শুক্রবার, ৩ জানুয়ারী, ২০১৪

অদ্বৈত মল্লবর্মণ তর্পণ : তিতাস তীরের তাল-তরঙ্গ

মুহাম্মাদ আমানুল্লাহ

তিরিশ দশকের সাহিত্য আন্দোলন বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় বিচিত্র ধারা উপধারার জন্ম দেয়—এর অনিবার্য প্রভাব পড়ে বাংলা কথাশিল্পে। শিল্পের উপজীব্য এবং উপস্থাপন প্রক্রিয়ায় আমূল পরিবর্তন ও অভিনবত্ব দেখা দেয়। বিদেশি সাহিত্যের প্রভাব, ফ্রয়েডের অবচেতনলোকের আবিষ্কার, জাতীয় আন্দোলন, মার্কস এঙ্গেলস-এর দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের নবীন জ্ঞান শিল্পী-সাহিত্যিকদের প্রবলভাবে আলোড়িত করে। বঙ্কিম-রবীন্দ্র-শরত্ কথাসাহিত্যের সঙ্গে নব নব চেতনাবোধ, বিষয়বৈচিত্র্য ও শিল্প দর্শনের সমন্বয় ঘটে মূলত এ সময়ে। কথাশিল্পের এ ধারায় কাব্যধর্মী উপন্যাসে বুদ্ধদেব বসু, বুদ্ধিদীপ্ত জীবন সমালোচনায় প্রেমেন্দ্রমিত্র, জীবনসমস্যা প্রধান উপন্যাসে অন্নদাশঙ্কর রায় এবং জীবনে সাংকেতিকতা ও শ্রেণি সচেতনতার প্রয়োগ করে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় স্বতন্ত্র শিল্পশৈলীর পরিচয় প্রদান করেন।

পথের পাঁচালীর বিভূতিভূষণ, রাইকমলের তারাশঙ্কর এবং পদ্মানদীর মাঝির মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলা কথাশিল্পের ত্রিশ-চল্লিশের দশকের শীর্ষস্থানীয় কথাশিল্পী। এ তিনজনই মাটি ও মানুষকে ভালোবাসতেন অকৃপণভাবে। তথাপি তারাশঙ্করের মাটি রুক্ষতায় গৈরিক, বিভূতিভূষণের মাটি স্নেহমায়ায় স্নিগ্ধ আর মানিকের মাটি জীবন সংগ্রামের জটিলতায় কৃষ্ণদগ্ধ।

নদীকেন্দ্রিক বাংলা উপন্যাসের মত্স্যজীবী সমাজের জীবন জীবিকার প্রথম সফল রূপকার মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯০৮-১৯৫৬)। পরবর্তীকালে এই ধারা আরও বিকশিত ও ঋদ্ধ হয়েছে সমরেশ বসু, অদ্বৈত মল্লবর্মণ প্রমুখ কথাশিল্পীদের রচনায়।

'তিতাস একটি নদীর নাম' (১৯৫৫) উপন্যাসটি বাংলা সাহিত্যের নদীভিত্তিক উপন্যাসের ক্ষেত্রে বিরল সম্মানে অভিষিক্ত। নদীমাতৃক বাংলাদেশের একটি নদী তিতাস ও সন্নিহিত উপকূলের মালো পাড়াই এই উপন্যাসের কেন্দ্রস্থল। উপন্যাসের কৌতূহলী পাঠকমাত্রই লক্ষ করবেন, এ উপন্যাসে প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'পদ্মানদীর মাঝি'র প্রভাব সুস্পষ্ট। সাদৃশ্য-সাজুয্যের পরও এই উপন্যাসের নর-নারীর বিচিত্র হূদয়বৃত্তি ও মানসসংকট এখানে প্রধান নয়; এখানে একটি অবহেলিত জনপদের প্রবঞ্চিত শোষিত ছিন্নমূল জনগোষ্ঠীর সমাজ ধর্ম সংস্কৃতিই প্রধানভাবে বিধৃত।

প্রায় সাড়ে চারশ পাতার এ উপন্যাসটি চার পর্বের বিভিন্ন বিভাগ-উপবিভাগে সুবিন্যস্ত। ১. তিতাস একটি নদীর নাম—প্রবাস খণ্ড ২. নয়া বসত-জন্ম-মৃত্যু-বিবাহ ৩. রামধনু-রাঙ্গা নাও ৪. দু'রঙা প্রজাপতি-ভাসমান। এ উপন্যাস কোনো কাহিনি প্রধান উপন্যাস নয়। তারপরও বিভিন্ন বিভাগের ক্রমানুসারে একটি বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্ত ঘটনাক্রমকে আশ্রয় করে উপন্যাসটি বিস্তৃতি লাভ করেছে।

তিতাস তীরের জনগোষ্ঠী মূলত উপন্যাসটিকে একটি মহাকাব্যিক বিস্তৃতি দান করেছে। জেলে, চাষি, বাউল, বৈষ্ণব—বিচিত্র পেশার ও বিবিধ ধর্ম-বর্ণের অসংখ্য চরিত্র এ উপন্যাসে ঠাঁই পেয়েছে। এ উপন্যাস মালো সমাজের বিভিন্ন নর-নারীর আগমন প্রস্থানে দুই প্রজন্মের বেশ কয়েকটি চরিত্র স্থায়ী অস্থায়ী উপস্থিতিতে সক্রিয়ভাবে এগিয়ে গেছে। প্রথম খণ্ডে কিশোর, সুবল; দ্বিতীয় খণ্ডে কিশোরের স্ত্রী তথা অনন্তের মা ও সুবলের বউ; তৃতীয় খণ্ডে অনন্ত উদয়তারা কাদির প্রমুখ ও চতুর্থ খণ্ডে অনন্ত, অনন্তবালা, বনমালী প্রমুখ চরিত্রে মালো জীবনের সমষ্টিগত জীবনস্পন্দন উত্কীর্ণ। এই উপন্যাসে কোনো চরিত্র কেন্দ্রিক তাত্পর্যের প্রাধান্য পরিলক্ষিত না হলেও পৃথিবীর অনেক উল্লেখযোগ্য উপন্যাসের মতো এখানেও লেখকের আত্মপ্রক্ষেপণ রয়েছে। মালো জীবনের বহির্জগতের দীন-হীন দৈন্যদশা অবলম্বন করেও অনন্ত চরিত্রে লেখক এক কল্পনাপ্রবণচিত্তের অনন্য ঐশ্বর্য মর্মস্পর্শী শব্দচিত্রে তুলে ধরেছেন। এভাবে কিশোর ও কিশোরপুত্র অনন্ত এই দুই প্রজন্মের পরিধিতে এ উপন্যাসে মালো জীবনের একটি প্রামাণ্যরূপ বস্তুনিষ্ট ছবি ধরা পড়েছে।

প্রকৃতি ও মহাজনি শোষণের শিকার গ্রাম-বাংলার শ্রমজীবী কৃষক-জেলেসহ সাধারণ মানুষ। মহাজন ও মালিক শ্রেণি অন্ত্যজ শ্রেণির মালোদেরকে তাঁদের ক্রীতদাসে পরিণত করার হীন ষড়যন্ত্রে লিপ্ততার বিরুদ্ধে এই অঞ্চলের সম্মিলিত জনগোষ্ঠীর আমৃত্যু লড়াইয়ের এক মৃত্যুঞ্জয়ী জীবনালেখ্য তিতাস একটি নদীর নাম। এই উপন্যাসের মহাকাব্যিক বিস্তৃতি অসংখ্য নরনারীর আগমন প্রস্থানে একটি অবহেলিত জনপদের দুঃখদীর্ণ জীবন প্রবাহকে প্রকটিত করে।

এ উপন্যাসের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য, লেখকের ব্যক্তিজীবন-অভিজ্ঞতার মহাকাব্যিক রূপায়ণ। একজন আত্মজৈবনিক ঔপন্যাসিকের মতো তিনি মালোপাড়ার সমাজসংস্কৃতি ধর্মের পাশাপাশি মালো জীবনের দুঃখ-দুর্দশার কারণ অনুসন্ধানেও সমান তত্পর। তাঁর সমাজচিন্তা বৈরী সমাজব্যবস্থার বিপ্রতীপ বিন্যাসকে স্পষ্ট করে তোলে।

'মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সেই পদ্মানদীর মাঝির সঙ্গে তুলনা করলেও তিতাস একটি নদীর নাম অনন্য হয়ে ওঠে। অদ্বৈতের অভিজ্ঞতা মানিকের মতো অর্জিত নয়; স্বয়ং ঔপন্যাসিক এই অভিজ্ঞতার প্রত্যক্ষ অংশীদার।' শান্তনু কায়সার; অদ্বৈত মল্লবর্মণ; বাংলা একাডেমি (১৯৮৭) ঢাকা; পৃষ্ঠা-২৩।

এভাবে ঔপন্যাসিক অদ্বৈত মল্লবর্মণ এই উপন্যাসে প্রাকৃতজীবনের মূল শিকড়কে জীবনলগ্নতা ও জীবনচর্যার ঘনিষ্ঠ গভীরতায় রেখায়িত করতে সক্ষম হয়েছেন।

প্রাকৃতিক সম্পদ ও সৌন্দর্যে সকল মানুষের অধিকার জন্মগত। কিন্তু তিতাস পাড়ের জেলে-কৃষক যারা ডাঙা ও জলের প্রকৃত মালিক; বংশানুক্রমিক দারিদ্র্য ও বৈরী সমাজব্যবস্থা তাদের এ মালিকানা সহজে প্রতিষ্ঠিত হতে দেয় না; মহাজন ও জমিদারের কাছে তারা বংশপরম্পরায় বন্দি হয়ে আছে। তাদের কারও কাছে নিজেদের জাল নেই, পরের জাল বেয়ে সারাজীবন মাছ ধরে, আবার নিজেদের জমি নেই পরের জমিতে 'মুনীষ' খাটে। বলদ ও ষাড়ের মতো এ শ্রমজীবী মানুষ শুধু শ্রম বিক্রি করে; অধিকার বা মালিকানা লাভের কোনো সুযোগ তাদের নেই। আবার কোনো জেলের শুধু জাল থাকলেও চলে না—'নাও' থাকতে হয়, প্রয়োজন হয় পুঁজি বিনিয়োগের। সংসারের শত ছিদ্রের মাঝে নৌকা ও জালের রক্ষণাবেক্ষণ করে নদীতে মাছ ধরার মতো পুঁজি তাদের কখনো হয় না। তাই সুবলের বাবা মাগন মালোর সারাজীবন পরের জালে খাটতে থাকে, তেমনি সুবলেরও নাও-জাল কিছুই হয় না। প্রথমে সে কিশোরের নৌকায় খাটে, তারপর একদিন পাগল হয়ে যায়। অবশেষে একদিন মুনিব কালোচরণ বেপারির আদেশে ঝড় থেকে নৌকা বাঁচাতে গিয়ে জলের অতলে তলিয়ে যায়। এভাবে তিতাস তীরের মালো সমপ্রদায় ও তিতাস পারের রায়তগণ বংশানুক্রমিকভাবে মহাজন, জমিদার ও মাছ ব্যবসায়ীদের তীব্র শোষণে বাস্তুহারায় পরিণত হয়, মানবেতর জীবন যাপনে বাধ্য হয়ে পড়ে। অর্থনৈতিক অধিকার বঞ্চিত মালো সমপ্রদায় শেষ পর্যন্ত বৈরী শক্তি ও প্রতিকূল প্রকৃতির কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। এ আত্মসমর্পণে নদী তীরবর্তী উপকূলীয় অসহায় বাঙালিদের করুণ আর্তস্বর বেজে ওঠে। তারপরও বাসন্তী ও মোহনের মতো কেউ কেউ একটি বিহিত ব্যবস্থার নিমিত্তে অস্থির হয়ে ওঠে। মোহনের চোয়াল অসহায় ক্রোধে শক্ত হতে থাকে, চোখ-মুখ-ঠোঁটে আগুনের ফুলকি ছড়িয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত তিতাস শুকিয়ে গেলে এই উপকূলবর্তী মালো সমপ্রদায়ের শেষ অবলম্বনটুকুও ফুরিয়ে যায়। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বান, নদীর নব্যতা হরাস ও চড়া পড়া মহাজন-জমিদারদের মালো আর রায়তদেরকে তীব্র শোষণের সুযোগ এনে দেয়, বিপন্ন হয়ে পড়ে উত্পাদনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত সাধারণ প্রাকৃত মালো সমপ্রদায়।

ঔপন্যাসিক অদ্বৈত মল্লবর্মণের এই উপন্যাস নদীতীরবর্তী হিন্দু মালো সমাজের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জীবনের সরস রূপায়ণ। লেখক তাঁর গ্রন্থে বৈষ্ণব, বাউল, ভাটিয়ালি গানের পাশাপাশি লোকজীবনের বিচিত্র উত্সব—নৌকাবাইচ, পদ্মপুরাণ পাঠ ও জন্ম-মৃত্যু-বিয়ে নিয়ে নানাবিধ উচ্ছ্বাস বেদনা উল্লাসের বর্ণনা দিয়েছেন বিশ্বস্ততার সঙ্গে। অন্ত্যজ শ্রেণির প্রাকৃত জীবনের এ অনুষ্ঠানগুলো আমাদেরকে প্রাণের স্পন্দনে সজীব রাখে, খুব সহজে পারিবারিক কলহ ও আর্থিক দৈন্যদশাকে ভুলে থাকতে সুযোগ করে দেয়। ঔপন্যাসিক মালো সমপ্রদায়ের একটি সুখপাঠ্য উত্সব বিবরণী তুলে ধরেছেন। এগুলোর মধ্যে মাঘমণ্ডলের ব্রত, আবিরবন্ধন, পাঁচ পীরের বদরধ্বনি, গুরুকরণ, কালী পূজার বারোয়ারী আয়োজন, উত্তরায়ণ সংক্রান্তি , তুলসী তলায় প্রণাম ও মনসা পূজার আয়োজন প্রধান।

এক. মাঘ মাসের শেষ দিনে কুমারীদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হয় মাঘমণ্ডলব্রত। মালো তরুণীদের কণ্ঠে তখন সমস্বরে ধ্বনিত হয় 'লও লও সুরুজ ঠাকুর লও পূজার জল'। কাঁচা কলাগাছের কাটা ফালি জড়ো করে তার ওপর রঙিন কাগজের চৌয়ারি তৈরি করে ঢোল কাঁসি বাজাতে বাজাতে সমস্বরে গান গেয়ে এ চৌয়ারি তিতাস জলে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। তখন নারীকণ্ঠের মধুর সংগীতে নেচে ওঠে তিতাস তীর।

দুই. পৌষের দিন শেষে অনুষ্ঠিত হয় উত্তরায়ণ সংক্রান্তি। তখন মালো সমাজে মুড়ি ভেজে ছাতু কুটার ধুম পড়ে। চালের গুড়ো রোদে শুকিয়ে মালো বধূরা পূর্ণরাত্রি বিনিদ্র নয়নে বিচিত্র আদলের পিঠা-পায়েস তৈরি করে। ঘরে বসে নানা উপকরণের পঞ্চান্ন ব্যঞ্জন রান্না করে।

'কালী পূজার সময় গানবাজনায় আমোদ-আহ্লাদে মালোরা অনেক টাকা খরচ করে সত্য, কিন্তু খাওয়া-দাওয়ার জন্য খরচ করে এই উত্তরায়ণ সংক্রান্তির দিনে। এই দিন পৌষ মাসের শেষ। পাঁচ-ছয় দিন আগে থেকেই ঘরে গুঁড়ি কোটার ধুম পড়ে।... ... ...পরবের আগের দিন সারাদিন জাগিয়া মেয়েরা পিঠা বানায়। পিঠা রকমে যেমন বিচিত্র, সংখ্যায়ও তেমনি প্রচুর।'

তিন. মালো পাড়ার প্রত্যেক বাড়িতে আছে তুলসী গাছ। ছোট্ট একটি বেদির ওপর বসানো এই তুলসী গাছে সবাই প্রণাম জানায়।

চার. কালী পূজাতে সমারোহ হয় সবচেয়ে বেশি। মূর্তি তৈরির জন্য বিদেশ থেকে কারিগর আসে, পূজার অনেক আগেই শুরু হয় সেই মূর্তি তৈরির কাজ। পূজার আগেই নির্বাচিত হয় এ পূজাতে কারা কারা সংযমী থাকবে; কারণ যাঁরা সংযমী থাকবে, তারা পূজার আগের দিন নিরামিষ খায় আবার পূজার দিনে প্রাতঃস্নান করে। সাধারণত সংযমীরা পূজার যাবতীয় কাজে পুরোহিতকে সহযোগিতা করে। তারাই পূজার জল তোলে, ফুল বাছাই করে, ভোগ-নৈবেদ্য সাজায় আর পুরোহিতদের আদেশ মতো নানা দ্রব্য এগিয়ে দেয়। এই পূজাতে তাই সংযমীদের গৌরব অনেক বেশি।

পাঁচ. শ্রাবণ মাসে প্রতিরাতে অনুষ্ঠিত হয় পদ্মপুরাণ পাঠ। লাচারী, দিশা ইত্যাদি সুরে তারা পদ্মপুরাণ পাঠ করে।

ছয়. আবার শ্রাবণ শেষ হওয়ার সাথে সাথে প্রতি ঘরে মনসাপূজার আয়োজন চলে। শুরু হয় জালা বিয়ে। মালো তরুণীরা বেহুলার এয়োতির স্মরণচিহ্নরূপে মেয়েতে মেয়েতে বিয়ের এ অভিনয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

'শ্রাবণ মাসের শেষ তারিখটিতে মালোদের ঘরে ঘরে এই মনসা পূজা হয়। অন্যান্য পূজার চাইতে এ পূজার খরচ কম, আনন্দ বেশি।'

ঔপন্যাসিক এ উপন্যাসে বাংলাদেশের নদীতীরবর্তী উপকূলীয় সমাজের বিচিত্র পূজা-পার্বণের বিশ্বস্ত চিত্র উপস্থাপন করেছেন। লোকজীবনের বিভিন্ন উত্সব ও হিন্দু সমপ্রদায়ের এ পূজা-পার্বণের মধ্যে খুব সহজেই আলোচিত হয়েছে উপকূলীয় গণমানুষের লোকজ ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার। জীবন অন্বেষী কৌতূহলী পাঠকমাত্রই ঔপন্যাসিকের এ উপস্থাপনায় সচকিত হবেন। একটি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনচর্যা বর্ণনায় লেখক খুব সহজে আমাদের হূদয়ে নাড়া দেন; ভরে তোলেন জীবনের পেয়ালা সৌন্দর্যে সৌকর্যে।

শুধু তা-ই নয়, অদ্বৈত মল্লবর্মণ এ উপন্যাসে ব্রহ্মমন্ত্র, নাপিতের গুরুবচন, কীর্তনের শ্লোক, চাঁদ সওদাগরের কাহিনি, পদ্মপুরাণ পাঠ, মুর্শিদা বাউল, বারোমাসী প্রভৃতির অনায়াস ব্যবহারে উপকূলবর্তী মালো সমপ্রদায়ের জীবনযাত্রার বিচিত্র বিন্যাসকে রেখায়িত করেছেন। শ্লোক-বচনের অজস্র ব্যবহার এই উপন্যাসকে একটি আলাদা মর্যাদায় অভিষিক্ত করেছে। এ জাতীয় সংগীতগুলো উপকূলীয় বাংলার সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখের সাথি হয়ে আছে। মূলত এ অনুষঙ্গ বাদ দিয়ে গ্রামীণ মানুষের হাসি-কান্নার পূর্ণ রূপায়ণ অসম্ভব।

পদ্মপুরাণ পাঠ : 'শ্রাবণের শেষ দিন পর্যন্ত পদ্মপুরাণ পাঠ করা হয়, কিন্তু পুঁথি সমাপ্ত করা হয় না। লখিন্দরের পুনর্মিলন ও মনসা বন্দনা বলিয়া শেষ দুইটি পরিচ্ছেদ রাখিয়া দেয়া হয় এবং তাহা মনসাপূজার পরের দিন সকালে, সেদিন মালোরা জাল বাহিতে যায় না। খুব করিয়া পদ্মপুরাণ গায়, আর খোল করতাল বাজায়।'

গুরুবচন : 'শুন শুন সভাজন শুন দিয়া মন/ শিবের বিবাহ কথা অপূর্ব কথন।/ কৈলাশ শিখরে শিব ধ্যানেতে আছিল,/ উমার সহিত বিয়া নারদে ঘটাইল।'

মুর্শিদা বাউল :'এলাহির দরিয়ার মাঝে নিরঞ্জনের খেলা,/ শিল পাথর ভাসিয়া গেল শুকনায় ডুবল ভেলা।/ জলের আনন জলের বসন দেইখ্যা সরাসরি,/ বালুচরে নাও ঠেকাইয়া পলাইল বেপারী।'

বারোমাসী :'এহীত আষাঢ় মাসে বরীষা গম্ভীর,/ আজ রাত্রি হবে চুরি লীলার মন্দির।'

তিতাস তীরের মালো সমপ্রদায়ের নিজস্ব সংস্কৃতি—গানে গল্পে, প্রবাদ-প্রবচনসহ লোকসাহিত্যের অন্যান্য উপকরণে একসময় বেশ সমৃদ্ধ ছিল। পূজা-পার্বণে, হাসি-ঠাট্টায় দৈনন্দিন জীবনের আত্মপ্রকাশের ভাবসম্পদে তাদের সাংস্কৃতিক জীবনের বিকাশ ঘটে বংশ পরম্পরায়, উত্তরাধিকারসূত্রে। কিন্তু পরবর্তীকালে মালো সমপ্রদায়ের এই ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতিচর্চা অবক্ষয়ের শিকারে জীর্ণ হয়ে পড়ে। ঔপন্যাসিক অদ্বৈত মল্লবর্মণ এই উপন্যাসে মালো সমপ্রদায়ের সংস্কৃতি অনুশীলন ও সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছেন।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'পদ্মানদীর মাঝি' কিংবা শহীদুল্লাহ কায়সারের 'সারেং বৌ' উপন্যাসের সাথে তুলনামূলক বিচারে বলা যেতে পারে, এই উপন্যাসে কোন বিশেষ নিরীক্ষা, শ্রেণি সচেতনতা, নায়ক-নায়িকার প্রণয়-বিগ্রহ ইত্যাদি প্রধান নয়; কুবের-কপিলার মনোদৈহিক প্রণয়, বা নবিতুন-কদম সারেং-এর দাম্পত্য প্রেমের সুগভীর অনুভব এখানে অপ্রধান। এ ধরনের জীবন অন্বেষী অনুষঙ্গ ঔপন্যাসিক অদ্বৈত মল্লবর্মণ খুব সহজে এড়িয়ে গেছেন। ঔপন্যাসিকের জীবন অন্বেষণ একটু আলাদা, বিপরীত বৈচিত্র্যের। তিনি জীবন থেকে মুখ ফিরিয়ে জীবনের স্পন্দন খুঁজেছেন আচ্ছন্নতায়, বিতৃষ্ণায়, দূরত্বে; কখনো বা আকণ্ঠ বুঁদ হয়ে থাকেন ঐতিহ্যে, ধর্মে-সংস্কৃতিতে-সংস্কারে। তাই তাঁর উপস্থাপিত এই ছিন্নমূল জনগোষ্ঠীর পারিবারিক দায়বদ্ধতা, সামাজিক সচেতনতা ও জীবনের প্রতি ভালোবাসার একান্ত অভাব দৃশ্যমান। জীবনের শত দুঃখ-দারিদ্র্য-বিবর্ণতা সত্ত্বেও তাঁরা কীর্তনে, পূজায়, বাউলগানে ও দোল উত্সবে নাচে আর গান গায়; সুখটানে বিভোর হয়ে পড়ে। এভাবে তিতাস তীরবর্তী মালোদের জীবন কখনো পরিচিত গণ্ডি ছাড়িয়ে হয়ে পড়ে অরণ্যচারী, নদী বিহারী ও স্বপ্নবিলাসী। জীবন তখন ক্ষণকালের জন্য হলেও মুক্তি পিয়াসী হয়ে ওঠে।

সহায়ক গ্রন্থ :অদ্বৈত মল্লবর্মণ :তিতাস একটি নদীর নাম, কলিকাতা-৬ প্রথম সংস্করণ ১৩৬৩।

1 টি মন্তব্য:

  1. আলোচনাটি পাঠ করে নিজেকে কিছুটা সমৃদ্ধ মনে করছি।

    উত্তরমুছুন