শুক্রবার, ৪ অক্টোবর, ২০১৩

তারাভাইয়ের গল্প

রেজা ঘটক

সারারাত থানা হাজতে আটক থাকার পরেও রমজানদের খোঁজে কেউ আসল না। ডাবলমুরিং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ইসমাইল হোসেন তারপরেও সকাল এগারটা পর্যন্ত খামাখা অপেক্ষা করেন। কেবল রমজানদের ছাড়াতে যেন কোনো শুখাভাক্সক্ষীর দেখা নাই। শেষ পর্যন্ত অন্য সতেরো জন হাজতবাসীর সঙ্গে রমজানদেরও কোর্টে নিয়ে যাওয়া হয়। এ্যাটেম টু মার্ডার-এর অপরাধে আদালত রমজানদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এমনকি আদালতে রমজানদের পক্ষে কোনো কৌসুলিকেও পাওয়া যায়নি। নিজের আত্মসম্মানবোধ থেকে রমজানও কাউকে সুপারিশ করার জন্য একবারও বলেনি। অগত্যা বেলা একটা নাগাদ রমজানদের চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়।
জেলখানা কেমন জায়গা ? রমজানের জানা ছিল না। যতোটুকু জানে তা ওই জেলখানার বাইরের খবর। সাজা ভোগের জন্য অপরাধীকে জেলে পাঠানো হয়। এমনকি সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ড সম্পর্কেও রজমান তেমন কিছুই জানে না। সেন্ট্রি চৌদ্দ শিকের লোহার গেট খুলতেই জেলখানার ভিতরে দুর্ভিক্ষের সময়কার খাবার আসার খবরের মতো একটা কোলাহল পড়ে গেলো। ভিতরের লোকগুলোর চোখেমুখে শিকার ধরার মতো ঔদ্ধত্যের হাতছানি। নতুন কে কে আসল ? পুরাতন কারা আসল ? কে কে মুক্তি পেলো ? কতো রাজ্যের খবর তখন চট্টগ্রাম জেলখানার মুখে। ভিতরে যাঁরা আছেন তাঁরা তো খবরের আগ্রহে জানতে চাইবেই আজ কি ঘটল?
ডানে-বাঁয়ে না তাকিয়ে সোজা হাঁটা দেয় রমজান। পিছু পিছু মইত্যা। বৃষ্টির মতো চারপাশ থেকে প্রশ্ন বর্ষিত হয়Ñ বাড়ি কোই? খবর কিঁতা? রমজান বুঝতে পারে চুপ থাকলে বিপদ বেশি। ভিতরে ভিতরে চার হাতপায়ে প্রস্তুতি নেয় রমজান। একজন কয়েদি একেবারে গায়ে ধাক্কা মেরেই জিজ্ঞেস করেনÑ কী অইলো, কঁতা কানে যায় না? রমজান এবার মুখ খোলে। বাড়ি দিয়া তোর কাম কী? সঙ্গে সঙ্গে দুতিনজন কয়েদি তো রমজানের উদ্দেশ্যে বুনো মহিষের মতো তেড়ে আসেন। রমজান চিৎকার করে বলতে থাকেÑ খবরদার ! জান খাইয়া ফালামু কিন্তু। অল্প ওষুধেই কাজ হয়। তেরে আসা তিনজন কিছুটা ব্রেক কসার মতো থেমে আবার জিজ্ঞেস করেনÑ বাড়ির কঁতায় কী জাত যাবেনে? খুন না ডাকাতি?
রমজান কিছুটা স্বস্থির সাথে তখন ছোট্ট জবাব দেয়Ñ খুন। শুনে মইত্যা ভালো করে একবার রমজানের দিকে তাকায়। খুন করলাম কখন? রমজাইন্যা এইডা কী কইলো? নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারে না মইত্যা। যা বলার রমজাইন্যাই বলুক ভেবে মইত্যা আগন্তুকদের দিকে শিয়ালের কবল থেকে রক্ষা পাওয়া মোরগের মতো ভয়ে ভয়ে চোখ বোলায়। প্রথম প্রশ্নের জবাব জানার জন্য তখনো উৎসুক দুএকজন বাড়ির কথা জিজ্ঞেস করেন। এবার রমজান স্বভাবসুলভ জবাব দেয়Ñ বাড়ি, রাউজান। অমনি অদূরে দাঁড়ানো তারাভাইয়ের লোকজন সবাইকে সরে যেতে বললে অনেকটা গাঁওগেরামের হাটের ক্যানবাচারদের লেকচার দেওয়ার মতো সবাই খানিকটা জায়গা করে দিলো রমজানদের। আমাদের মন্ত্রী মহোদয়গণ কোনো ফলক উন্মোচনের সময় দলীয় লোকজন গায়েগায়ে দাঁড়িয়ে যেভাবে মন্ত্রী মহোদয়কে অভ্যর্থনা জানায়, সেরকম অভ্যর্থনা না দিলেও, যার যার জায়গায় দাঁড়িয়ে থেকেই সবাই রমজানদের সরাসরি হেঁটে যাওয়া প্রত্যক্ষ করতে থাকেন। অতি উৎসাহী দুএকজন দ্বিতীয় প্রশ্নের জবাব শোনার জন্য তখনো রমজানদের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করে চলেন। কেউ একজন জোর গলায় রমজানদের পক্ষে জবাবটাও হাঁকলোÑ খুন ছাড়া রাউজানের কেউ জেলখানায় আসে নাকি? রমজান আর মইত্যার হাঁটা থামে তারাভাইয়ের কাছাকাছি এসে। তারাভাই দশ-পনেরো জন কয়েদি বেষ্টিত অবস্থায় এতোক্ষণ বেশ খোশ মেজাজেই ছিলেন। এবার স্বয়ং তারাভাই জিজ্ঞেস করেনÑ রাউজান্যা, কনইক্যা আছোনা? রমজান জবাব দেয়- আঁরার বাড়ি, বদ্দা।
Ñ কোন্নৎ বাড়ি?
Ñ চৌদুরী বাড়ি।
একজন সাগরেদকে বাম হাতটা টেপার জন্য বাড়িয়ে দিতে দিতে কপালে ভাঁজ তুলে তারাভাই এবার মইত্যার উদ্দেশ্যে চোখ না খুলেই জিজ্ঞেস করেনÑ তোঁয়ারার বাড়ি হঁন্ডে? মইত্যার বদলে জবাবটা রমজানই দেয়Ñ সন্দ্বীপ। খুব বালো কোতাÑ বলতে বলতে তারাভাই একজন সাগরেদের ঘাড়ে অনেকটা ইজি চেয়ারের মতো নিজের শরীরটা এলিয়ে দিয়ে ডান হাতটা একবার মাছি তাড়ানোর মতো করে গভীর পুলকে শীতকালীন মধ্যাহ্নের মজাদার রোদ পোহাতে ব্যাকুল হয়ে পরেন। রমজান বা মইত্যা কেউই তারাভাইয়ের সেই রহস্যময় ইশারার কিছুই বুঝতে পারে না। এরপর তারাভাইয়ের লোকজন রমজান আর মইত্যার সেবাযতেœ উঠে পরে লেগে যায়। জেলখানায়ও যে এতো কদর তা রমজান বা মইত্যার কারোরই আগে জানা ছিল না।
বউবাজারের মোড় থেকে রমজানকে যখন পুলিশ ধরল, সে দৃশ্য দেখেছিল মাত্র একজন। চায়ের দোকানদার বরিশাইল্ল্যা ছালাম। করীম দস্তগীরের বাড়িতে টিউশনি শেষে প্রায়ই রমজান ছালামের দোকানে চা সিগারেট খেতো। প্রায় দুবছর ধরে রমজান মাস্টারকে চেনে ছালাম্যা। রমজানের মতো মাস্টার এ পাড়ায় আর কেউ নাই। রমজানের কাছে যার ছেলে মেয়েই প্রাইভেট পড়ক না কেন, ভালো রেজাল্ট সে করবেই। আর রমজানের মতো ভালো ছেলে বউবাজারে তেমন কেউ আসলে তো? দেখা হলেই জিজ্ঞেস করবেÑ ছালাম ভাই ক্যামুন আছেন? সেই রমজান মাস্টারকে ডাবলমুরিং থানার পুলিশ ধরে নিয়ে গেলে ছালাম কি আর বসে থাকতে পারে!
নতুন করে দেওয়া চায়ের পানি তখনো কেটলিতে ভালোভাবে ফোঁটেনি। তড়িঘড়ি করে চুলা নিভিয়ে এক ঝাঁপের দরজা বন্ধ করল ছালাম্যা। আবুল বিড়ির সঙ্গে কয়েকটিমাত্র কাঠিযুক্ত ডলফিন ম্যাচটা কোমড়ের থামিতে গুঁজে খালি গায় খালি পায় বেরিয়ে পড়ল দোকানদার। ঘাসের ডগার শিশিরের মতো তার কপালে কয়েক ফোঁটা ঘাম টলমল ফুটছিল তখন। বিশ্বরোডের মুখে এসে চারদিকে একবার তাকালো ছালাম্যা। রমজান মাস্টারের বাসা কোথায় তাও জানা নেই তার। পরিচিত যাকে পাচ্ছিল তাকেই জিজ্ঞেস করল। রমজান মাস্টারের বাসা কেউ চেনে না। বছর তিনেক আগে বরিশালের বানড়িপাড়া থেকে বউবাজারে ফ্যামিলিসহ এসে ওঠে ছালাম। চাটগাঁর আঞ্চলিক ভাষাটা এখনো পুরোপুরি বোঝে না ছালাম্যা। বউবাজারের মোড়ে টোঙ মতো একটা দোকান তুলে চা-সিগারেট বিক্রির ব্যবসা তার। তাও ডগি কামাইল্যারে মাসে মাসে পঞ্চাশ টাকা দিতে হয়। উচ্ছেদ-হুমকি থেকে রেহাই পেতে ডাবলমুরিং থানার পুলিশদের জন্যও মাঝেমধ্যে পঞ্চাশ একশ গুনতে হয়। এরকম টানাটানির ব্যবসার ওপর পাঁচ পেটের সংসার ছালাম্যার। ঘণ্টা দুই এরে ওরে জিজ্ঞাসা করে কোনো কুলকিনারা না পেয়ে বউয়ের কাছে পরামর্শ করতে বাড়িতে গেল ছালাম্যা। এবারো কোনো লাভ হয় না। উল্টো পুলিশের কথা শুনে ছালামের বউ ছালাম্যারে আর রাস্তায় বের হতে দেয় না।
সারারাত ডাবলমুড়িং থানার হাজতখানায় রমজান আর মইত্যার জন্য কেউ আসল না। ওরা নিজেরাও কাউকে কিছু বলল না। কাউকে কোন খবরও পাঠাল না। অনেকটা কপালে যা আছে তাই পরখ করতেই যেন মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল রমজাইন্যা। আর মইত্যা তো আরেক হাবা। রমজান মাস্টোর সঙ্গে থাকলে তার আবার কীসের চিন্তা? হাজতখানার মধ্যে যে অন্য এক জগত, তা বাস্তব অভিজ্ঞতা ছাড়া অনুমান করা কার বাপের ব্যাটার সাধ্য? হিরোইনচিদের আবার হাজতখানায় আলাদা কদর। নেশার টাইম হইলে হয় ওদের হিরোইন জোগার কইরা দিতে হইবো, নতুবা গালাগাল দিয়া কোন রকম মুচলেকা ছাড়াই ছাইরা দিতে হয়। আড়াইঘন্টায় এক হিরুর কান্ডকীর্তি দেইখা রমজান আর মইত্যা বেশ খোশ মেজাজেই ছিল। মনেই হচ্ছিল না যে তাদের পুলিশে ধইরা আনছে। মনে হইতাছে শখ কইরা কোন উজবুক দেশে ঢুইকা আজগুবি সব ব্যাপার স্যাপার এনজয় করতাছে। রাত আড়াইটায় হিরু মিঞারে সেচ্ছায় পুলিশ ছেড়ে দেওয়ার পর প্রথম ওদের মনে হল, এটা থানা হাজতখানা। 
পরদিন একটু বেলা করেই দোকান খোলে ছালাম্যা। মনের মধ্যে তখনো রমজান মাস্টারের কী হলো সে চিন্তা ঘুরপাক খায়। ভুল করে দুবার লিকার দিয়ে ফেললো চায়ে। কেটলির পানি ফেলে নতুন করে পানি চড়াতে রাস্তা ক্রস করে এপারে আসতেই ছালাম্যার চোখ পরলো নাঈমের রিকশায়। নাঈমকে ছালাম্যা ভালোমতোই চেনে। নাঈম ভাই যে রমজান মাস্টোরের বন্ধু, তাও জানে।
সব্বোনাশ হইয়া গ্যাছে নাঈম ভাইÑ ছালাম্যার চিৎকারে নাঈম রিকশাঅলার ময়লাযুক্ত স্যাতস্যাতে ভেঁজা শার্টে হাত ছুঁইয়ে থামার ইঙ্গিত দিয়ে পাল্টা জিজ্ঞাসা করেÑ কী অইছে ছালাম্যা?
Ñ আপনে গো রমজান মাস্টোররে পুলিশে ধইরা লইয়া গ্যাছে।
ছালাম্যা থামতে না থামতে নাঈম আবার প্রশ্ন করেÑ কহন?
Ñ কাইল সন্ধ্যার কালে, বলতে বলতে ছালাম্যা কোমরে প্যাঁচানো গামছা খুলে তার টেনশানি মুখ মোছে।
Ñ আইচ্ছা, আঁই দেইরÑ বলে নাঈম কিছুটা দ্রুততার সাথে রিকশাঅলাকে বড়পুল যাওয়ার নির্দেশ দেয়।
নাঈমের মাথায় তখন দুনিয়ার চিন্তা। রমজাইন্যা তো সে রকম পোলা না। ক্লাস সিক্স থেকে চিনি। কোনোদিন কারো সাথে গণ্ডগোলতো দূরের কথা একটু মনোমালিন্য পর্যন্ত হয়নি। সবার সাথেই রমজাইন্যার গলায় গলায় খাতির। রমজাইন্যারে পুলিশে ধরবে ক্যান? বউবাজারে কারোর সাথে ঝগড়া হলে তো আমারেই আগে কওনের কথা। নাকি পুলিশ ভুল কইরা রমজাইন্যারে ধরলো। হাউগার জ্যাম পরতে আর সময় পাইলো না। কচিকণ্ঠ বিদ্যা নিকেতনের সামনে বেলা দশটা বাজলেই হলো। ইশকুল ছুটি হলে ঢাকার রাস্তার মতো জ্যাম লাগে এই পোর্ট কানেকটিং রোডেও। মাগীর পোলাগো গাড়ি রাহার জায়গা ওগোর বাপের রাস্তায়। ঢ্যামনি ম্যাগিগুলার কারবার দ্যাখো। লজ্জা সরমও করে না। একদম তলপ্যাট পর্যন্ত দ্যাখানো লাগবো। আর ব্যাটাগুলোনও বা ক্যামুন আহম্মক! বউদেরই পাঠানো লাগবে স্কুলে বাচ্চা আনতে।
বাম দিয়া কাইটা যাওÑ ধমকের সুরেই নাঈম রিকশাঅলাকে নির্দেশ দেয়। আর একটু হলেই তিন মন ওজনের খালাম্মা তাঁর দেড় মন ওজনের তুলার বস্তার মতো ঢেউশ মেয়েটাকে নিয়ে নাঈমের রিকশাকেই প্রায় ধরাসাই করতো। যাক অল্পের জন্য বাঁচা গেলো। এ সময় ট্রাকগুলোরই বা কি এতো জরুরি কাম যে, ভ্যাড়ার পালের মতো বন্দরের দিকে ছুটতে হবে। ওই মিঞা খাড়ায়া খাড়ায়া কী দ্যাখো? ডান পাশের একটা খালি রিকশার চালককে নাঈম কড়া ধমক লাগায়। দিশেহারা খালি রিকশার চালক কী জবাব দিতে চাইলো, তা না শুনেই নাঈম লাফ দিয়ে রিকশা থেকে নেমে ডান হাতে সজোরে এক ঘা বসিয়ে দেয় খালি গায়ে দস্তার মোটা চেইন পরা যাত্রীবিহীন সেই রিকশার চালককে। যার বাম হাতের অর্ধেক পোড়া নেভি ফিল্টার সিগারেট সিটকে পরে নাঈমের রিকশায়। মার-খাওয়া রিকশাঅলা কিছু একটা বলবে বা পাল্টা এক ঘা দেবার প্রস্তুতি নিতে নিতে নাঈম সপাসপ আরো দুঘা বসিয়ে দেয় তাকে। ইতোমধ্যে কয়েকটি রিকশা গায়ে গায়ে নব দম্পত্তির মতো জড়িয়ে আচ্ছামতো জটলাটা পাকায়। নাঈম তখনো কেউটে সাপের মতো ফুঁসছে। রমজাইন্যাকে পুলিশে ধরার দায়ে দায়ী যেনো এই খালি গায়ে দস্তার চেইন পরা রিকশাঅলাটা!
ওদিকে তারাভাই সিগারেটে লম্বা একটা সুখটান দিয়ে রমজানকে জিগায়Ñ তোঁয়ারা দুইজন ধরা পইজ্য না? রমজান কি জবাব দেবে? ব্যাটা মইত্যা এর আগেও নাকি দুতিনবার থানা হাজত খাটছে। কিন্তু পুলিশের ভ্যানে ওঠার পর থেকে কাঁন্দন সেই যে শুরু হলো, তার আর ক্ষান্তি নেই। কিছুক্ষণ চুপ তো আবার বাউলার মার মতো হাউমাউ করে ওঠে মইত্যা। মা-বাপ মরলেও মানুষে এমুন কাঁন্দে কিনা সন্দেহ। তারাভাই ওঁয়ারে এ্যাট্টু থামতে কনÑ ইশারা করে রমজান বলতে শুরু করেÑ ব্যাপার তেমন কিচ্ছু না। বউবাজারে করীম দস্তগীরের পোঁয়ারে পড়াই ছালাম ভাইর দোকানের দিকে আইতেছিলাম। দ্যাখি, গলির মুখে মইত্যারে চার-পাঁচজনে মিল্ল্যা মারতাছে। সব জুনিয়র পোলাপাইন। জিগাইলাম ব্যাপার কী ? তোঁয়ারা ইতারে মারর ক্যা? কওয়া নাই, বলা নাই আমারেও মারতে শুরু করলো। আমি কি আর বইস্যা থাক্কুম? পাশে পাইলাম কচা। জারে কয় কাউফলার কচা। একটা ভাইঙ্গা আমিও শুরু করলাম। দুতিনডারে কয়ডা দিলেই দৌড়। একটার সঙ্গে মইত্যা তখনো ঠাসাঠাসি করতাছে। সেইডারে দিলাম এক্কেয়ারে মাথায়। মাথা ফাইট্টা বোয়াল মাছের মতো হা অইয়া ফিনকি দিয়া রক্ত বাইরাইলো। ভাঙা কচা ফ্যালাইয়া হাঁটা ধরলাম। কোত থাইকা পুলিশের একটা ভ্যান আইসা মইত্যারে ধরে হাতেনাতে। আমি যেনো এসবের কিছুই জানি না। সোজা রাস্তা ধইরা ছালাম্যার দোকানের দিকে যাইতাছি। পুলিশের গাড়িটা ঠিক আমার পাশে আসতেই দুজন পুলিশ লাফাইয়া নামল। আমারে কয়Ñ গাড়িতে ওঠ।
তারাভাই এবার আরো উৎসুক হয়ে জিগায়Ñ ইবা কি জ্যাঁতা আঁচিল না?
Ñ কী জানি। রমজানের ছোট্ট জবাব। এবার তারাভাই মইত্যার দিকে নজর দেয়। এ্যাতো কাঁন্দোন কীয়র? রাউজান্যা পোয়ার লগে ধরা পঁইজ্যো না, মাইরতো অটোমেটিক মাফ হইয়্যা গ্যাছে। এ্যায়া কিয়র লাই কাঁন্দোর?
Ñ তারাভাই, তুঁই আঁরে বাঁচো। বলে মইত্যা আরো জোরে বাচ্চা শিশুর মতো হাউমাউ করে ওঠে। এ সময় একজন সাগরেদ এতোক্ষণ ধরে বানানো গাঁজার স্টিকটা তারভাইয়ের হাতে দিয়ে বলেÑ ওস্তাদ ধরান।
তারাভাইয়ের সঙ্গের লোকগুলো এতোক্ষণ মনোযোগের সাথে গাঁজা বানানো দেখছিল আর ওদের আলাপচারিতা শুনছিল। তাদের মধ্য থেকে চিকন রোগা পাতলা তালপাতার সেপাইয়ের মতো একজন উঠে এসে তারাভাইয়ের ঠোঁটে ধরা গাঁজার স্টিকে ম্যাচের সাহায্যে আগুন ধরিয়ে দেয়। তারাভাই মইত্যার ওপর থেকে চোখ ঘুরিয়ে গাঁজার জ্বলন্ত আগুনে রেখে লম্বা একটা টান দিয়ে সবটুকু ধোঁয়া গিলে ফেলার জন্য মেরদণ্ড সোজা করে পিট পিট চোখে আবার মইত্যার দিকে তাকিয়ে জানতে চায়Ñ কিঁয়র লাই তোর লগে বাদাবাদি অইয়্যে?
মইত্যার কান্নায় বিরাম পরতে এতোক্ষণে একটা যুতসই ব্যাপার ঘটলো। এবার মইত্যা বলতে শুরু করেÑ বউবাজারের এ্যাট্টা মাইয়ার লগে আঁয়ার পিড়িত। রোজ একবার দ্যাহা না অইলে আঁয়ার ভালো লাগে না, তারাভাই। পরানডা ছটফট করে। কাইলও আইলাম চাঁইতে। পোঁয়াগুলান ডেইলি আঁয়ারে ফলো করতো। কিচ্ছু ন্য কয়। শহিদ স্মৃতি ক্লাবে ওঁরা ক্যারাম খ্যালতাছিল। ক্লাবের উল্টাপাড়োত সঞ্জিতাগো বাসা। সঞ্জিতা, আঁরে দেই দোতালার বারান্দায় আঁইয়ারে চিঠিয়ান ফ্যালাইয়্যে। আঁই নিচু অঁইয়ারে চিঠিয়ান যেই তুল্লি, এ্যানে আচম্বিৎ চারমুইক্যাতুন আঁরে যেন কিলঘুষি মাইজ্যে। 
হু, ইন্টারেস্টিং কাহিনীÑ বলে তারাভাই লম্বা একটা টান মেরে গাঁজার স্টিকটা ডানপাশে বসা কোকিল চক্ষুর লোকটিকে দেয়। এ পর্যায়ে লোহার ডান্ডি পরা খোঁচা খোঁচা দাড়ির একজন কয়েদি লুলা মানুষের মতো হাঁটু বাঁকিয়ে হাঁটতে হাঁটতে এসে গায়ের ময়লা গেঞ্জির ভাঁজ খুলে দুটো ফেন্সিডাইলের বোতল তারাভাইয়ের উদ্দেশ্যে দিতে দিতে বলেÑ ওস্তাদ, পুলিশে নাকি মাল কিছু রাইখা দিছে।
মইত্যা অদ্ভূত কায়ার বেটে লোকটার দিকে একবার তাকিয়ে আবার বলতে থাকেÑ বিশ্বাস করেন তারাভাই, পাক্কা এক বৎসরের পেরেম। আঁর চিডিয়ান আর দিন্ন পারি। তয় সঞ্চিতার চিঁডিও ইতারা নিন ন্য পারে। এ পর্যায়ে তারাভাই অভয় দিয়ে বলে ওঠেÑ সাব্বাস, বাপের ব্যাটা সাদ্দাম। তো চিডিয়ান পইরা শোনাও, কী ল্যাখছে, শুনি।
ওদিকে বড়পুলে পৌঁছে নাঈম তাসফিয়া বুক লাইব্রেরিতে পায় মিঠুকে। মিঠু কাঠের চেয়ারে ঠেস দিয়ে আরামছে পড়ছিল আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের দোজখের ওম না তাকিয়েই আগšকের উদ্দেশে বলে ওঠেÑ সেট ভালো নেই। টেলিফোন করা যাবে না। নাঈম রিকশা'অলাকে মারার সময় যে মেজাজে ছিল, তার চেয়ে দ্বিগুণ মেজাকে প্রতিবাদ করে উঠলোÑ মাগির পোঁয়া, আঁই ফোন করতে ন্য আসি। রমজাইন্যারে পুলিশে ধইজ্যে। এ্যাঁনে কী করবি ক্য? মিঠু হাতের চাবিগোছা দিয়ে দোজখের ওমের খোলা পাতায় চাপা দিতে দিতে বলেÑ কহোন? কিঁয়র লাই? আঁই জানলে কি আর মাগির পো তোঁয়ার কাছে আইরন্যা? ক্ষিপ্রতার সঙ্গে জবাব দেয় নাঈম। মিঠুর সামনাসামনি হাতগুটিয়ে এতোক্ষণ নিরবে নিরামিশ বসেছিলেন দোকান মাকিল রইসউদ্দিন। ঘটনা বুঝতে পেরে নাঈমকে তিনিই প্রশ্ন করেনÑ কোন রমজাইন্যা? আন্নেগো মাস্টোর?
হ বদ্দাÑ সংক্ষিপ্ত জবাব দেয় নাঈম। শুনে রইসউদ্দিনের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে। ছোটবেলা থেকেই রমজানকে ভালো ছেলে হিসেবে চেনেন তিনি। ধোপার দিঘির পশ্চিম পাড়োত রমজানদের বাসা। বড়ো ভাইটা রকমান বন্দরের সিকিউরিটি ইন্সপেক্টর হলেও একটু মাস্তান টাইপের। পোর্ট কোলোনিতে রকমান অনেক মাস্তানি করলেও রমজান একেবারে সোনার টুকরা ছেলে। ছোট্ট বেলা বাপ মরলেও রকমানের মতো মাস্তান হয় নাই। ম্যাট্রিকে-ইন্টারমিডিয়েটে ভালো রেজাল্ট করার পর চিটাগাং ইউনিভার্সিটিতে বিবিএ পড়তাছে। বয়স কুঁড়ি একুশ হলেও এই অল্পবয়সেই ভালোই কামাই করতাছে। ইচ্ছামতো দুহাতে টাকাও ওড়াচ্ছে। মন দিয়ে লেখাপড়া করে মাস্টোর। আমাদের খোকনও রমজান মাস্টোরের কাছে অঙ্ক, ইংলিশ পড়তে চায়। মাস্টোরের এ্যাতো সময় কই? সেদিন কইলÑ কলেজের ব্যাচটা শেষ হলেই খোকনরে পড়াব। আঁন্নে কোনো চিন্তা ন গরন, বদ্দা। এমুন মাটির মানুষ রমজান মাস্টোররে পুলিশে ধইজ্যে কিঁয়র লাই? রইসউদ্দিন কিছুতেই এ প্রশ্নের জবাব খুঁজে পায় না। নাঈম-মিঠুদের উদ্দেশ্যে তিনি দরদি কন্ঠে বলেনÑ তোঁয়ারা থানাত যও। টেঁয়া পয়সা লাইলে আঁরে ফোন দিও। রইসউদ্দিনের কথা শেষ না হতেই নাঈম আর মিঠু ডাবলমুরিং থানার উদ্দেশে রওনা দেয়।
সঞ্জিতা মইত্যারে চিঠিতে কি লিখেছে তা শোনার জন্য তারাভাইয়ের ব্যাপক আগ্রহ দেখে রমজান আবার মুখ খুললÑ ওই মাগির পোঁয়ার হ্যাঁডাম আঁচেনি? চিঠিতো আঁরগো লিখ্যা দেওন লাগে, তারাভাই। শুনতে চাইলে আঁয়ার পড়ি শোনান লাগবো। তারাভাই এবার মইত্যারে চিঠিখানা বের করার নির্দেশ দিয়ে একটা ছয় ইঞ্জি বোতলের মুখ উন্মোচন করে ঢক ঢক অমৃত পান করে নেন। রোদ্দুর আইয়া পড়ছে, ওই গাছতলার নিচন লওÑ বলে নিজেই আগে ওঠেন তারাভাই। তারাভাইয়ের নতুন পুরাতন শিষ্যকুলও তার পিছু পিছু সেদিকে যায়।
চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের এই একটা ভালো দিক। বয়সি সিরিজ কড়াই গাছগুলো ছায়ার স্নেহে কয়েদিদের একটু যা স্বস্তি দেয়। কোনো কোনো গাছের বয়স তো আশি বা একশো বা তারও বেশি। গাছগুলোর শাখা-প্রশাখায় নানা দেশের নানান পাখিরা এসে কয়েদিদের বাংলার ষড়ঋতুকে মনে করিয়ে দেয়। যে কড়াই গাছটায় তারাভাই পিঠ ঠেকিয়ে বসেছেন, তার সঙ্গে তারাভাইয়ের বারো বৎসরের বন্ধুত্ব। কড়াই গাছটার যে অংশে তারাভাই পিঠ ঠেকিয়েছেন তার রঙ জোলেখার পেটের রঙের সঙ্গে' যেন অনেকটাই মিলে যায়। জোলেখাকে বিয়ে করার আড়াই বৎসরের মাথায় তারাভাই পিতা হওয়ার গৌরব লাভ করেন। আর পুত্র সিরাজের বয়স এক বৎসর না পুরতেই নীলমনি ধোপা হত্যাকাণ্ডে তারাভাইয়ের যাবজ্জীবন জেল হয়। প্রথমদিকে জেলখানায় জোলেখার জন্য তারাভাইয়ের কী যে কষ্ট হতো। কড়াইগাছটার এখানটায় বসেই তখন মনের ছটফটানি দূর করতো তারাভাই দিবা স্বপ্ন দেখে দেখে। এখন ওসব সয়ে গেছে। জেলখানার নেতা বনে যাওয়ার পর আয় রোজগার মাশাল্লা ভালোই। জোলেখার মুখেও বাঁশখালীর ভাঙ্গা সেঁতুটার মতো সেই হাহাকার আর নেই। সিরাজ স্কুলে যায়। গত বৎসর ক্লাস ফাইভে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়েছে সিরাজ। দৈনিক পত্রিকায় তখন সিরাজের ছবিও ছাপা হয়েছিল। ইস্পাহানী পাবলিক স্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি হওয়ার পর শিক্ষকরাও সিরাজের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। অঙ্কের নতুন শিক্ষক ক্লাসে একদিন সিরাজকে জিজ্ঞাসা করেছিলেনÑ তোমার বাবা কি করেন? সিরাজ কোনো জবাব না দিয়ে ফুঁপিয়ে ডুকরে উঠেছিল। ঘটনাটা তখন হেডমাস্টার পর্যন্ত গড়িয়েছিল। এখন আর সিরাজকে কেউ এ ধরনের প্রশ্ন করে না।
ডাবলমুরিং থানায় এসে নাঈম আর মিঠু খুবই হতাশ। একঘণ্টা আগেই চালান হয়েছে ওদের। এখন উপায় একমাত্র উকিল ধরা। কার্তিক ভান্ডারি ছাড়া তেমন কোনো উকিলকে ভালো চেনেও না ওরা। কিন্তু কার্তিক ভাণ্ডারিকে কি এখন পাওয়া যাবে? ক্ষীপ্রতার সঙ্গে থানা থেকে বের হয় ওরা।  পাছে এসআই শাহজাহান কোন কথায় ওদেরকে হেনস্তা করে সে ভয়তো রয়েছেই। এমনিতে নাঈমের নামে দুতিনটা রাজনৈতিক মামলা আছে থানায়। বেশি রিক্স নেওয়া ঠিক হবে না। রকমান ভাইরে একটা ফোন করা যায়Ñ বলতে বলতে রিকশায় ওঠে নাঈম আর মিঠু। রকমান ভাইর বন্দরে যেমন প্রভাব তাতে দুচারজন উকিল জানাশোনা থাকতেই পারে। দ্যাখলি না আলিম্যারে গতমাসে এক ঘণ্টার মধ্যে জামিন করাইলো রকমান ভাই। মিঠুর কথায় সায় দিয়ে নাঈম বলেÑ এতোক্ষণ হুদাই ব্যাবাক টাইম নষ্ট করছি। চল রকমান ভাইরে সব কই।
তারাভাইর যারা চ্যালা চামচা, খাবারে তাদের কোনো কমতি নেই। ইতোমধ্যে দুপুরের খাবার নিয়ে গাছতলায় হাজির হয়েছে কয়েদি মোসলেম। মোসলেম তারাভাইকে ভালোই সম্মান করেন। তাকে দেখে তারাভাই প্রশ্ন করেনÑ কি ব্যাপার মোসলেম? আমার দুইজন মেহমান আছে, তোমারে তা কেউ কয় নাইজবাবে মোসলেম ডালের বালতির দিকে তাকিয়ে হাত কচলাতে থাকে। তারাভাই তখন যুদ্ধেক্ষেত্রের জেনারেলদের মতো জোড়গলায় কমান্ড করেনÑ দুই প্যাকেট বিরানি পাঠাও, জলদি। তারাভাইয়ের নির্দেশ পেয়ে মোসলেম ভাত তরকারি ডেকসি ভরা চারচাকার ঠেলাগাড়ি রেখে দ্রুত পা চালায়।
কড়াই গাছতলা থেকে জেলখানার উঁচু দেওয়াল বেশি দূরে নয়। দেওয়ালের ওপরের দিকে আবার বৎসর তিনেক হলো তারকাঁটার বেড়া দেওয়া হয়েছে। দেওয়ালের কোল ঘেঁষে যে বয়সি কাঁঠাল গাছটা, ওটায় কাঁঠালের যে ছড়াছড়ি, হঠাৎ তাকালে মনে হবে বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে বুঝিবা শিয়ালের কোন দাবী আদায়ের মিছিল। ওই কাঁঠাল গাছটা থেকেই তিন বছর আগে জেলখানা থেকে পালনোর সময় করম গাজী পা ভেঙ্গেছিলেন। ভাঙ্গা পা ভালো হাওয়ার আগেই চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে ফের করম গাজী পালায়। পরের বৎসর বাঁশখালীতে পুলিশের গুলিতে যে তিনজন ডাকাত মারা যায়, তার মধ্যে করম গাজীও ছিল। করম গাজীর মৃত্যু সংবাদ চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে পৌঁছামাত্র রাউজানের আধিপত্য খর্ব করার জন্য সেদিন অন্য কয়েদিরা মিলে রাউজানবাসী কয়েদিদের ওপর কালবৈশাখী ঝড়ের মতো হঠাৎ হামলা চালিয়েছিল। সেদিনই  তারাভাই দেখিয়ে দেয় করম গাজী মরলেও রাউজানের কর্তৃত্ব জেলখানায় কীভাবে অটুট থাকে। ছয়জনের শুধু মাথা ফাঁটলো, হাত-পা ভাঙলো আট দশজনের। নরেন মাস্টারের মতো গো-বেচারা যিনি কিনা মিথ্যা মামলায় আসামি হিসেবে খামাখা জেল খাটছেন, সেই নিরিহ মাস্টার পর্যন্ত তারাভাইয়ের কিলঘুষি থেকে সেদিন রেহাই পায় নাই। সেদিন থেকেই জেলখানায় রাউজানের নতুন সর্দার তারাভাই। আর জেলখানায় রাউজানের কর্র্তত্ব বুঝিবা আগের চেয়েও সুপ্রতিষ্ঠিত হল। সেই থেকে তারাভাইয়ের আর কোনো অভাব থাকলো না। মাসে মাসে বাড়িতে জোলেখাকে কাড়ি কাড়ি টাকা পাঠান। তিনটা সমিল আর একটা লবণ ইন্ডাস্ট্রির মালিক এখন চট্টগ্রাম জেলখানার সর্দার তারাভাই। চট্টগ্রাম শহরে এমনকি রাউজান, বাঁশখালী, চাঁন্দনাইশ, আনোয়ারা, পটিয়ায়ও তারাভাইয়ের মার্কিন প্রেসিডেন্ট বুশের মতো বিশাল প্রভাব। কাকে কোথায় খুন করা লাগবে সে নির্দেশ জেলখানায় বসেই দেন তারাভাই। তারাভাইয়ের বেশি কদর বাড়ে নির্বাচন আসলে। দর কষাকষি হয় সোর্স মারফত। জাতীয় সংসদের নির্বাচন থেকে কলেজের ছাত্র সংসদের নির্বাচন পর্যন্ত তারাভাইয়ের হাত। তারাভাই যে পক্ষের টাকা খাবেন, নির্বাচনে জয় তাদের অনিবার্য। টাকার ভাগ অবশ্য ক্ষমতাসীনদের হাতেও কেমনে করে যেনো পৌঁছে যায়। তারাভাই অবশ্য তা নিয়ে তেমন একটা মাথা ঘামান না। দেশের প্রতিটি জেলখানায় এরকম অসংখ্য তারাভাইদের পেছনের নাটের গুরুরা অবশ্য ব্যস্ত থাকেন রাষ্ট্রীয় ফলক উন্মোচনে। অনেকে এদেরকে পেছনে গডফাদার বললেও বাস্তবে তাঁদের পরিচয় তুলে ধরার সাহস রাখবে এমন হিম্মত আছে কার? অথচ আমরা সবাই তাঁদেরকে কতো ছালাম দেই।
কতো হাজার ঘটনা আর ইতিহাস যে জড়িত তারাভাইয়ের জীবনে, কোনটার সাথেই তো অমন প্রেমপত্রের কোনো তুলনা হয় না। বেশ কৌতুহল নিয়েই তাই তারাভাই রমজানকে চিঠিখানা পড়তে বলেন। রমজান আট ভাঁজ দেওয়া পেন্সিল টানা ডায়েরির পাতায় লেখা সঞ্জিতা বড়য়ার মইত্যারে দেওয়া প্রেমপত্র পড়া শুরু করার আগে সবার দিকে একবার চোখ ঘোরায়। কেবল মইত্যার চেহারায় তখন সমুদ্রে জাহাজ ডুবে যাওয়ার আগে নাবিকের অসহায় অবস্থার মতো ছাপ থাকলেও, বাকি সবার মুখে ছুটির ঘণ্টা বাজলে শিশুদের মুখে যেমন নির্মল আনন্দ জাগে, সেরকম উপস্থিতি টের পাওয়া যায়। চোখেমুখে মিটমিট হাসির একটা স্ফুরণ তুলে রমজান মাস্টোর চিঠি পড়া শুরু করেÑ
প্রিয় আমার জান,
ভালোবাসা নিবা। কাইলা সন্ধ্যায় ওইহানে ঘুর ঘুর করছো ক্যা? বাবায়রে পল্টু নালিশ করছে। পল্টুরে মায় কইছে, তোর বন্ধুগো লইয়া ছ্যাড়ার হার মাংস আলাদা কইরা দিবি। আমার কিচ্ছু ভালো লাগতাছে না। যাদোইপ্যার দোকানে যে আংটি বানাইতে দেছো, তা লইয়া শনিবার দশটার কালে পরানগো কল পাড়ে থাকপা। খাওয়া দাওয়া ঠিকমতো কইরবা। তুমি রাইতে ঘুমাও না ক্যান? চক্ষের নিচোন কালি পড়ছে। আমি ব্যাবাক বুঝি। তয় কিচ্ছু ভালো লাগতাছে না। ভালো থাইকো।
ইতি
তোমার সঞ্জিতা।
রমজানের চিঠি পড়া শেষ হলে মাত্র দুজন ছাড়া বাকী সবাই হো হো হাসিতে যোগ দেয়। সেই হাসিতে যোগ দেয় নাই শুধু তারাভাই আর মইত্যা। তারাভাই হাসেন কী করে ? এই কড়াই গাছটার নিচে বসে জোলেখার কতো স্বপ্নের চিঠি তিনি পড়েছেন। সিরাজের একটু একটু বেড়ে ওঠা, নতুন নতুন কাণ্ডকীর্তি সব জানতে পারতেন কাগজে কলমে না লেখা জোলেখার সেই অদ্ভুদ অদৃশ্য চিঠিতে। পিতৃস্নেহের কোটিভাগের একভাগও যে তিনি পুত্র সিরাজকে দিতে পারেন নাই। স্ত্রীর ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন দীর্ঘ একটি যুগ। তিনি কেমন করে অন্যদের মতো হাসেন ! আর মইত্যা তো চিঠির আগাগোড়া এক নিমিষেই ধরতে পারে। যাদোইপ্যারে আংটি বানাতে দিছে, এই খবর সঞ্জিতা যেদিন শোনে, কী যে আনন্দের ঢেউ লেগেছিল সঞ্জিতার মনে! হারিয়ে যাওয়া ছেলে ফিরে পেয়ে মা যেমন তারে বুকে আগলে ধরে, সঞ্জিতাও তেমনি মইত্যারে বুকে জড়িয়ে ধরেছিল সেদিন। সঞ্জিতারে ছাড়া মইত্যার জীবন যে অচল পয়সার মতো নিরর্থক। মইত্যা হাসে কি করে? তারাভাই আর মইত্যার হাসি না পাওয়ায় অন্যরাও এক বিচিত্র কারণে অনেকটা লজ্বা পাওয়ার মতো নিজেদের উচ্চহাসিকে বেশিক্ষণ দীর্ঘস্থায়ী করল না।
হয়তো জেলখানায় সঙ্গের অনেকের কষ্টকে উচকে না দিয়ে তাঁদেরকে নিরব সম্মান জানাতে এই উচ্চহাসি থামানো কিনা স্পষ্ট বোঝার উপায় নেই। তবে হাসিটা থেমে পরন্ত সূর্যের নিস্তেজ রোদের মতো সেখানে ধীরে ধীরে একটা বিমুর্ত অবস্থার সৃষ্টি হল। আর যতোই সময় গড়াতে লাগল ক্রমশঃ বিমুর্ত সেই গুমোট ভাবটা কখন যে একটা সম্মিলিত দলীয় কোরাস কান্নায় রূপ পেল তা কেউ বলতে পারে না। চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের সেদিনের সেই বোবা কান্নায় একেএকে কেবল সংখ্যা বাড়তে লাগল। আর সেই বিষাদময় কান্নার মধ্যে দুর্বল চিত্তের মানুষগুলো নিজেদেরকে কেবল গভীর ভালোবাসায় পরস্পর আলিঙ্গন করতে লাগল। ঈদের কোলাকুলিতেও বুঝিবা অমন হৃদ্যতা থাকে না। পৃথিবীর অন্য গ্রহ থেকে শক্তিশালী ক্যামেরার সাহায্যে ওই দৃশ্য ধারণ করলে কারো বোঝার উপায় নেই এটা কোন জেলখানার বন্দিদের পারস্পারিক আলিঙ্গন। মনে হবে, এটা হয়তো কোন বৃন্দাবনে তীর্থদের মিলন মেলা। পৃথিবীর সব পাপ মুছে পবিত্র শরীরে তারা নিজেদেরকে সিক্ত করছেন পরস্পর বুকে বুক মিলিয়ে।    
ছয়দিন পরে জেলখানার গেটে একটা ছোট্ট সুসংবাদ নিয়ে হাজির হলো রমজান মাস্টারের দুই বন্ধু নাঈম, মিঠু, আর এ্যাডভোকেট বেলায়েত করীম। গত এক সপ্তাহে রমজান আর মইত্যার সঙ্গে তারাভাইয়ের যে কী পরিমাণ সখ্য হয়েছে, তা বোঝা গেলো ওদের বিদায় দেবার সময় তারাভাইয়ের চোখের কোণে সমুদ্র ফুঁড়ে বিরামহীন জল যখন চিকচিক করে ওঠে, তখন। মইত্যার কাঁধে হাত রেখে তারাভাই শান্তনা দেনÑ সঞ্চিতারে তুমি পাইবা। আঁই তার ব্যবস্থা করতাছি। আগামী মাসেই আঁই বাইর হইতাছি। তখন সব দ্যাখকুম।
রমজানকে কী বলবে তারাভাই, তাঁর কোনো শব্দই যে তখন ভাষা খুঁজে পায় না। সাত দিনে যে অনেক গল্প করা শেষ। একজন বন্ধুর জন্য যে এক সপ্তাহ জেল খাটলো, তারাভাইয়ের প্রথম জেলখাটার অভিজ্ঞতা তো ওই বন্ধু রমজান মাস্টারের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়।  রমজানকে বুকে নিয়ে পুত্র সিরাজের কথা স্মরণ করিয়ে দেন তারাভাই। আঁই সিরাজের লগে তোঁয়ারে দ্যাহা করাই দিবনো। রমজান আর মইত্যা যখন নাঈমদের কাছে পৌঁছায় তখনো তারাভাই সেদিকে তাকিয়ে হাত নাড়েন আর চোখ মোছেন। জেলখানার সর্দার হলেও তারাভাই যে একজন পিতা, সিরাজের মতো স্কলারশিপ পাওয়া যাঁর একটা অবুঝ পুত্র আছে। একজন হতভাগা স্বামী, জোলেখার মতো যাঁর একটা সহনীয়া বউ সংসারে। সেই তারাভাইয়ের চোখে আজ দুনিয়ার যতো জল। জেলখানার সর্দার তারাভাইয়ের এতো প্রভাব আর দাপোট থাকলেও সেই জল তিনি কোনো শক্তির জোড়েও আজ যেনো আর আটকাটে পারছেন না। রমজান আর মইত্যার মতো মুক্ত হওয়ার ইচ্ছা তারাভাইয়েরও যে মাঝে মাঝে হয়। যা তিনি কাউকে বলতে পারেন না। সেই গোপন দগদগে কষ্টটা যে আজ তারাভাইয়ের মধ্যেও হঠাৎ ফাল্গুনি কুয়াশায় জট পাকানো বিমুর্ত বারিধারার মতো টুপটাপ ঝরতে থাকে।  জেলখানার গেট বন্ধ হওয়ার আগে শেষবারের মতো রমজান আর মইত্যা পেছনে ফিরে তারাভাইকে একবার দেখলো। তারাভাই সেদিকে খেয়াল না করে চোখ মুছতে মুছতে নিরবে সোজা সেই কড়াই গাছটার দিকে হাঁটা দেয়।


১০ অক্টোবর ২০০৩ ॥ কাঁঠালবাগান

লেখক পরিচিত
রেজা ঘটক
জন্ম: ২১ এপ্রিল ১৯৭০ (৮ বৈশাখ ১৩৭৭), উত্তর বানিয়ারী, নাজিরপুর, পিরোজপুর, বাংলাদেশ।
পড়াশুনা: অর্থনীতি শাস্ত্রে স্নাতক সম্মান ও মাস্টার্স।
প্রকাশিত গ্রন্থ:
ছোটগল্প: বুনো বলেশ্বরী, ছোটগল্প সংকলন, ২০০৮। সোনার কঙ্কাল, ছোটগল্প সংকলন, ২০১০। সাধুসংঘ, ছোটগল্প সংকলন, ২০১১ । ভূমিপুত্র, ছোটগল্প সংকলন, ২০১৩
উপন্যাসমা, ২০১২। 
সমালোচনাশূন্য দশমিক শূন্য, ২০১১।
কিশোর গল্প: বয়োঃসন্ধিকাল, ২০০৫।
শিশুতোষময়নার বয়স তেরো, ২০০৩। গপ্পো টপ্পো না সত্যি, ২০১১

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন