রবিবার, ৫ জানুয়ারী, ২০১৪

তারা টিভিতে প্রদত্ত গল্পকার--ঔপন্যাসিক অমর মিত্রের সাক্ষাৎকার

অমর মিত্র

আজকে এমন একজন লেখককে পেয়েছি যিনি খুব জনপ্রিয় লেখক—বাঙালী তাঁর বই পড়ে। এবং অনেকগুলি বই শুধু তিনি লেখেননি--তিনি অনেক পুরস্কার পেয়েছেন এই লেখার জন্য—স্বীকৃতি পেয়েছেন সেই লেখার জন্য। তিনি অমর মিত্র।
অমর মিত্রর পরিচয়টা আগে দেই—তিনি জন্মেছিলেন বাংলাদেশের সাতক্ষীরায়—জন্মেছিলেন ধুলিহর গ্রামে। চমৎকার দুটো নাম—সাতক্ষীরা এবং ধুলিহর। উনি রসায়ন শাস্ত্রের সম্মানিক। তারপরে যে বইগুলি তিনি লিখেছেন –যেমন ধরুন বিষয়টা কি—তিনি বঙ্গোপসাগরের পড়ে থাকা মৎসজীবীদের চরে রাষ্ট্রের আগ্রাসন এবং উচ্ছেদ নিয়ে উপন্যাস লেখেন, তেমনি লেখেন ২০০০ বছর আগের ভারত বর্ষের উজ্জ্বয়িনী নগর নিয়ে। ভূমিকম্প পীড়িত লাতুর তাঁর বিষয় হয়ে ওঠে যেমন তেমনি সামান্য গৃহনির্মাণের বিন্দুতে সিন্ধু দর্শন করতে পারেন। কি কি পুরস্কার তিনি পেয়েছেন--

১৯৯১ সালে সমরেশ বসু পুরস্কার,
ছোটো গল্পের জন্য সমতট পুরস্কার,

১৯৯৮ সালে ছোটো গল্পের জন্য সর্বভারতীয় কথা পুরস্কার,
২০০১ সালে বঙ্কিম পুরস্কার,
২০০২ সালে আনন্দ বাজার স্নো-স্লেন পুরস্কার,
২০০৬ সালে ধ্রুবপুত্র উপন্যাসের জন্য সাহিত্য একাডেমী পুরস্কার।
তাঁর গল্প হিন্দি, মালায়ালাম, তামিল, ইংরেজি ইত্যাদি নানান ভাষায় অনুদিত হয়েছে।

আরেকটি বই দেখুন আশ্বচরিত, আরও একটি বই—খুব বিখ্যাত বই—ধনপতির চর—নিশ্চয়ই পড়েছেন বইটি। এই বই মেলায় বেরিয়েছে-নীল যমুনার জল।

অমর মিত্রের আরেকটি পরিচয় হচ্ছে যে ওঁর দাদার নাম আমরা সবাই জানি-- মনোজ মিত্র। দাদা-ভাইয়ে মিলে লিখেছেন-ভাসিয়ে দিয়েছি কপোতাক্ষের জলে।
আমি প্রথমেই অমর বাবুকে একটা প্রশ্ন করব—সেটা হচ্ছে যে এতো বছর লেখক জীবন পেরিয়ে এসে যখন পেছন ফিরে তাকান, আপনার অনেক স্ট্রাগল—অনেক লড়াই, লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়া তো অতো সহজ নয়—যারা একটু লেখাপড়া করেন তারা জানেন। তো আপনি কি ভাবেন যে আপনার এই লেখক জীবন কেমন আপনার কাছে?

অমর মিত্র : আমার তো মনে হয়—মধুর। এই কারণে যে মনে হয় একজন লেখক যদি স্ট্রাগল না করেন—তার লেখার জন্য তার সামনে যদি কোনো প্রতিবন্ধকতা না আসে—তাহলে কিন্তু লেখক স্ফুরিত হতে পারেন না। আমার কাছে যদি সব সুযোগই চলে আসে তাহলে শেষ অব্দি লেখার জন্য আমার যে পরিশ্রম—আমার যে ঐকান্তিক চেষ্টা এবং বারবার ভালো লেখার জন্য মাথাখুড়ে মরা এই জিনিসটা থাকে না।

যেমন ধরুন অল্প বয়সে আমি যাদের সঙ্গে মিশেছি এবং তাদেরও যেমন একজন শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় এবং আরেকজন মহাশ্বেতা দেবী—এঁদের দেখেছি। মহাশ্বেতা দেবীকে দেখেছি। উনি চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন। অনুবাদ করে সংসারের ব্যয় নির্বাহ করতেন। নানান রকম কাজ করেছেন। অক্সফোর্ডে অনুবাদ করেছেন। এখানে ওখানে অনুবাদ করেছেন। প্রচুর লিখেছেন ছোটো কাগজ বড় কাগজে মিলে। ছোটো কাগজে লিখেও যে বড় লেখক হওয়া যায়—সেটা মহাশ্বেতাদি দেখিয়ে দিয়েছেন। ফলে প্রথম জীবনে তাঁর সঙ্গে মিশে—এই ব্যাপারটি ভিতরে তৈরী হয়েছিল—কখনো ভয় পাইনি।


রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় : মানে লেখক হতে গেলে কি কি স্যাক্রিফাইস করতে হবে—সেটা আপনি জেনে--

অমর মিত্র : আমি জেনে গিয়েছিলাম। ধরুন, আনন্দবাজারে আমি একবার উপন্যাস লিখেছি। এবং সে উপন্যাস প্রবল বিজ্ঞাপনে ছাপা হয়েছিল। সাত লেখকের উপন্যাস ছাপা হছে—সাতজন লেখকের ছবি টবি দিয়ে আনন্দবাজার বিজ্ঞাপন করেছিল। তারপর তারা আমাকে আর লিখতে বলেনি। গল্প লিখেছি অনেক অনেক রকম। রমাপদ বাবু আমাকে পছন্দ করতেন। বারবার ডেকে পাঠাতেন--সেটা অন্য প্রশ্ন। কেনো লিখতে বলেননি—সেটা সম্পাদকের ব্যাপার। সম্পাদকের কাউকে পছন্দ হতে পারে—অপছন্দ হতে পারে। এটা নিয়ে কোনো মান অভিমানের ব্যাপার নেই। কিন্তু তারপরেও আমি উপন্যাস লিখেছি। সত্যযুগ কাগজে। তারপরে তখন ছোটো সাহিত্য পত্রে।

রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় : এটা কোথায় লিখেছেন—এই ধ্রুবপুত্র?

অমর মিত্র :  ধ্রুবপুত্র সেই অর্থে কোথাও বের হয়নি। টুকরো টুকরো করে এখানে ওখানে গল্প হিসেবে নানান জায়গায় বেরিয়েছে। সব জুড়ে আমি ধ্রুবপুত্র করেছি।

রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় : সেটা একাডেমী পুরস্কার পেয়েছে।

অমর মিত্র : হ্যাঁ। এই ধনপতির চরটার একটা অংশ প্রতিদিন পত্রিকায় বেরিয়েছিল প্রথম পর্ব হিসেবে। বাকি ৬টা পর্ব –সবটাই আমার পান্ডুলিপি থেকে বইয়ে গেছে।

রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় : আপনি তো নিয়মিত পূজা সংখ্যায় লেখেন।
অমর মিত্র :

রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় : আর নীল যমুনার জল?

অমর মিত্র : নীল যমুনার জল গতবার শারদীয় প্রতিদিনে লিখেছিলাম বড় গল্প হিসেবে। অশ্বচরিত উপন্যাসটি ১৯৮১ সালে শিলাদিত্য পত্রিকায় বের হত। সূধীর চক্রবর্তী তখন সম্পাদক ছিলেন শিলাদিত্যের। উনি তখন আমাকে একটা নভেলেট লিখতে বলেছিলেন। তখন আমি একদমই নতুন। নানান জায়গায় লেখা নিয়ে গিয়েছি। এমনও দেখেছি লেখা জমা দিয়েছি। তারপরই অন্য জায়গায় ঘুরে এসে দেখি আমার লেখাটি ওয়েস্ট পেপার বাস্কেটে ফেলে দিয়েছে। কিন্তু এটা হচ্ছে জীবনের একটা অংশ। কখনো দমিনি।
আমার স্ত্রী—তখন আমি নতুন বিয়ে করেছি। একটা গল্প—গল্পটি ভালো, সেই গল্পটির পরে নাম হয়েছিল, সেই গল্পটি একটি বিখ্যাত পত্রিকায় দিয়েছিলাম। সাত দিনের মধ্যে খাম বন্দি হয়ে বাড়িতে ফেরত এসেছিল। সে তো এই ব্যাপারটি জানেই না—ভাবে লেখা দিলেই বুঝি ছাপা হয়। ফেরত আসায় সে খুবই দুঃখিত হয়েছিল। আমি তাকে বলেছিলাম—এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। ওরা ছাপায়নি। অন্য জায়গায় ছাপা হবে। কারও কোনোটা পছন্দ হয়—আবার কারো কোনোটা পছন্দ হয় না। এতে মান-অভিমানের কাজ নয়। লেখকের মান-অভিমান কেউ দেখবেও না। আমাকে আমার মত কাজ করে যেতে হবে। এবং আমি যদি ভালো লিখতে পারি তাহলে ৫ জন পড়বে। আর না লিখতে পারলে আমার কী হবে? পাঠক হয়তো আজ পড়ল। কালকে ফেলে দেবে। এ রকম অনেক দেখেছি। আমাদের সঙ্গে যারা নিয়মিত লিখত এমন অনেকে ছিল—আস্তে আস্তে সরে গেছে তারা। তারা কতজন! সেই সব বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হয়। তাদেরও বয়স হয়ে গেছে এখন। ফলে এই নিয়ে...এটা তো ন্যাচারাল একটা ব্যাপার।

রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় : আপনি কি এখনো চাকরি করেন?

অমর মিত্র : হ্যা, আমি চাকরি করি। সামান্য কদিন আছি।
রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় : চাকরির পরে আপনি কি সম্পূর্ণভাবে লেখা নির্ভর হবেন?
অমর মিত্র: নিশ্চয়ই। তখন আমি লেখার পিছনে প্রচুর সময় ব্যয় করব।

রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় : আপনি কত সময় লেখেন আপনি?
অমর মিত্র : ধরুন আমি বাইরে চাকরি করেছি বহুদিন। একা একা থেকেছি। ধরুন শালতোড়া নামে বাঁকুড়ার একটা নির্জন জায়গা—পাহাড়ি এলাকা, সেখানে একা একা থাকতাম। ওখানে আমাকে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়তে হত। এবং আমি একটু তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ি। অনেক ভোরে উঠি।
রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় : এখনো সেটা করেন?

অমর মিত্র : হ্যা, সেই অভ্যাস এখনো রয়েছে। আমার বন্ধু-বান্ধবেরা এটা জানে। কেউ ১০টার পরে আমাকে ফোন করে না। এবং কারো যদি বিশেষ প্রয়োজন হয় ফোন করার তাহলে প্রথমে জিজ্ঞেস করে নেয়—আপনি কি শুয়ে পড়েছেন? প্রথম প্রশ্নটা হল এইটা। আমি একটা নিয়ম মেনে চলি এবং আপনি যদি সকাল বেলায় ঘণ্টা তিনেক লিখতে পারেন ঘণ্টায় যদি আপনি তিন পাতা লেখেন ধরুন আপনি ১০০০ শব্দ লিখলেন, তাহলে ৩৬৫ দিনের মধ্যে যদি আপনি ২০০ দিন লেখেন—কত শব্দ লেখা হচ্ছে? রেগুলার লিখলে তো ব্যাপার না। আমাকে একদিনে ২৪ ঘণ্টা লিখতে হবে—১৮ ঘন্টা লিখতে হবে—তা করতে হয় না।
রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় : তাহলে কি আমি এই প্রশ্ন করতে পারি যে পূজোর সময় আপনার অতো চাপ থাকে না?
অমর মিত্র : অতো চাপ থাকে না। আমি তো সারা বছরই লিখি।
রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় : আপনি সারা বছরই লেখেন এবং একটু একটু লিখে যান।

অমর মিত্র : একটু একটু লিখে যাই। পূজার সময় খুব বেশি চাপ তৈরী হয় না।
রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় : আচ্ছা। আপনি কি রকম বিষয় নিয়ে লেখেন—আপনি যখন একটা উপন্যাস নিয়ে ভাবছেন, কিংবা একটা ছোটো গল্প ভাবছেন। আপনি নাটক লেখেন?
অমর মিত্র : আমি নাটক খুব অল্প বয়সে লিখেছিলাম সে অর্থে আমি মৌলিক নাটক লেখার কথা ভাবি নি।

রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় : ...ওটা দাদার ব্যাপার...

অমর মিত্র : ... ওটা দাদার (মনোজ মিত্র) ব্যাপার। আমি অল্প বয়সে নিজের গল্পের নাট্যরূপ দিয়েছি, আন্তন চেখভের একটি গল্পও নাটকে পরিণত করেছিলাম, অল্প বয়সের সাহস, চেখভ নিজেই কত বড় নাটককার, নান্দীকারের নাটক মঞ্জরী আমের মঞ্জরী বার তিনেক দেখেছি তখন। পরে বুঝেছি আমার জায়গা নয় ওটা।
রেডিওর জন্য আমার নিজের দুটি গল্পের নাট্যরূপ দিয়েছিলাম। ছোটদের নাটক দু তিনটে লিখেছি। বুঝেছি নাটকটা মঞ্চের সঙ্গে জড়িত না থাকলে হয় না—নাটক একটা আলাদা ফর্ম—ফলে সেই ফর্মটা আমার কাছে লেখার সময়ে আসে না। ফলে ওখানে আমার শুধু শুধু মাথা গলিয়ে কোনো লাভ নেই।
রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় : আপনি ছোটো গল্প লেখেন। আপনি উপন্যাস লেখেন। কবিতা লেখেন না।
অমর মিত্র : কবিতা লিখি না। এমনি নানান রকম ফিচার লিখি।
রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় : এই যে আপনি আসলে একটা উপন্যাস লিখছেন, এই উপন্যাসটা কি হবে শেষমেষ আপনি কি আগে থেকে জানেন? না, উপন্যাসটা নিজে নিজে, মানে আপনা আপনি হয়ে যায়? কিভাবে লেখেন?

অমর মিত্র : উপন্যাস আগে থেকে কখনই জানা সম্ভব নয়। এটা নিয়ে আমি দিল্লীতে একবার সাহিত্য একাডেমির একটা প্রোগ্রামে গিয়েছিলাম। গঙ্গাধর গ্যাডগিল—বিখ্যাত সম্মাননীয় মারাঠি লেখক—তার সঙ্গে এ নিয়ে মত বিরোধ হয়েছিল—তখন আমার অল্প বয়স, তিনি প্রবীন, আমি বলেছিলাম আমার কথা—তিনিও বলছেন, একটু বাক-বিতণ্ডার মত হয়েছিল, তাঁর কাছে আমি মার্জনা চেয়েছিলাম। তিনি বলেছিলেন—না না তোমার যেটা বলার তুমি সেটা বলেছো—উনি বলেছিলেন, পুরো উপন্যাসটা ছকে নিতে হবে, তাহলে তোমার পক্ষে লিখতে সুবিধা হবে। আমি বলেছিলাম, স্যার, পুরো উপন্যাসটি ছকে নেই তাহলে আমি লিখবটা কী? তাহলে আমার লেখাটা কী হবে? আমি যে লিখব, আমার কলম দিয়ে যে লিখিয়ে নেবে—আমি লিখতে লিখতে নতুন কথা—যেগুলো আমি ভাবিনি, হয়তো আমার অবচেতনায় আছে, মানে অনাবিস্কৃত ভূখণ্ডটাকে যে আমি বের করব, জীবনের অনেক আলোছায়া যা আমি জানি না বা ভাবিনি সেই অংশ যে চলে আসবে, চরিত্র বদলে যাবে—সবটা ভেবে নিলে এটা কী করে হবে?

রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় : সবটা না ভাবলেও কি আপনি স্ট্রাকচারটা ভাবেন না?
অমর মিত্র : অল্প স্বল্প করে ভাবি। কিছুটা ভাবি, স্ট্রাকচারটা মানে ভাবা কি রকম হয়—হয় না অনেক সময়। ধরুন আমি একটা উপন্যাস লিখেছিলাম ৭৫ পাতার মত—লিখলাম—পূজা সংখ্যার জন্য লিখেছিলাম। আমার এক বন্ধুর বাড়িতে গিয়ে পড়লাম। পড়া টড়ার পরে সে আমাকে প্রশংসা করল। বিষয়টার জন্য ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি নিজে পড়তে গিয়ে বুঝলাম হয় নি। হয় নি। পরের দিন সকাল থেকে নতুন করে লিখতে শুরু করলাম, নতুন লেখা। ওই ৭৫ পাতা ফেলে দিতে হল, নতুন লেখার বীজ ওই লেখাতেই ছিল এটা সত্য। একটু একটু করে আবার লিখতে আরম্ভ করলাম। এবং ওখানে যে প্রথম চ্যাপ্টারটা লিখেছিলাম, সেই প্রথম চ্যাপ্টারটাই পরে পুরো একটা উপন্যাস হয়ে প্রতিদিন পুজা সংখ্যায় ধনপতির চর নামে ছাপা হল একটা পর্ব। প্রথম যে আমি ৫ পাতার যে চ্যাপ্টার লিখেছিলাম—সেই যে বীজটা রোপণ করেছিলাম, সেই বীজটা দিয়ে পুরো একটা ৮০ পাতার লেখা প্রথম পর্বটা হয়েছিল—এই ধনপতির চরের।
রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় : (ধনপতির চর বইটা সামনে এনে) বুঝলাম। আর বাকিটা হল আরেকটা উপন্যাস।

অমর মিত্র : বাকিটার কিছু হয়নি। তার পরে ওই যে বীজটা প্রথমে এগুলো আস্তে আস্তে—টুকরো টুকরো করে লিখতে লিখতে ধনপতির চর লেখা হয়েছিল। বছর তিনেক লিখতে লিখতে পুরো ধনপতির চরটা লেখা হয়েছিল।

রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় : আচ্ছা, আপনি এই বছর তিনেক ধরে এতো উপন্যাস লিখছেন—টুকরো টুকরোভাবে লিখছেন—এতে আপনার জোড়া লাগাতে অসুবিধে হয় না?
অমর মিত্র : না, টুকরো টুকরোভাবে আমি উপন্যাসটা আমি টানা লিখেছি। এবার যদি ছাপার সুযোগ এলো কোনো পত্রিকার তরফ থেকে—প্রথম একটা অংশ জুড়লাম, জুড়ে ছাপতে দিয়ে দিলাম। তারপর সেটা কেটে জুড়ে দিলাম—বই করার সময় সেটা অসুবিধে হয় না। এই ধ্রুবপুত্র লিখতে আমার ৭ বছর লেগেছিল। ১৯৯৪ আরম্ভ করেছিলাম। ২০০০ সালের শেষের দিকে এটা শেষ হয়েছিল।
এবং উজ্জয়িনীতে আমি অনেকবার গেছি। উজ্জয়িনীতে গিয়ে অদ্ভুত একটা ব্যাপার ঘটে—উজ্জয়িনীতে যাওয়ার আগে আমি ভাবতাম যে কালিদাসের মেঘদূতম কাব্যের উজ্জয়িনী নগরের বোধ হয় কোনো অস্ত্বিত্ব নেই।
রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় : এর বিষয়টা কি? আপনি তো উপন্যাস লিখেছেন।।
অমর মিত্র : বিষয় কিছু নয়—বিষয় খুব সামান্য। আমি উজ্জয়িনীতে বেশ কয়েকবার গিয়েছি, আমি উজ্জয়িনীতে আমি শীতে গেছি, গ্রীষ্মে গেছি—বর্ষায় গেছি—আগস্ট মাসে গেছিলাম, এবং ওখানে শুনি—ওখানে আমার যারা আত্মীয়স্বজন আছেন মানে আমার বিবাহ সূত্রে স্ত্রীর আত্মীয়রা আছেন, তারা বলেছেন যে ওখানে ১৪ ইঞ্চি বৃষ্টি হয় সারা বছর। এবং মিউনিসিপালিটি গরমের সময় তিনদিন অন্তর জল সাপ্লাই করে। আমরা থাকি টালায় আমার বাড়িতে। এখানে ২৪ ঘণ্টা জল থাকে। উজ্জয়িনীর এ রকম জলের কষ্ট দেখে অবাক হয়েছিলাম। কালীদাসের কাব্যে যে নগরের মাথায় এসে মেঘ বিশ্রাম নিয়েছিল অলকাপুরী যাওয়ার পথে, কী অপূর্ব ছিল সেই বর্ষার বর্ণনা, সেই নগরের মহাকাল মন্দিরের সামনে দাঁড়িয়েছি, সে মহাকাল মন্দিরের মাথায় মেঘ এসে দাঁড়াল—সেই উজ্জ্বয়িনীর এই অবস্থা, তখন আমি ভাবলাম যে আমি তো এমন একটা উপন্যাস লিখতে পারি যা মেঘদূতের এন্টি থিসিস হবে। মেঘদূতে যে সেই বর্ষার বন্দনা আছে—এই নগরটা এখন আদতে তো খরায় পুড়ছে, এবং খরা পীড়িত এই নগর—এবং প্রাকৃতিক যে দূর্যোগ। এখন তো দেশের মধ্যে নানান রকম দূর্বিপাকে দেশের মধ্যে গণ্ডগোল ইত্যাদি ইত্যাদি নানান রকম হয়—রাষ্ট্র—সরকারও ভেঙ্গে যায়—কিন্তু প্রাকৃতিক দূর্বিপাক একটা বড় ব্যাপার ছিল, এবং বহিঃশত্রুর আক্রমণ, তাতে সরকার বদল হত। এই খরা পীড়িত উজ্জ্বয়িনী নগরকে নিয়েই উপন্যাসটা।
রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় : খরা পীড়িত একটা নগরকে নিয়ে একটা উপন্যাস লিখলেন যেটা কালীদাসে এন্টি থিসিস। অর্থাৎ এটাকে দ্বিতীয় মেঘদূতও বলা যেতে পারে। মেঘ দূত—মানে মেঘ যেহেতু নেই...

অমর মিত্র : মেঘ একদম শেষে আছে। একদম শেষে বৃষ্টি এলো। এখানে কালীদাসই ধ্রুবপুত্র। আমি কালীদাসের নাম ব্যবহার করিনি। পুরো কাহিনীটাই আমার তৈরী করা। এ কাহিনীর মধ্যে কোনো ইতিহাস নেই।
রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় : তাহলে এক অর্থে কালীদাসই এই উপন্যাসের নেপথ্যের নায়ক?
অমর মিত্র : হ্যা। এবং উপন্যাসে শেষে সেই কবি ফিরছেন—ফিরে যখন মেঘদূত পাঠ করছেন—কবি সেই কাব্যটা নিয়ে নগরে ফিরছেন। কবির নির্বাসনে নগর পুড়ছিল। কবি ফিরে এলেন। নগরে বৃষ্টি আসছে। কবির নির্বাসন মানে নগর থেকে জ্ঞানের নির্বাসন। জ্ঞানের নির্বাসন মানে মেঘ বৃষ্টি এই সবের নির্বাসন।

রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় : চমৎকার বলেছেন। এর সঙ্গে আমার শেলীর কথাটা মনে করিয়ে দিল—পোয়েটস আর আন একনলেজড লেজিসলেটর অফ দি ওয়ার্ল্ড। কবিরাই এই পৃথিবীর শাসক। এই কবিরাই এই পৃথিবীকে চালাবে। কবিরাই এই পৃথিবীতে শান্তির বারী নিয়ে আসবেন। এবং এই নিয়ে সেই উপন্যাস ধ্রুব পুত্র।

রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় : দাদা মনোজ মিত্র এবং ভাই অমর মিত্র দুজনে মিলে একটি বই লিখেছেন—ভাসিয়ে দিয়েছি কপোতাক্ষের জলে। এই বইটি কিভাবে লেখা হল?
অমর মিত্র : বইটা লেখা হল মানে কি-- আমার দাদা ছেলেবেলায় আমাদের যে গ্রাম ধুলিহর সেখানে উনি অনেকদিন কাটিয়েছেন। এবং আমার ঠাকুরমার খুব প্রভাব আমার দাদার উপরে আছে। আমাদেরও ঠাকুরমার কথা মনে আছে। তিনি এক অদ্ভুত তেজিয়ান মহিলা ছিলেন—তেজোস্বিনী যাকে বলে। তিনি যেমন কি দেশভাগের পরে এপারে এসে কোনোদিন আর মা দুর্গার মুখ দেখেননি। মণ্ডপে যেতেন। কিন্তু দুর্গার মুখ দেখার আগে নিজের ঘোমটাটা টেনে দিতেন। তার এতো অভিমান ছিল যে মা দুর্গা এই পার্টিশনটা রোধ করতে পারেননি। দাদার যে মেমোয়ারস—দাদার যে স্মৃতিকথা এর মধ্যে এই সমস্ত আছে।
আমি তো স্বাধীনতার পরে জন্মেছি ১৯৫১ সালে। কিন্তু আমিও-- ছেলেবেলায় ওখানে আমাদের যাতায়াত ছিল, ওই গ্রামে আমিও থেকেছি কিছুদিন। আমার কাকা শেষ অব্দি ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পরে এপারে চলে আসেন। তখনই যোগাযোগটা ছিন্ন হয়। আমি ২০০০ সালে বাংলাদেশ থেকে একটা আমন্ত্রণ পেয়ে গিয়েছিলাম। এবং খুলনার যিনি ডিস্ট্রিক্ট কমিশনার ছিলেন তাকে আমি বলেছিলাম আমাদের বাড়ি আছে ওখানে (ধুলিহরে)। আমার বাংলাদেশের কিছু দেখার দরকার নেই। আমার ঢাকা চট্টগ্রাম কিছু দেখার দরকার নেই। আমার ওই যে ধুলিহর যাকে লোকে বলে ধুরল-এই গ্রামটাকে একটিবার দেখিয়ে দিলে হবে। তিনি ভদ্রলোক, আমার কথা শুনে এতো ইম্প্রেসড হয়েছিলেন যে পরদিন আমাকে গাড়ি টাড়ি ঠিক করে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন-আপনি ঘুরে আসুন। দাদা, আপনাকে ঐ ধুলিহর গাঁ না দেখিয়ে বাংলাদেশ দেখাব না। ওইগ্রামে লোকজন গিয়েছিল। আমার বন্ধুরাও গিয়েছিল—স্বপ্নময় চক্রবর্তী, ভগীরথ মিশ্র—এঁরা অনেকে গিয়েছিলেন। ফিরে আসার পরে অনেক রকম অভিজ্ঞতা হয়েছিল আমাদের। যেমন স্কুলে মাস্টার মশাই আমাদের ডেকে বসালেন। গ্রামের প্রাইমারী স্কুলটা আমার বাবা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি ঐ গ্রামের প্রথম গ্রাজুয়েট ছিলেন। এবং উনি মাস্টার মশাই একটা রেজিস্ট্রার বের করে একটা সিগনেচার দেখিয়ে আমাদের বলেছিলেন-এটা কার সই বলতে পারেন? আমি বাবার সই চিনতে পেরেছি। উনি আরো পুরনো নানান রকম রেজিস্ট্রার বের করে দেখাচ্ছেন। বললেন—এটা কার নাম? দেখলাম ১৯৪৪ সালে ক্লাশ ওয়ানে মনোজ মিত্র নামে ভর্তি হচ্ছেন একজন। বিজয়া মিত্র আমার খুড়তুতু বোন। এই সমস্ত রেজিস্ট্রারগুলো ওরা রেখে দিয়েছেন। এবং আমরা এতো বলি মানুষের এই--তারা খুব—তারা আমাকে অতোটা চেনে না। কিন্তু তারা আমার দাদাকে ভালো চেনেন। তারা খুব গর্ববোধ করে। আমি যে গেছি আমাদের পরিবারের জন্য-সে প্রায় আমাকে তারা বুকে জড়িয়ে ধরে কান্নাকাটি করেছে এই রকম। ওইটা আসার পরে আমি একটা মেমোয়ার লিখেছি--একটা ভ্রমণ কাহিনী প্রতিদিন পত্রিকায় লিখেছিলাম। লেখার পরে সেই বছর হঠাৎ আমার খুব খেয়াল হল--আমি বললাম বড়দা তুমি এটা করবে? তুমি তো এই সব পুরনো কথা ঠাকুরমা-ঠাকুরমাদের নিয়ে লিখেছ। তো একটা ভ্রমণ কাহিনী নিয়ে তো বই হয় না—ছোট্ট ভ্রমণ কাহিনী। তো তোমার ওই লেখাগুলো জুড়ে আমরা একটা বই করি। এটা ২০০১-২০০২ সালে এই বইটা প্রথম বের হয়। তারপরে আমি সেই মেমোয়ারস গুলো নানান জায়গা থেকে যোগাড় করি। আনন্দ বাজারের লাইব্রেরীতে গিয়ে—লাইব্রেরীয়ানের সঙ্গে কথা বলে পুরনো সেই লেখাগুলো যার বেশিরভাগই আমার দাদার কাছে ছিল না।সেই পুরনো লেখাগুলো যোগাড় করে বইটার পরিকল্পনা করি। প্রথম প্রতিক্ষণ থেকে ছাপা হয়। প্রথমে ছোটো আকারে ছিল। তারপরে ইতিমধ্যে আরো অনেক লেখা লিখেছি। সেই গুলো জুড়ে এই দে’জ থেকে এই বইটা বেরিয়েছে।
রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় : এবং বইটা দেখতেও খুব ভালো হয়েছে।

অমর মিত্র : এবং সুন্দর সুন্দর ওই স্মৃতিকথা গুলো আছে
রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় : আমি বইটা থেকে একটু পড়ে শোনাই--
এক জায়গা থেকে আরেক জায়গার দূরত্ব কমে গিয়েছে। ঠাকুরদার বাগানগুলো কাটা পড়েছে। গাছ নেই। তাই বাগানের সেই উচ্চতাও নেই। পৃথিবীটা হঠাৎ যেন তার দৈর্ঘ প্রস্থ উচ্চতা হারিয়ে বসেছে। ফিরিয়ে দাও জেঠা কাকা পিসি ঠাকুরদা ঠাকুরমা কাকী জেঠি নিয়ে এই দালান কোঠা। ভৈরব কপোতাক্ষ বেত্রবতী কুলে এখন কারা মানুষ নই।
চমৎকার। হ্যা, বলুন—

অমর মিত্র : এইটা ঠিক আছে। আমরা দুজনে মিলে পরিকল্পনা করেছিলাম। তবে দাদার লেখাগুলো করে টরে সাজিয়ে গুছিয়ে এই বইটা বের করেছি। কিন্তু এটা একটা—এই বইটা ভালো রেসপন্স করছে। যারাই বইটা কিনেছেন-- পড়েছেন , তাদের অনেকেই ফোন করেছেন। ওরা ভালো বলেছেন। লোকে সংগ্রহ করছেন।
রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় : বাংলাদেশে বইটা ভালো চলবে বলে আমার ধারনা।
অমর মিত্র : আমারও তাই ধারণা
রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় : কারণ বাংলাদেশের অনেক কথা আছে তো।
অমর মিত্র : পুরোটাই বাংলাদেশের কথা--
রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় : আরেকটা বইয়ে আমি চলে যাচ্ছি। অশ্ব চরিত-এই বইটার বিষয়ে একটু বলবেন কি? এটা আপনার নাম করা বই...
অমর মিত্র : এই বইটা কিল্যাণী নাট্য চর্চা কেন্দ্র নাটকও করেছিল। এইটার একটা বিচিত্র বিষয়। দীঘার সমুদ্র তটের একটি ছোটো হোটেলের মালিক এবং ওই যে ওখানে ছোটো ছোটো টাট্টু ঘোড়া নিয়ে ঘুরে বেড়ায়--ওই রকম এক ঘোড়া পালক—একটি ঘোড়াকে দেখভাল করত। সেই লোকটা একজন সর্বহারা একেবারে। বাসের কন্ডাকটর ছিল—বাস এক্সিডেন্ট করে...
রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় : এইটা কি আপনার জানা ছিল একটু?
অমর মিত্র : হ্যা। আমি দীঘাতে ছিলাম...এবং আমার এক বন্ধু ছিল, সে ফরাসি একটি ছেলে। আমার পাশের ঘরে ছিল, সে হিপ্পি—আমি রাত্রিবেলা ফিয়েস্তা রেকর্ড প্লেয়ারে শচীন দেব বর্মন বাজাতাম, জুঁথিকা রায় বাজাতাম। সে এসে ঘর থেকে চুপি চুপি এসে আমার গান শুনত। এবং ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংরেজিতে সে কথা বলত। আমি তখন ফরাসী সাহিত্য সম্পর্কে দুচার কথা বলতাম। আমি ফরাসী সাহিত্য খুব বেশি পড়িনি। সে অবাক হয়ে শুনত। ধরুন বিদেশে গিয়ে আমি কোনো বাঙালী লেখকের কথা শুনে যেই রকম অবাক হব—সেই রকম অবাক হত। শুনে তার গায়ের রোম খাড়া হয়ে যাচ্ছে। আমার সঙ্গে তার এতো বন্ধুত্ব হয়েছিল—সেই ছেলেটি। তো ওখানে সেই অভিজ্ঞতা নিয়েই এই অশ্বচরিত উপন্যাসটি লেখা।
কিন্তু উপন্যাসটির অভিনব বিষয়টা হচ্ছে—যে এর কোনো যুক্তি নেই। একে আপনি যাদু বাস্তবতা বলতে পারেন। যাদু বাস্তুবতা বলেন কি বলেন না সেটা নিয়ে আমার কোনো কথা নেই। ওই যে ঘোড়া পালক লোকটি হচ্ছে-- বুদ্ধ যখন রাজপুত্র যখন সংসার ত্যাগ করে, তপবন অব্দি যান, তার সঙ্গে ছিল তার প্রিয় ঘোড়াটা। ঘোড়াটা হচ্ছে কন্থক। আর সারথী ছন্দক। ও বলে ঘোড়াটা কন্থক। আর আমি ছন্দক। রাজপুত্র ফিরে আসবে—তার জন্য অপেক্ষা করছে। এবং পুরো ঘোড়াটা হচ্ছে অদ্ভুত। দুমাস তিন মাস অন্তর দড়ি ছিড়ে সে পালিয়ে যায়। এবং এই ঘোড়া পালক লোকটি ঘোড়াটাকে খুঁজতে বের হয়। খুঁজতে বের হওয়া মানে আর কিছু নয়—মালিকের কাছ থেকে কিছু টাকা পয়সা আদায় করা। বলে-- একটু পশ্চিমটা একটু ঘুরে আসি। কিছু টাকা দিন।
রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় : ঘোড়াটা পশ্চিমে গেল?
অমর মিত্র : পশ্চিমে গেল মানে টাকা পয়সা নিয়ে অন্য জায়গায় ঘুরে টুরে এলো। কিন্তু ও জানে ঘোড়াটা ঠিক সময়ে ফিরে আসবে। কিন্তু এটা যে-- ঘোড়াটা যায় সেটা হচ্ছে আশ্বিনের পরে যেসময় সুবর্ণ রেখা এবং সমুদ্রের মোহনায় একটা চর আছে, সেই চরে প্রচুর ঘাস হয়। নানান জায়গাতে ঘোড়া লাগিয়ে ওখানে ঘাস খায়। এই বৈশাখ মাসে ঘোড়াটা পালিয়ে যায়। বৈশাখী পূর্ণিমার রাতে ঘোড়াটা পালিয়ে যায়। এবং তাকে কিছুতেই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। পুরো ঘোড়াটাকে খোঁজা নিয়েই উপন্যাসটা। তার মধ্যে এতো ল্যান্ড একুইজিশিন—জমি অধিগ্রহণ, এবং জমি অধিগ্রহণে মানুষের কী হয়, মানুষ কিভাবে ঘর হারায়, মানুষ কিভাবে নিজস্ব গ্রাম হারায়, তার কথা কিন্তু অশ্বচরিতে প্রথম লেখা আছে। জমি অধিগ্রহণ নিয়ে দীর্ঘ একটা অংশ আছে। যেটা হচ্ছে বালিয়া পালে যখন প্রথম রকেট উৎক্ষেপন কেন্দ্র হয়েছিল, তখন যে জমি অধিগ্রহণ হয়েছিল উড়িষ্যায়—সেই বিষয়টা এটার মধ্যে আছে। দীঘাতো উড়িষ্যার বর্ডারে। লোকটি ঘোড়া খুঁজতে খুঁজতে ওখানে চলে যায়। ঘোড়া খুঁজতে খুঁজতে বিভিন্ন জায়গায় যায়। এবং সেখানে গিয়ে বিভিন্ন ঘটনার মুখোমুখি হয়।
রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় : এই ঘটনাগুলি উঠে আসছে।
অমর মিত্র : হ্যা। এই ঘটনাগুলি উঠে আসছে। শুধু উঠে আসা নয়—এই উপন্যাসটি কখনো শেষ হয় না। শেষে ঘোড়াটার কি হয়? ওই ঘোড়াটা বৈশাখি পূর্ণিমার দিনে পালিয়েছিল মানে ঐদিন যেদিনটিতে বুদ্ধ হেসেছিলেন। অর্থাৎ ১৯৯৮ সালের বৌদ্ধ পূর্ণিমার দিনে আপনার রাজস্থানের ক্ষেতলাইয়ে এটমিক বিস্ফোরণ হয়েছিল, সেই রাত্রেই ও পালায়। কিন্তু ঘোড়ার পালানো সময় হচ্ছে শরৎকালে—শরৎকালে পালায়, যখন আকাশ নীল হয়, সাদা মেঘ হয়, বাতাস ঠাণ্ডা হয়। সেই বৈশাখ মাসের দুপুর বেলায় প্রবল মেঘ করে বৃষ্টি হয়। বৃষ্টি হয়ে যাওয়ার পরে বাতাস ঠাণ্ডা হয়ে যায়। আকাশ নীল হয়ে যায়। পুরো শরৎকালের আবহ একরাত্রে ফিরে আসে। ওর মনে হয়—ঘোড়াটার মনে হয় যে এক দিনেই কয়েকটা ঋতু পেরিয়ে সে শরৎকালে পেরিয়ে গেছে। এই যে বিভ্রমটা হয়—এই বিভ্রমেই ও কিন্তু পালায়। পালিয়ে বোঝে সে বৈশাখের মাঝে সে হারিয়ে গেছে। প্রবল বৈশাখ। তার সঙ্গে ওইটাকে মেলানো হয়েছে—উপন্যাসটাকে মেলানো হয়েছে
রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় : এটমিক ইয়েটার সঙ্গে
অমর মিত্র: এটমিক বিস্ফোরণের সঙ্গে মেলানো হয়েছে।
রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় : তার মানে উপন্যাসটিতে একটি পলিটিক্যাল ব্যাপারও এসেছে।
অমর মিত্র : একদম এসেছে।
রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় : তখন তো এটা গোপনে করা হয়েছিল। এটা নিয়ে পাকিস্তানের সঙ্গে অনেক সমস্যা হল।
অমর মিত্র : একদম সেই ব্যাপারটা আছে। এবং শেষ অব্দি ঘোড়াটাকে তো পাওয়া যায় না। ঘোড়াটা যেখানে ডুবে যায়—হিরোশিমায় ঢুকে যায়, সেই সময় হিরোশিমায় ব্লাক রেইন হচ্ছে।
রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় : উফ বাবা। তার মানে হিরোশিমা!

অমর মিত্র: হ্যা। ব্লাক রেইনের মধ্যে ঘোড়াটা পড়ে গেছে। এবং আস্তে আস্তে তার চোখ গলে পড়ছে। এ গলে পড়ছে। সমস্ত দেহটা খসে খসে যাচ্ছে। কিন্তু তাও সে ফেরার চেষ্টা করছে রাজপুত্র গৌতমের কাছে।
রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় : বৌদ্ধ যে অহিংসার--
অমর মিত্র : আমাদের এখানে যে ট্রাজেডি হচ্ছে সে এটম বোমাটা বিস্ফোরণ হয়েছিল তার নাম দেওয়া হয়েছিল বুদ্ধের হাসি। অহিংসার প্রকাশ বুদ্ধের মূর্তি।
রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় : সেই হাসিটাকে এটমিক বিস্ফোরণের নাম দেওয়া হল।
অমর মিত্র : বুদ্ধ হাসলেন। এই সঙ্কেতটা ছিল। এই সঙ্কেতে খবরটা এসেছিল। ঘোড়াটা হিরোশিমার ভেতরে পড়ে—সেই ব্লাক রেইনের ভেতরে পড়ে গলতে গলতে গলতে গলতে সে যখন ফিরতে থাকে –বুদ্ধের কাছে ক্রমাগত ফিরে আসতে থাকে—এটা নিয়ে উপন্যাসটা শেষ হয়। উপন্যাসটিতে একটি আন-এন্ডিং ব্যাপার আছে। এবং ঐ কন্থক ক্রমাগত কখনো সে ফিরে যাচ্ছে আড়াই হাজার তিন হাজার পূর্বে রাজপূত্র গৌতমের যুগে।
রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় : তার মানে কাটিং ব্যাক...
অমর মিত্র : কখনো সে ফিরে আসছে এই সময়ে। এই ...
রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় : বর্তমান এবং অতীত
অমর মিত্র : বর্তমান এবং অতীত দুয়ের মধ্যে ঘোড়াটি ছোটাছুটি করে। যাওয়া আসা করে।
রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় : আচ্ছা এই মুহূর্তে কি লিখছেন?
অমর মিত্র : আমি একটা উপন্যাস লিখছিলাম।
রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় : আমরা কিন্তু একদম শেষ মুহূর্তে চলে এসেছি।
অমর মিত্র : হ্যা।
রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় : এইটা নিয়ে আজকে আলোচনা শেষ করব। এই মুহূর্তে অমর মিত্র কি লিখছেন। সেটা আমাদের জানা খুব প্রয়োজন। কি লিখছেন আপনি। পূজার লেখা?
অমর মিত্র : পূজার লেখা লিখছি। একটা উপন্যাস গতবারে এক টুকরো লিখেছিলাম—যেভাবে আমি লিখি। এবারেও সেভাবে আরেক টুকরো লিখছি সেই উপন্যাসটির। সেটাতে দুই চৈনিক পরিব্রাজক ভারত বর্ষে প্রবেশ করেছেন। প্রবেশ করে নানান ঘটনার মুখোমুখি হচ্ছেন। এবং সেই ভারত বর্ষ হিংসা এবং অহিংসা। আমি অতীতের কাহিনী লিখলেও আমি মনে করি সমকাল তার ভেতরে ছায়া ফেলে থাকে।
রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় : বুঝতে পারছি।
অমর মিত্র : ধ্রুব পুত্রের মধ্যেও তাই আছে।
রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় : অর্থাৎ আপনি আবার একটি অতীতের কাহিনী শুরু করেছেন। কিন্তু যে অতীতের কাহিনীর মধ্যে বর্তমানকে ধরা যাচ্ছে –সেটা একটা প্রতিকের মত।
অমর মিত্র : হ্যা।
রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় : আমরা শেষ করব অমর মিত্রের সঙ্গে সাক্ষাৎকার। তিনি লিখছেন অতীতের কাহিনী। কিন্তু সেটা একটা ঢাকনা মাত্র। আসলে সেটা বর্তমানের কাহিনী।

২টি মন্তব্য:

  1. লোকে কত কী জানতে পাচ্ছে এটা পড়ে, সেটাই খুব ভালো লাগছে। ভেবেও আশ্চর্য লাগে কত বড় বড় সব লেখক আছেন, আমরা জানিই না !

    উত্তরমুছুন