শুক্রবার, ৪ অক্টোবর, ২০১৩

একটি আলোচনা



গুরুচণ্ডালীতে  আলোচনাটি শুরু করেছেন সোমনাথ রায়। সঙ্গে মূল গায়েনের মত বিস্তার ঘটয়েছেন সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায়। আলোচনাটি শুরু হলেও শেষ হয়নি। হবে কোনোদিন। তখন আবার আপডেট দেওয়া যাবে।



সোমনাথ রায়--
জগদীশ গুপ্ত-র নাম আমি প্রথম পাই এক ট্রেনযাত্রার দুপুরবেলায়, সহযাত্রীর থেকে চেয়ে নেওয়া "দেশ'-এ জয় গোস্বামীর লেখা সমালোচনায়। বোধহয়, তখনও ডিকনস্ট্রাকশন আমার চরাচরে নেই, আর সে লেখাটি এখন স্মৃতিতেও নেই। তবে মনে হয় "দেজ" প্রকাশিত 'জগদীশ গুপ্তের গল্প" বইটার সমালোচনাই হবে লেখাটা।


তারপরে অনেকদিন, বোধিদা বইমেলার বাজারে খুঁচিয়ে দিল, বসুমতি প্রকাশিত হলুদ মলাটের র্বইটার একটা ছিন্নভিন্ন এডিশন সহ, যেটা অবধারিত আমায় কিনতে হল ফেরত দেবার প্রচুর তাগাদা থেকে বাঁচতে। ফলে জগদীশ গুপ্তের বাকি যে দুটো বই এখনো পাওয়া যাচ্ছে - দেজ-এর বইটা আর সপ্তর্ষি প্রকাশিত "দুঃপ্রাপ্য জগদীশ গুপ্ত" ভিকিরও যেটা এতদিনে পড়ে ফেলার কথা, কিনতে হল। এই তিনটে বই পড়ে, জগদীশ গুপ্ত কে নিয়ে লিখতে চাইছি, লিখব, অর্থাৎ পাতি পাকামো মারব। সুতরাং বাকিদের ও লিখতে হবে পুরো ব্যপারটাকে ঠিকঠাক গোছানোর জন্যে।


সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায়--
"I am a sick man....I am a wicked man. An unattractive man. I think my liver hurts." ( Notes From Underground, Dostoyevsky) 

""সিদ্ধার্থ বলিল, - ব'স; বড় অন্ধকার, বন্ধু।
দেবরাজ হাসিয়া ঊঠিল।
ইদানীং সিদ্ধার্থের চালচলন দেখিয়া আর কথাবার্তা শুনিয়া বেচারীর মস্তিষ্ক সম্বন্ধে তাহাদের দারুন একটা সন্দেহ জন্মিয়াছে।
তাই দেবরাজ ফিক ফিক করিয়া হাসিতে হাসিতে বলিল, - অন্ধকার কোথায়? দিব্যি দিনের মত ফুট্‌ফুটে জ্যোছনা।
-- বাইরে নয়, ভাই, ভেতরে। - বলিয়া অনিচ্ছুক দেবরাজের ডান হাতখানা বুকের উপর টানিয়া তুলিয়া লইয়া সিদ্ধার্থ বলিল, - অন্ধকার এইখানে। কান পেতে থাকো, একটা শব্দ শুনতে পাবে। ভগবানের অভিসম্পাত বুকের গহ্বর জুড়ে চেপে বসে আছে, তার ভেতর থেকে অবিশ্রান্ত উঠছে পৃথিবীর ক্ষুধার গোঙানী।"" (অসাধু সিদ্ধার্থ, জগদীশ গুপ্ত)

"অসাধু সিদ্ধার্থ" বইটি উৎসর্গ করা হয়েছিল "" ছায়াপথ যার আভরণ - ধূমকেতু যার কলঙ্ক - সেই শূন্যকে।"" শূন্য, মানে সেই মহাশূন্য। সেখানে তো মাইল মাইল অন্ধকার, কিছু জ্যোতিষ্কের আলো। আর মহাশূন্যের তলায় সিদ্ধার্থ (আসলে যদিও সে নটবর, নটবর দাস)। সিদ্ধার্থের ভেতরেও তো অন্ধকার দানা বেঁধে আছে, যদিও তার "ভাবনাটা যেন মাঝে মাঝে থমকিয়া হা হা করিয়া শূন্যে উঠিয়া যাইতেছে - যেমন দীপের চঞ্চল শিখাগ্রটা উর্দ্ধের অন্ধকারের অঙ্গে সূক্ষতম রেখায় বিদ্ধ হইয়া অদৃশ্য হইয়া যায় - "। (জগদীশ গুপ্তর লেখার একটা মূল সুত্র হয়ত এটাই) কিন্তু একটু আশা কি সিদ্ধার্থ করে না? যখন বাহ্যিক ভাবে সহানুভুতির ধার না ধারলেও "" ভিতরটা তার অন্য রকম - কিছুদিন হইতে সেখানে অগ্নিগিরির অগ্নিবমন শুরু হইয়া গেছে। ভিতরে সে শ্রান্ত, অতিশয় পরমুখাপেক্ষী।"

কিন্তু এ অন্ধকারের মানে কি? অভাব ? আর সেই জন্যই তাকে টেনে নামানো যায় জালিয়াতিতে? কিন্তু তার অপেক্ষাকৃত শিক্ষিত মনে ""অনুমানের অতীত একটা স্থানে কু ও সু-এর কলহ এখনো ঘটে।"" বাংলা উপন্যাসের প্রথম anti hero কি এই সিদ্ধার্থ? যে জারজ সন্তান, বেশ্যার সহচর। নটবর দাস থেকে যে সিদ্ধার্থ বসু হয়ে আনুষঙ্গিক সুবিধাগুলি প্রাণপণে খাটিয়ে নেয় এবং তার পরেও যত দুষ্কৃতি, যত অপকার্য, যত অধর্ম দিয়ে ভরা তার জীবন। সে ""গৃহী নয়; গৃহ তার নাই। বৈরাগী সে নহে। বৈরাগ্য তার জন্মে নাই। মাঝখানে সে দুলিতেছে।""
আরো বলা যায় -
""আশা ফলিত, ছিল সবই, কিন্তু ছিল না কেবল সেইটি - যার সংগা নাই, যার স্বরূপ বলিয়া বুঝান যায় না; যাহাতে উদ্যম সফল হয়, বড় আরো বড় হয়, ছোট উঠিতে থাকে, ছিল না তাই। - সে অদৃষ্ট নয়, দৈব নয়, পুরুষকার নায় - এই সকলের মিলিত সে নিরুপাধিক অজ্ঞাত একটা বস্তু - ছিল না তার তাই।
পালাইয়াছে সবাই। সংগে আছে কেবল শয়তান।"" কিন্তু মনে রাখতে হবে দীপের ঐ চঞ্চল শিখাগ্রটি। আর ""ঊর্দ্ধে নিস্তরঙ্গ নীলিমা - নিম্নে তরঙ্গায়িত শ্যামলিমা" - দুটিতে যেখানে মিশছে , সিদ্ধার্থ আসলে সেখানেই যেতে চায়, কিন্তু জীবন কেবল তাকে অতীতের দিকেই টেনে রাখে। ফলে যাওয়া তার হয় না। জীবনে প্রেম (আঁধারে জ্যোতিষ্কসম) এলেও হয় না। কারন সে তো সিদ্ধার্থ নয়, তাকে ফিরে যেতে হয় আবার সেই নটবরের পরিচয়ে।

কিছু লেখা আছে, যেগুলি সম্বন্ধে লিখতে গেলে উদ্ধৃতিই উঠে আসে শুধু। যেমন দিবারাত্রির কাব্য, মাল্যবান, চাঁদের অমাবস্যা। যেমন বিজনের রক্তমাংস। তেমনি অসাধু সিদ্ধার্থ। পুরোন এই টইটা গতকাল খুঁজে পেয়ে উপন্যাসটির প্রথম চ্যাপ্টারটি বার তিনেক আবারো পড়লাম। আর পড়তে গিয়ে বুঝলাম যে লেখাটি সরাসরি যা বলে, তার চেয়ে বেশী বলে শব্দ আর বাক্যের মাঝে ফাঁকগুলো, নৈ:শব্দ্যগুলো। (মিলিয়ে নিলাম একটা সাক্ষাতকারে এই উপন্যাসটি সম্বন্ধে সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের বলা "" রিডিং বিটউইন দা লাইনস"" কথা কটি)

যেমন :
""সিদ্ধার্থ হঠাৎ চমকিয়া উঠিয়া বলিল - ভয় করে। আমি পারব না, ভাই।
হাসিয়া দেবরাজ বলিল - জেলের?
- না। যদি টাকা হাতের ওপর জ্বলে ওঠে।""

কিংবা :

""ঋণ কিছু কিছু পরিশোধ করিয়া সিদ্ধার্থ পূর্বের বাসস্থান ত্যাগ করিয়াছে। পলায়ন ছাড়া তার আর উপায় ছিল না ।
অধুনা সে এইখানে, একটা পার্বত্য জলপ্রপাতের খাদের ধারে।"""

(পাওনাদার এখানে আসছে না, কিন্তু তাও তার মরতে ইচ্ছা করছে। কেন? নিজের থেকে, নিজের স্মৃতি থেকে পালাতে পারছে না বলে?)


সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায়--

একটা দীর্ঘ উদ্ধৃতি দিই। উদ্ধৃতিটি মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের "আত্মহত্যার অধিকার" নামে ১৯৬২ সালে লেখা একটি প্রবন্ধ থেকে। প্রবন্ধটি ছাপা হয়েছিল তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগের জার্নালে। প্রবন্ধটি মূলত মানিক, জীবনানন্দ এবং জগদীশ গুপ্তর লেখায় আত্মহনন নিয়ে। ""অসাধু সিদ্ধার্থ"" সম্বন্ধে লেখা হয়েছে -

""কতগুলি গুপ্ত সংযোগ ও পৌন:পুনিক উল্লেখের সাহায্যে গোটা উপন্যাসটিকে ধীরে ধীরে অত্যন্ত সচেতনভাবে গড়ে তোলা হয়েছে; ব্যবহার করা হয়েছে স্বপ্ন ও সাধনা, ভাবনা ও শিহরন, রূপ আর সংকেত। ...... অনেক জিনিস আছে যা ভোজবাজির মতো ঘটে যায়; আবার বহু কিছু লক্ষ্য করা যায়, যেখানে কিছুতেই কিছু ঘটে না। সিদ্ধার্থর দু:স্বপ্নএসে আতংকে যেমন নিখিল ব্রক্ষান্ড ভরে দিয়ে যায়, তেমনি তারই ভিতর সংগোপনে গড়ে ওঠে এক অপার মন্দাকিনীর প্রবাহ, যার নাম করুণা। ..... 

বস্তুত স্বাভাবিকতা নামক একটি আশ্চর্য বিষয় আছে লেখকদের দখলে , যার পরাকাষ্ঠা আমদের স্বাভাবিকতা অতিক্রম করতে শিখিয়ে দেয়। আমদের মনে হয় এই পুঙ্খানুপুঙ্খ স্বাভাবিকতা বোধহয় কোনো ছল, কোনো উপায়, কোনো ছদ্মবেশ, যার ভেতর দিয়ে লেখক তার মূল বাণীকে, কৌটোর ভেতরে গন্ধের মতো লুকিয়ে রাখতে চান।"" ..... 

""অসাধু সিদ্ধার্থ"" এই ধরনের স্বাভাবিকতার অন্যতম উঙ্কÄল নিদর্শন। বাংলা সাহিত্যে পরবর্তীকালে এই স্বাভাবিকতাকেই ব্যবহার করেছিলেন মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর "দিবারাত্রির কাব্য", "পুতুলনাচের ইতিকথা" ও "হলুদপোড়া"য়। ..... 

আসলে এই স্বাভাবিকতা হোল প্রতারক এক প্রচ্ছদ, যার মনোমুগ্‌ধকর প্রভাব অনেককে এতটাই ভুলিয়ে দেয় যে, আমরা সহজে আর খেই ধরতে পারি না, পারি না গুন্ঠন মোচন করতে।""

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন