সোমবার, ৬ জানুয়ারী, ২০১৪

মলয় রায়চৌধুরীর উপন্যাস নিয়ে আলোচনা : অরূপ তোমার এঁটোকাঁটা

অর্ক চট্টোপাধ্যায়

বিষয়মুখ’ পত্রিকার ২০০৭ জুলাই - ডিসেম্বর সংখ্যায় প্রকাশিত উপন্যাস ‘অরূপ তোমার এঁটোকাঁটা’ পড়তে-পড়তে যে পেনসিল দিয়ে মার্ক করছিলাম, দেখলাম সেটার শিষটা ভাঙা । তারপর ঐ এঁটোকাঁটা শিষ দিয়েই মার্ক করা শুরু করলাম । এই ‘এঁটোকাঁটা’ মধ্যবিত্ত ভেতো বাঙালির মুখোশ-উচ্ছিষ্ট যেন । উৎকৃষ্ট এবং উৎ-সৃষ্ট । পিতামহ-মাতামহের গুপ্ত যৌনজীবনের এঁটোকাঁটা । প্রয়াত দাদুর চিঠি-চাপাটি দিয়ে শুরু এই খনন। টেক্সট যেন এক খননায়ন — চোরাগোপ্তা খুলামকুচি আমদানি করে । সাধু বাংলায় লেখা অতীতের হলুদ ন্যারেটিভ জাক্সটাপোজড হয় প্রজন্মান্তরের ই-মেল বা চ্যাট-এর সঙ্গে ।

কাহিনির প্রবাহ বেনারসে, শিকড় বর্ধমানে । ইন্দিরা ব্যানার্জির প্রয়াত দাদু অতুল মুখোপাধ্যায় বা “অতুল মূর্খ”র বন্ধু শিশির দত্তর লেখা যে ন্যারেটিভ মলয়ের উপন্যাসের মেরুদণ্ড, তা এক জটিল বহুকথন সম্বলিত প্যালিম্পসেস্ট । শিশির দত্তর সাধু বাংলার ওপর পাঠিকা তথা কাইনির অন্যতম প্রধান চরিত্র কল্যাণী/কেকা বউদির ন্যারেটোরিয়াল প্রেজেন্স । তার ওপর আবার নির্মলবাবুর ( অতুলের বন্ধু ) বাবা, যার ডায়েরিতে শিশির লিখেছিলেন এই কাহিনি, তাঁর প্রফেসোরিয়াল নোটস — লেককের বিমূর্ত ও তাত্ত্বিক পরিসর ; এই ত্রিস্তরিত আখ্যানের সমান্তরাল চলে লিখন আর পাঠ । শিশির পড়েন বন্ধুর বাবা তথা প্রফেসরের সমাজভাবনার র‌্যানডাম নোটস, আর তারই ওপর লিখে ফ্যালেন নিজের বৈদেশিক যৌন কাহিনি । 

অন্যদিকে কেকা বউদি, যিনি নিঃসন্দেহে মলয়ের উপন্যাসের র‌্যাডিকাল নায়িকা, তিনিও তো শিশির কাহিনির পাঠিকাই । তবে শিশিরের মতন তিনিও লেখা ও পাঠ দুই করে থাকেন । শিশিরের কাহিনিকে ক্রমাগত আন্ডারকাট করতে থাকে কেকা-কথনের বলনকলা । ইমপোটেন্ট ও বধুনির্যাতনকারী প্রসন্নকান্তির বিদ্রোহিনী স্ত্রী কল্যাণী পাড়ার ছেলে অতুলের সাথে বেনারস পালিয়ে আসেন । সেখানে অতুল আর কল্যাণী তথা নামান্তরে কেকা শুরু করে গাঁজাচরস আফিমের ব্যবসা — “দ্রুত ধনী হবার ব্যধি” । বেনারসের মন্দির চত্ত্বরে কালো গ্র্যানাইটের ফ্যালিক এক লিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করে কেকা । কিন্তু ক্রমশই অতুলের কাছে কেকার শরীর আকর্ষণ হারায় আর অতুল লিপ্ত হয় অন্য-অন্যান্য নারীশরীরের সাথে । মার্কিনী জোসেফিনের সঙ্গে শয্যা আমদানি করে হাইব্রিড এক শিশুপুত্র ‘কং’ । ‘কং’কে প্রতিপালনের দায় পড়ে কেকার ওপর । জোসেফিন তখন উধাও । 

শিশিরের কাহিনির সিংহভাগ জুড়ে থাকে কেকার ভাষায় “কভাবলা কামুক”টার সাথে ভাইকিং রমণী ম্যাডেলিন ক্যরিয়েটের সঙ্গম-লীলা । সাধু ভাষার মোচড়ে বলা এই যৌন আখ্যান পর্নোগ্রাফি আর এসক্যাটোলজির মধ্যিখানে থেকে যায় । কখনও তা প্লেজার দেয়, কখনও কুন্দেরায়েস্ক এক বিষাদ । এক অতলান্ত অনুভব । অ্যাটলান্টিকের এপার থেকে ওপার— সংকরায়ণের গন্ধ এই শরীরময় এঁটোকাঁটায় । মলয়ের বর্ণনাগুণে এই ইনটারকোর্স মিস্টিক এক রিচুয়ালে পরিণত হয় — “অগরু” এবং “কান্তা” নামে ছয়টি করে শিশির তরল প্রলেপ সূর্যাস্তের পর ফোরপ্লের ফোরগ্রাউন্ড তৈরি করে । শিশিরের এই ‘বিদকুটে’ সাধু বাংলা কি তবে রক্ষণশীল এক ভাষা-পদক্ষেপ, যেমনটা কেকা বলে — “আর লিখলি তো লিখলি এই বিদকুটে বাংলায় কেন ? সোজা বাংলায় লিখতে গেলে নোংরা করে ফেলতিস ?” শিশির তথা ‘শিশু’ আর ম্যাডেলিন তথা ‘ম্যাডি’র শরীর যেন ভাইকিং রাজগৌরবের এক ঐতিহাসিক যুদ্ধক্ষেত্র । 

স্ক্যান্ডিনেভিয় নৌযোদ্ধাগণের বংশজ অতিকায় ম্যাডেলিন ও শিশিরের এই সঙ্গমে নারী সরীর প্যাট্রিয়ার্কাল গেজের নিষ্প্রাণ পাঠবস্তু নয় । তা এক ঋদ্ধ ইতিহাসমুখরিত চিহ্ণ, যা তেরছা করে দ্যায় যৌনতার পুংশাসিত কাঠামোকে । পুরুষ হেথায় নারীর বশিকৃত ক্যাবলা-কামুক মাত্র । ম্যাডেলিন চলে যাবার পর চাবুক আসে কেকাবউদির হাতে, যখন তিনি সিডিউস করেন শিশিরকে । বিদেশি গান বদলে যায় বৈজয়ন্তীমালার “হোঁটোপে অ্যাইসি বাত”-এ । এই সিক্রেটই কেকার সম্পদ — ” আমার গায়ের রঙ আহ্লাদী পুতুল ম্যাডেলিনের মতন নয়, তাতে কী । আমি এমন অপ্সরা যার মুঠোব আছে শকুনির পাশা । মুকখু চাষা শিশির কিছুই আঁচ করতে পারেনি । ম্যাডেলিনের শেখানো এলকুমি-বেলকুমিই পুঁজি ।” কেকার অভিসন্ধিতে শিশির এক অনুঘটক মাত্র । শিসির-কেকার শয্যা থেকে উঠে আসে ‘বং’ । কেকা হন কং-বং-এর মা — “অতুল আমার কোলে ওর বাচ্চা কংকে ধরিয়েছে । আমি ওর কোলে শিশিরের বাচ্চা বংকে ধরাব ” এই ধরাধরির গুপ্ত পারিবারিক ইতিহাস ছুঁয়ে যায় বারানসীর সাংস্কৃতিক ইতিহাস– অবাধ ফ্যাগের সন্মোহন থেকে বজরং দলের উপস্হিতি যারা তুকটাক চুমুকেও আস্ত রাখেনি । 

এই আখ্যান শেষ হয় অতুলের নাতনি ইন্দিরা ও শিশিরপুত্র সুবীরের প্রণয়-পরিণয় দিয়ে । তারা গুপ্ত ইতিহাস সম্বলিত ডায়েরিটিকে চুপচাপ স্বস্হানে রেখে দেওয়াই সাব্যস্ত করে । টেক্সটের অপেক্ষা শুরু হয় আবার পাঠ ও লিখন বৃত্তের ভিতর ঢুকে পড়ার জন্য । শিশির জানে সে মোহরা । কেকার । কেকা অতুলের মৃত্যুতে কাঙালিভোজন করিয়ে মাদার ইন্ডিয়া সাজে । 

মলয়ের উপন্যাসে যৌনতা অস্তিত্ব তথা আইডেনটিটিরই বিনির্মাণ ঘটায় । শিশির-কেকারা বুঝতে পারে কত-কত আরও কত-কত শিশির-কেকাদের তারা তাদের শরীর-মন আর অস্তিত্বে পুষছে । লেখক মলয় তার ডিসকার্সিভ স্পেস তৈরি করেন নির্মলের অধ্যাপক পিতার ‘জ্ঞানবাক্যের’ পরিসরে । তাঁর ডায়েরিতেই তো লেখে শিশির । তাঁর সফল দার্শনিক অ্যাফোরিজম এক সমান্তরাল প্রাতর্কিক পরিসর নির্মাণ করে — এক প্রফেটিক স্পেস যার বয়ানে বাঙালির দোআঁশলা আধুনিকতায় এক উনিশ শতকীয় অ্যনাক্রনিস্টিক অধুনান্তিকতার রিপোর্ট পাওয়া যায় । সেখানে উঠে আসে উত্তর-উপোনিবেশের অনুসঙ্গ, ভালো-মন্দের নৈতিক বিচার ও সর্বোপরি এই ‘আমি’র আবরণ— “আমি নামক নিবাসটি যে যাবতীয় সমস্যার আগার । তাকে সংজ্ঞায়িত করা অসম্ভব । কতরকম আমি যে আছে— সবই অনির্ণেয়, তার ইয়ত্তা নেই । পার্শ্বচরিত্র নির্মলের প্রয়াত পিতা যেন ‘অরূপ তোমার এঁটোকাঁটা’র অধুনান্তিক ডেড অথর — স্বয়ং মলয় রায়চৌধুরী । শিষ বড্ডো ছোটো হয়ে গেছে, পড়াও শেষ । শিশির আর কেকার মত আমিও পড়লাম আর লিখলাম।


লেখক পরিচিতি
অর্ক চট্টোপাধ্যায় 
 কলকাতা শহরের উপকন্ঠে উত্তরপাড়ায় বাস। প্রেসিডেন্সি কলেজ এবং যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে বিএএমএ এবং এম-ফিল। বর্তমানে সিডনিতে গবেষণারত। দশ বছর ধরে গল্প-গদ্য লেখালিখি। নবেন্দু বিকাশ রায়ের সাথে বিগত ৬ বছর ধরে অ্যাশট্রে নামক লিটল ম্যাগের সম্পাদনা। বর্তমানে অনুপম মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত ওয়েবজিন বাক-এর 'গল্পনাবিভাগের সম্পাদক। শূন্য দশকের বিভিন্ন লিটল ম্যাগের সাথে যোগাযোগ এবং লেখালিখি। কয়েকটি বন্ধু পত্রিকা: বৈখরী ভাষ্যঅবসরডাঙাঅক্ষরযাত্রা,প্রতিষেধকজার্নি ৯০জকালিমাটিকৌরবনতুন কবিতাঅপর ইত্যাদি।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন