শনিবার, ১২ অক্টোবর, ২০১৩

আমি নিজেকে ভাঙতে গল্প তৈরি করেছি

মোজাফফর হোসেন


১. গল্প লিখতে শুরু করলেন কেন?
এই প্রশ্নটার উত্তর আমি নিজেও খুঁজি। যেটা হতে পারে—আমি কতগুলো সম্ভাবনাকে দাঁড় করাতে পারি। এইভাবে এজন্যে বলছি যে, আমি শুধু জানি আমার কিছুই হবার কথা ছিল না। একটা গ্রামের ছেলে—বাবা-মার এগারতম সন্তান। মা-বাবা একবার আমাকে মাদ্রাসায় পাঠালেন ‘হুজুর’ বানাবেন বলে। পরে ঐ মাদ্রাসাটা বন্ধ হয়ে গেলে ঠিক করলেন ডাক্তার বানাবেন। তারা নিজেরাও আমার ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলেন না। পরে আমি তাদের ধারণা বদলে মাধ্যমিকে বাণিজ্য বিভাগ হয়ে ইংরেজি সাহিত্যে ভর্তি হলাম।
টোটাল ব্যাপারটার ভেতর পরিষ্কারভাবে পরিকল্পনার অভাব। এক্ষেত্রে নোবেল ভাষণে নাইপলের সেই উক্তিটির কথা মনে আসছে—my background is at once exceedingly simple and exceedingly confused.

শুরুতে কবিতা লিখতাম। কেন লিখতাম—এ প্রশ্নের উত্তরও আমার অজানা। কবিতা লিখতে লিখতে মনে হল, আমি কিছু বলতে চাই যেটা কবিতায় সম্ভব নয়। বার ভাই-বোনের মাঝে বড় হয়েছি। সব গল্পই তো! আমি তাদের সবাইকে নতুন করে লিখতে চেয়েছিলাম। এজন্যই গল্প লেখা বোধহয়।

২. শুরুর লেখাগুলো কেমন ছিল?
পূর্বেই বলেছি, শুরুটা কবিতা দিয়ে। পরে দেখলাম ওটা আমার জায়গা না। basically I’s born with tales; and destined to be a teller. গল্পে আসলাম একটা প্রতিবাদ বা দ্রোহ থেকে। প্রতিবাদটা সমাজের কোনো অন্যায়-অনিয়মের বিরুদ্ধে নয়, প্রতিবাদটা নি:সঙ্গতার বিরুদ্ধে। কিংবা নিজের বিরুদ্ধে। গল্পে নিজেকে নতুন করে গড়তে চেয়েছি। আমার ভেতরের ঐ ‘রিডিকুলাস মি’কে আমি মানতে পারছিলাম না। তাই আমি নিজেকে ভাঙতে গল্প তৈরি করেছি। কিছু লিখেছি, বেশিরভাগই লিখিনি। তারপর নিজের অনেকগুলো সম্ভাবনা তৈরি করার পর এবার আমি আসল আমিকে খোঁজার চেষ্টা করছি, এটা খানিকটা পাজেল গেমের মতো।


৩. গল্প লেখার জন্য কি প্রস্তুতি নিয়েছেন? নিলে সেগুলো কেমন?
প্রস্তুতিটা নিয়েছিলাম অজান্তেই। তখনো জানি না আমি লিখবো। মফস্বলের ছেলে—একদিকে ঘরভর্তী মানুষ—অন্যদিকে অখণ্ড নীরবতা। ঐ নীরবতা ঘোচাতে আমি অস্ত্রস্বরূপ বই হাতে তুলে নিই—বয়সের তুলনায় বড্ড বেমানান সব বই। গ্যেটে, রবীন্দ্রনাথ, তলস্তয়, মানিক, বিভূতিভূষণ, মিল্টন, চেখব আমি মাধ্যমিকে থাকতেই পড়তে শুরু করি। সে বইগুলো আমার কাছে এখনো আছে। বেশিরভাগ বই পড়ে আমি কিছুই বুঝতাম না। অনেকটা ‘কি বুঝতাম না, তাও বুঝতাম না’ টাইপের! যেটুকু বুঝতাম তার চেয়ে ঐ না বোঝা অংশটুকুই আমাকে টানতো বেশি। আর আমার সঙ্গী ছিল, সঙ্গীত ও সিনেমা। এ দুটোর কাছেও আমি সমানভাবে ঋণী। আমি প্রায়ই বলি রবীন্দ্রনাথ, হেমন্ত-মান্না, সত্যজিৎ-ঋতুপর্ণ: এঁদের সবার কাছ থেকে একটু একটু করে আমি ব্যক্তিকে নির্মাণ করতে শিখেছি।

আর একটা প্রস্তুতি চলেছে আমার একেবারে অজান্তে—বুদ্ধি হওয়ার আগে থেকেই। সেটা ভিন্নগল্প, এবং ঐটাই মূল গল্প। কোনদিন জীবনী লেখা সম্ভব হলে লিখবো। এখানে আর এগুচ্ছি না।


৪. আপনার গল্পলেখার কৌশল বা ক্রাফট কি?
আমার মনে হয়, সেটা মোটাদাগে চিহ্নিত করে বলা মুশকিল। অনেক সময় গল্পই নির্ধারণ করে নেই শৈলিটা কেমন হবে। সব কাপড়ে তো আর এক বুনন চলে না! তবে আমার মনে হয়, আমি গল্প এবং বয়নশিল্প দুটোকেই সমান গুরুত্ব দিই। কিভাবে বলা হল আর কি বললো দুটোই আমার কাছে ভাবনার বিষয়।

কিছু কিছু গল্পে আমি সরলভাবে গল্পটা বলতে চেয়েছি। মানে সেখানে জটিল হওয়ার সুযোগটা ছিল না। আবার কিছু কিছু গল্প আছে আমি চাইলেও সরল হতে পারিনি। যেমন ধরুন, আমি একটা গল্পে বললাম যে আধুনিক মানুষের অস্তিত্ব মিডিয়ার হাতে নির্ভর করছে। মিডিয়া বলল ব্যক্তি নেই। রাতারাতি ব্যক্তি থেকেও নেই হয়ে গেল। এখানে যতটা সম্ভব সরল বয়নরীতি দরকার ছিল। অনেকটা কাফকার মতো খুব সহজ করে বলে দেওয়া, As Gregor Samsa awoke one morning from uneasy dreams he found himself transformed in his bed into a gigantic insect. (Metamorphosis), যেন গুরুত্ব দেওয়ার মতো কিছুই ঘটেনি! আবার একটা গল্প লিখলাম যেখানে চরিত্র বাল্যকালে যে ঘটনাগুলো ঘটবে বলে শুনেছিল, কিন্তু পরে ঘটেনি, মাঝবয়সে এসে তার মনে হয় সব ঘটেছে। রিয়ালিটি আর প্রভাবিলিটির বিষয়টাই গুলিয়ে ফেলে। ফলে সে অতীতে গিয়ে ঠিক ফিরে আসতে পারে না। একবার বলে, তার যমজ বোনটা জন্মের আগ মুহূর্তেই মারা গিয়েছিল আবার একবার বলে তারা দু’জনে একসঙ্গে বেড়ে উঠেছে। এই গল্পটা আমি চাইলেও সহজভাবে বলতে পারিনি। এটা আমার আয়ত্তে ছিল না। আমি নিজেও জানি না, ঐ চরিত্রের জীবনে কোনটা বাস্তব আর কোনটা পরাবাস্তব। কাজেই আমাকে খানিকটা জেমস জয়েস-এর পথে হাঁটতে হয়েছে।


৫. আপনার নিজের গল্প বিষয়ে আপনার নিজের বিবেচনা কি কি?
খুব বেশি কিছু হয়েছে বলে মনে হয় না। তবে ‘লিভিং টু টেল এ টেল’ ব্যাপারটা যতদিন ভেতর থেকে অনুভব করবো ততদিন লিখবো। চূড়ান্ত বিবেচনার মালিক আসলে পাঠক ও সময়। আমি এ দুটোকে বিশ্বাস করে এগুতে চাই।


৬. কার জন্য গল্প লেখেন? আপনি কি পাঠকের কথা মাথায় রেখে লেখেন? লিখলে কেনো লেখেন? আর যদি পাঠকের কথা মনে না রেখে লেখেন তাহলে কেনো পাঠককে মনে রাখেন না লেখার সময়ে?
এক্ষেত্রে আমি বলবো, আচেবে যেমনটি বলছেনে, ‘প্রত্যেকে গল্প বোনে তার নিজের জন্যে—নিজের বেঁচে থাকাকে উপভোগ্য করে তুলতে।গল্পগুলো সত্য হোক মিথ্যা হোক, ভাল হোক মন্দ হোক—তার চোখ দিয়ে জগতকে দেখবার অসম্ভব এক শক্তি নিয়ে হাজির হয়।’ [‘দি ট্রুথ অব ফিকশন’ অনুবাদক: ঐ]

এক্ষেত্রে আবার আমি এ্যমি টানের এই কথাগুলোর সঙ্গে ভীষণভাবে একমত: [...] I don’t write to dig a hole and fill it with symbols. I don’t write stories as ethnic themes. I don’t write to represent life in general. And I certainly don’t write because I have answers. If I knew everything…I wouldn’t have any stories left to imagine. If I had to write about only positive role models, I wouldn’t have enough imagination left to finish the first story.’ [In the Canon, for ALL the Wrong Reasons.]


৭. লেখালেখিটা আপনি কিভাবে দেখেন?
লেখালেখিটা একজন লেখকের কাছে বিশ্বাসের মতো। লিখতে লিখতে একজন লেখক তার ‘সত্য’কে আবিষ্কার করেন। পড়তে পড়তে একজন পাঠকও তাই করেন। এক্ষেত্রে লেখক ও পাঠকের সত্য আলাদা হতে পারে। আবার দুজনের সত্য মিলেও যেতে পারে। তাই একটা বই পড়া মানে ঐ জাতির সমগ্র ইতিহাস পড়া নয়। কেউ যদি কোনো জাতির ইতিহাস জানার জন্যে সাহিত্য পড়তে চায়, তাহলে আমি তাকে নিরুৎসাহিত করবো। আবার কেউ যদি ইতিহাস পড়ে কোনো জাতির জীবন ও সংস্কৃতি জানতে চায় তাকেও আমি সমানভাবে নিরুৎসাহিত করবো। প্রমথ চৌধুরী যে কারণে লাইব্রেরিকে হাসপাতালের ওপরে রেখেছেন সেই একই কারণে আমি, ব্যক্তিগত পাঠের ক্ষেত্রে, সাহিত্যকে ইতিহাসেরও ওপরে রাখি। কারণ আরও একটা আছে—ইতিহাসের প্রতিটি পাতা একটি শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করে, সাহিত্য করে না। সাহিত্য দুটো প্রপোজিশনকে দাড় করিয়ে দেয়, সিদ্ধান্ত নেয় ব্যক্তি। আর ইতিহাস সিদ্ধান্ত ধরে এগুতে থাকে। কাজেই আমার কাছে সাহিত্য হল ব্যক্তির অস্তিত্বমূখী এক শিল্পমাধ্যম।


৮. এখন কি লিখছেন?

এখন কিছু সমালোচনা সাহিত্য নিয়ে আছি। কথাসাহিত্যের ওপর কিছু প্রবন্ধ লিখেছিলাম, আরো কিছু লিখে সামনের বইমেলায় একটি বই করার কথা ভাবছি। আর মার্গারেট আটুডের “হান্ডস মেড’ট টেল” উপন্যাসটা একটু একটু করে অনুবাদ করছি। এই তো।


৯. আগামী কি লিখবেন?
আগামীতে ছোটগল্পের টেকনিক্যাল কিছু বিষয় নিয়ে একটা বই করার কথা ভাবছি। ছোটগল্পের টেকনিক এবং তত্ত্বীয় কিছু বিষয়ের ওপর প্রাসঙ্গিক বিশ্বসাহিত্যের কতক গল্প নিয়ে সেই গল্পে ধর্তব্য টেকনিক বা তত্ত্ব কিভাবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে সে বিষয়ের ওপর আলোকপাত থাকবে। প্রতিটি বিষয়ের ওপর দুটো করে গল্প থাকবে তুলনামূলক বিশ্লেষণ করার জন্যে।

আর সৃজনশীল কাজের ভেতর গল্প লেখালেখির পাশাপাশি উপন্যাসে হাত দিতে চাই। আগে সেই প্রস্তুতিটা ভাল মতো সারতে চাই।
০৯/২২/২০১৩


২টি মন্তব্য:

  1. লেখালেখিটা একজন লেখকের কাছে বিশ্বাসের মতো।...............good

    উত্তরমুছুন
  2. লেখক নিজেই তো একটা গল্প!

    উত্তরমুছুন