সোমবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০১৩

শিল্প -- একটি ব্যক্তিগত ম্যানিফেস্টো...


সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায়
১। প্রাককথন

শিশুটি ক্ষিধে পেলে খেতে চায়, ঘুম পেলে শুতে। আর বাকি সময় সে প্লাগপয়েন্টের ফুটোয় ঢুকিয়ে দেয় ললিপপের কাঠি। পাশের প্লাগেঁ জে রাখে অন্য আরেকখানা ক্যান্ডি -- রচিত হয় সিমেট্রি। সে ড্রয়ারে ভরে রাখে জুতো, মোজার ভিতর বাদামভাজা। ছোট্টো পুতুলকে বসিয়ে রাখে কালো চেয়ারে, সোফার উপরে রাখে একলা কুকুরছানাটিকে। টিভির পাশে থাকে চামচ, জুতোর ফিতে, ক্যাসেটের খাপ। মেঝেতে ছবির ফ্রেম, পেনের রিফিল, এবং সানগ্লাস, পাশাপাশি। টেবিলের উপরে থাকে ঝর্‌ণাকলম আর তোবড়ানো কোকের বোতল । এরপর সে খুলে রাখে তার কর্মীর আংরাখা ও এই দিগন্তবিস্তৃত শস্যক্ষেত্রের সামনে লাজুক কাকতাড়ুয়ার মতো একটি নির্জন কোণ বেছে নিয়ে লক্ষ্য করতে থাকে এই বিশ্বচরাচর, এই অর্ডার অফ থিংস, এই কম্পোজিশন। 

এই কম্পোজিশান, এই অবাঞ্ছিত বিশৃঙ্খলা -- একে আমি শিল্প বলি। বা শিল্পের বিকল্প, আমার চালশে পড়া চোখ যার মানে বুঝতে অক্ষম। সেই মেয়েটির কথা মনে পড়ে, ধূসর আতাগাছে উৎপল কুমার বসু যার কথা লিখেছিলেন। সেই মেয়েটি, খেলা শেষে, প্রতিদিন সযতনে লাল বল লিকে লাল বাক্সে ও নীল বল লিকে নীল বাক্সে তুলে রাখে। তারপর এক ঝড়ের রাতে সব এলোমেলো হয়ে যায়। একে আমি সৃষ্টি বলি। একটি ছেলের কথা মনে পড়ে। সে প্রতিদিন সকালে টিউবের পিছন দিকে চাপ দিয়ে বার করত টুথপেস্ট। এভাবেই, জগিং দিয়ে শুরু হত তার দিন । একদিন সে টিউবের মাঝখানে সজোরে চাপ দিল। পরদিন সকালে সিলিং ফ্যান থেকে ঝুলতে দেখা গিয়েছিল তার নশ্বর শরীরকে। একেও আমি সৃষ্টি বলি। বা একেই আমি সৃষ্টি বলি। 


যাঁরা ভাবছেন, এখানে প্রথাভাঙার কথা হচ্ছে, তাঁরা একদম ঠিক ভাবছেননা। ভাঙা নয়, আমি প্রথাকে প্রত্যাখ্যান করার কথা বলছি। ভাঙা, আর সমর্পণ, বিপ্লব ও দাসত্ব, একটি মুদ্রার দুটি পিঠ মাত্র। হেড পড়লে আগে ব্যাটিং, টেল পড়লে পরে। আর কিছু না। এক স্কুলশিক্ষকের মেধাবী ছেলে বাবাকে অনুসরণ করত। তার হাতের লেখায় বাবা, কথায় বাবা, মুদ্রাদোষে বাবা, সাইকেলারোহণে বাবা, এমনকি পছন্দের নারীতেও বাবা। এ হল সমর্পণ। এ হল দাসত্ব। আর এক জগদ্বিখ্যাত বাবার পুত্র বাবার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল। বাবা নিরামিশাষী, অতএব সে আমিষ। বাবা মদকে ঘৃণা করেন, অতএব সে মদ্যপ। বাবার আদর্শ ব্রক্ষচর্য, অতএব সে অমিতাচারী। এ হল বিদ্রোহ, বিপ্লব, ভাঙচুর। 

এই বিদ্রোহ, এবং এই সমর্পণ উভয়েই পিতার অপেক্ষক। ফাংশান অফ দা সেক্রেড ফাদার। বিদ্রোহী, পিতাকে অস্বীকার করতে পারেনা, শত্রুরূপে ভজনা করে মাত্র। 

এক সুন্দরী নারী তার প্রাক্তন প্রেমিককে দেখে চোয়াল শক্ত করেছিল। তার মনে পড়েছিল পুরোনো ক্ষত, পুরোনো বেদনা, পুরোনো অপমান ও প্রত্যাখ্যানের উপাখ্যান। সে প্রেমিকের দিকে থুতু ছিটিয়েছিল। সে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিল। সে চোয়াল শক্ত করে হেঁটে গিয়েছিল। এর নাম বিদ্রোহ। কিন্তু প্রত্যাখ্যান না। কারণ বাড়ি ফিরে মেয়েটি কান্নায় ভেঙে পড়েছিল। তার গোটা দিনটা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। তার প্রেমিক, এভাবেই, আজও ক্ষমতা ধরে তার জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করার। প্রেমিককে সে, মেয়েটি, এভাবেই স্বীকৃতি দেয়, যা মূলত: ব্যজস্তুতি। 

অতএব, দাসত্ব হল স্তুতি এবং বিপ্লব ব্যজস্তুতি। অতএব আমি ভাঙা নয়, প্রথাকে প্রত্যাখ্যান করার কথা বলছি। বিপ্লব নয়, আমি অ্যানার্কির কথা বলছি। বা অ্যানার্কি ও নয়, অ্যানার্কি উত্তর কোনো এক অবস্থানের কথা বলছি, যেমন বলেছিল মুজতবা আলীর চরিত্র -- এসো ভাইসকল আমরা অ্যানার্‌কিও উড়িয়ে দিই। আমি নিয়ন্ত্রিত অ্যানার্কির কথা বলছি। আমি কোল্‌ড ফিউশানের কথা বলছি। 

মঞ্চে বক্তা বক্তব্য রাখছেন। আর চাটাই পেতে বসে থাকা জনতা শুনছে, গিলতে বাধ্য হচ্‌ছে প্রতিষ্ঠানের ভূষিমাল। বিপ্লবীরা চাইবেন অবস্থাটা উল্টে দিতে। ঘাড়ধাক্কা দিয়ে নামিয়ে দেবেন বক্তাকে। মঞ্চে তুলে আনবেন নতুন আর এক চ্ছ বক্তাকে। আবার নতুন করে শুরু হবে বক্তৃতাবাজি। কিন্তু মঞ্চ আর প্রেক্ষাগৃহ থেকে যাবে অবিকল। এর নাম বিপ্লব। এক্সট্রিম অ্যানার্কি চাইবে এই মঞ্চকেও ভেঙে চুরমার করতে। প্রেক্ষাগৃহের ধ্বংসস্তূপে আর কোনো বক্তা থাকবেনা। চলন্ত মানুষের জোটে, ভিড় ট্রেনের মতই, সবাই বক্তা, সবাই শ্রোতা। আর আমি যে নিয়ন্ত্রিত অ্যানার্কির কথা বলছি, সেখানে মঞ্চ থাকবে, থাকবে প্রতিষ্ঠান। তাকে উল্টে নিজে মঞ্চে উঠে পড়ার কোনো আকুতি থাকবেনা। শুধু বক্তাকে মাঝে মাঝে থামিয়ে দিয়ে একদল শ্রোতা হল্লা করে উঠবে। মানে, বলছেন বলুন, কিন্তু এ যে ভূষিমাল সে আমরা জানি। এইভাবে প্রতিষ্ঠানের সাজানো বাগানে মূর্তিমান বিশৃঙ্খলার মতো থেকে যাবে অ্যানার্কি। ভাবগম্ভীর সভার মধ্যে বক্তার নিতম্বে ভার্চুয়াল চিমটি কেটে পালিয়ে যাবে ফচকে ছোঁড়া। সাজানো ড্রইংরুমে টিভির পাশে রেখে দেওয়া হবে দুটো চামচ আর একপাটি জুতো, টেবিলে ফ্লাওয়ার ভাসের পাশে থাকবে একখানি তোবড়ানো কোকের বোতল। গাম্ভীর্য আর প্র্যাকটিকাল জোক, রসিকতা আর কালো হিউমার পাশাপাশি রেখে তৈরি হবে বিচিত্র এক অর্ডার অফ থিংস। 

এই অর্ডার অফ থিংসে কোনো নারী তার প্রাক্তন প্রেমিককে দেখে চোয়াল শক্ত করবেনা। শাপশাপান্তও করবেনা। বরং শান্তভাবে জানতে চাইবে বৌ-বাচ্চা কেমন আছে। কেমন চলছে সবকিছু। এবং সবশেষে বলবে -- " চলি, কেমন?" অর্থাৎ, তুমি আবার লেজুড় হয়ে পিছু ধোরোনা বাপু। 

এইভাবে ভব্যতার সঙ্গে প্রত্যাখ্যান মিশিয়ে দেওয়া যাবে। সভ্যতার সঙ্গে মিশে যাবে অ্যানার্কি। অর্ডার ও অ্যানার্কি নিয়ে তৈরি হবে অদ্ভুত এক কম্পোজিশান। 

একে আমি সৃষ্টি বলি। বা সৃষ্টির বিকল্প। 

২। একটি কেস স্টাডি

অতএব, আমার প্রস্তাবিত সৃষ্টির বিকল্পে গালিগালাজ নেই। হাহুতাশ নেই। প্রতিষ্ঠানকে গাল পাড়া মানে পিতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা। পিতার বশ্যতা স্বীকার করা। অতএব, প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ নেই। শুধু এক নীরব প্রত্যাখ্যান আছে, ভিতরে ও বাইরে। প্রতিটি স্বীকৃত কম্পোজিশানই পিতার প্রতিভূ। পিতা আছেন, মেনে নিতে হবে। এবং কম্পোজিশনের সাজানো বাগানে ঢুকিয়ে দিতে হবে একটি ছাগলছানাকে, যে মুড়িয়ে খাবে আমিও ভালো তুমিও ভালোর ফিল ড মনোভঙ্গীকে -- এই হল অ্যাজেন্ডা। এই হল নিয়ন্ত্রিত অ্যানার্কির ঘোষিত কর্মসূচি। এই হল সৃষ্টির বিকল্পের রাজনৈতিক অবস্থান। 

আসুন, এই রাজনীতি নিয়ে এবার হাতেকলমে রাস্তায় নামা যাক। ধরা যাক দু-একটা ইঁদুর এবার। আসুন, সৃষ্টির বিকল্পের এই রাজনৈতিক অবস্থান থেকে আমরা, খুঁটিয়ে পড়ি বিনয় মজুমদারের একটি কবিতার কয়েকটি লাইন । এই লাইনলি, আমার মতে, নিয়ন্ত্রিত অ্যানার্কির একটি চমৎকার কেস স্টাডি। আসুন পাঠ করা যাক পংক্তিলি : 

"" শব্দ ব্রহ্ম। অর্থাৎ শব্দের আকার আছে। "সফেদা' একটি শব্দধ্বনি। এই শব্দের আকার সফেদা ফলটি যেমনি ঠিক তেমনি। এর শব্দতাত্ত্বিক প্রমাণ আছে। "আতা' একটি শব্দধ্বনি। আতা শব্দটির চেহারা ঠিক আতা ফলটির মতো। পাঠক আপনিও এইরকম নতুন শব্দ দিয়ে ধ্বনি দিয়ে নতুন ফল বানাতে পারেন। '' 

একে বিনয় কবিতা বলেছেন। আপনি একে কবিতা বলতে পারেন, নাও পারেন। কবিতা বা না-কবিতা, ভালো বা মন্দ নিয়ে এই আলোচনায় আমাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। আমরা শুধু খুঁটিয়ে দেখব লাইন লির কয়েকটি বৈশিষ্ট্য। 

এক। ন্যারেটিভ ভঙ্গী। লাইনলির গঠন অতীব সরল। ভঙ্গীতে ন্যারেটিভ। এবং বাচনে শিশুসুলভ। কোনো জটিলতা নেই। সেই শিশুটি, যে, ঘরময় ছড়িয়ে রাখে বালিশ ও বিছানা, টিভির পাশে রেখে দেয় একপাটি জুতো ও একখানি তোবড়ানো রিফিল, সে জলের গ্লাসের দিকে তাকিয়ে কোনো একদিন বলে উঠেছিল " গোল মতো গ্লাস। নিচের দিকটা সোজা। গ্লাসে জল রাখলে জলও গ্লাসের মতো হয়ে যায়'। শিশুর মতো সরল, সোজা, ঋজু এই বাচনভঙ্গী, দেখুন, উপরের পংক্তিলিতে উদ্ভাসিত। 

কিন্তু শিশুটি তো শুধু জলের কথা বলেনি। সে জুতোকে রেখেছিল টেবিলের উপর। ফ্লাওয়ার ভাসের পাশে রেখেছিল ফাঁকা কোকের বোতল। জুতোকে জুতোর জায়গায় রাখতে হয়, যুক্তির এই অথরিটেটিভ টোটালিটারিয়ান মনোবৃত্তিকে সে অস্বীকার করেছিল। "জুতোকে টেবিলের উপর রাখলে টেবিল্‌জুতো নামের একটি নতুন শব্দ তৈরি হয়। এর শব্দতাত্ত্বিক প্রমাণ আছে ' -- বাক্যে বললে, শিশুর প্রত্যাখ্যান হয়তো এরকমই হতো। ভুল বললাম। "শব্দতাত্ত্বিক প্রমাণ আছে' বাক্যাংশটির মধ্যে তত্ত্ব-তাত্ত্বিক-অ্যাকাডেমিখচিত নক্ষত্রবীথির প্রতি যে তীব্র ব্যঙ্গ আছে, তা শিশুর নাগালের বাইরে। ফলে বিনয়ের এই পংক্তিলি যথার্থ শিশুসুলভ নয়। যদিও, প্রথাসিদ্ধ যুক্তিপরম্পরাকে উল্টে-পাল্টে এখানে বানানো হয়েছে নতুন কম্পোজিশন। শিশুর মতই। অতিরিক্ত হিসাবে শুধু তার মধ্যে মিশে আছে পরিণত হিউমার। ব্যঙ্গ। যার রঙ কালো। 

অতএব, বিনয়ের এই অবিনয়ী পংক্তিলিতে যথেচ্চাচার আছে। ভঙ্গীতে সরল। বড়লোকের সাজানো ড্রয়িংরুমের মতই পরিপাটি ও লিনিয়ার। কিন্তু এই লিনিয়ার বুননে ঢুকে আছে অ্যানার্কি। যুক্তির অন্তর্নিহিত প্রক্রিয়াটি সযত্নে উল্টে-পাল্টে দেওয়া আছে। আলোকিত মঞ্চের বক্তাদের প্রতি আছে উপেক্ষা। প্রত্যাখ্যান। ব্যঙ্গ। এইভাবে উল্টে-পাল্টে দিয়ে তৈরি হয়েছে এক নতুনতর কম্পোজিশান। লাইনলি ভালো না মন্দ, তা মূলত: ঐ কম্পোজিশানটি কেমন দাঁড়িয়েছে তার উপর নির্ভরশীল। কিন্তু সে আলোচনায় আমরা ঢুকছিনা। 

দুই। শিল্পের উপাদান। লক্ষ্য করুন লাইনলিতে কোনো তথাকথিত মহৎ ভাব নেই। শিল্প করতে হবে বলে মহত্তর চিন্তা-চেতনা হাতড়ে এনে লাইনে ঢুকিয়ে দেবার কোনো প্রচেষ্টা নেই। উপর থেকে দেখলে তাই একে এফর্টলেস মনে হয়। কুলুঙ্গীতে তুলে রাখা প্রতিমার স্তবগাথা রচনা নয়, হাতের কাছে যে হাতেমতাই ছিল, তাকেই দুম করে রাজার পার্ট দিয়ে দেওয়া হয়েছে। শব্দ, ধ্বনি, সফেদা, আতা, পাঠক -- এবম্বিধ গোটা কতক ফালতু জিনিস এদিক-সেদিক থেকে তুলে এনে তৈরি হয়েছে কম্পোজিশন। এই একই কথা প্রকাশভঙ্গীর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। প্রকাশভঙ্গীর সন্ধানে পিতার কাছে নতজানু হয়ে ফর্ম ভিক্ষা করা হয়নি। পিতার ফর্মকে ভেঙে টুকরো টুকরো করার বিদ্রোহী আস্ফালনও নেই। ফর্মরুদের জাস্ট উপেক্ষা করা হয়েছে। হাতের কাছে চট পাওয়া গেছে ফেলে দেওয়া ন্যারেটিভ প্রকাশভঙ্গী, দুম করে তাকেই ব্যবহার করে ফেলা হয়েছে। হাতের কাছে ছেঁড়া চটি পেলাম, তাই পরেই বেরিয়ে পড়লাম, গামবুট থাকলে তাইই পরতাম। হাই-হিল না অজন্তা হাওয়াই তা নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই -- ভাবখানা এমনই। 

এইভাবেই, বস্তুত: ফর্মকে অস্বীকার করা হয়েছে। "একেকটি গানের জন্য আমার একেকটি পোশাক, দারুণ অগ্নিবাণে গাইতে গেলে পরি উজ্জ্বল কমলা আর মেঘের পরে মেঘ জমেছেতে ছায়াঘন অ্যাশ' -- ফর্মসংক্রান্ত এই লক্ষণের গন্ডীকে অতিক্রম করে ঘোষণা করে দেওয়া হয়েছে -- "গামছা হলেও হয়, সুটেও আপত্তি নেই। কবিতা লিখলেও হয়, নইলে বসে বসে পা চুলকালেও চলে' । 

এই হল দুইখানা পয়েন্ট, এই কেসস্টাডি থেকে যা এইমাত্র খুঁড়ে বার করা হল। এতে আমি বিশদে আবার ফিরে আসব। এখানে একটা কথা শুধু উল্লেখ থাক, যে, এটি একটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কেসস্টাডি মাত্র। কোনোমতেই বিনয় মজুমদারের লেখালিখির মূল্যায়ন নয়। সেরকম কোনো দাবী নেই। জাস্ট হাতের কাছে ছিল বলে বিনয় মজুমদার। নইলে নবারুন ভট্টাচার্য, সুবিমল মিশ্র, বা বিক্রম পাকড়াশী দিয়েও চলত। একটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অ্যাজেন্ডা আছে হাতে, যার নাম নিয়ন্ত্রিত অ্যানার্কি। এর অন্য নাম দিলেও হত। নেহাৎ লেখার সময় অ্যানার্কি কথাটা মনে পড়ল, তাই দিয়ে দেওয়া হল। 

তো, এই অ্যাজেন্ডাটিকে দু-পায়ে দাঁড় করানোর জন্য একটি কেস স্টাডি দরকার ছিল। অতএব হাতের কাছে যা পাওয়া গেল, তাকে যথেচ্ছভাবে উল্টে-পাল্টে যেমন খুশী অপব্যবহার করা হল। টেবিলের উপর বসিয়ে দেওয়া হল একপাটি জুতো। দরজার সামনে ছড়িয়ে রাখা হল এক বাক্স দেশলাই কাঠি। মিউজিক সিস্টেমের মাথায় বসিয়ে দেওয়া হল একটি আপেল। ইত্যাদি। 

এতে ভালো হল না মন্দ হল সে অন্য কথা। কিন্ত কিছু একটা তো হল। একটা কম্পোজিশন হল। একেই আমি সৃষ্টি বলি। বা সৃষ্টির বিকল্প। 


৩। রন্ধনপ্রণালী

এবার কিঞ্চিৎ রান্নাবান্নার কথা। প্রথাসিদ্ধ রন্ধনপ্রণালী সম্পর্কে আমি যতদূর জানি, তা এইরূপ: 

এক। প্রথমে মেনু ঠিক কর। 
দুই। কতজন লোকের জন্য রান্না জানো। 
তিন। কি কি লাগবে, কি পরিমানে লাগবে, লিস্টি বানাও। 
চার। ফর্দ নিয়ে বাজারে যাও। 
পাঁচ। সব মাল মজুত হলে রান্না শুরু কর। 

এ হল প্রতিষ্ঠান-স্বীকৃত রন্ধন-প্রণালী। অতএব পরিত্যাজ্য। অতএব আমার প্রস্তাবিত অর্ডার অফ থিংসে এর কোনো জায়গা নেই। আমি রন্ধনের এই প্রথাসিদ্ধ পদ্ধতিকে প্রত্যাখ্যান করছি। আমি অ্যানার্কিস্ট রন্ধনপ্রণালীতে বিশ্বাসী। 

এবার প্রশ্ন হল রন্ধনের অ্যানার্কিস্ট পদ্ধতিটি কি? আর, খামোখা স্বীকৃত পদ্ধতিকে প্রত্যাখ্যান করে অ্যানার্কিস্ট পদ্ধতিতে যাবই বা কেন? 

উত্তর হল, দরকার পড়লে যাবেন। শখে নয়। ধরে নিন, আপনার নুন আনতে পান্তা ফুরোয়। এবং আপনার বাড়িতে আজ নিমন্ত্রিত পাঁচজন লোক। তিনটি ডিম, যথেষ্ট চাল, একটুকরো কুমড়ো, ছটি পটল, সামান্য পেঁয়াজ আর দু-টুকরো আদা -- ভাঁড়ার খুলে দেখলেন, সঞ্চয় বলতে এইটুকু। অর্থাৎ ভাঁড়ে ভবানী, এবং আপনাকে মা অন্নপূর্ণা সাজতে হবে আজ বিকেলে। যা মূলত: অসম্ভব। কারণ রান্নার প্রথাসিদ্ধ পদ্ধতি বলতে আপনি যা জানেন, তার চার নম্বর আবশ্যিক ধাপটি, অর্থাৎ "ফর্দ নিয়ে বাজারে যাও', এইটা পারবেননা। পকেটে ফুটো কড়িটিও নেই। 

এবার আপনার সামনে দুটো অপশন। 

এক। আত্মসমর্পণ করুন। অর্থাৎ "আমার কি হবে গো, ভগবান কিছু একটা করো গো' বলে হাত পা ছড়িয়ে কাঁদুন। কিংবা বিদ্রোহ করুন। অর্থাৎ যাদের পকেটে পয়সা আছে, তাদের "আমার পকেটে পয়সা থাকলে রান্না কাকে বলে দেখিয়ে দিতাম শালা বুর্জোয়া প্রতিষ্ঠানকে' বলে তেড়ে শাপশাপান্ত করুন। দুটো ই একই ব্যাপার, আমি আগেই বলেছি, সমর্পণ আর বিদ্রোহ একই মুদ্রার এপিঠ আর ওপিঠ। এতে করে আল্টিমেটলি কিছু হবেনা। 

দুই। অথবা আপনি হয়ে উঠুন এক অ্যানার্কিস্ট রাঁধুনি। উল্টে-পাল্টে দিন রান্না-বান্নার প্রথাসিদ্ধ ব্যকরণ। শখে নয়, দরকারে। দেখে নিন হাতের কাছে কি-কি আছে। দেখে নিন পাশের বাড়ির গাছ থেকে একখানি লাউ ঝুলছে কিনা। ঝুললে পেড়ে নিন। ভাঁড়ার আর এদিক-সেদিক থেকে যা-যা পেলেন, এবার তার উপর দাঁড়িয়ে তৈরি হবে আপনার মেনু। পদ, ও রান্নার পদ্ধতি। এখানে ফর্ম এবং কনটেন্টের আর কোনো আলাদা মানে নেই, কারণ, যদি লাউ পেলেন তো লাউঘন্ট। আর যদি না পেলেন তো অন্যকিছু। 

এইভাবে রান্নাবান্নার প্রথাসিদ্ধ পদ্ধতিকে উল্টে দিলেন আপনি, সেই অ্যানার্কিস্ট গিন্নী। "আগে মেনু ঠিক কর, তারপর ভাঁড়ার ভর্তি কর' নয়, আপনার যুক্তিপরম্পরা উল্টে গিয়ে দাঁড়ালো, "আগে ভাঁড়ারে কি আছে দেখ, তারপর মেনু ঠিক কর'। এরপর রান্না করে জিনিসটা কেমন দাঁড়ালো, সে আপনার হাতের ণ, কিন্তু চেষ্টা করতে হলে আপনাকে এইভাবেই করতে হবে। কবে পয়সা হবে, তারপর মেনু ঠিক করব তারপর রান্না করব, তারপর লোক খাওয়াবো, এই ভেবে বসে থাকলে কোনোদিনই কিছু হবেনা। 

আমার আগের অনুচ্ছেদের কেসস্টাডি, ঠিক এরকম একটি রান্নাবান্নার কথাই বলেছিল। এক,এবং দুই নম্বর পয়েন্টে যে কথালি বলা হয়েছিল, তার যুক্তিপরম্পরাটি নিম্নরূপ: 

এক। ফর্ম এবং কনটেন্টকে (একসাথে এবং আলাদা করে, দুরকমভাবেই) উপেক্ষা করুন। অর্থাৎ আগে কনটেন্ট ভাবি, তারপর কিভাবে লিখব ভেবে বার করব, তারপর লিখব -- এই যুক্তিপরম্পরাকে জলাঞ্জলি দিন। 

দুই। এবার হাতের কাছে কি আছে দেখুন। যা আছে, তাই আপনার সৃষ্টির উপাদান। তাই ফর্ম। তাই কনটেন্ট। তাই স্টাইল। তাই টেকনিক। যে নামেই ডাকুন একই গন্ধ। 

তিন। যা-যা পেলেন হাতের কাছে, তা দিয়েই নির্ধারিত হবে আপনার সৃষ্টি। তাই দিয়েই রচিত হবে আপনার কম্পোজিশন। 

চার। কম্পোজিশন তৈরির সময় প্রথাসিদ্ধ যুক্তি পরম্পরাকে উল্টে-পাল্টে নিন। এটা না করলে কিছুই করা যাবেনা। পোলাউ রাঁধতে গেলে লাগে চাল, কড়াইশুঁটি, গাজর, বিন, এলাচ, তেজপাতা, লবঙ্গ, ঘি -- এইসব লাগে। কিন্তু হাতের কাছে আপনি গাজর পাননি, পেয়েছেন লাউ। অতএব পোলাউয়ের প্রথাসিদ্ধ রন্ধনপ্রণালীকে উল্টে বানান লাউ-পোলাউ। 

পাঁচ। এবার রান্না কেমন হল, কেমন হল কম্পোজিশন, সে অন্য প্রসঙ্গ। সেখানেই আপনার কব্জির জোর। 

এই হল অ্যানার্কিস্ট সৃষ্টির পদ্ধতি। পাঠক, লক্ষ্য করে দেখুন, এই তিন নম্বর অনুচ্ছেদের পরে এই পদ্ধতি কেমন বিশ্বাসযোগ্য লাগছে। অন্তত: আমার নিজের কাছে। দু-তিন ছটাক বিনয় মজুমদার, তিন ছিপি কথার মারপ্যাঁচ,একটি রন্ধনপ্রণালী, আর একখানা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অ্যাজেন্ডা দিয়ে যে লবাজির শুরু, সেই সব টুকরোটাকরা জোড়াতালি দিয়ে একটা কম্পোজিশনের ছায়া দেখা যাচ্ছে। 

কম্পোজিশনই ব্রহ্ম।এই কম্পোজিশনের আকার, ঠিক এই কম্পোজিশনটির মতো। এই কম্পোজিশন বাস্তব, কারণ এটি, এইমাত্র আমি সৃষ্টি করলাম। একেই আমি সৃষ্টি বলি। 


চার। ফলিত অ্যানার্কি

এইবার কাজের কথা। কেন অ্যানার্কিস্ট সৃষ্টির পদ্ধতি? সব কিছু ছেড়ে, কেন এই পদ্ধতি? উত্তর আগেই দিয়েছি, শখে নয়, দরকারে। কিসের দরকার? গরীবের যে কারণে অ্যানার্কিস্ট রন্ধনপ্রণালী প্রয়োজন, সেই কারণেই। ক্যামেরা একদিন সত্যি সত্যিই পেনের সমগোত্রীয় হবে, রামা-শ্যামা সেলুলয়েডের বুকে এঁকে রাখবে নিজের স্বাক্ষর -- কাহিয়ে দু সিনেমার সেইসব কল্পকথা, আজও কল্পকথাই। ক্যামেরা পেনের মতো সহজলভ্য হয়নি, বরং পেনই ক্রমশ: ক্যামেরার মতো দুর্মূল্য হয়ে উঠছে। শুধু লিখলেই হল না, কন্টেম্পোরারি হতে হবে আপনাকে। মার্কেট করতে হবে লেখাকে। অতএব, ঝর্ণাকলম থেকে রিফিল ভরা ডটপেন,সেখান থেকে ইউজ অ্যান্ড থো,পেন যত সস্তা হচ্ছে,ততই কঠিন হচ্ছে লেখালিখি, লেখার জন্য ততই দরকার হচ্ছে অফসেটোত্তর ছাপাখানা, বিজ্ঞাপনী নেটওয়ার্ক, ঝকঝকে অফিস এবং স্বল্পবাস তন্বীকূলকে। এসব আপনার নাগালের বাইরে। এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহও অর্থহীন, কারণ যত জেহাদ, যত বিদ্রোহ, যত গালাগাল,ততই পিতার সামনে নতজানু হওয়া; চোয়াল শক্ত করে, থুথু ছিটিয়ে ঘরে ফিরে প্রেমিকাটি এরপর রুদ্ধদ্বারে কাঁদবেন। 

অতএব অ্যানার্কি। দ্বিতীয় পথ নেই। কারণ ক্যামেরা যত সস্তা হচ্ছে, ততই দূর্মূল্য হচ্ছে সিনেমার উপকরণ। ইলেকট্রনিক্স বিপ্লবের কল্যাণে, আজকে যা তিন লাখ টাকা, পরশু দিন তার দাম কমে তিন হাজার। কিন্তু বাজারে ততদিনে এসে যাচ্ছে নতুন হাইটেক প্রযুক্তি, যার দাম সাড়ে তিন লাখ। ফলে আজকে যা কন্টেম্পোরারি, কালকে তা অবসোলিট। কন্টেম্পোরারি জিনিসটি পাল্টে যাচ্ছে, কিন্তু দাম কনস্ট্যান্ট। সেই তিনলাখ টাকা। পিতা জানাচ্ছেন, সর্বশ্রেষ্ঠ প্রযুক্তির নিচে আর যা কিছু, সব অবসোলিট। পিতা জানাচ্ছেন, পেশাদার টেকনিশিয়ান, পেশাদার অভিনেতৃবিনা ফিল্ম করা যাবেনা। সঙ্গে আছে সেই ঝকঝকে অফিস, বিজ্ঞাপনী নেটওয়ার্ক, এবং স্বল্পবাস তন্বীকূল। 

অতএব অ্যানার্কি। দ্বিতীয় কোনো পথ নেই। আসুন শিল্পকে বার করে নিয়ে আসি রাস্তায়। খোলা ময়দানে। ন্যাংটো ছেলের হাগার দৃশ্য রেকর্ড করি মন দিয়ে, কলমে বা ডিজিট্যাল ডিস্কে। আসুন কিছু করে দেখাই। আসুন ফলিত প্রয়োগ করি অ্যানার্কিস্ট সৃষ্টিপদ্ধতির। আসুন একটি অ্যানার্কিস্ট ফিল্ম বানাই, যা, আমার রন্ধনপ্রণালীর একটি ফলিত প্রয়োগ। 

অতএব আমি ফিল্ম বানাবো -- এইখান থেকেই যাত্রা শুরু করি। আগে চিত্রনাট্য, তারপর কাস্টিং, সঙ্গে বাজেট, এইসব না। প্রডিউসার ধরি, টাকা জোগাড় করি, তারপর একটি যুগান্তকারী সিনেমা বানাবো -- এইসবও না। ওসবের জন্য পিতার কাছে নতজানু হতে হবে। পিতার কাছে, বা পিতার রেবেলের কাছে। সে একই ব্যপার। আর নতজানু না হলে প্রোডিউসার পাবোনা। সারাজীবনেও ফিল্ম বানানো হবেনা। অতএব, চিত্রনাট্য থেকে বাজেটে আসবনা। ঐ লাইনে ভাববই না। জাস্ট ফিল্ম বানাবো, ব্যস। এইখান থেকে শুরু হয়ে যাবে খেলা। শুরু কর। এক। দুই। 

আমরা প্রথমে দেখব : হাতের কাছে কি আছে। সস্তা হ্যান্ডিক্যাম? তাতেই চলবে। ট্রলি আছে? নেই। ট্রাইপড আছে? আছে। যথেষ্ট। আর আছেন তিনজন অভিনেতা-অভিনেত্রী। তাদের মধ্যে একজন তোৎলা। দ্বিতীয়জন অভিনয় পারেননা। তৃতীয়জনের দাঁত উঁচু। আর লোকেশন বলতে আছে তিনতলায় আপনার ফ্ল্যাট। আর আউটডোর বলতে সামনের একচিলতে পার্ক। 

এই হল কাঁচামাল। এই হল আমাদের লক্ষীর ভাঁড়ার। এই দিয়ে রান্নাবান্না শুরু হবে। রান্নাবান্নার প্ল্যানে এইবার আসব, অর্থাৎ কাহিনী/চিত্রনাট্য, শট ডিভিশন ইত্যাদি। লক্ষ্য করুন, এর মধ্যেই আমরা প্রতিষ্ঠিত ফিল্মমেকিং এর পদ্ধতির ষ্টির তুষ্টি করে দিয়েছি। প্রথামাফিক, আগে চিত্রনাট্য তারপর ক্রমে লোকেশন-কাস্টিং - ক্যামেরা - লেন্স -শট ডিভিশনে পৌঁছনোর পদ্ধতিকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়েছি। আমাদের পদ্ধতি সম্পূর্ণ আলাদা জায়গায় শুরু হচ্ছে। প্রথমে মাল কি কি আছে দেখা হল। এরাই আমার ফর্ম। এরাই আমার কনটেন্ট, স্টাইল, জগৎসংসার। এবার এরাই নির্ধারণ করবে আমার সৃষ্টিকে। 

প্রথমে কাহিনী। ন্যারেটিভ বা নন ন্যারেটিভ। এ দুইই আমার কাছে সমান। কারণ এরা উভয়েই পিতার প্রতিভু। অতএব আমার কোনো প্রায়োরিটি নেই। কিছু একটা হলেই হল। শুধু এমন একপিস আখ্যান (ন্যারেটিভ বা নন-ন্যারেটিভ) চাই, যার একজন চরিত্র তোৎলা। দ্বিতীয়জন সারাক্ষণ অভিনয় করার চেষ্টা করে যাবে, কিন্তু ভর্তসিত হবে অভিনয় করতে পারেনা বলে। এখানে এক্ষুনি, এই লিখতে লিখতে, একটা প্ল্যান চলে এল, যে,দ্বিতীয় চরিত্রটি, যে অভিনয় পারেনা, তার এই অক্ষমতাকে মেইন স্ট্রিম অভিনয়ের প্রতি বিদ্রূপ হিসাবে কাজে লাগানো যায়। সে সারাক্ষণ মেইন স্ট্রিম অভিনয়রুদের নকল করার চেষ্টা করে যাবে, আর ব্যাকগ্রাউন্ডে শোনা যাবে সোপ অপেরার হাসির আওয়াজ। তোৎলা ঠিক কি করবে, আর দাঁত উঁচুকে কোন কাজে লাগানো হবে, ফ্র্যাঙ্কলি এখনই মাথায় আসছেনা। একটু ভাবলে নিশ্‌চয়ই আসবে, কিন্তু আমি অত সময় দেবনা। কারণ, লেখাটা শেষ করতে হবে। কারণ, মোদ্দা জিনিসটা বোঝা যাচ্ছে দিব্যি। যে, এমন একখানা গপ্পো/গপ্পোহীনতা চাই, যাতে একজন অভিনয়ক্ষমতাহীন, একজন তোৎলা এবং একজন দাঁত উঁচু অ্যাক্টর/অ্যাকট্রেসকেঁ জে দেওয়া যায়। 

খুব টাফ কাজ। কে করবেন জানিনা, তবে এ কাজ নামাতে পারলে তখনই বোঝা যাবে কব্জির জোর। এ ছাড়া বাকি যা কিছু, সব প্রোডাকশান সিস্টেম। পিতার সন্তান। তার মধ্যে কোনো কারিকুরি নেই। এইভাবে কাহিনীর ফর্ম-কনটেন্ট যুগলবন্দীর ষ্টির তুষ্টি করে দেওয়া যাবে। জাস্ট চরিত্রদের গোঁজার প্রয়োজনে ফিল্ম হবে ন্যারেটিভ বা নন-ন্যারেটিভ। "শিল্পসম্মত' কোনো কারণ থাকবেনা। ওহো, বলতে ভুলে গেছি, শুধু চরিত্র না, লোকেশনের কথাটাও মাথায় রাখতে হবে। যেন তিনতলার ফ্ল্যাট আর সামনের একচিলতে পার্ক ব্যতীত অন্যত্র শুট না করতে হয়। 

এইটুকুতেই যিনি আঁতকে উঠছেন, তাঁর জন্য আরও দু:সংবাদ। এই পদ্ধতিকে আমরা টেনে নিয়ে যাব "চিত্রভাষা' বলতে যা বোঝায়, সেই অবধি। অর্থাৎ শট ডিভিশন। ক্যামেরার মুভমেন্ট। এবং শব্দপ্রক্ষেপণ। সেটা কিরকম? এরকম হতে পারে: আমার ট্রলি নেই, অতএব ক্যামেরা নড়বেনা। হাই অ্যাঙ্গেল লো অ্যাঙ্গেল শটের পিতৃপ্রদত্ত ফান্ডা ভুলে যান। আমার ট্রাইপডের যা উচ্চতা, সেখান থেকে ছবি নিতে হবে। এই হল আমার ফর্ম। অর্থাৎ, পুনর্বার ফর্মের ষ্টির তুষ্টি। সত্যজিতবাবু জানিয়েছিলেন, যে, প্রতিটি শটই বিজ্ঞানের মতো, কার্যকারণনির্ভর। ওসব আমি ভুলে যেতে বলব। শট কিরকম, তা, ট্রাইপডের উচ্চতা দ্বারা নির্ধারিত হবে, চিত্রনাট্য দিয়ে নয়। শুধু এখানেই শেষ না। আমার ডাব করার বন্দোবস্ত নেই। অতএব সংলাপ থাকলেই ক্লোজ আপ। একদম সামনে থেকে শুট করতে হবে। আরও আছে। ধরা যাক, আমার অভিনেতা একটা কথা কিছুতেই ঠিকঠাক বলতে পারছেনা। অতএব শট পাল্টে যাবে। সে ক্যামেরার পিছন থেকে বলবে, এবং ক্যামেরা তখন দেওয়াল দেখবে। এবার, দেওয়াল দেখাতে হবে বলে দেওয়ালে দু-চাট্টে পোস্টার বা ছবি বা মাটির পুতুল। এর পিছনে প্রতীক টতিক খুঁজে লাভ নেই। আমার অভিনেতা ডায়লগ বলতে পারছিলনা, অতএব ডায়লগের সময় দেওয়াল দেখিয়েছি। শুধু দেওয়াল তো দেখানো যায়না, তাই বেণীর সঙ্গে মাথা। ব্যস। 

এইভাবে তৈরি হবে আমার চিত্রভাষা। একটি অ্যানার্কিস্ট চিত্রভাষা। যাকে ফর্মরুরা কম্প্রোমাইজ বলবেন। যে, শিল্পের সঙ্গে কম্প্রোমাইজ করা হল। কম্প্রোমাইজের চূড়ান্ত করা হল। আমি বলব, কম্প্রোমাইজ নয়, শিল্পকে নিয়ে ছিনিমিনি খেলা হল। আর কম্প্রোমাইজ করা হল বাস্তবের সঙ্গে। বাস্তব যেরকম, আমার ফিল্মও সেরকম হল। বাস্তব এই, যে আমার শুধু হ্যান্ডিক্যাম আছে। বাস্তব এই, যে, ভুবনডাঙার মাঠ না, আমার আছে হাতিবাগানের তিনতলার ফ্ল্যাট। বাস্তব এই, যে, আমার কাছে সাউন্ড নিয়ে খেলা করবার যন্ত্র নেই। আমি সেই বাস্তবতাকে কাজে লাগিয়েছি। অতএব উচ্চমানের নিখুঁত ফিল্ম নয়, একটি বাস্তব ছবি বানিয়েছি আমি। ভার্চুয়াল রিয়েলিটি নয়, রিয়েলিটি ইন ভার্চুয়ালিটি। কল্পদুনিয়ার বুকচিরে একটি বাস্তব যাত্রা। একে ডাইরেক্ট ফিল্ম বলতে পারেন, পচা জিনিস বলতে পারেন, ছাতার মাথা বলতে পারেন, আই ডোন্ট কেয়ার। ওসব পিতৃপ্রদত্ত নামে আমার বিশ্বাস নেই। 

অতএব, আমার কোনো ফর্ম নেই। কনটেন্ট নেই। একরকম করে বাস্তবতা আছে। আর হাতে রইল হারিকেনের মতো পলিটিক্স। এই পলিটিক্সের কোনো সুনির্দিষ্ট ফর্ম নেই। জ্বালাময়ী বক্তব্যও নেই, যার নাম কনটেন্ট। পলিটিক্স বলতে এখানে শুধু নির্মানপদ্ধতি -- কিভাবে জোড়াতালি মেরে জিনিসটা দাঁড় করানো হল সেই পদ্ধতিটিই পলিটিক্স। এর নাম কলোনীবাসীর ঔদ্ধত্য। যে, তোমার বন্দুক আছে, শিল্প আছে, সিনেমা আছে, আমার কিসু নাই। যা আছে তাতেই চলবে। জোড়াতালি দিয়ে যা বানালাম তা শিল্পসমত হলনা তো হলনা, ফিল্ম হলনা তো হলনা, কেউ দেখলনা তো দেখলনা -- তো? এরই নাম ফলিত অ্যানার্কি। হ্যাভ-নটসের ফিল্ম যেখানে হ্যাভ-নটসের বাড়ির মতই দরিদ্র। পমেটম লাগিয়ে বাবু সাজার বাসনা নেই তার একদম। বরং বাবুদের সৃষ্টির পদ্ধতিকে সে থোড়াই কেয়ার করে। টিভির পাশে বসিয়ে দেয় বিষণ্ন বটের ঝুরি। মেঝেতে ছড়িয়ে দেয় কোক ও চেরি ব্লসম। আকাশে ছড়ানো মেঘের কাছাকাছি, দেখা যায় তাহার বাড়ি। বাঁকানো সিঁড়ি দিয়ে সেখানে নেমে আসে চাঁদের আলো। মর্জিনা-আবদাল্লা প্রেম ও আলাদিন, বিষণ্নতা দিবারাত্রির কাব্য ও রেকারিং ডেসিমেল খচিত তার এই অর্ডার ও অ্যানার্কিময় বেঁচে থাকা, আহা, তাকেই আমি সৃষ্টি বলি। বা সৃষ্টির বিকল্প। 



লেখক পরিচিতি
সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায়

গল্পকার। প্রবন্ধকার। উপন্যাসিক। গায়ক।
পেশায় প্রকৌশলী।
প্রকাশিত বই : খাণ্ডবদাহন। 

সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায়ের আরো লেখা পড়তে লিঙ্কে ক্লিক করুন : লিঙ্ক

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন