সোমবার, ২১ অক্টোবর, ২০১৩

আমি আমার দেখাশোনার বাইরে কিছু লিখি না

নীহারুল ইসলাম

------------------------------------------------------------------------------------------------------
রৌরব, দেশ সহ বিভিন্ন লিটিল ম্যাগাজিনে লেখেন নব্বই দশক থেকে নীহারুল ইসলাম। জন্ম ১৯৬৭ সালে। মুর্শিদাবাদের লালগোলায়। প্রকাশিত গল্পগ্রন্থঃ পঞ্চব্যাধের শিকার পর্ব (১৯৯৬), জেনা (২০০০), আগুনদৃষ্টি ও কালোবিড়াল (২০০৪), ট্যাকের মাঠে, মাধবী অপেরা (২০০৮), মজনু হবার রূপকথা (২০১২)। দু’টি নভেলা--জনম দৌড় (২০১২), উপন্যাস। ২০০০ থেকে ‘খোঁজ’ নামে একটি অনিয়মিত সাহিত্য সাময়িকী’র সম্পাদনা।
নীহারুল ইসলামের লেখায় তার নিজের দেখা জীবন আছে। ফলে ভাষার মধ্যে আরবী উর্দু ফার্সি ভাষার স্বাভাবিক ব্যবহার দেখা যায়। এটা তাঁর গল্পের নিজস্ব একটি শক্তি। 
--গল্পপাঠ
------------------------------------------------------------------------------------------------------
১. গল্প লিখতে শুরু করলেন কেন?

নীহারুল ইসলামঃ  কী জানি কেন? হয়ত জন্মে পাওয়া এই ভুবন আমার পছন্দ নয়! তাই হয়ত নিজস্ব ভুবন সৃষ্টি করতে আমার গল্প লেখার শুরু...।

২. শুরুর লেখাগুলো কেমন ছিল?

নীহারুল ইসলামঃ   আমার প্রথম গল্প কলেজে পড়ার সময়ে লেখা। একটি মেয়েকে (সহপাঠী) মনে মনে ভালবাসতাম খুব। কিন্তু তাকে কিছু বলতে পারতাম না। মনে মনে খুব কষ্ট পেতাম। সেই না বলতে পারার কষ্ট থেকে মুক্তি পেতে লিখেছিলাম গল্প একটি বিয়োগান্ত প্রেম। প্রকাশিত হয়েছিল আমাদের লালগোলার ‘আগ্রহী’ পত্রিকায়। একেবারে কাঁচা লেখা। যদিও তার দু’বছর পর আচমকাই লিখে ফেলি ‘ফুলি’ গল্পটি। সঙ্গে সঙ্গে বহরমপুরের ‘রৌরব’ পত্রিকা ছেপে দেয়। ওই একটি গল্পেই আমি ‘গল্পকার’ হয়ে যাই। যদিও আজ বুঝতে পারি ওই গল্পটিও খুব কাঁচা ছিল। এবং আজও অনেক কাঁচা গল্প লিখে ফেলি।


৩. গল্প লেখার জন্য কী কী প্রস্তুতি নিয়েছেন? নিলে সেগুলি কেমন?

নীহারুল ইসলামঃ   গল্প লেখার তেমন কোনও প্রস্তুতি ছিল না। আজও নেই। তবে আমার একটা দুর্দান্ত শৈশব ছিল। জন্ম থেকে ষষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত আমার কেটেছে মামার বাড়িতে। সেটা রাঢ় বাংলার একটি গ্রামে। ‘মামার বাড়ির আব্দার’ বলতে আমরা যে সুখকে বুঝি, সেই সুখ আমি একশো শতাংশ ভোগ করেছি। কিন্তু তারপর পদ্মাপাড়ের পিতৃভূমিতে এসে দেখি একেবারে বিপরীত চিত্র। বন্দি জীবন। নিয়মে বাঁধা। পান থেকে চুন খসলেই শাস্তির ভয়। সেই ভয় থেকে বাঁচতে আমি আমার আব্বার সংরক্ষিত বইগুলিকে বন্ধু বানিয়েছিলাম। রামায়ণ, মহাভারত, মধুসূদন রচনাবলী, রামমোহন রচনাবলী, ইলিয়াড-ওডিসি- আরও কত সব বই! কিছু বুঝতাম না, শুধু পাতা উল্টে যেতাম। পাঠ্যবই ছেড়ে এইসব বইকে বন্ধু করা আব্বা প্রশয় দিয়েছিলেন। সেই কারণেই হয়ত তাঁর এবং মেজো ফুফুর (পিসি) জন্য লাইব্রেরী থেকে বই আনার দায়িত্ব পড়েছিল আমার ওপর। আমি আমার খুশী মতো বই আনতাম। ছোটদের কালিদাস, জাতকের গল্প, পঞ্চতন্ত্র, মোল্লা নাসিরুদ্দিনের গল্প, বিশ্বকোষ- এই বিশ্বকোষের কোনও এক খন্ডে পেয়েছিলাম, ‘পায়রা ও পিঁপড়ে’র গল্পটি। সাহিত্যের স্বাদ গ্রহণ বলতে ওই গল্পটিই ছিল আমার কাছে প্রথম। তারপর থেকে অন্যকিছু পড়ার চেয়ে গল্প পড়ার প্রতি ঝোঁক হয়েছিল বেশী।

৪. আপনার লেখার কৌশল বা ক্রাফট কি?

নীহারুল ইসলামঃ   লেখার কি কোনও কৌশল হয়? হলে আমার জানা নেই। পথ চলতে চলতে কিছু দেখে কিংবা কাজ করতে করতে কিছু শুনে কিংবা ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখে আমি গল্প লেখার রসদ পাই। আর সেই রসদ আমি আমার শৈশব-স্মৃতিতে চুবিয়ে জারিয়ে নিই। তারপর লিখতে বসি। তার মধ্যে একটা-দুটো উতরে যায়। ভাল লাগে।

৫. আপনার নিজের গল্প বিষয়ে আপনার নিজের বিবেচনা কি কি?

নীহারুল ইসলামঃ  নিজের গল্প বিষয়ে নিজের বিবেচনা করার সময় পাইনি এখনও। তবে আমি আমার দেখাশোনার বাইরে কিছু লিখি না। আমার লেখার ভূগোল মাত্র পঁচিশ বর্গ কিমি। এই ভূগোলের মানুষ-জন, প্রকৃতি আমার লেখার বিষয়। যতদিন লিখতে পারব, এঁদের নিয়ে-এসব নিয়েই লিখে যাব।


৬. আপনার আদর্শ গল্পকার কে কে? কেন তাদেরকে আদর্শ মনে করেন?

নীহারুল ইসলামঃ সেই অর্থে আদর্শ গল্পকার বলে কেউ নেই আমার। কিংবা সব গল্পকারই আমার কাছে আদর্শ। যাঁদের গল্প আমি পড়েছি। কিংবা পড়ছি। সবার কাছেই কিছু না কিছু শিখি। আজও এমন সব গল্পের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ ঘটে, তার গল্পকারকে আমি ঠিক চিনি না। যেমন, ‘গল্পপাঠ’ –এর সৌজন্যে সদ্য নাহার মণিকার গল্প ‘চারিদিকে রোদের হাহাকারে’ এবং জ্যোতিপ্রকাশ দত্তের ‘দেহাবশেষ’ পড়ে আমি স্তম্ভিত হয়ে আছি। তবে আমাকে গল্প লিখতে যারা উস্‌কে ছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্তত তিনজন গল্পকারের নাম আমি করতেই পারি। প্রথম জন হাসান আজিজুল হক। গল্প শকুন। এই গল্পটি পুনঃমুদ্রণে পড়েছিলাম কোনও একটি সাময়িক পত্রে। গল্পটি পড়ে কিছু প্রশ্ন নিয়ে আমি পদ্মা পেরিয়ে রাজশাহী ছুটেছিলাম হাসানদার সঙ্গে দেখা করতে। কেননা, ‘শকুন’ গল্পের পটভূমি, চরিত্র, সংলাপ সব আমার চেনা। শুধু তাই নয়, ওই গল্পের একটি চরিত্র যেন আমি নিজে! অথচ হাসানদা থাকেন রাঢ়, বাগড়ি পেরিয়ে বরেন্দ্র ভূমিতে। তাহলে তিনি এ গল্প লিখলেন কী করে? হাসানদাকে প্রশ্ন করতে তিনি হেসে বলেছিলেন আদতে তিনি রাঢ় বাংলার মানুষ। তাছাড়া আমার মামার বাড়ির পাশেই একটি গ্রামে ছিল তাঁর দিদির বাড়ি। সেখানে নিয়মিত এসে থাকতেন তিনি। দিদির খুব কাছ-লাগা ছিলেন। আশপাশের গ্রামে ফুটবল খেলে বেড়াতেন। এমন কী, আমার মামার গ্রামের ফুটবল মাঠেও তিনি ফুটবল খেলেছেন। আমি আমার প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেছিলাম। দ্বিতীয় জন সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ। তাঁর ‘রাণীঘাটের বৃত্তান্ত’ গল্পগ্রন্থটি থেকে প্রথম যে গল্পটি পড়েছিলাম, সেটি হল, গোঘ্ন। একটি অসামান্য গল্প! মনে পড়লে আজও দেহমনে ঘোর ধরে। তৃতীয় জন স্বপ্নময় চক্রবর্তী। ‘অনুষ্টুপ’ পত্রিকায় পড়েছিলাম তাঁর ‘মানুষ কিংবা কোলবালিশ’ গল্পটি। আহা! এই তিনটি গল্প না পড়লে আমি কখনোই গল্প লেখার কথা ভাবতাম না। সেই অর্থে এঁরা প্রত্যেকেই আমার আদর্শ গল্পকার।

৭. কার জন্য গল্প লেখেন? আপনি কি পাঠকের কথা মাথায় রেখে লেখেন? লিখলে কেন লেখেন? আর যদি পাঠকের কথা মনে না রেখে লেখেন তাহলে কেনো পাঠককে মনে রাখেন না লেখার সময়ে?

নীহারুল ইসলামঃ   নিজের জন্য গল্প লিখি। নিজের কথা মাথায় রেখেই লিখি। পাঠকের কথা মনে রাখি না। কারণ, আমি মনে করি আমি সেই আদিম শিল্পী, যে আলতামিরার গুহাগাত্রে বাইসনের চিত্র এঁকেছিল। সময় কাটাতে কিংবা বিনোদনের জন্য সে বাইসন আঁকেনি। আসলে শিকারে বেরিয়ে চোখের সামনে একটা অদ্ভূত জন্তুকে ছুটে যেতে দেখে যে ভুলে যাচ্ছে শিকারের কথা! কেননা, সেই অদ্ভূত জন্তুটাকে সে আগে কখনও দেখেনি। এই মাত্র দেখল। তার চোখের সামনে দিয়ে ছুটে গেল জন্তুটা! ওটা জন্তু না অন্যকিছু? কোথা থেকে এল? কোথায় বা গেল? আদিম মানুষ ক্ষিদের কথা ভুলে গেল। সে তার হাতে ধরা অস্ত্র, যেটা নিয়ে সে শিকারে বেরিয়ে ছিল! সেটা নিয়েই ঘোরের মধ্যে গুহায় ফিরে গেল আবার। আর তার চোখে তো ছিলই সেই অদ্ভূত জন্তুটার ছুটে যাওয়ার দৃশ্যটা। শিকার করা অস্ত্রটা দিয়ে গুহাগাত্রে জন্তুটাকে আঁকল সে। এঁকে বুঝতে চাইল সে যেটা দেখল সেটা আসলে কী?

৮. এখন কী লিখছেন?

নীহারুল ইসলামঃ   এখন ‘সাদা ক্যানভাস’ নামে একটি ছোট উপন্যাস লেখার চেষ্টা করছি। যেখানে চরিত্ররা সব কাঠবিড়ালি, ইঁদুর, শকুন, বাঘ...।

৯. আগামী কী লিখবেন?

নীহারুল ইসলামঃ  ছোটগল্প। উপন্যাস ঠিক জমছে না আমার হাতে...



নীহারুল ইসলামে লেখা পড়তে ক্লিক করুন এই লিংকে--

1 টি মন্তব্য: