শনিবার, ১৯ অক্টোবর, ২০১৩

বায়োডাটা

অঞ্জন আচার্য

ধোলাইখালের হাজি মিয়ার মটর গ্যারেজের পেছনে যেখানে ফালান থাকে আজ সকালে সেখানে এসে মামুন ভাই তাকে বলে গেলেন একটা বাসায় ড্রাইভারের দরকার, সে যেন আজই ওখানে যোগযোগ করে। গত কয়েক দিন ধরে মামুন ভাইকে একটা চাকরির কথা বলে আসছিল ফালান। কাজ বলতে ফালান একমাত্র ড্রাইভিংয়ের কাজটাই পারে। তার ওপর ওর জীবনের সাথে জড়িয়ে আছে কুসুম। একটা চাকরি না পাওয়া পর্যন্ত সংসারও পাততে পারছে না তারাএছাড়া গত কয়েকদিন ধরে কুসুম ফালানকে বিয়ের জন্য বেশ চাপ দিয়ে আসছেকুসুমদের বস্তির এক বাপের বয়সী গুন্ডামার্কা লোক নাকি তাকে আসতে-যেতে পথ আটকায়, অশ্লীল প্রস্তাব দেয়।

কুসুম গার্মেন্টসকর্মী। ঘরে তার অসুস্থ মা আর ছোটো ভাই। তার রোজগারেই চলে সংসার। কুসুমের ইচ্ছা ফালানকে বিয়ে করে মা-ভাই মিলে একসাথে অন্যকোথাও থাকবে। দারিদ্র্য অনেক, কিন্তু ফালান ও কুসুমের মধ্যকার ভালোবাসার অভাব নেই। অল্পেতেই খুশি থাকে দুজন। সামর্থের মধ্যে যতটুকু সম্ভব তারা একে অপরের জন্য কিছু না-কিছু করে। ফালান যে টাকা রোজগার করে তাতে করে সংসার চালানো রীতিমতো অসম্ভব। তাই একটা চাকরি তার খুব প্রয়োজন। আজ সকালে মামুন ভাই এসে বললেন- “ফালান, এক বাড়িতে তোর জন্য একটা চাকরি পাইছি। তুই আজই গিয়া যোগাযোগ কর- এই নে ঠিকানা।
বিকালের দিকে ফালান যায় মামুন ভাইয়ের পাঠানো ওই বাড়িতে। বাড়ির মালিকের সাথে কথা বলে। সাহেব খুব নরম মানুষ। এক-দুই কথা জিজ্ঞেস করার পর ফালানকে বলেন- “তাহলে কাল থেকেই কাজে লেগে যাও। আর সাথে করে এক কপি বায়োডাটা আর ছবি নিয়ে আসবে।

বায়োডাটাশব্দটি জীবনে এই প্রথম শুনলো ফালান। তবে মালিকের সামনে তা বুঝতে দিলো না। কোনোরকমে শব্দটি মনে-মনে আওরিয়ে ওই বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে সোজা গেল মুশকিল আহ্সানকারি মামুন ভাইয়ের কাছে। সব শুনে হেসে মাছি তাড়ানোর মতো করে উনি বলেন- “এইডা কোনো ঘটনাই না। যেকোনো ফটোকপির দোকানেই রেডিম্যাট বায়োডাটার ফরম পাবি।

এলাকার এক পরিচিত ফটোকপির দোকানে গিয়ে বায়োডাটা-ফরম চায় ফালান। দোকানদার অবাক হয়ে বলেন- “ওইডা দিয়া তুমি কী করবা? চাকরি খুঁজতেছ নাকি?” ফালান লজ্জা-লজ্জা মুখে হা-সূচক মাথা নাড়ায়। দোকানদার বিষয়টা গুরুত্বের সাথে নেন। ঘরে থাকা রেডিমেট ফরম ফালানকে না দিয়ে বলেন- “দাঁড়াও মিয়া, তোমার জন্য একটা সুন্দর দেইখ্যা বায়োডাটা বানাই দেই।” -এই বলে দোকানদার কম্পিউটারের সামনে গিয়ে বসেন এবং ফালানকে তার পাশে বসান। দোকানদার বলেন, আগে নাম কও।
ফালান বলে- আমার নাম তো ফালান।

দুর মিয়া, শুধু ফালান কইলে হইব, আগে পরে কিছু নাই? পুরা নাম কও।

ফালান খুব চিন্তায় পড়ে যায়। তার পুরো নাম তো তার জানা নেই। ময়মনসিংহ থাকতে তাকে অনেকে ডাকতো বল্টুবলে নামে নিজের নামের আগে বসানোর মতো একটি শব্দ পেয়ে যায় সে। বলে- বল্টু ফালান। এইবার হয় নাই?

দোকানদার ঠিকাছে ঠিকাছে বলতে বলতে 'বল্টু ফালান' লিখতে লিখতে বলেন- “এইডা কোনো নাম হইল? -এইবার বাপের নাম কও।

এবার দারুন ফ্যাসাদে পড়ে যায় ফালান। তার মা ছিল বেশ্যা। তারপর কোনো একদিন ফাদার রিগান ডি-কস্তা নামের এক পাদ্রি তাকে রাস্তায় কুড়িয়ে পেয়ে নিয়ে আসেন তার নিজের আশ্রমে। বছর দুই উনার স্নেহতলেই বেড়ে ওঠে সে। ফাদারের কাছেই তার লেখাপড়ার হাতেখাড়ি। একসময় ফাদার মারা গেলে আশ্রমের অন্যেরা বিড়াল তাড়ানোর মতো করে ফালানকে রেখে আসে এক এতিমখানায়। ফালান জানে, ইংরেজিতে ফাদারশব্দের বাংলা অর্থ 'বাবা'ওইটা তাকে ফাদারই শিখিয়েছিল।
তাই এ প্রশ্নের উত্তরে সে বলে- বাবার নাম রিগান ডি-কস্তা।

শুনে দোকানদার যেন আকাশ থেকে পড়ে। কি কও? আমি তো তোমারে এতদিন মুসলমান ভাবছি, তুমি তো দেহি মিয়া খ্রিষ্টান।

এর জবাবে কিছু বলে না ফালান। দোকানদার তারপর মায়ের নাম জানতে চায়।

ফালান যে বেশ্যারই ছেলে তা কিন্তু পুরোপুরি ঠিক নয়। কোনো এক ভোরবেলায় মালতিবালা দাস নামের এক বেশ্যা তাকে ময়মনসিংহ রেলস্টেশনের পরিত্যক্ত এক মালগাড়ির বগিতে কুড়িয়ে পায়। মালতিবালা নিজের ছেলে কাল্লুর সাথে ফালানকে মানুষ করে তোলে। ফালাননামটি মালতিবালারই দেওয়া। জীবনে মালতিবালাকেই প্রথম 'মা' বলে ডেকেছে সে। অতঃপর দোকানদারকে সে বলে- মার নাম মালতিবালা দাস।

নামটি শুনে দোকানদার বেশ মজা পায়। বলেন- বাহ! কও কি, তুমি দেহি হাফ হিন্দু, হাফ খ্রিষ্টান।

ফালান আর কথা বাড়ায় না। দোকানদার বলেন- বর্তমান ঠিকানা-?

ঠিকানা বলতে সে জানে হাজি মিয়ার গ্যারেজ, ধোলাইখাল, ঢাকা- এইটুকুই।

দোকানদার বলেন- এইডা বললে হইব? ওইখানের কোনো নাম্বার নাই?

ফালান নম্বর বলতে পারে না। দোকানদার তাই লিখতে লিখতে বলেন স্থায়ী ঠিকানা বলো-

ফালানের হা-মুখ দেখে দোকানদার বলেন- এমন একটা ঠিকানা কও যেইডা লরচর হয় না।

ফের বিপাকে পড়ে ফালান। ছোটোবেলায় বড়ো হয়েছে ময়মনসিংহ রেলস্টেশনে। তারপর ফাদারের সাথে চলে আসে সাভার। ফাদার মরে যাওয়ার পর ঠাঁই হয় জামালপুরের এক এতিমখানায়। সেইখান থেকে পালিয়ে আজ সে হাজি মিয়ার গ্যারেজে আছে অনেকদিন। স্থায়ী-অস্থায়ী ঠিকানা বলতে তো এই একটাই তার জানা। ফালান বলে, দোকানদার তাই লিখেন।

দোকানদার- মোবাইল নাম্বার কত?

ফালানের একটা ভাঙাচোরা মোবাইল-সেট ছিল ঠিকই কিন্তু গত সপ্তাহে সেটা চুরি হয়ে গেছে। এ মুহূর্তে নিজের কোনো মোবাইল নম্বর নেই তার। কুসুমের অবশ্য আছে, ওটা সে বায়ডাটায় লিখতে চায় না। গত কয়েকদিন ধরেই ভাবছে একটা সেকেন্ড-হ্যান্ড মোবাইল-সেট কিনবে, কিন্তু সেই সামর্থ্যটাও নেই তার। এমনকি এজন্য হাজি মিয়ার কাছে টাকা ধার চেয়ে অপমানিত হয়েছিল ফালান-ভাত খাওয়ার পয়সা নাই, তার আবার হাতি কেনার শখ। যাহ্, টাকা জমাইয়া মোবাইল কে, ফেলেট কিন্ গিয়া যা, আমি টাকা দিবার পারমু না।ফালানের মুখে একথা শুনে রাগে-দুঃখে কুসুম তার নিজের সেটটা দিয়ে দিতে চেয়েছিল, ফালান নেয়নি। এখন পর্যন্ত টাকা জোগার হয়নি, তাই মোবাইল কেনাও হয়নি।

ওই ঘরটায় তাই লেখা হয়- চুরি গেছে।

দোকানদার- এইবার জন্মতারিখ খান কও

কোন সালের কত তারিখে ফালান জন্মেছে তার কোথাও কোনো প্রমাণ নেই তার কাছে। নিজের আসল বাবা-মারই যেখানে ঠিক নেই, সেখানে এটা থাকবেই বা কী করে। তবে ছেলেবেলার কিছু স্মৃতি আবছা-আবছা মনে ভাসে তার। সময়টা এরশাদের আমল। সেইবার সারাদেশে অনেক বন্যা হয়েছিল। তার বছর দুইয়েক পর মিছিলে গুলি করে দুজন ছাত্রকে মেরে ফেলেছিল পুলিশ। আঙুলে গুনে, দোকানদারকে জিজ্ঞাসা করে, অবশেষে দুইজনে এই মতে উপনীত হয় যে, ফালানের জন্ম উনিশশ পঁচাশি সালের কোনো এক সময়

দোকানদার মজা করে বলেন- তোমার ধর্ম কী লিখবো কও? হাফ হিন্দু, হাফ খ্রিষ্টান?

ফালান মনে মনে ভাবে, সে কি হিন্দু, না খ্রিষ্টান, নাকি মুসলমান? এতিমখানায় থাকতে কোরান শরিফের বারো পারা পর্যন্ত পড়েছিল সে। একদিন সকালে সেখানকার কেয়ারটেকার তাকে জোর করে মুসলমানিও করে দেয়। টানা এক সপ্তাহ টনটন যন্ত্রণায় কারিয়েছে ফালান। তারপর একরাতে ট্রেনে চেপে পালিয়ে আসে কমলাপুর স্টেশনে। ধর্ম ঘরে তাই লেখা হয়- হিন্দু+খ্রিষ্টান+মুসলমান।

জাতীয়তাশব্দের সাথে পরিচিত নয় ফালান। দোকানদার তাকে বুঝিয়ে দিলে বিষয়টা নিয়ে সে ভাবতে থাকে। বড়ো হয়ে একবার সে মালতিবালাকে খুঁজতে ময়মনসিংহে গিয়েছিল। সেখানে গিয়ে শুনতে পায় তার মা চলে গেছেন ভারতের সোনাগাছিতে। আর ফাদার রিগানের জন্মভূমি যে ফ্রান্স, তা উনার মুখেই শুনেছেতারপর ফালান বড়ো হয়েছে বাংলাদেশে। তাই তার জাতীয়তা আসলে কী হতে পারে তা বলতে পারে না। দোকানদারকে বলে- জানা নাই। দোকানদারও এ বিষয়ে আর কৌতূহল দেখায় না। টাইপ করতে করতে বলেন- লেখাপড়া কিছু করেছো, নাকি করো নাই?

ফালান ভাবে, ফাদারের কাছে সে ক্লাস টু পর্যন্ত পড়েছিল। তারপর এতিমখানায় কোরান শিক্ষা নিয়েছে। বানান করে করে কোনোরকম লিখতে পড়তেও জানে। কুসুমকে কত ভুল বানানে চিঠি লিখেছে সে, আর কুসুমও তার চেয়ে বেশি ভুল শব্দে তার উত্তর দিয়েছে- তার হিসেব নেই। অতঃপর ফরমে লেখা হয়- ক্লাস টু+কোরানের বারো পারা পর্যন্ত খতম।

দোকানদারের এবারের প্রশ্ন- বিয়া করছো?

ফালান লজ্জা পায়। বলে- অর্ধেক।

মজা পেয়ে দোকানদার বলে- এইডা আবার কেমন কথা? অর্ধেক আবার ক্যামনে বিয়া করে? বাপের জন্মে শুনি নাই।

বিষয়টা খুলে বলে ফালান। একজনের সাথে প্রেম আছে তার। ওর কাছেই সব কিছু বন্ধক। শুধু ঘরে তোলা বাকি। ফরমে লেখা হয় তাই- অর্ধেক বিবাহিত।

অবশেষে সম্পন্ন হয় ফালানের বায়োডাটা।
নাম : বল্টু ফালান
পিতা : রিগান ডি কস্তা
মাতা : মালতিবালা দাস
বর্তমান ঠিকানা : হাজি মিয়ার গ্যারেজ, ধোলাইখাল, ঢাকা
স্থায়ী ঠিকানা : ঐ
মোবাইল নম্বর : চুরি গেছে
জন্মতারিখ : উনিশশ পঁচাশি, (মাস জানা নেই)
ধর্ম : হিন্দু+খ্রিষ্টান+মুসলমান
শিক্ষাগত যোগ্যতা : ক্লাস টু+ কোরানের বারো পারা পর্যন্ত খতম
বৈবাহিক অবস্থা : অর্ধেক বিবাহিত
সুপারিশ : মামুন ভাই।

বায়োডাটা হাতে পেয়ে ফালানের মনে হতে থাকে যেন আকাশের চাঁদ পেয়েছে সে। রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে তার কেবল কুসুমের কথা মনে পড়ে। বউ সাজে কুসুম তার পাশে বসে আছে, আর সে মনের আনন্দে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছে খালি রাস্তায় ফালানের গলায় গান- এই পথ যদি না শেষ হয়...





লেখক পরিচিতি
অঞ্জন আচার্য। 

জন্ম ময়মনসিংহ জেলার প্রাণকেন্দ্রে। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর শেষে বর্তমানে সাংবাদিকতা পেশায় কর্মরত। পেশাগত জীবন শুরু হয় দৈনিক ভোরের কাগজ, প্রথম আলো, ইত্তেফাক পত্রিকায় কাজ করার মধ্য দিয়ে। প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেনের গবেষণা সহকারী হিসেবে জেন্ডার ও উন্নয়ন বিষয়ে কর্মরত ছিলেন দীর্ঘদিন। গবেষক হিসেবে কাজ করেছেন বাংলা একাডেমীতে। লিখেন- কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, ফিচার, সাহিত্য- সমালোচনা।

প্রকাশিত বই- জলের ওপর জলছাপ (কবিতা), আবছায়া আলো-অন্ধকারময় নীল (কবিতা), রবীন্দ্রনাথ : জীবনে মৃত্যুর ছায়া (গবেষণা-প্রবন্ধ), লেনিন কথা (সম্পাদনা), জীবনানন্দ দাশের নির্বাচিত গল্প (সম্পাদনা), পাবলো নেরুদার কবিতা সংগ্রহ (সম্পাদনা), ধর্ম-নিধর্ম-সংশয় (সম্পাদনা)।

নেশা : বইপড়া, নাটক-সিনেমা দেখা, গান শোনা আর নতুন কোনো জায়গায় হারিয়ে যাওয়া।

1 টি মন্তব্য: