন্যই আমার প্রতিটি গল্পই আলাদা। এর একটি ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিক আছে। ভালো দিকটি হলো, প্রতিটি গল্প পড়েই পাঠক আলাদা আলাদা স্বাদ নিতে পারবেন। যেন তার মনে হবে এমন গল্পভাবে তিনি এর আগে পড়েননি। আর মন্দ দিকটি হলো, এতে করে আমার স্বাতন্ত্র্য থাকছে না। রবীন্দ্রনাথের কোনো একটি গল্পের টুকরো অংশ যদি ফুটপাথের রাস্তায় পড়ে থাকে, আর পড়ুয়া মানুষ যদি সেটি কুড়িয়ে পাঠ করেন- গল্পের নাম না বলতে পারুক, আমি নিশ্চিত, তিনি ধরতে পারবেন লেখাটি রবীন্দ্রনাথেরই। অর্থাৎ এখানেই লেখকের সার্থকতা। এই স্বাতন্ত্র্য অবস্থান তৈরি করতে সবাই পারেন না। অনেক শক্তিশালী লেখকও আমৃত্যু চেষ্টা করেও পারেননি। সেই দৌড়ে আমি যে নেই তা কিন্তু নয়।


প্রশ্ন : নিজের গল্প বিষয়ে আত্মোপলব্ধি বা বিবেচনা কী?
উত্তর : কবিতা লিখছি অনেকদিন। সেই সাথে গল্প লিখি, প্রবন্ধ লিখছি, গবেষণা কাজও করছি নানা বিষয়ে। পেশায় সাংবাদিক হওয়ার কারণে কাজ করতে হয় দেশীয় বা আন্তর্জাতিক সংবাদ নিয়ে। তবে কোনো কিছুকেই আমি অন্য কোনো কিছুর সাথে গুলিয়ে ফেলি না। যা আমি কবিতায় বলতে গিয়ে বলতে পারি না, তার জন্য আশ্রয় নিই গল্পের। যেটা বলার জন্য প্রবন্ধের দাবি করে আমি তাই করি। একেকটা জগৎ আমার কাছে একেক রকম। আমার কবিতার ভাষার সাথে আমার গল্পের ভাষার কোনো মিল নেই- সম্পূর্ণ ভিন্নতর। গল্পকে আমি গল্প হিসেবেই দেখাতে চাই। কবিতা দিয়ে গল্প বলতে চাই না।

গল্পে কাজ করে যাচ্ছি। ভালো-মন্দ মিলিয়েই চলছে সেই যাত্রা। এখনও মনের মতো গল্প লিখে উঠতে পারিনি। একেক সময় এমন হয়, যা লিখবো বলে বসেছিলাম, তা আর লেখা হয়ে ওঠে না। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বদলে যায় গল্পের মোড়। তবে যে জীবন আমি যাপন করিনি, তা আমার গল্পের ভূমি হয়ে ওঠে না। আমি জোর করে কোনো পটভূমি তৈরি করি না। যেমন ধরা যাক, কারাগারের কথা। সেখানে আমি কোনোদিন যাইনি। অথবা দীর্ঘদিন কারাবন্দি থাকা কোনো আসামির সাথেও ভালোভাবে মেশার কোনো সুযোগ হয়নি আমার। কারাগারের জীবনযাপন, খাদ্যাভাস, পোশাক, কাজকর্ম ইত্যাদি বিষয় আমাকে চলচ্চিত্র দেখে কিংবা বই পড়ে জানতে হয়েছে। প্রত্যক্ষ কোনো অভিজ্ঞতা নেই। এই বলে সব কিছুরই যে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা প্রয়োজন তার কোনো ভিত্তি নেই। বিষ যে তিতা তা না খেয়েও জানা যায়। তবে যা কিছুর সাথে মানুষের নিবিড় সংশ্লিষ্টতা রয়েছে তার জন্য বাস্তব অভিজ্ঞতা নেওয়া খুবই অপরিহার্য হয়ে দাঁড়ায়। আর এ কারণেই জেলখানার জীবন নিয়ে গল্প লেখা আমার এ মুহূর্তে সম্ভব নয়। শিল্পে আরোপিত বস্তুর কোনো ঠাঁই নেই। যেদিন আমি সত্যিকার অর্থে জেলখানার বিষয়-আশয় জানতে পারবো, সেদিনই এ নিয়ে লিখবো। ভাববাচ্যে কোনো কিছু লেখার পক্ষপাতী আমি নই। প্রকৃতপক্ষে মানবিক সম্পর্ক, সমাজ-বাস্তবতা, প্রেম-লোভ-ঘৃণা-কাম ইত্যাদি জৈবিক প্রেষণা আমার গল্পের উপকরণ। তাছাড়া আমার অনেক গল্পই ম্যাজিক রিয়েলিজমে লেখা। অনেক গল্প আমি বলেছি ফ্যান্টাসি আকারে। তাই বলে মাটি ও মানুষ থেকে সেগুলো বিচ্ছিন্ন নয়; বরং অনেক বেশি জীবন-ঘনিষ্ঠ।

প্রশ্ন : গল্পকার হিসেবে কাদেরকে আপনি আদর্শ মনে করেন? কার বা কাদের গল্প আপনাকে অনুপ্রেরণা দিয়েছে গল্প লিখতে?
উত্তর : আদর্শ গল্পকার হিসেবে সুনির্দিষ্ট কারো নাম বলা আমার জন্য মুশকিল। বিশ্বসাহিত্যের বহু লেখকের গল্প আমি পড়েছি। সবারই কিছু না কিছু আমার ভেতর কাজ করেছে। সবার কাছেই কিছু না কিছু আমি গ্রহণ করেছি। তাছাড়া একজন লেখকের সবগুলো গল্পই যে অসাধারণ হবে এমনটা ভাবা অন্যায়। তবে রবীন্দ্রনাথে বেশ কিছু গল্প আমাকে আজো মোহিত করে। বুদ্ধদেব বসুর ‘আমরা তিন জন’ গল্পটি আমার বেশ ভালো লেগেছিল। জীবনানন্দ দাশের কয়েকটি গল্প পড়ে আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। কী চমৎকার বিশ্লেষণ! শরৎচন্দ্র, বিভূতিভূষণ, তারাশঙ্কর, বনফুল, সতীনাথ, মানিক, মহাশ্বেতা- এমন বহু নাম মনে পড়ছে যাদের গল্প পড়ে রোমাঞ্চিত হয়েছিলাম। জগদীশ গুপ্ত, সমরেশ বসু, হাসান আজিজুল হক, শওকত আলী, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, মাহমুদুল হক, সৈয়দ ওয়ালীউলস্নাহ, সৈয়দ শামসুল হক, সেলিনা হোসেন থেকে শুরু করে হাল আমলের শহীদুল জহির, ইমতিয়ার শামীম, শাহাদুজ্জামানের বেশ কয়েকটি গল্প আমাকে প্রাণিত করেছে। এছাড়া সুবোধ ঘোষ, জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, কমলকুমার মজুমদার, রমাপদ চৌধুরী, বিমল কর, আবুল বাশার, সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ, প্রফুল্ল রায়, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়, দেবেশ রায়, অমর মিত্র, অভিজিৎ সেনগুপ্ত, নবারুণ ভট্টাচার্য, দিব্যেন্দু পালিত, স্বপ্নময় চক্রবর্তী থেকে তিলত্তমা মজুমদার- পশ্চিমবঙ্গের এমন অনেকের নাম মনে পড়ছে যাদের কোনো না কোনো গল্প আমার ভালো লেগেছে। আসলে নাম বলে শেষ করা যাবে না। তবে কবিদের লেখা গল্প পড়তে আমার বেশ ভালো লাগে। তাদের গদ্যের মধ্যে একধরনের খেলা থাকে, রহস্যময়তা থাকে। আল মাহমুদ, আবদুল মান্নান সৈয়দ, পুর্ণেন্দু পত্রী’র লেখা সেজন্যই একটু অন্য রকম।

একটা সময় মস্কোর প্রগতি প্রকাশনের সুবাদে প্রচুর রাশিয়ান সাহিত্য পড়েছি। লেভ তলস্তয়, ম্যাক্সিম গোর্কি, আন্তন চেখভ, নিকোলাই গোগল, আলেক্সান্দর পুশকিন, ইভান তুর্গেনেভ, ভ্লাদিমির কারলেস্কো, মিখাইল শলোখভ, সের্গেই আমেত্মানভ, ইউরি নাগিবিন, ইউরি কাজাকভ, ভালেরি ওসিপভ, কনস্তানতিন পাউসেত্মাভস্কি এমন অনেক লেখক আমাকে দারুনভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল। হেমিংওয়ে, মান্টো, মার্কেজ, নাদিম গার্ডিমার, টনি মরিসন, নাগিব মাহফুজ থেকে শুরু করে হারুকি মুরাকামি, আবেলারদো কাস্তি লো, মিলান কুন্ডেরা, ওক্টাভিও পাজ, ওরহাম পামুক- এমন লেখকদের অনুবাদ গল্প পড়ে দারুন আপ্লুত হয়েছি। তবে অনেক ক্ষেত্রে নিম্নমানের অনুবাদের কারণে ভালো লেখাও মনে কোনো দাগ কাটতে পারেনি।


প্রশ্ন : কার জন্য আপনার গল্প লেখা? যখন গল্প লিখতে বসেন তখন কি পাঠককের কথা ভাবনায় থাকে নাকি থাকে না?
উত্তর : পাঠকের কথা ভেবে আমি কোনো গল্প লিখি না। কেননা সকল পাঠকের চিন্তা-চেতনা, পঠন-পাঠন, রুচিবোধ এক নয়। তাই আমি জানি না, আমার পাঠক কোন রুচির। আমার একটি গল্প যে সকল পাঠকের কাছে ভালো লাগবে সেটা ভাবা বোকামি। একটি গল্প একজনের কাছে অসাধারণ লাগতে পারে, অন্যজনের কাছে তা অাঁস্তাকুড়ে ফেলার মতো হতে পারে। সত্যিকার অর্থে, আমার নিজস্ব কিছু বলার আছে যা অন্যের সাথে শেয়ার করার। আর সেটি বলার মাধ্যম হিসেবে গল্পকে বেছে নিই মাঝে মাঝে।


প্রশ্ন : বর্তমান সময়ে কী নিয়ে লিখছেন?
উত্তর : এ সময়ে গল্প লেখার চেয়ে গল্প পড়ছি বেশি। গল্প লেখার করণ-কৌশল নিয়েও দেশি-বিদেশি লেখা পড়ছি। মাথার ভেতর অনেক গল্প জমা আছে। ওইগুলো ঘুণপোকার মতো কাটছে। ওগুলো লিখে উঠতে হবে। তবে আগে পিছে বলে আমার কাছে কিছু নেই। আমার কাছে আমার সকল গল্পই সন্তানের মতো। উচ্ছন্নে যাওয়া সন্তানের প্রতি যেমন মা-বাবার অস্থিরতা থাকে তেমনই গল্প হারিয়ে যেতে বসলে আমার ভেতর তেমনটা করে। তখন লিখতে বসি। একান্ত লিখে উঠতে না পারলে মাথার ভেতর নিয়ে ঘুরে ফিরি- মন্দ লাগে না।


প্রশ্ন : ভবিষ্যতে আর কী কী বিষয় নিয়ে কাজ করার চিন্তা আছে?
উত্তর : ব্যক্তিজীবনে আমি খুব একটা হিসেবী মানুষ নই। জীবনটা আমার কাছে কোনো অংক নয়; বরং অনেকটা ভূগোলের মতো। যেকোনো সময় তার আচরণ পাল্টে যেতে পারে। এই ভালো-এই মন্দ। ভবিষ্যতে কী নিয়ে কাজ করবো তা ভবিষ্যতেই বলতে পারবো। আপাতত পরের স্টেশনে যাওয়া মতো টিকিট কাটা আছে আমার। সেই পথটুকুই যেতে চাই। তারপর না হয় পরের স্টেশনের টিকিট কাটবো।


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন