সোমবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০১৩

পরীপর্ব

কুলদা রায়

  
---------------------------------------
পরীমানবের কথা অমৃত সমান।
কুলদা রায় ভনে শুনে পূণ্যবান।।
 ---------------------------------------
বাল্যকালে পরীরদের দেখেছি। সামনের রিজিয়া আপুদের বাসায়। ফরিদা আপুর বাসায়। আমেনা আপুদের বাসায়। তারা তিন বোন। আরেকটি বোন হয়েছিল। হামাগুড়ি দিত। জানালা দিয়ে আলোর রেখা দেখলে আবাক হয়ে চেয়ে থাকত। এই আলোর দিকে হাত বাড়িয়ে দিত। বলত, আ আ আ। সবাই বলত রিজিয়াদের এই বোনটি সত্যি সত্যি পরীর মত ছিল। তাকে পরে একদিন তালতলায় পাওয়া গিয়েছিল। সায়েম কবিরাজ বলেছিল—এটা পরীদের কাজ। এই ছোটো শিশুটিকে পরীরা ঘর থেকে নিয়ে গিয়েছে। ফেলে রেখে গিয়েছে আমাদের পুকুর পাড়ের তালগাছটির নিচে। ওই তালগাছটির নিচে তখনো ছায়ার মধ্যে ঘুমিয়ে আছে। চোখের উপরে জোড়া ভুরু। তার নাম ফাহমিদা।


ফাহমিদা আমাদের বাসায় আসত গুটি গুটি পায়ে। ছোটো ছোটো পায়ে এসে পুকুর থেকে  স্নান করে যেত। স্নান সেরে যাওয়ার পরে উঠোনে ওর পায়ের চিহ্ন পড়ে থাকত। লাল মত-আলতার মত সেই সব গুটি গুটি পা। আমার ঠাকুরদা সেই পায়ের চিহ্ন রক্ষা করত গভীর স্নেহে আর মমতায়। বলত, এ মেয়ে শ্রী শ্রী লক্ষ্মী দেবী। রিজিয়া আপা, ফরিদা আপা, আমেনা আপা শুনে খিল খিল করে হাসত। বলত, ও দাদাজান, ফাহমিদা লক্ষ্মী হইবে ক্যামনে। ও হইল পরী। সাকিন কোহেকাফ। কোহেকাফের মুছাম্মাৎ ফাহমিদা পরী।

পরে ঠাকুরদাই বলেছিলেন, জানিস, শ্রী শ্রী লক্ষ্মী দেবীর পা মাটিতে পড়ে না। মাটি থেকে একটু সামান্য উপর দিয়ে যায়। যায় হেঁটে নয়—উড়ে উড়ে।

ফাহমিদা লম্বা ঘাগরা পরত। ঘাগরাটি তার পা ছাড়িয়ে মাটিতে গিয়ে পড়ত। খালাম্মা তার মেয়েদের এ রকম লম্বা ঘাগরা বানিয়ে দিতেন নিজ হাতে। হাতে সেলাই করে। পরে একটি মেশিন কিনেছিলেন। ঘর ঘর শব্দ হত তার। শব্দ শুনলে বুঝতে পারা যেত—মাহমুদারা বড় হয়ে যাচ্ছে। নতুন জতুন ঘাগরা চাই তাদের।

ফলে তার পা দেখার কোনো সুযোগ ছিল না। আমরা কখনো পা দুটি দেখতেই পাইনি। ঠাকুরদাই সে সময়ে আমাদের দুঃখিত হতে দেখে বলেছিলেন, মেয়েদের পা দেখতে নেই। দেখতে পেলে প্রভাব চলে যায়।

বাল্যকালে এই একটি বাসায়ই পরীরা আসত। কখনো সকালে। কখনো দুপুরে। অথবা সন্ধে বেলা—রাত্রেও। এই পরীটি ফাহমিদা।  পরেও সে আমাকে দাদা বলে ডাকত। একদিন ওদের বাসায় নিয়ে গিয়েছিল। সারা ঘর তন্ন করে দেখিয়েছিল। বলেছিল, পরী বলতে কিছুই নাই দাদা। যদি পরী বলে কেউ থাকে তাইলে আমার আপারা হইল সেই পরী। বুঝতি পারতিছ?

আমি বুঝতে পারিনি। বুঝতে পারিনি বলেই সেই সময় আপারা বাসায় ছিল না। নিচে খালাম্মা নামাজ পড়ছেন। একটা ঘুঘু পাখি ডাকছে। হাওয়ায় কি একটা সড় সড় শব্দ হচ্ছে। দিনের আলো হাল্কা হয়ে এসেছে।

এ সময় জানালা দিয়ে আমাদের তিন আপা—রিজিয়া আপা, ফরিদা আর আমেনা আপা জানালা দিয়ে সোজা উড়ে এলো বাইরে থেকে।উড়ে বেড়ালো ঘরের মধ্যে। চোখ বুজে। আমাকে দেখতে পায়নি। ফাহমিদাকেও নয়। ফরিদা আপা একটু ছাঁদ ছুঁয়ে গেল। একটি টিকটিকি বাঁদিকের দেওয়ালে স্থির হয়ে ছিল—রিজিয়া আপা তার লেজটাকে একটু নাড়িয়ে দিল। আর আমেনা আপা ডাক দিকের দেওয়ালে খস খস করে লিখল—মনে রেখো—ভুল না আমায়। ফাহমিদা আমাকে ফিসফিস করে বলেছিল, ওই দ্যাখো দাদা, ওই দ্যাখো ওদের পিঠে পাখা।

চেয়ে দেখি—তিন আপা ততক্ষণে তাদের পিঠ থেকে জোড়া জোড়া পাখা খুলে ফেলেছে। ভাজ করে রাখছে। জলে ভেজা। টপ টপ করে জল পড়ছে।

আরো একটু গভীর করে দেখতে পাই—তাদের চোখ থেকেই এই জল ঝরছে। তাদের একমাত্র ভাই, আমার সামান্য বড়, আমাদের বাছেদ ভাই পরী হতে চেয়েছিল। পরী হতে গিয়েছিল মডেল স্কুলের মাঠে। মাঠ থেকে ওড়া যায় না। তখন স্কুল ঘরের চালে উঠতে গিয়েছিল। কোনো সিঁড়ি না থাকায় চালে উঠতে পারেনি। তখন পুকুর পাড়ের সারি সারি কৃষ্ণচূড়া গাছের একটির ডাল বেয়ে ঊঠে পড়েছিল। সেখান থেকে দুদিকে দুহাত পাখির মত সোজা করে উড়াল দিয়েছিল। আকাশের দিকে। বাছেদ, আমার বন্ধু উড়তে পারতে পারেনি। কৃষ্ণচূড়া গাছের উপর থেকে থেকে সোজা পড়ে গিয়েছিল নিচে। পুকুরের জলে। জলের নিচে। গভীরে। মাছেদের কাছে।

সেদিন আমাদের সামনে, আমাদের তিন আপা—রিজিয়া, ফরিদা আর আমেনা খবরটি পেয়ে ঠিক উড়ে যাওয়ার মত করে ছুটে গিয়েছিল মডেল স্কুলের পুকুরের দিকে। তখন ভরা বর্ষা। জল থৈ থৈ করছে। আর মাঝখানে পদ্ম ফুটেছে। পদ্মের গায়ে ফড়িং উড়ছে। হাল্কা হাওয়ায় জল নড়ছে। এর মধ্যে কোথাও বাছেদ ভাই নেই। তিন বোনে সেই পুকুর পাড়ে বসে হাহাকার করে বাছেদ ভাইয়ে নাম ধরে ডেকে ডেকে ফিরল। সেই আর্তনাদে জলের মধ্যে একটা আলোড়ণ উঠল। একটি হাওয়াও ছুটে এলো দক্ষিণ থেকে। আর কারা কারা মিছিল নিয়ে ছুটে যাচ্ছিল—তোমার আমার ঠিকানা/ পদ্মা-মেঘনা-যমুনা। এবং আরো কয়েকটি লোক রাঁতে ইঁদুর ধরতে পারেনি বলে হায় হায় করছিল আর মাঝে কপাল চাপড়াচ্ছিল, এর মধ্যে কে জন বলছিল, আজি রজনীতে দীপালী অপেরায় অভিনীত হইবে একটি পয়সা দাও। মূল ভূমিকায় অভিনয় করিবেন—নট সম্রাট অমলেন্দু বিশ্বাস। আর কিছু ডানাকাটা পরী।

এই পরী শব্দটার সঙ্গে সঙ্গে জলের নীচ থেকে বাছেদ ভাই উঠে এলো। একটা বড় সড়ো মাছের মত। মাথাটি উপর দিকে। দুহাত দুদিকে তখনো ছড়ানো। ঠিক এই ভাবেই গাছ থেকে লাফ দিয়ে পড়ে গিয়েছিল। পড়তে পড়তে বলেছিল—আমি উড়ছি।

পুকুরপাড়ে তখন আমাদের পাড়ার দুঃখী দিদির মা কাপড় কাচতে বসেছিলেন। একটি কাঁঠাল কাঠের পিঁড়ির উপর ধপাশ ধপাশ করে কাপড় আছড়ে ফেলছিলেন। সেই ধপাশ ধপাশ শব্দের কারণে হতে পারে, তার বয়সজনিত কারণে হতে পারে, অথবা সত্যিকারের একটি বিভ্রম হতে পারে,—তিনি শুনেছিলেন, আমি পুড়ছি।

তার প্রথম মেয়েটি আগুনে পুড়ে গিয়েছিল। আগুন দেখে সবাই যখন দেখল, দুঃখি দিদির মায়ের ঘরটিতে আগুন লেগেছে, ভেতরে দেখা যাচ্ছে—দুঃখি দিদি আগুন দেখে আউ আউ করছে, একটু রিস্ক নিলেই তাকে তুলে আনা যায়। বাঁচানো যায়। কে একটা ছেলে ঝাঁপিয়ে পড়তে যাবে বলেও উদ্যোগ নিচ্ছিল, তার মামাবাবু একটু ধমকে তাকে সরিয়ে দিয়ে বলেছিল, পাগল হইলি নাকি তুই। আগুন নিয়া খেলা করতি যাইতিছিস।
এই কথার পরে  দুঃখি দিদি আগুনেই পুড়ে গিয়েছিল। পুড়তে পুড়তে অবাক হয়ে সবার দিকে চেয়েছিল। মুখে কোনো কথা ছিল না। না কোনো ব্যাথা। না কোনো বেদনা। না কোনো হাহাকার।

এর পর থেকে মাঝে মাঝে দুঃখি দিদির মা মাঝে মাঝে শুনতে পায়—পুড়ছি। কে যেন থেকে বলে ওঠে পুড়ছি গো মা। এই রকম কাউকে সে পুড়তে দেখেনি। দেখার কোনো স্মৃতি তার নেই।  সায়েম কবিরাজ বলেছিল, ভুল শুনতিছিস রে দুঃখির মা। কেউ পোড়ার কথা না। বাঁচার কথা কয়। কয়, বাঁচাও।

ফলে এই দুঃখি দিদির মা পুকুরের দিক থেকে পুড়ছি শব্দটা সত্যি সত্যি শুনেছে কিনা সন্দেহে পড়ে। মনে হয়—ভুল শুনেছে। ভুলই সে শোনে। এ রকম ভুল শুনতেই সে চায়। এই মনে করে এক ধরনের শান্তনাও পায়। আর কাপড় কাঁচতে তার ইচ্ছে করে না। দুঃখি দিদির মা পুকুর পাড়ে থেকে চলে যায়। একটা সজিনা গাছের নিচে চুপ করে বসে থাকে। কাউকে বলে না যে পুড়ছি বলে একটা শব্দ সে শুনেছে। বললে হয়তো তারা উপহাস করতে পারে। তখন তার ঘুম পায়। ঘুমিয়ে পড়ে। ঘুমিয়ে গেলে তার কোনো কথাই আর মনে থাকে না। শুধু মনে পড়ে কাঁঠাল গাছে পিঁড়িটি পুকুর পাড়ে রেখে এসেছে। পিঁড়িটা ফুঁপিয়ে কাঁদছে। বলছে—মাগো, পুড়ছি।   এই পিঁড়িটা আনতে যাবে বলে ছুটে এসে দেখতে পেল—পুকুর থেকে তিনটি পরী ডানা মেলে উড়ে যাচ্ছে। তারা নিয়ে যাচ্ছে একটি বড় সড় মাছ। ঠিক মাছ নয়। মাছের অত। মানুষের মত। পরীর মত আরেকটি মানুষ। মানুষ নয়। পরীমানব।

তিন বোনের মধ্যে চতুর্থ বোনটি মাহমুদা শুধু তাদের সঙ্গে ওড়েনি। আমাকে পরে মাহমুদা বলেছিল, বাছেদ ভাইয়েরও ডানা ছিল। সেদিন তাড়াহুড়া করে যাওয়ার সময় ডানাটি নিতে ভুলে গিয়েছিল। কোনো কোনো ভুলের ক্ষমা নেই।


২.পরী হওয়ার ঘটনার কিছুদিন পরে—বহুদিন পরে, যখন রিজিয়া আপার বিয়ে হয়ে গেছে, বিয়ে হয়ে গেছে ফরিদা আপা। আমাদের আমেনা আপাও শ্বশুরবাড়িতে চলে গেছে। এমন কি মাহমুদাকেও আমরা পৌঁছে দিয়ে এসেছি মাদারীপুরে মীর্জাদের ঘরে। খালাম্মাও ততদিনে বেশ বুড়ি হয়ে গেছেন। এতো বুড়ি যে তার নাতিপুতিরাও বাবা-মা হয়ে গেছে।

সেই সময়ই আমাদের খুব ভালো খালাম্মা একদিন ডেকে বলেছিলেন, বাবারে, আমার বাছেদের সত্যি সত্যি কিন্তু কোনো ডানা ছিল না। ডানা ছিল মাহমুদার। মাহমুদার ডানা নিয়েই বাছেদ মাঝে মাঝে উড়ত। উড়ত কিনা ঠিক বলতে পারছি না। এখন সব কথা মনেও করতে পারি না। রিজিয়া অথবা ফরিদা—এমনকি আমেনাই হয়তো বলেছিল, মাঝে মাঝে বাছেদ উড়ত। ওর স্মরণ শক্তি এতো প্রখর ছিল যে কখনো কোনো কিছু ভুলে যেত না। তবে একটা জিনিস জানত না। জানত না যে, ডানাটির শুধু কায়া নয়--মানুষ, গাছপালা অথবা পক্ষীর মত কায়ার পাশে ছায়াও ছিল। রোদ উঠলেই ছায়াটিকে টের পাওয়া যেত। অল্প আলো বা অন্ধকারে ছায়া দেখা যায় না। কায়ার পাশে এমন করে ঘুমিয়ে থাকে যে তাকে দেখাই যায় না।    উড়তে উড়তে সেদিন  হঠাৎ করে বুঝতে পেরেছিল—আজ ডানাটির বদলে ডানার ছায়াটি নিয়ে এসেছে। ততক্ষণে ফেরার উপায় নেই। কৃষ্ণচূড়া গাছটির আগা থেকে ঝাঁপ দিয়ে পড়েছে। আর উপায় নেই। খালাম্মা হাহাকার করে বলেছিলেন, ছায়া দিয়ে ওড়া যায় না। প্রকৃত ডানা লাগে।

পরে আমি আবিস্কার করি আমাদের বাড়িতে বেলগাছটার নিচে একটি গুপ্ত সিন্দুক আছে। ঠাকুরদা সিন্দুকটি মাঝে মাঝে খুলে দেখতেন। আমার বাবাও খুলে দেখতেন। আমিও একবার খুলে দেখতে গিয়ে দেখি—সেই দুটো ডানা সিন্দুকের মধ্যে গভীরভাবে ঘুমিয়ে আছে। তখন ঠিক শীতও নয়—গ্রীষ্মও নয়। বর্ষা চলে গেছে। আকাশটা নীল। মেঘগুলো সাদা। থেকে থেকে একটা হাওয়া আসে গাছের পাতা থেকে। বেশ সবুজ হাওয়া। সেই হাওয়া বেলপাতার উপর থেকে সোজা সেঁধিয়ে যায়  মাটির নিচে। সিন্দুকের মধ্যে। এই হাওয়ার চোয়ায় ডানা জোড়া চোখ মেলেছে। হেসে উঠেছে। তার গায়ে রোদের গন্ধ লেগে আছে। বেশ পুরনো বলে কটু গন্ধ বটে। তারপর রোদ নেমে গেলে ডানাজোড়া পাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়েছে।
আমার মা সেটা শুনে বলেছিল, এই ডানা জোড়া মায়ের বাপের বাড়িও ছিল। তবে বেলগাছের তলায় নয়। একটি ডালিমগাছের নিচে। কেউ কেউ জানে। কেউ কেউ জানে না।

এই জানাটাই পরীকথা। না জানাটাও পরীকথা। 



লেখক পরিচিতি
কুলদা রায়

গল্পকার।
ব্লগার।
বই : কাঠপাতার ঘর

1 টি মন্তব্য:

  1. অসামাণ্য এর শৈলী...নিবিড় চিত্রণ। মাঝরাতে পড়লাম, সেই আবেশে বালিশে মাথা রাখবো এখন।

    উত্তরমুছুন