শুক্রবার, ৪ অক্টোবর, ২০১৩

পতিতার ভূত, রবীন্দ্রনাথ ও জগদীশ গুপ্ত

আবুল আহসান চৌধুরী

বহুকাল ধরেই বাঙালি সমাজে পতিতার কদরদানি চলে এসেছে। বাংলা সাহিত্যেও পতিতা যে একেবারে অপাঙ্ক্তেয় ছিল তা নয়। মধ্যযুগ থেকেই পতিতার প্রসঙ্গ ও পরিচয় সাহিত্যে পাওয়া যায়। বাংলা কথাসাহিত্যে পতিতা-প্রসঙ্গ আসার বেশ আগেই নকশাজাতীয় রচনায় পতিতার কথা ও কাহিনী স্থান পেয়েছে। রবীন্দ্রনাথের (১৮৬১-১৯৪১) পরের প্রজন্ম থেকে গল্প-উপন্যাসের প্রসঙ্গ ও প্রকরণে যে মৌলিক পরিবর্তন দেখা দিল, তাতে একদিকে যেমন নিম্নবর্গের হতদরিদ্র শ্রমজীবী মানুষ, অপরদিকে সংসারবিচ্যুত নারী যারা পতিতা-কুলটা-অসতী অভিধায় চিহ্নিত, ধীরে ধীরে কথাসাহিত্যের ভুবনে তারা ঠাঁই করে নিতে লাগল। পরকীয়া প্রণয় ও যৌনতাও এর সঙ্গে মিশে গেল।
অবশ্য রুচি ও নীতির প্রশ্ন তুলে সমাজ স্বাস্থ্য-রক্ষায় স্বেচ্ছাব্রতগ্রহণকারী অনেকেই অনুমোদন করেননি এই প্রয়াসকে, নিন্দার হুল তাঁরা যথেষ্টই ফুটিয়েছেন। পতিতার ভূত কথিত শুদ্ধ রুচির উচ্চবর্গের মানুষকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়িয়েছে বহুকাল। সাহিত্যের ভুবনে এই অবিদ্যাদের অবাঞ্ছিত বলে স্বীকৃতি দিতে কুণ্ঠা থাকলেও কারো কারো জীবনে তারা সাদরে গৃহীত হয়েছে। পতিতা-প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথও যে কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেশ অসহিষ্ণু ও সমালোচনামুখর হয়ে উঠেছিলেন, তার প্রমাণ মেলে জগদীশ গুপ্তের (১৮৮৬-১৯৫৭) ‘লঘু-গুরু’ উপন্যাসের আলোচনায়।

২.
রবীন্দ্রনাথ-শরৎচন্দ্র বাংলা কথাসাহিত্যের যে আদর্শ নির্মাণ করেছিলেন, উত্তরপর্বে সেই রুচি, রূপ, রীতি ও বিশ্বাসকে অগ্রাহ্য ও বিচূর্ণ করে কথাসাহিত্যে যে পালাবদল এসেছিল, এক ভিন্ন অর্থে জগদীশ গুপ্ত ছিলেন তার প্রধান ঋত্বিক। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ঘটনার কার্য-কারণ সূত্রে পরিবর্তিত আর্থ-সামাজিক কাঠামোর অন্তর্গত সংকট ও সমস্যার পরিপ্রেক্ষিতে জীবন-অন্বেষা ও সমাজ-বাস্তবতার যে শিল্প-ভুবন নির্মিত হয়েছিল, তিনিই ছিলেন তার উদ্বোধক ও শ্রেষ্ঠ প্রতিনিধি। মানুষের অস্তিত্বের সংকট, মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা, তার প্রবল প্রবৃত্তির নগ্ন রূপের বিস্ময়কর উন্মোচন ঘটেছে তাঁর সাহিত্যে, যার তুলনা বা সাদৃশ্য পূর্বাপর বাংলা সাহিত্যে প্রায় দুর্লক্ষ্য। জীবনের প্রত্যয় ও প্রত্যাশা কীভাবে বিনষ্ট হয়েছে প্রবৃত্তি আর সমাজ-শাসনের যৌথ ক্রিয়ায় তার রূপায়ণও এখানে স্পষ্ট। প্রকৃতপক্ষে এক ‘শাস্ত্রবিরোধী’ শিল্প-ধারার প্রবর্তন করে তিনি কথাসাহিত্যের ভূগোলকে সম্প্রসারিত করেছেন। অথচ এই ব্যতিক্রমী অনন্য শিল্পসাধক স্বকালে উপেক্ষিত, উত্তরকালে প্রায়-বিস্মৃত। প্রচারকুণ্ঠ, আত্মমুখী, নির্লিপ্ত স্বভাবের এই ‘অন্তরালের সাহিত্যিকে’র প্রতি তাঁর সমকালে প্রসিদ্ধ প্রকাশক, পেশাদার সমালোচক কিংবা বৃহত্তর পাঠকসমাজ, কারোরই তেমন মনোযোগ আকৃষ্ট হয়নি। তবে এ-কথা আশা আর আনন্দের যে, জগদীশ গুপ্ত সম্পর্কে উত্তরকালের পাঠক-সমালোচক-প্রকাশকের আগ্রহ ও অনুসন্ধিৎসা জেগেছে, ফলে এই সৎ-প্রয়াসে হয়তো পূর্বযুগের অবহেলা, কর্তব্যচ্যুতি ও অমনোযোগের ক্ষতিপূরণ হতে পারবে।

৩.
জগদীশ গুপ্ত জন্মেছিলেন সেকালের নদীয়া জেলার মহকুমা-শহর কুষ্টিয়ার গড়াই নদীর তীরে আমলাপাড়ায়। উনিশ শতকের সামাজিক রেওয়াজ অনুসারে কুষ্টিয়া শহরেও বেশ কয়েকটি পতিতাপল্লী গড়ে উঠেছিল। থানাপাড়া, মিলপাড়া এবং গুপ্তবাড়ির একেবারে কাছে আমলাপাড়াতেও। আম-জনতার মনোরঞ্জনের জন্য গণবধূর দল তো ছিলই, শহরের অভিজাত উকিল-মোক্তার-আমলা-ফয়লা-ব্যবসায়ী-জোতদার জমিদারদের বাধা রক্ষিতারও অভাব ছিল না। মীর মশাররফ হোসেনও (১৮৪৭-১৯১১) তাঁর ভদ্রাসন লাহিনীপাড়া থেকে পতিতা-সঙ্গলাভের জন্য কুষ্টিয়া শহরে মাঝেমধ্যে আসতেন।

জগদীশ গুপ্তের ছেলেবেলার অনেক সময় কেটেছে পতিতাপল্লীর বারবধূদের সঙ্গ-সান্নিধ্যে। এ-সম্পর্কে তাঁর পত্নী চারুবালার (১৩০১-১৩৯০?) স্মৃতিচর্চায় জানা যায় : “শ্মশ্রুমাতার কাছে শুনিয়াছি আমলাপাড়ায় আমাদের বাড়ির আশপাশ দিয়া অনেক ঘর পতিতার বাস ছিল। উহারা লোকের বাড়ি ঝিয়ের কাজ করিত, আঁতুর পাহারা দিত, কেহ কেহ ঘরভাড়া করিয়াও থাকিত। ইনি [জগদীশ গুপ্ত] হইবার পর পাঁচ-ছয় মাসের পর ওরা নিজেদের কাছে রাখত, একটু বড় হইলে মালাচন্দন দিয়া সাজিয়ে বাঁশি হাতে দিয়া আনন্দ করিত। শ্মশ্রুমাতা নিজের বাড়ির জানালা দিয়া দেখিয়াছেন; সময় মত দিয়া যাইত” (‘সাহিত্য ও সংস্কৃতি’, কার্তিক-পৌষ ১৩৮০; পৃ. ২৭৪)। এই পতিতাদের মধ্যে গিরিবালা নামের এক নায়েবের রক্ষিতা জগদীশ গুপ্তকে খুবই স্নেহ করত। এই গিরিবালা “মধ্যে মধ্যে মা মা করে বাড়িতে এসে শাশুড়ির সঙ্গে কথা বলত। এঁর [জগদীশ গুপ্ত] খোঁজখবর লইত--ছোড়দা কোথায় প্রভৃতি, কলকাতায় কলেজে পড়ে শুনে খুব খুশি” (ঐ; পৃ. ২৭৫)।

জগদীশ গুপ্তের সময়ে পতিতারা সমাজে একেবারে অচ্ছুৎ বা ঘৃণ্য ছিল না। ভদ্র-পরিবারে তাদের অবাধ যাতায়াত ছিল। এক ধরনের মানবিক ও সামাজিক সম্পর্ক গড়ে উঠতে যে বাধা ছিল না তা বেশ বোঝা যায়। বিগতযৌবনা সম্পন্ন পতিতাদের কেউ কেউ ‘সর্দারণী’ বা ‘মাসি’ হিসেবে ভূমিকা পালন করলেও বেশিরভাগই বড় কষ্টের জীবনযাপন করতো। না ছিল সহায়-সম্বল, না ছিল আত্মীয়স্বজন তাই রোগ-শোক-ব্যথা-বেদনায় অনাদৃত নিঃসঙ্গ জীবন কাটানোই ছিল তাদের অনিবার্য নিয়তি। জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে কেউ ঝিয়ের কাজ, কেউ বা রাস্তার ধারে দোকানি-পসারি হিসেবে বসতো। জগদীশ গুপ্তের ছেলেবেলার কথা বলতে গিয়ে এই চিত্রের সন্ধান মেলে। পরিণত বয়সে জগদীশ গুপ্তের যে শান্ত-সৌম্য-নির্লিপ্ত স্বভাবের ছবি আমাদের চোখে ভাসে, ছেলেবেলার জগদীশ ছিলেন ঠিক তার বিপরীত, যথেষ্টই দুরন্ত, দুষ্টবুদ্ধিও কম ছিল না। তাঁর এই বাল্যকালের কথায় পতিতাদের সম্পর্কে যা-জানা যায় তা কম কৌতূহল-জাগানো বিষয় নয়। চারুবালা শাশুড়ি সৌদামিনী দেবীর কাছ থেকে যা শুনেছিলেন, তা অকপটে জানাতে দ্বিধা করেন নি : “ওঁদের খেলার জায়গা ছিল নদীর ধারে। কুষ্টিয়ার বাড়ির দক্ষিণে নদী, আমাদের বাড়ি হইতে বেশি দূরে নয়, পশ্চিমে রাস্তা গিয়ে দক্ষিণ দিকে নদীর মধ্যে নিয়েছে [মিশেছে]। ঐ পতিতাদের মধ্যে বৃদ্ধা হইয়া একজন রাস্তার ধারে মুড়িমুড়কি বাতাসা প্রভৃতির দোকান সাজিয়ে বসে থাকে। এদের সঙ্গে চেনা ছিল। ছোটবেলা কোলে উঠেছেন গল্প শুনেছি শ্মশ্রুমাতার কাছে। এঁরা দুই ভাই, ইনি আর আমার খুঁড়া শ্বশুরের ছেলে যোগেশচন্দ্র গুপ্ত, এঁরা নদীর ধারে খেলা করিতে যাইবার সময় ময়রানীর ঝাঁকা হইতে মুড়িমুড়কি বাতাসা প্রভৃতি খাবলা ভর্তি তুলে নিয়ে দৌড় দিতেন। ময়রানী তাড়া দিলেও বারণ মানে না। পরে না পেরে মায়ের কাছে এসে বলে দিয়েছে। মা শুনিয়া ছেলেদের বকে দিয়েছেন। তারপর দুজনার কেহ যেতেন না। কয়েকদিন ময়রানী ছেলেদের না দেখে রাস্তা থেকে ডেকে নিয়ে পকেট ভর্তি করে মুড়িমুড়কি প্রভৃতি দিয়েছে” (ঐ; পৃ. ২৭৫)। এ-ছাড়া ছেলেবেলায় পতিতাদের উদ্দেশে কৌতুককর মন্তব্য ছুড়ে দিয়ে উত্ত্যক্ত করতেও জগদীশের উৎসাহের কমতি ছিল না (ঐ; পৃ. ২৭৫)।

এ-তো গেলো জগদীশের বাল্য-কৈশোরে পতিতা-সান্নিধ্যের নির্দোষ কথা। কিন্তু যখন তিনি যৌবন পেরিয়ে গেছেন তখনো পতিতার মোহ ত্যাগ করতে পারেননি। জগদীশ গুপ্তের অতি ঘনিষ্ঠজন ছিলেন নন্দগোপাল সেনগুপ্ত (১৯১০-১৯৮৮)। নিজের জীবনের অনেক সুখ-দুঃখের কথাই তাঁকে জানাতেন অতি গোপন ব্যক্তিগত কথাও বাদ পড়ত না। তাঁর শেষজীবনের বেদনা-নৈরাশ্য-অতৃপ্তি-দারিদ্র্যের চিহ্ন রয়েছে এই নন্দগোপালকে পোস্টকার্ডে পদ্যে লেখা কয়েকটি ছত্রে :

দুঃখ-কষ্ট এ জীবনে চিরস্থায়ী নয়,
আজ হক কাল হক হবে তার ক্ষয়।
তবু সেই ভাগ্যবান, যার যথাকালে,
দুঃখ-অন্তে সুখোদয় সম্ভব কপালে।
আমি নয় [নই] সেই দলে তাতে নেই ক্ষতি,
অশ্র“র কমলে পুঁজি দুঃখ-সরস্বতী।

কাছের মানুষ নন্দগোপাল সেনগুপ্ত ১০ নভেম্বর ১৯৮৭ আবুল আহসান চৌধুরীকে এক চিঠিতে জগদীশ গুপ্তের ব্যক্তিজীবন সম্পর্কে এক বিস্ময়কর গোপন কথা জানিয়ে লিখেছিলেন, জগদীশের কলকাতায় একজন রক্ষিতা ছিল। হতদরিদ্র, অসামাজিক, স্বল্পবাক, পত্নীপ্রাণ, লাজুক স্বভাবের জগদীশ সেই রক্ষিতার টানেই মাঝেমধ্যে বোলপুর থেকে কলকাতায় আসতেন। তাঁর রচনার মতো এই খবরেও চমক ও স্তম্ভিত হওয়ার মতো উপকরণ আছে।

আর দশজন বাঙালি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানের মতো জগদীশের শৈশব-কৈশোরের দিনগুলো কাটলেও, কিছু ব্যতিক্রমও ছিল। বাল্যকালে যেভাবে পতিতাজীবনের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়েছিল, যৌবনে যেমন করে জড়িয়ে পড়েছিলেন পতিতার প্রেমমোহে, যতো কাছ থেকে তাদের জীবনকে দেখার সুযোগ পেয়েছিলেন, তার স্মৃতি ও অভিজ্ঞতা তাঁর জীবনে যে গভীর প্রভাব ফেলেছিল তার প্রমাণ মেলে তাঁর শিল্প-সাহিত্যে। তাই পতিতা বা পতিতাজীবনের কথা লিখতে গিয়ে তাঁকে কল্পনা বা অনুমানের আশ্রয় নিতে হয় নি, তাঁর বাস্তব-জ্ঞানই এ-বিষয়ে তাঁর সহায়ক হয়েছে।

৪.
ফ্রয়েডকে কতটুকু জানতেন তার সাক্ষ্য না মিললেও ফ্রয়েডিয় যৌন-মনস্তত্ত্বের প্রভাব জগদীশ গুপ্তের মন ও রচনায় যে পড়েছিল তাতে সন্দেহের সুযোগ নেই। তাঁর রচনায় আবিষ্কৃত হয়েছে মানুষের মন, বিশ্বাস, অভ্যাস, প্রবণতা ও আচরণ কত বিস্ময়কর ও বিচিত্রগামী। সুন্দর মুখোশের আড়ালে হঠাৎ হঠাৎ বেরিয়ে এসেছে বিকৃত মুখের ছবি। এই সূত্রে অনেকেই মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের (১৯০৮-১৯৫৬) শিল্প-মানসে জগদীশ গুপ্তের প্রভাব অনুমান করেছেন। মানিকের ‘পূর্বসূরি’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন তিনি। কেউ কেউ মানিককে জগদীশের ‘মন্ত্রশিষ্য’ (‘শনিবারের চিঠি’, বৈশাখ ১৩৬৪; পৃ. ৫) বলে উল্লেখ করেছেন। কেউ আবার ‘পরোক্ষ প্রভাব’ (‘বাংলা গল্প-বিচিত্রা’, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, তৃ-মুদ্রণ : কলকাতা, ১৩৭৮; পৃ. ৯১) স্বীকার করেছেন। তবে এ-বিষয়ে মানিকের স্বীকারোক্তি কখনো মেলেনি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সাদৃশ্যের অভাব সত্ত্বেও অশোক গুহের মতে : “... এঁরা দুজনে একই কলমের , একই স্কুলের লেখক, স্বগোত্র। দুজনই আঞ্চলিক ভাষার সুষ্ঠু প্রয়োগ করেছেন, দুজনেই বিশ্লেষণী বুদ্ধিতে সমুজ্জ্বল, দুজনেই হাতড়ে বেড়িয়েছেন কার্য-কারণ” (‘পরিচয়’, ভাদ্র-আশ্বিন ১৩৬৪; পৃ. ১৪১)। পতিতা-প্রসঙ্গেও এই দুজনের মানসিক মিল কখনো কখনো খুঁজে পাওয়া যায়।

৫.

জগদীশ গুপ্তের সাহিত্যকর্ম সম্পর্কে তাঁর সুহৃদ-শুভাকাক্সক্ষীদের ঘরোয়া অভিমতের বাইরে বোধ হয় ‘মানসী ও মর্মবাণী’ (শ্রাবণ ১৩৩৫) পত্রিকাতেই তাঁর প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘বিনোদিনী’কে (পৌষ ১৩৩৪) উপলক্ষ করে আনুষ্ঠানিক আলোচনার সূচনা হয়। রবীন্দ্রনাথও ‘বিনোদিনী’ সম্পর্কে প্রশংসা করে বলেন : “ছোটগল্পের বিশেষ রূপ ও রস তোমার লেখায় পরিস্ফুট দেখিয়া সুখী হইলাম”। এরপর অনিলবরণ রায় ‘বিচিত্রা’ (ভাদ্র ১৩৩৬) পত্রিকায় ‘আধুনিক সাহিত্যে দুঃখবাদ’ নামের এক দীর্ঘ প্রবন্ধে জগদীশ গুপ্তের শিল্প-কর্মের প্রবণতা ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আলোচনা করেন। এর দু’-বছর পর রবীন্দ্রনাথ জগদীশ গুপ্তের সদ্য-প্রকাশিত ‘লঘু-গুরু’ (১৩৩৮) উপন্যাস সম্পর্কে তাঁর দীর্ঘ প্রতিক্রিয়া জানান ‘পরিচয়’ (কার্তিক ১৩৩৮) পত্রিকার মাধ্যমে।

রবীন্দ্রনাথের এই আলোচনাটি নানা কারণে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। সম্ভবত কলেবরের দিক দিয়ে এটি তাঁর সবচেয়ে দীর্ঘ গ্রন্থ-সমালোচনা। যেহেতু এর আলোচক রবীন্দ্রনাথ এবং তা সে-কালের অভিজাত সাহিত্যপত্র ‘পরিচয়ে’ প্রকাশিত, সে জন্য আলোচনাটি সুধীমহলে বিশেষ মনোযোগ পায়। যদিও জগদীশ গুপ্ত সে সময়ে নিতান্ত অপরিচিত বা অজ্ঞাতকুলশীল ছিলেন না, তবুও এর ফলে জগদীশের পরিচয়ের পরিধি যে প্রসারিত হয় সে-সম্পর্কে সন্দেহ নেই। রবীন্দ্রনাথ সচরাচর সাহিত্যযশ প্রার্থী নবীন লেখককে উৎসাহ জানিয়ে যেভাবে গৎ-বাঁধা প্রশংসাপত্র বিতরণ করতেন, এক্ষেত্রে তার ব্যতিক্রম লক্ষ্য করা যায়। নৈতিক শুচিতা, রুচির পবিত্রতা ও সমাজের স্বাস্থ্যরক্ষার কারণেই তিনি এই কাহিনীর উপস্থাপনাকে প্রসন্ন মনে অনুমোদন করতে পারেন নি। তাই প্রায় জীবনসায়াহ্নে অপটু ও অশক্ত শরীরেও তাঁকে এই দীর্ঘ আলোচনার তাগিদ অনুভব করতে হয়। এই উপন্যাস সম্পর্কে অভিমত পেশের সময় তাঁর মনে যে কিঞ্চিৎ উত্তেজনা ছিল এবং অনেকটাই নৈতিক দায়িত্ব পালনের জন্যই যে তাঁর লেখনী-ধারণ, তার ভাব প্রচ্ছন্ন থাকেনি।

রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে জগদীশ গুপ্তের ব্যক্তিগত পরিচয় ছিল, চিঠিপত্রেও সামান্য যোগাযোগ ছিল। তাঁর ‘বিনোদিনী’ ও ‘লঘু-গুরু’ বই দু’খানা তিনি শান্তিনিকেতনে গিয়ে রবীন্দ্রনাথকে উপহার দিয়ে এসেছিলেন। তবে রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে তাঁর অতিরিক্ত আগ্রহ বা ভক্তির আতিশয্য ছিল না। বরঞ্চ বলা চলে এক ধরনের সসংকোচ দূরত্ব বজায় রাখতেন। তাঁর স্ত্রীর স্মৃতিচারণায় জানা যায়, কুষ্টিয়া-বাসের সময়ে বাড়ি থেকে মাত্র মাইল ছয়েক দূরে কবিতীর্থ শিলাইদহে যাওয়ার আগ্রহ জগদীশের কখনো হয়নি। এমন কী যখন কর্মসূত্রে বোলপুরে থাকতেন তখনো রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে কোন সরল যোগাযোগ গড়ে ওঠেনি। জগদীশ গুপ্ত শান্তিনিকেতনে যেতেন বটে, তবে তা প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের (১৮৮২-১৯৮৬) সঙ্গে কিংবা ‘কালি-কলম’ সম্পাদক মূরলীধর বসু যখন শান্তিনিকেতনে তাঁর শ্বশুরবাড়িতে বেড়াতে আসতেন তখন তাঁর সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য। রবীন্দ্রনাথ ও জগদীশের সম্পর্ক বিষয়ে উভয়েরই প্রীতিভাজন সাহিত্যিক-সাংবাদিক নন্দগোপাল সেনগুপ্ত বলেছেন : “জগদীশবাবু রবীন্দ্রনাথ শরৎচন্দ্র প্রমুখের সঙ্গে কোনোদিন ঘনিষ্ঠ হতে পারেননি। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে একাধিকবার দেখা-সাক্ষাৎ করেছেন, কিন্তু বিশেষ সমাদর লাভ করেছেন মনে হয়নি কথা প্রসঙ্গে” (আবুল আহসান চৌধুরীকে লেখা ১০ নভেম্বর ১৯৮৭-এর চিঠি)। রবীন্দ্রনাথকে আকৃষ্ট করার মতো স্বভাব, মানসতা বা ভক্তির নিষ্ঠা জগদীশের ছিল না। এ-কারণেই হয়তো উভয়ের মধ্যে যে ব্যবধান রচিত হয়েছিল তা লুপ্ত হয় নি।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন