শুক্রবার, ৪ অক্টোবর, ২০১৩

পাঠ প্রতিক্রিয়া : মা গো, ভুল মানুষ হওয়ার অপরাধবোধে আমার মরে যেতে ইচ্ছে করে গো মা, আমার মরে যেতে ইচ্ছে করে !

------------------------------------------------------------------------------------------------------------
মৌসুমী জাহান নিশা


আমার মনে আছে, ঝিমঝিমে কড়া রোদের এক দুপুরে বিছানায় শুয়ে যখন শীর্ষেন্দুর পারাপার উপন্যাসটা পড়ছিলাম, তখন আমার গলাটা ব্যথায় টনটন করছিলো...কান্না চেপে রাখলে গলাব্যথা করে না ? এরপর থাকতে না পেরে ঝরঝর করে কাঁদছি আর বইটার পৃষ্ঠা উল্টাচ্ছি । পারাপার উপন্যাসের সেই ছেলেটা,

ললিত, যে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করতো, আমার ইচ্ছে করতো তার মাথাটা বুকে চেপে ধরে হু হু করে কাঁদি তাকে জড়িয়ে ধরে । আমার ইচ্ছে করতো ললিতেরর ঠোঁটে ঠোঁট ছুঁইয়ে মৃত্যুর স্বাদ নিই । তাকে বলি, "এই শোন ! তুমি একা মরবে না । আমিও তোমার সাথে মরবো । ঠিকাছে ?" আর আমার কথা শুনে ললিত শক্ত করে আমাকে বুকে চেপে ধরবে আর কানে কানে ফিসফিস করে বলবে, "মৃত্যুর পরও তুমি আমার থাকবে, বলো...থাকবে...?" এরপর অনেকদিন আমার একেলা দুপুরগুলোতে ললিত এসে আমার কোলে মাথা দিয়ে শুয়ে থাকতো । আমি তার গালে গাল রেখে বসে থাকতাম, দুজনের কান্নার জল একসাথে মাখামাখি হয়ে যেতো ।

"নন্দিত নরক" এর খোকা আছে না ? ছেলেটা বড্ড বিষণ্ন । ছেলেটার এলোমেলো করে দেয়া বিষণ্ন চোখে চোখ রেখে "কালো বরফ" এর পোকার মতো বলতে ইচ্ছে হতো, "এই ছেলে! আমি তোমায় ভালোবাসতে বাসতে পচিয়ে ফেলবো ।" নিলু বা জরী কিংবা রাণুর মতো খুব সাধারণ মায়াবতী একটা মেয়ে হয়ে খোকাকে আগলে রাখতে খুব ইচ্ছে করতো, যেন এই পৃথিবীর বিচ্ছিরি বাস্তবতার কোন ছাট খোকার গায়ে না লাগে ।

স্কুলের পরীক্ষাগুলোর আগের দিনের দুপুরবেলার অনুভূতিটা ক্যামন যে ছিলো, সবাই ঘুমুচ্ছে, একটা হতচ্ছাড়া কাক ডাকছে, আমি একা একা পড়ছি । কী ভীষণ হাহাকার লাগতো তখন বুকের ভেতর ! খুব মন চাইতো, কেউ আমার পাশে বসুক, মাথায় হাত বুলিয়ে দিক...তাপ্পর বলুক, "পড়তে হবে না তোকে । উঠ গাধুনি ! গোল্লায় যাক পরীক্ষা ! চল আইসক্রিম খেয়ে আসি ।" কেউ বলতো না, আমি বিপুল অভিমান বুকে চেপে রেখে পরীক্ষার পড়া পড়তাম, আমার কাঁদতে ইচ্ছে করতো ।

এইসব ললিত বা খোকাকে ভালোবাসতে না পারার কষ্ট কিংবা পরীক্ষার কাছ থেকে আমাকে ঝটকা মেরে নিয়ে যাবে এইরকম কারও ভালোবাসা না পাওয়ার অপ্রাপ্তিগুলো খুব মধুর ছিলো, ব্যথার মতো সুখ ছিলো তাতে, ছিলো অভিমানী শূন্যতা । এতেই ভরে ছিলো আমার নিঃসঙ্গ সময়গুলো, একেলা আনচান করা মুহুর্তগুলো ।

আজকাল আমার একেলা দুপুরে ভয় হয় । কল্পনার ললিত কিংবা খোকাকে ভালোবাসতে না পারার কষ্টে যে আমি কেঁদে বুক ভাসাতাম, বাস্তবের এক বিষণ্ন এলোচুলের যুবককে তার মতো করে ভালোবাসতে না পারার অক্ষমতা একেলা আমার উপর ভয়াবহ অপরাধবোধের নির্যাতন চালায় । মাইনাস তিন পাওয়ার চশমার আড়ালে বিষাদী চোখের সেই ছেলেটির জানলা দিয়ে দেখতে পারা ছোট্ট এক ফালি আকাশ হতে চেয়েছিলাম আমি, কিন্তু আমার উপন্যাসের নায়কদের মতোই বড্ড বোকা বোকা আবেগী সেই ছেলেটি আমাকে, এই ভুল মানুষটাকে, তার পুরো পৃথিবীর আকাশ বানিয়ে কষ্ট পাচ্ছে । আর আমি, তার জন্য বুকের ভেতর জগতের সবটুকু মমতা নিয়েও তার কষ্ট দূর করতে না পারার অক্ষমতায় গুমরে মরছি ।

মা গো, ভুল মানুষ হওয়ার অপরাধবোধে আমার মরে যেতে ইচ্ছে করে গো মা, আমার মরে যেতে ইচ্ছে করে !




লেখক পরিচিতি মৌসুমী জাহান নিশা

অন্তর্জালে লেখেন।
বস্ত্রপ্রকৌশল, আহসানুল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা। 

1 টি মন্তব্য:

  1. এরকম ভুল মানুষ হওয়ার বেদনাবোধ একমাত্র ঠিক মানুষই বোধহয় করতে পারে।

    আর এরকম হাহাকার মানুষকে হয়তো তার নিজস্ব বেদনার সমগীতে উন্মুখর ও কাতর করে...

    উত্তরমুছুন