মঙ্গলবার, ১১ ফেব্রুয়ারী, ২০১৪

কুলদা রায়ের জলযাত্রা

বনি আমিন

 আমরা তিনজন দুর্দান্ত কিশোর ছিলাম। সেই বয়সে লোনা মাটি-জলে জম্মেও লবণ সঙ্গ ত্যাগ করার শপথ নিয়েছিলাম। কারণ আমাদের মধ্যে বয়সে বড় যে, সে নজরুল কোথা থেকে জেনে এসেছিল যে, লবণ খাওয়া ত্যাগ করলেই মনুষ্য স্বভাবের সেক্স প্রবৃত্তি নাকি ত্যাগ করা যায়। আমরা মানুষের কল্যাণ আর সৃষ্টিকর্তার সান্নিধ্য সাধনায় নিজেদেরকে ব্যাপৃত রাখব এমন ইচ্ছায় কর্মসাধনা নির্ধারণ করেছিলাম। আর সেজন্য আমরা প্রচুর নামাজ পড়তাম। মাঠ-ঘাট, পুকুর পাড়, নদী তীর এমন কি হিন্দু পাড়ার কল্যাণ সাধনায় সেখানে গমন করলে তাদের উঠোনে বারন্দায়ও নামাজে দাড়িয়েঁ যেতাম। তো সেই আমরা তিনজন দূর্গা পূজার সময় তাদের মন্দির চষে বেড়াতাম আর তার উদ্দেশ্য ছিল সৌন্দর্য্য অনুসন্ধান। অর্থাৎ কোন মন্ডপের দেবী মূর্তি সুন্দর হয়েছে তা এক্সামিন করা। বিসর্জনের দিন ওরা যখন সেই উৎকৃষ্ট সৌন্দর্যের নারী শিল্পকর্মগুলোকে জলে ডুবিয়ে দিত তখনকার সে দৃশ্যে আমাদের মনে যে ভাবের উদয় হতো তা আমি এতো বছর বাদে লক্ষ করলাম কুলদা রায়ের গল্প ( আমার কাছে গল্প নয়, জীবন কাব্যে) সুবল সখার বিয়ে বৃত্তান্তে।

গল্পটি প্রকাশিত হয়েছে কলকাতা থেকে প্রকাশিত অনুষ্টপ ১৪২০ বর্ষা সংখ্যায়। লেখকের সাথে চ্যাটিং মারফত বাক বিনিময়ের মধ্যে তিনি গল্পটা আমাকে দয়াপরবশ হয়ে পাঠালে (খুব সম্ভব ঐ অনুষ্টপ-এরই টাইপকৃত ওয়ার্ড ফরমেটে দুই কলামে লেখা) আমি তা দেখি যে, ২৭ পৃষ্টা হয়ে গেছে। এক বিকেল ভর সকল কাজ-কর্ম ছেড়ে দিয়ে পড়লাম। 

লেখক স্বয়ংই লেখাটা পাঠানোর পর আমাকে লিখেছেন যে, তিনি গল্পের মধ্যে যে বিয়ে বৃত্তান্ত লিখেছেন তা ১৯৭৪ সালের ঘটনা এবং তিনি নিজে সেই সুবল সখার বিয়েতে উপস্থিত ছিলেন। গল্পের মধ্যে যে চরিত্রগুলো পেলাম তাতে অবশ্য তার মতো কারো উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়নি। তবে অনুমান করা যায় তিনি রেডিও শচীন হতে পারেন। তাঁর (লেখকের) ইতিপূর্বে আমার পড়া পরী রাণীর সন্ধ্যা গল্প সম্পর্কে আমার ভাল লাগার অনুভূতি জানালে তিনি প্রতি উত্তরে আমাকে জানালেন গল্পটা সম্পূর্ণ সত্যি। গল্পের হুজুর স্যার লেখকের প্রাইমারির শিক্ষক, আনিস স্যার কলেজের শিক্ষক, আলমগীর-এনি তাঁর সহপাঠী।আমি আরেকটু ঝালাই করতে তাকেঁ বললাম, আমি তো গোপালগঞ্জে থাকি আপনার আনিস স্যার কোথায় থাকেন আমি তার সাথে একটু দেখা করতে চাই। তিনি জানালেন, আনিস স্যার বেঁচে নেই ; তবে স্যারের এক মেয়ে আছে, সে ফেসবুকের গোপালগঞ্জ নামক গ্রুপে লেখে। আমি লেখকের কথায় অভিভূত যে, এতো দিনে বুঝি বানিয়ে ইনিয়ে বিনিয়ে গল্প লেখার দিন শেষ হলো। সত্যি ঘটনা, জীবন চরিতগুলো সহজভাবে বর্ণনা করলেই তো গল্প হয়ে যায়। তবে কেন আমরা মিথ্যা কুহকের আশ্রয় নেব ? খুব বেশি গল্প লেখা কি দরকার আছে ? আর যারা খুব খুব লিখতে গেছেন তাদের সব লেখাই কি আর শিল্পসৌকর্য্যে মান সম্পন্ন হয়েছে ? 

লোক মারফত জানতে পারি, মরহুম শামসুল হক ফরিদপুরী (রহ:) গোপালগঞ্জ টুংগীপাড়ার গওহরডাঙ্গায় যে, মাদ্রাসার পত্তন করে গেছেন তিনি নাকি এক পরীর ডানা কেটে দিয়েছিলেন সেই কিংবদন্তীটি লেখকের পরী রাণীর সন্ধ্যা গল্পে আছে। গল্পটি পাঠ করার সময় তাই সত্যের কাছাকাছি গল্প মনে হয়েছিল; আর কুলদা রায় স্বয়ং মারফত জানতে পারলাম গল্পটা পুরোটাই সত্য। জীবনের সত্যকে গল্পের সত্য হয়ে উঠতে হয়। আর কুলদা রায় সেটি করতে পেরেছেন বলেই বাংলা কথা সাহিত্যে তাঁর গল্পের স্থান (আমার মতো তুচ্ছ কেউ বলছে বলে নয়, ভবিষ্যতই প্রমাণ করবে) হবে অনন্য। 

সুবল সখার বিয়ে বৃত্তান্ত লেখক বলেছেন বলে নয়, এ গল্পের বর্ণন ভঙ্গীতে এমন কোনো অংশ নেই যে, যেটিকে মনে হতে পারে বানানো। এতো দীর্ঘ ছোট গল্প পড়ার দিন ফুরিয়ে আসছে। মানুষ এমনিতেই সাহিত্যের দ্বারস্থ কম হয় আর যদি তা হতে থাকে দীর্ঘ তবে সে সাহিত্য কে আর পড়তে চাইবে বলেন ? আমিও পড়বো না এরকম একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম কিন্তু পড়তে ঢুকে আর উঠতে পারিনি। যে জীবন সত্যের বুনন তা আমাকে উঠতে দেয়নি। 

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর যে দূর্ভিক্ষ পুরো দেশটাকে গ্রাস করতে চলেছিল সেটাই হয়েছে এ গল্পের মূল বিষয়বস্তু। এ একটি সময়ের দলিল। গ্রাম কি গ্রাম মানুষ বেঁচে আছে রেশনের চা’লে। তাও পর্যাপ্ত নয়। ভাতের অভাবে মানুষ হয়ে যাচ্ছে পাটকাঠির মতো। আমার মনে আছে, প্রাইমারিতে পড়ার সময় তখন স্কুলে দেওয়া হতো ছাতু। সেই ছাতু খেয়ে আমাদের কি অঢেল পায়খানা। স্কুল ফেরৎ আমরা সারি সারি বসে যেতাম বেড়িবাধেঁর ঢালে। 

সুবল সখার বিয়েতে অনন্ত মিস্ত্রির বাড়ির ঘাট বিয়ের কথা শুনে নৌকা থেকে পিলপিল করে হাড্ডিসার মানুষ ধীরে ধীরে ঘাটকূলে—উঠোনে আসতে শুরু করেছে। সারি দিয়ে নিঃশব্দে উঠোন জুড়ে বসছে। তাদের হাতে নানা প্রকার বাসন-কোসন। হরেণ মেম্বরের চাল আসার খবর এখনও হয় নাই। হরেণ মেম্বর নরা লেঠেলকে হেকে বলছেন, এই মানুষগুলোরে সামলা রে নরা। নরা লেঠেলেরর সাড়া নাই। তার এখন বেশ খিদে লেগেছে। সে ঘরের পিছনে চলে গেছে। তার ইচ্ছে—আজ দুটো গরম গরম বাড়তি ভাত খাবে। সেই বিয়েতে দুটো ভাত আর কারো কপালে জোটেনি - না বরযাত্রীর কারো, না কনে বাড়ির কারো। 

আমি এই ক্ষুধা প্রসংগটি বাদ দিয়ে বাই গোলকের প্রসঙ্গটিতে বেশি মজা পেয়েছি। এই লেখার শুরুতে যে দূর্গা প্রতিমা বিসর্জনের কথা উল্লেখ করেছি তা সে প্রসঙ্গেই। বাই লাগা গোলক গল্পে মানসিকভাবে অসুস্থ এক যুবক। সে এমনি সময় স্বাভাবিক মানুষের মতো সুস্থ কিন্তু যখন তার মানসিক বৈকল্য ঘটে তখনই সে অসুস্থ হয়ে পড়ে। সে অবস্থা থেকে তাকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে অনেক বেগ পেতে হয় এবং সে কাজে তার বাবাই একমাত্র সক্ষম লোক। গোলকের একটি বোন জলে তলিয়ে মারা গেছে। গোলকের বাই উঠলে সেও জলপরীর স্বপ্ন দেখে। গোলোকের মা তাকে একা পাঠাতে রাজী ছিল না। যখন তখন তার মাথায় বাই উঠতে পারে। তখন তার হুশ থাকে না। তখন তার জগত ভরা পরী। পরী দেখে। আর পরীর সঙ্গে কথা কয়। কী কয়—তার কোনো আগামাথা নেই। কেউ বোঝেও না। 

সুদামার মা জানে এই পরী আসলে জলপরী। জল থেকে ওঠে। জলে ভেসে যায়। এই সময় তাকে চোখে না রাখলে জলে চলে যেতে পারে। জলে ডুবে যেতে পারে। অপঘাতে মৃত্যু হতে পারে। তখন তাকে কায়দা করে সামলাতে হয়। তার নিজের মেয়েটি জলেই ভেসে গেছে চোখের সামনে। তাকে বাঁচাতে পারেনি। সুদামার মা জানে সুদমার মা নয় হবে হয়ত গোলকের মা। কারণ সুদামাদের কোন বোন ছিল সেটা গল্প থেকে জানা যায় না। গোলকের মা-র প্রসঙ্গেই কথাটা এসেছে, তাই হয়ত এখানে গোলকের মা -ই হবে। তার অনুভূতি দিয়েই লেখক এক গুঢ় জীবন সত্য প্রকাশ করছেন - এই পরী আসলে জলপরী। জল থেকে ওঠে। জলে ভেসে যায়। 

কুলদা রায় যে ভূ-জীবন-প্রকৃতির চিত্র এ গল্পে উজ্জ্বলতা দান করেছেন তাতে জল একটি বড় অনুষঙ্গ। পদ্মার পলি বিধৌত বৃহত্তর ফরিদপুরের যে অঞ্চলটি (গল্পে সরাসরি গোপালগঞ্জ এলাকা)র কথা বর্ণিত হয়েছে। বর্ষাকালে সেখানকার বাড়িঘরগুলো জলের ভেতর ভাসমান এক একটা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দ্বীপ যেন। এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়িতে যেতে হলে নৌকায় একমাত্র বাহন। জলই তাই তাদের জীবনের সাথে জড়ানো একমাত্র উপাদান। সে জল তাদের জীবন দান করে যেমন, তেমনি স্বাভাবিকভাবে তাদের জীবন নেয়ও। এখানকার মানুষের বিশ্বাস দেবী দূর্গা জল থেকে উঠে আসেন, আবার সেই জলেই তাকে তলিয়ে বিসর্জন দেওয়া হয়। জলে ডুবে মারা যাওয়া তাই একটা স্বাভাবিক ঘটনা। 

বাছাড়ি নৌকায় রুপোহাটি গ্রাম চার ঘন্টার পথ। বরযাত্রীর দলে সঙ্গী হয়েছে বাই গোলক। তবে খালি হাতে নয়, বইঠা হাতে। গোলক বৈঠার খোচ মারে আর থামে। জলের দিকে তাকিয়ে দৃষ্টি স্থির হয়ে যায়। তার বৈঠায় কিছু ঠেকেছে বলে বোধ হয়। দেখতো সুদামা দাদা—কি যেন একটা ঠেকল। সুদামা দেখতে পেয়েছে। জলের নিচে একমাথা কালো চুল। চুলের মধ্যে লাল ফিতা। মুখ দেখা যায় না। মনে মনে বলল, দুগগা, দুগগা। 

এই জায়গাটা পাঠ করতেই আমার ছোটবেলার কথা মনে পড়ে গেল। সে সময় নৌকায় নদী পথে চলাচল করতে হতো। আর নদী স্রোতে ভেসে যেতে দেখতাম দূর্গা প্রতিমা । তার মুখাবয়বটা আর দৃশ্যমান নেই কিন্তু অন্য বস্তু সামগ্রী - খড়, লাঠি হয়ত বানানো চুল, তাতে দেওয়া লাল ফিতে হয়ত ভেসে চলেছে এখনো। গোলককে ঘোর লাগা অবস্থায় নিয়ে গিয়ে এমন এক গুঢ় সত্য লেখক উপস্থাপন করেছেন যাতে লীন হয়ে আছে এ দেশের বহু বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। 

কিন্তু কুলদা রায়ের এই জলগমনের আছে আরো তাৎপর্য। কুলদা রায় পরী পর্বের গল্প লিখেছেন। সবগুলো পড়া হয়নি। বিডিনিউজ২৪ এর সৌজন্যে পরী রানীর সন্ধ্যা পড়ার পর আরো একটা পড়লাম সেদিন। পরী রানীর সন্ধ্যাতে লক্ষ্য করা যায় নারী চরিত্রের প্রতি লেখকের বিশেষ দূর্বলতা। লেখক-শিল্পী সবার নিজস্ব কিছু ভাল লাগা মন্দ লাগা থাকতে পারে। তাকে আমরা দর্শন বা বিশেষ জীবন দৃষ্টি বলতে পারি। এই জীবন দৃষ্টির মধ্যে তার বিশ্বাস - শিক্ষা এবং ঐতিহ্য পরম্পরায় গড়ে ওঠা আদর্শ প্রতিফলিত হয়। 

কুলদা রায় তাঁর গল্পের মারফত তার যে মানস উন্মোচিত করেছেন তা তাঁর নারী চরিত্রের মাধ্যমে আলোকপ্রাপ্ত। এনি, আনিস স্যার এর স্ত্রী এবং সর্বশেষ গওহরডাঙ্গা মাদ্রাসায় যাওয়ার পথে মধুমতি নদী ঘাটে পতিতা নিবাসের ছোট বেলায় পড়ে গিয়ে বাম কাঁধে দাগ হয়ে যাওয়া নারী সবার ভেতর দিয়ে এবং সর্বশেষ উদভ্রান্ত আনিস স্যারের মগজের ভেতর যে কন্যা শিশুর কান্নার শব্দ তা গল্পের বিষয়কে তুলে ধরতে সহায়তা করেছে। 

আনিস স্যারের স্ত্রীর শিল্পের প্রতি অনুরাগ যেটি আছে এনির ভেতরেও(ছবি ভালবাসা)শিল্প রসিক মানুষের প্রতি গল্পকারের সুদৃষ্টির পরিচয় বহন করে। আর কুলদা রায় যে পরী পর্বের গল্প লিখছেন তার নামকরণেই তো নারীর প্রতি সহানুভূতির পরিচয়বাহী পরী। নারী চরিত্রের মাধ্যমে তাঁর জীবন দৃষ্টি তুলে ধরবার প্রয়াস পেয়েছেন। যদি পরী বাদ দিয়ে তিনি জ্বীনের গল্প লিখতেন তাহলে বুঝা যেত যে তিনি নারী শক্তিকে তার গল্পে উপজীব্য করেননি ; পুরুষ শক্তিকেও জগৎ নিয়ামকের শক্তি রুপে দেখতে চেয়েছেন। হ্যা পাঠক, আমার কুলদা রায়ের গল্প পাঠে লেখককে যে মানসিকতায় দেখেছি। তাতে আমি বুঝাতে চাচ্ছি যে, কুলদা রায় তাঁর রচিত নারী চরিত্রে নারীকে দেখেছেন শক্তি দাত্রীরুপে এবং সেই সাথে সৌন্দর্য্যের অধিষ্ঠাত্রীর দেবীরুপেও। পুরুষ চরিত্র তার গল্পে যন্ত্রণার শরবিদ্ধ পাখি। সেজন্য নারী চরিত্রগুলো স্বপ্নময় আর পুরুষ চরিত্রগুলো বাস্তবের রোদ-তাপে পোড়া রিয়ালিটি। 

সুবল সখার বিয়ে বৃত্তান্ত গল্পে যে নারী চরিত্রগুলো উল্লেখযোগ্য তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সুলেখা,সুনিতি। আরো দু’ তিনটি চরিত্র আমার কাছে গুরুত্ববহ বোধ হয়েছে। তাদের অবস্থান গল্পে কম কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ। তারা হলো টুনিলতা, পুনিলতা এবং তাদের খুড়ি দিদিমা । টুনিলতার বিবাহ সম্বস্ধ হয়েছিল কিন্তু গল্পের শেষে সে এসেছে লাশ হয়ে। বিয়ে অনুষ্ঠান। সেখানে যদি নারীদের উপস্থিতি না থাকে তাহলে সে বিবাহ অপাংক্তেয় হয়ে থাকে। সুবল সখার বিয়ের বরযাত্রী হিসাবে মেয়েদেরকে নেওয়া হবে না। সেটা বেমানান কোন কথা নয়। সে সমাজ বাস্তবতায় সে সিদ্ধান্ত স্বাভাবিক বাস্তবতাকে ধারণ করে। 

বিয়ের বরযাত্রীতে লোক যাওয়ার কথা এক কুড়ি কিন্তু হয়ে গেছে শোয়া দুই কুড়ি। সেই শোয়া দুই কুড়ি লোকের কোন স্ত্রীলিঙ্গবাচকতা নেই। কিন্তু অতিরিক্ত দুইজন মহিলা সদস্য লুকিয়ে উঠে পড়েছে এবং নৌকা যাত্রা করার পর তাদের সঙ্গী হওয়ার বার্তা জানা গেল। তখন আর ফিরিয়ে দেওয়ার উপায় নেই -বিয়ের মতো শুভ কাজে পিছন ফেরা অযাত্রা। সুতরাং এ বিয়ে যাত্রার গার্জেন ছেলের মামার আপত্তি আর ধোপে টিকল না। এই যে দুই মেয়ে বিয়ে যাত্রায় সঙ্গী হলো তারাই বরং হলো এই এক বাছাড়ি নৌকার বর যাত্রীদের মূল কান্ডারী। সুলেখা, সুনীতি দুই বোনই বিয়ে বাড়ির বিভিন্ন সময়ে সংঘটিত বিপত্তির নিরসনে বড় ভূমিকা পালন করেছে। গোলককে সামলানো, বরহীন বিয়েতে উপস্থিত বুদ্ধি খাটিয়ে সামাল দিয়েছে সুলেখা। সুনীতির মাধ্যমে জানতে পেরেছে বিয়ের কনে আসলে নেই তাদের বাড়ি ফিরে যাওয়া সমীচিন ইত্যাদি। টুনিলতার বিয়েতে এই গল্পের অবতারণা। 

সেই টুনিলতার বয়স আর কত হবে হয়তো ১৩ থেকে ১৭ এমন বয়সের একটি যে মেয়ে, সে অশিক্ষিত, বাবা তার মিস্ত্রি বা দিনমজুর। বিয়ের একদিন আগে সে উধাও। পাওয়া যাচ্ছে না। জলে ডোবা ভাসমান জনপদ। নৌকা নিয়ে খুজে বেড়াচ্ছে মেয়ের মামারা। এমন কোনো মেয়ে বিয়ের আগে পালিয়ে যায় পছন্দের অন্য ছেলে থাকলে শুধু। সেটাই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু অনন্ত মিস্ত্রির এ মেয়ে টুনিলতা পালিয়েছে অন্য কারণে। যেটি আমার কাছে মনে হয়েছে আরোপিত, স্বাভাবিক নয়। গল্পের মূল বিষয় বস্তুর ট্রাজিক আবহকে ত্বরান্বিত করতে টুনিলতার উপর এটি আরোপ করেছেন গল্পকার কুলদা রায়। 

অভাবের দিনে টুনিলতার বিয়ার কথা গুপ্ত রাইখাছিল আমার জামাই বাবাজী অনন্ত মিস্ত্রী। কাল যখন বড় মাইয়া টুনিলতারে কইছে—তখন মাইয়া টুনিলতা গোপনে বর্ষার জলে ঝাঁপ দিছে। তারে কেউ দেখে নাই।সুনিতি মুখে আঁচল চাপা দিয়েছে। শিউরে উঠেছে। তা দেখে দিদিমা বলল, ঝাঁপ না দিয়া করবে কি? ঘরে ভাত নাই। বিয়ার আসরে বসে কেমনে! ছাওয়াল পক্ষ কি ছাইড়া দেবে মাইয়ারে? মেয়েরা সাধারণত বাপের বাড়িতে থাকতে থাকতে - আর বিশেষত সে বাপের বাড়িতে যেখানে কিনা ক্ষিদে জোকের মতো লেগে আছে - অতীষ্ট হয়ে পড়ে। বিয়ে ঠিক হলে তারা খুশি হয়। 
আর গোপালগঞ্জ শহরে যে মেয়ের বিয়ে ঠিক হয়েছে, তার মনে তো স্বপ্ন জাগবে সুখের। তা না করে সে কিনা ভাববে বিয়ের পরে ছেলে পক্ষ কিছু না পেয়ে তাকে মরণ যন্ত্রণা দেবে সে কথা ? ঠিক বিশ্বাসযোগ্য নয়। টুনিলতা চরিত্রে ঠিক সে বিষয়টা আরোপ করা হয়েছে যা আর দশটা মেয়ের সাথে মিল খায়না। এই যে টুনিলতার আগাম ভাবনা থেকে জলে ঝাপ দিয়ে আত্মহত্যা লিপ্ত হওয়া তার একটি ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা আছে। টুনিলতার দিদিমার কন্ঠে আমরা শুনছি তার বার্তা এবং সেই দিদিমা পরে বলছেন -মাইয়া জনম লইছিই জলে ঝাঁপ দেওনের লাইগা। আমার বড় বইনও ঝাঁপ দিছিল। আমার সাইজা মাইয়া দিছিল। আমিও দিছিলাম। তখন আমাগো মাঠে ধান। বাপে কাটতে যাবে। মাইঝা কর্তা কইলেন, ধান কাইটা আর করবি কি। দ্যাশ আর নাই। মাঠে যাইয়া বাপে যাইয়া দেখে দ্যাশ আছে। ফসল নাই। এদিকে আমার বিয়ার বাদ্য বাজতেছে। ধান কেডা নেছে? কর্তা বাবু? না, মোজাম সদ্দার? কেউ কইতে পারে নাই। কর্তা বাবুর খবর নাই। তিনি কৈলকাতা। লোকে কয় কর্তাবাবু ধান সুদ্দা জমি জিরেত মজাম সদ্দারের কাছে বেঁইচা কৈলকাতা গেছে। আর আইবে না। দিদিমার নাতনির বিয়েতে ক্ষুধার ভিন্ন প্রেক্ষাপট। কিন্তু যে ক্ষুধা-দারিদ্র সে আছেই। 

আমরা এ গল্পের শেষ দিকে এসে পাব - বাই-লাগা গোলোককে টেনে তুলেছে সুলেখা রানী। তার ঘুমের ঘোরের মধ্যে তাকে ধরে অনেক গা বাঁচিয়ে বাছড়িতে উঠতে পেরেছে। তাকে বলল, এই নাও তোমার বৈঠা। গোলক সে বৈঠাটা হাতে নিয়ে, বাঁকা করে ঘাড়ের আড়ালে দেখল, জলপরী তাকে রেখে জলে নেমে যাচ্ছে। গুপ্ত কথার মত করে বলছে, প্যাট ভৈরা দীঘা ধানের ভাত খাতি আইছিলাম। জলের মধ্যে তার পা দুখানি ডুবেছে। কোমরটাও ডুবতে ডুবতে জলের মধ্যে গলে যাচ্ছে। সেই গাঢ় সবুজ রঙ জলে ভেসে যাচ্ছে। গোলোক বলল, যাইও না জলপরী। জলপরী ততক্ষণে গলা জলে। বলল, থাইকা কী করব, দ্যাশে ভাত নাই। জলে নাইমা যাই। জলপরী জলে নেমে মিশে গেল। 

এই যে বাণী এখানে অন্তলীন হয়ে আছে কুলদা রায়ের মানস। গল্পে লেখকের জীবনদৃষ্টি। বিশেষত আমার মানসে এক গভীর ব্যঞ্জনা তৈরি করে - যাইও না জলপরী। জলপরী ততক্ষণে গলা জলে। বলল, থাইকা কী করব, দ্যাশে ভাত নাই। কথা কয়টি। কুলদা রায় কৃষি গবেষক। জানিনা তিনি কেন আমেরিকার মতো (নিজে সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শের হয়েও)ধনিকদের দেশে গেছেন। হয়তো তাঁর অন্তর্গত রক্তের ভেতরে খেলা করে উপরে গল্পের ঐ বাক কয়টি। তাই বলতে পারি, জলযাত্রা বাই গোলকের জলপরীর জলযাত্রা নয় ; এ জলযাত্রা কুলদা রায়ের নিজেরই জলযাত্রা।




আলোচক পরিচিতি
বনি আমিন

জন্মস্থান: সাতক্ষীরা (সুন্দরবনের পাশ ঘেষে শেষ জনপদে) লেখাপড়া এবং বেড়ে ওঠা ওখানেই(মাধ্যমিক পর্যন্ত) এরপর খুলনা এবং রাজশাহী। 
কর্মস্থল: গোপালগঞ্জ--দিগনগর গ্রামে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন