সোমবার, ২১ অক্টোবর, ২০১৩

মানুষ নিজের অভিজ্ঞতা লেখে, এক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা মানে হলো যা কিছু সরাসরি কিংবা অগোচরে তাকে স্পর্শ করে চলে

নাহার মনিকা
-----------------------------------------------------------------------------------------------------
নাহার মনিকা কবিতা লিখতেন শুরুতে। পরে গল্প লিখছেন। তাঁর গল্প একটু আয়োজন করে পড়তে হয়। গল্পের মধ্যে সেই আয়োজনের শৈলীটি তিনি বেশ করে বুনে দেন। পাঠককে শুরুতে তাঁকে বুঝতে হয়। তারপর গল্পের ঘরে প্রবেশাধিকারটি পান। এবং বুঝতে পারেন--এটা প্রকৃতই গল্পের জগত। এখানে কথক নাহার মনিকা। অন্য কেউ নন। এই ঘরানার গল্প পড়া যাবে জ্যোতিপ্রকাশ দত্তদের মত অতি বিরল কয়েকজন গল্পকারের কাছে। ফলে গল্পগুলো জনপ্রিয় হতে সময় নেয়। তাঁরা জনপ্রিয়তার দৌড়ে নেই। গল্পের ভবিতব্যে আছেন। 
 নাহার মনিকার বেড়ে ওঠা বাংলাদেশের উত্তর বঙ্গে। পড়াশুনা : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও লন্ডন স্কুল অব হাইজিন এন্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিন। বর্তমান নিবাস : কানাডা। বেশ কয়েকটি কবিতা ও গল্পের বই প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে গল্পগ্রন্থ : পৃষ্ঠাগুলি নিজের। কাব্যগ্রন্থ : চাঁদপুরে আমাদের বরষা ছিল।
-----------------------------------------------------------------------------------------------------

১. গল্প লিখতে শুরু করলেন কেন?

ভেবে চিন্তে প্রস্তুতি নিয়ে গল্প লিখতে শুরু করিনি। শুরুর দিকের লেখালেখির সঙ্গে চাকুরী, গবেষণার কাজ ইত্যাদি কারণে বেশ দীর্ঘ ব্যবধান তৈরী হয়ে যাওয়া একটা সময়ে আমার আবার গল্প লেখার শুরু। হতে পারে একাডেমিক রিসার্চ রিপোর্ট লেখার একঘেয়েমী ভালো লাগছিলো না। তখন না অবসর না ব্যস্ত ধরনের একটি দিনে গল্প লিখতে শুরু করেছিলাম। বন্ধুদের অনিয়মিত আড্ডায় ‘হলুদ আক্রান্ত’ নামের সে গল্প শুনিয়ে, তাদের আগ্রহ স্বত্ত্বেও ফেলে রেখেছিলাম বেশ কয়েক মাস। পরে বাংলামাটি নামের ওয়েব ম্যাগাজিনে ছাপা হয়।


ভেবে দেখেছি, আসলে গল্পটি আমার মাথায় বেশ অনেকদিন থেকে সন্তরণশীল ছিল, বাকী ছিল কেবল লিখে ফেলাটা। এরপর ‘ডানায় বাহানা,’ আর ‘আড়াল’ নামে আরো দুটি গল্প লিখে নিজের সম্পর্কে-‘গল্প লেখার চেষ্টা করে দেখা যায়’- এই বিবেচনা গ্রাহ্য করতে থাকি, তবে সে গ্রাহ্য করার মধ্যেও আমার দ্বিধা থাকে, সংশয় থাকে।


২. শুরুর লেখাগুলো কেমন ছিল?

অন্য অনেকের মত আমারও শুরু কবিতা দিয়ে। দৈনিক, সাপ্তাহিক পত্র-পত্রিকা আর লিটল ম্যাগাজিনে ছাপানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল আমার কবিতা। বেশ অনেকদিন পরে ২০০৭ এ বই বেরিয়েছে- ‘চাঁদপুরে আমাদের বর্ষা ছিল’ এই শিরোনামে। এর আগে ১৯৮৯/৯০ সাল হবে, আমি গল্প লিখেছি, হয়তো কবিতা ছাড়া অন্য মাধ্যমে কথা বলবার প্রেক্ষিত তৈরী করতে চেয়েছি। সে সময় গল্প ভালো হচ্ছে কি না, আদৌ হয়ে উঠছে কি না এ বিষয়ে কারুর কাছ থেকে শোনার বা আলোচনার সুযোগ খুব একটা পাইনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েদের হলে থাকি। তখন সূর্যাস্ত আইনের কাল, মানে সন্ধ্যা ছ’টার মধ্যে হোষ্টেলে ফিরতে হবে। কাজেই বইমেলা, কবিতা উৎসবের প্রলোভন সব রেখে ঘরে ফিরে আসি। বড়বোন বাংলা সাহিত্যের ছাত্রী আর রুমমেট ইংরেজী সাহিত্যের হওয়ায় ওদের প্রচুর টেক্সট বই আমার পাঠের আওতায় চলে এলো। বই আর লেখালেখি তখন নিত্যকার সঙ্গী হয়ে ওঠে। আর সে লেখা ছাপাবার একমাত্র মাধ্যম ডাকযোগে পত্রিকায় পাঠিয়ে দেয়া। লেখা ছাপা হওয়ার বাড়তি আনন্দ ছিল সম্মানীর টাকা! দুটো গল্প লিখেছিলাম তখন, মনে আছে ডাকযোগে পাঠকের পাঠ-প্রতিক্রিয়ার চিঠি এসেছিল! এ কথাগুলো বলছি এজন্য যে যে সময় লেখা ছাপিয়ে সরাসরি পাঠ প্রতিক্রিয়া যা আমরা আন্তর্জালের সুবাদে আজকে পাই তা দূর্লভ ছিল, আর সম্মানী পাওয়া বোধহয় লেখা চর্চার একটা প্রণোদক ছিল! পাশাপাশি সে সময় সর্বভূক সাহিত্য পাঠও লেখালেখির প্রস্তুতি পর্বের একটা অংশ বলে মনে হয়।


৩. গল্প লেখার জন্য কি প্রস্তুতি নিয়েছেন? নিলে সেগুলো কেমন?

পড়ার বাইরে গল্প লেখার জন্য আর কোন প্রস্তুতির কথা চিন্তা করিনি কখনো। হ্যা, গল্প নিয়ে অবশ্যই ভাবি। একটা পলকা ভাবনা উড়ে বেড়ায়, ধরতে চাই, ধরা যায়, আবার যায় না। পাতার ধারালো ধার ঘেষে লেপ্টে থাকা মাকড়সার মত তির তির দুলতে থাকে তারপর সহসাই বুনতে শুরু করে অধরা কিনারের বাসাটি। শুরু হয়ে যায় একটা গল্পের আখ্যান। আমার গল্প আমার নিজের কিংবা অনুভূতি ছুয়ে গেছে এমন কিছুকে ঘিরেই হয়। আমার কাছে গল্প আসে একটা শব্দে, কখনো বা একেকটা অক্ষরে কোন উত্তুঙ্গ, নয় তো অবসন্ন মুহূর্তের প্রকাশ হয়ে, যে ভাবনার অনুকে তারপর জুড়ে দেয়া যায় দৈনন্দিনের সঙ্গে, স্মৃতির সঙ্গে, মানুষের চালচিত্রের সঙ্গে। আবার উল্টোটাও ঘটে, এইসব ভাবনাকে আমি নিজেই হারিয়ে যেতে দিই দলে দলে। সব তো অতি অবশ্যই লেখা হয় না, তা বাদেও অনিচ্ছুক ছাত্রের মত যে লেখাটা লিখছি সেটির সঙ্গে একটা না লেখার খেলা জমে আমার। আর শেষে লেখা হয়ে গেলেও কাটাছেঁড়া, ব্যবচ্ছেদ হয় অধিকাংশ গল্পের।


৪. আপনার গল্পলেখার কৌশল বা ক্রাফট কি?

তেমন কোন সু নিদ্দির্ষ্ট কৌশল বা ক্রাফট অনুসরণ, পরিস্কার করে বললে বলা উচিৎ, পারি না। যে প্রেক্ষিত নিয়ে একটা গল্প লিখছি সেখানে সচেতনে বা অবচেতনে অনুপ্রবেশ করা আর সেটা লেখক হিসেবে লুকিয়ে রাখাটাকে কি একটা কৌশল বলবো? মানুষ নিজের অভিজ্ঞতা লেখে, এক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা মানে হলো যা কিছু সরাসরি কিংবা অগোচরে তাকে স্পর্শ করে চলে। অবশ্যম্ভাবীভাবে আসে শৈশব, দেশ গ্রাম, মফস্বল। কিংবা বিদেশবাস এর অভিজ্ঞান, বর্তমান। কখনো প্রত্যক্ষ করিনি এমন প্রেক্ষাপট নিয়েও আমি গল্প লিখেছি, যে বিষয়গুলো সংবাদ হিসেবে, ইস্যু হিসেবে, ঘটনা হিসেবে, ঘটনার পরম্পরা হিসেবে আমাকে প্রবলভাবে আক্রান্ত করেছে। সরাসরি প্রত্যক্ষ না করা বিষয়ের মধ্যে সর্বাগ্রে থাকে মুক্তিযুদ্ধ, আমাদের মুক্তিসংগ্রামের কাহিনী। সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রের গল্প নয়, এর বাইরে সাধারণ মানুষের, নারী পুরুষের যুদ্ধের মুখোমুখি হওয়ার গল্প লিখেছি। আবারো বলি, যেসব উপলব্ধিকে আমি আমার লেখায় প্রাসঙ্গিক করতে পারি, আপাতত সেখানেই সাচ্ছন্দ বোধ করি।


৫. আপনার নিজের গল্প বিষয়ে আপনার নিজের বিবেচনা কি কি?

লেখার ইচ্ছে আর স্বাধীনতাকে বিবেচনা বলে চালাবো কি না ভাবছি! জানা গল্প, গল্পের আড়ালের গল্প কতরকম করেই তো বলতে ইচ্ছে করে, আর সে ইচ্ছের প্রতিফলন যখন লেখার আদলে দেখি সেটিই আনন্দ। এর বাইরে বাকীটুকু আমার সংশয়। প্রতিটা গল্প বা লেখা শেষ হলে কেমন হলো সেটা নিয়ে যেমন, আবার নতুন কিছু লিখতে শুরু করবো কিনা তা নিয়েও আমার দ্বিধা থাকে। সুতরাং, বিবেচনা বিষয়ে বলার পর্যায়ে এখনো পৌঁছেছি বলে মনে হয় না।


৬. আপনার আদর্শ গল্পকার কে কে? কেনো তাঁদেরকে আদর্শ মনে করেন?

আদর্শ গল্পকার আর পছন্দের গল্পকার দুটো কি এক কথা? আমি সে রকমভাবে নিয়ম মেনে গল্প পাঠ করিনি এখন পর্যন্ত। হ্যা, গল্পগুচ্ছ থেকে শুরু করে প্রথিতযশা প্রায় সকল গল্পকারের গল্প পড়েছি। নাম করলে তালিকাটা খামোখা দীর্ঘ হবে। ইদানিং আন্তর্জালের কারণে ভালো লেখা হাতের কাছে এসে যাচ্ছে, পড়া হচ্ছে, ব্লগে, ওয়েবজিনে। ‘গল্পপাঠ’ ই তো ভালো গল্পের এক সমৃদ্ধ ভাণ্ডার! আমি সাহিত্য পড়ি প্রথমত তার রস আস্বাদনের জন্য, টেক্সট বিবেচনা করে পড়ি না, মহৎ কোন লেখা পাঠক হিসেবে আমার মধ্যে যে দাপটের ছাপ রেখে যায় তা আমাকে প্রেরণা দেয়, কখনো কখনো স্তিমিতও করে, মনে হয় এ লেখা ডিঙ্গিয়ে আর লিখতে যাওয়া বোকামী! তবে কতটা প্রভাবিত করে তা বলতে পারবো না। আর কেউ, আরো মনযোগী, তুলনা করতে পারঙ্গম কোন পাঠক/সমালোচক হয়তো বলতে পারবেন।


৭. কার জন্য গল্প লেখেন? আপনি কি পাঠকের কথা মাথায় রেখে লেখেন? লিখলে কেনো লেখেন? আর যদি পাঠকের কথা মনে না রেখে লেখেন তাহলে কেনো পাঠককে মনে রাখেন না লেখার সময়ে?


একসময় খুব ষ্ট্রেট-ফরোয়ার্ড মনে হতো পাঠকের কথা মাথায় রেখে লিখি না।

নিজের আনন্দের জন্য লিখি, লিখতে পারলে আমার ভালো লাগে। লিখতে পারা আমার কাছে একটা স্বাধীনতা, আর সে স্বাধীনতা প্রকৃতির শক্তির মত। তবে এ পর্যন্ত ছোটগল্প, উপন্যাস ইত্যাদি লেখার পর মনে হয়, গল্পের প্রথম খসড়াতে চোখ বোলানোর পরে লেখাটিকে আমি পাঠকের হয়েও দেখতে শুরু করি, কিন্তু হরেক পাঠকের কথা মাথায় রাখা তো আর সম্ভব না, তবু যতটুক পারা যায় নিজের বিবেচনায় গল্পটিকে পাঠকের জন্য অনায়াস করার একটা মিহি ভাবনা বোধকরি কাজ করে আমার। জানি না তার কতটুকু ফলবতী হয়, কেননা সে পাঠকটি তো আমিই যে কিনা লেখাটি লিখেছে। তবে, কেউ আমার লেখা পড়লে যে শুভ বোধ, তা এড়িয়ে যাওয়া বা উপভোগ না করার মত মোহমুক্তি আমার ঘটেনি।


৮. এখন কি লিখছেন?

এ বছর আমার প্রথম উপন্যাস ‘বিসর্গ তান’ লিখেছি। উপন্যাসের বিষয় আমার চেনা সেইসব শৈশবতাড়িত, স্মৃতি আক্রান্ত মানুষ যারা এক কিংবা একের অধিক, যারা নিজেদেরকে নিজের অথবা আর কারো চোখ দিয়ে দেখে চলেছে। দেখে চলেছে স্থান আর স্থানান্তর, এবং সময় আর সময়ান্তরকে। এটি এবারের ঈদসংখ্যাতে ছাপা হয়েছিল। সেখানে আরো কিছু সংযোজন আর এডিট করছি।


৯. আগামী কি লিখবেন?

আমি যেহেতু পেশাদার লেখক নই, তাই লেখালেখি নিয়ে আমার তেমন সুনির্দিষ্ট কোন পরিকল্পনা নেই।


শিশু কিশোরদের জন্য লেখা আমার তিনটি গল্প আছে যেগুলো কোথাও ছাপতে দেয়া হয়নি, এ ধরনের আরো কিছু গল্পের ভাবনা আছে মাথায়। স্বতস্ফুর্ততা, প্রনোদনা এসবকে নমস্য রেখে আমার সংসারী অবস্থান থেকে দেখেছি যে লেখার তাগাদা বা একটা ডেডলাইন থাকলে আমার অন্তত, টাইম ম্যানেজমেন্ট ভালো হয়। আরো ছোটগল্প লিখতে চাই, হয়তো উপন্যাসও লিখবো।




নাহার মনিকার গল্প ও অন্য লেখা পড়তে এই লিংকে ক্লিক করুন

1 টি মন্তব্য: