শুক্রবার, ৪ অক্টোবর, ২০১৩

শিল্পী (অনূদিত, মূলঃ কার্ল গুস্তাভ ইয়ুং)

অনুবাদ ঃ রাতুল পাল

[ইংরেজী প্রবন্ধটির শিরোনাম The Poet । কিন্তু নির্দিষ্টভাবে এতে কবি বা কাব্যের ব্যাখ্যা না করে সামগ্রিক ভাবে শিল্প ও শিল্পীর প্রকৃতি বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করা হয়েছে। তাই অনূদিত প্রবন্ধটির শিরোনাম হিসাবে “শিল্পী”-ই আমার আমার কাছে অধিকতর গ্রহণযোগ্য।]



মানুষের ইচ্ছার স্বাধীনতা যেমন রহস্যপূর্ণ একটি বিষয়, তেমন রহস্যপূর্ণ তার সৃষ্টিশীলতাও। মনোবিজ্ঞানীরা বিষয় দুটিকে বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করলেও, তা থেকে উদ্ভূত কিছু দর্শনগত সমস্যার কোন সমাধান পাননি। সৃষ্টিশীল মানুষের প্রকৃতি এমনই এক ধাঁধা যে, নানা উপায়ে তাকে সমাধান করার চেষ্টা করা হলেও, শেষ পর্যন্ত উত্তর পাওয়া প্রায় অসম্ভব। আধুনিক মনোবিজ্ঞান বিষয়টি উপলব্ধি করার পর বার বার চেষ্টা করেছে শিল্পী ও শিল্পীকে অনুধাবন করার ।
ফ্রয়েডও একটি পন্থা নির্দেশ করেছিলেন। তাঁর মতে, শিল্পীর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকেই শিল্পের উদ্ভব হয়। ধারণাটি সত্য হবার কিছুটা সম্ভবনা অবশ্যই রয়েছে, কারণ একটি ব্যাপার অনেকটাই স্পষ্টরূপে প্রতীয়মান হয়, তা হল - যে-কোন শিল্পসৃষ্টির স্পৃহাকে,  মনোবৈকল্যের সাথে যার পার্থক্য সামান্যই, মানসিক অবস্থা বিকাশের কিছু সমস্যাযুক্ত জটিল পর্যায়ের সাথে সম্পর্কযুক্ত বলে ধরে নেওয়া যায়। মনোবৈকল্যের কারণ যে মানুষের পূর্ববর্তী মানসিক অবস্থার মধ্যেই নিহিত থাকে, অর্থাৎ মনোবৈকল্যের উদ্ভব যে বিভিন্ন আবেগ বা শৈশবের কিছু বাস্তব বা কাল্পনিক অভিজ্ঞতা থেকেই হয়ে থাকে, এই সত্যটি ফ্রয়েডের একটি বড় আবিষ্কার। পরবর্তীকালে আরও কিছু মনোবিজ্ঞানী এ-বিষয়ে গবেষণা করেছেন এবং অনুরূপ ফল পেয়েছেন। একজন কবি বা শিল্পীর মানসিক গঠন তাঁর সৃষ্ট শিল্পের মধ্যে প্রতিফলিত হয়, একথা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। আবার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা শিল্পীকে শিল্পের বিষয়বস্তু নির্ধারণেও প্রভাবিত করে, এই ধারণাটিও নতুন কিছু নয়। তারপরও ফ্রয়েড ও তাঁর অনুসারীদের অবদান অস্বীকার করা যাবে না, কারণ তাঁরা দেখিয়েছেন এই প্রভাবটি কতোটা সুদূরপ্রসারী হতে পারে এবং কতো আশ্চর্যজনকভাবে সেগুলির অভিব্যক্তি ঘটতে পারে। 

ফ্রয়েডের মতে মনোবৈকল্য হল মানুষের অবদমিত বাসনা পূরণের একটি বিকল্প পন্থা। তাই তিনি বিষয়টিকে বিবেচনা করেন এক ধরনের অযোগ্যতা হিসাবে - একটি ভুল, প্রতারণা বা স্বতপ্রবৃত্ত বিবেচনাহীনতা হিসাবে। তাঁর কাছে মনোবৈকল্য হল কোন না কোন অসম্পূর্ণতার ফল, যা স্বাভাবিকভাবে হবার কথা ছিল না। তবে একটি শিল্পকর্মকে যদি শিল্পীর অবদমিত আকাঙ্খার আলোকে ব্যাখ্যা করে মনোবৈকল্যের আওতায় ফেলা হয়, তবে তা প্রশ্নবিদ্ধ হবে। ফ্রয়েডিও মনোবিজ্ঞান দর্শন ও ধর্মকেও এভাবেই ব্যাখ্যা করতে চেয়েছে। যদি বলা হয় যে উল্লেখিত তত্ত্বটি একজন শিল্পীর ব্যক্তিগত জীবনের সেই সব নির্ধারককে ব্যাখ্যা করে যেগুলি ছাড়া শিল্পকর্ম সম্ভবই নয়, তাহলে কোন আপত্তি থাকে না। কিন্তু যদি বলা হয় যে তত্ত্বটি স্বয়ং শিল্পকর্মকে ব্যাখ্যা করতে পারে, তবে অবশ্যই তা গ্রহণযোগ্য হবে না। একজন শিল্পীর বা কবির যে স্বভাব বৈশিষ্ট্যগুলি শিল্পকর্মের ভিতর নিহিত থাকে, সেগুলি শিল্পের মুখ্য বিষয় নয়; যতই আমরা এই বিষয়গুলির দিকে নজর দেব, ততই আমরা শিল্পকর্মের মূল থেকে সরে আসবো। শিল্পকর্ম বা কাব্য ব্যক্তিগত জীবনের গন্ডি থেকে ঊর্ধ্বে উঠে মানুষ হিসাবে শিল্পী বা কবির আত্মা ও হৃদয় হতে উদ্ভূত বক্তব্যকে প্রকাশ করে সমগ্র মানবজাতির আত্মা ও হৃদয়ের কাছে। শিল্পে ব্যক্তিগত বিষয়স্তু এক ধরনের সীমাবদ্ধতা, যাকে শিল্পের নৈতিকতা বিরোধীও বলা যেতে পারে। কোন শিল্পকর্ম যদি মুখ্যত ব্যক্তিগত বিষয়বস্তু দ্বারাই গঠিত হয়, তবে সেটি মনোবৈকল্যের ফল হিসাবে বিবেচিত হবারই যোগ্য। সকল শিল্পীই নিজের মধ্যে একান্তভাবে অভিনিবিষ্ট , অর্থাৎ  তাঁরা হল শিশুসুলভ ও স্বকাম স্বভাবের অবিকশিত ব্যক্তিত্বের মানুষ  - ফ্রয়েড অনুসারীদের দ্বারা প্রদানকৃত এই মতামতের কিছুটা ভিত্তি রয়েছে। কিন্তু এই ধারণা গ্রহণযোগ্য হবে যখন আমরা একজন শিল্পীকে মানুষ হিসাবে ব্যাখ্যা করব তখন, যখন মানুষটিকে শিল্পী হিসাবে ব্যাখ্যা করব তখন নয়। শিল্পী হিসাবে একজন মানুষকে ব্যাখ্যা করতে গেলে তাঁকে যৌনতার প্রেক্ষিতে বিচার করা যায় না। শিল্পী হিসাবে তিনি নৈর্ব্যক্তিক অর্থাৎ সকল মানবিক বৈশিষ্ট্যের আওতাবর্হিভূত।  শিল্প শিল্পীর শিল্পীসত্তার প্রতিফলন, তাঁর ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্যের নয়।     

প্রত্যেক সৃষ্টিশীল ব্যক্তিই দ্বৈত স্বভাবের, অর্থাৎ তাঁর ভিতর বিপরীতমুখী প্রবণতাসমূহ ক্রিয়াশীল। একদিকে মানুষ হিসাবে তাঁর একটি ব্যক্তিগত জীবন রয়েছে, অপরদিকে সে সৃষ্টিশীল নৈর্ব্যক্তিক স্বভাবের অধিকারী। শিল্পী হিসাবে তাঁকে পরিমাপ করতে গেলে তাঁর শিল্পকর্মের দিকেই নজর দিতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, একটি প্রতিষ্ঠানের অফিসার বা ক্লার্ক যখন দায়িত্ব পালন করেন তখন তাদের ব্যক্তিত্ব অনেকটা নৈর্ব্যক্তিক হয়ে ওঠে, ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য দ্বারা যা নিয়ন্ত্রিত নয়। একজন শিল্পীর ক্ষেত্রেও ঘটে অনুরূপ ব্যাপার । শিল্প সৃষ্টির সময় সে ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য থেকে সরে এসে নৈর্ব্যক্তিক হয়ে যায়। শিল্প হল অন্তর্জাত এক শক্তি যার দ্বারা মানুষ অধিকৃত হয় এবং পরিণত হয় সেই শক্তি প্রকাশের একটি  মাধ্যমে। শিল্পের ক্ষেত্রে শিল্পী স্বাধীন ইচ্ছা দিয়ে সবকিছু নির্ধারণ করে না, বরং শিল্পকে তাঁর মধ্য দিয়ে শিল্পের নিজস্ব অভীষ্ট পূরণের সম্মতি প্রদান করে। মানুষ হিসাবে তাঁর ব্যক্তিগত ইচ্ছা ও লক্ষ্য থাকতে পারে, কিন্তু শিল্পী হিসাবে তিনি “মানুষ” উচ্চতর অর্থে - তিনি সমষ্টিগত মানবসত্তার ধারক, তিনি মানুষের সামগ্রিক অবচেতন ও মানসিক জীবন ধারণ ও আকৃতি প্রদান করেন। এই কঠিন কাজটি সম্পাদন করার জন্য তাঁকে অনেক ক্ষেত্রে কিছু সাধারণ আনন্দকে বিসর্জন দিতে হয়, যে আনন্দগুলির প্রাপ্তি একজন সাধারণ মানুষের কাছে তার জীবনকে অর্থপূর্ণ করে তোলে।

একজন শিল্পীর জীবন দ্বন্দ্বপূর্ণ না হয়ে পারে না, কারণ দু’টি বিপরীতমুখি শক্তি তাঁর ভিতর সংঘাতে লিপ্ত- একদিকে আনন্দ, তৃপ্তি ও সুরক্ষার জন্য সাধারণ মানবীয় বাসনা; অপরদিকে সৃষ্টির জন্য অদম্য আকাঙ্খা, যার বাস্তবায়নের জন্য মানবীয় বাসনাগুলিকে অগ্রাহ্য করা আবশ্যক। সাধারণ মানবীয় বৈশিষ্ট্যের অভাবহেতু শিল্পীদের জীবন স্বাভাবিক ভাবেই অত্যন্ত অসন্তষজনক হয়ে থাকে। সৃষ্টিশীলতার ঈশ্বরিক ক্ষমতা প্রাপ্তির দরুণ একজন ব্যক্তিকে সাধারণ জীবনে মূল্য দিতেই হবে - এই সত্যটির কোন ব্যাতিক্রম প্রায় অসম্ভব। অন্তনির্হিত কিছু শক্তি নিয়ে আমরা প্রত্যেকেই জন্মগ্রহণ করি। পরবর্তীতে আমাদের মানসিক গঠনের পেছনে যে-প্রবণতাটি মুখ্য ভূমিকা পালন করে সেটিই উক্ত শক্তিকে একচ্ছত্রভাবে কাজে লাগাতে চায়, ফলে বঞ্চিত হয় মানসিক বিকাশের অন্যান্য ক্ষেত্রগুলি। ঠিক এভাবেই সৃষ্টিশীল সত্তা দ্বারা শিল্পী এমনভাবে তাড়িত হয় যে তাঁর অহংবোধ সৃষ্টিশীলতাকে রক্ষার নিমিত্তে  নিষ্ঠুরতা, আত্মকেন্দ্রিতা ও অহমিকার মতো বিভিন্ন নেতিবাচক স্বভাবের জন্ম দেয়। একজন শিল্পীকে তুলনা করা যেতে পারে অবৈধ বা বঞ্চিত শিশুদের সাথে। শৈশব থেকে স্নেহ করার মতো কেউ থাকে না বলে তারা অত্যন্ত প্রতিকূল পরিবেশে বেড়ে ওঠে। এই প্রতিকূলতা প্রতিরোধ করার জন্য তারা অত্যন্ত আত্মকেন্দ্রিক হয়ে অসহায়ভাবে জীবনযাপন করে অথবা ধ্বংসাত্বক চরিত্রের অধিকারী হয়ে অনৈতিক কার্যকলাপে লিপ্ত হয়। তাহলে, ব্যক্তিগত দুর্বলতা বা দ্বন্দ্ব নয় বরং শিল্পই শিল্পীকে ব্যাখ্যা করে - এই সিন্ধান্ত নিয়ে সন্দিহান হবার কোন কারণ থাকছে কি? শিল্পীর চরিত্রের সকল নেতিবাচক দিক, তিনি যে একজন শিল্পী, এই সত্যেরই প্রত্যক্ষ ফলাফল। একজন শিল্পীকে জন্ম থেকেই সাধারণ মানুষের চেয়ে বেশি দায়িত্বের বোঝা বহন করতে হয়। একটি বিশেষ ক্ষমতা মানেই অন্যান্য ক্ষেত্রগুলিকে বঞ্চিত করে একটি নির্দিষ্ট দিকে শক্তি ব্যয়িত হওয়া।       

একজন শিল্পী বা কবি হয়তো ভাবতে পারেন যে, তাঁর মনোজগতে শিল্প বা কাব্য জন্ম লাভ করছে ও বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়ে বিকশিত হচ্ছে; তিনি এও ভাবতে পারেন যে, নিজস্ব চিন্তাশীলতা কাজে লাগিয়ে একদম শূন্যাবস্থা থেকে তিনি শিল্পের সৃষ্টি করছেন। শিল্পী যাই ভাবুক না কেন, একটি সত্যের কোন পরিবর্তন ঘটছে না, তা হল -  শিল্পীর শিল্প সৃষ্টির প্রক্রিয়া একজন মায়ের সন্তান জন্মদানের অনুরূপ। সৃষ্টিশীলতার প্রক্রিয়া স্বভাবতই নারীসুলভ, এবং তা উৎসরিত হয় শিল্পীর অবচেতন থেকে, বা তাঁর ভিতর সুপ্তাবস্থায় থাকা মাতৃসত্তা থেকে। যখন সৃষ্টিশীল শক্তি প্রবল হয়ে ওঠে তখন মানুষ নিজস্ব ইচ্ছার বদলে অবচেতন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, এবং সচেতনতা নিষ্ক্রিয় হয়ে গিয়ে পরিণত হয় ক্রিয়াশীল সৃষ্টি-প্রক্রিয়ার নীরব পর্যবেক্ষকে। সৃষ্টি একজন শিল্পীর নিয়তি হয়ে ওঠে ও নিয়ন্ত্রণ করে তাঁর মানসিকতাকে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, গ্যাটে ফাউস্ট সৃষ্টি করেননি, বরং ফাউস্টই গ্যাটেকে সৃষ্টি করেছে। আর এই ফাউস্ট মূলত একটি প্রতীক ছাড়া আর কিছু নয়। তবে প্রতীক মানে এই নয় যে, সেটি এমন কিছু নির্দেশ করছে যা সকলের কাছে সুপরিচিত; বরং তা প্রকাশ করছে এমন কিছু যা তখনও প্রর্যন্ত অপ্রকাশিত হলেও অজান্তে সক্রিয় ছিল প্রগাঢ়ভাবে।ফাউস্ট প্রকাশ করে এমন কিছু যা প্রত্যেক জার্মানের মনোজগতে বিরাজ করে, গ্যাটে শুধুমাত্র তার বহিঃপ্রকাশ ঘটান। একজন জার্মান ছাড়া অন্য কারো পক্ষে কি ফাউস্ট  বা অলসো স্পার্শ জরাথুসট্র লেখা সম্ভব? গ্রন্থ দু’টি এমন বিষয়ের অবতারণা ঘটায় যা অনুরণিত হয় প্রত্যেক জার্মানের মনোজগতে। একজন আদর্শ প্রজ্ঞাবান ব্যক্তি অর্থাৎ একজন ত্রাণকর্তার প্রতিকৃতি মানুষের অবচেতন মনে সুপ্তাবস্থায় অবস্থান করছে সভ্যতার উষালগ্ন হতে। যখন মানবসমাজ অধঃপতিত হয় অর্থাৎ বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে, তখন জাগরণ ঘটে এই প্রতিকৃতির । এরূপ প্রতিকৃতি বেশ কিছু থাকলেও সাধারণভাবে মানুষের স্বপ্নে বা শিল্পীর শিল্পকর্মে সেগুলি ধরা দেয় না। আমাদের সচেনত জীবনযাপন যখন একপার্শ্বিক ও ভ্রান্তিপূর্ণ হয়ে ওঠে তখন কিছুটা সহজাতভাবেই প্রতিকৃতিগুলি সাধারণ মানুষের স্বপ্নে বা শিল্পীর অন্তর্দৃষ্টিতে ধরা দেয়, এবং এর ফলস্বরূপ পুনরায় সুস্থিতি লাভ করে আমাদের মনোজগৎ।

এভাবেই একজন কবি বা শিল্পী তাঁর সময়ের আধ্যাত্মিক প্রয়োজনীয়তা পূরন করে থাকেন, এবং মূলত এ-কারণেই শিল্পীর কাছে তাঁর শিল্পকর্ম নিজের জীবনের চেয়েও অধিক মূল্যবান বলে মনে হয়, যদিও তিনি সবসময় তা উপলব্ধি করতে পারেন না। যেহেতু শিল্পী তাঁর অন্তর্জাত শিল্পের বহিঃপ্রকাশের মাধ্যমমাত্র, তাই তাঁর কাছে সৃষ্ট শিল্পের ব্যাখ্যা চাওয়া অযৌক্তিক। শিল্পীর ভিতরে যা উৎসরিত হয়, তাকে সঠিক আকার প্রদান করাই শিল্পীর প্রধান কাজ। ব্যাখ্যা করার দায়িত্ব তাঁকে অন্যের উপর ছেড়ে দিতে হবে। একটি মহৎ শিল্পকর্ম হল একটি স্বপ্নের মতো; কারণ অনেকটা স্পষ্টরূপে প্রতীয়মান হলেও কখনোই তা নিজেকে ব্যাখ্যা করে না এবং পরিপূর্ণ স্বচ্ছভাবে ধরা দেয় না। স্বপ্ন কখনোই “তোমার করা উচিৎ...” বা “এটাই সত্য” এ-জাতীয় কিছু নির্দেশ করে না। স্বপ্ন অত্যন্ত সাধারণভাবে আমাদের কাছে কিছু চিত্রকল্প উপস্থাপন করে, কিন্তু সেগুলিকে আমাদের ব্যাখ্যা করে নিতে হয় নিজেদের মতো । গভীরভাবে শিল্পকে পর্যবেক্ষণ করলে বলা যায় যে, একটি শিল্পকর্ম দর্শক ও তাঁর শিল্পীর উপর একই প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।শিল্পকর্মের অর্থ অনুধাবনের জন্য তার দ্বারা আমাদের নিয়ন্ত্রিত হতে হয়, ঠিক যেমন ভাবে পূর্বে নিয়ন্ত্রিত হয়েছিল স্বয়ং শিল্পী। আর তাহলেই আমরা উপলব্ধি করতে পারবো শিল্পীর প্রকৃত অভিজ্ঞতা। তাহলেই আমরা অনুধাবন করতে পারবো যে, তিনি প্রকাশ করেছেন এমন সব সত্যসমূহ যা চেতনার অতলে বিরাজমান। আমরা আরও বুঝতে পারবো যে, তিনি মানব জীবনের সেই গভীর স্তরে অবগাহন করেছেন যেখানে সকল মানব একই সূত্রে বাঁধা, যেখান থেকে একজন ব্যক্তির পক্ষে এমন কিছু অনুভূতি ব্যক্ত করা সম্ভব যা  সমগ্র মানবজাতির জন্য গ্রহণযোগ্য।

শিল্পের স্বরূপ ও তার মর্মের সন্ধান পাওয়া যাবে অভিজ্ঞতার সেই স্তরে যেখানে মানুষ কেবলমাত্র স্বতন্ত্র ব্যক্তি হিসাবে অস্তিত্বশীল নয়, যেখানে ব্যক্তিগত কল্যাণ-অকল্যাণের প্রশ্ন বিবেচিত হয় না, বরং বিবেচিত হয় সামগ্রিক অর্থে মানব-অস্তিত্ব। এজন্যই প্রতিটি মহৎ শিল্পকর্ম নৈর্ব্যক্তিক হয়েও আমাদের গভীরভাবে আলোড়িত করে। আর এ-কারণেই শিল্পীর ব্যক্তিগত জীবন দিয়ে শিল্পকে ব্যাখ্যা করা চলে না, বড়জোর তা শিল্প অনুধাবনের সহায়ক হিসাবে ব্যবহার করা যেতে পারে। একজন শিল্পী মানুষ হিসাবে অসামাজিক, সুনাগরিক, বিকারগ্রস্থ, অথর্ব বা অপরাধীও হতে পারে; কিন্তু এই বৈশিষ্ট্যগুলির আলোকে তাঁকে ব্যাখ্যা করা অনুচিত।              

(ঈষৎ সংক্ষেপিত

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন