শুক্রবার, ৪ অক্টোবর, ২০১৩

বর্তমানের নগদমূল্য তিনি প্রায় কিছুই পাননি

হীরেন চট্টোপাধ্যায়

দুষ্প্রাপ্য জগদীশ গুপ্ত, সংকলন ও সম্পাদনা রাজীব চৌধুরী। সপ্তর্ষি, ৩০০.০০

জগদীশ গুপ্তের রচনা মাত্রই এক অর্থে দুষ্প্রাপ্য, জগদীশ গুপ্তের অনুরাগী পাঠক সে কথা জানেন। জীবৎকালে এই লেখক বিশেষ জনপ্রিয় ছিলেন না, থাকলে প্রেমেন্দ্র মিত্র বলতেন না ‘বর্তমানের নগদমূল্য যথাযোগ্য ভাবে তিনি পাননি’। ‘ভাবীকাল যে তার ক্ষতিপূরণ করবে অনুশোচনায়’, এমন আশ্বাসও তিনি দিতে পারেননি। এবং আমরা জানি, বৃথা আশ্বাস না দিয়ে তিনি ভালই করেছেন।

বর্তমানের নগদমূল্য যে প্রায় কিছুই পাননি তার প্রমাণ, সমালোচকদেরও তাঁর সম্বন্ধে নীরবতা। পাঠকের জনপ্রিয়তা না ঘটলেও সাহিত্যের জহুরিরা যথার্থ মূল্য আবিষ্কার করেছেন, ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় থেকে কমলকুমার মজুমদার পর্যন্ত এর উদাহরণ। কিন্তু জগদীশ গুপ্তের ভাগ্যে সমালোচকদের বরাভয়ও বিশেষ জোটেনি। শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলা উপন্যাসের ধারাবাহিক ইতিহাসে তাঁর সম্বন্ধে তিলমাত্র ঔৎসুক্য দেখাননি। এই লেখক প্রসঙ্গে প্রথম সচেতন করেন সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায়, অন্যদের সামান্য কিছু অতি-সংক্ষিপ্ত মন্তব্য বাদ দিলে।



অথচ এমনটি হওয়ার কথা নয়। জগদীশ গুপ্ত ঠিক কী ধরনের বাস্তবতাবাদী মানসিকতার অধিকারী, শরৎচন্দ্রের শেষের পরিচয়উপন্যাসের সমালোচনাতেই তা তিনি বুঝিয়ে দেন। তাঁর প্রথম ছোটগল্প সংকলন বিনোদিনী-কে স্বাগত জানিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ, তাতে তিনি ‘নতুন রস ও রূপ’ দেখতে পেয়েছেন বলে। প্রথম উপন্যাস লঘুগুরু-র যে বিরাট সমালোচনা রবীন্দ্রনাথ করেন, তাঁর আক্রমণ সত্ত্বেও বলতে হবে, তাকে তিনি নিশ্চয়ই বেশ খানিকটা গুরুত্ব দিয়েছিলেন। জগদীশ গুপ্ত এর পর যে-সব উপন্যাস ও গল্প লিখেছেন, তাতে অন্তত নিজেকে স্বতন্ত্র লেখক হিসাবে প্রমাণ করতে পেরেছেন। যে সময় বস্তি, কয়লাকুঠি, শ্রমিক-মজুরদের নিয়ে গল্প লেখাটা প্রায় ফ্যাশনে পরিণত হয়েছিল, সেই সময়ে জগদীশ গুপ্তের সম্পদ ছিল মনস্তত্ত্বের সুগভীর ও অস্বস্তিকর উন্মোচন। আমরা কথার কথা হিসাবে অবচেতন মনের অবদমিত ইচ্ছার কথা বলি, কিন্তু অবচেতন মন যে সত্যিই এক হাজারদুয়ারি প্রাসাদ এবং তার গোপন দু’টি-একটি দরজা হঠাৎ খুলে গেলে যে মনের মালিক পর্যন্ত হতভম্ব হয়ে যেতে পারে, জগদীশ গুপ্ত তা দেখিয়েছেন। বাংলা সাহিত্যের এই সব মণিমানিক্য এখনও কি তেমন সমাদৃত! বোধহয় নয়।

নয় যে, তার আরও একটা কারণ, জগদীশ গুপ্তের সুসম্পাদিত গ্রন্থের অভাব। বহু দিন পর্যন্ত একমাত্র হাতে ছিল বসুমতী সাহিত্য মন্দিরেরজগদীশ গুপ্তের গ্রন্থাবলী (১৩৬০) এবং ইণ্ডিয়া অ্যাসোসিয়েটেড পাবলিশিং কোম্পানির জগদীশ গুপ্তের স্বনির্বাচিত গল্প (১৩৬৬)।
পরে গ্রন্থালয় তিন খণ্ডে জগদীশ গুপ্ত রচনাবলি বের করেছে, গল্প-সংগ্রহের দু’টি খণ্ডও প্রকাশ করেছে; কিন্তু এগুলি এত অযত্নপ্রসূত এবং অসম্পাদিত যে দেখে রীতিমত কষ্ট হয়। মুদ্রণপ্রমাদই শুধু নয়, গল্পসংগ্রহে একটি গল্প শেষ হওয়ার আগেই অন্য গল্প শুরু হয়ে যায়, এমনও আছে। রাজীব চৌধুরী সম্পাদিত দুষ্প্রাপ্য জগদীশ গুপ্ত বহু দিনের আশা পূর্ণ করেছে। জগদীশ গুপ্তের এত সুসম্পাদিত গ্রন্থ ইতোপূর্বে চোখে পড়েনি; অথবা আরও একটিই এ রকম গ্রন্থ দেখেছি— সুবীর রায়চৌধুরী সম্পাদিত জগদীশ গুপ্তের গল্প। এক1_80 নবীন গবেষক একটি প্রয়োজনীয় গ্রন্থের সুষ্ঠু সম্পাদনার জন্য যে পরিমাণ পরিশ্রম স্বীকার করেছেন ও নিষ্ঠা দেখিয়েছেন, আজকের ঔদাস্যপীড়িত শিথিল সম্পাদনার সময়ে তা দৃষ্টান্ত হতে পারে।

আলোচ্য সংগ্রহে আছে দু’টি উপন্যাস, তিনটি বড় গল্প এবং তিনটি ছোটগল্প সংগ্রহের চোদ্দটি গল্প। কবিতা তিনি রাখেননি, সম্ভবত ‘কবিতাগুলি গল্পেরই লক্ষণাক্রান্ত’ বলে। কিন্তু দু’টি কথা মনে রাখলে কিছু কবিতা এই সংকলনে রাখা যেত। প্রথম, কবিতা দিয়েই তিনি লেখালেখি শুরু করেন, সারা জীবনে প্রচুর কবিতা লিখেছেন এবং তাঁর শেষ মুদ্রিত লেখাটিও শারদীয় যুগান্তর-এ প্রকাশিত একটি কবিতা। দ্বিতীয়, কিছু লেখা সত্যিই ‘কবিতা’ হয়ে উঠেছে এবং অনেক কবিতায় গল্পকার জগদীশ গুপ্তের মানসিকতা নিখুঁত ভাবে ধরা পড়েছে, যেমন কিনা একটি কবিতার এই ক’টি পংক্তি:
‘অর্থাৎ আমি বলতে চাই যে, ব্যাহত এই জগৎ
পরাঙ্মুখীকৃত; তারে পরিপূর্ণ সুখে
পৌঁছে যেতে দেওয়া হয় না; এবং ভবিষ্যৎ
অশান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে রুখে।’
(‘অচ্যুতানন্দের তিক্ততা’)

গ্রন্থের প্রথমেই আছে দুষ্প্রাপ্য জগদীশ গুপ্ত প্রসঙ্গে। সম্পাদক ঠিকই বলেছেন, পূর্ববর্তী গবেষকদের নজরে পড়েনি জগদীশ গুপ্তের উপন্যাসআলুনী আলু। তবে তরুণ গবেষককে স্মরণ রাখতে বলব, তাঁরা অনেকেই কিন্তু শুরু করেছেন একেবারে শূন্য থেকে। স্বনির্বাচিত গল্পের প্রথম গল্পটি ছিল ‘আলুনী সাকু’, সেটি এই উপন্যাসের প্রথম কিস্তি হলে বলতেই হবে, নিজের পালিতা কন্যা সুকুমারীই তাঁর এই উপন্যাসে কেন্দ্রীয় চরিত্র; কারণ একে নিয়ে (সুকু এবং সাকু নামে) অনেক কবিতা তিনি লিখেছেন।নিষেধের পটভূমিকায় উপন্যাসটি অবশ্যই দুষ্প্রাপ্য, তবে সে অর্থে সহজলভ্য রচনা গ্রন্থালয় প্রকাশিত উদাসীন রচনাসম্ভার ছাড়া আর কোথায়!

বড় গল্পগুলি যথার্থই জগদীশ গুপ্তের সবচেয়ে দুষ্প্রাপ্য রচনা। কল্লোল, কালিকলম, প্রবর্তক প্রভৃতি পত্রিকায় অনেক সময়ই তাঁর প্রকাশিতব্য গ্রন্থের বিজ্ঞাপন ছাপা হয়েছে, কিন্তু গ্রন্থটি খুঁজে পাওয়া দুঃসাধ্য। শশাঙ্ক কবিরাজের স্ত্রী গল্পসংগ্রহে দেখা গেল তুলসী কাব্যগ্রন্থের বিজ্ঞাপন, শ্রীমতীগল্পসংগ্রহে আছে ভৃঙ্গার গ্রন্থের বিজ্ঞাপন, উদয়লেখা গ্রন্থে কঙ্কউপন্যাসের বিজ্ঞাপন ছাপা হয়েছে, ‘কালিকলম’ পত্রিকায় ‘শীঘ্রই বাহির হইবে’ হিসাবে আছে তমসার পথে-র বিজ্ঞাপন। বড় গল্প তিনটির মধ্যে ‘সমঝদার’ বসুমতী-র সংকলনগ্রন্থে আছে। আর ছোটগল্পের যে তিনটি সংকলনগ্রন্থ উদ্ধার করা হয়েছে, তার প্রত্যেকটিই দুষ্প্রাপ্য তালিকায় পড়তে পারে।

গ্রন্থের একেবারে শেষ পর্যায়ে সংকলক-সম্পাদক তাঁর পরিশ্রম ও সততার নিঃসন্দিগ্ধ প্রমাণ রেখেছেন। সংকলিত লেখার প্রত্যেকটির প্রথম প্রকাশকাল এবং এ সম্বন্ধে যাবতীয় বিবরণ দিয়েছেন। এমনকী বিভিন্ন গ্রন্থ ও পত্রিকায় প্রকাশকালে রচনায় যে-সব মুদ্রণপ্রমাদ তাঁর চোখে পড়েছে, তাদের সংশোধিত পাঠও দিয়েছেন।

যে কথাশিল্পী যাপনে ও শিল্পসৃষ্টিতে আপসহীন ছিলেন, যিনি খাঁটি সাহেবের সঙ্গে একটি ইংরেজি শব্দের বানান নিয়ে মতভেদ হওয়ায় জম্মের মতো চাকুরি ছেড়ে দেন, স্বাধীন ব্যবসা করবেন বলে ‘জগোজ ইঙ্ক’ নামক লেখার কালি প্রস্তুত করে বাজারে ছাড়েন, যিনি উপন্যাসের কলেবর একটু বৃদ্ধি করবার অনুরোধ করলে প্রকাশককে লেখেন ‘যে উপন্যাস যেখানে যখন সমাপ্ত হওয়া প্রয়োজন এবং যে ঘটনা বিস্তারের যতটুকু ক্ষেত্র আছে তার বেশি কোনো ফরমাসী লেখা আমার পক্ষে সম্ভব নয় (কলঙ্কিত তীর্থ-র ভূমিকা)’— তিনিই যে অনেক ছোট গল্পের সম্প্রসারিত রূপ হিসাবে উপন্যাস লিখেছেন, নাটক থেকে উপন্যাসে পরিবর্তন করেছেন কোনও কাহিনি, কয়েকটি ছোটগল্প নিয়ে তৈরি করেছেন একটি উপন্যাস বা ছোট গল্পের নাম ও চরিত্র পাল্টে তাকে অন্য গল্পে পরিণত করেছেন— সেই সব আচরণের সংগতি খুঁজে পাওয়া শক্ত। গোটা ব্যাপারটা নতুন করে ভাববার জন্য প্রত্যেক রচনার প্রথম প্রকাশকাল ইত্যাদি পাওয়া দরকার, এবং সে জন্যই দরকার এমন নিপুণ সম্পাদনার।

সব শেষে ধন্যবাদ প্রকাশককে এমন একটি তাৎপর্যপূর্ণ গ্রন্থ প্রকাশে উদ্যোগী হওয়ার জন্য। তবে বহু দিন হাতে হাতে ঘুরবে এমন একটি বই প্রকাশ করতে গেলে তার বাঁধাইয়ের মানও কিন্তু আর একটু ভাল হওয়া দরকার।



জগদীশ গুপ্ত (১৮৮৬-১৯৫৭)।
পরিমল গোস্বামীর তোলা ছবি, হিমানীশ গোস্বামীর সৌজন্যে।



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন