শুক্রবার, ৪ অক্টোবর, ২০১৩

লেখার আগে সবচেয়ে বেশি বিতর্ক হয় নিজের মনের সাথে নিজের

রেজা ঘটক
------------------------------------------------------------------------------------------------------------
বহুমাত্রিক লেখক। বরিশালে বাড়ি বলেই তাঁর কথার বিস্তার ঘটে স্বতস্ফুর্তভাবে। চলচ্চিত্র শিল্পের সঙ্গে জড়িত পেশাগত জীবনে। গল্প, প্রবন্ধ, কবিতা, ছোটদের লেখা করেন। বেশ কিছু বই প্রকাশিত হয়েছে তাঁর। দুই পর্বে রেজা ঘটক গল্পপাঠের কাছে লিখিতভাবে জানিয়েছেন তাঁর নিজের গল্পের ভুবনটি। --গল্পপাঠ
------------------------------------------------------------------------------------------------------------
১. গল্প লিখতে শুরু করলেন কেন?

খুব ছোটবেলায় আমি মায়ের কাছে খুব গল্প শুনতাম। গল্প শুনতে আমার খুব ভালো লাগতো। অনেক সময় একই গল্প আমি মায়ের কাছে বারবার শুনতে চাইতাম। তখন আমার মধ্যে একটা ছোট্ট জিজ্ঞাসা কাজ করতো। মা আগের বলা সেই একই গল্পটি নতুন করে আবার বলে কিনা? কিংম্বা নতুন করে বলার সময় কিভাবে বলেন? নতুন করে বলার সময় কি কি নতুন বিষয় সেখানে যোগ হতো সেটা ছিল আমার কোয়ারি। তো আমি খুব সচেতনভাবে লক্ষ্য করতাম যে, প্রতিবারেই মায়ের বলা সেই গল্পে নতুন কিছু যোগ হচ্ছে।
আর আগের বলা কিছু কিছু জিনিস বিয়োগ হচ্ছে। তখন আমার সেই গল্প নিয়ে মায়ের কাছে আরো অনেক জিজ্ঞাসা থাকতো। আর গল্প শোনার নেশাটা আরো বেশি সতেজ হতো। আমরা অনেকগুলো ভাইবোন। আটভাই চারবোন। মোট বারোজন। তো, আমার একেবারে বড় দুই ভাই খুব ছোটবেলায় মারা যায়। একেবারে বড় ভাই মারা যায় কলেরায়। তার তখন বয়স হয়তো দুই আড়াই বছর। তারপর আবার পরের ভাইয়ের জন্ম। সেই ভাইটার বয়স ঠিক ওরকম দুই আড়াই বছর হবার পর পানিতে ডুবে সেও মারা গেল। পরপর দুই ছেলের মৃত্যুতে তখন আমার মা অনেকটা মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছিলেন। তারপর তিন বছরের মাথায় আবার পরের ছেলের জন্ম। তখন মা মানসিকভাবে আবার রিদ্ধ হতে থাকলেন।

তখন তো আর পরিবার পরিকল্পনার ব্যাপার ছিল না। তাই একে একে আমরা জন্ম নিতে থাকলাম দুই আড়াই বছর গ্যাপ দিয়ে। প্রথম দুই ভাই মারা যাবার পর জন্ম নিল একে একে দুই ছেলে আর তিন মেয়ে। তারপর আমার জন্ম পরপর তিন বোনের পরে। আমার পরে আবার একটা ভাই। তারপর একেবারে ছোট বোন। তারপর আবার পরপর দুই ভাই। ততোদিনে আমার বড় ভাই বিয়ে করেছেন। তার ঘরেও ছেলের জন্ম হয়েছে। তো আমার সেই ভাতিজা'র চেয়েও আমার একেবারে ছোট ভাইটা বছর খানেক ছোট। কিন্তু এক ঈদের দিনে সেই ভাইটাও ডায়রিয়ায় মারা গেল। আমার মা আবার সেই পুরানা মানসিক দুরাব্যাধিতে ভুগতে লাগলেন।

ততোদিনে আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। আমার বড় তিনটা বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। বড় দুই ভাই বিয়ে করেছেন। তাদের ছেলেমেয়ে হচ্ছে। আমাদের প্রচুর আত্মীয়স্বজন। যখনই বাড়িতে যাই, দেখতাম আমাদের বাড়িতে কোনো না কোনো পক্ষের মেহমান রয়েছে। আমার দাদু ভাইয়ের দুই বউ। বড় দাদী হল আমার বাবা'র মা। তার গর্ভে জন্ম নিল তিন ছেলে পাঁচ মেয়ে। আর ছোট দাদী'র গর্ভে জন্ম নিল এক ছেলে আর তিন মেয়ে। মানে আমার বাপ-চাচা-ফুফুরাও বারোজন। আমাদের বিশাল সংসার। একান্নবর্তী পরিবার। দাদুভাই মারা যাবার আগে সেই বিশাল সংসার ভাগ হল। কিন্তু ছোট দুই চাচা আলাদা হলেও আমার বাবা আর মেজো চাচা একত্রে থাকলেন। ততোদিনে ফুফুদের বিয়ে হয়ে গেছে। তারাও বেড়াতে আসলে আমাদের ঘরেই ওঠেন। বাড়িতে আমাদের সব সময় দলবেধে ভাত খেতে হত। আর তিন চার পালায় দীর্ঘ সময় ধরে সেই খাবার খাওয়া চলতো। সারা বছর অনেকটা পিকনিকের মতো। একেবারে কম মানুষ বাড়িতে থাকলে সেই সংখ্যাও কুঁড়ির কম হবে না। তো আমার চারপাশে অসংখ্য কারেক্টার। আমি খেয়াল করলাম, প্রত্যেকটা ক্যারেক্টারের কিছু কিছু আলাদা বৈশিষ্ট্য আছে। আমার ভাইদের মধ্যে একমাত্র আমিই কালো, বাকিরা সবাই ফরসা। আবার আমার চেহারায় দাদুভাইয়ের চেহারার অনেক মিল। তাই ফুফুরা সবাই আমাকে বাবা ডাকতো। আমার আট ফুফু'র সবারও অনেক ছেলেমেয়ে। শুধুমাত্র নিজেদের আত্মীয়স্বজনদের মধ্যেই আমরা অনেকে সমবয়সি ছিলাম। যে কারণে দলবেধে অনেক জায়গায় ঘুরতাম। পরিবারের বাইরেও প্রচুর বন্ধুবান্ধব ছিল। আমি বড় হয়েছি গ্রামে। তাই মাধ্যমিক পর্যন্ত গ্রামের প্রায় সকল প্রান্ত দূরদূরান্ত আমার চলাফেরার আওতায় ছিল। দশগ্রামে নানান উৎসব পার্বনে দলবেধে প্রচুর অংশগ্রহন করেছি। সেই সব অনুষ্ঠান, সংস্কৃতি, আচার-আচরণ খুব কাছ থেকে উৎসুকের মতো উপভোগ করতাম।

আমাদের গ্রামে এখনো ইলেকট্রিসিটি যায়নি। এখন বাজার পর্যন্ত গেছে। তো, কেবল রেডিও ছিল বিনোদনের মাধ্যম। এছাড়া আমরা পালিয়ে পালিয়ে তাস খেলতাম। ফুটবল ছিল প্রধান খেলা। নৌকাবাইচ, পুতুলনাচ, যাত্রা, গরুর লড়াই, হাডুডু খেলা, ফুটবল খেলা, মোরগ লড়াই, আর স্কুলের নানান সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নিয়মিত যাতায়াত ছিল। মোটকথা, গ্রাম-বাংলার সকল আচারে-বিচারে, আড়ংয়ে, লাঠিখেলায়, ঈদে-পূজায় বিক্ষিপ্ত ঘোরাঘুরি ছিল একেবারেই মামুলি ব্যাপার। পড়াশুনার কাজটি ঠেক রেখে এগুলোতে অবাধে যাতায়াত করার সুযোগ ছিল। আরেকটা মজার জিনিস ছিল যে, প্রায় বছর বলেশ্বরের নৌকাবাইচের দিন আমি দলছুট হয়ে নদীর ওপার চলে যেতাম। আর সন্ধ্যায় যখন মেলা ভাঙতো তখন আমি ভুলে যেতাম যে, আমি নদীর ওপারে। তো, লোকজনের সাথে অন্ধকার পথে হাঁটতে হাঁটতে একসময় বুঝতাম আমি হারিয়ে গেছি। ওদিকে বাড়িতে অন্যদের সাথে না পৌঁছানোতে বাড়ির সবাই আমাকে তল্লাশি শুরু করতো। পরদিন বা তার পরের দিন আমাকে পাওয়া যেতো নানান তল্লাশি চালানোর পর।

বাড়িতে আসার পর কিছু উত্তম-মধ্যম অবশ্য পিঠে পড়তো। কিন্তু সেই হারানোর ব্যাপারটা আমি খুব এনজয় করতাম। এক অন্যরকম অনুভূতি হত। আমি হারিয়ে গেছি, কোন গ্রামে গেছি, কিছুই জানি না। বাড়িঘরের পরিচয় দিয়ে, লোকজনের সহায়তায় পরে বাড়ি ফেরা। আমার এই হারানোর অভ্যাসটার কারণে পরে অনেক উৎসবে আমার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি হত। কিন্তু মজার ব্যাপার হল, উৎসবের দিন কারো সেই কথা মনে থাকতো না। আর আমি ঠিকই হারিয়ে যেতাম। তখন স্কুলের বইয়ের বাইরে গল্পের বই পড়ার কোনো সুবিধা ছিল না। লুকিয়ে লুকিয়ে দুই-চারটা বই পড়তাম। তাও শরৎচন্দ্র, নিহাররঞ্জন, বিমল মিত্র, রবীন্দ্রনাথ, নজরুলের কিছু বই। বড়দের পড়ার টেবিলে এ ধরেনর বই কিছু পাওয়া যেতো। আমাদের পাঠ্যবইয়ের সাথে চয়নিকা নামে একটা গল্পের বই ছিল ঐচ্ছিক। ওটা পড়তেই আমার সবচেয়ে বেশি ভালো লাগতো। আমি উপরের ক্লাসের চয়নিকা বইও অ্যাডভান্স পড়ে ফেলতাম।

কলেজে গেলাম মফস্বল শহরে। কলেজে ওঠার পর কিছু কিছু গল্পের বই আর উপন্যাস পড়ার সুযোগ হল। কলেজের পাঠাগারের প্রায় সব বই আমি পড়ে ফেলেছি। আমি ক্লাস কামাই দিয়ে লুকিয়ে সেই বই পড়তাম। পড়ায় আমার খুব নেশা ছিল। সেটা এখনো আছে। বাদামের ঠোঙ্গায় কি লেখা আছে, কালিজিরার প‌্যাকেটে কি লেখা আছে, বাজার থেকে কাগজের যতো ঠোঙ্গা আসতো তা সব আমি খুটিয়ে খুটিয়ে পড়তাম। আমার ওসব পড়তে ভালো লাগতো। তখনো জানতাম না যে, আমি বড় হয়ে লেখক হব। স্কুলের পরীক্ষায় প্রায় প্রতি বছর একটা রচনা আসতো- 'তোমার জীবনের লক্ষ্য'। ওটা আমি যতোবার লিখেছি, ততোবার উল্টাপাল্টা কিছু একটা বানিয়ে বানিয়ে লিখেছি। স্যার কিন্তু নম্বর দিতেন। অন্যদের চেয়ে নতুনত্বের কারণে ভালো নম্বরই পেতাম। একবার লিখলাম, বড় হলে আমি বিপদভঞ্জনের কির্তনের দলের ঢোলক হব। আমাদের গ্রামের বিপদভঞ্জনের একটা কির্তনের দল ছিল। প্রতি বছরই হরিসভার কির্তনের সময় বিপদভঞ্জনের দল গান গাইতো। আমার সেই গান ভারী ভালো লাগতো। তো, পরীক্ষার খাতায় ঢোলক হবার কথা লিখে নম্বর পেয়ে একটু চমকে গেলাম। আবার সাহসও পেলাম। মনে মনে অবশ্য একটা রিক্স নিয়েছিলাম। কারণ, অন্য ছাত্ররা কেউ ডাক্তার, কেউ ইঞ্জিনিয়ার, কেউ শিক্ষক ইত্যাদি লিখছে। আমার কপালে হয়তো বেতের বারি আছে, এ ধরনের আতংকে থাকতাম। কিন্তু রেজাল্টের সময় ভালো নম্বর পাওয়ায় সেই দুঃসাহস পরবর্তী সময়ে আরো বেড়ে গেল।

আমাদের স্কুল থেকে একুশে ফেব্রুয়ারি, ২৬শে মার্চ আর ১৬ ডিসেম্বরে তিনটি ম্যাগাজিন বের হত। সেখানে কেউ কবিতা, কেউ গল্প, কেউ প্রবন্ধ লিখত। তো, সেখানে আমি 'শেয়াল' নিয়ে এক গল্প লিখে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলাম। কলেজে ওঠার পর সেই লেখালেখি আরো বেড়ে গেল। আমার বড় ভাই একটু আধতু কবিতা লিখতেন। তার লেখার ডায়েরি ছিল। আমি চুরি করে সেই কবিতা পড়তাম। আর সেই একই কবিতা আবার নিজের মতো করে নিজের খাতায় লিখতাম। উভয় কবিতার থিম এক হলেও আমার শব্দ ব্যবহার ছিল আলাদা। একবার ধরা খেয়ে বড় ভাইয়ের কাছে বেদম মার খেয়েছিলাম। কারণ, সেটা ছিল তার প্রেমের কবিতা। প্রেমটা ছিল অনেকটা ওপেন সিক্রেট। আমি সেই ঘটনায় নাক গলানোতে ওই মার খেতে হয়েছিল। তারপর লিখতাম লুকিয়ে। হয়তো অংক খাতার মধ্যে দুই পৃষ্ঠা ফাঁকা রেখে দিতাম। সেখানে পরে গল্প লিখতাম। আমার বড় ভাইয়ের অভ্যাস ছিল, আমার সব খাতা চেক করা। খাতা চেকের আগে লুকিয়ে সেই পাতা ছিড়ে অন্য কোথাও গুজে রাখতাম। আবার ধরাও খেতাম।

তো, কলেজ শেষ করে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে আসলাম, নগরে আসলাম, রাজধানীতে আসলাম, তখন আমারে আর পায় কে? আমার লেখার খাতা তখন আর বাড়িতে নিতাম না। এভাবে লেখালেখিতে হাত পেকে গেল। প্রথম দিকে কবিতা লিখতাম। সেগুলো ঠিক কবিতা হত না। অনেকটা ছড়ার মত ছন্দ্ব মিলিয়ে লেখার চেষ্টা আরকি। আমাদের গ্রামে রনজিৎ রায় নামে একজন লোক ছিলেন, অনেক ভালো কবিতা লিখতেন। তার লেখা কবিতা পড়ে আমি স্কুলের বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে পুরস্কারও পেয়েছিলাম। তো আমার কবিতাগুলো মাঝে মাঝে সেই দাদাকে দেখাতাম। দাদা অনেক শব্দ ঠিক করে দিতেন। কেন সেটা কবিতা হচ্ছে না, তা বুঝিয়ে দিতেন। রনজিৎ দা'র শখ ছিল বিমান বানানোর। যে কারণে তাকে আমার খুব ভালো লাগতো।

রনজিৎ দা, বাঁশ, সুতা আর সিমেন্টের বস্তার কাগজ দিয়ে বড় সাইজের বিমানের মতো দেখতে ঘুড়ি বানালেন। সেই ঘুড়ি আকাশে ওড়ানোর পর নাটাই গাছের সঙ্গে বেধে রাখতে হত। নইলে ছোটদের উড়িয়ে নিয়ে যেতো। রনজিৎ দা'র সেই ঘুড়িতে আমরা ছোটবেলায় অনেক উড়েছি। ভারী মজা লাগতো সেইসব কর্মকাণ্ড। রনজিৎ দা দূরের কোনো এক স্কুলের প্রাইমারির শিক্ষক ছিলেন। অবসরে তিনি এসব করতেন। তার এই সব কাজ আমার খুব ভালো লাগতো। রনজিৎ দা খুব ভালো ছবি আঁকতেন। আমাদের প্রায় সবার ছবি তিনি সেই ছোটবেলায় এঁকেছিলেন। তো, একবার আমি রনজিৎ দাকে আমার গল্পের নায়ক বানিয়ে একটা গল্প লিখলাম। নাম পাল্টে দিয়েছিলাম। পড়ার পর সবাই বললো, এই গল্পের সঙ্গে তো রনজিৎ মাস্টারের অনেক কিছু মিল আছে। শুধু একটা ছাড়া। সেটা কি? আমি গল্পের নায়ককে দেখিয়েছিলাম, সে শুধু জল খেয়ে বাঁচে। আর অমাবস্যা-পূর্ণিমায় সে হারিয়ে যায়। তখন পৃথিবীর কোথাও তাকে পাওয়া যায় না। সে তার বানানো বিমানে করে ওই সময় ঘুরতে যায় অন্য গ্রহে। তো, রনজিৎ দা আমার সেই গল্পটির খবর শুনে আমাকে ডেকে বললেন, তোমার গল্পটি কাকে নিয়ে লেখা? বললাম, আপনাকে নিয়ে। তো, দাদা বললো, তুমি কবিতা না লিখে গল্প লেখার চেষ্টা কর। তোমার গল্প খুব ভালো হয়।


২. শুরুর লেখাগুলো কেমন ছিল?

প্রথম দিকের গল্প লিখতাম গল্প না বুঝেই। কিন্তু সেই গল্পে নতুন কিছু তাজ্জ্বব ব্যাপার থাকতো। পরে ধীরে ধীরে সেটা আরো শক্ত করেছি। আমার গল্পের চরিত্ররা একটু ভিন্ন টাইপের। হয়তো আমাদের গ্রামের সবচেয়ে বয়স্ক ভিক্ষুক মহিলা, যিনি রোজ আমার মায়ের কাছে আসতেন। গল্প করতেন। খেতেন। যাবার সময় কিছু চাল-ডাল-পিঁয়াজ নিয়ে যেতেন। যা আমি খুটিনাটি খেয়াল করতাম। তো, সেই মহিলা আমার গল্পে চরিত্র হয়ে হাজির হতো। কিংম্বা ব্যতিক্রমি কোনো চরিত্র, যার সাথে অন্যদের খুব একটা মিল নেই, সে হতো আমার গল্পের চরিত্র। আমার প্রথম গল্পের বই 'বুনো বলেশ্বরী'তে নয়টি গল্প আছে। একটা গল্প মহাজাগতিক নিয়ে। সেখানে মৃত চরিত্ররা কথা বলে। জীবিত কেউ কথা বলে না। একটা গল্প আছে জেলখানা নিয়ে। সেখানে জেলের সর্দার কিভাবে জেলে বসে রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করেন, তা বলা হয়। একটা গল্প আছে একজন কবিরাজকে নিয়ে। মুক্তিযুদ্ধের সময় যিনি ছিলেন কলকাতায়। তো, সবাই যখন এপার থেকে পালিয়ে ওপারে যাচ্ছিলেন, সেই কবিরাজ তখন তার এক শিক্ষক বন্ধু'র মেয়েকে নিয়ে এপারে আসেন। ওই মেয়েটি তার বাবার চিতা দেখতে চেয়েছিল। আমার দ্বিতীয় গল্পের বই 'সোনার কংকাল'। সেখানেও নয়টি গল্প। 'সোনার কংকাল' গল্পটিতে একটা ছেলে তার মায়ের লাশ চুরি দিয়ে চুরি বিদ্যায় হাতেখড়ি হয়। আরেক গল্পে একজন লোককে ফাঁসি দেওয়ার কারণে নগরের তরুণ-তরুণি জুটিরা ২১ দিন পরপর দলবেধে সুইসাইট করে। আমার তৃতীয় গল্পের বই 'সাধুসংঘ'। সেখানেও নয়টি গল্প। এক গল্পে বিনা খরচে চাঁদে যাবার একটা ঘটনা আছে। আরেক গল্পে এক জিনের বাদশাহ কিভাবে মানুষের সম্পদ লুন্ঠন করে, সেই গল্প আছে। আমার চতুর্থ গল্পের বই 'ভূমিপুত্র'। সেখানে মোট সাতটি গল্প। একটি গল্প আছে সুনামি নিয়ে। চরিত্র ইন্দোনেশিয়ার। একটা আছে দুই পাগল নিয়ে।

আমার গল্পে জাগতিক, মহাজাগতিক ব্যাপার স্যাপার থাকে। কিছু বাস্তব কিছু অবাস্তব ভৌতিক ব্যাপারও থাকে। কোথাও হয়তো দেয়ালই একটা চরিত্র। আবার কোথাও হয়তো গাছ একটা চরিত্র। গল্পের প্রয়োজনে এসব বিষয় আমার অটোমেটিক চলে আসে। শিশুদের নিয়ে আমি প্রচুর শিশুতোষ গল্প লিখি। আমার এ পর্যন্ত তিনটি শিশুতোষ গল্পের বই বের হয়েছে। 'গপ্পো টপ্পো না সত্যি', ময়নার বয়স তোরা' আর 'বয়োঃসন্ধিকাল'।

৩. গল্প লেখার জন্য কি প্রস্তুতি নিয়েছেন? নিলে সেগুলো কেমন?

লেখার প্রস্তুতি'র কথা বললে সেটা আসলে প্রচুর পড়াশুনা আর ভ্রমণ। আমি যতো ঘুরতে পারি ততো বেশি আমার গল্পের চরিত্র পাই। আগে যা পেতাম তাই পড়তাম। বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করে বাছাই বই পড়া শুরু করি। এখন বা্ছাইয়ের বাইরে না পারলে পড়ি না। রবীন্দ্রনাথ, সুনীল, বুদ্ধদেব, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, মাক্সিম গোর্কি, খুশবন্ত সিং, এমিলি ব্রন্টি, ভার্জিনিয়া উলফ, গাব্রিয়েল মার্কেজ, সালমান রুশদি, এরিক মারিয়া রিমার্ক, রমা রলা, হুমায়ূন আজাদ, এরকম অনেকে আমার প্রিয় লেখক। আমি যখন এদের লেখা পড়ি, গল্পের ভেতরের গল্পটা বোঝার চেষ্টা করি। এদের লেখার টেকনিকটা আমি খুব প্রাণ দিয়ে ধরার চেষ্টা করি। শব্দ প্রয়োগ, বাক্য গঠন, ডায়লগ, শব্দের ব্যঞ্জনা, দ্যোতনা, তুলনা, প্রতিশব্দের ব্যবহার এগুলো খুব আমাকে টানে। আমি পড়ার সময় শুধু পড়ার কাজটি করিনা, প্রত্যেকটা লাইনের কারুকাজগুলো'র আমি খুটিনাটি খুব সচেতনভাবেই খেয়াল করি।

লেখার জন্য সবচেয়ে বেশি দরকার অভিজ্ঞতা। সেটা শব্দের প্রতি, বাক্য গঠনের প্রতি, তুলনা, রূপক সবক্ষেত্রের জন্য প্রযোজ্য। এই কাজগুলো আমি বেশি বেশি পড়ার কারণে রপ্ত করতে পেরেছি।

৪. আপনার গল্পলেখার কৌশল বা ক্রাফট কি?

কোনো একটা গল্প লেখার আগে আমার মাথায় সেই গল্পের কোনো একটা ঘটনা খুব ঘুরপাক খায়। মাথায় দীর্ঘ সময় ধরে সেই ঘটনা ঘুরপাক খায়। মোটামুটি একটা ডিটেইল চিত্র মাথায় আসার পরেই আমি লেখা শুরু করি। লিখতে লিখতে সেই গল্পের বাকি অংশ অটোমেটিক এসে যায়। এটা অনেকটা নিজের মনের সাথে নিজের মনের তর্ক-বিতর্কের মতো। সেই বিতর্কে বিজয়ী পক্ষের সমর্থণ নিয়েই আমি লিখতে শুরু করি। আর আমার গল্প আমি লেখার পর বারবার পড়ি। প্রতিবার পড়ার ফাঁকে নতুন কিছু বিষয় যোগ হয়। এভাবে ধীরে ধীরে একটা গল্প, গল্প হয়ে ওঠে। কখনো হয়তো এক লাইন নোট করে রাখি। যে কোন ধরনের থিম। পরে হয়তো ওটা থেকে গল্পটা লেখার একটা সূত্র পাই। লেখার আগে সবচেয়ে বেশি বিতর্ক হয় নিজের মনের সাথে নিজের। সেই বিতর্কের অবসান ঘটে লেখার মাধ্যমে।

৫. আপনার নিজের গল্প বিষয়ে আপনার নিজের বিবেচনা কি কি?

আমি নিজেও জানি না আমার লেখা গল্পগুলো ঠিক গল্প হয় কিনা। তবে আমার কাছের লেখক বন্ধুদের সঙ্গে আমি আমার গল্প নিয়ে প্রায়ই কথা বলি। তাদের পরামর্শটা মন দিয়ে শুনি। আমাকে কেউ ভিজিট করলে তাকে অন্তত আমার সদ্য লেখা গল্পটা শুনতে হয়। এটা প্রায় অবধারিত একটা ব্যাপার। গল্প শোনানোর পর তার মতামতকে আমি খুব গুরুত্ব দিয়ে ভাবি। আমার গল্পের প্রথম পাঠক আমি। আর অন্য পাঠকের মতামত আমি খুব গুরুত্বের সঙ্গেই বিবেচনা করি। ১৯৯০ সাল থেকে প্রায় আমার খাবার যেমন নিজে রান্না করি, তেমনি রান্না করার সময় মাথায় আসা থিমটি নিয়ে আমি নানাভাবে এক্সপারিমেন্ট করি। আমার মনে হয় গল্প হল রান্না করার মত বিষয়। রান্নার মাল-মসলা, জিনিসপত্র যেমন প্রত্যেকটা গুরুত্বপূর্ণ। কোনো একটা একটু কমবেশি হলে রান্না করা খাবার আর স্বাদ হয় না। তেমনি গল্পের সব নারী নক্ষত্র ঠিকঠাক না হলে গল্প ঠিক আর গল্প হয়ে ওঠে না। আবার গল্প অনেকটা ফুটবল খেলার মত। মাঝ মাঠ থেকে বলে কিক দিয়ে হঠাৎ গোল হলেও সেটা গোল। কিন্তু সেই গোলে দর্শকরা তেমন একটা আনন্দ হয়তো পায় না বলেই আমার ধারণা। কিন্তু বলটি যখন অনেক খেলোয়ারের পা ঘুরে নানান কসরত করে জাদুর ভেলকি দেখিয়ে শেষ পর্যন্ত গোল হয়, তখন সেটা থেকে দর্শক বেশি আনন্দ পায়। গল্প অনেকটা গোল করার মত ব্যাপার। গোলটা আমি কতো ভাবে ভেলকি দেখিয়ে কতো দক্ষতার সঙ্গে দৃষ্টিনন্দনের বদলে সেখানে মনের সৃজন মিলিয়ে করতে পারলাম সেটাই বড় কথা।

৮।
কার জন্য গল্প লেখেন? আপনি কি পাঠকের কথা মাথায় রেখে লেখেন? লিখলে কেনো লেখেন? আর যদি পাঠকের কথা মনে না রেখে লেখেন তাহলে কেনো পাঠককে মনে রাখেন না লেখার সময়ে?

গল্প আমি নিজের জন্য লিখি। লিখতে না পারলে মাথার মধ্যে ঝাঁঝাঁঝিঁঝিঁ করে। লেখা শেষ হলেই রিলিফ পাই। পাঠকের জন্য তো অবশ্যই। গল্প লেখার পর তা যখন একজন পাঠক হিসেবে আমি প্রথম পড়ি, তখন ধরে নেই এটা অন্য এক ব্যক্তির লেখা। তখন আমি এডিটরের দায়িত্ব পালন করি। একটু কাটছাট করি। বাক্য শব্দ পরিবর্তন করি। গল্পটাকে গল্প হয়ে ওঠায় সাহায্য করি। গল্প লেখা শেষে যতোবার সেটি পড়ি, ততোবার এই কাজটি আমি করি। কিন্তু লেখার সময় মোটেও খবরদারিটা করি না। সেটা করতে গেলে তার ছিড়ে যায়। লেখার মুডটা নষ্ট হয়ে যায়। গল্পের চরিত্রগুলোর যা যা করার কথা তা ঠিক ঠাক করলো কিনা তা যাচাই বাছাই করি। নিজের গল্পের নিজে পাঠক ও এডিটর হিসেবে কাজটি শেষ করার পর সাধারণ পাঠকের জন্য তা উন্মুক্ত করি।

৮. এখন কি লিখছেন?

যে গল্প আমি এখনো লিখিনি, ভবিষ্যতে লিখব বলে ঠিক করেছি বা মাথায় সেই গল্পের প্লট ঘুরপাক খাচ্ছে, তা আমি কারোর সাথেই শেয়ার করি না। এটা আমার নিজের সঙ্গে নিজের এক ধরনের খেলার মত। এটা একান্তই আমার। লেখা শেষে তা সবার জন্য উন্মুক্ত করি, এডিট করার পর। আমি যখন রি-রাইট করি, তখনো অনেক গল্পের অনেক জায়গায় অনেক পরিবর্তন করি। তখন পাঠকের পরামর্শকে কিছু কাজ করার মনে করলে, করি।

৯. আগামীতে কি লিখবেন?

এখন লিখছি একটা ত্রিলজি। একই চরিত্র নিয়ে তিনটি উপন্যাস। বসনিয়ার যুদ্ধের উপর এই উপন্যাস। অনেকটা ঐতিহাসিক উপন্যাস হবে হয়তো। আমার বউ বসনিয়ার নাগরিক। বসনিয়ার যুদ্ধটা সে ফেস করেছে। সেই অভিজ্ঞতা আমি যা শুনেছি এবং ইতিহাস ও আমার পড়াশুনা মিলিয়ে এটা করতে চেষ্টা করছি। আমার বউয়ের বাবা আবার নেপালি নাগরিক। তো, তিন দেশ বসনিয়া, নেপাল ও বাংলাদেশ এই উপন্যাসে ঠাই পাবে। তাছাড়া আমার বউয়ের বিশ্বের অনেক দেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা আছে। সেগুলো থেকে মজার মজার ঘটনা হয়তো এখানে থাকবে। এখনো জানি না ঠিক কিভাবে থাকবে। তবে নানাভাবে আমি সেগুলো এক্সপারিমেন্ট করার চেষ্টা করব।

আগামীতে কি লিখব জানি না। বেঁচে থাকার উপর লেখা চলবে। জীবনের অন্য কাজগুলো বাদ দিয়ে তো আর শুধু লেখা চলে না। সে কাজগুলোর পাশাপাশি যতোটুকু লেখা যায়, লিখব। একটা শিশুতোষ ফিল্মের স্ক্রিপ্ট লিখছি। এটা দিয়ে ফিল্ম বানাবো। প্রায় ১৫ বছর আমি নানা বিষয়ে গবেষণা করেছি। বাংলাদেশের ৫৯ টা জেলা তন্ন তন্ন করে ঘুরেছি। তারপর প্রায় ৫ বছর ফিল্মের সঙ্গে নানভাবে যুক্ত। তাই ফিল্ম বানানো একটা কাজের মধ্যে পড়ে। আমি শিশুদের জন্য ফিল্ম বানাবো।

তবে গল্পের সঙ্গে আমার জীবনের সম্পর্ক। এই সম্পর্ক মৃত্যুর আগ পর্যন্ত চলবে। এটুকু বলতে পারি। গল্প লিখব। যতো ধরনের গল্প মাথায় আছে সব লিখব, এটুকু বলতে পারি।

আমার প্রথম উপন্যাস 'মা' বের হয়েছে ২০১২ সালের অমর একুশে গ্রন্থমেলায়। আরেকটা সমালোচনা গ্রন্থ 'শূন্য দশমিক শূন্য' বের হয়েছে ২০১১ সালে। এছাড়া একটি উপন্যাস এখন প্রায় শেষের পথে। আগামী বইমেলায় হয়তো এটি প্রকাশ পাবে। তাছাড়া একটি প্রবন্ধের বই আগামী বইমেলায় প্রকাশ পাবে। ২৫-৩০ জন প্রয়াত ব্যক্তিকে নিয়ে। আর গল্পের বই তো অবশ্যই একটা থাকবে আগামী বইমেলায়। এইটুকু আপাতত আপডেট।




লেখক পরিচিত
রেজা ঘটক
জন্ম: ২১ এপ্রিল ১৯৭০ (৮ বৈশাখ ১৩৭৭), উত্তর বানিয়ারী, নাজিরপুর, পিরোজপুর, বাংলাদেশ।
পড়াশুনা: অর্থনীতি শাস্ত্রে স্নাতক সম্মান ও মাস্টার্স।
প্রকাশিত গ্রন্থ:
ছোটগল্প: বুনো বলেশ্বরী, ছোটগল্প সংকলন, ২০০৮। সোনার কঙ্কাল, ছোটগল্প সংকলন, ২০১০। সাধুসংঘ, ছোটগল্প সংকলন, ২০১১ । ভূমিপুত্র, ছোটগল্প সংকলন, ২০১৩
উপন্যাসমা, ২০১২। 
সমালোচনাশূন্য দশমিক শূন্য, ২০১১।
কিশোর গল্প: বয়োঃসন্ধিকাল, ২০০৫।
শিশুতোষময়নার বয়স তেরো, ২০০৩। গপ্পো টপ্পো না সত্যি, ২০১১

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন