মঙ্গলবার, ১১ ফেব্রুয়ারী, ২০১৪

ম্যাজিশিয়ান : গেব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ

অধীশা সরকার

একশ বছরের নিঃসঙ্গতার কারণে (অর্থাৎ One Hundred Years of Solitude বইটি নোবেল পাওয়ার কারণে) এই লেখকের নামটা এখন সারা পৃথিবীর মানুষের চেনা। কিন্তু যখন এই কিংবদন্তী বইটা লেখা হচ্ছিল তখন মার্কেজ ছিলেন এক অতি নগন্য সাংবাদিক। তার লেখা ছাপা হত খুব কম, অর্ধেক লোক তার লেখা বুঝতেই পারত না। পাবলিশাররা একের পর এক তাকে বিদেয় করেছেন ম্যানুস্ক্রিপ্ট দেখে; বইটা কেউ ছাপতেই রাজি হয়নি।


হঠাৎ একদিন, বুয়েনোস এয়ারস মার্কেজকে লিখে জানালেন তাঁরা বইটা ছাপতে রাজি। কোনো বন্ধুর সুপারিশে, হয়তো। মার্কেজ ম্যানুস্ক্রিপ্ট বগলে পোস্টাপিসে ছুটল, কুরিয়ার করে পাঠাবে। সঙ্গে তার বউ, মার্সিদিজ। তাদের তখন দিন এনে দিন খেতে হয়, তবু যা ছিল সঙ্গে সবই পকেটে নিয়ে নিল, কে জানে কত খরচ পড়বে পাঠাতে? পোস্টাপিসে পৌঁছে তারা আবিস্কার করল, তাদের শেষ পেসোটা দিয়েও ম্যানুস্ক্রিপ্টের পুরোটা পাঠানোর খরচ উঠবে না। তখন ওই পোস্টাপিসে বসে তারা একটা একটা করে পাতা ওজন-যন্ত্রে রাখছে - যা টাকা আছে তাতে যতটা পাঠানো যায় আর কি। অর্ধেক ম্যানুস্ক্রিপ্ট পাঠানো গেল প্রথম কিস্তিতে।

তারপর তারা বাড়ি ফিরে ঘরে লাগানো হিটার আর অন্যান্য গ্যাজেট বিক্রি করতে বেরোল। সেই টাকাতে পাঠানো গেল ম্যানুস্ক্রিপ্টের বাকিটা।

পোস্টাপিস থেকে বেরিয়ে মার্সিদিজ তার বরকে বলেছিল, "গেব্রিয়েল, এবারও যদি তোমার বইটা ফ্লপ করে, আমরা কিন্তু তাহলে প্রকৃত অর্থে কপর্দকশূন্য হলাম।"

(সোর্স - মার্কেজের জীবনী, Living to Tell the Tale)


কিন্তু কথা সেটা না। কথা হল, মার্সিদিজ এই কথাটা বলেছিল ঠাট্টার সুরে, হাসতে হাসতে। তখনো কিন্তু তাদের পক্ষে কল্পনা করাও সম্ভব না যে বেরোবার পর ওই বই নোবেল পাবে, এবং, মারিও ভার্গাস লোসার ভাষায়, সাহিত্যের দুনিয়ায় একটা "ভূমিকম্প" হবে। তাও, হাসতে হাসতেই এই দম্পতি কপর্দকশূন্য হয়েছিল। একটা বই ছাপাতে চেয়ে।


মার্কেজের 'মাকোন্দো' একটা কাল্পনিক গ্রাম, যেখানে অলৌকিক ঘটনা প্রতিদিন দু'চারটে ঘটেই থাকে। ঘুম থেকে উঠে ব্রেকফাস্ট টেবিলের পথেই দেখা হয়ে যেতে পারে মৃত পূর্বপুরুষের সঙ্গে। আকাশে হাতি উড়ে বেড়াতেই পারে। এবং, পড়তে পড়তে একবারও এই কোনো ঘটনাই অস্বাভাবিক মনে হবে না পাঠকের। ওই আজব মাকোন্দো হয়ে উঠবে বাস্তবের চেয়ে অনেক বেশী বাস্তব। 'ম্যাজিক রিয়ালিজম' ধারার জন্মদাতা মার্কেজ এটা কিভাবে করতেন তা নিয়ে অনেক তর্ক-বিতর্ক আছে। আমার খুব মজা লাগে মার্কেজের নিজের বলা একটা কথা এ বিষয়ে। একটা ইন্টারভিউয়ে তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল তার অতিবাস্তব নির্মাণের পদ্ধতি সম্পর্কে। সে বলেছিল, "মশাই, আমি সাংবাদিক। এটা আমার পক্ষে খুব সহজ। আপনাকে যদি আমি বলি আকাশে হাতি উড়ে বেড়াচ্ছে, আপনি কখনোই বিশ্বাস করবেন না। কিন্তু আপনাকে যদি বলি, আজ সকাল ৯টা নাগাদ আকাশে ৪৮৪টা হাতিকে উড়তে দেখা গেছে, আপনি খানিকটা হলেও এটা বিশ্বাস করার দিকে এগোবেন"।

কিন্তু এই অলীক পৃথিবী কেন? কেন ম্যাজিক রিয়ালিজম? এর উত্তর অবশ্য মার্কেজের আলাদা করে দেওয়ার কিছু নেই। অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ডে এর উত্তর আছে, আবোল তাবোলেও। মার্কেজ আরো ব্যপ্তভাবে দেখিয়েছে মাত্র। ম্যাজিক তো আসলে সিম্বল দিয়ে তৈরী; কিছু চিহ্ণ এবং তার মানে। A game of meanings. যেভাবে, আদতে যেকোনো ভাষাও তৈরী। ঠিক যেভাবে রিয়ালিটি জিনিসটাও তৈরী। খালি মানেগুলো উল্টেপাল্টে দিলেই ম্যাজিক রিয়ালিজম। ব্যাপারটা সহজ বলেই, সেটা এত সহজে ধরতে হয়তো মার্কেজের মত ম্যাজিশিয়ানের জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছিল পৃথিবীকে।

মার্কেজের অধিকাংশ লেখাতেই আত্মজীবনীর আংশিক প্রভাব। কিন্তু কি অদ্ভূত ব্যাপার যে, মা-বাবার প্রণয় নিয়ে লেখা "কলেরার দিনগুলিতে প্রেম" (Love in the times of Cholera), অথবা "একশ বছরের নিঃসঙ্গতা", যা লেখা তার পারিবারিক ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে, কেমন সুন্দর তা এই বাংলাদেশেও মানিয়ে যায়। কর্নেল বুয়েন্দিয়ার সঙ্গে আমাদের স্বৈরাচারী ঠাকুর্দাদের মিল নেই কি? অথবা সরলা এরেন্দিরার সঙ্গে আমাদের গ্রামবাংলার 'ট্রাফিকড' হয়ে যাওয়া কিশোরীর? মিলটা আরো প্রকট হয় ঐ ম্যাজিকের মাধ্যমে। ওদের গল্প আমাদের হয়ে যায়। মুছে যায় সীমান্তরেখা।

সীমান্তরেখা মুছে দিতে পারে যে ম্যাজিশিয়ান, তার নাম গেব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ।






লেখক পরিচিতি
অধীশা সরকার
লেখক। সাংবাদিক।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন