শুক্রবার, ৬ ডিসেম্বর, ২০১৩

শিল্পে প্রাণ-প্রতিষ্ঠা করতে গেলে কৌশলের ব্যবহার কখনও খুব প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে ঠিকই, কিন্তু প্রকৃত শিল্প বোধহয় কৌশলকে ঢেকে রাখতেই পছন্দ করে ।

অমিতাভ দেব চৌধুরী

১. গল্প লিখতে শুরু করলেন কেন? 

প্রথম কথাটি হচ্ছে এই যে আমি মূলত গল্পলেখক নই । ৫১ বছরের সংক্ষিপ্ত জীবনে যদি কোনও অর্জন এযাবৎ ঘটে থাকে আমার--- তা কবিতা লিখে । সুতরাং প্রতিষ্ঠিত গল্পকারদের চেয়ে আমার উত্তর এক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে বাধ্য । আমি গল্প লিখতে শুরু করি কবিতার বীজকে সম্প্রসারিত করতে নয়, কবিতার জীবাণুর থেকে মুক্তি পেতে। 


২. শুরুর লেখাগুলো কেমন ছিল? 

সুতরাং, আমার লেখা গল্পগুলিকে,শেষ বিচারে, কবির লেখা গল্পের অভিধায়ও বাঁধা উচিত হবে না বোধহয় । এমন অনেক বিষয় নিয়ে আমি গল্প লিখেছি---যথা, হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক নিয়ে বা পরিবেশ-দূষণের থিম নিয়ে---যা কোনও কবিই সচরাচর লেখেন না । ও হ্যাঁ, আমার গল্প-লেখা শুরু হয়েছিল গত শতাব্দীর ৮০-র দশকের মাঝামাঝি থেকে । শুরুর লেখাটি ছিল আধুনিকতাবাদের ছায়ায় আচ্ছন্ন । তবে আমি কখনই হার্ড কোর মর্ডানিস্ট ছিলাম না । তাই, পরের গল্পটি থেকেই সোশ্যাল কনটেন্ট---অন্তত কিছুদূর পর্যন্ত আমার লেখকসত্তাকে অধিকার করে নেয় ।

৩. গল্প লেখার জন্য কি প্রস্তুতি নিয়েছেন? নিলে সেগুলো কেমন? 

গল্প-লেখা নিয়ে কোনও প্রস্তুতিই নিই নি । আমি যে শহরে বড় হয়েছি, আজকের এই বিপুলায়তন শিলচর শহর ছিল না সেটা কিন্তু ছিল অনেক বেশি ছিমছাম আর মার্জিত রুচির ,পড়ুয়া আর সাহিত্যরসপ্রবণ একটা শহর । সেখানে আজ থেকে মাত্র ৪০/৪৫ বছর আগেও বিদ্যুৎ সর্বত্রগামিনী ছিল না। আমরা লণ্ঠনের আলোয় বড়দের মুখ থেকে ভূতের এবং পতনশীল মানুষের কেচ্ছা শুনতে শুনতে বড় হয়েছি । শুনেছি রূপকথা, উপকথা, রামায়ণ-মহাভারতের গল্প । হয়তো সেই 'কিচ্ছা'-কাহিনী শোনার ঐতিহ্যের ভেতরেই ভবিষ্যতে গল্প বলার ইচ্ছের বীজটা লুকিয়ে ছিল । কারণ, বড় হতে হতে দেখলাম, শরদিন্দু বা সত্যজিৎ ছাড়া, বিভূতিভূষণ বা রবীন্দ্রনাথ ছাড়া, মোপাসাঁ বা জেমস জয়েস ছাড়া ,আমাদের অভিজ্ঞতার কোনও রোল-মডেল নেই । প্রান্তীয় মানুষ আমরা, কী আর করি ? তবু, আমাদেরই মধ্যে কেউকেউ কলকাতা কিংবা নিউইয়র্কের মতো করে গল্প লিখেছেন । মানে, নিজের গল্প লিখতে গিয়ে অন্যের গল্প লিখে ফেলেছেন । আমরা কেউ কেউ তা লিখতে পারিনি...আমি না , সপ্তর্ষি বিশ্বাস তো নয়ই । আমাদের জন্মসূত্রে-লব্ধ অভিজ্ঞতাই এক্ষেত্রে আমাদের শিক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। আমাদের ঐতিহ্য ভুলে যেতে দেয়নি।

অর্থাৎ, যে-কথাটা বলতে চাইছি, story এবং tale-এর মধ্যে, বড় হয়ে ওঠার নানারকম অভিজ্ঞতার সূত্রেই, আমাদের কারো কারো পক্ষপাত tale কে অস্বীকার করতে পারে নি। আমার নিজের লেখায় অবশ্য, tale-এর প্রাধান্য তেমনভাবে প্রতিষ্ঠিত নয় । তবু আছে । tale আছে ।  সরাসরি না থাকলেও, element হিসেবে আছে । 

৪. আপনার গল্পলেখার কৌশল বা ক্রাফট কি? 

 গল্পলেখকের কাজ হলো চোরের মতো সিঁদ কেটে কোনও চরিত্র কিংবা ঘটনা কিংবা কল্পনার ভেতরে ঢুকে পড়া । আর কেউ কি নিজের সিঁদ-কাটার কৌশল সবার সামনে প্রকাশ করতে চায় । তবে কোনও শিল্পকর্মই তো চূড়ান্ত বিচারে কৌশলের সমষ্টিমাত্র নয় ! শিল্পে প্রাণ-প্রতিষ্ঠা করতে গেলে কৌশলের ব্যবহার কখনও খুব প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে ঠিকই, কিন্তু প্রকৃত শিল্প বোধহয় কৌশলকে ঢেকে রাখতেই পছন্দ করে । অর্থাৎ কৌশল লুকিয়ে রাখাটাই, শেষ বিচারে, যে-কোনও গল্পকারের সবচেয়ে বড় কৌশল । আমি নিজে যেখানে তা করতে পারিনি, সেখানে অবশ্যই ব্যর্থ হয়েছি ।

৫. আপনার নিজের গল্প বিষয়ে আপনার নিজের বিবেচনা কি কি?  

আমি এখনও , গল্পকার হিসেবে, এক ছাত্র মাত্র ।এছাড়া নিজের গল্প বিষয়ে অন্য কোনও বিবেচনা নেই । 

৬. আপনার আদর্শ গল্পকার কে কে? কেনো তাঁদেরকে আদর্শ মনে করেন? 

আদর্শ গল্পকার তো অনেক--- কাকে ছেড়ে কার নাম বলি ?যাই হোক, যে কজনের নাম মনে আসছে, লিখে ফেলছি : লৌকিক গল্পকাররা যাঁদের গল্প পড়েছি কিন্তু নাম জানিনা, দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার, মোপাসাঁ, রবীন্দ্রনাথ, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, শরদিন্দু, সত্যজিৎ, জেমস জয়েস, সৌরভকুমার চলিহা , রে ব্র্যাডবেরি...কমলকুমার মজুমদার...আসলে 'কেন'-টেনোর কারণ কখনও বিশ্লেষণ করিনি । নিজের পছন্দ-অপছন্দ নিয়ে তত্ত্ব করতে ভালো লাগে না । একটা জিনিস মনে হয় : গল্প যেখানে শুধুই বাস্তবের অনুবাদ, বাস্তবের ব্যাখ্যা, বাস্তবের বিশ্লষণ---তখন তা আমাকে ততটুকু টানে না ।আমাকে টানে গল্পের উড়ান, তার ভেতরে কল্পনার আলপনা, কিংবা দর্শনের প্রান্তর ছুঁয়ে গল্পের জেগে-ওঠার চিহ্নগুলি যেমনটা পাই হাসান আজিজুল হকের কোনও কোনও গল্পে...

৭. কার জন্য গল্প লেখেন? আপনি কি পাঠকের কথা মাথায় রেখে লেখেন? লিখলে কেনো লেখেন? আর যদি পাঠকের কথা মনে না রেখে লেখেন তাহলে কেনো পাঠককে মনে রাখেন না লেখার সময়ে? 

লেখার সময় পাঠক সামনে থাকলে লেখাটা পালিয়ে যায় । একটা বয়সে, প্রেমের উন্মেষলগ্নে, হয়ত কোনও বিশেষ পাঠিকার কথা ভেবে গল্প লেখা যায় । কিন্তু মনের সেই বয়স বহুদিন হলো আমি পেরিয়ে এসেছি । এখন পাঠক মানে অনির্দিষ্ট এক অবয়ব---যাদের মধ্যে কেউ কেউ হয়ত একটা গল্প পছন্দ করল, অন্যরা করল না । অন্যরা ভালো বলল অন্য একটি গল্পকে । আসলে বিশেষ কোনও পাঠকের বা পাঠকগোষ্ঠীর মনোরঞ্জনের জন্য যে শিল্প নির্মিত হয়, তা গোষ্ঠীতান্ত্রিক । তা লেখকের চিন্তার স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করে বেড়ে ওঠে । একথা বাণিজ্যিক পত্রিকায় প্রকাশিত গল্প সম্পর্কে যতটুকু সত্যি, ততটুকুই সত্যি তথাকথিত অবাণিজ্যিক তথাকথিত বামমার্গীয় পত্রিকায় প্রকাশিত গল্প সম্পর্কে। লিখতে বসলে লেখার আনন্দটাই আসল কথা । পাঠক-টাঠকের কথা তো পরে আসে ।

৮. এখন কি লিখছেন? 

বহুদিন হলো, আমি কোনও গল্প লিখছি না । আমার একটা মজা আছে : কবিতায় গল্প ঢুকে পড়ে ।তারপর আর তা নিয়ে আলাদা করে গল্প লিখতে ইচ্ছে করে না । সেরকমই গল্পবীজ-বয়ে-নিয়ে-চলা একটি কবিতা লিখলাম সেদিন । আত্মবিজ্ঞাপনের জন্য নয়, স্রেফ ব্যাপারটা বোঝাতে কবিতাটি নীচে দিলাম :


প্রণয়বৃষ্টি 
পুরনো বৃষ্টির নীচে ভিজে যায় প্রণয়কাহিনি
তাকে কে ডাকবে বলো ছাতার ওই আঁধারের নীচে ?
সব ছাতা ছাদ নয়, কিছু ছাতা প্রলয়রূপিণী ।
সে ছাতা ঝরায় বৃষ্টি মাঝেমাঝে গুজব-আমোদে ।

বৃষ্টি তো পুরনো ,কিন্তু মানুষেরা বড়ই নবীন ।
একজন গোঁফোত্তীর্ণ, অন্যজন সদ্য-শাড়ি-পরা
একটি কাঁঠালগাছ---সারা গাঁয়ে একক পুলিন,
দু’জনকে ছাতা দেয়, ভিজে যায় নিজে ছন্নছাড়া ।

আমি সে কাঁঠালগাছ---ভয়ে কাঁপি , দেখে ওই চাঁদে ।
ছিলাম তাদের ছাদ একদিন, অন্যদিন সেই
কলঙ্কিনী মেয়েটির লাস ঝোলে আমার ডালেই
তারপর, হে কুঠার, সব ছায়া কেটে নিল রোদে ।
আজ আমি একা খাট---সাঁকো এক উদ্যত প্রেমের ।
দু’দিকে বিরহী দুই । একই গল্প, নতুন জন্মের ।

৯. আগামী কি লিখবেন?

আগামীতে কী লিখব ? জানি না , সত্যিসত্যিই জানি না । কিছু কিছু জিনিস লিখতে চাই, কিন্তু তা তো ইচ্ছের কুঁড়ি---তার কথা কাউকে বলা উচিত হবে না ।


লেখক পরিচিতি
অমিতাভ দেব চৌধুরী
জন্ম ১৯৬২ সালে, আসাম প্রদেশের তৎকালীন রাজধানী শিলং শহরে । শিক্ষা-শুরু জোয়াই (মেঘালয়) নামক এক ছোট্ট শহরের কনভেন্টে, তারপর হাফলং-এ, শিলচরে, শিলং-এ, কলকাতায়, হায়দরাবাদে । শিলচরের একটু দূরে একটি হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলে ইংরিজি পড়ান । মূলত কবি, তবে গল্প-প্রবন্ধও লেখেন। প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য বই : সীজারিয়ান এবং অন্যান্য কবিতা, অমিতাভ দেব চৌধুরীর কবিতা, গতজন্মের কবিতা, ঈশ্বরের শেষ গুপ্তচর, স্বপ্নসুমারি, চাঁদের ফ্রেস্কো, ক্ষতস্নান, হারেরেরেরেরে (বাংলা বর্ণপরিচয়ের বই), কবির বাড়ি (প্রবন্ধ), বাজে খাতা (গল্প), তিন ঘণ্টার জীবনকাহিনি ( গল্প ) । আগরতলার সৈকত পুরস্কার পেয়েছেন ২০১২ সালে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন