মঙ্গলবার, ১১ ফেব্রুয়ারী, ২০১৪

বিপুল দাসের প্রবন্ধ এই সময়ের ছোটগল্প

ফুকো, দেরিদা, বাখতিনের তত্ত্ব বা বোর্হেসের ছোটগল্পের বৈশিষ্ট নিয়ে আলোচনা করবা না। আমি তার অধিকারীও নই। নিতান্ত একজন গল্পকার হিসেবে জীবন এবং সাহিত্যকে যেমন দেখেছি, নিজের লেখালেখির অভিজ্ঞতাই আপনাদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে চাই।

এই সময়ে বাংলাভাষায় যারা ছোটগল্প লিখছেন, হাতে গোণা দু’একজনকে বাদ দিলে যা পড়ে থাকছে, সেগুলো পড়ে মনে হতেই পারে চলাচলের নিরাপদ, প্রথাগত পথকেই তারা বেছে নিয়েছেন। ব্যক্তিবিশেষের গল্প বলার ভঙ্গিতে একটু উনিশবিশ হচ্ছে, কিন্তু ভয়ংকর কোনও বিষ্ফোরণ, যার তীব্রতা কাঁপিয়ে দিতে পারত সনাতন কাঠামো, গল্পবলার প্রথাগত প্রকরণকে আক্রমণ করে খুঁজে আনতে পারত নতুন কৌশল – তেমন বারুদগন্ধী বিপজ্জনক পথে প্রায় কেউ নেই। হাতে গোণা দুচারজনের লেখায় সেই দুঃসাহসের ইশারাটুকু কখনও ঝিলিক দিয়ে যায়। কিন্তু পাঠকের কাছে পৌঁছবার জন্য একটা আকুতি বোধহয় লেখার সময় গোপনে কোথাও কাজ করে। লেখক-পাঠক communication—দায়, সেতুবন্ধনের গোপন প্রবৃত্তি পরোক্ষে কাজ করে। সেই দায় শেষ পর্যন্ত পাঠককে একটা গল্প শোনাতে চায়। তখন সমঝোতার প্রশ্ন আসে। কেমন হবে আমার বলার ভঙ্গি, কাদের জন্য আমি গল্প লিখছি, সমাজের কোন শ্রেণীর মানুষের কাছে আমি আমার বার্তাটুকু পৌঁছে দিতে চাই, emotional factor, নাকি cerebral factor – কাকে বেশি প্রাধান্য দেব।

তখন যে প্রশ্নটা অবধারিতভাবে উঠে আসে, তা হল – সাহিত্য কি একধরণের বিনোদনের উপকরণ, নাকি আমাদের জীবনযাপনে অবিরত যে সংশয়, যে সংকট আমাদের বেঁচে থাকাকে বিপদগ্রস্ত করে রাখে, তাকে উন্মোচিত করা। আমাদের বেঁচে থাকার গ্রাফ তো কখনওই সরলরেখা নয়। অজস্র উঁচুনিচু রেখা। বিচিত্র, রহস্যময়। প্রেম, অপ্রেম, ঘৃণা, ভালোবাসা, পেটের খিদে এবং যৌনতা, কাম ও ঘাম, অশ্রু এবং রক্ত – এসব কিছুই একজন লেখকের কালির সঙ্গে মিশে থাকে। এর ভেতর কোনটা ভালো, কোনটা মন্দ – সেটা নির্দেশ করার দায় লেখকের নয়। সে দায় সমাজসংস্কারকদের, সমাজসেবীর, গুরুদেবের, আচার্যদের, যুগাবতার মহাপুরুষদের। লেখক শুধু সত্ত্ব এবং তমঃ, আলো এবং আঁধারকে শিল্পসম্মতভাবে চিহ্ণিত করেন। যদি বিনোদন হয়, তবে সে লেখায় cerebral factor –এর কোনও প্রয়োজন পড়ে না। সেখানে বাণিজ্যমুখীনতাই প্রধান বিচার্য বিষয়। পাঠকের ইচ্ছাপূরণের জন্য গোলগল্প চাই। পাঠকের কাছে খুব সহজে পৌঁছে যাওয়ার কয়েকটা সমীকরণ থাকে। সে সব পড়ার পর একটা তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হয় শুধু। কিন্তু যে রসায়নে কমলকুমার মজুমদারের ‘মতিলাল পাদ্‌রি’ বা বিমল করের ‘আঙুরলতা’ গল্প চিরকালের জন্য পাঠকের মনে আসন পেতে বসে, সে রসায়ন এসব বাণিজ্যমুখী গল্পে থাকে না। 

‘মতিলাল পাদরি’ গল্পে শেষের দিকের একটি প্যারা মনে করুন। ‘ এই প্রকান্ড বনভূমি, সুদীর্ঘ বৃক্ষরাজি, তির্যক আলোকপাত। সমস্ত কিছুই রহস্যময়। শিশুর ভীত চোখ এখনও কাকে খোঁজে, চোখ অনবরত মোছার ফলে মুখমন্ডল মলিন হয়েছে। সে কাঁদে, এগিয়ে আসে। আলোক ভেদ করে তার কান্নার শব্দ। পাখী উড়ে যায়, পাতা উড়ে উড়ে পড়ে আর দু-চারটে শালফুল পালকের মত দুলে দুলে নামে। শিশুপুত্র টলতে টলতে আসছে। পাদরি নিজের বুকে যেন লাথি মেরে লাফ দিয়ে উঠেই দৌড়ে শিশুর কাছে গিয়ে আছড়ে পড়লেন। শুধু তার ছোট দেহে মুখ ঘষতে ঘষতে ক্ষীণস্বরে বললেন, ‘ও প্রাণ, ও প্রাণ’। পটভূমি, প্রকৃতি, শিশুর ভেতর চিরকালের প্রাণের স্পন্দন, এই যেন সেই বেথেলহেমের দেবশিশু, মনেপড়ে নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর কলকাতার যীশু, কলকাতার ব্যস্ত রাজপথের সমস্ত চলমানতা যে উলঙ্গ শিশু স্তব্ধ করে রাস্তা পার হয়ে যাচ্ছিল। ওই একটি মুহূর্ত শিল্প সৃষ্টি করে। মহাজীবনের কথা বলেন কমলকুমার। অন্ত্যজ এক রমণীর, ভামর, জারজ সন্তানের দেহে মুখ ঘষছেন একজন পাদরি। বলছেন – আমি সত্যই ক্রিশ্চান নই গো বাপ। এই কনফেসন গল্পটিকে এক অসম্ভব উচ্চতায় পৌঁছে দেয়। 

এ সময়ের ছোটগল্প – এ সময় বলতে আমি ধরুণ বলছি গত পঁচিশ থেকে তিরিশ বছর। এ সময়টা জুড়ে একদম হাল সময়টা ছেড়ে দিলে রাজনৈতিক ভাবে মোটামুটি স্থিতাবস্থাই বলা যায়। বামফ্রন্টের শাসনকাল। এ সময় শহর নয়, দ্রুত পালটে যাচ্ছিল গ্রামজীবন। মানুষের বেঁচে থাকার জন্য লড়াইএর কৌশল, জীবনযাপন পদ্ধতির দ্রুত পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছিল। আপনারা নিশ্চয় লক্ষ করেছেন গত পঁচিশতিরিশ বছরের বাংলা ছোটগল্পে এই পরিবর্তনই লেখকদের কলমে উঠে আসছিল। বেঁচে থাকার জন্য সমস্ত উপাদান, মানুষ, পরিবেশ – এসবের দ্রুত পরিবর্তন, ফলে ব্যক্তিমানুষ এবং গোষ্ঠিবদ্ধমানুষ – মানুষের বেঁচে থাকায় হঠাৎ বদল ঘটে যাচ্ছিল। একটা দুটো উদাহরণ – পুকুর, বাঁশঝাড়, আলপথ, ব্রতকথা, গরুরুগাড়ি – একটা দুটো করে কমে যাচ্ছে। আসছে এস টি ডি বুথ, মোবাইল, বাইক, মোমোর দোকান। আমাদের চোখের সামনে এই ছিল হারুদার মুদিদোকান, হয়ে গেল মনিকা শপিং প্লাজা। এই পরিবর্তন আমাদের সবার চোখের সামনেই ঘটে যাচ্ছে। কিন্তু লেখক সমাজের এই পাল্টে যাওয়া, পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে মানুষের খাপ খাইয়ে নেওয়ার ইতিহাসটুকু লিখে রাখেন। এ ভাবেই এ সময়ের কজন গল্পকার, নাম উল্লেখ করেই বলছি – অমর মিত্র, স্বপ্নময় চক্রবর্তী, আফসার আহমেদ, নলিনী বেরাদের গল্পে বারে বারে এই পরিবর্তনের কথা উঠে এসেছে। ছোট ছোট বর্ণনার ভেতর দিয়ে প্রকৃত সত্যসন্ধানের চেষ্টা। ভারতবর্ষকে চেনার চেষ্টা। 

আসলে যখন কোনও রাজনৈতিক সংকট, সামাজিক অস্থিরতা আমাদের বেঁচে থাকাকে, আমাদের অস্তিত্বকে বিপন্ন করে তোলে, তখন শিল্প, প্রধানত সাহিত্য এগিয়ে আসে তার লড়াই নিয়ে। ভাষাকে, অক্ষরকে হাতিয়ার করে সমস্ত মানুষের চেতনাকে, তার বোধের কাছে লড়াই করার বার্তাটুকু পৌঁছে দেয়। এ লড়াই, বুঝতেই পারছেন বন্দুককামান নিয়ে লড়াই নয়, মনুষ্যত্বহীনতা, লোভ, হিংসা, জাতিদাঙ্গা, সাম্প্রদায়িকতা – যা এই সমাজকে, সভ্যতাকে পেছন দিকে টানে, তাকেই চিনিয়ে দেন লেখক। 

আসলে সংশয় এবং সংকট। আমাদের বেঁচে থাকার প্রতিটি মুহূর্ত এই সংশয় এবং সংকটে আক্রান্ত। আমরা কোনও সময় এর স্বরূপ স্পষ্ট বুঝতে পারি। যেমন ধরুন, আর্থিক দৈন্য, জীবিকার অনিশ্চয়তা, পারিবারিক সংকট, সামাজিক পীড়ন, আমার চেয়ে যে শক্তিশালী, তার কাছ থেকে নিত্য অপমান ও লাঞ্ছনা – এসব দিয়ে তো আমরা প্রতিদিন ভেতরে ভেতরে রক্তাক্ত হচ্ছি। দু’ধরনের খিদে সেই আদিম কাল থেকেই মানুষকে আক্রমণ করে এসেছে। পেটের খিদে আর যৌন চাহিদা। যে সমস্যাগুলোর কথা বললাম, সেগুলো আর আমাদের বেঁচে থাকা – এদুটোকে যদি দুটো তল কল্পনা করি, তবে প্রতি মুহূর্তে এই দুটি তলে প্রচন্ড ঘর্ষণ হয়ে চলেছে। এই ঘর্ষণ থেকেই শিল্প জন্ম নেয়। মসৃণ জীবনযাপনে কোনও শিল্প তৈরি হয় না। ফুটে বেরনোর, ফেটে পড়ার কোনও রসায়ন সেখানে কাজ করে না। দ্বন্দ্ব ছাড়া বিকাশ হয় না, এ তো বৈজ্ঞানিক সত্য।

আর এক ধরণের সন্ত্রাসও খুব গোপনে মানুষের বেঁচে থাকায় কাজ করে। রাষ্ট্রীয় পীড়ন, রাজনৈতিক চাপ, প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশঙ্কা, প্রাণঘাতী অসুখের ভয়, দুর্ঘটনার আশঙ্কা। ছেলেকে স্কুলবাসে তুলে দিয়েছি, তারপর যদি কোনও খারাপ খবর আসে ? আমাদের বেঁচে থাকায় যে উষ্ণতা রয়েছে, এসব ফাক্টর এক ধরণের হিমশীতল ভয় আমাদের বিপদগ্রস্ত করে রাখে। একজন গল্পকার এসব চিহ্নিত করার চেষ্টা করেন। একটা গল্প-কাঠামোর ওপর এসব উপাদান দিয়ে গল্পপ্রতিমা নির্মান করেন। একমেটে হয়, দোমেটে হয়, রঙ চাপানো হয়, গর্জন্ তেল মাখানো হয়। ডাকের সাজের শেষে একটি ছোটগল্প ঝলমল করে।

কিন্তু, একদম হাল-আমলের গল্পকারদের বয়স যদি ধরে নিই তিরিশ থেকে ষাট, তবে তারা স্পষ্টভাবে বিশ্বযুদ্ধ দ্যাখেননি, দাঙ্গা, মন্বন্তর, তেভাগা আন্দোলন দ্যাখেননি। অর্থাৎ গোটা সমাজ, সংসারকে এবং নিজের অস্তিত্বকে তুমুলভাবে একেবারে খাদের কিনারায় নিয়ে যেতে পারে, এমন অবস্থা তাদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার বাইরে। একমাত্র সত্তর দশকের নকশাল আন্দোলন তাদের অভিজ্ঞতায় রয়েছে। অথচ খুবই বিস্ময়ের ব্যাপার এই আন্দোলন নিয়ে বড়মাপের কোনও উপন্যাস লেখা হল না। বিক্ষিপ্ত ভাবে কারও লেখায় এসেছে মাত্র।

আমাদের বেঁচে থাকায় একটা centre of gravity থাকে। ভরকেন্দ্র। ভালোভাবে বেঁচে থাকার জন্য আমরা অবিরত চেষ্টা করে যাই সেই ভরকেন্দ্রকে সুস্থিত রাখার জন্য। নইলে আমাদের বেঁচে থাকাই টালমাটাল হয়ে যায়। সেই সংকট আর সংশয় চিরকালের। শুধু রূপ পালটে পালটে জীবনকে আক্রমন করে। এখনও বাথানিয়াটোলায় দলিতের রক্ত আলপথের ঘাসে লেগে থাকে। এখনও স্বামী যেখানে বলে, স্ত্রীকে ব্যালটপেপারে সেখানে ছাপ দিতে হয়। এখনও অফিসে, ট্রামেবাসেট্রেনেমেট্রোরেলে মেয়েদের যৌন হেনস্থা নিত্যকার ব্যাপার। এখনও দাম না পেয়ে, ঋণের ফাঁসে আলু ও তুলোচাষির আত্মহত্যা। এখনও শ্রমিক শোষণ, শিশুশ্রম। এসব সংকটের কথা উঠে আসছে এই সময়ের ছোটগল্পে। বেঁচে থাকার জন্য সেই ভরকেন্দ্র যাতে stable থাকে, সেজন্য আমরা অনেক দৃশ্য দেখতে চাইনা, অনেক শব্দ শুনতে চাইনা, অনেক গলি এড়িয়ে যাই দুর্গন্ধের জন্য। লেখক এসব উন্মোচন করেন। এক একজনের বলার ভঙ্গি এক একরকম। কেউ খুব তির্যক ভঙ্গিতে, শ্লেষাত্মক ভাষায় আক্রমণ করছেন। স্বপ্নময় চক্রবর্তীর ‘মানুষরতন’ গল্পটার কথা ভাবুন। আদর্শবাদী বাবা তার ছেলেকে রামকৃষ্ণ মিশনে ভর্তি করতে চেয়েছিল। অথচ তাকে মিথ্যের আশ্রয় নিতে হচ্ছে। মানুষের বেঁচে থাকায় যন্ত্রণা এবং আনন্দ চিরকালের। শুধু উপাদানগুলো পালটে যাচ্ছে। আসছে মোবাইল, কম্পিউটার, মাইক্রোআভেন, আইপড, আইপ্যাড, নন্দীগ্রাম, সিঙ্গুর, ওবামা, সুইট কর্ন চিকেন স্যুপ, ডিপ টিউবওয়েল, পঞ্চায়েত নির্বাচন, টুলুপাম্প। আসবেই। জীবনের কথা লিখতে হলে এসব তো আসবেই। এসব নিয়েই তো আমাদের দিনযাপন। এগুলো বাদ দিয়ে কীভাবে জীবনের চালচিত্র তৈরি হবে। এখন তো মারী নেই, মড়ক নেই, দাঙ্গা নেই, যুদ্ধ নেই, অন্তত দৃশ্যত নেই। তবুও একধরণের অদৃশ্য সন্ত্রাস কি আমাদের সন্ত্রস্ত করে রাখে না। অস্পষ্ট একটা নাম-না-জানা ভয় আমাদের স্বপ্নে আসে। কী করে অস্বীকার করি। এই সময়ের লেখায়, বিশেষ করে যারা নবারুণ ভট্টাচার্যের লেখার সঙ্গে পরিচিত, আশা করি আমার সঙ্গে একমত হবেন। 

লেখককে তো ইতিহাসসচেতন হতেই হয়। না হলে কীভাবে তিনি এই সভ্যতার, মানুষের মানুষ হয়ে ওঠার কথা লিখবেন। মানুষ কত দীর্ঘপথ দিল। কত ধর্মযুদ্ধের নামে অন্যায় যুদ্ধ, এখনও ডাইনির মাংসপোড়া গন্ধে উল্লাস শোনা যায়, কত সাম্রাজ্যের উত্থানপতন হল। এসব কিছু মন্থন করে জীবনের রহস্যময়তার কথা, কোনও এক সার সত্যের সন্ধান করে যান লেখক। পুরাণের নতুন পাঠ, মঙ্গলপাঠের নবনির্মাণ, যে পাশ্চাত্য লেখনরীতিকে মডেল করে একসময় আধুনিকতার সংজ্ঞা ঠিক করা হয়েছিল, তাকে অতিক্রম করে দেশজ পাঁচালি, ব্রতকথা, পুরাণ, মঙ্গলকাব্যের বিনির্মানের মধ্য দিয়ে,আমাদের লোককথা, উপকথাকে নতুন আঙ্গিকে লিখছেন অনেকেই। অন্যরকম শৈলীতে যারা লিখছেন, তাদের ভেতর রবিশঙ্কর বল, রামকুমার মুখোপাধ্যায়, গৌতম সেনগুপ্ত উল্লেখযোগ্য।

যে অর্থে কমলকুমারের মতিলাল পাদরি বা নিম অন্নপূর্ণা, বিমল করের আত্মজা বা আঙুরলতা, সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের গোঘ্ন, শীর্ষেন্দুর উত্তরের ব্যালকনি, সন্দীপনের মীরাবউদি আমাদের মনে চিরকালের আসন পেতে বসেছে, জীবনকে দেখার যে গভীর দৃষ্টিভঙ্গির জন্য গল্পগুলো চিরায়ত হয়ে উঠেছে, এমন লেখা ইদানীং খুব একটা চোখে পড়ছে না। রাশি রাশি পুজোসাহিত্য, রাশি রাশি লিটল্‌ ম্যাগাজিন পড়ছি, কিন্তু ওই যে, প্রথমেই বলেছিলাম – একটা বিষ্ফোরণ ঘটিয়ে দেবার মত লেখা, পাঠকের ঝুঁটি ধরে নাড়িয়ে দেবার মত লেখা – সে কিন্তু বিরল। এখনও ‘অলীক মানুষ’-এর মত লেখা বা বাঘারু বর্মনের মত আর একটা চরিত্র বাংলা সাহিত্যে এল না। সমসাময়িক সমস্যা নিয়ে লেখার একটা প্রবণতা সব সময়েই থাকে। তা থাকুক, কিন্তু পাঠক শিল্পের ভেতর দিয়েই সুদূরকে ছুঁতে চায়। জীবনের একটা রহস্যময়তা আছে। মানুষ সেদিকেই উঁকি মারতে চায়। যে লেখক এ কালের কথাকে সেই চিরকালের কথায় নিয়ে যেতে পারেন, তিনিই সত্যিকারের দ্রষ্টা, এবং স্রষ্টা তো বটেই। একজন বড় লেখককে একবার বলতে শুনেছিলাম – তোমার পা থাকবে মাটিতে, কিন্তু দৃষ্টি প্রসারিত হবে দিগন্তের দিকে।

আসলে তো জীবনকে বুঝতে পারা। মানুষকে দ্যাখা। দেখতে দেখতে অভিজ্ঞতার ঝুলি ভরে ওঠে। ছোটগল্প সেই বহুচর্চিত ছোটকথা, ছোটব্যথার বা একমাত্রিকতার সংজ্ঞা থেকে এখন অনেক সরে এসেছে। অন্তত বিমল কর পর্যন্ত ছোটগল্পে একমাত্রিক স্বর শুনতে পাই। পরবর্তী সময়ে একটা ছোটগল্পের ভেতরেই অনেক স্বর শোনা যেতে লাগল। গল্প যেন একটা প্রিজম্‌। পাঠ শেষ হলে পাঠক বুঝতে পারেন একটি নয়, অনেক রং-এর আলো ছড়িয়ে দিয়েছেন লেখক। মূলগল্পকে আশ্রয় করে অনেক সমস্যা ছুঁয়ে রয়েছে। আসলে যে protagonist, তার পৃথিবীও এখন অনেক প্রসারিত। তার অভিজ্ঞতায় ঢুকে পড়েছে IT sector, কৃষি ও শিল্পের দ্বন্দ্ব, ভোগবাদ, নগরায়ন, বিশ্বায়ন, মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের জটিলতা। ফলে ছোটগল্প এখন বহুস্বরান্তিক। অনেক রং-এর আলো ছড়িয়ে পড়ছে একটি ছোটগল্প থেকে। 

তিনটি ছোটগল্পের কথা আমি জাস্ট উল্লেখ করব। গল্প তিনটি আমাকে ভীষণ নাড়া দিয়েছিল। প্রথমটি জগদীশ গুপ্তের ‘দিবসের শেষে’। এ গল্পে নারাণীর পাঁচ বছরের ছেলে ঘুম থেকে উঠেই তার মাকে বলেছিল – মা, আজ আমায় কুমীরে নেবে। এখান থেকেই গল্পটির suspense তৈরি হয়েছিল। গল্পটার কথনশৈলী এমন majical, প্রতিমুহূর্তে পাঠকের মনে হয় তার আশপাশেই বুঝি দুটো ড্যাবড্যাবে চোখ জলের ওপর ভেসে তাকেই লক্ষ করে যাচ্ছে। এই হল গল্পের ভেতরে সংশয় তৈরি করা। দিনের শেষে সত্যি কুমির এসেছিল। দ্বিতীয় গল্প সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের। বিপন্ন একজন মানুষ গলায় দড়ি দিয়ে মরবে বলে ফ্যানের সঙ্গে দড়ি বাঁধছে। তার ছোট্ট ছেলে সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে। পাকা ছেলের মত সে বাবাকে জিজ্ঞেস করছে – বাবা, গলায় দড়ি দিচ্ছ ? ‘গলায় দড়ি’ শব্দের গূঢ় ব্যঞ্জনা সে জানে না। অথচ ওই একটি শব্দে তীব্র সংকটের সামনে সন্দীপন আমাদের দাঁড় করিয়ে দিলেন। মিতকথন, আর অমোঘ তীক্ষ্ণতায় পাঠকের মননে একটা বিষ্ফোরণ হয়। আর একটি গল্প নবারুণ ভট্টাচার্যের ‘পাগল ও প্রেমিক’। গল্পের নায়ক খাঁচায় পাখি পুষতে ভালোবাসত। কিন্তু তার প্রেমিকার মনে হত এটা এক ধরণের নিষ্ঠুরতা। শেষ পর্যন্ত প্রেমিক তার নায়িকার জন্য খাঁচার দরজা খুলে দিয়েছিল। পাখিটা বাইরে এলেই অন্য পাখিরা তাকে ঠুকরে মেরে ফেলেছিল। একটু ভাবুন, কোথায় গল্পটার সৌন্দর্য। কোথায় শিল্প রচিত হল। কোন সূক্ষ্ম ইশারা বেয়ে জীবনের গূঢ় তামাশার কথা লেখা হল। এ গল্পের ভেতরে ছড়িয়ে থাকা বিষাদময় একটা সৌন্দর্যচেতনা আমাকে দীর্ঘদিন অবশ করে রেখেছিল। 

ছোটগল্পের ভাষা এবং আঙ্গিক নিয়ে অনেক পরীক্ষানিরীক্ষা হয়েছে। নিমগল্প, হাংরিগল্প, গল্পহীন গল্প, না-গল্প, অণুগল্প। কিন্তু মানুষ বোধহয় শেষপর্যন্ত একটা গল্পই শুনতে চায়। সেই রামায়ণমহাভারতের, বা তারও আগের সময় থেকে মাঠাকুমার কোলে বসে গল্প শোনা, হয়তো গর্ভবাস থেকেই সে শোনে যুদ্ধ আর পরীর গল্প। হাজার হাজার দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে এখনও মানুষ গল্পই শুনতে চায়। নিমগল্প নয়, অমৃতের গল্প। থাকুক না হয় গল্পের ভেতরে আর একটা গল্প। বুঝ লোক, যে জান সন্ধান।




লেখক পরিচিতি
বিপুল দাস

গল্পকার, উপন্যাসিক
জন্ম : ১৯৫০, থাকেন শিলিগুড়িতে।
গল্পগ্রন্থ: শঙ্খপুরীর রাজকন্যা।
উপন্যাস : লালবল। সরমার সন্ততি।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন