রবিবার, ৫ জানুয়ারী, ২০১৪

এই চরাচর এই চালচিত্র

 অমর মিত্র


তোমার নাম? আঁজ্ঞে, বাপের বাড়ির নাম ভুতি, ভুতি মণ্ডল। বিয়ে হল দাসের ঘরে। আমার বাপের নাম ছেল ছায়েব মণ্ডল। গাঁ-র লোক তারে বলত হাজু, হাজু— হাজরা ঠাকুর বাঁচাল তারে, জম্মের পর পেঁচোয় ধরেছিল, বাঁচার আশা ছেল না। বলতে বলতে ভুতি মুখ অন্য দিকে ঘুরিয়ে নেয়। মনটা হঠাৎ খারাপ হয়ে গেল। কেন যে সে এত কথা বলে? তার বাপের পরিচয়ে কী দরকার ওই লোকের? সরকার পাঠিয়েছে তার খবর নিতে।

শিশুবালা দাস কে? জানলে কী করে? ভুতি দাস জিজ্ঞেস করল। গ্রাম প্রধানের কাছ থেকে খবর পেয়েছি। সার্ভেয়র বলল।


তা হবে! ভুতি বিড় বিড় করে। প্রধানের আগের বাড়ি ছিল তাদের জগৎপুরে, যেখানে টাউন হল আর জোতজমি-বাগান-পুকুর সব গেল মাটির নীচে। মনে রেখেছে লোকটা। অনেক টাকা ক্ষতিপূরণ পেয়ে এ দিকে এসে হোমরা-চোমড়া। প্রধানও হয়ে গেছে পর্যন্ত। তার মতো সব ভাসিয়ে হাইওয়ের ধারে নয়। দু’এক জনের হয়, বেশির ভাগের হয় না। সে সরকারের পাঠানো সার্ভেয়রকে দেখতে লাগল। এই লোক কি সেই জগৎপুরে গিয়েছিল? সার্ভেয়র পঞ্চাশ পার। মাথার চুল ঘন কালো বটে, কিন্তু মুখখানিতে বার্ধক্যের ছায়া এসে গেছে স্পষ্ট। কালো প্যান্ট লাল শার্টে সার্ভেয়রের বয়স কমে কমেছে একটু। অন্তত সে নিজে তা মনে করে মনে হয়।

সার্ভেয়র দেখছিল মেয়েমানুষটিকে, আর তার পিছনে দাঁড়ানো নিরীহ মুখের পুরুষটিকে। হাইওয়ের পর নয়ানজুলি পেরিয়ে এই ভিটে। আশপাশে আর কোনও ঘর দেখতে পাচ্ছে না সে। কী রকম নিঃসঙ্গ একটা মানুষের মতো প্রায়। ভাঙাচোরা দেহ, কোটরে ঢোকা চোখ, ভুতি দাসের বয়স চল্লিশ পেরিয়েছে সবে। তার পিছনের লোকটির যে কত, তা ধরা যায় না। হাসলে ভুতি দাসের পান খাওয়া দাঁত অসহ্য মনে হয়। বুক এখনও ভারী, তাই মেয়েমানুষ বলে চেনা যায়। সামনে দাঁড়ানো যায়।

ভুতি বলল, শিশুবালা আমার শউর মশায়ের দেয়া নাম। বিয়ের পর বলল, ঘরে লক্ষ্মী এল, তার নাম ভুতি হবে কেন? আমি ও বাড়ি যাওয়ার পর শউর মশায় পাঁচশো এক টাকা লটারি পেইলেন, আর সরকারের কাছ থেকে বর্গার সাট্টিফিকেট, বাপ-বেটা দু’জনায়।

কথা বলতে বলতে যেন হাঁপ ধরে যায় শিশুবালার। চুপ করে দম নিল। ঘোর লাগা চোখে দেখছে সার্ভেয়রবাবুকে। ওই অনেক দূরে হাইওয়ের উপর সরকারি গাড়ি। গাড়ি রেখে পায়ে হেঁটে সাঁকো পার হয়ে সার্ভেয়রবাবু শিশুবালার ভিটের সামনে এসেছে। এ ছাড়া কোনও পথ নেই। বাঁশের সাঁকো, ঘাসবনে গাড়ি ঢুকবে কী করে! আশ্বিন মাসের বেলা। ঘাসের গোড়ায় কাদা শুকোয়নি এখনও। ভাদ্রের শেষাশেষি ক’দিন খুব বৃষ্টি হল। আকাশে কত মেঘ এসেছিল তখন! হাওয়া উঠেছিল। তা থামতে না থামতে কাশের বন ছেয়ে গেছে এ দিক-ও দিক। শিশুবালার ভিটের ধারেও। শিশুবালা দম নেওয়া শেষ করে বলল— আমার শউরবাড়ির ভিটে-বাগান, বর্গা-পাট্টা জমিন নাকি ফেরত দিয়া হবে, টাউনে সব গিয়েছিল যা।

সার্ভেয়র হাসল। শিশুবালার অজ্ঞতায় তার মনে যেন করুণার উদ্রেক হয়। বলল, যা যায় তা আবার আসে নাকি? আসে, আমার সোয়ামি বলেছিল দেখিস আদরি, সব আবার আগের মতো হয়ে যাবে। আদরি কে? সার্ভেয়র জিজ্ঞেস করল। হাসল শিশুবালা। পান খাওয়া কালো দাঁতেও হাসি ফুটল সুন্দর। বলল— আমিই আদরি। রেশনকার্ডে তো দেখছি অন্য নাম?

আদরি বলল, ওখেনে ভুতি আছে। বাপের ঘরে তো ভুতিই ছিলাম। কাড্ তো বদলি করে আনা হল শউরঘরে। নাম বদল করতি তিনশো টাকা চাইল। কী দরকার? ভুতিও যা পাবে, শিশুবালাও তাই। আদরি হলি কি চাল-কেরাচিন বেশি দেবে? সার্ভেয়র জিজ্ঞেস করল, ঘরে কি কাগজ আছে? আছে, একটা পাট্টাও আছে। সরকার দিয়েছিল। এই ভিটের? না আঁজ্ঞে। সে জমি টাউনে চলে গেছে। সার্ভেয়র জিজ্ঞেস করল, আর কী আছে? বর্গার কাগজ আছে, গোমস্তার রসিদ আছে। কই আনো দেখি সব। সার্ভেয়র নির্দেশ দিল। তা শুনে আদরি তার পিছনে দাঁড়ানো মধ্যবয়সী নিরীহ গোছের লোকটিকে বলল, আনো দেখি ঘর থেকে।

লোকটা গেল। আদরি এ দিক-ও দিক তাকায়। চোখমুখে বিভ্রান্তির ভাব। সেই কত দিন আগে টাউনের জন্য জমি নিল। উকিল গোমস্তা কাগজে সই নিয়ে ক’টা টাকা ধরিয়ে দিল। বাকিটা নিজেরা খেল। তা নিয়ে কাড়াকাড়ি হল দেওর-ভাসুর-স্বামীর ভিতরে। দীর্ঘশ্বাস ফেলল সে। এখন ও সবে কী দরকার? কাগজগুলো রেখে দিয়েছে এমনি। ও কাগজের কোনও দাম নেই জেনেও রাখা। কোনও কিছু ফেলতে নেই, বলত তার স্বামী নিতাই দাস। এ সব ভাবতে ভাবতে সে জিজ্ঞেস করল, কাগজে কী হবে?

সার্ভেয়র জবাব দিল না। লোকটা একটা পুরনো প্লাস্টিক প্যাকেট এনে দিল আদরির হাতে। আদরি তা দিল সার্ভেয়রের হাতে। বলল, দেখে নাও, অনেক কাগজ আছে।

সার্ভেয়র এটা-ওটা, পুরনো পাট্টা, বর্গার সার্টিফিকেট, সরকারি নোটিসের কপি দেখতে দেখতে একটা রসিদ নেড়ে-চেড়ে জিজ্ঞেস করল, রাধিকা কুইলা কে? এ যে দেখছি রাস্তার ধারের সরকারি জমির জন্য খাজনা তুলেছে। হ্যাঁ, এই তো ভিটে। ভিটে পাকা বন্দোবস্ত দিয়ে গেছে গোমস্তাবাবু। আদরি বলল, পাঁচশো এক টাকা নিল। ইস্! পারে নাকি! পি ডব্লুউ ডি-র জমি! রাধিকা কুইলাকে দিয়ে দিলেই হবে? হবে না হুজুর? আদরির পিছনের লোক জিজ্ঞেস করল। না, হবে না। টাকা ও নিজেই খেয়েছে, এ তো ফালতু কাগজ। কিন্তু এই রাধিকা কুইলা কোথা থেকে এল? আদরি নিজের বুকে হাত দিয়ে বলল, এই তো আমিই আধিকা। তুমি? তুমি না আদরি?

সে তো আমার কানু-ভানুর বাপ দিয়েছিল, বললাম না ভুতি শউরবাড়ি এসে হল শিশুবালা, আর সোয়ামির কাছে হল আদরি...। বলতে বলতে ভাঙাচোরা শরীরে মেয়েমানুষটির দু’চোখ চকচক করে ওঠে। শ্বাসপ্রশ্বাস গাঢ় হল। বুক কাঁপল। মনে পড়ে গেল হয়তো। হু হু করে কোনও এক প্রাচীন বাতাস এসে ঝাপটা মারতেই আঁচল আলুথালু হল। প্রাণ থরথর করে উঠল। প্রথম রাত্তিরেই নামটা পাওয়া। লোকটা ঝাঁপাল। ঝাঁপাতে মাটির ভিটে যেন দুলতে লাগল। নৌকো হয়ে গেল জগৎটা। সে ছিল রোগা মানুষ, ছোটখাটো। অথচ তার পৌরুষ কী! চাপা গলায় ডাক দিল, আদরি, তুই আমার বউ। কেডা আদরি? তুই, তুই আমার আদরি বউ। কথাটা কি এই সায়েববাবু জানে? কত কথা থাকে মানুষের, তা তার নিজের কাছেই থেকে যায়। সে লোকটাকে দু’হাতে বেড় দিয়ে বলল, আমারে মনে ধরেছে? তোর ধরেছে আদরি? আমি তো শিশুবালা।

থো তোর শিশুবালা, তুই আমার আদরি! গরগর করে উঠেছিল লোকটা। প্রায় বুনো বিড়াল। আঁচড়ে-কামড়ে একশেষ! ও মা, মা, মা! সে কী লজ্জা! গালে দাগ, ঠোঁট ফোলা, বুকে দাগ, ঘাড়ের কাছে নখের আঁচড়! সব দিনমানে দেখে সেই লোক বলল, ‘তোর নাম লিখে দিইছি তোর গায়ে। মুছতি পারবিনে বউ।’

সে ঘাড় তুলে বলল, ও নাম মুছে গেছে। তুমি তা হলে রাধিকা? হ্যাঁ, আধিকা কুইলে। কাগজ ভর্তি প্যাকেট ফেরত নিতে নিতে রাধিকা বলল। তার পিছনে দাঁড়ানো মাঝারি উচ্চতার শীর্ণকায় কৃষ্ণকায় মানুষটি মাটিতে পা ঘষতে ঘষতে বলল হুজুর, ও রাধিকে। গোমস্তাবাবু ওই নামে বন্দোবস্ত দিল।

তা হলে আদরি গেল কোথায়? সার্ভেয়র জিজ্ঞেস করল। রাধিকা কুইলা ডান দিকে অনেক দূরে তাকায়। ধীরে ধীরে নিঃশ্বাস ফেলতে থাকে। আঁচলের খুঁট দিয়ে গাল মোছে। চোখও মোছে মাথা নামিয়ে। তার পর বিড়বিড়িয়ে বলে, ওই রাস্তায়, রাস্তা তো এক টাউন থেকে আর এক টাউনে যায়।

যায়। সার্ভেয়র হতভম্ব। মধ্যিখানে আমরা চাকার তলে পড়ে যাই ছায়েব, রাস্তা দিয়ে ভেগে গেল আদরির সোয়ামি। পুলিশ তাকে কেস দিয়ে দেশ ছাড়া করল। সে ভিটের সামনে শুয়ে পড়েছিল, দখল দেবে না।

ঠিক আছে থাক। সার্ভেয়র অস্বস্তি বোধ করে। এক পা পিছিয়ে যায়। সে পিছোলে রাধিকা এগোয়। সার্ভেয়র দাঁড়ালে রাধিকাও দাঁড়ায়। নগর গড়তে এমন হয়। দু’পাঁচটাকে ধরলে, হাজতে ভরে দিলে, পেটালে আর সবাই ঠাণ্ডা হয়ে যায়। দু’পাঁচ জনের নামে গোলমেলে কেস দিলে তারা চিরকালের মতো দেশ ছাড়া হয়ে যায়। এ সব জানে সার্ভেয়র। কম দিন নেই তো এই কাজে! নগর গড়তে এ সব করতে হয়। না হলে হয় না।

রাধিকা বলল, টাউনের কথা মনে পড়ে ছায়েব? কোন টাউন? আমার শউরঘর, পাট্টাজমিন, বর্গাজমিন সব চলে গেল। কবের কথা বলছ? সেই যে মৌজা জগৎপুর গেল, তার পর কত বার আশ্বিন মাস এল! দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল রাধিকা। কোন জগৎপুর? বেঁকা জগৎপুর। রাধিকা বলে উঠল। বেঁকা খাল ছিল পাশে, মনে নেই? না, না। ও-রকম কিছু হয়নি তো! সার্ভেয়র বলল। টাউন হয়নি? কোথায় টাউন? আমি জানি না। রাধিকা বলল, গিয়ে দেখে এস জগৎপুরে কানু-ভানুর বাপের ভিটে ছেল কি না।

সার্ভেয়র চুপ হয়ে গেল। রাধিকাও। থমথম করতে লাগল, আকাশ মাটি, এই বুনো আমগাছের ছায়া। একটু পরে সার্ভেয়র অনুচ্চ স্বরে জিজ্ঞেস করল, কানু-ভানু কে?

আদরির দুই বেটা। যমজ বেটা হল আদরির। তা দেখে কী আহ্লাদ সংসারে। ওরে আমার কানু-ভানু রে! চাপা গলায় কেঁদে উঠতে যায় রাধিকা কুইলা। তখন তার পিছনে দাঁড়ানো গগন কুইলা তার কাঁধে হাত দিল। বলল, ছায়েবদের সামনে কানতি নেই।

শুনে রাধিকা মাথায় কাপড় দিল। চোখ দুটি যেন উড়ো মেঘে ভারী হয়ে টলমল করতে লাগল। ভাদ্রমাসে জোড়া ছেলে হল। ছেলের মুখ দেখে আদরির স্বামী বলল, দুই বেটার জন্য দুই বিঘা জমিন, দুইখানা ভিটা সব করতে হবে। তার পর সেখেনে টাউন হওয়ার নোটিস এল। ফুঁসে ঘুরতে লাগল আদরির যমজ বেটার বাপ। মরব, তবু জমি দেব না।

তার ফোঁস ফোঁসানির গরমে আগুন ধরে গেল যে ভিটেয় কী ভাবে, কোন পথে? পুড়ে সব ছাই। সার্ভেয়র জিজ্ঞেস করল, কোন নাম লিখি তা হলে? —রাধিকে লেখেন বাবু, গোমস্তা ওই নামেই তো রসিদ দিয়ে গেল এই খাস জমির। বলল গগন কুইলা। ও এখন রাধিকে হুজুর, আমি ওরে এই নাম দিয়েছি।

শুনে রাধিকা কুইলা মাথার কাপড় ফেলে হাসল গগনের দিকে চেয়ে। গগন তাকে বাঁচাল। কানু-ভানুকে নিয়ে গগন কুইলার হাত না ধরলে ভেসে যেত কোথায়? এখন কানু-ভানু গেছে হাইওয়ের ধারের ধাবায় কাজ করতে। থালা গেলাস ধোয়, টেবিল মোছে, ট্রাক ড্রাইভারদের পা টেপে, কচি হাতে দলাইমলাই করে। রাস্তার দিকে তাকিয়ে চোখ জ্বালা করতে লাগল রাধিকার। ধাবায় তেল মশলা শুকনো লঙ্কার খুব ঝাঁজ!

সার্ভেয়র পায়চারি করছিল। চোখে চোখে মেপে নিচ্ছিল হাইওয়ের ধার। এত বছরের মাপামাপির অভ্যেস, চোখে চোখেই ভাল আন্দাজ করতে পারে। হাইওয়ে যতটা আছে, তার দ্বিগুণ হবে। সেই মাপের ভিতর এই ভিটে পড়ে গেছে মনে হচ্ছে। এ হল প্রাথমিক অনুসন্ধান। এর পর নোটিস পড়ে গেলে মাপামাপি, চেন ফিতে। সার্ভেয়র এই কাজে দক্ষ। কত জমি আজ পর্যন্ত মেপেছে। কত জমি রাস্তায়, টাউনে ঢুকিয়ে দিয়েছে। আবার এমনও হয়েছে মাপের গরমিলে কত জনকে বাঁচিয়েও দিয়েছে। আরও কত কী পারে সে! কোথাও কোনও গোলমাল পেয়ে গেলে ক্ষতিপূরণ না-দিয়ে জমি দখল করে নিতে পারে। তার পর দর কষাকষি। দিনের পর দিন ঘোরাঘুরি। কাউকে আগাম খবর দিয়ে কোর্টে পাঠিয়ে প্রকল্প আটকে দিতে পারে। এমন কাজে তার হাত যশ আছে শোনা যায়। এই যে রাধিকা না আদরি, আদরি না শিশুবালা, শিশুবালা না ভুতি, এত নামেই তো ঘোঁট পাকিয়ে যাবে। সে জিজ্ঞেস করল,ভোটের কার্ড আছে, ছবিওয়ালা?

আছে’। বলেই রাধিকা নিজে গেল ভিতরে। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকল আর সকলে।


রাধিকা ঢুকল যে ভিতরে, আর বেরোয় না। ভোটের ছবি তো শুধু তার নেই, আছে আদরির স্বামী নিতাই দাসের, তার বাবা নিরাপদ দাসের, শাশুড়ি মিনু দাসের। সে ঘরের অন্ধকারে ঢুকে নিঃশব্দে কাঁদতে লাগল। কেন কাঁদছে? আদরি কোথায় আর? নেই। কানু-ভানুর বাপ? নেই। রাধিকা আঁচলে চোখ মুছতে লাগল। তার পর তোরঙ্গ থেকে ছবির খামটা বের করে থম মেরে বসে থাকল। কী হবে দেখিয়ে? দেখে ওরা কী করবে? সবাইকে খুঁজে দেবে?

বাইরে থেকে ডাক এল সার্ভেয়রের, কী হল রাধিকা?

রাধিকা বেরিয়ে এল অনেকগুলো ভোটের কার্ড নিয়ে। কিছুই ফেলতে নেই, তাই রাখা। প্যাকেট ধরে সার্ভেয়রের হাতে দিয়ে দিল। সার্ভেয়র খাম থেকে ভোটার পরিচয়পত্রগুলো বের করে দেখতে লাগল। কার্ড মেলাতে মেলাতে জিজ্ঞেস করল, কই, তোমারটা কই ও রাধিকা? আছে দেখে নাও ছায়েব। এইটা! চেনা যাচ্ছে না, কম বয়সের তো, কিন্তু এ তো পঞ্চি দাস। রাধিকা বলল, আমি। তুমি কী করে হলে? আদরি, শিশুবালা, রাধিকা, ভুতি কেউ নেই যে!

পঞ্চি আছে। রাধিকা ঘড়ঘড়ে গলায় বলল, ‘‘চার মেয়ের পর আমি পাঁচের পাঁচ, দিদিরা ডাকত পঞ্চি। এডা সেই নাম।’’ কথা শেষ করতে করতে রাধিকার সব মনে পড়ে গেল। এক দিদির নাম ঘটি, অন্য জনের নাম বাটি, আর এক দিদির নাম খুনতি, পরের জনের নাম চায়না। আর মেয়ে চায় না বাপ মা। তবু কিনা মা আবার পেটে ধরল, কাঁদতে কাঁদতে মানত করল, আর না ঠাকুর, মেয়ে আর না। হল মেয়েই। মা নাম দিল আন্না। বাপ ডাকত ভুতি, রংটা খুব কালো কিনা। কিন্তু দিদিরা বলল, ও সব না, ও হল গিয়ে পাঁচের পাঁচ পঞ্চি। সেই পঞ্চি নামটা বাদ যাবে কেন? ভোটের ছবি তুলতে এলে ওই নামটা বলে দিয়েছিল ছবিওয়ালাদের। দিদিরা অত আদর করে নাম দিল। থাকবে না হুজুর! ঘটি বাটি দিদিরা সব স্বামীর হাত ধরে, জুটিয়ে নেওয়া পুরুষ মানুষের হাত ধরে কোথায় কোথায় চলে গেল। তমলুক গেল, বাসন্তী গেল, উলুবেড়ে গেল। শেষের জন চায়না দিদি যে গেল কোথায় কেউ জানে না। কেউ বলত কলকাতায় দেখেছে, কেউ বলত হাওড়াহাটে দেখেছে। কেউ বলেছিল চায়নার গা ভর্তি সোনার গয়না। হাত ঝুমঝুম পা ঝুমঝুম করতে করতে ট্যাক্সিতে গিয়ে উঠল।

সার্ভেয়র বলল, এইটা তা হলে তোমার পরিচয়পত্র? হাঁ বাবু। গোমস্তার রসিদে রাধিকা, রেশন কার্ডে ভুতি, ভোটের কার্ডে পঞ্চি— কী হবে তোমার? রাধিকা বলল, তোমার খাতায় আন্না লেখ ছায়েব, আদরি লেখ দাগ খতেনে।

সার্ভেয়র হাসে। বলে, সব আলাদা আলাদা?

আলাদা কেন ছায়েব। নাম তো আমার। সব নামই তো আমার বটে। তখন আমি ছোট ছিলাম, এই গেঁড়া এইটুকুন। মা ঠেলে দিয়ে বলত আন্না, দিদিরা টেনে লিয়ে বলত আন্না না পঞ্চি। পঞ্চি ও পঞ্চি। তা শুনে ঠাকমা বলল, পাঁচি। সেডাও আমার নাম।

শুনতে শুনতে প্রৌঢ় সার্ভেয়রের মুখে কৌতুকের হাসি জেগে উঠল। কিছুই নেই, থাকে পি ডব্লউ ডি-র জমি দখল করে ঝুপড়ি বানিয়ে। কিন্তু নামের কত বাহার! এক এক জায়গায় এক এক নাম। যেন পাঁচ সাতটা, দশ বিশটা, হাজার লক্ষ লোক। সবার আলাদা কাগজ। সার্ভেয়র বলল, ঠিক আছে, দেখা হল, এ বার যাই। কিন্তু এ ভিটে তো থাকবে না রাধিকা কুইলা, রাস্তা ডবল হবে দু’পারেই, রাস্তায় পড়ে যাবে এ ঝুপড়ি।

কথাটা বলেই দিল বহু দিনের পুরনো সার্ভেয়র। এই রকম সে কত বলেছে। লুকিয়ে মিথ্যে আশ্বাস দিয়ে লাভ কী? বরং আগে জেনে নিয়ে বুক বাঁধতে পারবে। কত ঘর কত বাড়ি, জোত জমি, বাগান পুকুর সে দখল নিয়ে দিয়ে দিয়েছে বড় বড় কাজে। টাউন হল, রাস্তা হল, ব্রিজ হল, হোটেল, হাসপাতাল— সব হল। কারখানা হল আবার বন্ধও হয়ে গেল। বন্ধ্যা জমি পড়ে থাকল ঘাসবন হয়ে। কাজ তবু চলছেই। আকাশ ছোঁয়া বাড়ি হচ্ছে, বড় বড় পার্ক হচ্ছে, মোটর রেসের ট্র্যাক হচ্ছে, গল্ফ খেলার মাঠ হচ্ছে— জমি কত লাগবে! সার্ভেয়রের কাজটা তাকে করে দিতে হবে। রাধিকা কুইলাকে কথাটা বলে সে সিগারেট ধরায়। দেখল গগন আর রাধিকাকে। তাদের পিছনে ঝুপড়ি ভিটে বাড়ি। আষাঢ় গেছে, শ্রাবণ গেছে, ভাদ্রও গেছে। তার আগে বোশেখ গেছে, জষ্টি গেছে। এ বার খুব রোদ হয়েছিল, তেমন বৃষ্টি হয়নি। কিন্তু ঘরের চেহারা তাতেই দুমড়ে-মুচড়ে বেঁকাচোরা মানুষের মতো হয়ে গেছে। চাল নেমে এসেছে অনেক। চালের খড় ভাদ্রের বৃষ্টিতে পচে আশ্বিনের রোদে ঝরে পড়ছে একটু একটু করে। ভিটের সামনে উবু হয়ে বসল গগন আর রাধিকা। নেড়েচেড়ে হাতের কাগজ, পুরনো পাট্টা, খতেন, গোমস্তার রসিদ, ভোটার পরিচয় পত্র দেখছে। ভাল করে বুঝে নিচ্ছে।

গগন ডাকল, ছায়েব, সত্যি রাস্তা এসে যাবে ঘর পর্যন্ত? হ্যাঁ, মাপে আসবে, পিছনেও যাবে মাপ। রাধিকা বলে উঠল, আসবে আসবে, আমার বাপ ছায়েব মণ্ডল বলত, যা হবার তা হবে, তারে কেউ ঠেকাতি পারবে না। গগন চুপ করে থাকল। সায় দিল না রাধিকার কথায়।

সার্ভেয়র বলল, ওহে সায়েব মণ্ডলের মেয়ে, এত নাম না বলে বলো, ডটার অব সায়েব মণ্ডল। রাস্তা এসে যাবেই, রাস্তা আটকাবে কে?

রাধিকা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। গায়ের আঁচল সামলে নিয়ে এগোল সামনের দিকে। এগোতে এগোতে বলল, হ্যাঁ, ছায়েব মণ্ডলই তো আমার বাপ। বাপ বলত ভুতি, মা বলত আন্না, দিদিরা বলত পঞ্চি, জেঠিমা বলত আন্না না কান্না, মেয়েছেলে মানেই কান্না...। বলতে বলতে ফুঁপিয়ে উঠল রাধিকা কুইলা। কেঁদে উঠল চাপাগলায়। কাঁদতে কাঁদতে বলল, আমার কত নাম ছেল, আমার বাপের নাম ছায়েব ছেল, হাজুও ছেল, ঘটি বাটি দিদি ছেল গো, আদরি শিশুবালা নাম ছেল গো...!

কাঁদল রাধিকা। ভিটে চলে যাবে আবার তাই কাঁদল, নাকি যাদের জন্য কাঁদল তাদের সে পেটে ধরেছিল বলে কাঁদল। সবাইকে যেন নিজের পেটেই লালন করেছিল এক দিন। মা বাপ স্বামী পুত্তুর, আদরি, শিশুবালা, পঞ্চি, আন্না, ভুতি— সবার জন্য সে কাঁদতে লাগল শরীর মুচড়ে মুচড়ে। শূন্য গর্ভে দুটি হাত রেখে ধুনকের মতো বেঁকে যেতে লাগল।

সার্ভেয়র চলে যাচ্ছিল। বাঁশের সাঁকো পার হয়ে হাইওয়েতে উঠে পিছনে ফেরে সে। আশ্বিনের পৃথিবী। কাশের বনে ঢেউ। রাধিকা কুইলা একা দাঁড়িয়ে আছে তার ভিটের সামনে। সার্ভেয়র অবাক হয়ে দেখল রাধিকা কুইলার পিছনে যেন ছায়া ছায়া মানুষ। মেঘের মতো ভেসে আছে তারা ভিটের শূন্যতায়। চালচিত্রে আদরি, শিশুবালা, ভুতি, পঞ্চি, আন্নারা সবাই। কত জন! একা সবাইকে ধারণ করে রাধিকা কুইলা চেয়ে আছে কোন মুখপানে কে জানে! চালচিত্রের ছায়ায় ঢেকে যায় এই চরাচর।


লেখক পরিচিতি
অমর মিত্র

জন্ম :৩০ আগস্ট, ১৯৫১।
বাংলাদেশের সাতক্ষীরার কাছে ধুলিহর গ্রামে | বিজ্ঞানের ছাত্র | কর্ম পশ্চিমবঙ্গ সরকারের এক দপ্তরে | তিনি ২০০৬ সালে ধ্রুবপুত্র উপন্যাসের জন্য সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার পেয়েছেন।

প্রকাশিত বই
পাহাড়ের মত মানুষ, অমর মিত্রের শ্রেষ্ঠ গল্প, অর্ধেক রাত্রি, ডানা নেই উড়ে যায়, ধুলোগ্রাম, অশ্বচরিত, আগুনের গাড়ী, ধ্রুবপুত্র, নদীবসত, কৃষ্ণগহ্বর, আসনবনি, নিস্তব্দ নগর, প্রান্তরের অন্ধকার, ভি আই পি রোড, শ্যাম মিস্ত্রী কেমন ছিলেন, গজেন ভূঁইয়ার ফেরা, জনসমুদ্র, সবুজ রঙের শহর, সমাবেশ, সারিঘর, সুবর্ণরেখা, সোনাই ছিলো নদীর নাম, হাঁসপাহাড়ি।
পুরস্কার : সাহিত্য একাডেমী।

২টি মন্তব্য: