মঙ্গলবার, ১১ ফেব্রুয়ারী, ২০১৪

অনিল ঘোষের গল্প তিরিশে সেপ্টেম্বর

সুবিমলদা, সুবিমল মিত্র সাম্যকে খুব ধমকালেন, তোমরা কেমন তরুণ লেখক, গল্প চাইলে গল্প দিতে পারো না! কবে থেকে একটা গল্প চাইছি, দিতে পারছ না!

সাম্য মাথা নিচু করে ধমক হজম করে। মনে মনে লজ্জিত হয় খুব। কথাটা সত্যি। সুবিমলদা বেশ কিছুদিন ধরে একটা গল্পের কথা বলছেন, আর সাম্য আজ দিচ্ছি, কাল দিচ্ছি করে কাটিয়ে দিচ্ছে। লিখতে পারছে না তা নয়, মনের মতো লেখাটা আসছে না, তাই। যা আসছে, এটা তো আগেই লিখেছি, কিংবা এ ধরনের বিষয় তো অনেকেই লিখেছেন। নতুন আর কী লিখবে! মুশকিল হচ্ছে কী লিখবে, এটাতেই যেন গোলমাল পাকিয়ে যাচ্ছে সাম্যর। কোনও কিছুই মনের মতো হচ্ছে না, তাই লেখাও এগোচ্ছে না। অথচ বুকের মধ্যে একটা জ্বালা অনুভব করছে সবসময়। সেটা লজ্জার, সেটা অক্ষমতার।


নাহ্, আর নয়। সাম্য নিজেকে ঝাঁকিয়ে নেয়। এ রকম তো নয় যে, যা লেখা হয়ে গেছে, তা আর নতুন করে লেখা যাবে না! নতুন মানে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি, নতুন ভাবনা। তাই ও ঠিক করে নেয় গল্প ওকে লিখতেই হবে। যাই হোক, যেভাবে হোক। অনেকদিন ধরে লিখছে সাম্য। ইতিমধ্যে চারটে গল্প সংকলন বেরিয়ে গেছে। নানা জায়গায় ওর গল্পের আলোচনা হয়েছে। সুবিমলদাও ওর গল্পের প্রশংসা করেন। নিজে উদ্যোগী হয়ে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় সাম্যর গল্প সম্পর্কে বলেছেন। তাঁরা গল্প চাইছেন, অথচ সাম্য দিতে পারছে না। এই লজ্জা ঝেড়ে ফেলতে চায় সাম্য। নিজেকে খুব করে ঝাড়া দেয়, মাথা ঝাঁকায় খুব জোরে। গল্প ওকে লিখতেই হবে। যে করে হোক।

সাম্য শুনেছে লেখকের প্রসব বেদনা বলে একটা কথা আছে। এই বেদনার জন্ম নাকি গর্ভে নয়, মস্তিষ্কে। সেখান থেকে শুরু হয় যন্ত্রণা, তারপর নেমে আসে হাতে-কলমে-কাগজে। কোনও একটা মানুষ দেখল, কোনও ঘটনা শুনল কিংবা কোনও দৃশ্য দেখল, অমনি মাথার ভিতরে ছুঁচ ফোটার মতো যন্ত্রণা শুরু হয়ে যায়। অর্থাৎ প্রসব রসের থলি--মুখ খুলে যায়। যন্ত্রণাটা আস্তে আস্তে ছড়িয়ে পড়ে শরীরের কোষে কোষে। তখনই শরীরের ভল্টে যেখানে যত শব্দ-অক্ষর-বাক্যমালা জমা আছে, সেগুলো এবার হইচই শুরু করে দেয়। তাদের তরঙ্গ পাঠিয়ে দেয় প্রতিটি কোষে, প্রতিটি তন্ত্রীতে। ওরা বেরোতে চায় সমস্ত জালিকা থেকে, ঝিল্লি থেকে। যতক্ষণ না বেরোবে, ততক্ষণ চলবে তাদের আন্দোলন। ওদের দাবি মানতেই হবে। নইলে ছটফটানি, অস্থিরতা, ঘুম যাওয়া, খিদে না হওয়া। সবসময় বিরক্তি, মেজাজ খিটখিট। সে এক সাংঘাতিক অবস্থা। লেখকের প্রসব বেদনা বোধহয় একেই বলে।

সাম্য এই বেদনা কি অনুভব করেনি? করেছে। লেখা কী? একটা প্রতিক্রিয়া। অপটিক নার্ভ যা দেখে, কান যা শোনে, মন যা চিন্তা করে-- তারই প্রতিক্রিয়া দেখা যায় কাগজে-কলমে। এমনও হয়, চোখের সামনে ট্রেনের চাকার তলায় কারও ঝাঁপিয়ে পড়ার ঘটনা দেখল, অথচ লেখায় তার কোনও প্রতিক্রিয়া হল না। আবার অকিঞ্চিৎকর কিছু দেখে যে প্রতিক্রিয়া হল, হয়তো সেটা মারাত্মক কোনও অভিঘাত সৃষ্টি করল। লেখার সৃষ্টিও বোধহয় এইরকমই। সাম্যর নিজেরও এমন হয়েছে। চোখের সামনে ছেষট্টির খাদ্য আন্দোলন দেখেছে। কোর্ট চত্বরে পুলিশ লাঠি-গুলি চালিয়েছে, তার প্রত্যক্ষ সাক্ষী সেও। অথচ তার কোনও প্রতিক্রিয়া হল না। আবার সুন্দরবনের পানীয় জলের কষ্টের কথা ও জানে। ও শুনল হিঙ্গলগঞ্জ অঞ্চলের দূরদূরান্তের মানুষেরা খাবার জলের জন্য প্রায় মারামারি করছে। সেই ঘটনা শুনেই ওর মনে তীব্র অভিঘাত সৃষ্টি করে। সেখান থেকে শুরু হয়ে যায় গল্প। যার সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ ওর ছিল না। তাই সাম্য নিজেই বুঝতে পারছে না সমস্যাটা এখন কোথায় হচ্ছে! লিখতে ও চায়, ভীষণভাবে


চায়। অথচ লিখতে বসে আর লেখা এগোয় না। কাগজে আঁকিবুকি শুধু। ট্রেনে যেতে আসতে কত কিছুই তো চোখে পড়ে। হকার, ভিখিরি। তাদের কত ধরন, কত কথা! গল্পে তারা যেন নিজেরাই কতা বলে ওঠে। সাম্য এমন গল্প অনেক লিখেছে। এবার নতুন কিছু চাই। অন্যরকম কিছু।

নাহ্, আর নয়, লিখতেই হবে। সাম্য প্রায় জোর করে টেবিলে বসে পড়ে। লেখাও একটা কাজ। সাম্য প্রতি মুহূর্তে অনুভব করছে প্রচ- এক তাগিদ। ভাবছে সে। চোখ খোলা। বিভিন্ন পার্টিকেল ভাসছে সামনে। পেঁজা পেঁজা তুলোর মতন। অস্পষ্ট অবয়ব। সাম্য সপ্তাহে তিন থেকে চারদিন কলকাতায় যায়। দুটো প্রকাশন সংস্থায় এডিটিং কাজের সঙ্গে যুক্ত। সেইসঙ্গে বাংলার একটি ঐতিহ্যশালী পত্রিকার দপ্তর সচিবের কাজও সামলাতে হয়। ওই পত্রিকার অফিসবাড়ি নিয়ে গল্প লেখা যায়। খুব পুরনো বাড়ি। সাম্য শুনেছে বাড়িটি উনিশ শতকের এক বিখ্যাত মিষ্টান্ন ব্যবসায়ীর। যিনি নাট্যরসিকও বটে। পাশেই এককালে ছিল থিয়েটার হল। এখন হয়েছে সিনেমা হল। সাম্য শুনেছে বাড়িটি সেকালের এক বিখ্যাত অভিনেত্রীকে ভালোবেসে তৈরি করেছিলেন সেই ব্যবসায়ী। নিচে ছিল তাঁর মিষ্টির দোকান। উপরে থাকতেন সেই অভিনেত্রী। এই বাড়ির মধ্যে দিয়ে একটা পথ ছিল থিয়েটার হলে যাতায়াতের। সাম্য বহুদিন খুঁজে সেই পথটি বার করেছে। সেই অভিনেত্রী ব্যবসায়ীর রক্ষিতা ছিলেন? তাঁর অভিনেত্রী জীবন কেমন ছিল? তাঁর শেষ জীবন কেমন কেটেছিল? তাঁর নিশ্বাস প্রশ্বাস, দুঃখ ব্যথা বেদনা কি অনুভব করার চেষ্টা করে না সাম্য! করে। এটা নিয়েই তো গল্প হয়। লেখকের কল্পনাশক্তি আছে। একটা কাঠামো দাঁড় করানো গেলে তার রথ ছোটাতে অসুবিধা হবে না। উনিশ শতকে থিয়েটারে মহিলারা অভিনয় করতে আসতেন বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অন্ধকার জগৎ থেকে। তাঁদের প্রতিভা ছিল। এমন জগতের মেয়েরা তো পরবর্তীকালে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। বিনোদিনী, ক্ষেত্রমণি, সুকুমারী-- এমন কত সব নাম। এই বাড়িতেই তো ছিলেন তেমন এক নায়িকা । তিনি কেমন দেখতে ছিলেন! কেমন অভিনয় করতেন! কোন ঘরে থাকতেন! সাম্য প্রতিটা ঘর ঘুরে দেখেছে। কৌতূহলী চোখ, মন উড়ে বেড়িয়েছে। মনে মনে ভেবেছে, সেই নারী কি সুন্দরী ছিলেন? তিনি কোথায় হারিয়ে গেলেন? সাম্য অনুভূতির প্রতিটি তন্ত্রী চারিয়ে দিয়েছে ঘরগুলোর প্রতিটি কোণে। দৃষ্টিপথে যেন আবছা ভেসে বেড়ায় একটা ঝলমলে রঙিন শাড়ি। কানে বাজে নূপুরের ছম ছম শব্দ। পত্রিকার অফিসঘরে বসে সাম্যর শিরদাঁড়ায় চিন চিন শিহরণ ওঠে। বুকের ভিতর অনুভব করে একটা জ্বালা। চোখের সামনে যেন ভেসে ওঠে এক রূপসি নারী সেজেগুজে বসে আছেন, কখন তাঁর বাড়ির সামনে জুড়িগাড়ি এসে দাঁড়াবে! কখন তাঁর বাবু গঙ্গায় হাওয়া খেতে নিয়ে যাবেন তাঁকে!

গল্পটা এখান থেকেই শুরু করা যায়। একটা চাপা টেনশন ছড়িয়ে থাকবে গল্পের মধ্যে। কেন না নায়িকার বয়েস হয়েছে। বাবুও আর আগের মতো সময় পাচ্ছেন না আসার। নাকি তাঁর আর মনে ধরছে না এই নারীকে! হতেই পারে। রক্ষিতা জীবন তো তাই! যার শরীর থেকে যৌবন যেতে শুরু করবে, তার কদর তত কমবে। এই রকম পরিবেশে গল্পটা জমবে ভালো।

সাম্যর শরীর জুড়ে অস্থিরতা। ও যেন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে একজোড়া অস্থির পা। নূপুর বাজছে ছম ছম। নায়িকা ঘরবার করছেন। মাঝেমধ্যে তাঁর দাসীকে বলছেন, যা না, দেখে আয় না এখনও আসছে না কেন বল তো! ছবিটা যেন স্পষ্ট হচ্ছে একটু একটু করে, আর ততই জ্বলছে বুকের ভিতরটা। একেই কি প্রসব বেদনা বলে! হবে হয়তো। সাম্য আর দ্বিধা করে না। তড়িঘড়ি অফিসঘরে বসে কাগজ টেনে নেয়। লিখতে লিখতে অনুভব করে টেবিলের উল্টোদিকে যেন কেউ এসে বসল। কে? চেহারাটা তো মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো। কথা বলছেন না। চুপ করে বসে আছেন। তাঁর বিখ্যাত এক্স-রে চোখ দিয়ে যেন জরিপ করে নিচ্ছেন সাম্যকে। সাম্য কেঁপে ওঠে। মানিকবাবু কি এই ঘরে কখনও এসেছিলেন? কি জানি! তবে এই পত্রিকার সঙ্গে ছিল তাঁর নাড়ির যোগ। বহু বিখ্যাত গল্প ছাপা হয়েছে এখানে। তিনি কি সাম্যর দুঃসাহসকে মেপে নিচ্ছেন? দেখছেন সে এই লেখার যোগ্য কিনা! কেঁপে ওঠে



সাম্য। নির্জন ঘরের মধ্যে নূপুরের ছম ছম শব্দ আবছা হতে হতে যেন মিলিয়ে যায়। লেখাটা এগোয় না।

তবু কমলি ছোড়েগা নেহি। লিখতেই হবে। লেখার ভূত যখন একবার চেপেছে ঘাড়ে, দুনিয়ার কোনও ওঝা-গুনিন হাজার মন্ত্র-তন্ত্র, ঝাড়ান-কাটান করেও নামাতে পারবে না। সাম্যর ভূত, সাম্যকেই নামাতে হবে। লেখকের প্রসব বেদনা বলে কথা!

এরপর সে ভাবে, আচ্ছা এমনও তো হয়, যে পত্রিকার ও দপ্তর সচিব, সেই পত্রিকা নিয়েই তো গল্প লেখা যায়। বাংলা ভাষায় সবচেয়ে বয়স্ক কাগজ। এই পত্রিকা অনেক নামী লেখকের জন্ম দিয়েছে। প্রচুর ভালো গল্প বেরিয়েছে। এই তো সেই অফিসঘর, যেখানে অনেক বিখ্যাত লেখক-শিল্পীরা হাজির হতেন। তাঁদের নিয়ে কত গল্প, কত ঘটনা! সাম্য শুনেছে, যে চেয়ারে এখন ও বসে, সেখানে একসময় মতি নন্দী বসতেন। ওঁর ‘বেহুলা’ গল্প এই পত্রিকায় বেরুবার সঙ্গে সঙ্গে হইচই পড়ে যায়। পরবর্তী সময়ে তিনি এক বাণিজ্যিক কাগজে চাকরি নিয়ে চলে যান। সেখানে তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘কোনি’ বেরোয়। তৎকালীন এই পত্রিকা সম্পাদক কাগজটা বগলে নিয়ে দপ্তরে ঢোকেন। দপ্তরে তখন এ কালের এক বিখ্যাত লেখক বসে আছেন। তাঁর মাথায় কাগজটা ঢাঁই করে মেরে বলেন, তোমরা সব প্রগতি সাহিত্য করো! দ্যাখো প্রগতি সাহিত্য কাকে বলে! পড়ে দ্যাখো। বলে কাগজটা ওঁর সামনে রাখলেন। কিংবা শম্ভু মিত্র! যিনি হঠাৎ হঠাৎ বাদামভাজা খেতে খেতে জলদগম্ভীর কণ্ঠে ‘দীপেন’ বলে সরবে উপস্থিত হতেন। তাঁর ‘চাঁদ বণিকের পালা’ প্রথম এই দপ্তরেই পাঠ করা হয়েছিল। সেদিন ঘরে তিলধারণের জায়গা ছিল না। সিঁড়িতেও লোক দাঁড়িয়ে শুনেছিল। আর এই সেই সিঁড়ি, যেখানে একদিন দারিদ্র্যক্লিষ্ট সমরেশ বসু প্রখ্যাত জীবনীলেখক নারায়ণ ওঝাকে আর্ত গলায় বলেছিলেন, মনে হচ্ছে ডুবছি--। নারায়ণ ওঝা সঙ্গে সঙ্গে সমরেশ বসুর হাত চেপে বলেছিলেন, আজ যা বললে বললে, আর কখনও মনেও আনবে না। ডুবছি ভাবলেই ডুববে।

এই তো সেই সিঁড়ি। সাম্য সিঁড়ির মাথায় দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্যটা অনুভব করার চেষ্টা করে। বুকের মধ্যে শিরশিরানি। এ সিঁড়ি কি ওঠার, নাকি নামার! গল্পটা তো এখান থেকে শুরু করা যায়! নাম হবে সিঁড়ি। এখানে কেউ ওঠে, কেউ নামে। তারপর এই পত্রিকার ঘর। এখানে কেউ আসে তার স্বপ্নের জলছবি আঁকতে। সেটা যখন বাস্তবায়িত হয়, তখন তার নামার মধ্যে কেমন চপলতা থাকে, যেন ময়ূরের ছন্দ। সে নামে তরতর করে। আর যার স্বপ্নের অপমৃত্যু ঘটে, তার নামার মধ্যে যেন কেবলই বিমর্ষতার ছোঁয়া। সে নামে শ্লথগতিতে, এক পা এক পা করে। হ্যাঁ এ গল্প লেখাই যায়। সে নিজেও তো ওইভাবেই উঠে এসেছিল একদিন। সেই সময়কার অনুভূতি আর আজকের অনুভূতি-- এ দুয়ে মিলিয়ে তো লেখা যায় একটা গল্প। কিন্তু লিখতে বসে টের পায় মাথার পিছনদিকে দেওয়ালে ঝোলানো ফোটোগ্রাফ থেকে তীব্র চোখে তাকিয়ে আছেন দীপেন বন্দ্যোপাধ্যায়, ননী ভৌমিক। তাঁরা যেন উঁকি মেরে দেখছেন সাম্য কী মাপের লেখক, কতদূর এগোবে! যখনই এটা মনে হয়, লেখা আর এগোতে চায় না। মাঝপথে খেই হারিয়ে ফেলে।

দিন পার হয়ে যাচ্ছিল। সাম্য লজ্জায় কফি হাউসমুখো হয় না। পাছে সুবিমলদার সঙ্গে দেখা হয়! প্রতি দিন ওর যুদ্ধের। যুদ্ধ টেবিলে কাগজ কলম নিয়ে বসা, ভাবা, আর লেখার প্রস্তুতি চালানো। লিখতেই হবে। না হলে ও মানুষ কেন? মানুষই তো পারে যে-কোনও বাধার প্রাচীর ঠেলে চুড়োয় উঠতে। লেখকের প্রসব বেদনার কথা ও জানে। সেটা যখন শুরু হয়, তখন বোধহয় আশঙ্কা আতঙ্কের অস্তিত্ব থাকে না।

এই যখন অবস্থা, তখন একদিন সাম্য কলকাতায় যাবে বলে বেরুল বাড়ি থেকে। সেদিন তিরিশে সেপ্টেম্বর। সেটা এক অদ্ভুত দিন। সেদিন স্টেশনে দেখল গুটিকতক লোক দাঁড়িয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। বৃহস্পতিবার। এমন তো হওয়ার কথা নয়। ট্রেনেও দেখল কামরা প্রায় ফাঁকা। সামান্য যে দু-চারজন আছে, তাদের চোখেমুখে কেমন অস্থিরতা। ট্রেন ছাড়ার মুখে লেখকের বন্ধু গৌতম দত্ত উঠল। ও



ঘোড়ারাস গ্রামীণ পাঠাগারের গ্রন্থাগারিক। একই সঙ্গে যায়। গৌতম বলল, আজ কলকাতা না গেলেই নয়!

সাম্য বলল, কেন?

গৌতম বলল, আজ বাবরি মসজিদের রায় বেরোবে জানো না!

সাম্য মাথা নাড়ল। জানে। বাবরি মসজিদের বিতর্কিত জমি সংক্রান্ত রায় দেবে এলাহাবাদের হাইকোর্টের লক্ষ্মৌ ডিভিশন বেঞ্চ। পাঁচদিন আগেই রায় দেওয়ার কথা ছিল। তখন থেকে সাম্য দেখেছে, কাগজে চ্যানেলে কীভাবে প্যানিক ছড়ানো হচ্ছে। দেশের প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে আঞ্চলিক নেতা-- সবাই সম্প্রীতি বজায় রাখার আবেদন জানাচ্ছেন। সব রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে দেশের আইন-বিচার-শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার আহ্বান জানানো হচ্ছে। কাগজে বিশেষ এডিটোরিয়াল বেরুচ্ছে, চ্যানেলে স্পেশাল প্রোগ্রাম হচ্ছে বিদ্বৎজনদের নিয়ে। কিন্তু দিল্লির এক নাগরিক সুপ্রিম কোর্টে আবেদন জানায়, আদালতের বাইরে সমাধানের সামান্য সুযোগ থাকলে সেটা দেওয়া উচিত। সুপ্রিম কোর্ট সেই আবেদন গ্রহণ করায় উত্তাপ হঠাৎই স্তিমিত হয়ে আসে। কাগজে লেখালেখি, বাসে-ট্রেনে হইচই-- সব এক কথায় নিশ্চুপ। মিডিয়ার ভাষায় একটা হাইপ উঠতে উঠতেও উঠল না।

সুপ্রিম কোর্ট গতকাল সেই আবেদন খারিজ করে দিয়েছে। ফলে রায়দানের আর কোনও বাধা রইল না। সাম্য এসবে কোনও উত্তেজনা অনুভব করে না। ওর কেমন হাসি পায়।

সাম্য বলল, আরে সে তো লক্ষ্মৌর ব্যাপার, এখানে কী!

গৌতম বলল, বলা যায়! চারদিকের যা অবস্থা, বেধে যেতে কতক্ষণ! আমি তো অফিসে সই করেই ফিরতি ট্রেন ধরব।

গৌতম নেমে গেল ঘোড়ারাস স্টেশনে। তখনই সাম্য অনুভব করল তীব্র তীক্ষ্ণ প্রসব বেদনা। গল্প। একটা গল্প লিখতে হবে। কথাটা ভাবতেই শিরদাঁড়ায় চিন চিন শিহরণ শুরু হয়ে গেল। শিরা-উপশিরায় রক্তের চঞ্চলতা টের পেল। এর মানে খুব পরিষ্কার। দূরের ছায়া ছায়া ছবির মতো কিছু একটা আসছে। যত এগোচ্ছে, তত টের পাচ্ছে বুকের মধ্যে অদ্ভুত অনুভূতি। এ যাবৎ যে গল্পগুলো লিখেছে, তার আগের মুহূর্তে এই রকমই অনুভূতি ও টের পেয়েছিল। ট্রেনের জানলা গলে ধানমাঠ, গাছপালার দৃশ্য সরে যাচ্ছে দ্রুত। সাম্যর খেয়াল নেই সেদিকে। ও যেন নিজের মধ্যে বুঁদ হয়ে আছে। গল্পটা যেন আলেয়ার মতো দপ দপ করে উঠছে চোখের সামনে।

সাম্য অনেক বিষয়ে গল্প লিখেছে, কিন্তু দাঙ্গা নিয়ে একটিও নয়। নয় মানে লিখতে পারেনি। লিখবে কী, আজ পর্যন্ত দাঙ্গার সঙ্গে ওর প্রত্যক্ষ সাক্ষাৎ ঘটেনি। খুব ছেলেবেলার একটা দৃশ্য ওর মনে আছে। ওরা যে শহরে থাকে, সেখানে হঠাৎ কী কারণে যেন গণ্ডগোল শুরু হয়ে যায়। কী গণ্ডগোল, কোথায় হচ্ছে-- এসবের কিছুই জানা নেই সাম্যর। ও দেখল ওর বাবার চোখেমুখে আতঙ্কের ছবি। বাবা অফিস কোয়ার্টারের সিঁড়ি বেয়ে একবার উঠছেন, আবার নেমে আসছেন উদ্বিগ্ন মুখে। একটা আতঙ্কের পরিবেশ যেন। ওই ছোটোবেলায় এসব বোঝার কথা নয় ওর। বোঝেওনি। বাবার ওই সিঁড়ি ভেঙে ওঠানামার মধ্যে কেমন মজা পেয়ে গিয়েছিল। আজও যখন দাঙ্গার প্রসঙ্গ আসে, তখনই চোখে ভেসে ওঠে সেই সিঁড়ি ভাঙার দৃশ্যটা। এরপর দাঙ্গার সঙ্গে ওর পরিচয় ঘটে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পরে। সেই ৬ ডিসেম্বর সাম্য ছিল স্বরূপনগরে, থানার উদ্যোগে একটা যাত্রা উৎসবে। সন্ধের সময়ও জানে না কী ঘটনা ঘটে গেছে দূরে অযোধ্যা নগরীতে। থানার ও সি পরিচিত। তিনি যেন কেমন অস্থির ছিলেন। মুসলমান অধ্যুষিত স্বরূপনগরে সেদিন ব্রজেন দে-র বাঙালি পালা খুব জমেছিল। হিন্দু-মুসলিম শিল্পীরা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ভেরী বাজিয়েছিলেন রঙ্গমঞ্চে। মাঝরাতে সাম্যরা ফিরেছিল। রাস্তায় দেখেছিল যাত্রা ফেরত মানুষেরা ফিরে যাচ্ছে গল্প করতে করতে। তাদের মধ্যে হিন্দু ছিল, মুসলমানও ছিল। ইছামতী নদী পার হয়ে শহরে যখন প্রবেশ করল, তখনই যেন আতঙ্কের সঙ্গে ওর পরিচয় ঘটল। মোড়ে মোড়ে পুলিশ। সাম্যদের ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, কোথা থেকে আসছেন, কী ব্যাপার ইত্যাদি। এই



ব্যাপারটা নিয়ে একটা গল্প লিখেছিল সাম্য। আতঙ্কের পরিবেশে মানুষের স্বাভাবিক আচরণের গল্প। এই স্বাভাবিকতা যেন দাঙ্গার বিরুদ্ধে দৃপ্ত প্রতিবাদ।

তবু সেখানে দাঙ্গা ছিল না। চেষ্টা করেও লিখতে পারেনি সাম্য। এখন যেন সেই সুযোগ এসে গেল সাম্যর। বাংলায় কত অসাধারণ গল্প লেখা হয়েছে এই বিষয় নিয়ে। তেমন একটা সুপ্ত বাসনা কি ছিল না সাম্যর মনে? ছিল। সুযোগ হচ্ছিল না। এখন যেন সেই সুযোগ এসে গেল হাতের মধ্যে। কিন্তু কোথা থেকে লিখবে, কীভাবে লিখবে? সামনে যেন দিশাহীন পথ। কোনও আলো নেই, কোনও ফ্ল্যাশ উঠছে না কোথা থেকেও, যা দিয়ে গল্প লেখা যায়। অথচ প্রবল প্রসব বেদনা যেন ট্রেনের গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বেড়ে চলে।

সাম্য যখন পা রাখল শিয়ালদায়, তখন দুপুর। অন্যদিনের মতো ব্যস্তসমস্ত ভিড়ে ভিড়াক্কার শিয়ালদা নয়, কেমন শান্ত শীতল আর শূন্যতায় ভরপুর শিয়ালদা। লোকজন দ্রুত চলে যাচ্ছে যে যার গন্ত্যবে। যে পুলিশগুলো গেটের কাছে বাঙ্কারে অলস ভঙ্গিতে বসে থাকে, তারা কেমন তটস্থ হয়ে দাঁড়িয়ে। চোখেমুখে অস্থিরতা। দুজন চেকার চাপা গলায় কথা বলছে নিজেদের মধ্যে।ওদের যেন বিনা টিকিটের যাত্রী ধরার ইচ্ছেই নেই আজ। প্রফুল্ল গেটের সামনের চত্বর সবসময় ভরাভরন্ত থাকে। টিকিট কাউন্টারের সামনে থিকথিকে ভিড়, সিঁড়িতে হকারদের চেঁচামেচি-- সবই আছে, তবু যেন কেমন ম্রিয়মাণ।

এসব পেরিয়ে সাম্য পা রাখল স্টেশন চত্বরের সামনের রাস্তায়। ফ্লাইওভারের তলা দিয়ে, খাবার গলির মধ্যে দিয়ে যেতে রোজ কালঘাম ছুটে যায়, এত ভিড়। ধাক্কাধাক্কি ছাড়া এ পথ পেরনো প্রায় অসম্ভব। আজ যেন গলিটা অলস ভঙ্গিতে শুয়ে আছে। দু-তিনজন লোক মাত্র, তারা সবই দোকানদার। সাম্য খুব সহজেই মহাত্মা গান্ধি রোডে পা রাখল। অন্যদিনের তুলনায় অনেক ফাঁকা রাস্তা। বাসও অনেক কম। সাম্য এগোতে এগোতে দেখতে পেল, রাস্তার দু-পাশের দোকানগুলোর সাটার নেমে যাচ্ছে। ফুটপাথ জুড়ে যে সবজিওয়ালারা বসে, তাদের কাউকেই দেখা যাচ্ছে না। ফাঁকা ফুটপাথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে বৈঠকখানা রোডের মুখে থমকে দাঁড়াল সাম্য। গলির ভেতর দুই কুলির মধ্যে জোর ঝগড়া বেধেছে। একটা বড়ো পেটি টানাটানি চলছে দুজনের মধ্যে। সাম্যর শিরদাঁড়ায় কাঁপুনি উঠল, আরে ওই দুজন ‘আদাব’ গল্পের সেই দুই চরিত্র না! ওদের মধ্য থেকে কি উঠে আসবে সেই মহান মানবিক গল্পের ফ্ল্যাশ? সাম্য প্রায় বেহুঁশের মতো এগিয়ে যাচ্ছিল, তখনই গলির অন্যকোণ থেকে গম্ভীর গলা ভেসে এল, মজাকি হচ্ছে, ভাগ হিঁয়াসে--! অমনি দুজন কেন্নোর মতো গুটিয়ে গেল। দুজন দু-দিকে প্রায় তাড়া খাওয়া জন্তুর মতো পালিয়ে গেল।

সাম্য দাঁড়িয়ে পড়ল! বুকের মধ্যে থেকে যেন দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। হল না। যা ভেবেছিল, তার সঙ্গে বাস্তবের অনেক ফারাক। অথচ শিরদাঁড়ায় শিহরণ যেন ঝড়ের মতো বয়েই চলেছে। ও আবার পা চালায়। হাঁটতে হাঁটতে কলেজ স্ট্রিট। প্রায় ফাঁকা রাস্তা। দ্রুত পায়ে হেঁটে ঠনঠনিয়া। সেখানে একটা প্রেসে কাজ মিটিয়ে বিদ্যাসাগর কলেজের সামনে দিয়ে সবে বিধান সরণিতে পা রেখেছে, মোবাইল বেজে উঠল। গৌতমের ফোন, কলকাতার কী অবস্থা?

সাম্য দেখল তাঁতপট্টির দোকানগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে দ্রুত। একটা ট্রাম যেন আতঙ্ক ছড়াতে ছড়াতে ছুটে আসছে। যাত্রী খুব কম। কেমন যেন শঙ্কার ছায়া চারদিকে। একটা লোক সাধারণ ব্রাহ্ম সমাজের সামনে থেকে দ্রুত রাস্তা পার হয়ে আসছে, আর চিৎকার করে বলছে, হো গিয়া হো গিয়া--! কী হো গিয়া? তবে কি কোথাও--! নাহ্, এসব কথা গৌতমকে বলা উচিত হবে না। বললে এখনই হয়তো ওর ছোট্ট শহরে গুজব ছড়িয়ে পড়বে। সেই গুজবের ডালপালা শত শাখায় বিকশিত হবে না কে বলতে পারে! সাম্য হেসে বলল, কলিকাতা আছে কলিকাতাতেই। আরে বাবা সব ঠিক চলছে।

শ্রীমানি বাজারের দোতলায় সাম্যর প্রকাশনী অফিস। সেখানে ঢুকে দেখল ম্যানেজার চন্দন বসে আছে। সাম্য বলল, কী ব্যাপার বলুন তো, চারদিক সব বন্ধ হয়ে যাচ্ছে! রায় কী বেরুল?



চন্দন বলল, কি জানি কিছুই তো জানতে পারছি না। এখানে টিভি থাকলে খবরটা দেখা যেত।

এই সময়ে চাঁদুদা চা দিতে এসে চন্দনের কথা শুনে বলল, আপনারা কি ভাবেন, সাংঘাতিক কোনও রায় বেরুবে! হাসালেন। আরে বাবা দেশটার নাম ভারতবর্ষ। আর মেরা ভারত মহান। দেখবেন পর্বতের মূষিক প্রসব ছাড়া কিস্সু হবে না।

নির্বিকার ভঙ্গিতে কথাগুলো বলে চলে গেল চাঁদুদা।

সেখানে কাজ সেরে সাম্য আবার কলেজ স্ট্রিটে। ততক্ষণে বিকেল। মোড়ের পাতিরাম স্টলে ইতিমধ্যে পত্র-পত্রিকা গোছানো হয়ে গেছে। বন্ধ করার তোড়জোড় চলছে। সাম্য রাস্তা পার হয়ে কলেজ স্ট্রিট মার্কেটের পিছনে ঘোষ কেবিনের দোতলায় উঠে গেল। ওর পত্রিকার দপ্তর। ঘর খুলে ঝাঁট দেওয়া ও জল এনে দেওয়ার মহিলাকে ডাকল, জল এনে দাও মাসি।

মাসি বলল, আমি তো চলে যাচ্ছি।

এত তাড়াতাড়ি!

সবাই যাচ্ছে। বলছে অবস্থা ভালো নয়, তাই।

মাসি চলে গেল। সাম্য ওর অফিসের উল্টোদিকে অধ্যাপক সমিতির ঘর। সেখানে তখন টিভি চলছিল। সাম্য দেখল লক্ষ্মৌ বেঞ্চ রায় দিয়েছে। বিতর্কিত স্থান হিন্দু মন্দির ছিল এটা মেনে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু মুসলিমের দাবিও অস্বীকার করা হয়নি। অর্থাৎ হিন্দু-মুসলিম উভয়কেই সন্তুষ্ট করা হল। সাম্যর মুখে হাসি ফুটল। চাঁদুদার কথাই যেন ফলে গেল।

সাম্য ফিরে এল ওর ঘরে। এখন পুজো সংখ্যার প্রস্তুতি চলছে। অফিসে কেউ আসেনি। আসবেও না বোধহয়। এমনকী ড. প্রবীর লাহা, যার আসা প্রায় জলভাতের মতো, সেও আসেনি। সাম্য তাকাল দেওয়ালে ঝোলানো ননী ভৌমিক ও দীপেন বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছবির দিকে। মনে মনে বলল, আজ অন্তত ঘাড়ের কাছে নিশ্বাস ফেলবেন না। পারি আর না পারি একবার শেষ চেষ্টা করে দেখব। সাম্য কাগজ টেনে নেয়। গালে হাত দিয়ে ভাবে, এতক্ষণ যা দেখে এল সেটা নিয়ে কি গল্প লিখবে? কোথা থেকে শুরু করবে? শুরুটাই তো গোলমেলে। কাগজে আঁকিবুকি কেটে চলে সাম্য। লেখা আর হয় না। কোনও ছবিই আসছে না। কিছুক্ষণ পরে ‘ধুত্তোর’ বলে কাগজ সরিয়ে রাখে। পকেট থেকে মোবাইল বার করে নম্বর দেখতে দেখতে মনে হল বাবুকে ফোন করি। আর কেউ না আসুক বাবু নিশ্চয়ই কফি হাউসে আসবে। বাবু আর কফি হাউস প্রায় সমার্থক। রোজ ওর গলার জোরে হাউস জমজমাট হয়ে থাকে।

সাম্য নম্বর টিপে দিল। রিং হচ্ছে। ওপারে বাবুর ভারি গলা, বল।

সাম্য বলল, তুই কোথায়?

বাড়িতে।

বেরুবি না?

মাথা খারাপ! কোথায় কখন গণ্ডগোল লেগে যাবে ঠিক আছে!

ফোন ছেড়ে দিয়ে হাসল সাম্য। তাহলে বাবুও!

সাম্য এখন কী করবে? বাড়ি যাবে! বাড়ি গেলে তো হয়েই গেল। যে উদ্দেশ্য নিয়ে বেরিয়েছে, সেটাই মাটি। অপটিকাল নার্ভে যা পৌঁছবে তারই প্রতিক্রিয়া তো কাগজে কালি কলমের অক্ষর গাঁথা। নাহ্, এখনও আসছে না সেটা।

একটু পরে সাম্য প্রেসে ফোন করল। পুজো সংখ্যার ম্যাটার এখনও দিয়ে যায়নি। আর তো বেশিদিন নেই।

প্রেস মালিক মুক্তি ফোন ধরেই বলল, তুমি কি পাগল, আজকের দিনে কেউ বাড়ি থেকে বেরোয়!

সাম্য বলল, কেন, কী হয়েছে?

আরে বাবা গণ্ডগোল লেগে গেলে কী হবে!



কেন, কোথাও লেগেছে নাকি!

আরে বাবা লাগতে কতক্ষণ! ওখানে বসে আছ কেন, বাড়ি চলে যাও। বলে ফোন কেটে দিল মুক্তি। আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গে আবার মোবাইল বেজে উঠল। সাম্যর পরিচিত বীরেশদা বললেন, তুমি কি কলেজ স্ট্রিটে?

সাম্য বলল,হ্যাঁ।

ওখানে নাকি দাঙ্গা হচ্ছে!

সাম্য হেসে ফেলল, কই, আমি তো কিছু দেখতে পাচ্ছি না।

আরও দু-চার কথা বলে ফোন রেখে দিল সাম্য। নাহ্, এবার বাড়ি ফিরতে হবে। সাম্য ঘড়ি দেখল। আটটা দশ। ওর ট্রেন ন-টা বারোয়। এখান থেকে শিয়ালদা হেঁটে যাবে। মোটামুটি দশ মিনিট লাগবে।

সাম্য যখন ঘরে তালা লাগাচ্ছে, তখনই নিচের ঘোষ কেবিন থেকে চিৎকার চেঁচামেচির শব্দ কানে এল। সাম্য শিউরে উঠল। তবে কি সত্যিই লেগে গেল! দ্রুত নিচে নেমে এল সে। চায়ের ভাঁড়ে অর্ধেক চা দিয়ে কেন তিন টাকা দাম নেওয়া হচ্ছে--এই নিয়ে খদ্দের-মালিকে বচসা। মালিক বলল, জিনিসপত্রের যা দাম বেড়েছে, তাতে আর তিন টাকায় চা খেতে হবে না, চায়ের গল্প শুনতে হবে। বাকিরা হো হো করে হেসে উঠল। সাম্য ভালো করে দেখল, ওই হাসির দলে হিন্দু আছে, মুসলমানও আছে। অথচ কোনও তরঙ্গ উঠছে না, কোনও অভিঘাতও নেই। ওরা কি আজকের ঘটনা কিছুই জানে না? নাকি সব জেনেও গুরুত্ব দিচ্ছে না! কোথায় কোন অযোধ্যা নগরীতে কী হবে, কী হতে পারে-- এ নিয়ে সারা শহর তোলপাড় হতে পারে, আতঙ্কিত হতে পারে, তাতে ওদের কিছু যায় আসে না। ওরা জিনিসপত্রের ক্রমবর্ধমান দাম নিয়ে ব্যস্ত, সন্ত্রস্ত।

সাড়ে আটটায় কলেজ স্ট্রিটের মোড়ে দাঁড়াল সাম্য। প্রেসিডেন্সি কলেজের দিকে পুরনো বইয়ের দোকানগুলো সব বন্ধ। এক অদ্ভূতুড়ে আঁধার মুখ ব্যাদান করে আছে। ওইদিক থেকে একটা বাস তাড়া খাওয়া কুকুরের মতো শ্বাস ফেলতে ফেলতে ছুটে এসে বিপজ্জনকভাবে মহাত্মা গান্ধি রোডের দিকে বাঁক নিল। তাতে একজন মাত্র যাত্রী। তার চোখে কি আতঙ্কের ছায়া! মোহিনীমোহনের সামনে যে অটোগুলো রোজ ‘শিয়ালদা শিয়ালদা’ বলে হাঁক পাড়ে, তারা কেউ নেই। সুনসান রাস্তায় সাম্য হাঁটতে শুরু করল। পাশ দিয়ে হুসহাস ট্যাক্সি। প্রায় ফাঁকা বাস সন্ত্রাসের আবহে পিষ্ট হতে হতে দ্রুতগতিতে চলে যাচ্ছে কোন অজানা অন্ধকারে। স্ট্রিট ল্যাম্পগুলো অনেক ইতিহাসের সাক্ষীর মতো চুপচাপ দাঁড়িয়ে। আকাশে তারাদের মিটমিট। একলা কালপুরুষ বুক চিতিয়ে ক্রমে সরে যাচ্ছে পশ্চিম আকাশে। কেউ তো স্থির নেই। এক আতঙ্কগ্রস্ত নগরীর বুকে সবই তো চলছে, যেমন চলে।

হাঁটতে হাঁটতে বেনিয়াটোলার মুখে কুকুরের ঘেউ ঘেউ শুনে থমকে দাঁড়াল সাম্য। দুই কুকুরের মধ্যে প্রচ- ঝগড়া চলছে, আর ওদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে এক বুড়ি লাঠি উঁচিয়ে বলছে, আরে শালো তোরা দেখছি দাঙ্গা বাধাবি, দাঙ্গা! দ্যাখ পারিস কিনা! সাম্যর মনে হল, সর্বগ্রাসী আতঙ্কের মুখে বুড়ির কথাগুলো যেন দুঃসাহসিক চ্যালেঞ্জ।

সাম্য দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবল, তাহলে দাঙ্গাটা কোথায় হচ্ছে? বাইরে তো নয়, সে কি তবে অন্তরমহলে? নাহ্, এ প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত বোধহয় ওর প্রসব বেদনা চলবে। চলতেই থাকবে।


সাম্য মুখ তুলে দেখল, স্টেশন এখনও অনেক দূর।



লেখক পরিচিতি
অনিল ঘোষ

জন্ম উত্তর ২৪ পরগনা জেলার বসিরহাট শহরেনদীর তীরে।  সেখানেই বসবাসপড়াশোনা। তারপর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় এমএ। বাঁধাধরা চাকরির পথ ছেড়ে প্রায় বাউণ্ডুলে জীবনযাপন। কখনও টিউশানিকখনও সাংবাদিকতা। বর্তমানে কলকাতার প্রকাশনা জগতের সঙ্গে যুক্ত। 
পরিচয় পত্রিকার দপ্তর সম্পাদক। সম্পাদিত পত্রিকা ইছামতী বিদ্যাধরী। 

লেখালেখির সূত্রপাত স্কুল থেকে। এ পর্যন্ত গল্প-উপন্যাস-নাটক ও অন্যান্য রচনা মিলিয়ে তেরোটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থÑÑ রণক্ষেত্রচারাগাছ ও অন্যান্য গল্পনিউ জার্সির ফোন,মহাযুদ্ধের পটভূমি (গল্প সংকলন)প্রান্তরের গান (উপন্যাস)নির্বচিত নাটক (নাটক)অকিঞ্চন কথামালা (কবিতা)শ্রেষ্ঠ শিখাবিষয় বসিরহাট (সম্পাদনা) প্রভৃতি।

২০০৭ সালে ছোটোগল্পের জন্য বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ প্রদত্ত ইলা চন্দ স্মৃতি পুরস্কার প্রাপক। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন