রবিবার, ৮ ডিসেম্বর, ২০১৩

নাগরিক


স্বকৃত নোমান
মীরপুর এগার নম্বর বাসস্ট্যান্ডে এসে থেমে গেল বাস। দশ নম্বর গোলচক্করের জ্যাম এই পর্যন্ত এসে ঠেকেছে। শত শত গাড়ির দীর্ঘ লাইন। এক টুকরো ঘোলা মেঘ ঢেকে রেখেছে জুনের সূর্যটা, তবু গরমের দাপট যথারীতি। বাতাসেরও অবরোধ চলছে, রাস্তায় পলিথিনের পাতলা ঠোঙাটি পর্যন্ত উড়ছে না; তার উপর যানবাহনের তপ্ত নিঃশ্বাস। কফিল সাহেবের দু-গাল বেয়ে দু-ফোঁটা ঘাম চিবুকে এসে ঝুলছে। ঘামে ভেজা রুমালটা ঘাড়ের উপর আড়াআড়ি করে রাখা। শার্টের কলারটা অন্তত না ভিজুক, ভেজা কলারে গা রি-রি করে। গোসল ছাড়াই বাসা থেকে বেরিয়েছেন। তিন দিন ধরে ফ্ল্যাটে পানি নেই। লোডশেডিংয়ের কারণে ঠিকমতো পানি সাপ্লাই দিতে পারছে না ওয়াসা। রাতে পাড়ার এক ছেলেকে এক শ টাকা দিয়ে পাশের টিনশেড থেকে এক ড্রাম পানি আনিয়েছেন, কয়েক মগ দিয়ে কোনোরকম গা-টা ভিজিয়েছেন, বাকিটা রান্নাবাড়া করতেই শেষ। গোসল না করে থাকা যায়, না খেয়ে তো আর থাকা যায় না।

সাড়ে সাতটায় বাসা থেকে বেরিয়েছেন, নটায় না হলেও সোয়া নটায় মতিঝিল পৌঁছার কথা, অথচ এখনই বাজে সোয়া আটটা। দশ নম্বরের সিগন্যাল কখন ছাড়বে ঠিক নেই। পনের মিনিটের মধ্যে না ছাড়লে অফিসে পৌঁছতে সাড়ে নটা বাজবে। আজও বসের ঝাড়ি খেতে হবে নির্ঘাত। প্রাইভেট ব্যাংকের চাকরি, সময়ের হেরফের করা চলে না।

দরজার পাশের সিটের এক যাত্রীর সঙ্গে কন্ডাক্টরের তর্ক-বাহাস চলছে। সিটিং সার্ভিসে মীরপুর থেকে গুলিস্তানের সরকার-নির্ধারিত ভাড়া বিশ টাকা, অথচ নেয়া হচ্ছে বাইশ টাকা। কন্ডাক্টরের উদ্দেশে খিস্তি করল যাত্রীটি―ওই ব্যাটা, বাস ভাড়া বাড়ছে কখন?

--তিন দিন আগে। তেলের দাম বাড়ছে।

--তেলের দাম বাড়ছে, না? তুই আমারে কী শিখাছ? বাসভাড়া তো বাড়ছে ঢাকা সিটির বাইরে, তুই বাইশ টাকা ভাড়া নিবি ক্যান?

--মালিক ভাড়া বাড়ালে আমাগো কী করার আছে? আপনে মালিকরে ফোন দেন।

--এক থাপ্পড়ে দাঁত ফালায়া দিমু ব্যাটা! ত্ইু ফোন দিয়া ক আইসা ভাড়া নিয়া যাইতে।

--ক্যা, থাপ্পড় দিবেন ক্যা? আরো দুই টাকা দেন।

--দিমু না, যা।

--দিবেন না ক্যা? আপনের বাপের গাড়ি?

আর কি রেহাই পায় কন্ডাক্টর! ভেঙ্গুলের বাসায় যেন ঢিল ছুঁড়ল বেচারা। পেছন থেকে যাত্রীরা হৈহৈ করে উঠল―ওই ব্যাটা, মুখে কথা আটকায় না? এক লাত্থি মাইরা বাস থেকে ফালায়া দিমু বেয়াদব কোথাকার!



কন্ডাক্টরও কম যায় না, পাল্লা দিয়ে সেও বকে যাচ্ছে। কিন্তু কেউ শুনছে না তার বকাবকি। বাসজুড়ে চলছে সমস্বরের প্যাঁচাল―যোগাযোগ মন্ত্রণালয় কি ভাড়া বাড়াইছে? বাসভাড়া বাড়ছে শহরের বাইরে, শহরে তো বাড়েনি! আর বাড়ছে তো তেলের দাম, গ্যাসের দাম কি বাড়ছে? বাস তো চলতেছে গ্যাসে, দু-টাকা বাড়তি নিব ক্যান? মগের মুল্লুক নাকি! শালারা, পাবলিকরে তোমরা ধুইঞ্চা ভাবো! ডেলি আপ-ডাউন করি। টাকা কি গরুর পাছা দিয়ে আসে? শালার বাঙালি জাতটাই খারাপ। দোষ আমাদেরই। কেউ প্রতিবাদ করে না। দু-টাকা বাড়তি না দিলেই তো হয়।

হট্টগোলের মধ্য দিয়ে জ্যাম উজাতে উজাতে বাস চলে এল দশ নম্বর গোলচক্কর। চক্করটা ক্রস করতে যাবে, অমনি আবার সিগন্যাল পড়ে গেল। দু-হাত তুলে উপর্যুপরি বাঁশি ফুঁকছে ট্রাফিক পুলিশ। তার গায়ের ওপর একটা সিনজি উঠি উঠি করে হঠাৎ কড়া ব্রেক কষে থেমে গেল। পুলিশ দাঁতমুখ খিঁচিয়ে হাতের ডাণ্ডাটা উঁচিয়ে সিএনজি ড্রাইভারের দিকে তেড়ে গেল।

ধুস্শালা―জোর পায়ে ব্রেক কষে খিস্তি করল বাসড্রাইভার। যাত্রীদের পাছা উঠে গেল সিট থেকে। হাতল ধরে দাঁড়ানো এক যাত্রী হুমড়ি খেয়ে পড়ল সিটে বসা আরেক যাত্রীর গায়ে। কফিল সাহেব জানালা গলিয়ে মাথাটা বের করে সামনে নজর ফেললেন। গোলচক্করের ওপারে পুরো রাস্তা ফাঁকা। রাস্তা ফাঁকা, অথচ জ্যাম! কারণটা কী? হঠাৎ ফায়ার সার্ভিসের গাড়ির সাইরেন শোনা গেল। কফিল সাহেব আবার জানালাপথে মাথাটা বাড়িয়ে দিলেন। শাহআলী প্লাজায় দমকল বাহিনীর মহড়া চলছে। মার্কেটের সামনের রাস্তায় বিরাট এক ক্রেন দাঁড়ানো। হলুদ পোষাক পরা দমকল বাহিনীর কর্মীরা ছোটাছুটি করছে।

পাশের যাত্রীটি ঠোঁট বেঁকিয়ে বলল―আগুন লাগলে খবর থাকে না, আর এখন কিনা মহড়া দিচ্ছে! অ্যাহ!

সামনের সিটের আরেক যাত্রী বলল―তা বাবা মহড়া দে, মহড়ারও দরকার আছে। তাই বলে অফিস-টাইমে রাস্তা ব্লক করে!

--তা তো করবেই। দেশে আইন-কানুন কিছু আছে নাকি!

--আইন-কানুন সবই আছে ভাই, কিন্তু ঠিকমতো মানা হয় না।

--মানা হবে কী করে? যারা আইনের রক্ষক তারাই তো মানে না। পাবলিকের দোষ দিয়া কী লাভ।

পানি, অ্যাই ঠাণ্ডা পানি...। আমড়া লন আমড়া...টক-ঝাল-মিষ্টি আমড়া...অ্যাই আমড়া...। বাসের দু-পাশে হকারদের হাঁকডাক। এক হাঁক থামলে আরেক হাঁক ভেসে আসে। দারুণ পিপাসা লেগেছে কফিল সাহেবের। বাসা থেকে বেরুনোর সময় ফ্রিজ থেকে একটা বোতল বের করে ঠাণ্ডা দু-গ্লাস পানি খেয়েছেন, অথচ এখন ছাতি ফাটার জোগাড়। এক হকারকে ডাক দিয়ে বারো টাকায় এক বোতল পানি কিনলেন।

ছিপিটা খুলতে যাবেন, এমন সময় পাশের যাত্রী বলল―এই পানি খাবেন ভাই? এসব তো ট্যাবের পানি।

--দেখে তো মনে হচ্ছে না ভেজাল।

--বোঝার উপায় নেই ভাই। কোম্পানির নাম দেখেন। জীবনে এই কোম্পানির নাম শুনেছেন? এসব হচ্ছে আন্ডারগ্রাউন্ড কোম্পানি। রাস্তা থেকে পুরনো বোতল কুড়িয়ে ট্যাবের পানি ভরে আমাদের কাছে বেচে। বোতলের গায়ে এই যে লেবেলটা দেখছেন, এটাও নকল। বানাতে আর ক’টাকা লাগে? সব দুই নম্বরি।

--তা অবশ্য ঠিক বলেছেন, কিন্তু উপায় তো নেই, যা গরম পড়ছে!

যাত্রীটি তার জানুর উপর রাখা কালো ব্যাগটা থেকে ফ্রেশ মিনারেল ওয়াটারের একটা বোতল বের করে কফিল সাহেবের দিকে বাড়ি ধরল―এই নিন, একদম নির্ভেজাল পানি। বাসা থেকে এনেছি।

কফিল সাহেবের চোখ বাঁ-দিকের জানালার উপরে লম্বা ফ্রেমে। ছোট ছোট অক্ষরে গোট গোট হাতের লেখা―পকেট সাবধান। বাসে অপরচিত লোকের দেয়া কিছু খাবেন না। মালামাল নিজ দায়িত্বে রাখুন।

--কী ভাবছেন ভাই? একদম বিশুদ্ধ পানি, নেন।

--তা ঠিক আছে, কিন্তু বোতলটা কিনেই ফেলেছি যখন আজকের মতো খাই। নষ্ট করে কী লাভ। রোজ কত ভেজাল জিনিসই তো খাই আমরা।

যাত্রীটির দরদমাখা হাসি খানিকটা ম্লান হয়ে গেল। চাপা গলায় ‘আচ্ছা ঠিক আছে’ বলে বোতলটা আবার ব্যাগে ঢুকিয়ে রাখল। ততক্ষণে বাস চলতে শুরু করেছে। টেট্টন কাপড়ের ময়লা ফ্রক গায়ে এক কিশোরী একটি চিরকুট ধরিয়ে দিচ্ছে সবার হাতে হাতে। কফিল সাহেব আনমনায় থাকায় তার কোলের উপর চিরকুটটি রেখে গেল মেয়েটি। চিরকুটটি তিনি হাতে নিলেও পড়ার দরকার মনে করলেন না। এসব চিরকুটে কী লেখা থাকে তার মুখস্ত। মুসলমান ভাইয়েরা সালাম নেবেন, হিন্দু ভাইয়েরা নমস্কার। আমার বাবা নেই, মা ক্যান্সারের রোগী। মায়ের চিকিৎসার জন্য দেড় লক্ষ টাকা প্রয়োজন। ছোট বোন মনে করে একটি চকলেট কিনে মায়ের চিকিৎসার জন্য আমাকে সহায়তা করবেন ইত্যাদি ইত্যাদি।

বাস দু-কদম আগায় তো তিন কদম পিছায়। গোলচক্কর থেকে যাত্রী তুলছে। সিটিং সার্ভিস, সিট খালি রেখে যাবে না। এখনো সাত-আট সিট খালি। কন্ডাক্টর অবিরাম হাঁক দিচ্ছে―অ্যাই ফার্মগেট শাহবাগ পল্টন গুলিস্তান...। ওদিকে পত্রিকার হকারের হাঁক―অ্যাই খবর লন গরম খবর। রাজধানীতে বোমা তৈরির সরাঞ্জামসহ গ্রেপ্তার পাঁচ। অ্যাই গরম খবর...।

কপিল সাহেব দু-টাকা দামের একটা পত্রিকা কেনার কথা ভাবছেন, ঠিক তখনই প্যান্টের ডান পকেটে রাখা মোবাইলটি কেঁপে উঠল। বাসের হৈ-হট্টগোলে রিংটোন শোনা যায় না, তাই ভায়োব্রেশন দিয়ে রেখেছেন। সিটগুলোর পরিসর এতই ছোট, পকেট থেকে কিছু বের করতে চাইলে হয় কাৎ হতে হবে, নয় চিৎ। দাঁড়ানোরও উপায় নেই, ছাদের সঙ্গে মাথা ঠেকবে। বড়জোর হাঁটুভেঙে দাঁড়ানো যায়। তাই তিনি বাঁ-দিকে কাৎ হয়ে মোবাইলটি বের করে রিসিভ করলেন। তার ছোট ভাইয়ের ফোন। ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলছেন আর চোখেমুখে আতঙ্কের ছাপ ফুটে উঠছে। তার মায়ের অবস্থা সঙ্কটাপন্ন, একটু আগে সিঁড়ির গোড়ায় মাথা ঘুরে পড়ে গেছেন।

: কী বলিস! আমি এক্ষুণি আসছি।

মোবাইলটি হাতেই ধরে রাখলেন কফিল সাহেব। পাশের যাত্রীটি তার দিকে বাঁকাচোখে তাকাল একবার। কফিল সাহেবের চেহারায় দারুণ উৎকণ্ঠা, দুশ্চিন্তার চাপে তিনি খানিকটা নব্জ্যু। মা এতদিন তার বাসাতেই ছিলেন, কদিন আগে ছোট ছেলের বাসায় গেছেন। পালা করে দু-ছেলের বাসায় থাকেন তিনি। হাইপ্রেশারের রোগী, ডায়াবেটিসও আছে। হঠাৎ হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। ভাতের চেয়ে ওষুদ বেশি খান, তবু রোগ সারে না। বয়স হয়ে গেলে ওষুদেও কাজে আসে না।

--এই তুমি যাবে?―চড়া গলায় ড্রাইভারকে ধমক দিলেন কফিল সাহেব। খানিকটা সামনে এগিয়ে আবার ব্রেক কষল ড্রাইভার। এই ব্যাটা ফাজিল কোথাকার!―আবারও ধমকে উঠলেন কফিল সাহেব। ড্রাইভার কানেই তুলল না। এই শহরের ড্রাইভাররা খানিকটা বেহায়া ধরনের। যতই ধমক-সমক দেয়া হোক, যতই গালাগালি করা হোক, যেই বেহায় সেই বেহায়া। সহজে গায়ে মাখে না।

সাড়ে আটটা বেজে গেছে। রাস্তা ফাঁকা পেয়ে একটানে কাজীপাড়া চলে এলো বাস, কিন্তু বিরক্তিকর জ্যাম পিছু ছাড়ল না। স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা রাস্তা পার হচ্ছে। ওদিকে একটা প্রাইভেট কারকে ধাক্কা দিয়েছে ইটিসি কোম্পানির একটি বাস। রাস্তা আটকে দুই ড্রাইভার তুমুল তর্কাতর্কি করছে। কফিল সাহেব আবার ঘামতে শুরু করেছেন, চোখেমুখে সীমাহীন অস্থিরতা। ছোট ভাই আবারও ফোন দিয়েছে, আসতে আর কতক্ষণ লাগবে জানতে চেয়েছে। তিনি জানালেন আধা ঘণ্টার বেশি লাগবে না। কিন্তু রাস্তার যা অবস্থা, এক ঘণ্টায়ও পৌঁছতে পারবেন কিনা সন্দেহ।

কন্ডাক্টরের সঙ্গে যাত্রীরা আবার ক্যাচাল শুরু করল। গেইটলক সিটিং সার্ভিসে সিটের বাইরে লোক ওঠানোর নিয়ম নেই, অথচ দশ নম্বর থেকেই তিনজন যাত্রী দাঁড়িয়ে আসছে, কাজীপাড়া থেকে তোলা হয়েছে আরো চারজন। এই অপরাধে একজন যাত্রী কন্ডাক্টরের গায়ে হাত তুলেছে, বেহায়া কন্ডাক্টর তবু দরজা বন্ধ করছে না। যাত্রীদের পেঁদানি খেয়ে শেষ পর্যন্ত তাকে দরজাটা আটকাতে হলো।

বাস যে গতিতে চলছিল তাতে বিশ মিনিটের মধ্যে গুলিস্তান পৌঁছে যেতে পারত, কিন্তু তালতলা এসে আবারও জ্যাম। এই জ্যাম দশ নম্বরের জ্যামের চেয়েও দীর্ঘ। তালতলায় সাধারণত জ্যাম থাকে না, আজ হলোটা কী? চার রাস্তার মোড়ের দিকে মানুষের শোরগোল শোনা যাচ্ছে। কী হলো কেউ কিছু বলতে পারছে না। কফিল সাহেব ঘাড় উুঁচ করে দেখলেন রাস্তায় আগুন জ্বলছে। টায়ারপোড়া গন্ধ এসে লাগছে নাকে। এই সময় রাস্তায় আগুন জ্বলবে কেন? আজ তো হরতাল-অবরোধ নেই। তাহলে কি কাল হরতাল ডেকেছে বিরোধী দল? তা তো ডাকার কথা নয়। সকালবেলা তো কখনো হরতালের ঘোষণা আসে না। গাড়িতে আগুনও দেয়া হয় বিকেলে বা সন্ধ্যার পর। সকালবেলায় তবে এ কিসের আগুন?

: কী হয়েছে ভাই? একজন পথচারীর কাছে জানতে চাইলেন কফিল সাহেব।

: একসিডেন্টে ইনুভার্সিটির পোলা মারা গেছে।

: কোন ইউনিভার্সিটির?

: শেরেবাংলা।

বিস্তারিত ঘটনা জানা গেল আরো কিছুক্ষণ পর। ঘটনা সত্যি। আগারগাঁও মোড়ে বাসের চাকার নিচে পড়ে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইনাল ইয়ারের এক ছাত্র একেবারে থেঁতলে গেছে। প্রতিবাদে অন্য ছাত্ররা সড়ক অবরোধ করেছে। অবরোধ কখন তুলবে বলা মুশকিল। ডানের রাস্তা ধরে পুলিশের একটি গাড়ি দ্রুতবেগে ছুটছে ওদিকে।

হঠাৎ গাড়ি চলতে শুরু করল। বুকের মাঝখানে আটকে থাকা দমটা যেন ফিরে পেলেন কফিল সাহেব। কিন্তু আগারগাঁও মোড়ে এসে আবার থেমে গেল বাস। অবাকচোখে কফিল সাহেব খেয়াল করলেন, রড ও হকিস্টিক হাতে বিশ-পঁচিশজনের একদল যুবক পাসপোর্ট অফিসের ওদিক থেকে ছুটে আসছে। রাস্তার লোকজন রূদ্ধশ্বাসে ছুটে পালাচ্ছে, অন্য বাসগুলোর যাত্রীরা নেমে পড়ছে হুড়োহুড়ি করে। ডান দিকে বিআরটিসির দোতলা বাসটিতে যাত্রীদের হুড়োহুড়িতে একটা শিশু পায়ের নিচে চাপা পড়ে চিৎকার করছে, জানালার পাশে বসা এক মহিলা কঁকিয়ে উঠছে চাপা কান্নায়। কফিল সাহেবের আশপাশের সিটের কয়েকজন যাত্রী নেমে গেছে, কিন্তু তার নড়চড় নেই, চুপচাপ বসে আছেন। ঢাকা শহরে এসব দাঙ্গা-হাঙ্গামা দেখে তিনি অভ্যস্ত। এই সময় ছোটাছুটির চেয়ে চুপচাপ বসে থাকাটা নিরাপদ।

গাড়ির কাচ ভাঙার ঝনঝনাৎঝন শব্দ ভেসে এলো হঠাৎ। সামনের কয়েকটি গাড়িতে হামলা চালিয়েছে যুবকরা। বেশভুষা দেখে ছাত্র বলেই মনে হচ্ছে। নিশ্চয়ই শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের। বাস চাপায় ছাত্রহত্যার প্রতিবাদে দেদার ভাংচুর চালাচ্ছে তারা।

কফিল সাহেব যে বাসটিতে, সেটির ঠিক সামনে আরেকটি বাস থাকায় বিক্ষুব্ধ ছাত্ররা এই বাসটির সামনের কাচের কোনো ক্ষতি করতে পারল না। ডান দিকের জানালার কাচগুলো ভাংতে শুরু করল তারা। কফিল সাহেবের পাশের জানালাটির কাচে রডের একটা বাড়ি এসে পড়ল হঠাৎ। সশব্দে ভেঙে পড়ল পুরো কাচটা। কপাল ভালো, বুদ্ধি করে কফিল সাহেব ব্যাগটা উঁচিয়ে ধরেছিলেন, নইলে রডের বাড়ি তার গায়ে পড়ত নিশ্চিত।

খানিকের মধ্যে তুলকালাম কাণ্ড ঘটিয়ে দিল ছাত্ররা, প্রায় শ-খানেক গাড়ি ভাংচুর করল। আরো ভাংত, যদি না পুলিশ এ্যাকশনে যেত। পায়ে রাবার বুলেট লাগায় রাস্তায় শুয়ে পড়ল আহত দুই ছাত্র। বেগতিক বুঝে তাদের নিয়ে বাকিরা যে-পথে এসেছিল সে-পথে পালাতে লাগল।

আবার চলতে শুরু করল গাড়ি। হাঁফ ছেড়ে বাঁচল যাত্রীরা, স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন কফিল সাহেব। তিনি ছাদের হাতল ধরে দাঁড়িয়ে। ডানপাশের সিটগুলোতে কাচের টুকরো ছড়ানো, বসার মতো পরিস্থিতি নেই। কন্ডাক্টর এসে সিটগুলো উল্টেপাল্টে কাচগুলো পরিস্কার করে দিলে পরে একটি সিটে গিয়ে বসলেন তিনি।

ছোটভাই আবারও ফোন দিল, জানতে চাইল আর কতক্ষণ লাগবে। কফিল সাহেব বললেন, বড়জোর বিশ মিনিট। রাস্তায় প্রচণ্ড জ্যাম। ছোট ভাই জানাল, চোখ উল্টে গেছে মায়ের, মুখ দিয়ে সাদা ফেনা বেরুচ্ছে। অবস্থা ভালো বলে মনে হচ্ছে না। যে কোনো সময় খারাপ কিছু ঘটে যেতে পারে।

ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন কফিল সাহেব―এই আসছি আমি ভাই, তুই মাকে দেখে রাখ।

বঙ্গবন্ধু নভোথিয়েটারের সামনে এসে আবার থেমে গেল বাস। বিজয় সরণির মোড়ে সিগন্যাল পড়েছে। গরমে-ঘামে-জ্যামে যাত্রীরা দারুণ বিরক্ত। মাঝবয়েসী হ্যাংলা-পাতলা এক হকার উঠল বাসে। বই বিক্রেতা। কথা বলছে বেশ সাজিয়ে-গুছিয়ে, কিন্তু শ-র উচ্চারণ করছে স।―বইটি পড়লে জানতে পারবেন কোন সাক খেলে গ্যাস্টিক ভালো হয়, কোন সবজি খেলে ডায়বেটিস কন্ট্রোলে থাকে। আরো জানতে পারবেন ফলমুল খেয়ে সরীর সুস্থ রাখার উপায়।’

বাঁ-হাতের বাণ্ডিল থেকে আরেকটি বই বের করল এবার―এই বইটি পড়লে জানতে পারবেন কোন দেসে সাগরের তলা দিয়ে ট্রেন চলে, কোন ব্যাক্তির মাথায় এক স একবার ঠাঠা পড়ার পরও সেই বিস্ববেহায়া মরেনি। আরো জানতে পারবেন কোন দেসে গাছে মানুস খায়...।খানিক দম নিয়ে আবার বলতে শুরু করল―এটির সঙ্গে পাচ্ছেন আরো একটি বই। বইটি পড়ে জানতে পারবেন কীভাবে নামাজ পড়তে হয়, কোন নামাজ জীবনে একবার হলেও পড়তে হয়। যে কোনো লাইব্রেরী থেকে কিনতে গেলে প্রতিটি বইয়ের মূল্য আপনার কাছ থেকে নেবে বিস টাকা। তবে আমাকে বিস টাকা দিতে হবে না। আমি কোম্পানির লোক। বেসি বেচি, লাভ করি সীমিত। কোম্পানির প্রচারের জন্য আমার কাছ থেকে তিনটি বই পাচ্ছেন মাত্র দস টাকায়। দস টাকা...দস টাকা...দস টাকা।

পেছনের সিটের এক যাত্রী দশ টাকায় তিনটি বই কিনে নিল। সামনের সিটের বোরকা পরা এক মহিলা তিনটি বই পাঁচ টাকায় চাইল। মহিলার কথা শেষ হবার আগেই হকার বলে উঠল―একদাম, মুলামুলি নাই। আরো কয়েকজন যাত্রী বইগুলো নেড়েচেড়ে দেখে ফিরিয়ে দিল।

বাস ছাড়ার কোনো লক্ষণ নেই। ইঞ্জিন বন্ধ করে চুপচাপ বসে আছে ড্রাইভার। কী হলো আবার! সিগন্যাল তো এতক্ষণ থাকার কথা নয়! কী আর হবে, এয়ারপোর্ট রোডে ভিআইপি যাবেন। প্রধানমন্ত্রী অথবা রাষ্ট্রপতি। নিরাপত্তার ব্যাপার আছে না! কম করে হলেও বিশ মিনিটের আগে রাস্তা ক্লিয়ার হচ্ছে না।

ওহ্ শীট্―মাথার চুল ছিঁড়তে ইচ্ছে করছে কফিল সাহেবের। কণ্ঠনালীতে কান্নার ঝড়োবেগ আটকে আছে। বাসায় থাকলে এতক্ষণে হাউমাউ করে করে কাঁদতেন। লোকলজ্জায় কাঁদতেও পারছেন না এখন। ছোট ভাইয়ের নম্বরে ডায়াল করলেন। ভাই জানাল, মায়ের হুঁশ ফিরেছে, তাকে একবার দেখতে চাইছেন তিনি।

--মাথায় পানি দে ভাই। প্রেশারের ওষুদ খাইয়েছিস? এই আমি আসছি, আর মাত্র দশ মিনিট...।

গলায় আটকে থাকা কান্নাটা আর ধরে রাখতে পারলেন না কফিল সাহেব, দু-হাতে চোখ ঢেকে ফুঁপিয়ে উঠলেন। পাশের যাত্রী অবাকচোখে তার মুখের দিকে তাকাল। অন্য যাত্রীরাও ঘাড় উঁচু করে তাকে দেখতে লাগল। কেউ কোনো প্রশ্ন করছে না। ছোট ভাইয়ের সঙ্গে ফোনে কথপোকথন সবাই শুনেছে, তাতে যা বোঝার বুঝেছে, নতুন করে আর জিজ্ঞেস করবেই-বা কী?

পাশের যাত্রীটি বলল―এক কাজ করুন ভাই। রাস্তা পার হয়ে একটা সিএনজি নিয়ে চলে যান।

পেছন থেকে আরেকজন বলল―রাস্তায় তো মশামাছিও উড়তে দিচ্ছে না, সিএনজি কোথায় পাবে? তার চাইতে বরং এখানে বসে অপেক্ষা করাই ভালো। দশ মিনিটের মধ্যে ছেড়ে দেবে আশা করি।

এরই মধ্যে বাদামওয়ালা, পত্রিকাওয়ালা এবং আন্ধা-লুলা কয়েকজন ভিখেরি ঘুরে গেছে। সবশেষে উঠল মৌলবি গোচের এক হকার। গায়ে লম্বা জোব্বা, মাথায় পাঁচকলিদা টুপি, মুখে চাপদাড়ি। এই গরমের মধ্যেও মাথাটা বড় রুমালে ঢাকা। দেখতে ঠিক মেয়েদের ওড়নার মতো। হাতে কয়েকটি ডিভিডি। একটা লম্বা সালাম দিয়ে সে বলতে শুরু করল―পরম করুণাময় আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের অশেষ মেহেরবানিতে বিজ্ঞান অনেক দূর এগিয়েছে। আল্লার কুদরত দেখুন, এখন আপনি কত সহজেই না পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত শুনতে পাচ্ছেন! সুমধুর কণ্ঠে কোরান তেলাওয়াত শুনতে পাবেন আমার এই ডিভিতে। যাদের ঘরে কম্পিউটার আছে তাদের জন্য আমার এই ডিভিডি। আল্লার রহমতে ডিভিডি একবারও আটকাবে না, যান্ত্রিক কোনো সমস্যা করবে না। হাদিয়া নিচ্ছি মাত্র এক শ টাকা। কারো দরকার হলে জায়গায় বসে আওয়াজ দেবেন, হাতে হাতে পৌঁছে দেব।

না, কেউ আওয়াজ দিল না। বেশিরভাগ যাত্রী কী বুঝে মুচকি মুচকি হাসছে। এক যুবক খিক্ করে হেসে উঠল। কারো কারো ঠোঁটে বিদ্রুপের হাসি। চারদিকে একবার চোখ বুলাল হকার। ঠিক সুবিধা করতে পারবে না ভেবে আবারও লম্বা একটা সালাম দিয়ে নেমে গেল।

কফিল সাহেবের ফোন বেজে উঠল আবার। এবার ফোন দিয়েছে তার ছোটবোন। সে মুগদা থেকে মাকে দেখতে যাত্রাবাড়ি গেছে কিছুক্ষণ আগে। ভীষণ কান্নাকাটি করছে। বোনের কান্না শুনে কফিল সাহেবও কাঁদছেন। বারবার চোখ মুছে বোনকে সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করছেন।

ঘড়ঘড় শব্দে গাড়ির ইঞ্জিনগুলো স্ট্রাট নিল। সিগন্যাল ছেড়েছে হয়ত। রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা লোকজন তড়িঘড়ি বাসে উঠছে। খানিকের মধ্যে বাসের চাকা গড়াতে শুরু করল। ফার্মগেট-কারওয়ান বাজারের ছোটখাট জ্যাম পেরিয়ে শাহবাগ পর্যন্ত যেতে বেশিক্ষণ সময় নিল না বাস, কিন্তু ঢাকা ক্লাবের সামনে এসে রাস্তার একপাশে থেমে গেল। গাড়ির কাগজ-পত্র চেক করবেন সার্জেন্ট। ড্রাইভার কালিময়লা পলিথিনে মোড়ানো কিছু কাগজপত্র নিয়ে নেমে গেল। কফিল সাহেব মোবাইলের স্ক্রীনে সময় দেখছেন বারবার। পৌনে দশটা বাজে। কাগজপত্র চেক করতে সার্জেন্ট কতক্ষণ সময় নেবেন কে জানে। বাস থেকে নেমে হাঁটা ধরবেন কিনা ভাবছেন। অথবা একটা রিকশাও নেয়া যেতে পারে। কিন্তু রাস্তায় জ্যাম থাকলে রিকসা নিয়েও তো লাভ নেই।

সার্জেন্ট বেশি সময় নিলেন না। কাগজপত্র ঠিক না থাকায় দু শ টাকা জরিমান করে ছেড়ে দিলেন। একটানে বাস হাইকোর্টের সামনে এসে আবার জ্যামে আটকা পড়ল। এখানে আবার কী হলো? গুঞ্জন উঠল যাত্রীদের মধ্যে। একজন পথচারী জানাল, প্রেসক্লাবের সামনে রাজনৈতিক মিটিং চলছিল, পুলিশ বাধা দেয়ায় কয়েক দফা সংঘর্ষ হয়েছে। আবার মিটিং শুরু হয়েছে এখন।

দারুণ অসহায় বোধ করলেন কফিল সাহেব। ডানা থাকলে এখন উড়ে যাত্রাবাড়ি চলে যেতেন। সিট থেকে উঠতে যাবেন, তখন ফোন বেজে উঠল আবার। তার ছোট ভাইয়ের ফোন। --হ্যাঁ ভাই, আর মাত্র দশ মিনিট...। কী? কী বললি ভাই? মা মারা গেছেন! ভাই...।

শিশুর মতো কাঁদতে শুরু করলেন শোকগ্রস্ত কফিল সাহেব। দ্রুত পায়ে বাস থেকে নেমে পড়লেন। উদভ্রান্তের মতো ছুটছেন পুরানা পল্টনের দিকে। প্রেসক্লাবের সামনে শত শত মানুষ। একজন সরকারের কঠোর সমালোচনা করে চড়াগলায় বক্তৃতা করছে। কিছুই কানে ঢুকছে না কফিল সাহেবের। সচিবালয়ের উল্টোদিকের রাস্তাটা ফাঁকা, শত শত ইটের টুকরো ছড়ানো-ছিটানো। পল্টন মোড় পার হয়ে ঘন ঘন চোখ মুছতে মুছতে তিনি গুলিস্তানের দিকে ছুটছেন...।



লেখক পরিচিতি
স্বকৃত নোমান

প্রতিশ্রুতিশীল তরুণ ঔপন্যাসিক। ১৯৮০’র ৮ নভেম্বর ফনীর পরশুরাম উপজেলার বিলোনিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। দৈনিক আজকের কাগজের মাধ্যমে সাংবাদিকতার শুরু। ‘কয়েকটি জোব্বার মহাপ্রয়াণ’ শীর্ষক একটি নিবন্ধের মাধ্যমে প্রয়াত নাট্যকার ড. সেলিম আল দীনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। পরবর্তীকালে তাঁর একান্ত সচিব হিসেবে যোগ দেন। তাঁর কাছেই বিশ্বসাহিত্যের পাঠ নেন নোমান। সেলিম আল দীনের মৃত্যুর পর আবার সাংবাদিকতায় যুক্ত হন। বর্তমানে তিনি নিউজপোর্টাল ঢাকারিপোর্টটোয়েন্টিফোর.কম ও সাপ্তাহিক ধাবমান-এর এক্সিকিউটিভ এডিটর। ২০০৮ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম উপন্যাস নাভি। এরপর প্রকাশিত হয় যথাক্রমে ‘ধুপকুশী’ (পরিবর্তিত নাম ‘বংশীয়াল’), ‘জলেস্বর’, ‘রাজনটী’ ও ‘হীরকডানা’। পত্রপত্রিকায় নিয়মিত গল্প লিখছেন। ইতিহাস, ইতিহাসের মানুষ, বিশাল বাংলার মিথ, লোকজীবন, লোকসংস্কৃতি, বঞ্চিত মানুষদের সুখ-দুঃখের পাঁচালি তাঁর গল্প-উপন্যাসে ভিন্ন রকমের মাত্রা নিয়ে উপস্থিত হয়। তাঁর উপন্যাসের ভাষা ও আঙ্গিক একেবারেই আলাদা, নিজস্ব। কথাসাহিত্যে তিনি এইচএসবিসি-কালি ও কলম পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।”

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন