শনিবার, ২ নভেম্বর, ২০১৩

একটা গল্পের চূড়ান্ত রূপ দিতে লেগে যায় মাসের পর মাস

শামসুজ্জামান হীরা
----------------------------------------------------------------------------------------------------------------
মাতৃ-পিতৃকুলের ঠিকানা বৃহত্তর পাবনায় হলেও শামসুজ্জামান হীরার শৈশব-কৈশোর ও যৌবনের বড় অংশটা কেটেছে সিলেট, নোয়াখালী, কুমিল্লা ও চট্টগ্রামে। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে অধ্যয়নকালে লেখালেখি নিয়ে মেতে থাকা; তারপর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে সক্রিয় সম্পৃক্ততা। মাস্টার্স ফাইনাল পরীক্ষার মাঝখানে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি ও ছাত্র ইউনিয়নের যৌথ বিশেষ গেরিলা বাহিনীর সদস্য হিসেবে ভারতের আসামের তেজপুরে প্রশিক্ষণ নিয়ে দেশে ঢুকে চট্টগ্রামের পটিয়াতে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আবারও ছাত্ররাজনীতি-- চলে ১৯৭৪ পর্যন্ত। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের প্যানেল থেকে চাকসুর সহ-সভাপতি পদে নির্বাচিত। কর্মজীবনে প্রবেশ করেও কখনও পরোক্ষভাবে আবার কখনও সরাসরি সমাজ- পরিবর্তনের রাজনীতির সঙ্গে নিজেকে যুক্ত রেখেছেন। একদিকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তাঁর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা অন্যদিকে এই রাজনৈতিক বিশ্বাস বা দায়বদ্ধতার প্রতিফলন তাঁর বেশির ভাগ গল্পে পরিলক্ষিত হয়।

----------------------------------------------------------------------------------------------------------------

১. গল্প লিখতে শুরু করলেন কেন? 

শামসুজ্জামান হীরা : যখন বলা চলে অ্যাডলসেন্ট, হবি ছিল গল্পের বই পড়ার, খুব। একসময় ইচ্ছে হল নিজে কিছু লিখে ফেলি। সেই থেকে লেখালেখি শুরু। লিখেছি নিজে আনন্দ পাওয়ার জন্যেই মূলত। যে-সময়ের কথা বলছি সেটা গত শতাব্দীর ছয়ের দশক। লেখা জমা দিয়েছি স্কুল ও কলেজ ম্যাগাজিনে; ছাপা হয়েছে। হাত একটু পাকলে কুমিল্লার তখনকার স্থানীয় সাময়িকী, সাহিত্যপত্র ইত্যাদিতে লেখা ছাপা হতে থাকে। ওগুলোর এখন কোনো হদিস নেই। কোথায় হারিয়ে গেছে ---জানি না।

২. শুরুর লেখাগুলো কেমন ছিল?

শামসুজ্জামান হীরা :  এখনও সে-সময়কার বন্ধুদের কেউ কেউ বলে, দুয়েকটা গল্প নাকি ভালোই হয়েছিল। বুঝি না। তবে বন্ধুদের প্রশংসা লেখালেখিকে নেশায় পরিণত করেছিল।

৩. গল্প লেখার জন্য কি প্রস্তুতি নিয়েছেন? নিলে সেগুলো কেমন?

শামসুজ্জামান হীরা : বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে ছাত্ররাজনীতিতে আকণ্ঠ মগ্ন থাকায় বন্ধ হয়ে যায় সাহিত্যচর্চা। তারপর দীর্ঘ বিরতি। তা তিন দশক তো হবেই। কর্মজীবনে প্রবেশ করবার পর পেশাগত ব্যস্ততা ছিল, কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা, অর্থহীন কিছু কাজে আমি নির্দয়ভাবে নষ্ট করি জীবনের সবচেয়ে উৎকৃষ্ট, সৃজনশীল সময়টাকে। আমি যে একসময় লেখালেখি করতাম, ভুলেই বসি। ঝোঁকটা আবার পেয়ে বসে সাংবাদিক-বন্ধু মোনাজাতউদ্দিন-এর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে স্মৃতিচারণমূলক একটি লেখার রেশ ধরে, উনিশশ ছিয়ানব্বইয়ের ডিসেম্বরে। অনেকেই ওই লেখাটির প্রশংসা করেন এবং আবার লিখতে উৎসাহ দেন জোরেশোরে। বলা দরকার, ১৯৮০তে আমার এক ঘনিষ্ঠজনের বড় ভাইয়ের মৃত্যু এবং সেটাকে ঘিরে কিছু ঘটনা আমার মনে প্রচণ্ড আলোড়ন তুলেছিল। একটা গল্পের খসড়া দাঁড় করিয়ে ফেলেছিলাম। ওই ঘটনাটির স্মৃতি ফারমেন্টেড হতে থাকে দীর্ঘকাল। তারপর একরাতে লেখা সাঙ্গ। ঘষামাজা চলতে থাকে বহুদিন। ১৯৮০ সালের স্মৃতি গল্পরূপ লাভ করে ২০০৩ সালে! ছাপা হয় বহুলপ্রচারিত একটি জাতীয় দৈনিকের সাহিত্য-সাময়িকীতে। ‘একটি মৃত্যু : অতঃপর’। অনেকের কাছে গল্পটা খুব ভালো লাগে। তারপর আবার চলতে থাকে নিয়মিত লেখালেখি। গল্প লেখার জন্য আটঘাট বেধে প্রস্তুতি নেওয়া কী, ঠিক বুঝি না। যখন ইচ্ছা হয়, টুকে-রাখা প্লট বার করে পিসি খুলে বসে পড়ি, ব্যস।

৪. আপনার গল্পলেখার কৌশল বা ক্রাফট কি?

শামসুজ্জামান হীরা : যেসব ঘটনা, গভীর রেখাপাত করে মনে, টুকে রাখি। আমার লেখার পদ্ধতিটা কিছুটা অদ্ভুত। এমনও হয়, কখনও দুটো, কখনও তিনটে, কখনও বা চারটে গল্প একসঙ্গে লিখে চলি। যখন যেটা লিখতে ইচ্ছে করে সেটা। মুডের ওপর নির্ভর করে কোনটা কখন লিখব। আবার দীর্ঘ বিরতি। লেখা গল্পগুলো নিয়ে চলে ঘষামাজা, ফেলে রাখা, কিছুদিন বাদে বাদে পড়া। কম্পিউটার এ-কাজটাকে এখন অনেক সহজ করে দিয়েছে। প্রথমে গল্পের শরীর থাকে মেদবহুল ---ঘষেমেজে করা হয় সাধ্যমত স্লিম! একটা গল্পের চূড়ান্ত রূপ দিতে লেগে যায় মেলা সময়, কখনও মাসের পর মাস!

৫. আপনার নিজের গল্প বিষয়ে আপনার নিজের বিবেচনা কি কি?

শামসুজ্জামান হীরা :  জীবন থেকেই তো উঠে আসে গল্পের রসদ। আমার গল্পগুলোতেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। শ্রমজীবী মানুষ আর মুক্তিযুদ্ধ (যা আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ অধ্যায়), আমার গল্পগুলোতে ঘুরেফিরে আসে।

তবে নিজের লেখার মান নিয়ে আমি সংকোচ বোধ করি; সন্তুষ্ট হওয়া তো দূরের কথা। এজন্যে মাঝেমধ্যে লেখালেখি ছেড়ে দিতে ইচ্ছে করে।

৬. আপনার আদর্শ গল্পকার কে কে? কেন তাঁদেরকে আদর্শ মনে করেন?

শামসুজ্জামান হীরা : আমার সব থেকে প্রিয় গল্পকার চেখভ। চেখভের গল্পে জীবনের যে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম দিক উঠে এসেছে তা অন্য কারও গল্পে অন্তত আমি তেমনভাবে খুঁজে পাই না। এর পরই আসেন মোপাসাঁ, রবীন্দ্রনাথ। এছাড়া গোগল, ও. হেনরি, কাফকা, বোরহেস, মার্কেজ, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রেমেন্দ্র মিত্র, নরেন্দ্রনাথ মিত্র, সুবোধ ঘোষ, স্বপ্নময় চক্রবর্তী, বলরাম বসাক, তিলোত্তমা মজুমদার, হাসান আজিজুল হক, সেলিনা হোসেন, শহীদুল জহিরসহ বেশ কিছু গল্পকারের গল্প ভালো লাগে। যাঁদের গল্প আমি পড়েছি তাঁদের কয়েকজনের নাম উল্লেখ করলাম মাত্র। এঁদের প্রত্যেকের লেখায় রয়েছে বিশিষ্টতা---গভীর জীবনবোধ, দর্শন; শব্দ, ঘটনা ও সময়কে নিয়ে নিরীক্ষা।


৭. কার জন্য গল্প লেখেন? আপনি কি পাঠকের কথা মাথায় রেখে লেখেন? লিখলে কেন লেখেন? আর যদি পাঠকের কথা মনে না রেখে লেখেন তাহলে কেন পাঠককে মনে রাখেন না লেখার সময়ে?

শামসুজ্জামান হীরা :  ভেতরে থেকে যখন এক বা একাধিক প্লট তাগিদ দেয়, লিখি। সমাজের প্রতি, আরও স্পষ্ট করে বললে, খেটে-খাওয়া মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে লেখার প্রেরণা আসে। কখনও তা পাঠাই কোনো পত্রিকায়। কখনও আবার সম্পাদকের অনুরোধেও লিখি। অনুরোধের লেখা ভালো হয় না বেশিরভাগ ক্ষেত্রে। পাঠক কী পছন্দ করে লেখার সময় সে ভাবনা মাথায় আসে না, বরং আমি কী চিন্তা করি পাঠক তা জানুক, এরকম কিছু একটা মনে আসে । পাঠকের চিন্তা মাথায় রেখে লিখতে গেলে স্বাভাবিকভাবেই তা অনেকটা অনুরোধের আসর জাতীয় কিছু একটা হবে বলে মনে করি। আমার আঁকিবুকি কারও মনোরঞ্জনের জন্যে নয়; প্রধানত নিজের আনন্দ, কিছুটা বা, আগেই বলেছি, সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে ।

৮. এখন কি লিখছেন?

শামসুজ্জামান হীরা :  গল্প। গোটা তিনেক গল্পের কোনোটা একেবারে প্রাথমিক অবস্থায়, কোনোটা অর্ধেক, কোনোটা প্রায় শেষ অবস্থায় রয়েছে। এছাড়াও একটা ফরমায়েশি কাজ করছি--- ফিয়োদর দস্তোয়েভস্কির জুয়াড়ি উপন্যাসের সম্পাদনা ।

প্রচলিত ধর্মমত, সামাজিক প্রথার অসংগতি, অসারতা নিয়ে আমার বেশির-ভাগ লেখালেখি। এখন যে উপন্যাসোপম গল্পটি লিখে শেষ করেছি তা-ও ওই বৃত্তবহির্ভূত নয়।

৯. আগামীতে কি লিখবেন?

শামসুজ্জামান হীরা : গল্প লেখাতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি বেশি। মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতার ওপর উপন্যাস লেখার পরিকল্পনা আছে; দেখা যাক। কিন্তু সমস্যা হল, যা লিখি মনে হয় খুব ভালো কিছু হচ্ছে না।

শামসুজ্জামা হীরার গল্প পড়তে ক্লিক করুন >>

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন